গল্প ৮৭

​”ওজন মেশিনে ভুল ছিল”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

৯৫ কেজি ওজনবিশিষ্ট নব্যপ্রেমিকের আজ মন ভাল নেই।মন খারাপের কারণ তার ওজন। 

বিষয়টা বিস্তারিত বলা প্রয়োজন।  তার ২ মাস আগে একটা নতুন প্রেম শুরু হয়।চোখ ধাঁধানো এক সুন্দরির সাথে। এখন দুইমাস পর সেই প্রেমিকার বান্ধবীরা নব্যপ্রেমিককে দেখার ইচ্ছা পোষণ করে। বিষয়টা গুরুতর রূপ ধারণ করে যখন প্রেমিকার হঠাৎ মনে পড়ে যে নব্যপ্রেমিকের ওজন ৯৫ কেজি। 

এখন ৯৫ কেজি ওজনের বয়ফ্রেন্ডকে কিভাবে বান্ধবীদের সাথে পরিচয় করাবে সেই টেনশনে নব্যপ্রেমিকের সুন্দরি প্রেমিকার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়,কাপাকাপি শুরু হয়,বুক ব্যাথা শুরু হয়,,খিচুনি হতে গিয়েও হয় না।

বেশ কয়েকদিন নব্যপ্রেমিকের প্রেমিকা দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে ওঠে। স্বপ্নে দেখে তার বান্ধবীরা তার বয়ফ্রেন্ডকে দেখে সবাই হার্ট এটাক করে মরে গেছে। এবং সেই বান্ধবীদের ভূত, “তোর জন্য আমরা মরে গেলাম অকালে,”  এই বলে খপ করে প্রেমিকারে গিলে খেয়ে ফেলছে।

আর স্ট্রেস নিতে না পেরে প্রেমিকা শেষ পর্যন্ত নব্য প্রেমিককে বলল,,”তুমি কি ১৫ দিনের মধ্যে ওজন ১৫ কেজি কমিয়ে ৮০ করতে পারবা? তোমাকে আমার বান্ধবীরা দেখতে চেয়েছে।”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”এটা কোন ঘটনা,তোমার জন্য সব করতে পারি”

কিন্তু প্রেমিকা চোখের আড়াল হতেই নব্যপ্রেমিক এক দৌড়ে চলে আসল তার ডেটিং এক্সপার্ট বেস্টফ্রেন্ডের পরামর্শ নিতে। অনেক খুজে দেখল,টি শার্ট,হাফপ্যান্ট আর বাথরুমের চটি পরা ডেটিং এক্সপার্ট একটা কালা চশমা চোখে দিয়ে দুইপাশে দুইটা সুন্দরির কাধে হাত রেখে বেলস পার্কের বেঞ্চে বসে আছে। সুন্দরিরাও প্রেমভরা দৃষ্টি তে ডেটিং এক্সপার্ট এর দিক তাকিয়ে আছে।

নব্য প্রেমিক: দোস্ত, ১৫ দিনে ১৫ কেজি ওজন কমানোর টিপস দে।

ডেটিং এক্সপার্ট : ব্যস্ত আছি। পরে দেখা কর।

নব্য প্রেমিক: তুই আসবি এখন আমার সাথে নইলে কিন্তু সেই কিলার এসমাইল কাহিনী এদের বলে দেব।

ডেটিং এক্সপার্ট শিগগিরি উঠে নব্যপ্রেমিকের মুখ চেপে ধরল। 

ডেটিং এক্সপার্ট : (সুন্দরিদের দিকে ফিরে)  আমি তোমাদের রাতে কল দিব। আর বিষয়টা যেন মাথায় থাকে।  (শয়তানি হাসি একটা)

মেয়েদুটো একসাথে বলল,,”যাহ দুষ্টু”।  এই বলে চলে গেল।

ডেটিং এক্সপার্ট : মামা,তুই এভাবে আমারে ব্লাকমেইল করতে পারলি?

নব্যপ্রেমিক: রাখ বলদ,আমার কি হবে এটা বল। মেয়ের বান্ধবীরা আমাকে দেখতে চাইছে। ৯৫ কেজি নিয়ে ওদের সামনে গেলে তো মেয়েরে নিয়ে হাসাহাসি করবে,অথবা পড়া পানি এনে ছিটা দিবে,যে আমি ব্লাক ম্যাজিক করছি কিনা।

ডেটিং এক্সপার্ট : সত্যিই করছস না ব্লাক ম্যাজিক?

নব্যপ্রেমিক ডেটিং এক্সপার্ট এর পিঠে একটা দড়াম করে কিল দিল।

ডেটিং এক্সপার্ট পিঠ বাঁকা করে দাঁড়িয়ে বলল,,”মারিস কেন? আচ্ছা দেখতাছি ব্যাপারটা কি করা যায়।”

নব্যপ্রেমিক : কিছু একটা বুদ্ধি বের কর

ডেটিং এক্সপার্ট : (নব্যপ্রেমিকের আপাদমস্তক দেখে)  মামা,তোর গার্লফ্রেন্ডের তো এমনিই স্ক্রু ঢিলা,তোরে তো ওইজন্যই বয়ফ্রেন্ড বানাইছে, এখন ওর বান্ধবীরা ওর স্ক্রু ঢিলা জানলে কি বেশি সমস্যা হবে?

নব্যপ্রেমিক আবার কিল দিতে উদ্যত হলে ডেটিং এক্সপার্ট বলল,”আচ্ছা,আর ইয়ার্কি করমু না। চল আগে তোর ওজনটা মাপাই। ধর,ওজন ৯৫ না, ৯০। তাইলে ১৫ দিতে ৫ কেজি কমিয়ে ৮৫ করাই অনেক। বাকিটা বুঝাইয়া বলবি। আর ৬ ফুট প্রায় লম্বা হইলে ৮৫ কেজি কোন মোটার মধ্যে পড়ে না”

নব্যপ্রেমিক দেখল কথা ঠিকই বলছে। অতঃপর তারা ওজন মেশিনওয়ালার কাছে গেল ওজন মাপাতে।

ডেটিং এক্সপার্ট : (মেশিনওয়ালাকে)  মামা,আমার দোস্ত ওজন মাপাইবে। মেশিনটা বাইর করেন

মেশিনওয়ালা: (নব্যপ্রেমিককে দেখে) মামা,আমার মেশিন ভাইঙ্গা যাইব। না খাইয়া মইরা যামু। 

ডেটিং এক্সপার্ট : ধুর হালা, মেশিন বাইর কর।

মেশিনওয়াল ওজন মেশিন নিয়ে একটা দৌড় দিল। ডেটিং এক্সপার্ট পিছে পিছে দৌড় দিয়ে মেশিনওয়ালার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। মেশিন ছিটে রাস্তায় পড়ল।

এই ফাঁকে নব্যপ্রেমিক মেশিনের উপর দাড়াল। মেশিনের রিডিং দেখে  নব্যপ্রেমিক ওজন মেশিনের উপর দাঁড়িয়ে দাড়িয়েই অজ্ঞান হয়ে গেল।

পিটাপিটি বন্ধ করে ডেটিং এক্সপার্ট আর মেশিন ওয়ালা নব্যপ্রেমিকের দিক তাকাল।মেশিন ওয়ালা বলল,,”আল্লাহ বাচাইছে,মেশিন ভাঙে নাই আমার”

ডেটিং এক্সপার্ট উঠে গিয়ে নব্যপ্রেমিককে নাড়া দিয়ে বলল,,”দোস্ত,কি হইছে?”

এটা বলে সে নিজেই ওজন মেশিনের রিডিং এর দিক তাকাল। দেখল,লেখা আছে “১৯৫”   

এটা দেখে ডেটিং এক্সপার্টও অজ্ঞান হয়ে গেল।

নব্যপ্রেমিকের মন তাই ভীষণ খারাপ। ব্রেকাপ এর ভয়ে ওজন সম্পর্কিত নতুন ব্যাপারটা গার্লফ্রেন্ডকে জানাল না। 

এদিকে ডেটিং এক্সপার্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।  ১৯৫ কেজি ওজন দেখে তার জ্বর এসে গেছে। জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বলতেছে,, “১৯৫ কেজি,,,, আসেন ভাই নিয়া যান,, ১৯৫ কেজি মাত্র,,,”

যাই হোক,, নব্যপ্রেমিক ব্যায়ামাগারে ভর্তি হল। ১৫ দিনে তার ওজন ১৯৫ থেকে ৮০ কেজিতে আনতে হবে। 

জ্ঞানীরা বলেন,মানুষের অসম্ভব কিছুই নেই। নব্যপ্রেমিক নিঃসন্দেহে একজন মানুষ।  তাই সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ,ওজন তাকে কমাতেই হবে।

ব্যায়ামাগারের ট্রেইনারকে নব্যপ্রেমিক বলল,,” আংকেল, নিউ গার্লফ্রেন্ড,ওজন ১৫ দিনের মধ্যে ৮০ কেজি না হলে ভীষণ মাইন্ড করবে।”

ট্রেইনার বলল,”তা বাবা তোমার বর্তমান ওজন কত?”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”১৯৫ কেজি”

ট্রেইনার সেদিনই ব্যায়ামাগারের চাকরি ছেড়ে দিলেন।

ব্যায়ামাগারের এতদিনের ট্রেইনার চলে যাবার পিছে হাত আছে ভেবে কর্তৃপক্ষ নব্যপ্রেমিককে তাড়িয়ে দিল ব্যায়ামাগার থেকে।

এদিকে নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ড তার বেস্টফ্রেন্ডকে আর না থাকতে পেরে বলে দিল পুরো কাহিনী। যে তার বান্ধবীরা যে বলছে তার বয়ফ্রেন্ডকে দেখবে। কিন্তু তার বয়ফ্রেন্ড এর ওজন তো ৯৫ কেজি। কিভাবে দেখাবে?

বেস্টফ্রেন্ড বলল,,”তুই কি ৯৫ কেজি জানার পরও ভালবেসেছিলি?”

গার্লফ্রেন্ড: হ্যা

বেস্টফ্রেন্ড: ছেলে কি টাকাওয়ালা,হ্যান্ডসাম?

গার্লফ্রেন্ড: না

বেস্টফ্রেন্ড: বাইক আছে?

গার্লফ্রেন্ড: না,তবে সাইকেল আছে। কিন্তু ও চড়লে বাকা হয়ে যায় সাইকেল তাই চড়ে না।

বেস্টফ্রেন্ড: (গার্লফ্রেন্ডের কান টেনে)  কিছুই যখন ছেলের নাই,আর ৯৫ কেজি দেখেও যখন প্রেমে পড়তে পারছস,তাইলে বান্ধবীদের দেখাইতে সমস্যা কি? নাহয় টিটকারিই দিবে একটু,তাতে কি হইছে? তোর ভালবাসা,তোর গর্ব হওয়া উচিৎ

গার্লফ্রেন্ড: আরে আমাকে যত টিটকারি মারুক।ওকে যদি ওরা অপমান করে? সেজন্যই তো ভয় পাচ্ছি।

গার্লফ্রেন্ড মাথা নিচু করে বসে রইল। বেস্টফ্রেন্ড ওর পাশে নীরবে বসে মুচকি হাসতে লাগল,আর বলতে লাগল,,”হায়রে প্রেম।”

এদিকে গার্লফ্রেন্ডকে ফেসবুকে আর্মির এক লেফটেন্যান্ট অনেক জ্বালাইত। প্রেম করব প্রেম করব বলে। সেই লেফটেন্যান্ট বিশাল বড়লোকের ছেলে,সেই হ্যান্ডসাম। বডিও বেশ ভাল। গার্লফ্রেন্ড তাকে পাত্তা না দেওয়ায়,ডাইরেক্ট বাসায়ই প্রস্তাব পাঠায়। গার্লফ্রেন্ডের বাপ মা রাজি হলেও গার্লফ্রেন্ড নব্যপ্রেমিকের জন্য প্রত্যাখ্যান করে।

এখন সেই লেফটেন্যান্ট ভীষণ খেপে যায়। সে যখন দেখে গার্লফ্রেন্ডের প্রেমিক আসলে বিশাল মোটা,দেখতেও বেঢপ,টাকাপয়সাও তেমন নাই। তখন হিংসায় জ্বলতে থাকে। ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিতে থাকে,,”সুন্দরি মেয়েদের চয়েজ এত্ত খারাপ”   অথবা,,”রিয়েল লাভ তারা বোঝে না,প্রেম করে অসুরের সাথে”   অথবা,,ফেইক আইডি খুলে মেসেজ দিতে থাকে, “প্রেমিকের কিন্তু ঘাপলা আছে,, ”   অথবা “প্রেমিক লুচ্চা”  এই টাইপ।

এত জ্বালানোর পর বাধ্য হয়ে গার্লফ্রেন্ড যখন নব্যপ্রেমিককে বলে দিল সব কথা নব্যপ্রেমিক সেই লেফটেন্যান্ট এর কাছে গিয়ে বলেছিল, “ওর আশেপাশে যদি আর তোকে দেখি,তোর উর্ধ্বস্তন কর্মকর্তাদের নালিশ দিব,তোর চাকরি কেমনে থাকে দেখব”

লেফটেন্যান্ট তখন ফেসবুকে পোস্ট দিছিল,,”বাস্তবে নায়িকারা ভিলেনদেরই হয়,, (কান্নার ইমো হপ্পে)”

যাই হোক, লেফটেন্যান্ট কিন্তু হাল ছাড়ে নি। সে নব্যপ্রেমিক আর তার গার্লফ্রেন্ডের ব্রেকাপ ঘটানোর উপায় খুজতে নিয়মিত নব্যপ্রেমিককে ফলো করত। একটু বেচাল কিছু করার অপেক্ষায় থাকত,, যেমন সিগারেট খাইলেই ভিডিও করবে,বা কোন মেয়ের সাথে কথা বললেই “লুচ্চা ভিডিও” করে গার্লফ্রেন্ডের কাছে পাঠাবে এই ছিল তার প্লান।

এখন নব্যপ্রেমিক তো সিগারেট খায় না, মেয়েদের সাথেও মেশে না। তাই এতদিন লেফটেন্যান্ট ঘুরঘুর করেও কিছু করতে পারল না।

কিন্তু ফলো করে যেই দেখল নব্যপ্রেমিক এর ওজন ১৯৫ কেজি,অমনি বাসায় এসে “রূপবানে নাচেরে কোমর দুলাইয়া” গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে ভাবল,,আর ঠেকায় কে। এবার গার্লফ্রেন্ডকে এটা বললেই ব্রেকাপ হবে,আর গার্লফ্রেন্ড তাকে বিয়ে করবে।

ওদিকে যেদিন গার্লফ্রেন্ডকে কথাটা বলতে যায় লেফটেন্যান্ট সেদিনই গার্লফ্রেন্ড তার বেস্টফ্রেন্ডকে স্বীকার করতেছিল যে, সে ৯৫ কেজি হলেও নব্যপ্রেমিককে ভালবাসে।

এটা শুনে লেফটেন্যান্ট একটু কনফিউশন এ পড়ল। ৯৫ কেজি নব্যপ্রেমিককে যদি মেয়ে ভালবাসে,তাহলে কি ১৯৫ কেজি ওজনের নব্য প্রেমিককেও ভালবাসবে?

শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নেয়,নাহ,এভাবে হবে না,নব্যপ্রেমিকের সাথে গার্লফ্রেন্ড ব্রেকাপ করবে না। তাই নব্যপ্রেমিককে দিয়েই ব্রেকাপ করাবে। সে জবরদস্ত একটা প্লান করল।

সে ঘুরে ঘুরে দেখল নব্যপ্রেমিকের বেস্টফ্রেন্ড ডেটিং এক্সপার্ট জ্বরে দুর্বল শরীর নিয়েও বন্ধুর ওজন কমানোর উপায় খুজতে ছুটাছুটি করছে।

লেফটেন্যান্ট করল কি,লেংটি পড়ে  দাড়ি চুল লাগিয়ে কিছু পাগল হওয়ার ওষুধ নিয়ে ডেটিং এক্সপার্টের বাসার পাশের মাঠটায় এসে বসে  থাকল। সাইনবোর্ড লাগাল,,”লেংটা বাবার বিধ্বংসী আবিষ্কার, ১৫ দিনে ওজন কমবে ১১০ কেজি”

ডেটিং এক্সপার্ট সেটা দেখে আনন্দে লাফাতে লাফাতে নব্যপ্রেমিককে আনতে গেল।

এদিকে লেফটেন্যান্ট যে দোকান থেকে পাগল হওয়ার ওষুধ কিনেছিল। সেই দোকানের পাশে ছিল তখন নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ডের বেস্টফ্রেন্ড। মেয়েটা শুনল আড়ি পেতে যে লেফটেন্যান্ট দোকানদারকে মোটা টাকা দিয়ে বলছে,,”এই ওষুধ এক মোটুরে খাওয়াইয়া পাগল বানামু,হালায় আমার বউ ভাগাইয়া নিছে”

এটা গিয়ে বান্ধবী নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ডকে বলে দিল। নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ড নব্যপ্রেমিককে ফোন দিতে লাগল। কিন্তু চার্জ নাই বলে নব্যপ্রেমিক মোবাইল বাসায় রেখেই ডেটিং এক্সপার্ট এর সাথে মাঠে চলে গেল।

এদিকে প্রেমিকা জানত যে নব্যপ্রেমিকের ওই একটাই বন্ধু আছে সারা দুনিয়ায়,সে হল ডেটিং এক্সপার্ট।  এবং ওদের আড্ডার জায়গা সেই মাঠ।

প্রেমিকা তার বান্ধবীকে নিয়ে এক দৌড়ে সেই মাঠে গেল।

গিয়ে দেখল,, ওজন কমানোর বিধ্বংসী ওষুধ লেংটা বাবা লেফটেন্যান্ট এর হাত থেকে মাত্র নিল নব্যপ্রেমিক।

প্রেমিকা দৌড়ে গিয়ে নব্যপ্রেমিকের হাত থেকে পাগলের ওষুধ টা ফেলে দিল।

নব্যপ্রেমিক: আহা এ কি? আমার ওজন কমানোর বিধ্বংসী ওষুধ

প্রেমিকা: শাট আপ। তোর ওজন ৯৫ কেন, ২০০ কেজি হলেও তোকেই ভালবাসি।

নব্যপ্রেমিক: বাট তোমার বান্ধবীরা?

প্রেমিকা নব্যপ্রেমিককে জড়িয়ে বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,,”আই ডোন্ট কেয়ার।”

এদিকে লেংটা বাবা লেফটেন্যান্ট লাফাতে লাফাতে বলল,,”এই হালার চেয়েও আমি অযোগ্য? রাতে ঘুমাইতে পারি না,, আর বাই দ্য ওয়ে,,এর ওজন ৯৫ না, ১৯৫ ”

এটা শুনে প্রেমিকা জড়ানো অবস্থায়ই নব্যপ্রেমিকের মুখের দিক তাকাল। প্রেমিকার বান্ধবী এই বাড়তি ১০০ কেজির শক সইতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে গেল।

এদিকে লেফটেন্যান্ট একটা ছুরি বের করল। বলল,,”এই মোটু থাকলে তো তোরে আর পাব না, দাড়া,মোটুর চর্বি কমিয়ে দিই।”

লেফটেন্যান্ট এগোতেই ডেটিং এক্সপার্ট ঝাপিয়ে পড়ল লেফটেন্যান্ট এর উপর। দুইজন মোচড়ামুচড়ি করতে করতে পাশের গ্যাস বেলুন ওয়ালার ভ্যানে গিয়ে পড়ল,লেফটেন্যান্ট এর ছুরি ছিটকে গেল।

লেফটেন্যান্ট গ্যাসবেলুন গুলোর সুতা দক্ষ হাতে ডেটিং এক্সপার্ট এর কোমড়ে বেধে দিল। ডেটিং এক্সপার্ট আকাশে উঠতে লাগল। চিল্লিয়ে বলল,,”মামা,বাঁচা,,,”

নব্যপ্রেমিক দৌড়ে এসে ডেটিং এক্সপার্ট এর কোমড় পেচিয়ে ধরল। আতংকের সাথে খেয়াল করল,,তাকে শুদ্ধ বেলুন গুলো আকাশে উঠে যাচ্ছে।

প্রেমিকা বিস্ময়ের সাথে স্বগতোক্তি করল,”এ কেমন শক্তিশালী বেলুন”

এদিকে বেলুনওয়ালা পিছপিছ ছুটতে ছুটতে বলল,,”এই মামারা,আবার বেলুনের দাম দিয়া যান”   বেলুন তখন ডেটিং এক্সপার্ট আর নব্যপ্রেমিককে নিয়ে আস্তে আস্তে আরী উপরে উঠছে। বাতাস তাদের ভাসিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে লেফটেনেন্ট প্রেমিকার সামনে এসে বলল,,”ভালবাসা দিবি কিনা বল”

প্রেমিকা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। লেফটেনেন্ট বলল,,”সামনে ক্যাপ্টেন পরীক্ষা, মন বসে না পড়ার টেবিলে”

প্রেমিকা আস্তে আস্তে পিছু সরল। বলল,”সে কি? এ বাংলা সিনেমার নাম কেনো বলে?”

লেফটেন্যান্ট ও পিছপিছ দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,,”এই মন তোমাকে দিলাম,এ বাধন যাবে না ছিড়ে,কোপা শামসুউউউউউ,,,,”

এবার প্রেমিকা সিউর হল লেফটেন্যান্ট প্রেমের ডায়ালগ মুখস্ত করতে গিয়ে বাংলা সিনেমার নাম মুখস্ত করে এসেছে। সে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,,”হেল্প,হেল্প মি,,,”

এদিকে বেলুন ১৫ ফিট উপরে উঠার পর আস্তে আস্তে নব্যপ্রেমিকের হাত পিছলাতে লাগল,পতন ঠেকাতে সে ডেটিং এক্সপার্ট এর স্টাইলিশ  হাফপ্যান্ট খামছে ধরল।

ডেটিং এক্সপার্ট চেচিয়ে বলল,,”এ্যাই শালা,প্যান্ট ধরে টানোস কেন?”

নব্যপ্রেমিক কিছু বলার আগেই ডেটিং এক্সপার্ট এর প্যান্ট খুলে  প্যান্ট সহ নিচে পড়ে গেল। নিচে প্রেমিকার পিছে বাংলা সিনেমার নাম জপতে জপতে লেফটেন্যান্ট দৌড়াচ্ছিল।

লেফটেন্যান্ট যখনই বলল,,”বুকের ভিতর আগুন জ্বলে,,,”  তখনই ১৫ ফুট উপর থেকে ডেটিং এক্সপার্ট এর হাফপ্যানট সহ নব্যপ্রেমিক তার ঘাড়ে এসে পড়ল। হাফপ্যান্ট টা তার মাথার আশেপাশে জড়িয়ে গেল।

লেফটেনেন্ট নব্যপ্রেমিক এর ওজন আর ডেটিং এক্সপার্ট এর এক সপ্তাহ না ধোওয়া হাফপ্যান্টের গন্ধের দ্বিমুখী  আক্রমণের অজ্ঞান হয়ে গেল।

এদিকে ডেটিং এক্সপার্ট কে নিয়ে গ্যাসবেলুন রেইন্ট্রি গাছের মাথায় বেধে রইল। ডেটিং এক্সপার্ট চেচাতে লাগল,,”আমাকে উদ্ধার করতে কেউ আসো, আর কাইন্ডলি একটা প্যান্ট নিয়ে আসো,আমি আন্ডারওয়ার পরি নি,,,”

১ সপ্তাহ পর….

নব্যপ্রেমিক,প্রেমিকা,ডেটিং এক্সপার্ট আর প্রেমিকার বান্ধবী রেস্টুরেন্ট এ গেল খেতে। খাওয়া শেষ হয়ে বের হলে তারা দেখল সামনে ওজন মেশিন নিয়ে এক লোক দাঁড়ানো।

প্রেমিকার বান্ধবী বলল,,”১ সপ্তাহ আগে মেপেছিলাম ৪৮ কেজি ছিল,ডায়েটিং করছি,জিরো ফিগার বানাবো,দেখে আসি ওই মেশিনে মেপে,ওজন কত হল।”

সবাই মেশিনওয়ালার কাছে আসার পর নব্যপ্রেমিক দেখল,,এটা সেই মেশিনওয়ালা,যার মেশিনে ওজন মাপাতে গিয়েই এত কান্ড।

প্রেমিকার বান্ধবী মেশিনে দাড়াতেই অজ্ঞান হয়ে গেল। সবাই দেখল, ওজনের রিডিং এসেছে,, “১৪৮ কেজি”

সবাই ধরাধরি করে বান্ধবীকে হাসপাতালে নিয়ে গেল,বান্ধবী জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বলছে,, “৪৮ থেকে ১৪৮ কেমনে হল?”

ডেটিং এক্সপার্ট নব্যপ্রেমিকের কানে কানে বলল,”মামা,ওজন মেশিনে ভুল ছিল।”

গল্প ৮৬

​Dimension Origins: Part 2

লেখা:ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.

“প্রচন্ড সাদা একটা আলো।ভয়াবহ চোখ ধাধানো একটা আলো। আলোটা এতই  শক্তিশালী যে রুমের আশেপাশে থাকা স্টিলের আলমারি,খাট গলিয়ে দিচ্ছে।

রুমের দেয়ালগুলো কাঁপছে। ভয়ংকর কাঁপুনি। ভূমিকম্প ভেবে তিনতলা বিল্ডিং এর নিচের  তলার লোকজন বাইরে দৌড়ে গেছে। বাইরের রাস্তা লোকজনের চিৎকার আর হুটোপুটির শব্দ।

ওপাশের রুমটা বারান্দা সহ ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই রুমের ধ্বসে পড়া মেঝে থেকে বের হওয়া রডে আটকে আছে একটা ছিন্নভিন্ন লাশ। একটা পুরুষের লাশ।লাশের চোখটা প্রচন্ড দুঃখ নিয়ে চেয়ে আছে নিষ্পলক,চেয়ে আছে প্রথম রুমে থাকা দোলনাটার উপর। যেই দোলনায় থাকা কারো চোখ থেকে এই ভয়াবহ আলোটা বের হচ্ছে,,,,,

দোলনার ঠিক সামনে দাঁড়ানো অত্যন্ত সুন্দরি, সোনালী চুলো ডাইনি লিন্ডা মাটি থেকে একহাত উপরে ভাসছে,তার মুখে একটা হাসি,,নীল চোখদুটো থেকে শীতল ঘৃণা ঠিকরে বের হচ্ছে।দুই হাত তার রক্তাক্ত,,একহাতে ধরা ওপাশের রুমে শুইয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহের পুরুষটার হৃদপিন্ড।প্রচন্ড চাপে,হৃদপিন্ডটা চুইয়ে রক্ত পড়ছে,,,

হঠাৎ দোলনায় থাকা উজ্জ্বল সাদা আলোর অধিকারিণীর ছোট শরীরটা জুড়ে একটা অমানুষিক রাগ বয়ে উঠল। সাথে সাথে লিন্ডার মুখটা বিকৃত হয়ে উঠল,চোখে বিশুদ্ধ আতংক ফুটে উঠল,,,,

“প্লিজ না,,, না,,, না,,, নাআআআআআআআ!!!!!”

ছাদটা ধ্বসে পড়ল,,লিন্ডার শরীরটা থেতলে গেল,,, উজ্জ্বল আলোটা আরো উজ্জ্বল হয়ে গেল,,,,,,,,,”

কুরআন পড়ার শব্দে অনন্যা আহমেদের ঘুম ভাঙল।চোখ খোলার সাথে সাথে সাদা উজ্জ্বল আলোটা যেন ঠিকরে পড়ল। অনন্যা লাফ দিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।তার সারা শরীরে ঘাম।

তার ১৪ বছর বয়স এখন। তার ধারণা এই ১৪ বছর প্রত্যেকটা রাতে সে এই স্বপ্নটা দেখেছে। এই ভয়ংকর রক্তাক্ত স্বপ্নটা।যত বড় হচ্ছে, স্বপ্নটা আরো স্পষ্ট হচ্ছে।আরো বুঝা যাচ্ছে।

পাশের রুম থেকে হাফেজ নবীন আংকেল কুরআন পড়ছেন। সেই সুর ভেসে আসছে এই রুমে। তারমানে ফজরের নামাজে উঠতে আজো দেরি হয়ে গেছে অনন্যার।

হাফেজ নবীন আংকেল অনন্যার পালক বাবা। কিন্তু নবীন আংকেল তাকে বলে দিয়েছে,”আমাকে তুমি আংকেল ডেকো,বাবা ডেকো না। তোমার বাবার মত আমি কখনওই হতে পারব না। তোমার বাবার মত কেউ নেই,অন্য কাউকে বাবা বলে নিজের বাবার স্মৃতিকে তুমি অপমান করবা না।”

নবীন আংকেল অনন্যাকে শুধু বলেছে তার বাবা অনেক মহৎ মানুষ ছিলেন। তার বাবা এই পৃথিবীটাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।কিন্তু এর প্রতিদান হিসেবে তার কপালে জোটে স্ত্রীর লাশ এবং নিজের মৃত্যু,তার একমাত্র মেয়ে হয়ে যায় এতিম।

অনন্যার বাবা আহাদ আহমেদ সম্পর্কে হয়ত নবীন কিছুই বলতেন না অনন্যাকে। কিন্তু আস্তে আস্তে দেখলেন,সেই বাসায় ঘটা ঘটনার অলৌকিক ব্যাখ্যা না পেয়ে মানুষ আহাদ আহমেদকে একটা সাইকো খুনি বানিয়ে দিচ্ছে। অনন্যাকে বলছে খুনির মেয়ে।তখন বাধ্য হয়েই ছোট্ট অনন্যাকে তার বুঝাতে হয় একটা ভয়ংকর সত্য,একটা অন্ধকার সত্য,,,একটা ব্যাখ্যার অযোগ্য সত্য,,,,

আহাদ আহমেদ কিভাবে এই পৃথিবীতে আসে আজব একটা ক্ষমতা নিয়ে,,, বস্তুজগৎ কে নিয়ন্ত্রণের,মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের,,, কিন্তু জীবনে খুব দুঃখে পড়ার আগে কখনো তার শক্তিটা আত্মপ্রকাশ করে নি।

প্রথম প্রথম ক্ষমতাটা পাওয়ার পর আহাদ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যায়। মানুষকে ঠকাতে থাকে। কিন্তু এভাবে ঠকাতে গিয়ে একটা নিরীহ লোকের আত্মহত্যার কারণ হয় সে। তারপর নিজেকে পালটে ফেলে। ঘুরে ঘুরে অসহায় মানুষের উপকার করতে থাকে সে,অত্যাচারী যারা,যাদের শাস্তি হয় না কখনো,, তাদেরকে শাস্তি দিতে থাকে।

কিন্তু সে নিজেই জানত না,তার এই শক্তির জন্য সে ভয়ংকর একটা ভবিষ্যতবাণীর অংশ। তাকে তার ক্ষমতা খাটিয়ে ৫ টা খুন করার অপেক্ষায় ছিল পিশাচপূজারীদের একটা দল। ভবিষ্যৎ বাণী ছিল,, “সৎ একজন লোক যখন ৫ টা খুন করবে,সে প্রস্তুত হবে একটা তন্ত্রের জন্য,তার হাতে বলি হবে আরেক সৎ মানুষ। সেই রক্তমন্ত্রে মুক্তি পাবে পাতালবন্দী পিশাচদেবতা হুইটজিলোপোক্টলি। পৃথিবীতে রাজত্ব করবে সে।”

রাগের মাথায় ৩ টা খুন করার পরই নিজেকে সামলে নেয় আহাদ।কিন্তু পিশাচপূজারীদের একজন,নাম লিন্ডা,বুদ্ধি খাটিয়ে,আহাদের পিছন থেকে এমন কাজ করে যে আহাদ বাধ্য হয় শেষ ২ টা খুন করতে। ৫ টা খুন সম্পূর্ণ হতেই তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে এই ভবিষৎবাণী সম্পর্কে জানানো হয়।

আরো বলা হয় পিশাচদেবতাকে মুক্ত করতে তাকে নিজ হাতে বলি দিতে হবে স্বদেশী এক পুণ্যবান লোককে।কাকতালীয়ভাবে এই লোকটিই ছিল হাফেজ নবীন।

শেষ মুহুর্তে দেখা যায়,বলি দেবার যজ্ঞের জন্য যে মন্ত্র পড়তে হয় সে মন্ত্রের বাক্যগুলো নিজের ক্ষমতাবলে পালটে দেয় আহাদ।উল্টিয়ে দেয়।পিশাচদেবতা মুক্তি পাবার বদলে পাতালেই মরে যায়।

পিশাচপূজারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।কিন্তু তরুণী লিন্ডা প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়।সে বাংলাদেশ এ এসে খুন করে তাসনিমকে,অনন্যার বয়স তখন মাত্র কয়েকদিন।সামান্য একটু দেরিতে আহাদ পৌছে যায়,ফলে অনন্যাকে কিছু করতে পারে না লিন্ডা।

তাসনিমকে খুনের দায় আহাদের উপর চাপানো হয়। কয়েকদিন আগেই আহাদকে ৫ টা খুন করাতে তাসনিমের চরিত্র নিয়ে মিথ্যা কথা ছড়ায় লিন্ডা।আহাদ এর রাগের কথা প্রতিবেশীরা জানত। কিছু গুন্ডা তাসনিমকে মারধর করে এসে,কিন্তু প্রতিবেশীরা ভাবে আহাদ তাসনিমের পরকীয়ার কথা জেনে মারধর করেছে।

তাই যখন বদ্ধ দরজার ভিতরে এক ডাইনি তাসনিমকে খুন করে,স্বভাবতই ভূত প্রেত বিশ্বাস না করা মানুষ আহাদকে ধরিয়ে দেয় পুলিশের কাছে।

হাফেজ নবীন আর আহাদের ছোট ভাই অনেক কষ্টে আহাদের বিরুদ্ধের অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণ করে।আহাদ ছাড়া পায়।মেয়েকে নিয়ে অনেক দূর চলে যায়।

আহাদ নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়।সে বুঝতে পেরেছিল তার ক্ষমতা ব্যবহার শুরু করার সময় থেকেই পিশাচপূজারীরা তাকে ট্রেস করা শুরু করেছিল।লিন্ডালে ভয় পায় সে। লিন্ডা ছিল তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী।

কিন্তু অনন্যার যখন এক বছর,চাকরির জন্য ইন্টার্ভিউ দিতে যায় আহাদ।আহাদ স্ত্রী খুনের মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও।দেশের মানুষ এর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল,আহাদই খুনি।কিন্তু তার ছোটভাই টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়েছে। ইন্টার্ভিউ এর লোকেরাও তাই ভেবেছিল,অপমান করেছিল আহাদ আর তার মৃত স্ত্রীকে। বাধ্য হয় আহাদ আবার তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে।লিন্ডা টের পেয়ে যায় আহাদের অবস্থান।

আহাদ বুঝতে পারে। তখনি ফোন দিয়ে হাফেজ নবীনকে অনুরোধ করে,,অনন্যাকে যেন নিজের মেয়ের মত মানুষ করে সে।

তারপর যে ঘটনাটাটা ঘটে, ১৪ বছরের অনন্যা এখনো সেটা প্রায় প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখে। মাত্র এক বছর বয়সে,সে লিন্ডাকে খুন করেছিল,তার চোখে ভাসে,,, তার বাবার ছিন্নভিন্ন লাশের অসহায় আকুতিভরা দৃষ্টি,,,,,,

এই ১৪ বছরে অনন্যা যেখানেই গিয়েছে,মানুষ তাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে,,অনন্যা পরকীয়ার ফসল,আর সেজন্য তার বাবা তার মাকে খুন করে।

হাফেজ নবীন তখন অনন্যাকে বলে,,”যারা তোমাকে মিথ্যা অপবাদ দেয়,এই জীবনেও ভুগবে,,পরকালেও কষ্ট পাবে।”

হাফেজ নবীন,একবার না, বারবার অনন্যাকে তার বাবার কাহিনীটা শুনায়। অনন্যা বুঝতে পারে,সে আসলে এক নায়কের মেয়ে। কোনো খুনির না। যে নায়ক না থাকলে এতদিনে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যেত,পিশাচদেবতা রাজত্ব করত।সারা দুনিয়া আহাদকে খুনি,আর অনন্যার মাকে চরিত্রহীনা বললেও,অনন্যার বুকটা নিজের মা বাবার প্রতি সীমাহীন মমতায় ভরে ওঠে। চোখ ভরে পানি আসে,কখনওই দেখা হল না তাদের সাথে,,,,,,

ফজরের নামাজে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে।এখনি নামাজটা পড়ে নেওয়া দরকার। অনন্যা তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নামে।

২.

ধানমন্ডি,ঢাকা। পুরনো একটা বিল্ডিং। বিল্ডিং এর সামনে একটা গলি অনেকদূর পর্যন্ত গিয়ে মেইন রোডে গিয়েছে। গলিটার আশেপাশের দেয়ালে পোড়ামাটির কাজ। ফুল,পাখি,,, অনেক আগের এক প্রায় ভুলে যাওয়া বিলাসিতা আর শিল্পের ভগ্নপ্রায় উদাহরণ।

মানুষ বলে পুরনো এই নির্জন বাড়িটায় নাকি ভূত আছে। কেউ থাকে না।রাতের আধারে বাতি জ্বলে না এখানে। কোনো মানুষ যে এখানে কখনো ছিল তার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে তারপরও রাতে যেন কাদের গুমড়ে ওঠা কান্নার শব্দ পাওয়া যায়,,,,,

রেজার বয়স ১৪ বছর। তার বন্ধুরা আজ বাজি ধরেছে তার সাথে,এই ভুতুড়ে বাড়িতে ঢুকতে হবে তার।সারারাত থাকতে হবে। রেজা মনে মনে ভয় পেলেও বন্ধুদের সামনে পার্ট নিতে রাজি হল। ছোটবেলা থেকে নিজের সাহসের মিথ্যামিথ্যি গল্প করেছে বন্ধুদের সাথে। এখন যদি ভয়ে ওদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করে,সব গোমড় ফাঁস হয়ে যাবে। শর্ত হল,একটা ক্যামেরা নেবে সে প্রমাণ হিসেবে,,সারারাত কোন রুমে সেট করবে ওই বিল্ডিং এর।তারপর থাকবে। পরেরদিন সবাই দেখবে সেই ভিডিও।প্রমাণ হবে সে আসলেই ভূতের বাড়িতে রয়েছিল কিনা।

অন্ধগলির মধ্য দিয়ে রেজা চলেছে ধীর পায়ে,সেই বাড়িটার দিকে। কে বলে ঢাকা শব্দ দূষণের শহর?এখন রাত ১২ টা। রেজা খুব করে চাচ্ছে, প্লিজ কেউ একটু শব্দ করুক। পৃথিবীতে যে মানুষ আছে,সেটা সে বুঝুক।

বাড়িটার সামনে এসে সে দাড়ালো। অন্ধগলি অতিক্রম করে। বাড়িটা দেখে মধ্যযুগের ডাইনি প্রেতসাধকদের বাসা বলে মনে হয়।

রেজা গেইটের কাছে আসল।গেট খুলবে নাকি টপকাবে যখন ভাবছিল তখন আকাশ বাতাস কাপিয়ে এক অপার্থিব শব্দ আসল,,”এখানে কি করছ? বাঁচতে চাইলে পালাও,,এক্ষুণি পালাও।”

রেজার পেটের নাড়িভুঁড়ি মনে হয় আরো কয়েকটা প্যাচ খেল। পড়িমরি করে সে দৌড় দিল।কিন্তু একটা গলির বাক অতিক্রম করতেই একসঙ্গে প্যায় দশ বারোজনের আর্তনাদ শোনা গেল বাড়ির ভিতর থেকে,,,”কেউ এসেছ? প্লিজ বাঁচাও।প্লিজ,,,কোন ভূত নেই,, প্লিজ বাঁচাও,,,নয়ত মেরে ফেল আমাদের,,, আর সহ্য হয় না।”

রেজা ফিরল। হাপাচ্ছে। না তো,এতো ভয়ের শব্দ না। এটা তো কোন অপার্থিব শব্দ না। বাস্তব শব্দ,,খুবই বাস্তব।

রেজা আবার গেইটের কাছে গেল। একদম কাছে আসার আগে আশেপাশের দেয়ালের দিক তাকাল। এবার ভাল করে তাকাতে দেয়াল আর গেইটের মাঝখানে একটা একটা লালচে আলো ঝিক করতে দেখল। প্রথমে ভয় পেলেও হঠাৎ নিজের হাতের ভিডিও ক্যামেরার দিক তাকালো। হুবহু সেইম লাল আলো ঝিক করতে দেখল।

রেজা বুঝে গেল ওটা একটা লুকানো ভিডিও ক্যামেরা। আরো কাছে গেল।গেইটের কাছে দেয়ালটাতে হাত দিল।এই দেয়ালের অংশটা ফাপা।তার মানে একটা ভিডিও ক্যামেরা এখানে ছিল,ধরা পড়তেই কেউ সেটাকে ভিতরে টেনে নিয়েছে।

তারমানে প্রথমবার ভৌতিক গলায় তাড়িয়ে দেওয়া শব্দটাও কোন স্পিকার থেকে এসেছে। দেয়াল দুইটা বেশ খানিকটা হাতড়ে,আরও কিছু ফাপা স্থান পেল সে। ফাপা স্থান গুলো পাথরের না। ইস্পাতের পাতের।

রেজার ছোট মাথা বুঝে ফেলল,এই বাড়িতে আর যাই হোক,কোন ভূত নেই। তবে কিছু একটা ঘটছে এই বাড়িতে।

রেজা ফিরে চলল। দ্রুতপায়ে। কিন্তু বিল্ডিং এর ভিতরে কেউ তাকে দেখছিল। সে বুঝে গিয়েছিল রেজা পুলিশে খবর দেবে।

বাড়ির বাগানের নিচ থেকে একটা রোবটিক লেজার গান উঠল। অনেক উচু আর বড়। রেজার দ্রুত হাটা পথের দিক তাক করল। রেজার মাথা সই করল।

আলোর একটা ঝলক রেজার মাথায় আঘাত করল। রেজার সারা শরীর থলথলে অবশ হয়ে সে দুমড়ে মুচড়ে পড়ল রাস্তায়। চোখে অবিশ্বাস আর আতংক। মুখ হা। লালা ঝরছে। বেঁচে আছে সে,সব বুঝতে পারছে,,তবে নড়ার ক্ষমতাটা আর নেই।

বাড়ির ভিতরে এক অদ্ভুত দর্শন এপ্রন পরা লোক একটা রুমে ঢুকল। রুমের ভিতর ২০ টা খাচা, প্রত্যেকটা খাচায় মানুষ। ১২ জন জীবিত।  ৮ জন মৃত। মৃত মানুষদের শরীরগুলো বিকৃত,বোঝাই যাচ্ছে বিভিন্ন ধরণের এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়েছে এদের উপর। গা ভর্তি মোটা সিরিঞ্জের সুইয়ের দাগ,ফুটা স্থান ফুলো লাল হয়ে ফোলা। প্রচন্ড গন্ধ। কারো গা ভর্তি ইলেক্ট্রিক শকের দাগ। কারো সারা গা ভর্তি ফোড়া। লাল ফোস্কা,,, কারো চোখ নেই,প্রত্যেকজনের খাচা নিজেদের বমি,মল আর মূত্রে মাখামাখি। কারো গায়ে কোন কাপড় নেই।

এপ্রন পরা লোকটা বলল,,”কাউকে আসতে দেখলে মাইক্রোফোনে যখন আমি চলে যেতে বলি,তা শুনে এভানে তোরা কেন চিল্লাস? তাতেই তো আমি বাধ্য হই বাইরের লোকটাকে শেষ করে দিতে।মগজ স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে। আজ যেমন একটা বাচ্চাছেলেকে এরকম করতে বাধ্য হলাম।”

খাচার লোকগুলো গুমড়ে উঠল।

লোকটা বলল,,”তোদের মুক্তি নেই। এক বছরের মধ্যে আমার ওষুধটা বানাতে হবে। সেই ওষুধের স্যাম্পল তোদের উপরে প্রয়োগ করছি আমি। গিনিপিগ, খরগোশ, ইদুরের উপর প্রয়োগ করলে লাভ নেই,,,আমার দরকার মানুষ। জীবিত মানুষ।  ২০ টা মানুষের ৮ টা মরছে। তোদের অবস্থাও ভাল না,,আরো নতুন মানুষ লাগবে,,আমার নতুন নতুন স্যাম্পলের জন্য।”

মৃতপ্রায় লোকগুলো গুমড়ে উঠল। লোকটা বলে চলল,,”কাঁদিস কেন? তোদের চাকরি এটা। আমি তোদের মত অনভিজ্ঞ বেকারদের এক লাখ টাকার চাকরির যখন অফার করেছিলাম,তখন তো লাফাচ্ছিলি। অনভিজ্ঞ বেকারদের এক লাখ টাকার বেতন এর কাজ,,মনে কি একটু সন্দেহ হয় নি?”

“তোদের টাকার লোভ দিয়ে খুব সহজে ফাঁদে ফেলা যায়। তোদের লোভ দেখিয়ে চাকরি দেবার ছল করে এখানে এনেছি। শুধুমাত্র আমার এক্সপেরিমেন্ট এর জন্য।”

“তোরা ছাড়া তো এই বাসায় কেউ আসে না। আমার গবেষণার পৃষ্ঠপোষকরা মাঝে মাঝে টাকা আর উপকরণ দিয়ে যায়,বড্ড একা লাগে। তাই কি আর করার,বাধ্য হয়ে তোদের সাথেই গল্প করি,,, একই গল্প গত ৩ বছর ধরে প্রায় ১০০ লোকের সাথে করেছি। প্রত্যেকজনের লাশ,বাড়ির পিছনে মাটির নিচে আছে।”

“শোন,একটা গোপন সংস্থা আছে। নাম The Lobby। উগ্রবাদী ইহুদিরা চালায়।ওদের জীবনের মূলমন্ত্র হল পৃথিবী থেকে মুসলমান নামধারী সবাইকে নির্মূল করা। এই যে ইরাক যুদ্ধ,আফগান যুদ্ধ,সিরিয়া যুদ্ধ,,,মোট কথা সারা দুনিয়ায় যত মুসলমান  মরেছে এবং মরছে বিভন্ন যুদ্ধে,সেই যুদ্ধ লাগানোর পিছনে ইন্ধনদাতা এই লবি। আমেরিকা,ইংল্যান্ড, রাশিয়া,,সবাই ওদের কথায় উঠেবসে।অমুসলিমদের মধ্যে যারা ওদের কথা শুনতে অস্বীকৃতি জানায়,তাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো নিজেদের এজেন্ট দিয়ে ভেঙে দেয়।অভাবে পরে সেই দেশ। যেমন,,গ্রীস,ব্রাজিল,জার্মানি। জার্মানি পরে বাধ্য হয় ওদের কথায় উঠবস করতে,ওরা তখন রাতারাতি ওদের অর্থনীতি স্বাভাবিক করে দেয়।

হঠাৎ ১৪ বছর আগে লবির নজর পড়ে একটু ভিন্ন দিকে। একটা পিশাচসাধকদের গ্রুপের প্রতি। তাদের ভূত প্রেত সাধনার প্রতি কোন আগ্রহ ছিল না লবির। তাদের আগ্রহ ছিল ওদের বিশেষ একটা ক্ষমতার উপর….. 

ওরা ইচ্ছাশক্তি দিয়ে যেকোনো জিনিস ঘটাতে পারত,মানুষ মারতে পারত,চোখের নিমেষে এক জায়গা থেকে আরেকজায়গায় যাওয়া আসা করতে পারত,,,,

লবি এই গোপনীয়তাটা জানার জন্য উঠেপড়ে লাগল। তারা এদের টাকা দিতে লাগল।বিনিময়ের নিয়মিত চেক আপ করতে লাগল এদের শরীর,কি এমন বিশেষত্ব আসে সেই শরীরগুলোর,,,,

তারপর হঠাৎ ওদের মধ্যে একটা গণ্ডগোল হল। ওদের পিশাচপূজারীর দলটা ধ্বংস হয়ে গেল।

ততদিনে লবি ওদের ফিজিওলজি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে গিয়েছিল।

তারা আমার উপর দায়িত্ব দিল,এমন একটা প্রসিডিউর বের করা,ওষুধ বের করা,,যাতে মানুষ হুবহু সেই শক্তি গুলো পায়। আমি সফল হলে,সেই ওষুধ দিয়ে তৈরি হবে কিছু সুপার সোলজার। লবির এজেন্টরা হবে ভয়ংকর শক্তিশালী। আর গোপনে লবিকে কাজ করতে হবে না,,প্রকাশ্য যুদ্ধ হবে মুসলমানদের সাথে,,সব মরবে,,সব,,, আর আমি বিজ্ঞানী ড: এরিক পামার,আমাকে ইতিহাসের পাতায় মুসলিমহীন নব্য পৃথিবী গর্বভরে স্মরণ করবে।”

এরিক পামার গুমড়ে ফোপাতে থাকা খাচার ভিতরের এক মাংস পচে গলে পড়া মানুষ এর চোয়াল ধরে ফিসফিস করে বলল,,”কাঁদিস কেন? ৩ বছর ধরে চেষ্টা করছি,,সফল একদিন আমি হবই,,, আমি সফল হলে তোদের মধ্যে কেউ হয়ে যাবি সুপারহিরো,,, ভয়ংকরতম শক্তি তোদের শিরায় শিরায় বইবে,,,,”

গুমড়ে উঠে মানুষটা তখনি মরে গেল।

এরিক পামার হতাশ হয়ে বলল,,”আবার এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিতে হবে।”

৩.

পরেরদিন সারা শরীর অবশ,,মুখ বাকা,লালা ঝরা রেজাকে ভূতের বাড়ির সামনে থেকে উদ্ধার করা হল। সকলের মুখে মুখে ছড়াতে লাগল,,ভূত দেখে ভয় পেয়ে রেজা অসুস্থ হয়ে গিয়েছে।

রেজাদের স্কুলের দুইটা পার্ট,,এক পার্ট অল বয়েজ,আরেক পার্ট অল গার্লস। রেজা বয়েজ পার্টে ক্লাস নাইনে পড়ে। হাসপাতালে নেবার পর ডাক্তাররা সিটি স্কান করে দেখল, রেজার মস্তিস্কের এবড়োখেবড়ো অংশের ম্যাক্সিমাম সমান হয়ে গেছে,ফরে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শরীর চালনার কেন্দ্র অচল হয়ে গেছে,ভাগ্য ভাল নিচের ব্রেইন স্টেমে কিছু হয় নি,হলে ওর শ্বাস আর হৃদয়ও বন্ধ হয়ে যেত।

তবে রেজার বাবা মাকে জানিয়ে দেওয়া হল,ছেলে সারাজীবনই এমনই থাকবে।

এটা জানার পর পুরো স্কুলের ছেলে মেয়েরা রেজাকে দেখতে গেল। অনন্যাও ক্লাস নাইনে পড়ে,কিন্তু ওর পালক বাবা হাফেজ নবীন ওকে স্ট্রিক্টলি আদেশ দিয়েছে,ছেলেদের দিক তাকান যাবে না,কথা বলাও যাবে না,মেশাও যাবে না,,, বড় হচ্ছ এখন,,,অনেক কিছু মেনে চলতে হবে।

অনন্যার পূর্ণিমার চাদের আলোর মত রূপ সে নেকাব দিয়ে ঢেকে রাখে, তাও বাইরে দাঁড়ানো ছেলেরা কখনো নেকাবের উপর থেকে বেরোনো তার চোখ দুটো দেখলেই মায়ায় হারিয়ে যায়। কিশোর বয়সের প্রথম প্রেমে পড়ে।

এখন এত লোক দেখতে গেল রেজাকে। কিন্তু নবীন মানা করায় অনন্যা গেল না। একদিন অনন্যাকে পিক করতে স্কুলে আসার সময় নবীনকে অনন্যার এক স্যার বলল,,”ক্লাস নাইনের এক ছেলে চিরদিনের মত অচল হয়ে গেছে। হাসপাতালে এখনো আছে,আমরা সবাই দেখতে গেলাম,আপনার মেয়ে গেল না,বলল,আপনি নাক মানা করেছেন,এটা কিন্তু খারাপ দেখায়।”

নবীন অনন্যার দিক তাকিয়ে বলল,,”আমি কি তোমাকে যেতে মানা করেছি? আম ছেলেদের সাথে মিশতে মানা করেছি,অসুস্থ কোন মানুষকে সহমর্মিতা জানাতে নিষেধ করি নি।”

অনন্যা লজ্জা পেল। নবীন স্যারকে বলল,,”আমি নিজে অনন্যাকে নিয়ে যাচ্ছি। কোন হাসপাতালে আছে বলেন।”

এদিকে হাসপাতালের নামাজ রুমে রেজার মার চোখের পানিতে জায়নামাজ ভিজে গেছে,জায়নামাজ এর গায়ে চোখের পানির লবণের দাগ।

রেজার মা বলল,,”আল্লাহ,আমার ছেলেটাকে সুস্থ করে দাও। ও তো বাচ্চা ছেলে আল্লাহ, নিষ্পাপ, কেন এত কষ্ট দিচ্ছ? তুমি তো কত অলৌকিক ঘটনা দেখাও,,এবার কি পারো না দেখাতে?”

নবীন তখন অনন্যাকে নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছে,অনন্যার ছোট মুখের টানা টানা চোখ অবাক হয়ে আশেপাশে দেখছে,,এখনো তার মুখটা নেকাবে ঢাকা।

হাসপাতালের এক জায়গায় বড় একটা মানুষের মস্তিষ্ক এর ছবি।অনন্যা অবাক হয়ে ওটার দিকে তাকিয়ে রইল।একটু বড় নবীন ওকে নিয়ে রেজার রুমে গেল।

রেজার বাবা রেজার বিছানার পাশে বসা।রেজার মুখে ভাবলেশহীন দৃষ্টি, মুখ থেকে লালা ঝরছে,,চোখ থেকে পানি। ওর বাবা একটু পরপর উঠে ওগুলো মুছিয়ে দিচ্ছে।

অনন্যা অবাক হয়ে চেয়ে রইল রেজার দিকে। ছেলেটা অনেক সুন্দর। ওর কিশোরী হৃদয়টা জোরে জোরে বাজতে লাগল।

হঠাৎ হয়ত কিশোরী হরমোনের প্রভাবেই,অথবা অতিরিক্ত হার্টবিটের কারণেই,অনন্যার চোখে সাদা নীলচে আলো ঝিকমিক করে উঠল।

অনন্যার চোখে রেজার ঠিক মাথার ভিতরে মগজটার একটা ছবি ভেসে উঠল। সে কি? এটা তো বাইরে দেখা মানব মস্তিষ্ক এর মত না।

অনন্যার চোখ আবার জ্বলে উঠল, এদিকে নবীন রেজার বাবার কাধে হাত দিয়ে কথা বলতেছে,কেউই খেয়াল করল না।

অনন্যা হঠাৎ ভাবল,এই মগজটা এমন কেন? বাইরের ছবির ওটার মত কেন না? এটাকে কি ওরকম করা যায় না?

আস্তে আস্তে রেজার সমান হয়ে যাওয়া মগজটা নিখুত শিল্পের মত বাইরের ছবিটার মগজের মত হতে লাগল। কিশোরীর ডিজাইন অনুযায়ী।  একদম হুবহু দেখা সেই বাস্তব মস্তিষ্ক এর ছবিটার মত,,,,,

পুরোটা হয়ে যেতেই রেজার মুখ স্বাভাবিক হয়ে গেল,তারপিরেই সে দেখল অনন্যার চোখে নীলচে আলোটা আস্তে আস্তে নিভছে,,নেকাব টা খুলে গেছে,,, রেজা “বাবা” বলে একটা চিৎকার করে উঠল।

ভয়ে অনন্যার চোখ আবার জ্বলে উঠল,নবীন ফিরে তাকাল। আশেপাশের পালস অক্সিমিটার,ইসিসি মেশিন,এসি,বালব ঠাস করে ফেটে রুমটা অন্ধকার হয়ে গেল। রেজা এক লাফে বিছানা ছেড়ে নামল,,সটান দাঁড়িয়ে চেচাতে লাগল,,”বাবা,,মা!!!!”

উপর থেকে নামাজরতা রেজার মা দৌড়ে নিচে নামল,হাসপাতালের সব ডাক্তাররা ছুটে এল। নবীন অনন্যার হাত ধরে অতি দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করল।

বাসায় এসে অনন্যাকে শাস্তি দেওয়া হল,, তাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে আধাঘণ্টা ধরে জপতে বলা হল,,”বাবার মত ভুল করব না,আর এভাবে আমার ক্ষমতা দেখাব না। আমার অনেক শত্রু আছে। আমাকে পেলে মেরে ফেলবে।”

৪. 

নবীন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের লেকচারার হিসেবে ঢুকেছিল।প্রায় ৩৭ বছর হয়ে গেছে তার। বি সি এস করা ভাল চরিত্রের লোক। এখনো বিয়ে করে নি।।না করার কারণ আছে। অনন্যাকে হয়ত সে মানা করে নিজেকে বাবা ডাকতে,এটা করে সে আহাদ আহমেদের উপর সম্মান রেখে। কিন্তু বাইরে সবখানে সে বলে বেড়ায়,”আমার একটা মেয়ে আছে,নাম অনন্যা।”

বিয়ে করতে গেলে,পাত্রীপক্ষকে বলে,,”আমার একটা মেয়ে আছে।”  কাউকেই বলে না এটা পালক মেয়ে,,পালক মেয়ে বললে হয়ত একবারে বিয়ে হবে নবীনের, কিন্তু অনন্যার আর থাকা হবে না।অনেকে নবীন হাফেজ,হ্যান্ডসাম,আর সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এর চাকুরে বলে মেয়ে দিতে একপায়ে খাড়া,অনন্যার কথা জেনেও,তবে নবীন বোঝে,,এরা অনন্যাকে কষ্ট দিবে ভবিষ্যৎ এ। নবীন তাই খুজে বেড়ায়,এমন মেয়ে পেলেই বিয়ে করবে,যে অনন্যাকেও ভালবাসবে।

নবীন হুজুর মানুষ,মেয়েদের দিকে তাকায় না। তবে নবীনের এক তরুণী কলিগ তার উপর ক্রাশ খাওয়া। অনন্যা প্রায়ই নবীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। সেই তরুণী কলিগ,নাম জিনাত,,, সে জানে যে অনন্যাকে নবীন কতটা ভালবাসে। সে অনন্যার সাথেই খাতির জমায়।

অনন্যাও জিনাতকে অনেক পছন্দ করে। জিনাত মাঝে মাঝে বাসায় এসেও অনন্যার সাথে কথা বলে,গল্প করে,পড়া বুঝিয়ে দেয়। অনন্যা সবই বোঝে,কেন মূলত জিনাত এই বাসায় আসে,,কিন্তু নবীন পাত্তাই দেয় না। অনন্যা জানে নবীন এতদিন বিয়ে করে নি তার জন্যই। অনন্যা তাই নিজ দায়িত্বে নবীন আর জিনাতের বিয়ের ব্যবস্থা করে।

এবং অবশ্যই তার আশ্চর্য মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েই।

ফলে নবীন আর জিনাতের বিয়ের পর নবীন অনন্যাকে আবার কান ধরে জপতে বলে,,”আর জীবনেও আমার শক্তি দেখাব না,, আমার শত্রুরা আমাকে খুজে পাবে,মেরে ফেলবে,,,”

নবীনের বিয়ের কয়েকসপ্তাহ পর হঠাৎ মানববন্ধন হয়,,”মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা চাকরি পাচ্ছে না কেন?” এই টাইটেলে। তারা শ্লোগান দেয়,আমাদের দাদারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করছে,, আমরা যতই জি পি এ টু পাই না কেন,, সরকারের উচিৎ আমাদেরকে সরকারি চাকরি দেওয়া। বইলে কঠোর আন্দোলন হবে।

এই দাবিতে পুরো বাংলাদেশ সোচ্চার হলে,বাধ্য হয়ে সরকার বি সি এস করে আসা সরকারি চাকুরে,গেজেটেড অফিসারদের চাকরি থেকে ছাটাই শুরু করে,আর বীর মুক্তিযোদ্ধা দের জি পি এ টু পাওয়া মেধাবী সন্তানরা সরকারি চাকরিতে ঢুকতে থাকে,,এই ছাটাই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও চলে। নবীন আর জিনাত দুইজনের চাকরি ই চলে যায়।

তবে পুরনো বি সি এস দেওয়া রাজনৈতিক নেতাদের চাকরি ছাটাই হয় নি।

একে বিয়েতে টাকা খরচ। আবার জিনাতের বাবার একটা অপারেশনের দরকার হয়,সেখানে নবীন,জিনাত দুইজনেই প্রচুর টাকা খরচ করে। এখন এই মুহুর্তে মোটামুটি স্থায়ী চাকরি এভাবে চলে গেলে দুইজনেই বজ্রাহতের মত চেয়ে থাকে।

প্রথম দুই তিনমাস বেশি একটা কষ্ট হয় না। এর পরেই তিনজনের পরিবারটা অভাবে পড়ে,আগের দামী বাসাটা ছেড়ে দিয়ে একটা টিনশেড বাসায় থাকতে হয়।

নবীন পাগলের মত আশেপাশে চাকরি খুজতে থাকে। তবে এ যুগে দাড়ি টুপিওয়ালারা যতই যোগ্য হোক,তারা আবার যুদ্ধাপরাধী হতে পারে ভেবে নবীন কোথাও চাকরি পায় না। জিনাতও চাকরি খুজতে থাকে,কিন্তু বিয়ের পর নবীন তাকে বোরখা পরার নির্দেশ দেয়ায়,বোরখা পরেই ছুটাছুটি করে সে,,, কিন্তু বোরকাওয়ালীরা নাকি পড়াশুনা যাতে না, জ্ঞানী চাকরিদাতারা তাই বিসি এস করা জিনাতকে অ আ ক খ না পারায় চাকরি হবে না বলে তাড়িয়ে দেয়।

এরকম যখন সিচুয়েশন।তখন একদিন এক ইংরেজি পত্রিকায় নবীন একটা বিজ্ঞাপন দেখে,, চাকরির বিজ্ঞাপন, বেতন এক লাখ টাকা।বিশেষ কিছু লেখা নেই,যোগাযোগ করলেই বিস্তারিত বলা হবে।

জিনাতও দেখে ফেলে বিজ্ঞাপন টা। দুইজনই বলাবলি করে,”যা হবার ভালোর জন্যই হয়। এখন আমরা অনেক বেশি টাকার একটা চাকরি পেতে পারি। যা রিকুয়ারমেন্ট চাইছে,আমরা এর চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য।”

নবীন আর জিনাত ধানমন্ডির একটা পুরনো বাড়ির ঠিকানা দেখে রওনা দিল। তারা জানত না,এটাকে মানুষ ভূতের বাড়ি বলে,,, রাত বিরেতে নাকি এটা থেকে মানুষের গুমড়ে উঠা কান্নার আওয়াজ শোনা যায়……

৫.

এরিক পামার তার ল্যাবরেটির দিক চেয়ে আছে। বিশটা খাচা পুরো ফাকা। মানুষের লাশ নামিয়ে নিচ্ছে লবির এজেন্টরা। বাড়ির পিছনে লাশগুলোকে মাটি চাপা দিতে হবে,আর ল্যাবরেটরির গন্ধটাও দূর করতে হবে।

বিজ্ঞানীর পাশে কাল চশমা পরা একটা লোক দাড়ালো। বলল,,”তোমার কাজে আমরা মোটেও খুশি না এরিক। ৩ বছর আমাদের টাকা নিয়েছ তুমি। যখন যা চেয়েছ,দিয়েছি।কিন্তু বিনিময়ে আমরা বিকৃত, পচা গলা কয়েকটা লাশই পেয়েছি। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না।”

এরিক বলল,,”একটু সময় দাও প্লিজ। এটা বাংলাদেশ,মানুষ কোন ব্যাপার না এখানে।এজন্যই তো ঘাটি গেড়েছি। কেউ নিখোঁজ হলেও কেউ পাত্তা দেয় না। দরকার হলে আমরা আরো মানুষ আনব,,কাজের গতি আরো বাড়াব। আমি একটু উন্নতি দেখছি,,শেষের মানুষগুলো ৪৪০ ভোল্টের শক ২০ মিনিট ধরে খেয়েও বেচে ছিল। ”

লোকটা বলল,,”এত সময় দেয়া যায় না এরিক। সেরকম ফিজিওলজি তৈরি করা হচ্ছে না। তোমাকে তো আমরা রিপোর্ট দিয়েছিলাম”

এরিক বলল,,”আমি একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছি। তোমরা যেরকম চাও,আমার ল্যাবে ওরকম মানুষের ট্রেস পাবে যন্ত্রটা,যন্ত্রটা থেকে বুঝব,আমার এক্সপেরিমেন্ট সফল কিনা।”

লোকটা বলল,,”তো যন্ত্রটা কি বলে এরিক?”

এরিক মাথা নিচু করে রইল।

“এইটাই তোমার লাস্ট ব্যাচ এরিক। এটায় ব্যর্থ হল,তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে দেব আমরা।আর আমাদের অনেক কিছুই জেনে ফেলেছ তুমি। এবার আর বাঁচবে না। মেরে ফেলব তোমাকে।”

এরিকের অন্তরাত্মা কেপে উঠল।

এর মধ্যে বাইরের ক্যামেরায় একটা লোক, আরেকটা মহিলাকে দেখা গেল। কাল চশমা লোকটা বলল,,”শেষ ব্যাচের প্রথম শিকার এসে গেছে এরিক।”

নবীন আর জিনাতকে বাড়ির ভিতরে ঢুকানো হল। জিনাতের কেন যেন অশুভ লাগল বাড়িটা।চারদিকে কেমন যেন মৃত্যু ঘুরপাক খাচ্ছে।

নবীন আর জিনাত হলরুমে প্রবেশ করল। সাথে সাথে ল্যাবরেটরিতে থাকা এরিকের সুপার হিউম্যান নির্দেশক যন্ত্রটা সিগন্যাল দিতে লাগল।

লোকটা আর এরিক চোখ বড় করে তাকাল পরস্পরের দিকে। লোকটা বলল,,”এদের দুইজনের একজন হয়ত প্রকৃতিগত ভাবেই ওই ফিজিওলজি নিয়ে জন্মানো। আহাদ আহমেদ এর মত।”

এরিক বলল,,”শিওর হতে হবে,,,”

লোকটা একটা লেজার গান বের করল।বলল,,”যাদের ওই শক্তি আছে,এই লেজার ওদের গায়ে লাহলে কিছুই হয় না।”

সে জিনাতের দিকে ওটা তাক করে গুলি করল,,লেজার জিনাতের গায়ে লাগতেই,ওর শরীরটা গলে গেল। রক্ত ছিটকে উঠল।নবীন আর্তনাদ করে উঠল।

লোকটা বলল,,”তারমানে এই লোকটাই সেরকম,,,এ কিছু করার আগেই একে নিউট্রালাইজ কর।”

বাগান থেকে সেই বড় গান টা উঠে দাড়াল,কাঁদতে থাকা নবীনের মাথায় লাগল,, নবীন রেজার মত ওরকম অচল হয়ে গেল না। তবে অজ্ঞান হয়ে গেল।

জ্ঞান ফিরতেই দেখল নবীন খাচার ভিতরে।তার গায়ে কোন কাপড় নেই। তার খাচার আশেপাশে প্রায় ২০ জন লোক তার দিক তাকিয়ে আছে।

এরিক বলল,,”আহাদ আহমেদের মত এও প্রাকৃতিক?? ”

লোকটা বলল,,”আমার কেমন জানি সন্দেহ হচ্ছে। কিছু একটা মিলছে না।”

এরিক বলল,,”কি?”

লোকটা বলল,,”জানি না,,তবে মনে হচ্ছে এই লোকের কাছে সেই শক্তি নেই।তবে এমনো হতে পারে সে নিজেই জানে না এই শক্তির কথা। আমি শুনেছি আহাদও এটা জানত না,পরে অনেক স্ট্রেসের ভিতর তার শক্তি প্রথম প্রকাশ পায়।”

এরিক বলল,,”থাক,,কয়েকদিন গবেষণা করলেই বুঝব। তবে প্লান চেঞ্জ,আমার সম্পূর্ণ কোন ওষুধ তৈরি করতে হবে না। আমার তৈরি আগের স্যাম্পলে আমি এর শরীর থেকে পাওয়া অংশ মিলাব,,, লবির ধারণার বাইরে শক্তিশালী মানুষ তৈরি হবে।”

খাচার ভিতর থাকা নবীন “The Lobby” এর কথা শুনেই ভয়ার্তভাবে তাকাল। খুবই চেনা তার এই সংগঠন,খুব বেশি চেনা।

৬.

এক সপ্তাহ হয়ে গেল নবীন জিনাত বাসায় ফেরে না। অনন্যা চিন্তায় অস্থির। কোথায় কোথায় যেতে পারে সে খুজে এসেছে।জিনাত আর নবীনের পরিবার পুলিশে খবর দিয়েছে।পুলিশ দেখব বলে,টিভি দেখে ফেলেছে। কেউ আর উদ্ধার হচ্ছে না।

আহাদের ছোটভাই,যে প্রায়ই নবীনের বাসায় আসত ভাতিজিকে দেখতে। সে অনন্যাকে নিয়ে গেল। আহাদের বাবা মা নিজের নাতনির সাথে দুর্ব্যবহার করল। তাদের ধারণা এই মেয়ে আহাদের না। বাসার দারোয়ানের। 

অনন্যা সারাদিনরাত কাদে।তবে তার কাধে হাত রেখে চোখের পানি কেউ মুছে দেয় না। নবীনের কোন খোজ নেই।

এদিকে এক সপ্তাহ ধরে অনন্যা স্কুলে যায় না। রেজার একটা অভ্যাস হয়ে গেছিল,স্কুল ছুটির পর মেয়েদের বের হবার জায়গার দিক লুকিয়ে তাকিয়ে থাকার,অনন্যাকে একবার দেখার জন্য।

সাতদিন ধরে অনন্যাকে খুজে না পেয়ে সাইকেল চালিয়ে সে ঘুরে ঘুরে নবীনদের টিনশেড বাসায় যায়। ওখানের বাড়িওয়ালা বলে নবীন নিখোঁজ, অনন্যাকে তার চাচা নিয়ে গেছে তার দাদাবাড়ি।

রেজা সাইকেল চালিয়ে দাদাবাড়ি গিয়ে অনন্যার খোজ নেয়। অনন্যাকে একটা ছেলে খুজছে বলে অনন্যার দাদী অনন্যা আর তার মায়ের চরিত্র একবারে ধুয়ে দেয়। রেজা লজ্জিত হয়ে চলে আসে,কিন্তু জানালায় কান্নারত দুইটা লাল উৎসুক চোখ সে দেখতে পায়।

রেজা আর যায় না। একটু অন্ধকার হইলে রেজা জানালার কাছে যায়। জানালা টোকা দিতেই অনন্যা খোলে,এই প্রথম অনন্যাকে সে বোরখা ছাড়া দেখে।শুধু চোখ না,চোখের মালকিনের চেহারাটাও দেখে। তার কিশোর হৃদয়ে ঝড় ওঠে।

এদিকে অনন্যার কেন জানি রেজাকে দেখে মন একটু হালকা হয়। রেজা ওকে বলে,,”চিন্তা কর না,,আংকেল এসে যাবে বাসায়।”

অনন্যা কেদে দেয়। ওরা অনেকক্ষণ গল্প করে,তারপর রেজা চলে যায়।

এভাবে আরো দুইদিন রাতে জানালা ধরে কথা বলার পর একরাতে রেজাকে চোর ভেবে অনন্যার দাদী বটি নিয়ে তাড়া করায় অনন্যা সিদ্ধান্ত নেয় পরেরদিন থেলে স্কুলে যাবে।

স্কুলে গেল পরেরদিন। ছুটির পর বাওরে রেজাকে দেখে কিছুক্ষণ হাটল। রেজা জিজ্ঞেস করল,”আচ্ছা,আংকেল হঠাৎ কোথায় যেতে পারে? আন্টিও সাথে করে?তোমাকে বলে গেছে?”

অনন্যা বলল,,”আমি জানি না,,তারা চাকরি হারানোর পর সারাদিন চাকরি খুজত।হয়ত চাকরি খুজতেই গেছে।”

রেজা বলল,,”এই চাকরির খোজে তারা কি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে যেত?”

অনন্যা বলল,,”হ্যা হ্যা”

রেজা বলল,,”চল তো,,তারা যে পেপার পড়ত,সেই পেপারটা তাদের নিখোজ হবার এক সপ্তাহ আগে থেকে আনা প্রত্যেকটা কপির বিজ্ঞাপনগুলো পড়ে দেখি।”

ওরা পত্রিকার কপি কালেক্ট করল। পত্রিকারর বিজ্ঞাপন দেখল। অনন্যা বেশ কয়টা চিনল।রেজাকে বলতে লাগল,,”হ্যা হ্যা,,এখানে গিয়েছিল তারা,,চাকরি হয় নি, ফিরে এসেছিল,,তারপর আলোচনা করেছিল।”

রেজা এরকম পেপার ঘাটতে ঘাটতে নিখোজের একদিন আগের একটা বিজ্ঞাপন দেখল। দেখেই তার গলা শুকিয়ে গেল,, এক লাখ টাকা বেতনের বিজ্ঞাপন।  ঠিকানাটা খুবই মারাত্মকভাবে পরিচিত।

সে তার অসুস্থ হবাত কাহিনীটা অনন্যাকে বলল,,এও বলল,,”এই ঠিকানায় তো কোন মানুষ থাকে না। সবাই বলে এটা ভূতের বাড়ি।কিন্তু আমি এতে ভিডিও ক্যামেরা আর স্পিকার দেখেছি। আর কিছু মানুষের চিৎকার শুনেছি।”

অনন্যা আর রেজা নিশ্চিত হয়ে গেল সেই চিৎকার করা মানুষ দের কাতারে আছে নবীন আর জিনাত।

অনন্যা আর রেজা পুলিশের কাছে গেল। কিশোর বলে পাত্তা দিল না কেউ। আহাদের ছোটভাই,রেজার বাবা মা,এদের যখন আনল,পুলিশ শুনল পুরো ব্যাপারটা। কিন্তু উপরের নির্দেশ আছে,, রহস্যময় কোন ক্ষমতাশালী লোক,ওই ভূতের বাড়ির দিকে পুলিশ যাক,তা চায় না। তাই পুলিশ বলল,,”আচ্ছা,আমরা দেখব নে।”   এটা বলে তারা কথা রাখতে মোবাইলে পর্ন দেখল।

অনন্যা আর রেজা অসহায় হয়ে পড়ল। অনন্যা জেদ ধরে বসল। সে যাবেই তার পালক বাবাকে উদ্ধার করতে,সে সিওর ওখানেই আছে নবীন।

রেজা অনন্যার প্রতিজ্ঞা দেখে ভয় পেয়ে গেল। তার সেই নীলচে আলো চোখের ঝলকানি দেখা গেল।

৭.

এরিক পামার নবীনের উপর এক্সপেরিমেন্ট করে বুঝল,নবীনের কোন শক্তি নেই,, কিন্তু দীর্ঘসময় এরকম কোনো প্রচন্ড শক্তির আশেপাশে থাকায়,আর শরীর থেকে সেই শক্তিটা সামান্য প্রতিফলন হচ্ছে।

এরিক একটা প্লান করল। অনেক দিন শক্তি বিকিরণের কাছে থাকায় নবীনের শরীরে যতটুকু শক্তি এসেছে,সেটা সে এক্সট্রাক্ট করে লবিকে দেবে। আর নিজে নবীনকে অত্যাচার করে সেই শক্তির উৎসটা খুজবে,মানে সেই প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী মানুষটাকে,যার সাথে নবীন এতদিন ছিল। লবি এরিককে এমনিও খুন করবে,সেটা সেদিন এর হুমকিতেই বুঝেছে। এরিক তাই লবিকে বুঝাবে যে নবীনই আসল শক্তির ধারক,তার রক্ত থেকে পাওয়া স্যাম্পল দেবে ওদের। আর নিজে আসল শক্তিটাকে লোকেট করে তার থেকে এক্সট্রাক্ট করে বানাবে আরো শক্তিশালী স্যাম্পল।সেটা সে নিজের শরীরে নেবে। লবি আসুক তাকে খুন করতে,,দেখিয়ে দেবে।

এখন নবীনকে প্রচন্ড অত্যাচার করল সে। শক দিল,আঙুল কেটে দিল। নখ উপড়ে দিল। বল্পল,,”তুই নিশ্চয়ই ওরকম কোন শক্তির আশেপাশে ছিলি,,আমি জানি।  তুই আমাকে সেই শক্তির সন্ধান দিবি। আমি জানি সে আছে। আমি তার কাছ থেকে শক্তি নেব।”

নবীন এরিকের মুখে থু দিল।

এরিক নবীনের উপর অত্যাচার বাড়িয়ে দিল।

এদিকে নবীনের রক্ত থেকে সিরাম বের করে শক্তি বিকিরণ এর অংশটা নিজস্ব কেমিক্যাল প্রটোটাইপে ঢুকিয়ে এরিক লবির জন্য সুপার সোলজার/এজেন্ট এর ফর্মুলা বানাল।

এখন লবি যে এরিকের ল্যাবের কনায় কোনায় মাইক্রোফোন বসিয়ে রেখেছিল এরিক জানত না। লবি ওর প্লান ধরে ফেলেছিল।  তারাও খোজ নিচ্ছিল সেই শক্তিটার। সেটা মেয়েও হতে পারে,ছেলেও।

এরিক লবির এজেন্টকে ডাকল,কম শক্তির স্যাম্পলটা গছিয়ে দিতে। লবি তো আগেই সব জেনে গেছে। লবির এজেন্টরা এরিককে গুলি করল। নবীনের কাছ থেকে সেই সুপারপাওয়ার ওয়ালা ব্যক্তির সন্ধান চাইল। নবীন এবারো দিল না। এজেন্টরা নবীনকে নিয়ে যেতে চাইল।আরো অত্যাচার করে তথ্য নিতে।

এদিকে গুলি খাওয়া এরিক সেই লবিকে দেওয়া সিরামটা নিজের শরীরে পুশ করল।

মারাত্মক একটা ভুল,বা মারাত্মক একটা আশাতীত ফল হল। তিন বছর ধরে বানানো ব্যর্থ, মানুষকে বিভিন্নভাবে বিকৃত করা কেমিক্যালকে স্ট্যাবিলাইজ করল নবীনের শরীর দেখে বের হওয়া শক্তি সিরাম।

ফলশ্রুতি তে এরিকের দেহে পচন ধরল না। বরং তার সাইজ বাড়তে লাগল। ৫ ফুট এরিক আস্তে আস্তে ১৫ ফুট লম্বা হয়ে গেল। মাংসপেশি শক্ত,দৃঢ় আর বড় হয়ে গেল।

দাতগুলো চোয়ালের বাইরে চলে এল। হাড়গুলো ইস্পাতকঠিন হয়ে মাংস চিড়ে বেড়োতে লাগল। বিশাল এক দৈত্য হয়ে গেল সে।

লবির এজেন্ট রা গুলি করতে লাগল। আর এরিক ওদেরকে ধরে ধরে আছাড় দিতে লাগল,,কারো শরীর অর্ধেক করে ছিড়ে ফেলল।

 সবাই যখন মরে গেল।নবীনকে ঘাড় ধরে সে উঠাল। বিকট গলায় বলল,,”কই সে শক্তি? আমাকে বল,,না বললে আমি পুরো শহরের সবাইকে মেরে ফেলব। যে আমাকে বাধা দেবে,বুঝব সেই তেমন শক্তির ধারক। কিন্তু তাকে পাবার আগে এতগুলো মানুষের মৃত্যুর কারণ হবি তুই।”

নবীন বিকৃত মুখে বলল,,”জাহান্নামে যা,শয়তান।”

এরিক নবীন কে দেয়ালে ছুড়ে মারল। তারপর ছাদ ভেঙে বিশাল একটা লাফ দিয়ে দূরবর্তী বিল্ডিং এর মাথায় উঠল,সেখান থেকে নামল মেইন রোডে,রাস্তা ভেঙে টুকরা উচু হয়ে গেল। যানবাহন গুলো মানুষ সহ ছিটকে পড়তে লাগল। মানুষ আর্তনাদ করে ছুটোছুটি করতে লাগল।

এদিকে ওই বাড়ি থেকে একটা দৈত্যকে বের হতে দেখল সাইকেলে থাকা রেজা,,আর পিছে ক্যারিয়ার এ থাকা অনন্যা।

অনন্যা হা করে দানবটাকে চেয়ে দেখল।

অনন্যা বাবা বলে চিৎকার দিল। গেটটা উপড়ে পরে ছিটকে গেল। ওরা ভিতরে  দৌড়াতে লাগল। নবীন তখনো বেচে ছিল,মেরুদণ্ড ভাঙা অবস্থায় ক্রল করতে করতে দরজার দিক আসল। অনন্যা আর্তনাদ করে উঠল ওই অবস্থা দেখে,,”বাবা,বাবা ” বলে চিল্লাতে লাগল।

হঠাৎ অলরেডি ছাদ ভাঙা বাড়ি। আর দৈত্যটার ধ্বংস করা ল্যাবের আগুনে পুরো বিল্ডিং ধ্বসে পড়ল,অনন্যার চোখের সামনে নবীনের মাথার উপর পুরো ছাদ ধ্বসে পড়ল।

অনন্যা চিৎকার দিয়ে বসে পড়ল। রেজা ওকে জড়িয়ে রাখল। হাউমাউ করে কাদতে লাগল অনন্যা।

হঠাৎ মাটির নিচে থাকা জেনারেটর এ আগুন লেগে গেল,বিস্ফোরণ হল। মাটি ধ্বসে পড়তে লাগল। রেজা টানতে টানতে অনন্যাকে ওর সাইকেলে বসালো। সাইকেলে পেডাল দিতে লাগল জোরে জোরে,,পিছে মাটি ধ্বসে পড়ল,,গলির রাস্তা ধ্বসতে লাগল,,, পাশের দেয়াল গুলো সাইকেলের পিছে পিছে পড়তে লাগল।সাইকেলের গতি কমলেই নিশ্চিত মরণ,,,,,

গলির একদম মাথা এসে বুঝল রেজা, সাইকেল আর যেতে পারবে না,,পিছের চাকা ধ্বসের ভিতর ঢুকে গেল,সামনের চাকা উচু হয়ে গেল। অনন্যাকে নিয়ে সে বিশাল একটা লাফ নিয়ে মেইন রোডের কোণায় পড়ল।

মেইন রোডে তখন কিয়ামত চলছে,,রাস্তা থেকে গাড়ি দুইহাতে ধরে পাশের বিল্ডিং এ ছুড়ে মারতে লাগল। মানুষ পিপড়ার মত ছুটতে লাগল।

রেজা তার পাশে একটা ছুড়ে মারা ভেঙে পড়া বাস দেখল।অনন্যাকে নিয়ে বাসটায় লুকাল।

দানবটা রাস্তায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এদিকেই আসতে লাগল। একটা চলন্ত বাসকে ধরে ফেলল। ভিতরের মানুষ আর্তনাদ করে উঠল।

রেজা হঠাৎ দেখল,,দানবের হাত থেকে বাসটা ছুটে ধীরে ধীরে উপরে উঠছ্র,,দরজা জানালা ভেঙে পড়ছে,ভিতরের মানুষ গুলো আস্তে আস্তে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আশেপাশের বিল্ডিং এর বারান্দায় এসে পড়ল।

এই ভয়ের মাঝেও প্রত্যেকটা ছুটন্ত মানুষ থেমে গিয়ে কান্ডটা দেখতে লাগল। দানবটা অবাক হয়ে বাসটাকে দেখতে লাগল,,আস্তে আস্তে সেটা উপরে উঠছে।

রেজা বলল,,”অনন্যা,,অনন্যা,,দেখ।”

এই বলে অনন্যার দিক ফিরতেই ভয়ে রেজা ৫ হাত দূরে ছিটকে পড়ল।

অনন্যা বাসের পিছের সিটের ৩ হাত উপরে ভাসছে,, তার চোখে পানি,,,সুন্দর মুখটা প্রচন্ড রাগে বিকৃত। চোখটা সাদাটে নীল আলোয় জ্বলছে,,, আলোটা আস্তে আস্তে সারা বাসে ঠিকরে পড়ছে,,রেজা চোখ ঢাকল।

বাসটা থেমে গেল মধ্য আকাশে। ভাসছে ওটা,,ঠিক এরিকের মাথার উপর।

এক সেকেন্ডের কম সময়ে প্রচন্ড বেগে বাসটা আছড়ে পড়ল এরিকের মাথায়। এরিকের পনেরো ফুটের ইস্পাত কঠিন দেহ থেতলে গেল।বাসটা আবার উপরে উঠল,,আবার এরিকের উপর পড়ল,,যেন একটা বিশাল অদৃশ্যহাত বাসটাকে হাতে করে এরিককে হামানদিস্তার মত করে পিষতেছে।

বাসটা ততক্ষণই এভাবে উপরে উঠল,আর নিচে নামল,,যতক্ষণ পর্যন্ত এরিকের দেহটা ভর্তা না হয়ে গেল,,মাংসপিণ্ড না হয়ে গেল,,আকার আকৃতি বোঝার অবস্থায় না থাকল,,,, এরপর ভাঙাচোরা বাসটা রাস্তার পাশে পড়ে রইল।

রেজা দেখল অনন্যা দড়াম করে বাসের মেঝেতে পড়ে রইল।তার নাকমুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে।

এরকম অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা দেখার পর ধানমন্ডির লোকেরা আরেকটা আজব ঘটনা ঘটতে দেখল,, একটা কিশোর ছেলে একটা কিশোরী মেয়ের অজ্ঞান দেহ কাধে নিয়ে অনেক কষ্টে দৌড়াচ্ছে,, আর চিৎকার করছে,,”প্লিজ কেউ অনন্যাকে বাঁচান,,প্লিজ হাসপাতালে নিতে হবে ওকে।”

কিশোরী মেয়েটার নাক থেকে ফোটা ফোটা রক্তে ছেলেটার জামা ভিজে যাচ্ছে,,,,,,,,  

(পরবর্তী গল্প Dimension Origins:Part 3 তে Dimension এর অরিজিন স্টোরি সমাপ্ত হবে)

গল্প ৮৫

​”শয়তানে স্যুট পরে”

(মৌলবাদের আদ্যোপান্ত গল্পের বর্ধিতাংশ)

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

ইকবাল খান একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা টি-শার্ট,আর একটা জিন্স পরে নিজেকে খুটিয়ে খুটিয়ে লক্ষ্য করছে।একটা চিরুণি দিয়ে সারাজীবনের অগোছালো চুলগুলোকে আচড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে।

ইকবাল খান যে ফ্লাটে থাকে,সেটায় সে পারতপক্ষে যেতে চায় না।অনেক স্মৃতি তার মনে পড়ে।অত্যন্ত দুঃখের কিছু স্মৃতি।

ইকবাল খান আমেরিকায় আসে মেডিসিনে এম আর সি পি করতে,সুদূর বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু আমেরিকায় এয়ারপোর্ট এ নামার প্রথম দিন আরেকটা বাংলাদেশি দম্পতির সাথে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটিরর কাছে লাঞ্ছিত হয় শুধুমাত্র মুসলিম নামের জন্য।

যাই হোক,সেই লাঞ্ছনাটা একটা উপকার করে,আমেরিকায় এসে সেই লাঞ্ছিত বাংলাদেশি দম্পতির (তারা এসেছিল রসায়নে থিসিস করতে) সাথে খুবই আপনভাবে বন্ধুত্বে লিপ্ত হয় ইকবাল। কেটে যায় প্রায় ৩ বছর। তারা ৩ জন ইকবালের বর্তমান ফ্লাটে শেয়ার করে থাকত।

ঠিক ৩ বছর পর,সেই দম্পতির একটা সন্তান আসার সময় হয়। তখন ইকবাল জানতে পারে,রেজা,,মানে যে বাবা হতে যাচ্ছে তাকে ব্রেইনওয়াশ করে একটা ইম্পরট্যান্ট বিল্ডিং এ বোমা হামলা করতে নেওয়া হচ্ছে।

ওদিকে মেয়েটার প্রসববেদনা ওঠে। ইকবাল হাসপাতালে নিতে চাইলেও মেয়েটা জোর করে রেজার কাছে নিয়ে যেতে অনুরোধ করে।ইকবাল তাই করে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে,রেজাকে ব্রেইনওয়াশ করে বোমা হামলা করতে যে উদ্বুদ্ধ করেছে,সে তাকে খেলনা বোম সাপ্লাই দিয়েছে।

পরে প্রকাশিত হয়,,এটা সি আই এর একটা প্লান,একটা গোপন অপারেশন।  নাম “স্টিং অপারেশন “।  কোন একটা মুসলিমকে নিজে মুসলিম সেজে হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কাফের মানে আমেরিকানদেরকে খুন করতে উৎসাহিত করবে,এবং সাপ্লাই দেবে নকল অস্ত্র। ব্রেইনওয়াশড মুসলিম কথিত জিহাদের নামে হামলা চালাতে যাবে।ওৎ পেতে থাকা পুলিশরা ধরে ফেলবে। এভাবে নিরাপরাধ এক মুসলিমকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া হবে,যাতে সত্যিকারের বোমা হামলাকারীরা এই শাস্তি দেখে ভয় পায়। ভাবে,,”জাস্ট হামলার অভিনয় করেই এই শাস্তি,,সত্যিকারের হামলা হলে কি না কি যেন হবে”

রেজাকে এভাবে ধরা হল। প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীকে ঘটনাস্থলে দেখে এরেস্ট অস্বীকার করে রেজা ছুটে আসল তার স্ত্রীর কাছে। পুলিশ অপরাধী পালাচ্ছে বলে সবার সামনে গুলি করল। গুলি শুধু রেজার গায়েই লাগল না,,, তার বউয়ের গায়ের লাগল,,আর লাগল প্রায় ভূমিষ্ট হওয়া বাচ্চার গায়ে।

পাশে দাঁড়িয়ে ইকবাল খান সব দেখল। ইকবাল খান স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। রেজা আর রেজার বউকে পরেরদিন দাফনের সময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়েছিল। তৃতীয় বিশ্বের মুসলিম ইকবাল খানের মনে হচ্ছিল অন্যায় দেখে লজ্জিত হয়ে আকাশ কাদছে।

যাই হোক,এরপর থেকে ফ্লাটটায় গেলে,ইকবাল রেজা আর তার বউকে সোফায় বসে থাকতে দেখে,আর অনাগত বাচ্চাটাকে সে ৩/৪ বছরের একটা মেয়ে হিসেবে দেখে,,ইকবাল খানকে ডাকছে,,”ইকবাল চাচ্চু,আইসক্রিম খাব।”

যাই হোক,এম আর সি পি ডিগ্রির সময় ইকবালের হাসপাতালে এক হেরোইন আসক্ত,হতাশ কিন্তু অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট এক আমেরিকান সাদা চামড়ার ছেলে রয় ট্রেভরের সাথে দেখা হয়। বাবা মার বিতাড়িত,স্ত্রীর থেকে প্রতারিত রয় ট্রেভরকে নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা এবং মোটিভেশন করে ইকবাল। রয় ট্রেভর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ইকবালের উপর। ইকবাল জানতে পারে রয়ের ইচ্ছা পুলিশ হবে,সে নিজ দায়িত্বে রয়কে পুলিশ একাডেমিতে ভর্তি করায়,,এসব ঘটনা ঘটেছিল রেজা আর তার বউ বেচে থাকতেই।

রয় সব পরীক্ষায় টিকে গেলেও শেষে বুঝতে পারে মাদক হিস্টোরি নিলে রয় ধরা খাবে,আর চাকরি হবে না। ইকবাল নিজে শয়তানি করে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসারকে মারধোর করে হাত পা বেধে পুলিশ একাডেমিতেই কুকিয়ে রাখে,,তারপর রয় ট্রেভরকে মাদক ক্লিন হিসেবে ঘোষণা দেয়।আর রয়ের চাকরি হয়ে যায়।

সেই থেকে রয় ট্রেভর ইকবাল খানকে শুধু বেস্ট ফ্রেন্ডই ভাবে না,,নিজের ভাই বলে পরিচয় দেয়।

রয় ট্রেভর গোয়েন্দাগিরি করে নিজের কৃতিত্বে নিউ ইয়র্কের বড় পুলিশ পোস্টে যায়।তাকে এক নামে সবাই চেনে,যমের মত ভয় করে অপরাধীরা।

যেই স্টিং অপারেশনে সি আই এর এক এজেন্ট রেজাকে ফাদের ফেলে,সেরকম ৫ জন এজেন্ট সারা নিউ ইয়র্কে ছড়িয়ে আছে বলে রয় ট্রেভর বের করে। সে আগেই সাবধান করে দেয় ইকবালকে। তবে রেজা যে এই ফাদে পড়বে সে বুঝে নি। কারণ ইকবাল রেজার চেয়ে কট্টরপন্থী মুসলিম।৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। অনেক কিছু জানে ধর্মের ব্যাপারে।জান প্রাণ দিয়ে ইসলামকে ভালবাসে। রয়ের সন্দেহ হয়েছিল ইকবালকে সি আই এ এজেন্টরা টার্গেট করতে পারে।

যাই হোক,সেই ৫ সি আই এ এজেন্টের মধ্যে একজন কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী।  সে স্টিং অপারেশনে তার টার্গেটকে খেলনা বোম না দিয়ে আসল বোম সরবরাহ করে। ব্রেইনওয়াশড টার্গেটের হামলায় একটা চত্বরের ৩০০ আমেরিকান নিহত হয়।

ইকবাল খানের এম আর সি অই ততদিনে হয়ে যায়। তার বাবা মা তাকে বাংলাদেশে ডাকে,, ৩ বছর হয়ে গেছে,ছেলে তাদের কাছছাড়া।ইকবালের মা তো ছেলে ছেলে করে বিছানায় পড়েছে।

ইকবাল প্লেনে উঠে যায়।রয় বিদায় জানাতে আসে এয়ারপোর্ট এ। তখনি ঘোষণা আসে,তদন্ত হবার আগে কোনো মুসলিম আমেরিকা ছাড়তে পারবে না। ইকবাল এর আর বাংলাদেশ ফেরা হয় না। আমেরিকা নামক বিশাল কারাগারে আটকা পড়ে সে। ছেলের চিন্তায় বাবা মা দুইজনই মরে যায়।

বোমা হামলায় ৩০০ আমেরিকান মরার পর সারা আমেরিকায় অসংখ্য মুসলিম বিদ্বেষী গ্রুপ তৈরি হয়। তারা গ্রুপ করে করে মুসলিমদের উপর হামলা জরতে থাকে। ৩০০ আমেরিকান মরার প্রতিশোধ।

এই আক্রোশের শিকার হয়ে ইকবাল খান প্রায় ১০/১৫ বার বেদম প্রহারের শিকার হয়। এভাবে একদিন মেরে ডাস্টবিন এর পাশে ফেলে রাখার সময় তার দেখা হয় এই মহাকাব্যের শেষ পর্যন্ত ইকবাল খানের সাথে থাকা কুকুর “কুত্তা” র। কুত্তা তখন ছিল একটা বাচ্চা মাত্র। সেই মহাকাব্য আমি বেচে থাকলে একদিন লিখব হয়ত।

যাই হোক,রয় ট্রেভর  জানতে পেরে মুসলিম বিরোধী কয়েকটা গ্রুপের সদস্যদের পিটিয়ে হাত পা ভেঙে দেয় তার বন্ধু ইকবাল খানকে এভাবে মারার জন্য। সারা নিউ ইয়র্ক জেনে যায়,ইকবাল খানের গায়ে একটা আচড় লাগলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।  সে নিউ ইয়র্কের সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকর আর দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা রয় ট্রেভরের পাতানো ভাই।

রয় ট্রেভরের নতুন একটা গার্লফ্রেন্ড হয়েছে ততদিন। তার নাম শেলি। শেলি প্রথম প্রথম মুসলিম বলে ইকবালকে ভাল চোখে দেখত না। কিন্তু এখন সেও ইকবাল এর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। ইকবাল এখন দিনের বেশির ভাগ সময় রয় আর শেলির ফ্লাটেই থাকে।

গত ক্রিসমাসের ইকবালের সাথে পরিচয় হয় এনি হার্ভার্ডের সাথে,, এনির ৮ বছরের একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। ইকবাল এনি আর তার ছেলে জ্যাকের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। মাত্র দুই মাসে জ্যাক আর এনি ওকে আপন করে নেয়। এমনকি জ্যাক বাবা দিবসে ইকবালকে গিফট কার্ড দেয়। ইকবাল বিব্রত হয়ে পড়ার আগেই এনি ওকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়।

আজ এনি আর ইকবালের প্রথম ডেট। তবে এই ডেটে জ্যাক থাকবে। ইকবাল বলে দিছে। এনি হেসেছে খুব। ইকবাল এর সাথে সারাজীবন সে কাটাতে চায়। কিভাবে তা সম্ভব সে জানে না। তবে সম্ভব করাতেই হবে।

যাই হোক,ইকবাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে। এমন সময় শেলি এসে পিছনে দাড়াল।শেলি একটা জিমের ট্রেইনার। রয় শেলিকে বলেছে ইকবালের আত্মরক্ষা শিকতে হবে,শেলি যাতে নিজ দায়িত্বে ওকে এক্সারসাইজ করায়,আত্মরক্ষা শেখায়,রয় মাঝে মাঝে তাকে অস্ত্র চালাতে শেখায়।তবে শেলি নিজ থেকে আরেকটা দায়িত্ব নিয়েছে। ইকবালকে স্মার্ট করা।

শেলি: শ্রমিকের মত গেট আপ নিয়ে কই যাও?

ইকবাল: ডেটিং এ। আজকে এনির সাথে প্রথম ডেট।

শেলি: এনি মানে ওই চোখ ধাধানো সুন্দরি মেয়েটা? ওরকম একটা মেয়ের জন্য লোকেরা লাইন লাগায়,আর তুমি ডেটিং এর অফার পেয়ে ক্ষেত সেজে যাচ্ছ। থাম্বস আপ।

ইকবাল: (ঘুরে তাকিয়ে)  ক্ষেত? কই? আমার কাছে তো ভালই দেখায়,, জাস্ট চুলটাকে নিয়ন্ত্রণে আনলেই হয়।

শেলি: (কপালে চাপড় দিয়ে)  কাকে যে আদিম মানুষ থেকে সভ্য করার দায়িত্ব নিলাম ঈশ্বর জানে,, এই বেটা কাপড় খোল।

ইকবাল: নাউজুবিল্লাহ।সে কি?

শেলি: চুপ থাক। ডেট কখন?

ইকবাল: এই তো ৪৫ মিনিট পর।

শেলি: সর্বনাশ। এর মধ্যে তৈরি কেমনে করব?

ইকবাল: আমি কি মেয়ে নাকি আজব? আমার রেডি হতে ৩০ সেকেন্ড লাগে,,শুধু চুলটা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

শেলি ততক্ষণে একটা ফিতা দিয়ে ইকবালের মেজারমেন্ট নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। বিশেষ জায়গার আশেপাশে হাত যাচ্ছে বলে ইকবাল লাফালাফি করে বলছে,,”সে কি?!”

মিজারমেন্ট নিয়ে রয়কে ফোন দিয়ে শেলি কি সব জানি বলল।১৫ মিনিটের মধ্যে রয় এল ইকবালের সাইজের একটা স্যুট নিয়ে।

বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড মিলে ইকবালকে স্যুটটার ভিতরে ঢুকানোর কসরত চালাতে লাগল। রয় তারপর ডেটিং বিষয়ক কিছু টিপস দিতে লাগল ইকবালকে। আর শেলি ওর মাথার চুল ঠিক করে দিতে লাগল জেল টেল লাগিয়ে।ইকবাল মাথায় সেই জিনিসগুলো লাগানোর কারণে শেলিকে ধমকাতে গেলে শেলির চোখ রাঙানিতে চুপসে গেল।

ইকবালের কুড়িয়ে পাওয়া কুকুর কুত্তা,যাকে সে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা তাকায় নিজের ঘরে ঢুকায় না বলে সারারাত ঘরের বাইরে শুয়ে থাকে (শেলি প্রচন্ড ক্ষেপে এজন্য),,এবং অন্য কেউ কুকুরটাকে ইকবালের থেকে সরাতে এলে কামড়াতে চায়,,সেই কুকুরটা এতক্ষণ ইকবালের সামনে আসে নাই,, একটু আগে ইকবাল তাকে “বিড়ালের বাচ্চা ” বলে গালি দেওয়ায় কুকুরটা ভীষণ অভিমান করেছিল।

ইকবাল যখন বাইরে ট্যাক্সিতে উঠছিল কুকুরটা তারস্বরে ডাকছিল। রয় আর শেলি ভাবল,কুকুরটা কখনো ইকবালকে ছেড়ে থাকে না বলে মনে হয় নিতে অনুরোধ করছে।

ইকবালের মনে হল,”কুকুর তো শয়তান দেখলে এভাবে ডাকে।”

নিউ ইয়র্কের পাশ দিয়ে যে নদীটা বয়ে গেছে। তার পাশে রেলিং এ হেলান দিয়ে রাতের নদীটাকে দেখছে এনি আর জ্যাক হার্ভার্ড। জায়গাটা মেইন শহর থেকে দূরে। এখানে লোকজন তেমন আসে না। হাইওয়ে বলে গাড়ি মাঝে মাঝে আসে। পিছনে হার্ভার্ডের গাড়িটা। মা আর ছেলে ওয়েট করতেছে আজব একটা ডেটিং এর জন্য।ইকবাল খান আসবে যেকোনোসময়।

জ্যাক: মা,শয়তান কি ভাল?

এনি: কি বলছ বেবি এগুলো?

জ্যাক: শয়তানকে কি খুব আপন লাগে প্রথম প্রথম? আসল ক্ষতি করে দেওয়ার আগে?

এনি: আমি বুঝছি না কিছু।

জ্যাক: আমি বাইবেলে পড়েছি জিসাসকে শয়তান বলেছিল সে বন্ধু,,,তারপর তাকে বিষ খেতে বলেছিল। এডামকে শয়তান আপেল খাইয়েছিল বন্ধু পরিচয় দিয়ে। কিন্তু জিসাস আর এডাম দুইজনেরই পরে ক্ষতি হয়।

এনি: হ্যা বেবি। শয়তান মাঝে মাঝে মানুষকে ধোকা দেয়।

জ্যাক: বাবা দিবসে সব বন্ধুরা যখন স্কুলে তাদের বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল।আমি ইকবালকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলাম এটা আমার বাবা। আমার বন্ধুরা আমাকে পরে বলেছে,ওই মুসলিম লোকটা তোমার বাবা?

এনি : তারপর?

জ্যাক: আমি বলেছ,হ্যা। ওরা বলল,,মুসলিমরা শয়তান হয়,তুমি জানো না?

এনি : না বেবি,ওরা ভুল বলে,,ইকবাল অনেক ভাল। তুমি নিজেই তো জানো,ও তোমাকে কত হেল্প করে,তোমাকে যারা খোড়া আর বুদ্ধি কম বলে ক্ষেপাত,ইকবাল ওদের দিয়ে তোমাকে হ্যান্ডশেক করিয়েছিল মনে আছে? তারপর তুমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলে,,ও হাসপাতালে নিয়ে গেল কত রাতে ঘুম থেকে উঠে এসে। ও মাম্মিকেও কত সাহায্য করে,কেয়ার করে।তুমি তো জানো।

জ্যাক: কিন্তু শয়তান নাকি এভাবে মানুষ এর আপন হয়। তারপর ক্ষতি করে? মানুষ ক্ষতির আগে বুঝতেই পারে না।

এনি কিছু বলার আগেই একটা ট্যাক্সি থামল। ইকবাল নামল ট্যাক্সি থেকে।ভাড়া মিটিয়ে ইকবাল ওদের দিক তাকিয়ে হাসল। লাইটপোস্টের আলোতে স্যুট পড়া ইকবালকে এনির কাছে কোন হলিউড নায়কের মত লাগল। এনর শ্বাসপ্রশ্বাস বেড়ে গেল।বুক ধুকপুক করে উঠল। স্যুট পরে ইকবালকে কখনওই দেখে নি সে।

জ্যাক প্রতিদিনের মত ইকবালকে দেখে হাত নাড়াল না।ওর কানে বাঁচতে লাগল,,”ও মুসলিম,  মুসলিম মানে শয়তান, বাঁচতে চাইলে পালাও,, ও শয়তান,,ও শয়তান।”

এনি এগিয়ে গিয়ে ইকবালের দুই গালে চুমো খেল। ইকবালকে স্যুটে এর আগে কখনওই দেখে নি সে। অসাধারণ সুন্দর লাগছে ইকবালকে। ইকবালও এনির দিক একদৃষ্টে চেয়ে আছে। কোন মেয়ে এর চেয়ে বেশি সুন্দর এই পৃথিবীতে হতে পারে না সে নিশ্চিত। এর চেয়ে সুন্দরি দেখতে গেলে জান্নাতে যেতে হবে।

এনি: তোমাকে,,,,এত সুন্দর আগে কখনো দেখি নি।

ইকবাল: (এক হাত দিয়ে জ্যাকের চোয়াল নাড়িয়ে) তাই? এখন আমি নিশ্চিত মেয়েগুলো আমার দিকই তাইলে তাকিয়েছিল। আমার ধারণা ছিল আমার ট্যাক্সি ড্রাইভারের দিক তাকিয়ে ওরা চোখ মারছিল।

এনি : (হেসে দিয়ে)  কয়টা মেয়ে? গুণছ?

ইকবাল: নাহ,বাই দ্য ওয়ে,আমি টি শার্ট পরে আসছিলাম। রয় স্যুট কিনে শেলির সাথে মিলে জোর করে পরিয়ে দিয়েছে। আর শেলি চুল ঠিক করে দিয়েছে। রয় অনেক টিপস দিয়েছিল ডেটিং সম্পর্কে।আমি ভুলে গেছি। আর শেলি বলে দিয়েছে তুমি যাতে ওকে একদিন ম্যাকডোনাল্ডে নিয়ে খাওয়াও।

এনি: (অনেকক্ষণ ধরে হেসে) আচ্ছা খাওয়াব খাওয়াব। 

জ্যাক ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে। ইকবাল সেটা খেয়াল করল।

ইকবাল: জ্যাক সাহেব,বোরড হচ্ছ? তাহলে বল,কোন রেস্টুরেন্ট এ যাই।এমনিই ফেরার সময় রেস্টুরেন্ট এ যাওয়ার প্লান আছে। 

জ্যাক কিছু বলল না।

এনি: (দ্রুত) ওর মুড অফ। স্কুলে ঝগড়া করেছে।

ইকবাল: (ব্যস্ত হয়ে)  সে কি? আবার কারা ঝামেলা করল? সেদিন সবার সাথে তোমার বন্ধু পাতিয়ে দিলাম না?

এনি : বাদ দাও। পরে ও নিয়ে ভাবা যাবে।

ইকবাল আর এনি অনেকক্ষণ ধরে রেলিং এর ধারে বসে নদী দেখতে লাগল।জ্যাক চুপচাপ ভাবতে লাগল কিসব, তার কানে এখনো বাজতে লাগল,,”ও শয়তান,,তোমাকে আর তোমার মাকে শেষ করতে ও এসেছে। পালাও পালাও।”

এনি: ইকবাল,আমি শেষ কবে হেসেছি ভুলে গেছি। সেই কবে থেকে একা হয়ে আছি।আমি আর জ্যাক। যদি হাসতাম সেটা হত লোক দেখানো। কিন্তু সেই ক্রিসমাসের পর থেকে আমার জীবনটা পালটে গেছে। আমি আমার জীবনে সত্যিকারের সুখী হয়েছি। আমার হাসি,আমার সুখ একটাও আর লোক দেখানো না,,একদম ভিতর থেকে আসছে সব।

ইকবাল: আমারো তোমার আর জ্যাকের সাথে পরিচয়ের পর নিজেকে আর একা মনে হয় না। এর আগে অনেক কারণে আমি বারবার একা হয়ে গিয়েছি।কষ্ট পেয়েছি।আমেরিকা আমার কাছে একটা কারাগার হয়ে গেছে। আমি রয় আর শেলির দয়ার পাত্র হয়ে বেচে থাকতাম। তোমার আর জ্যাককে পেয়ে মনে হচ্ছে,আমি একজন স্বাভাবিক মানুষ। ইসসস,, তোমাদের সাথে এভাবে থাকতে পারতাম।

এনি : হুম। আমার জ্যাকের বাবার সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর সব পুরুষের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি আসলেই অনেক একা,,, জ্যাকের একটা বাবা লাগে আর আমার একটা জ্যাকের বাবা।

ইকবাল: (থতমত খেয়ে)  মানে,,জ্যাকের বাবা আবার ফিরে আসছে?

এনি: (ইকবালের হাত জড়িয়ে)  জ্যাকের বাবাকে ফিরে আসতে বলি নি তো। কিন্তু জ্যাকের বাবা তো কেউ হতে পারে,,,যাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি,,,,,

এনি ইকবালের বুকে সেধিয়ে গেল। ওর ঠোট প্রায় ইকবালের ঠোটের কাছে,,,,

জ্যাকের কানে তীব্রভাবে বাজতে লাগল,,, “ও শয়তান,ও শয়তান,,, আজ কেউ মরবে,,, হয় তোর মা,নয়ত তুই,,, শয়তানের নজর পড়ছে তোদের মা বেটার উপর,,শয়তানের,,,,”

একটা বিয়ারের ক্যান ঝনাৎ করে রাস্তায় গড়িয়ে পড়ল। ইকবাল আর এনি লাফিয়ে সরে গেল। একটা মাতাল লোক টলে টলে ওদের তিনজনের দিক আসছে। হাতে একটা রিভলভার।

ইকবাল কেন যেন বুঝে ফেলল,লোকটার মতিগতি ভাল না। সে এনি আর জ্যাককে তার পিছনে আড়াল করে সামনে দাড়াল।

ইকবাল: প্লিজ স্যার,আপনি ক্ষতি করবেন না। আপনি যদি টাকা চান,আমি দিয়ে দিচ্ছি।

লোকটা: তুই মুসলমান? হ্যা,,কপালে দাগ দেখতেছি,,এই দাগ মুসলমানদের থাকে,,,তুই মুসলমান।

জ্যাকের কানে “ও শয়তান ” কথাটা এত জোরে বাজতে লাগল যে জ্যাক কান চেপে ধরল।

লোকটা: মনে পড়ে? দুই বছর আগে? নিউ ইয়র্ক চত্বরে বোমা হামলা? ৩০০ জন মরছিল,, তোর মত কোন মুসলিম কুত্তার বাচ্চা মারছিল,,,ওই ৩০০ জনের মধ্যে আমার বউ ছিল,,,,,,

এনি ইকবালের স্যুট খামচে ধরল।

লোকটা: আমার প্রিয়তমাকে তোর মত কেউ একজন এই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। আর তুই আজ এখানে তোর প্রিয়তমাকে নিয়ে সময় কাটাচ্ছিস?

এনি ইকবালের সামনে এসে দাড়াল।

জ্যাক: মা!!!!!

ইকবাল: এনি পিছনে আসো।

এনি: প্লিজ স্যার ওকে কিছু বলেন না,,ও তো কিছু করে নি। আপনি মাতাল। আপনি তাই বুঝছেন না। আমাদের ছেড়ে দিন।ওকে মারবেন না।

লোকটা: ওকে কে মারবে?  আমি জাস্ট ওকে বুঝাচ্ছি,এবং ভবিষ্যতে ওর মত আরো শয়তানদের বুঝাব,,, নিজের প্রিয়তমাকে হারালে কেমন লাগে,,,,

লোকটা রিভলভার উচিয়ে এনির বুকে দুইটা গুলি করল,ইকবালের স্যুটে আর মুখে রক্ত ছিটে উঠল।

লোকটা পালিয়ে গেল। জ্যাক তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল।

ইকবাল এনিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। এনির ঠোটটা কাপতে কাপতে বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে ইকবালের দিক শেষবারের মত তাকাল।

ইকবাল এনির নিস্পন্দ দেহটা আকড়ে পাথরের মত বসে রইল।

পুলিশের গাড়ি এল। পুলিশ আসল। রয় ও আসল। ইকবাল তখনো ঠায় বসা,এনি ওর কোলে।

জ্যাক তারস্বরে চিৎকার করল,,”শয়তান,, তুই শয়তান,,, তোর জন্য আমার মা মরে গেল,তুই আমার মাকে নিয়ে নিছিস আমার কাছ থেকে,তুই শয়তান,,তুই নরকের শয়তান।  যা শয়তান,নরকে যা,,,, নরকে পচে গলে মর,,,,,

ইকবাল এনির দেহ কোলে নিয়ে ঠায় বসা।এবার ইকবালের কানে বাজছে,,”তুই শয়তান,,তুই শয়তান।”

গল্প ৮৪

​”এই কিলার এসমাইল সেই কিলার এসমাইল নয়”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

৯৫ কেজি ওজনের একজন নব্যপ্রেমিক তার বেস্টফ্রেন্ড ডেটিং এক্সপার্টকে দুধ চা খাওয়াচ্ছে। নব্যপ্রেমিকের রিলেশনটা হয়েই গেল। ৯৫ কেজি যে রিলেশনের পথে অত ওজনদার কোন বাধা না,সেটার জীবন্ত প্রমাণ  দুনিয়ার বুকে হেটে চলা এই নব্যপ্রেমিক।

ঘটনা শুরু প্রায় ১ মাস আগে। নব্যপ্রেমিক প্রথমবারের মত ডেটে যায় এক অত্যন্ত সুন্দরি তরুণীর সাথে।প্রথম ডেটে ৯৫ কেজি দেখে তরুণী ঘাবড়ে গিয়ে নব্যপ্রেমিককে খালুzone এ ফেললেও শেষমেশ রিলেশনে রাজি হয়।

যাই হোক,ডেটিং এক্সপার্ট এর একটা কথাও পালন না করেই গার্লফ্রেন্ড হয়ে যায় নব্যপ্রেমিকের। কিন্তু ভদ্রতাবশত ডেটিং এক্সপার্ট কে চা খাওয়াচ্ছে নব্যপ্রেমিক।

নব্যপ্রেমিকের সাথে ডেটিং এক্সপার্ট এর কথোপকথনটি তুলে ধরার চেষ্টা করা হল।

এক্সপার্ট : প্রথম ডেটে তো যা যা করতে বলছিলাম কিছুই করস নাই। মাইয়ারে গিফট দেস নাই,রেস্টুরেন্ট এ নিস নাই,জিনসের প্যান্ট পরস নাই,আকাশী কালারের শার্ট পরস নাই,কেডস পরস নাই। হুদা তোর ৯৫ কেজিটা লইয়া গেছস,মাইয়া যে রিলেশনে রাজি হইল,এখন আমার ওর মানসিক ভারসাম্যের ব্যাপারে তীব্র সন্দেহ দেখা দিচ্ছে।

ডেটিং এক্সপার্ট চায়ে সুড়ুত করে একটা টান দিল।

অন্যদিন হলে নব্যপ্রেমিক এই চায়ে সুড়ুত টান দেওয়ার জন্য আর তাকে অপমান করার জন্য ডেটিং এক্সপার্ট এর পিঠে ভাদ্র মাসের তালের সম ভরসম্পন্ন দুটি কিল বসিয়ে দিত।কিন্তু নতুন প্রেমে পড়েছে বলে,তার মেজাজ অত্যন্ত ফুরফুরে।তার ক্লাসমেটরা তাকে এবনরমাল বলার পরেও পর্যন্ত সে রাগ করে নি।

নব্যপ্রেমিক: “এসো আমার নদীর তীরে,এসে কূলকিনারা পাও,আমাকে যদি ভাল লাগে তবে ভালবেসে যাও” (গানের কলি দিয়ে গুণগুণ করছে।ফুরফুরে মেজাজের আধিক্যে তার ভারতবিদ্বেষ পর্যন্ত মনে দাগা দিচ্ছে না)

এক্সপার্ট : (ভ্রু কুচকে)  হইছে,শব্দ দূষণ করিস না। বাই দ্য ওয়ে,আয় তোকে আমি রেস্টুরেন্ট এর ডেটিং এর কিছু নর্মস শিখিয়ে দিই। 

প্রথমে রেস্টুরেন্ট এর দরজায় গিয়ে দরজা খুলে দাড়াবি,মাইয়ারে আগে ঢুকতে দিবি।তারপর তুই ঢুকবি। তারপর টেবিল চুজ করে চেয়ার টেনে দাঁড়িয়ে থাকবি,আগে বসবি না খবরদার।তারপর ওয়েটারকে “এক্সকিউজ মি” বলে ডাকবি,ওয়েটার না। অর্ডার দিবি,মাইয়ার সামনে আবার হাপুস হুপুস করে খাবি না। আস্তে আস্তে খাবি। তারপর বিল দেবার সময় ওয়েটারকে ২০ টা টিপস দিবি।এগুলো ছোটখাটো বিষয়,কিন্তু মাইয়ারা খুব খেয়াল করে।

নব্যপ্রেমিক: (উদাসী কন্ঠে) একচুয়াল্লি,আমি সেদিনের পর আবার ডেটে গেছিলাম,এবার রেস্টুরেন্টেই গেছিলাম।তখনো রিলেশনও হয় নি। কিন্তু আমি দরজা ধরে দাড়াই নি।উলটা সেই দরজা ধরে আমাকে আগে যেতে দিছে। তারপর চেয়ার পেয়েই আমি বসে পড়ছি। 

এক্সপার্ট : মহৎ কাম করছ,মাইয়া রাজি হইল কেমনে তোর মত ক্ষ্যাতের সাথে রিলেশন করতে?

নব্যপ্রেমিক: বাট আমি ওয়েটারকে “এক্সকিউজ মি” বলছিলাম তো।

এক্সপার্ট : তারপর কি অর্ডার দিছস?

নব্যপ্রেমিক: গেছিলাম কফি খেতে। ওয়েটার বলল,,চা কফি আলাদা সার্ভ করে না। চা এর সাথে টা কিনতে হয় আগে। অথচ আমার পকেটে অনলি কফি খাওয়ার টাকা।

এক্সপার্ট : (চোখ গোল আলুর মত করে) তারপর?

নব্যপ্রেমিক: অর্ডার ও দিল। কি সব চপসি না টপসি,,একদম চানাচুর মাখানোর মত। আমি ওকে বললাম,”রুচি চানাচুর টমেটো সস দিয়ে মাখিয়ে দিছে” শুনে সে কি হাসি,, আহ,,, একদম কিলার স্মাইল,,,যাকে বলে খুনে হাসি,,ওই হাসিতেই তো খুন হয়ে গেছিরে,,,,

এক্সপার্ট : (এবার চোখ মিষ্টি কুমড়ার মত করে)  থাম শালা,টপিকে আয়,কফির টাকা নিয়ে গিয়ে চপসির দাম কেমনে দিলি?

নব্যপ্রেমিক: আমি দিই নি তো,,ওই দিছে।

এক্সপার্ট : (নিজের কপালে ভয়াবহ শক্তি নিয়ে চাপড় মেরে)  মাইয়া খাওয়াইছে,আর তুই বইয়া বইয়া গিলছস? মান ইজ্জত শেষ।

নব্যপ্রেমিক: খাইতে পারি নাই তো। চানাচুর সস নিয়ে মাখানো,,এ কি খাওয়া যায়?

এক্সপার্ট : মেয়ে কেমনে তোর প্রেমে পড়ে? মামা,সত্যি কইরা ক কি করছস? কালা যাদু,নাকি জানে মেরে ফেলার হুমকি?

নব্যপ্রেমিক: কিছু করি নাই তো,,, আমার প্রোপোজাল তো আরো এক সপ্তাহ আগে থেকে ঘুরতে ছিল,ওইদিন রেস্টুরেন্ট ডেটের পর সে হ্যা বলছিল।

এক্সপার্ট : (মুখটা হা হয়ে গেল।একটা মশা ঢুকতেই কাশতে লাগল) কি জ্বালা!

নব্যপ্রেমিক: আরো কাহিনী আছে,রেস্টুরেন্ট থেকে আমরা ছবি টবি তুলতে ডেটিং স্পট খুজলাম আশেপাশের। একটা পুকুর পাড়ে দেখলাম কাপলরা বসে টসে,আমরা ওখানে গেলাম। মেয়ে বলল,,”আপনার প্রোফাইল পিকচার একটাও ভাল না।পোজ জানেন না,পোজ শিখিয়ে দিই,আসেন,ওই পুকুরপাড়ে দাড়ান।”

আমি দাড়ালাম। মেয়ে একটু পর মোবাইল ক্যামেরা হাতে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল।আম খেয়াল করলাম আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছি।মেয়ে এসেই আমার হাত ধরে টান দিল। ঘুরে দেখলাম আমার ৯৫ কেজির চাপে পুকুরের পাড়টা ধ্বসে পুকুরে পড়ে গেল।

আমি আর ও শিগগিরি বরিশালের কয়েকশ কপলের অভিশাপ উপেক্ষা করে স্থানত্যাগ করলাম।

এক্সপার্ট এমন বড় হা করল,সে তার মুখ হা অবস্থায় লকড হয়ে গেল।কিছু কথা বলার জন্য চেষ্টা করতে লাগল।কিন্তু লকড হওয়া হা মুখ আর বন্ধ হল না।নব্যপ্রেমিক লক হওয়া মুখটা চেপে চুপে ঠিক করে দিল। 

এক্সপার্ট : (চোয়াল ডলতে ডলতে)  মামা,মাইয়া কি পাবনায় থাকত টাকত? জিজ্ঞেস করছিস? এতকিছুর পর তোর সাথে রিলেশনে রাজি হইছে,আমার ধারণা,তার মাথার তারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট তারটা ছেড়া। মামা,সাবধানে থাকিস,কামড়াইতে পারে মাইয়া।

নব্যপ্রেমিক: আরে ধুর,কামড়ালে কামড়াক,,শি ইজ দ্য লাভ অফ মাই লাইভ। (একটা প্রশান্তিময় হাসি)  আর এছাড়া,ও কামড়াবে না, ক্রেজি ৪ সিরিজের নাম শুনছিস না? টি এম রায়হান মাসুদের লেখা? ওখানের একটা ক্যারেক্টার আছে আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের। দুষ্ট লোকে বলে,সেই জুবায়েরের চাপা শুনলে নাকি মানুষ ভায়োলেন্ট হয়ে কামড়ায়। এই মেয়ে ক্রেজি ৪ এর সব বই পড়ছে,এত্তগুলো চাপা শুনেও সে কাউকে কামড়াইতেছে না।

এক্সপার্ট : দেখ,,জুবায়ের বসরে কিছু বলবি না। উনি চাপাবাজ না। উনি আমার আইডল। আমার ধারণা উনার একটা কথাও চাপা না। লেখকের ব্যক্তিগত দ্বেষের শিকার জাস্ট। লেখক ওনাকে চাপাবাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে

এক্সপার্ট আর নব্যপ্রেমিক রাস্তা ধরে হাটতে হাটতে এভাবে কথা বলছে।ওদিকে বরিশালের অপরপ্রান্তে এক রাজনৈতিক নেতা,তার একই দলের প্রতিপক্ষ গ্রুপের এক অধিক জনপ্রিয় নেতাকে এক পেশাদার খুনি দিয়ে মেরে ফেলে কীর্তনখোলায় ফেলে দিয়েছে। খুনের স্টাইল দেখে গোয়েন্দাদের পুরনো নথিপত্র ঘেটে পুলিশ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে,এই খুনি আর কেউ নয়,বাংলাদেশের কুখ্যাত পেশাদার খুনি,কিলার এসমাইল।

যাই হোক,এক্সপার্ট নব্যপ্রেমিককে বলল,,”চল,তোদের পুকুরপাড় তো তোর ভরে ধ্বসে পড়ছে।এখন ডেটিং স্পট পাবি কই,তোরে একটা জায়গা চিনাইয়া দিই। জায়গাটা মুক্তিযোদ্ধা পার্কের মত অত জনবহুল না,কেডিসির মত অত নির্জন না, পারফেক্ট জায়গা। একটা বড় বটগাছ আছে নদীর পাড়ে। বটগাছের শিকড়ে বসে ডেট করবি।”

নব্যপ্রেমিক: চল।দেখিয়ে দে।

নব্যপ্রেমিক আর ডেটিং এক্সপার্ট যখন আসে এখানে,তখন অলরেডি সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। মাগরিবের নামাজ পড়তে নব্যপ্রেমিক মসজিদে ঢুকেছিল,যদিও ডেটিং এক্সপার্ট একটা টি শার্ট,একটা হাফপ্যান্ট আর বাথরুমের চটি পরে আসার কারণে মসজিদে ঢুকতে অপারগতা জানায়। 

যখন তারা ডেটিং এক্সপার্ট এর দেখানো স্পটের সন্ধানে গেল।এশার টাইম হয়ে গেছে। নব্য প্রেমিক আবার মসজিদে ঢুকল। এবং ফেরার সময় আমার মিলাদ হল,, নব্যপ্রেমিক বের হয়ে যেতে চাইলেও তার ৯৫ কেজি তাকে মিলাদের মিষ্টি থেকে বঞ্চিত করতে চাইল না। 

সুতরাং অবশেষে তারা যখন উক্ত ডেটিং স্পটের কাছে গেল,ডেটিং স্পট অন্ধকার, আকাশ ভরা মেঘ,বিদ্যুতের চমক আর ঝড়ো হাওয়া। রাতের আকাশের কালো মেঘের লালচে আভায় বটগাছটাকে রহস্যময় লাগছে।বটগাছের তীরে কীর্তনখোলা নদীর স্রোত বিদ্যুৎচমককে কাব্যিকভাবে প্রতিফলিত করছে।

ডেটিং স্পট দেখতে দেখতে ডেটিং এক্সপার্ট নব্যপ্রেমিককে বলল,,,”মুতমু মামা।”

নব্যপ্রেমিক আর ডেটিং এক্সপার্ট ঘুরতে ঘুরতে সারি সারি ইটের মাঝের একটা স্পটে গেল। ডেটিং এক্সপার্ট দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করল। এদিকে নব্যপ্রেমিক তার গার্লফ্রেন্ডকে মেসেজ দিয়ে ডেটিং স্পটের জায়গাটার বর্ণনা দিল।

এদিকে ডেটিং এক্সপার্ট কাজ শুরু করার সাথে সাথে  শুনল, কে যেন বলতেছে,”স্যার বৃষ্টি নামে”

আরেকজন বলতেছে,,”বৃষ্টির ধারা তো জানতাম এক সরলরেখায় নামে না,পানির ফোটা হিসেবে নামে,এছাড়া বৃষ্টির পানিতে এরকম বিটকেল গন্ধ কেন?”

প্রথমজন বলল,,,”স্যার,বৃষ্টি না,এক বলদে আমাদের গায়ে পেশাব করে দিছে।”

এটা শোনার পর ডেটিং এক্সপার্টও চিৎকার দিল,আর দুইজন পুলিশ সদস্য চিল্লিয়ে লাফ দিল।পুলিশ সদস্যদের মুখ আর ইউনিফর্ম ভিজে গেছে।

এক্সপার্টের ঘাড় চেপে ধরে বড় পুলিশটা বলল,,”হারামজাদা,,আর জায়গা পাস নাই? আন্ডার কভারে ইটের স্তূপের কোনায় বসছিলাম।দিছস বারোটা বাজাইয়া।”

এদিকে নব্যপ্রেমিক এক্সপার্টকে ফোন দিল অন্ধকারে না পেয়ে। ঘুরতে ঘুরতে ইটের স্তূপের কাছে এসে দেখে ডেটিং এক্সপার্টকে দুইজন পুলিশ ঘাড় ধরে ঝাকুনি দিচ্ছে,ডেটিং এক্সপার্ট “ইয়া মাবুদ” বলে আর্তনাদ করছে।

নব্যপ্রেমিক বলল,,” সে কি? আপনারা ওকে ধরেছেন কেন? আর আপনাদের গা থেকে এভাবে মানবমূত্রের গন্ধ আসছেই বা কেন?”

বড় পুলিশটা বলল,,”তুমি এই ছাগলটাকে চেনো?”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”হ্যা চিনি তো,,আমার বেস্ট ফ্রেন্ড প্লাস ডেটিং এক্সপার্ট।  ও আমাকে ডেটিং এর টিপস দিচ্ছিল। আর স্পট খুজছিল।”

ছোট পুলিশ বলল,,”ইটের স্তূপের কোণায় ডেটিং স্পট? স্যার,,,ঘোরতর সন্দেহজনক। ”

বড় পুলিশ বলল,,” আসলেই তো,এত রাতে এখানে ডেটিং স্পট খোজে? আমার ধারণা, মাদক সেবন করতে এখানে এসেছে। হাবিলদার,সার্চ হিম।”

হাবিলদার এসে নব্যপ্রেমিককে সার্চ শুরু করতেই সে বলল,,”পুলিশ আংকেল,আপনা গা থেকে মানব মূত্রের তীব্র গন্ধ।কাইন্ডলি যদি নদীতে কয়েকটা ডুব দিয়ে সার্চ করতেন,অত্যন্ত ভাল হত।”

হাবিলদার বলল,,”চোপ!!!”

হাবিলদার নব্যপ্রেমিককে সার্চ দিয়ে কয়টা রিক্সাভাড়া আর মোবাইলটা পেল।ওদিকে বড় পুলিশ ডেটিং এক্সপার্টকে সার্চ করলে,হাফপ্যান্টের ভিতর দুইটাকার একটা কয়েন পেল আর ৩% চার্জওয়ালা একটা মোবাইল। 

সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে শেষে পুলিশ বলল,,”মোবাইলটা চেক কর। দেখ ভি পি এন আছে কিনা।”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”ভি পি এন থাকলে কি হয় স্যার?”

পুলিশ বলল,,”ন্যাকা? তারানা হালিম পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করছে জানোস না? ভি পি এন থাকলে বুঝব তুই পর্নো দেখিস,তোরে তখন থানায় নিব।”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”স্যার আগে দেখতাম,এখন ভাল হয়ে গেছি। নতুন নতুন প্রেম শুরু করছি তো”

পুলিশ ভ্রু কুচকে বলল,,”তোর সাথে কে প্রেম করে? মাইয়ার মাথার তার কি ইন্ট্যাক্ট আছে?”

ডেটিং এক্সপার্ট পাশ দিয়ে বলল,,”এক্সাক্টলি স্যার,,পয়েন্ট টু বি নোটেড।”

পুলিশ বলল,,”তুই চুপ কর হারামজাদা।মুইতা দিছস মুখের উপর। তোরে পুলিশের প্রতি হামলার অভিযোগে গ্রেফতার করলাম।থানায় চল,বাংলা,পাকিস্তানি আর ইন্ডিয়ান মিক্স ডলা দিব।”

ডেটিং এক্সপার্ট কাপতে লাগল।এদিকে হাবিলদার নব্যপ্রেমিকের মোবাইলে ভি পি এন খুজতে লাগল। হঠাৎ নব্যপ্রেমিকের ডেটিং স্পট সম্পর্কিত মেসেজের রিপ্লাইয়ে তার গার্লফ্রেন্ড মেসেজ দিল,,”জায়গার নাম বলেন”

এখন গার্লফ্রেন্ডের হাসি দেখে গত একমাসে বারবার খুন হয়ে যাওয়া নব্যপ্রেমিক আদর করে গার্লফ্রেন্ডের নাম সেইভ করে রেখেছিল,, “Killer Smile”

হাবিলদার সাথে সাথে কাপতে কাপতে বড় পুলিশকে বলল,,”স্যার,অবস্থা আরো সিরিয়াস, এরা ছোটখাটো অপরাধী না স্যার,,, কিলার এসমাইলের সাথে যোগাযোগ আছে।কিলার এসমাইল এই ছেলেরে মেসেজ দিছে, “জায়গার নাম বলেন” ”

ডেটিং এক্সপার্ট আর পুলিশের ওসি দুইজনেই চোখ বড় করে হা করে নব্যপ্রেমিকের দিক তাকিয়ে রইল। নব্যপ্রেমিক তড়িঘড়ি করে বলল,,”এই না,,স্যার এই কিলার এসমাইল সেই কিলার এসমাইল না। এই কিলার এসমাইল হল,কিলার স্মাইল, আমার গার্লফ্রেন্ড স্যার,, অসাধারণ হাসি স্যার,,একবার হাসি দিলে স্যার হার্ট মারাত্মক জোরে ধকধক করতে থাকে স্যার,তাই কন্টাক্টে নাম রাখছি “Killer Smile”।

ওসি বলল,,”বটে,,তাই তোকে আপনি বলল কেন? জায়গার নাম জানতে চাইল কেন?”

নব্যপ্রেমিক বলল,”স্যার,আমি ওকে এই ডেটিং স্পটের একটা কাব্যিক বর্ণনা দিচ্ছিলাম স্যার,তাই জায়গার নাম জিজ্ঞেস করল।আর আমাকে নাকি আমার গার্লফ্রেন্ডের কাছে খালু খালু লাগে স্যার,,তাই আপনি বলে আদর করে।”

ওসির চোখ বনবন করে ঘুরতে লাগল। সে বলল,,”তুই তো বেটা চাপাবাজিতে ক্রেজি ৪ এর জুবায়েরকেও ছাড়িয়ে যাবি রে। সাইজে তো ক্রেজি ৪ এর বিপুর মত দেখায়,চাপাবাজিতে জুবায়ের ফেইল!!!!!”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”আল্লাহর কিরা স্যার,কিলার এসমাইলরে আমি চিনি না। আপনি লাগলে কল দেন ওই নাম্বারে।”

হাবিলদার কিলার স্মাইল কন্টাক্টে টিপ দিতে গেল। কিন্তু তার হাত মুখ ডেটিং এক্সপার্ট এর মূত্রে ভেজা বলে,ক্লিকটা কিলার স্মাইলের না পড়ে পড়ল ঠিক উপরে থাকা “J” আদ্যক্ষরের একটা নামে। এটা ছিল “ডেটিং এক্সপার্ট ” এর আসল নাম।

হাবিলদার খেয়াল না করে টিপ দিতেই ডেটিং এক্সপার্ট এর ফোন বেজে উঠল।

ওসি আর হাবিলদার লাফ দিয়ে এক্সপার্ট এর দুই হাত চেপে ধরে বলল,,”কিলার এসমাইল,,কিলার এসমাইল।”

ডেটিং এক্সপার্ট আর্তনাদ করে উঠল,,,”আম্মা”

ওয়াকি টকিতে পুলিশরা বাকি পুলিশদের বলল,,”খবর সঠিক ওভার,আমরা যা সন্দেহ করেছিলাম তাই ঠিক,আমাদের কাছে খবর ছিল কিলার এসমাইল এই জায়গায় ক্লাইন্টের সাথে দেখা করতে আসবে ওভার। তাই আমরা এখানে ঘাপটি মেরে বসেছিলাম ওভার, কিলার এসমাইল না দেখে আমাদের গায়ে পেশাব করে দিছে ওভার,ওদের এখন থানায় নেব ওভার, দুইটা সাবান কিনে আনো ওভার,নদীতে গোসল করতে হবে ওভার এন্ড আউট।”

ডেটিং এক্সপার্ট লাফাতে লাফাতে বলল,,”স্যার,বিলিভ মি,,আমি তেলাপোকা দেখিলে খাটের তলে পলাই,স্যার,,, মশা পর্যন্ত আমি কিল করতে পারি না স্যার,আমি কেমনে কিলার এসমাইল,স্যার?”

ওসি পাত্তা না দিয়ে নব্যপ্রেমিকের কান টেনে বলল,,”দেখলে তো নাদুস নুদুস ক্যাবলা ক্যাবলা লাগে,তুই কিলার ডাইকা কারে খুন করাবি? কেউ টিফিন চুরি কইরা নেছে দেইখা?”

আতংকে আর শোকে নব্যপ্রেমিক স্তব্ধ।

এদিকে দূরে দুইটা লোককে হ্যান্ডশেক করতে দেখা গেল। পুলিশরা এতক্ষণ তাদের খেয়াল করে নি। হ্যান্ডশেক করে একজন মোটরসাইকেল এ করে চলে গেল। আরেকজন আশেপাশে তাকিয়ে দুইজন পুলিশ,আর দুইজন জোকারকে দেখে আসতে লাগল।

পুলিশ বলল,,”এই যে ভাই,এখানে মারাত্মক অপরাধী আছে,যেকোনো সময় ওর সাঙ্গপাঙ্গরা এসে ক্রসফায়ার করতে পারে,আপনি এখানে থেকেন না।”

লোকটা বলল,”অপরাধী কে?”

ডেটিং এক্সপার্ট কে দেখিয়ে পুলিশ বলল,,”এই যে”

লোকটা আগ্রহ না দেখিয়ে নব্যপ্রেমিকের আপাদমস্তক দেখে বলল,,”হুম চলবে।”

পুলিশরা বলল,,”কি চলবে?”

কি যেন বলতে গিয়ে লোকটা হঠাৎ থেমে বলল,,”মানবমূত্রের গন্ধ কোথা থেকে আসছে?”

পুলিশরা গলাখাকারি দিয়ে বলল,,”আশেপাশে ঝোপঝাড় থেকে মে বি।”

লোকটা বলল,,”যা বলছিলাম। এই ছেলে তোমার ওজন কত? ১০০ এর উপরে হবে?”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”৯৫ কেজি,কেন?”

লোকটা বলল,,”তোমাকে আমার লাগবে,তুমি ডিস্যার বাসা চেনো?”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”চিনি,কেন?”

লোকটা বলল,,”আমাকে নিয়ে তুমি ডিসির বাসায় যাবা। তারপর গার্ডদের বলবা, অত্যন্ত বিপদে পড়েছ,ডিসির সাথে দেখা করতে চাও। তোমার ক্যাবলাকান্ত মার্কা চেহারা দেখে গার্ডরা তাড়িয়ে দেবে না। উলটা ডিসির সাতগে দেখা করার ব্যবস্থা করিয়ে দেবে।”

সবাই চুপ। লোকটা বলল,,”ডিসি আগ্রহ নিয়ে তোমাকে ডাকবে। তুমি বলবা,”স্যার,বরিশালের বাসগুলো টেকসই করার দাবি জানাচ্ছি। আজ আমি একটা বাসে ওঠায় বাস ভেঙে গেছে। বাসের মালিক আমাকে জিম্মি করে বাসের নাম চাচ্ছে। আপনি কাইন্ডলি যদি বাসের মালিককে বুঝান,,আর বরিশালে আরো টেকসই বাস সরবরাহের নির্দেশ দেন,বড়ই উপকৃত হব।”

পুলিশ বলল,,”এই যে জনাব,,কি যা তা বলছেন?”

লোকটা পাত্তা না দিয়ে বলল,,”তোমার চেহারা দেখে ডিসি খুব আগ্রহ নিয়ে উক্ত বাসমালিক এবং বাসটাকে দেখতে চাইবে। বাসমালিককে ডাক দিবে,আমি য়খন ভিতরে যাব,আর ডিসির মালিকে টাকা দিয়ে সকালে যে গাছের গড়ায় রামদা পুততে বলছিলাম ওটা উঠিয়ে গার্ড গুলোর গলা নামিয়ে দিব,,,তারপর ডিসিকে জবাই দেব। আসলে ডিসির বাসায় স্নাইপার করে মারার চান্স নাই,গাছ তো অনেক। আর অস্ত্র নিয়ে তো ঢোকাও যাবে না। আর আমার কন্ট্রাক্ট বলেছে আজরাতের মধ্যে ডিসিকে মারতে হবে।তাই এই প্লানটা করতে হল। জাস্ট অস্ত্রছাড়া আমাকে ভিতরে ঢুকার জন্য।”

পুলিশ দুইজন বলল,,”ব্রাহ,আপনি কে?”

লোকটা রিভলভার বের করে পুলিশ দুইটার দিকে তাক করে বলল,,,”এসমাইল,,কিলার এসমাইল।”

পুলিশ দুইটা গুলি এড়িয়ে এক দৌড় দিয়ে নদীতে লাফ দিল।

ডেটিং এক্সপার্ট ওই জায়গায় অজ্ঞান হয়ে গেল।

কিলার এসমাইল নব্যপ্রেমিককে টানতে টানতে নিয়ে গেল। এমনসময় নব্যপ্রেমিকের মোবাইল আসল। মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠল Killer Smile.

কিলার এসমাইল মোবাইলটা ধরে বলল,,”এই কিলার এসমাইল আবার কোন কিলার এসমাইল?” এই বলে ফোনটা ধরল।

ওপাশ থেকে নারীকন্ঠের চিৎকার শোনা গেল,,”ওই বেটা,মেসেজের রিপ্লাই দেছ না কেন? কোন মেয়ের সাথে প্রেম করতেছিস, আগের প্রেমিকা ফিরে আইছে? সেই ডাইনি? যদি টের পাই অন্য কোনো মেয়ের ধারেকাছে গেছিস,,কল্লা নামাইয়া দিমু শালা।”

কিলার এসমাইলের হাত থেকে নব্যপ্রেমিকের মোবাইল পড়ে গেল। নব্যপ্রেমিক বলল,,”এক্সকিউজ মি কিলার আংকেল,,,গার্লফ্রেন্ড,,রিপ্লাই না দিলে ব্রেক আপ হয়ে যাবে,, নতুন নতুন প্রেম। মাত্র ৪ টা ডেইট। এটা গেলে,আমার সুফি হয়ে জঙ্গলে যেতে হবে,,বুঝতেই পারছেন আমার সাইজ দেখে,,এটাই লাস্ট হোপ।”

কিলার 

এসমাইল বলল,,”আচ্ছা,দাও রিপ্লাই।”

নব্যপ্রেমিক মোবাইলটা হাতে নিয়ে গার্লফ্রেন্ডকে রিপ্লাই দিল,,,”ডিসির বাগানে রামদা পোতা।”

গার্লফ্রেন্ড উদ্ভট মেসেজ পেয়ে কেন জানি আর রিপ্লাই দিল না। উলটা তার ছোট মামা, যে একজন পুলিশ অফিসার,তাকে বলল,,”ডিসির বাগানে নাকি রামদা পোতা?”

সাথে সাথে ছোটমামা রওনা দিল ডিসির বাসায়। তার সোর্স নাকি আজ সকালে ডিসির মালিকে একটা আগন্তুকের কাছ থেকে টাকা নিতে দেখছে। ডিসিকে খুন করার একটা ষড়যন্ত্রের গুজব আকাশে বাতাসে ঘুরছিল।

এদিকে কিলার এসমাইল নব্য প্রেমিককে নিয়ে ডিসির বাসায় গেল প্লান মত। কিন্তু কোন গার্ড দেখল না। কিলার এসমাইল ভাবল,,”এ কেমন বিচার? গার্ড কই?”

এদিকে রামদা খুজে পেয়ে পুলিশের লোকেরা ভিতরে বাগানের অন্ধকারে ওৎপেতে আছে।সন্দেহজনক কাউকে আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখলেই গুলি।

এসমাইল ব্যাপারটা আঁচ করল। তাই সন্দেহ মুক্ত হতে বলল,,,”এই বেটা,,তুই আমার কাধে  ওঠ,কাধে উঠে ভিতরে দেখ,কেউ আছে কিনা।”

নব্যপ্রেমিক দোয়া পড়তে পড়তে কিলার এসমাইলের ঘাড়ে উঠল।

ভিতরের পুলিশগুলো দেখল,, ৯৫ কেজি ওজনের ক্যাবলাকান্ত টাইপ একটা ছেলেকে দেয়ালের উপর থেকে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু এ কি,,ছেলেটা হঠাৎ নিচে নেমে যাচ্ছে কেন? আর ও কি? ওভাবে “বাচাও বাচাও” বলে চিৎকার করতে কে? ছেলেটার মুখ তো নড়ছে না।

পুলিশ বাইরে এসে দেখল,কিলার এসমাইলের ঘাড়ে চড়ে আছে ৯৫ কেজি ওজনের নব্যপ্রেমিক। তবে ৯৫ কেজি আসলে কি জিনিস,সেটা আঁচ করতে পারে নি কিলার এসমাইল। ৯৫ কেজি ওজন,যেটা কয়েকদিন আগে পুকুরপাড় ধ্বসিয়ে দিয়েছে,,, সেই ওজনটা কিলার এসমাইলকে রাস্তার পাড়ের শক্ত মাটিতে কোমড় পর্যন্ত গেড়ে দিছে।

কিলার এসমাইল বলছে,,”হেল্প মি হেল্প,,আলুর বস্তাটাকে আমার ঘাড় থেকে কেউ নামা,কেউ নামা,,,”

সেরাতে কিলার এসমাইলকে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করায় অনেক বাহবাসিক্ত নব্যপ্রেমিক Killer Smile কে ফোন দিয়ে বলল,,”বেবি,আমি কিলার এসমাইলকে ধরিয়ে দিয়েছি”

Killer Smile ফোনের অপরপাশ দিয়ে একটা Killer Smile দিল।

গল্প ৮৩

​”দ্য গ্রান্ড চাপা”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

ক্রেজি ৪ এর নবম গল্প এটা। ঈদের দিন লেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু মানুষ নাকি আমাদের ক্রেজি ৪ এর কাহিনী বিশ্বাস করে না সত্য বলে,সেজন্য জুবায়ের ক্ষোভ প্রকাশ করল খুব। ওর সেই ক্ষোভ আর আত্মগ্লানিকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে গল্পটা লেখা হল না।

যারা নতুন নতুন গল্প পড়ছেন ক্রেজি ৪ সিরিজের,তাদেরকে পরিচয় দিয়ে দিই আবার। ক্লাস এইটে থাকতে( সে ২০০৭ সালে কথা),  আমরা চার বেস্ট ফ্রেন্ড একসাথে একটা গ্যাং খুলি। গ্যাং এর নাম ক্রেজি ৪।সদস্য সংখ্যা ৪। যদিও জিহাদ পরবর্তীতে ক্রেজি ৪ এর আরো কয়েকজনকে ঢুকাতে চাইছিল। কিন্তু তাহলে সংঘের নাম যে ধীরে ধীরে বেড়ে বেড়ে “ক্রেজি এক কোটি” হয়ে যেতে পারে সেই কথা বলে ওকে নিরস্থ করার চেষ্টা করায় সে অত্যন্ত মর্মাহত হয় এবং বলে,”এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি।”

যাই হোক,,ক্রেজি ১ আমি,টি এম রায়হান মাসুদ বিপু ওরফে ফ্রাংকেস্টাইনের কুৎসিত দানব (বাহ,নামটা দেখি আরব শেখদের মত হয়ে গেছে এতদিন খেয়ালই করি নি),ক্রেজি ২ জিহাদুল ইসলাম,বিশিষ্ট ঘাড়ত্যাড়া,হ্যান্ডসাম এবং নিরেট বুদ্ধির অধিকারী, যফি আপনারা কখনো আশেপাশে একটা ডায়ালগ শোনেন,, “এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি”,,ধরে নেবেন জিহাদ আশেপাশে আছে, ক্রেজি ৩ হল আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের ওরফে চাপাবাজ জুবায়ের, আর ক্রেজি নম্বর ৪ হল দুর্জয় দে,, বিশিষ্ট প্রেমিকপুরুষ,গার্লফ্রেন্ডপাগলা,কিন্তু একে দেখলে কেন জানি মানুষজন শিবিরনেতা ভাবে।

যাই হোক,পরিচয়পর্ব শেষ। গল্পের নাম পড়ে আপনাদের অলরেডি বোঝা উচিৎ গল্পটা কাকে কেন্দ্র করে।

ঘটনাটার দুইটা অংশ আছে। প্রথম অংশে শুধুমাত্র জুবায়েরই ছিল। আর পরের অংশে আমাদের বাকি তিনজনকে জুবায়েরকে গিয়ে উদ্ধার করা লাগছে (হ্যা,আবার!!!) 

তাই প্রথম অংশটা জুবায়েরের কাছ থেকে শোনা। এবং ২০০৩ সাল থেকে তার চাপা শুনতে শুনতে মোটামুটি ধারণা আছে কোনগুলো চাপা। তাই সেসব চাপা ফিল্টার করে তথাকথিত সত্যটা এখানে তুলে ধরা হল।তবে জুবায়ের এই অংশে চাপাটা একটু কমই ছেড়েছে। কারণ যে কৃষি ম্যাগাজিন নিয়ে এত ঘটনা,দৈবক্রমে সেটা বাজেয়াপ্ত হবার আগে আমি পড়ে ফেলেছিলাম। তবে গ্রান্ড চাপাটা আসবে দ্বিতীয় অংশে।ধৈর্য ধরে একটু পড়ুন। সবচেয়ে ভাল হয় কোন শত্রুর কাছে গিয়ে পড়লে। কারণ মস্তিষ্কের চাপাশ্রবণের লিমিট ক্রস হয়ে গেলে যে মানুষ ভায়োলেন্ট হয়ে যায় সেটা তো আপনারা জানেনই।এটা যেহেতু গ্রান্ড চাপা,আপনারা সর্বকালের সেরা ভায়োলেন্ট হয়ে যাবে আশাপ্রকাশ করছি।

তো প্রথম অংশ শুরু করা যাক,,,,

জুবায়ের তার আত্মজীবনী (!) “সুপারহিরো জুবায়ের” উপন্যাস লিখে স্বল্প সময়ের জন্য বেশ হিট হয়ে গিয়েছিল। তবে লিমিটলেস চাপা পাঠ করে দেশজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল বলে বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তবে জুবায়ের সেই স্বল্প সময়ের জন্য সেলিব্রেটি হয়ে গিয়ে বেশ মজাসে কিছু দিন কাটায়। জুবায়েরের হঠাৎ ইচ্ছা হল,আবার লেখালেখি করবে। কিন্তু বই প্রকাশ আর সে করতে পারবে না এটা জানে। কারণ আমার লেখা ক্রেজি ৪ এর ব্যানারে সে সুপায়েরহিরো জুবায়ের নামক বিধ্বংসী চাপাসমগ্র এক প্রকাশকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিল। প্রকাশক সুন্দরমত সত্যি কাহিনী ভেবে না পড়েই প্রকাশ করে দিয়েছিল,আর তাতেই তো এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই প্রকাশক নাকি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে জুবায়েরকে দেখলে এমনিতেই ভায়োলেন্ট হয়ে যায়।

তো জুবায়ের সিদ্ধান্ত নিল সে উপন্যাস লিখবে না। বরং পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে গল্প পাঠাবে। অনেক বড় বড় লেখক লেখকজীবনের প্রারম্ভে পত্রিকায় ছোটগল্প প্রকাশ করত।

যাই হোক,যেই ভাবা সেই কাজ,জুবায়ের ঠাস করে একটা গল্প লিখে ধপাস করে প্রথম আলো পত্রিকায় পাঠিয়ে দিল।

যে প্রথম আলো পত্রিকা ডিকম্প্রেসিভ ক্রেনিওটমি অপারেশনকে “ডাক্তাররা রোগীর মাথার খুলির হাড় চুরি করে”  বলে  দুঃসাহসী  খবর প্রকাশ করে, তারা পর্যন্ত জুবায়েরের গল্প ছাপানোর দুঃসাহস দেখাল না। বরঞ্চ পরে গুজব উঠল প্রথম আলোর সম্পাদক নাকি দুইদিনের জন্য ভায়োলেন্ট হয়ে গিয়েছিল।মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”রাষ্ট্রের কোন ধর্ম হয় না” শিরোনামে সম্পাদকীয় লিখে অযৌক্তিক কথাবার্তা লিখে টিখে সে এক প্রলয়ঙ্করী ঘটনা ঘটিয়ে দিয়েছিল সারা দেশে।

যাই হোক,প্রথম আলো সেই গল্প না ছাপালে জুবায়ের আরো জেদ করে সারা বাংলাদেশের সব পত্রিকা আর ম্যাগাজিনে গল্প পাঠাতে লাগল। গল্প ছাপা তো হলই না,বরং গল্প চেক করতে গিয়ে পত্রিকার লোকেরা প্রথম আলোর সম্পাদকের মত হয়ে গেল। সারাদেশের পত্রিকাগুলো আজগুবি খবর ছাপতে লাগল।

যেমন,, সিস্টিক হাইগ্রোমাসহ বাচ্চা জন্মালে খবর প্রকাশ করা হত,,”দুই মাথা ওয়ালা শিশুর জন্ম”

হারলেকুইন ইকথিয়াসিস নিয়ে জন্মানো বাচ্চা দেখলে খবর প্রকাশ করা হত,,”অমুক মহিলার জ্বিনের সাথে পরকীয়া,ভয়াবহ বাচ্চা প্রসব।”

তারপর গরুছাগলের যদি সময়ের আগেই ভ্রূণ পড়ে যেত,খবর আসত,,”গরুর পেটে মানুষের বাচ্চা।”

আর ম্যাগাজিন গুলোতে লেখা হতে লাগল,,”ভারত না থাকলে বাংলাদেশের জন্মই হত না” শীর্ষক প্রবন্ধ।

তারপর আরো খবর আসতে লাগল,,”তনুকে ধর্ষণ করেছে সেনাবাহিনী ”

আমিও প্রায়ই এই খবর পড়তাম সে সময়টায়।পড়ে অবাক বিস্ময়ে যারা খবর প্রকাশ করেছে তাদের মানসিক ভারসাম্য সম্বন্ধে ভাবতাম।

তবে ঘুণাক্ষরেও ভাবি নি এর পিছে জুবায়েরের লেখা গল্পের হাত আছে। সেই গল্প পড়েই সাংবাদিকদের এই অবস্থা।ভাগ্য ভাল ছিল গল্পগুলো প্রকাশের আগেই সম্ভবত আগুণে পোড়ানো হইত।নইলে দেশে কি হত বলতে পারব না।

যাই হোক,,কোথাও গল্প ছাপাতে না পেরে শেষমেশ জুবায়ের ভাবল সে শাইখ সিরাজের কৃষি ম্যাগাজিনে গল্প লিখবে। শাইখ সিরাজ যেমন দেশ ও মাটির মানুষ নিয়ে লেখালেখি করেন।জুবায়ের মাটির মানুষ,ফসল,ক্ষেত নিয়ে লিখে পাঠাবে,যাতে শাইখ সিরাজ মুগ্ধ হয়ে তার ম্যাগাজিনে ছাপায় জুবায়েরের মাটির গল্প।তো জুবায়ের বড্ড আশা নিয়ে অনেক মমতা মাখিয়ে একখানা গল্প লিখে শাইখ সিরাজের অফিসে সশরীরে গেল। শেষ চেষ্টা যেহেতু,ডাকে গল্প পাঠানোর রিস্ক নিল না।

এদিকে শাইখ সিরাজ অসুস্থ।অতিরিক্ত কাজের চাপে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।ডাক্তার বললেন,”আপনি সমুদ্রপাড়ে ঘুরে আসেন”

শাইখ সিরাজ ভাবলেন,কক্সবাজারে তো অনেক মানুষ,নিরিবিলি সময় কাটাতে তিনি কুয়াকাটা যাবেন।ওখানে নাকি সরিষাগাছ ভালভাবে চাষ হচ্ছে। সেটাও একফাকে দেখে আসা যাবে।

তো শাইখ সিরাজ সেদিন তার বন্ধু চ্যানেল আইয়ের মালিককে বললেন তিনি কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাবেন। তার বন্ধু যেন ইয়ং একটা ছেলেকে পাঠায় কৃষি  ম্যাগাজিনটা ততদিন চালাতে।

তো চ্যানেল আইয়ের মালিক একটা ছেলেকে পাঠিয়েছিল শাইখ সিরাজের অফিসে। শাইখ সিরাজ তখন বিদেশী এক এগ্রিকালচার প্রফেসরের সাথে আলাপ করছিলেন বলে ছেলেটা বাইরে অপেক্ষা করছিল।জুবায়ের গিয়ে তার পাশে বসল।

ছেলেটা জুবায়েরকে দেখে বলল,,”আপনি কে?”

জুবায়ের বলল,,”আমি একজন লেখক”

ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,,”আপনি এখানে কেন?”

জুবায়ের বলল,,”কৃষি এবং মাটির মানুষদের দিয়ে আমি একটি গল্প লিখেছি।আমি তাই স্যারের কাছে এসেছি,উনাকে দেখাব।গল্পটি যাতে প্রকাশিত হয়।”

ছেলেটা বলল,,”স্যার তো কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছেন,আপনি আমাকে গল্পটা দিতে পারেন।আমি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে আজই জয়েন করব।”

জুবায়ের তার হাতে গল্পের পাণ্ডুলিপি দিল।গল্পটা পড়ার সাথে সাথে ইয়ং ছেলেটা গায়ে শিহরণ দেখা দিল,কাপাকাপি শুরু হয়ে গেল,ঘামতে লাগল,তারপর নিজের চুল ছিড়তে লাগল।অবশেষে জুবায়েরের হাত টান দিয়ে হাতে একটা কামড় বসিয়ে দিল।

জুবায়ের আর্তনাদ করে বলল,,”ইয়া মাবুদ।”

আর্তনাদ শুনে অফিসের অন্যান্য লোকেরা জুবায়ের আর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে ইচ্ছুক ছেলেটাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিল।

জুবায়েরের হাত ছুটল বটে।তবে তার হাতে থাকা ৫০০০ (আমার দাম নিয়ে সন্দেহ আছে) টাকার ঘড়িটি ছেলেটার মুখেই রয়ে গেল।ছেলেটা ঘড়িটাকে চিবাতে লাগল।আর লোকেরা তাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেল।

ঘটনা শেষ হবার পর শাইখ সিরাজ হন্তদন্ত হয়ে বের হলেন। জুবায়েরকে দেখে বললেন,,”এসে গেছ? এই নাও চাবি,,আম আজি বের হব,শোনো তুমি তো এর আগেও কাজ করেছ শুনলাম একটা ম্যাগাজিনে। কাজ তো বোঝোই নাকি?”

জুবায়ের জবাব দিতে গিয়েও দিল না। তার মনের ভিতরে ইবলিশ দাগা দিল। শাইখ সিরাজ তাকেই ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে পাঠানো ছেলে মনে করেছে। এই সুযোগ,সম্পাদক হয়ে পুরো ম্যাগাজিনে ভরে সে তার গল্প লিখবে। আচ্ছা গল্প না হোক,সম্পাদকীয় লিখবে।তারপর তো লালে লাল।জুবায়ের হয়ে উঠবে খ্যাতিমান সাহিত্যিক।

শাইখ সিরাজ চলে গেল। জুবায়ের হয়ে গেল কয়েক সপ্তাহের জন্য কৃষি ম্যাগাজিনের সম্পাদক।

এখন প্রথম ইস্যুতে অন্যান্য লোকেরা বিভিন্ন প্রবন্ধ ট্রবন্ধ লিখে ভরে ফেলল,একটু জায়গা রাখল সম্পাদকীয়ের জন্য।যেটা সাধারণত শাইখ সিরাজ লেখেন। এবং গ্রাহকরা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে।স্পেশাল্লি চাষীরা।

জুবায়ের করল কি,, ৩ /৪ পৃষ্টার প্রবন্ধ বাতিল করে দিয়ে বিশাল একটা সম্পাদকীয় লিখল।

“আপনারা সবাই জানেন ধান আমাদের জাতীয় ফসল। কিন্তু এটা কি জানেন কেন ধানই আমাদের জাতীয় ফসল হল? কেন গম বা ভুট্ট না? কারণ ধান থেকে আমরা শুধু চালই পাই না। কাঠও পাই। সেই কাঠা দিয়ে খাট হয়,টেবিল হয় চেয়ার হয়,,বড় বড় জাহাজ হয়,,,নৌকা হয়।যদিও নৌকায় ইদানিং ধানের কাঠ কম ব্যবহার হচ্ছে,এর চেয়ে পাটের কাঠ দিয়ে তৈরি নৌকা বেশী টেকসই বলে গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন…….”

এই টাইপের ৩ পৃষ্ঠা সম্পাদকীয় লেখা হল। পরেরদিন সারা বাংলাদেশে বেস্ট সেলিং হল শাইখ সিরাজের কৃষি ম্যাগাজিন।  আগের দিন যে ম্যাগাজিন  হকারদের কাছ থেকে কেউই কেনে নি চাষীরা বাদে। সেই ম্যাগাজিন আজ পাওয়া গেল না বলে হকারদের গালাগালি করা হল।

সারা বাংলাদেশে কয়েক লাখ কপি বিক্রি হল, সবাই শুধু সম্পাদকীয় পড়ে। পরেরদিন জুবায়ের হোটেল থেকে শাইখ সিরাজের অফিস (বর্তমানে জুবায়েরের) গেল। গিয়ে দেখে অফিজের আশেপাশে কয়েক হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। নতুন সম্পাদককে সবাই একনজর দেখতে চায়।

জুবায়ের ভাবল,মনে হয় বিরোধী দলে বিক্ষোভ।ককটেল ফকটেল দুই একটা মাথায় পড়লে আর দেখতে হবে না ভেবে জুবায়ের দ্রুত অফিসে ঢুকে গেল।সাথে সাথে হাজার হাজার মানুষ বলে উঠল,,”গেল,গেল,গেল,,,,”

জুবায়ের অফিসে বসে দেখল কয়েকশ চিঠর স্তূপ। চিঠির তোড়ে কম্পিউটার খুলে ইমেইল আর চেক করা গেল না। জুবায়ের খুবই আত্মপ্রসাদ পেল।

এদিকে  বিল্ডিং এর পাইপ বেয়ে একটা লোক জানালা গলে জুবায়েরের পিছে দাড়াল। বলল,,”আসসালামু আলাইকুম ”

জুবায়ের “আব্বা” বলে চিৎকার দিয়ে দরুদ শরীফ পড়তে লাগল।

আগন্তুকের মাথায় রুক্ষ চুল,গায়ে ধুলাবালি,মুখভর্তি দাড়ি। সে বলল,,”আসেন ভাই,,হাত মেলাই,,না না কোলাকুলি করি। আপনি কৃষি পত্রিকায় যা যা লিখেছেন আমি ঠিক সেসব জিনিস ৫ বছর আগে মানুষকে বলে বেড়াতাম।

যেমন ধরেন,আপনি লিখেছে,, “আমাদের আরো বেশি বেশি আলু গাছ লাগানো উচিৎ, এবং এক বছর পর পর আলু গাছ থেকে পাড়া উচিত। আলু গাছ বটগাছের চেয়ে বড় হয়,বিদেশে এক বছর পর পর আলু পাড়া হয় আলুগাছের ডালে চড়ে।এজন্য বিদেশে আলুগুলো তরমুজের সমান বড় হয়।আর আমরা বাংলাদেশিরা খালি খাইতেই জানি।আমাদের আলু তাই তরমুজের সমান বড় হয় না।”

ভাই আমি আপনার সাথে একদম একমত। 

আবার এই যে আপনি লিখলেন,,”মুলাবাগানে কুকুর পালা উচিৎ। নইলে পোলাপান গাছের মাথায় উঠে মুলা পেড়ে খেয়ে ফেলবে সব।”

অতি যৌক্তিক কথা।

কিন্তু জানেন ভাই,এদেশে গুণীর কদর নাই। শালারা আমার মত এত জ্ঞানী এক লোককে পাগলাগারদে ভরে দিল একথা বলার কারণে? বলেন এগুলো কি সহ্য হয়?

আজ আমি সকালে কৃষি ম্যাগাজিনে দেখলাম আব্দুল্লাহ আল জুবায়েরে সম্পাদকীয়তে হুবহু আমার কথা গুলো লেখা। এত বড় বিখ্যাত পত্রিকায় আমার কথাগুলোই লেখা,,আর শালারা কিনা আমাকে ধরে রাখে পাগলাগারদে? পাগলাগারদে আগুণ লাগিয়ে, বাশ দিয়ে কয়েকটারে ঠেঙিয়ে আপনার সাথে আমি দেখা করতে এলাম।”

জুবায়েরের গলা শুকিয়ে গেল। কোনরকমে বলল,”ডাক্তাররা কিছু বলে নি?”

পাগলটা বলল,,”বলবে কি? তারা তো আমার হাতের লাঠিটা দেখে গাছের মাথায় চড়ে বসেছে।”

হঠাৎ বাইরে গাড়ির সাইরেন শোনা গেল। পাগলটা বলল,,”এই মরেছে,শালারা গাড়ি নিয়ে এসেছে খুজতে।ভাইজান,পরে দেখা করব নে।”

পাগলটা জানালা গলে পালিয়ে গেল। একটুপর হন্তদন্ত হয়ে বুক চেপে ধরে শাইখ সিরাজ সাহেব চলে আসলেন।

জুবায়ের বললেন,,”সেকি স্যার,আপনি কুয়াকাটা যান নি? স্যার ম্যাগাজিন তো লাখ কপি বিক্রি হয়ে গেছে,বাংলাদেশের সর্বকালের রেকর্ড ব্রেক,,,”

শাইখ সিরাজ বললেন,,,”বাবা,,আমি যদি তোমার কোন ক্ষতি করে থাকি,মাথায় একটা বাড়ি দিয়ে মেরে ফেল বাবা,আমি হার্টের রোগী,,এভাবে তকলিফ কেন দিচ্ছ,বাবা?”

জুবায়ের বলল,,”মানে স্যার?”

শাইখ সিরাজ বললেন,,”মানে তুমি বোঝো নি বাবা? এই যে দেখ(ব্রিফকেস থেকে ম্যাগাজিনের কপি বের করে),, “সরিষা ফুল দেখতে খুব সুন্দর,কিন্তু এর গাছটা অনেক লম্বা।তাই ফুল দেখতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।অনেকের মাথা ঘোরে।তাই তো মাথা ঘোরানোর বাগধারা হয়েছে,,”চোখে সরিষা ফুল দেখা”  ”  বাবা এটা পড়ে,আমি সেই থেকে চোখে সরিষা ফুল দেখছি   আবার এই যে লিখলে,”পিয়াজ আর বাঁধাকপি একই জিনিস,পিয়াজ বড় হলে বাঁধাকপি হয়,”এটা দেখে আমি লেবুখালি গিয়েই বাধা পেলাম। তারপর আবার তুমি লিখেছ, “একই গাছে আম,কাঠাল,লিচু,জাম,কদবেল সব কিছু ফলাবার একটা টেকনিক আছে” এটা পড়ার পর আমি আর নিতে পারলাম না বাবা,আমি হার্টফেল করতে পাড়ি ভেবে ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে দিলাম।তারপর ফিরে এলাম,আমার মত লক্ষ লক্ষ লোক হার্টফেল করলে এর দায় তো আমাকেই নিতে হবে বাবা।”

জুবায়ের বলল,,”কিন্তু স্যার,প্রবন্ধের মাঝে সামান্য একটু কল্পনা না হলে সাহিত্যরসটাই যে আসে না,,,,”

সাথে সাথে দরজা খুলে পাগলাগারদের লোকেরা আসল। বলতে লাগল,,,”কইরে,,সেই পাগলটা কই? পাগলাগারদ থেকে পালিয়েছে,,সবাইকে সে বলে বেড়া,করল্লার ভিতর চিনি ঢুকিয়ে দিলে বড় হয়ে কাঁঠাল হয়? কই সে?”

শাইখ সিরাজ সাথে সাথে জুবায়েরকে দেখিয়ে বলল,,,”এই,এই সেই ছোকরা।”

পাগলাগারদের লোকেরা জুবায়েরকে বগলদাবা করে নিল। জুবায়ের চেচিয়ে বলল,,”এই কথা আমি লিখি নি,,কিখতে ভুলে গিয়েছিলাম। এ কথা যে বলে,সে সাইরেন শুনে জানালা দিয়ে পালিয়েছে,,,”

কে শোনে কার কথা।জুবায়েরকে ওরা পাগলাগারদে ভরে দিল।

এই গেল গল্পের প্রথম অংশ। এবার পুরো গল্পই আমার নিজের সামনে ঘটা। দ্বিতীয় অংশ আমি শুরু করলাম।

বরিশালে বসে হঠাৎ পেপারে দেখলাম,,”কৃষি ম্যাগাজিন কেলেংকারি: পাগলাগারদ থেকে পালানো পাগল লিখল সম্পাদকীয়। ”

নিচে জুবায়েরকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে সেই ছবি।আর ক্যাপশনের লেখা,” এই সেই পাগল, যে সম্পাদকীয়তে লিখেছে মাদার গাছে স্নেহময়ী মা ফলে,আর শিশু গাছে শিশু। তবে সুন্দরি গাছে কেন বান্দর ফলে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করে বের করছেন”

আমি,জিহাদ আর দুর্জয় দেখলাম এ তো মহাবিপদ।  চাপাবাজির একটা সীমারেখা থাকা উচিৎ আমরা অনেক আগে থেকে এটাকে বুঝিয়ে আসছি।তবে কিন্তু কে শোনে কার কথা,থাক এবার পাগলাগারদে।

কিন্তু মন তো মানে না। বেস্টফ্রেন্ড বলে কথা। আমি,জিহাদ আর দুর্জয় বেশ মুষড়ে পড়লাম। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, জুবায়ের যে পাগল না,এটার প্রমাণ নিয়ে যাব,আর সাক্ষী তো আমরাই।জুবায়েরকে যেন ছেড়ে দেয়।

সমস্যা হল,জুবায়ের যে পাগল না,এটার প্রমাণ হাজারবার খুজেও আমরা পেলাম না।শেষমেশ আমরা ৩ জনের সাক্ষ্য এর উপর ভরসা করে জুবায়েরকে উদ্ধারের জন্য আমরা রওনা হলাম।

তো পাগলাগারদে যাওয়ার পরপরই লোকদের জুবায়েরের কথা বলতেই বলল,,”না না এখন দেখা হবে না। ওটাকে বদ্ধ পাগলদের ঘরে রাখা হয়েছে।এখনো চিকিৎসা শুরু হয় নি।চিকিৎসা শুরুর আগে দেখা করা বিপজ্জনক।”

অনেক বুঝিয়েও রাজি করাতে পারলাম না। ভাবলাম,রাত হলে লুকিয়ে ভিতরে যাব।জুবায়েরের সাথে দেখা করব। লাগলে চুরি করে চাবি নিব।জুবায়েরকে বের করব। সহজে যে ওকে বের করা যাবে না সে তো সকালেই বুঝছি।

যাই হোক অতি সন্তর্পণে দেয়াল টপকে আমরা ৩ জন পাগলাগারদের ভিতর ঢুকলাম। তারপর আমাদের যাতে কেউ চিনতে না পারে,তাই তিনটা পাগলকে মাথায় বাড়ি দিয়ে অজ্ঞান করে পাগলের ড্রেস  পরে পাগলাগারদের ভিতরে ঢুকলাম।

খুজে খুজে বদ্ধ পাগলদের ওয়ার্ডে ঢুকলাম। দেখি ওয়ার্ডটাই তালা মারা।তালা খোলা হল একটা তার দিয়ে,জিহাদের প্রাণান্ত চেষ্টার পর। আমি জিহাদ আর দুর্জয় সন্তর্পনে ভিতরে ঢুকে জুবায়েরের রুম খুজতে লাগলাম।

দেখি প্রত্যেকটা রুমের সামনে কি টাইপের পাগল,সেটার বর্ণনা দেওয়া।একটা তুমের সামনে লেখা,,”এই পাগলের অভ্যাস মানুষের প্যান্ট টান দিয়ে খুলে দেওয়া। একবার এক মন্ত্রী নতুন কাপড়ের মার্কেট উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন। পাগলটি তার প্যান্ট টেনে খুলে দেয়। সেদিন আবার মন্ত্রীটি প্যান্টের নিচে কিছু পরেন নি,,,,”

পরের রুমের সামনে লেখা,,,”এ রুমে থাকা পাগলটি একটি সুন্দরি মেয়ের প্রেমে পড়ে।মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাবার পর থেকে সে বলা শুরু করে,,”দেখতে কি ভাল!!! খ্যাখ্যাখ্যা!!! ”

শেষ রুমে লেখা “এখানের পাগলটিকে বর্তমানে মাথায় ইলেক্ট্রিক শক দেওয়া হচ্ছে। কারণ পাগলামি এর বেড়ে যাওয়ায় প্যান্ট খোলা পাগলটির উপর সে হামলা চালায়। এই পাগলটির ধারণা বটগাছে আম ধরে শীতকালে।”

বুঝে গেলাম কোন পাগলের কথা বলা হচ্ছে। এও বুঝে গেলাম তাকে এখন ইলেক্ট্রিক শক দেওয়া হচ্ছে। প্রমাদ গুণলাম,সাথে সাথে দৌড়ে গেলাম শক রুমে।

গিয়ে দেখি দরজা ভিতর থেকে আটকানো। দরজার উপরে একটা ভেন্টিলেটর।  আমি দুর্জয়কে বললাম,,”আমাকে কাধে নে,আমি দেখি জুবা আছে কিনা।”

দুর্জয় বলল,,”মামা,ভর্তা হইয়া যামু রে। এর চেয়ে জিহাদ উঠুক।”

আমি বন্ধত্ব নামক জিনিসটার উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেললাম।

যাই হোক,জিহাদ দুর্জয়ের কাধে উঠে দাড়াল। ভেন্টিলেটর দিয়ে দেখল জুবায়ের পাগলদের শার্ট আর একটা জাইঙ্গা পরে বসে আছে। জিহাদ বলল,,”জুবা”

জুবায়ের চিল্লিয়ে বলল,,”আল্লাহর কিরা আমি পাগল না।”

জিহাদ বলল,,”ওই জুবা,আমরা আসছি,ভিতরে তো কেউ নাই,দরজা আটকাইছে কে,তুই?”

জুবায়ের বলল,,”আর কইস না দোস্ত,আমি পাগল না কতক্ষণ ধইরা কইতাছি।কেউ শুনেই না। শেষে খাবার সময় বাইর করল। আর ওই পাগল হালায় প্যান্ট খুইলা দিল।রাগ হইয়া দিলাম থাপ্পড়।ওরা আমারে শক দিতে নিয়ে আসল।”

জিহাদ বলল,,”তাইলে ওরা তোকে শক না দিয়ে কই গেছে।”

জুবায়ের বলল,,”শক দিতে লইছিল,হঠাৎ বাইরে থেকে খবর আইছে ৩ টা পাগল নাকি ৩ ভদ্রলোকের মাথায় বাড়ি দিয়ে আহত কইরা দিছে।ওরা সবাই ভদ্রলোকগুলোকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে গেছে।”

আমি শুনে চিল্লিয়ে বললাম,,”সর্বনাশ, ওরা তো পাগল,আমরা তো ড্রেস চুরি করতে ওদের অজ্ঞান করে আমাদের ড্রেস পরিয়ে দিছি।”

জুবায়ের বলল,,”দোস্তরা,,বাচা ভাই।”

হঠাৎ কোত্থেকে প্যান্টখোলা পাগলটা এসে আমার কছু করার আগেই দুর্জয়ের  প্যান্ট ধরে টান দিয়ে খুলে দিল।

দুর্জয় চেঁচিয়ে বলল,,”এ্যাই,পিছনে কি হচ্ছে।”

আর নড়ানড়ির চোটে ওর কাধে থাকা জিহাদ দড়াম করে পড়ে গেল।

দড়াম শব্দে সিকিউরিটির লোকেরা চলে এল। আমাকে,জিহাদকে, দুর্জয়কে আর প্যান্টখোলা পাগলকে বাইরে দেখে পাকড়াও করে বাইরে এনে  ওয়ার্ডে ঢুকিয়ে দিল। আমরা চিল্লিয়ে বললাম,,”আমরা পাগল না,,আমরা ক্রেজি ৪।”

লোকগুলো বলল,,”না না তোমরা পাগল না,,তোমরা ক্রেজি,তাই তো?”

জিহাদ বলল,,”হ্যা হ্যা”

আমি বললাম,,”আপনাদের ভুল হচ্ছে ব্রাদার,বুঝিয়ে বলছি ওয়েট। ”

আর বুঝানো। আমাদের ৩ জনকে একটা হাজতের মত জায়গায় ভরে দিল। প্যান্ট খোলা পাগলকে বদ্ধ উন্মাদের জায়গায় পাঠিয়ে দিল। আর জুবায়ের মাফ টাফ চাওয়ায় ওকে শক দিল না,তবে রুমেও পাঠাল না। শাস্তি দিতে হাজতের মত জায়গায়,মানে যেখানে আমাদের রাখা হয়েছে “ওয়ার্ড থেকে পালিয়ে ঘোরাঘুরির অপরাধে(তাদের সন্দেহ আমরাই সেই পাগল যারা তিন ভদ্রলোকের মাথায় বাড়ি দিছে)”  ।

তাই আমরা ক্রেজি ৪ পাগলাগারদের গারদে অবস্থান করলাম। এখানে মেঝেত্র ময়লা,খাট খুট নেই,শাস্তি তো,তাই।

এদিকে সেই ব্যর্থ প্রেমিক পাগলটা নাকি সকালে কোন নার্সকে একটা চুমো দিছে,তাই তাকেও আমাদের সামনের গারদে পোরা হল।সে আমাদের দুরবস্থা দেখে হেসে দিল।

আমি তাকে খেপানোর জন্য মনের দুঃখে বললাম,,”দেখতে কি ভাল,,খ্যাখ্যাখ্যা।”

যাই হোক,, ওই গারদে ৩ দিন রাখল,বাসার সাথে কোন যোগাযোগ নেই। আমরা বুদ্ধি করলাম,আমরা পাগল না এই কথাটা বলব না। কারণ জিহাদ চেচিয়ে কেদে “আমি পাগল না” বলার সাথে সাথে কয়েকশ পাগল কেদে বলে উঠল,,”আমি পাগল না।”

৩ দিন ভাল ব্যবহার করার কারণে ওরা আমাদের একটু কম উম্মাদদের সাথে রাখল।এদেরকে রুমে রুমে আলাদা করে রাখা হয় না। ওয়ার্ডে রাখা হয়।এক বিশাল রুমে অনেক বেড।এদের বাইরে বাগানেও যেতে দেওয়া হয়।

আমরা প্লান করলাম কিভাবে পালানো যায়। অনেক নজরদারি করে বুঝলাম,পাগলাগারদে ঢোকা সহজ,বের হওয়া কঠিন,প্রায় অসম্ভব।

অবশেষে একটা বুদ্ধি এল মাথায়, চিল্লিয়ে কেউ যদি কিছু বলে পাগলাগারদের সবাই রিপিট করে।

ডাক্তার সকালে আসার পর আমি বললাম,,”স্যার,আমার বন্ধু জুবায়ের খুব ভাল গল্প লেখে, ও চিৎকার করে গল্পটা পড়তে চায়।”

ডাক্তার পাগলদের পাগলামি প্রতিরোধে সদয় ব্যবহার করে। সে বলল,,”হ্যা,শুনাবা গল্প,তবে চিল্লানো যাবে না।”

আমি বললাম,”স্যার,ওর খুব শখ,ওর গল্প শুনে সব মানুষ হাততালি দিবে।না চিল্লালে কিভাবে সবাই শুনবে? কিভাবেই বা কেউ হাততালি দিবে?”

জুবায়ের বুঝল কিছু একটা বুদ্ধি করতেছি। সাথে সাথে ও মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে ওভার এক্টিং করতে লাগল,,”আমি গল্প বলব,,ওয়ায়ায়ায়ায়ায়া”

জুবায়েরের ওভার এক্টিং দেখে ডাক্তারের মন নরম হল। বলল,,”আচ্ছা,তুমি গল্প বলবা,আমি মাইকের ব্যবস্থা করব,কিন্তু শর্ত আছে, চিল্লাতে পারবা না,ওকে? এর আগে একজন গান গাইতে চাইছিল,তাকে মাইক দেবার পর এমন চিৎকার করছিল,যে আমার আগের ডাক্তার বয়ড়া হয়ে গেছিল।”

ডাক্তার চলে গেল। সবাই আমাকে ঘিরে বলল,,”কি বুদ্ধি করছিস?”

আমি বললাম,”সবকিছু জুবায়েরের উপর নির্ভর করবে। এতদিন ওকে চাপাবাজি বন্ধ করতে বলতাম।আজ ওর একটা চাপাবাজি করা চাই। ওর স্মরণকালের সেরা চাপা।”

ওরা বলল,,”তাতে কি হবে?”

আমি বললাম,,”জুবায়েরের লিমিট ক্রস করা চাপা শুনলে মানুষ ভায়োলেন্ট হয়,সিকিউরিটি গার্ড গুলো যদি শুনে,ওরাও ভায়োলেন্ট হয়ে যাবে,নিজেদের ডিউটি ভুলে যাবে। এই ফাকে পালাব আমরা।”

দুর্জয় বলল,,”তাইলে বাকি পাগলরা চাপা শুনলে তো আরো বেশি ভায়োলেন্ট হয়ে যাবে। ওরা যদি আমাদের কিলায় চাপা শুনে?”

আমি বললাম,,”নাহ,ওরা ভায়োলেন্ট হবে না।ওরা গল্পের কিছুই বুঝবে না,পাগল তো।”

জুবায়ের বলল,,”পারমু মামা,,আজ আমি আমার জীবনের সেরা চাপা কমু। দ্য গ্রান্ড চাপা।”

পরেরদিন ডাক্তার তার কথা রাখলেন। জুবায়েরকে ডাইনিং হলে নিয়ে গেলেন,সামনে মাইক্রোফোন।  দুইপাশে সিকিউরিটি, জুবায়েরকে সাবধান করা হল,মাইকে যদি পাগলামি করে চিল্লায়,তাইলে শক দেওয়া হবে।

আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম পাগলদের মধ্যে।সতর্ক থাকলাম,প্যান্ট টানা পাগলটা থেকে প্যান্ট ছাড়া পালিয়ে রাস্তায় দৌড়ানোটা কেমন জানি দেখায়।

জুবায়ের গল্প বলা শুরু করল,,”একসময় আমি সাংবাদিক ছিলাম। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেফিরে সংবাদ আনতাম। ধরেন,,”গরুর পেটে মানুষের বাচ্চা” ,, “দুই মাথাওয়ালা শিশু” ,,,  “আক্কাস আলী পাশ করছে।”  এই টাইপের নিউজ। তো হঠাৎ একদিন আমাদের পত্রিকার সম্পাদক আমাকে বলল,, ” শোনো,বরিশাল শহরে নাকি বাঘের উপদ্রব বেড়েছে। এই বাঘটা নাকি মানুষের ফ্লাটবাড়িতে ঢুকে মানুষ খেয়ে নিচ্ছে। যাও তো রিপোর্ট টা করে আসো।

বাঘ টাঘ আবার আমি অত ভয় টয় পাই না। গেলাম সরেজমিনে রিপোর্ট করতে। গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে মানুষখেকো বাঘের কথা জিজ্ঞেস করতে যা শুনলাম,সেটা অত্যন্ত ভয়াবহ।

বাঘটা নাকি যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে,সেদিন এক মুদি দোকানে ঢুকে রাধুনি চটপটি মশলা গুলো খেয়েছে।নুডুলসগুলো কচরমচর করে চিবিয়ে খেয়েছে।

আরেকদিন নাকি,একটা স্টোরের গিয়ে টুথব্রাশ আর পেস্ট নিয়ে দাত ব্রাশও করেছে।তারপর একটা সাবান হাতে নিয়ে পুকুরে লাফ দিছে।

গতসপ্তাহে নাকি একটা মিষ্টি দোকান এ ঢুকে সব মিষ্টি খেয়ে ফেলছে। আর মিষ্টি দোকানদারকে অপহরণ করে নিছে। মিষ্টি দোকানদার গতদিন পালিয়ে আসার পর নাকি সবাইকে বলছে,এ কয়দিন বাঘটা ময়দা,দুধ,চিনি বস্তা করে মুখে নিয়ে আসত,আর দোকানিকে সেগুলো দিয়ে মিষ্টি বানাতে হত,আর বাঘ সেগুলো খেত।

ব্যস,আমি সাথে সাথে রিপোর্ট করে অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। খবর ছাপা হল। খবর পড়ে চিড়িয়াখানার পরিচালক বলল,,”এই স্বাস্থ্যসচেতন বাঘটাকে যে ধরে আনতে পারবে। তাকে আমি এক লাখ টাকা দেব।”

ব্যস,সাথে সাথে বরিশালে হুলস্থূল পড়ল,বাঘটাকে জ্যান্ত ধরতে লাখে লাখে মানুষ লাখ টাকার লক্ষ্যে বরিশালে আসতে লাগল।

আমি বললাম,,”বাবা,খবর করলাম আমি,সবাইকে জানালাম আমি,আর টাকা নেবা তোমরা? ওটি হচ্ছে না,,বাঘ আমাকেই ধরতে হবে।”

আমি বাঘ ধরতে মারাত্মক একটা প্লান করলাম।বাঘ মিষ্টি পছন্দ করে বলে, এক কেজি মিষ্টি কিনে তাতে কিছু ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে সেই দোকানীর কাছে কিডন্যাপ এর জায়গার কথা শুনে,রওনা দিলাম।

কিছুক্ষণ ওয়েট করার পর বাঘ এল। প্রায় ১০ ফুট লম্বা হলদে কাল রয়েল বেঙ্গল টাইগার।আমি বাঘের দিকে মিষ্টি ছুড়ে দিলাম।

এক গ্রাসে বাঘ সব মিষ্টি খেয়ে ফেলল। তারপর রাগী রাগী মুখে আমার দিক এগোতে লাগল।এক পা,দুই পা,,,,,”

জুবায়েরের গল্প শুনতে শুনতে পাগলগুলো আশ্চর্য ঠান্ডা হয়ে গেল। কিন্তু সিকিউরিটি আর ডাক্তাররা ঘামতে লাগল।দাত দিয়ে নখ কাটতে লাগল।আমার বুদ্ধিতে আমি,জিহাদ আর দুর্জয় কানে তুলা দিয়েছিলাম।অল্প অল্প গল্প কানে আসছিল।ওতেই মাথা ঘুরাচ্ছিল।

একটা পাগল শান্ত গলায় বলল,,”তারপর কি হল,ভাই?”

জুবায়ের বলল,,”বাঘটা হালুম করে আমাকে বলল,,”হারামজাদা,মিষ্টি তিতা লাগে ক্যা?”  এই বলে টুপ করে আমাকে গিলে ফেলল।তারপর হজম হয়ে গেলাম ওর পেটে।”

এই বলার সাথেসাথে পাগলাগারদের দারোয়ান, সিকিউরিটি,  নার্স আর ডাক্তার,সবাই ভায়োলেন্ট হয়ে কামড়াকামড়ি শুরু করলে,কেউ কেউ আবার কোমড় দুলিয়ে নাচা শুরু করল,,হেড়ে গলায়,, “সুঁইঁটিঁ,,তুঁমিঁ অ্যাঁর কেঁদোঁ ন্যাঁ,,,”  গাইতে লাগল মাথা ঝুলিয়ে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হাসপাতালের কয়েকশ পাগল সুস্থ হয়ে গেল। একে অপরের কুশলাদি বিনিময় করতে করতে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেল। প্যান্ট টানা পাগল,নিজের প্যান্টটা ধরে ভদ্রভাবে হেটে সি এন জি তে উঠল। প্রেমিক পাগল বলল,,”তোর থেকে সুন্দরি বিয়ে করব,শালি মুটি,বিয়ের পর তো ভুটকি হইয়া গেছিস।”  এই বলে সেও চলে গেল।

আমি,জিহাদ,জুবায়ের আর দুর্জয় তব্দা খেয়ে নিঃশব্দে বের হয়ে গেলাম। পিছে রয়েছে পাগলাগারদ। তাতে ডাক্তাররা এখনো বিরহের গান গাইছে,নার্সরা ব্রেক ড্যান্স দিচ্ছে,আর সিকিউরিটিরা কামড়াকামড়ি করছে।

কেউ গল্প বিশ্বাস না করলে আমার বয়েই গেল। 😒😒😒

গল্প ৮২

​”হলুদ পরী,খয়েরি চোখ”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

সেবার আমি গিয়েছি গ্রামের বাড়ি।গ্রামে তখন কেউ থাকে না।বাড়ি একদম ফাকা।ভাবলাম বন্ধুবান্ধব নিয়ে পিকনিক করব ফাকা বাড়িতে।

শুরুর দিক ১০/১৫ জন রাজি হল।বাড়িতে কারেন্ট নাই দেখে ৫ জন কমল।টয়লেট দূরে বলে আরো ৫ জন কমল।নদীতে গোসল করতে হবে বলে ৩ জন রূপসচেতন হাফ লেডিস ফ্রেন্ড কমল।

বাকি রইলাম আমি আর জুবায়ের।জুবায়ের বলল,বাড়ি গিয়ে নাকি গাছগাছালিতেই চড়ে বেড়াবে।ফলফলাদি খাবে।খালে মাছ ধরবে।নৌকায় করে নদীতে ঘুরবে।মাঝি হবে।যদি গ্রামে দুই পক্ষের মাঝে মারামারি বাধে,ছাকিপ খানের মত গিয়ে থামাবে।গ্রাম্য কোনো সুন্দরি ইম্প্রেসড হবে।একটু কোমর দুলিয়ে নাচ হবে।তারপর জুবায়ের আর সেই কল্পিত সুন্দরির বিয়ে হবে,জুবায়ের তার লাভ অফ লাইফ পাবে।

কিন্তু জুবায়ের তার লাভ অফ লাইফ পাওয়ার আগেই জুবায়েরের বাসার টয়লেট জুবায়েরকে তার লাভ অফ লাইফ ঘোষণা করল।ফলস্বরূপ,জুবায়ের যাওয়ার ২ দিন আগে দেখে টয়লেটের ভিতরেই অস্থায়ী সংসার বসাল,পাছে টয়লেট থেকে বের হলেই টয়লেটের অভিশাপে জিনিসগুলো প্যান্টেই পড়ে যায় কিনা সেজন্য।

তো কি আর করার,  ১০/১৫ জনের পিকনিক হওয়ার কথা,,গেলাম আমি একা।

যাই হোক,ভেবেছিলাম গ্রামে গিয়ে একটু শান্ত প্রকৃতির মাঝে  হারিয়ে যাব। শান্ত কিছু সময় কাটাব।রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে।শব্দ বলতে পাখপাখালির কলরব।অথবা হয়ত মাঝির ভাটিয়ালি গান।রাতে বসে দেখব নদীর শীতল বাতাসে বিশাল নদীবক্ষের মাঝে টিমটিমে জেলেনৌকার আলো।

কখনো হয়ত চলে যাব সুদূর সেলিমপুরের হাটে,দেখব হয়ত যাত্রা,বা শুনব জারি গানের আসর।

শহরে থাকলে যা দেখতে পারি না,গ্রামে গিয়ে তা দেখব। দেখব,গ্রামের মানুষের কেন এগুলো এত ভাল লাগে।

আর দিনে লেখালেখি করব। হয়ত এমন একটা উপন্যাস কিখে ফেলব যা একদিন সারা বাংলাদেশ এ খ্যাতি ছড়াবে।

রাতে ঘুমাব।নদী তে শব্দ হবে ঢাকাগামী বা বরিশালগামী বিশাল লঞ্চের ইঞ্জিনের।

অথবা,হয়ত ভাগ্যভাল হলে রাতে টিনের চালে পড়বে বৃষ্টি।সেই শব্দে বিভোর হয়ে কারো চোখের স্বপ্নের মায়ায় হারাব,খয়েরি বর্ণের কোনো চোখের।

জেলেদের মাছ থেকে তাজা মাছ কিনব,দরকার হলে,ধরাও শিকব,সেই মাছ নিয়ে যাব কোনো গ্রাম্য পরিবারে,তাদের সাথে ভাগ বাটোয়ারা করে খাব দুপুর আর রাতের খাবার।

আহহহ,,,কত স্বপ্ন।

উপন্যাসের পাতায় পড়া গ্রামের বর্ণনা চোখে নিয়ে গিয়েছিলাম এক সপ্তাহ শান্তিতে কাটাব বলে। বন্ধু বান্ধব পিকনিকে রাজি হয় নি বলে ভালই হয়েছে। এরকম নির্জন নিঃস্তব্দ সুখ হয়ত আস্বাদন করতে পেতাম না।

তবে,গ্রামের বর্ণনা যে নেহাত উপন্যাসেই থাকে টের পেলাম যাবার পর।

 ঘটনার শুরু হল, নৌকা থেকে নায়কের মত লাফিয়ে নদীর পাড়ে নামার সময়

 ঠাস করে আছাড় খেলাম। আশেপাশের গ্রাম্য ছেলেমেয়ে,মহিলারা তা দেখে দিল হেসে।কেউ এগিয়ে এল না সাহায্য করতে।

কাদা মেখে ব্যাগ হাতে উঠলাম কষ্টে,কোমর ধরে বাকিয়ে বাকিয়ে হেটে হুটে গেলাম নিজের বাড়ি।তালা খুললাম,ধুলায় এতদিনের পরিত্যক্ত বাড়ি ঘোলা হয়ে আছে।

নিজের কর্দমাক্ত দেহে খেয়াল করি নি। কিন্তু ময়লা জামা কাপড় খোলার পর নাকে একটা গন্ধ যেতে খেয়াল করলাম,আশেপাশের মানুষ বাড়ির উঠানে তাদের গোয়াল বানিয়েছে।গরু ছাগল চরিয়ে রেখেছে।

বইয়ে পড়েছি গ্রাম্য মানুষ নাকি খুবই সহজ সরল,সব কুটিলতা শহুরেদের মনেই।তাই ওই অবস্থায় সহজ সরল মানুষদের বললাম,,”আপনাদের গরু আমাদের উঠানে কেন?”

তারা বলল,,”আসলে গোয়াল ভিটার পাশে রাখলে গন্ধ আসে,আমাদের ছেলে আবার ঢাকায় থালে,গ্রামে এসেছে,ওর এতে অনেক কষ্ট হয় তাই আপনাদের ফাঁকা ভিটায় গরু রাখলাম”।

আমি বললাম,,”এবার আমি পথ চলব কিভাবে? গরু তো পথের বারোটা বাজিয়ে দিছে। আর আপনাদের তো আব্বু জানিয়েছে আমি আসব,  আরো অনেক আগে থেকেই,ফোন দিয়ে,টাকাও পাঠিয়েছে,ঘর গুছিয়ে দিতে,এ কি অবস্থা?”

সহজ সরল লোকগুলো চেচিয়ে পাড়া মাথায় করল,,”বেয়াদব ছোকরা ,,, টাকার খোটা দেয়। এর বাবা তো ভাল ছিল,যথেষ্ট সম্মান করত,তার ছেলে এরকম খাইস্টা কেন?”

আমি সহজ সরল মানুষের অভিবাদনের বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।

যাই হোক,,,তাদের চিল্লাচিল্লির মধ্যে আমি কোনোরকম আনাড়ি হাতে ঘর পরিষ্কার করলাম। বাইরে ঠান্ডা হতে হতে রাত হয়েছে,গায়ের কাদা সরাতে চাই গোসল।রওনা দিলাম নদীতে।সাবান দিয়ে গোসল করে গান গেতে গেতে ফেরার পথে উঠানের গোয়ালে গরুর গোবরে আছাড় খেলাম।আবার গেলাম নদীতে গোসল করতে।

ফিরে এসে সাবধানে পা ফেলে আসতে গিয়ে ভুলে একটা গরুর লেজে টান দিলাম। গরু তাদের সহজ সরল মালিকের মত ভদ্র,তাই কষে একটা লাথি দিল।

লাথি খেয়ে আবার আগের গোবরটায় গিয়ে পড়লাম।আবার নদীতে গিয়ে গোসল করলাম।

সেরাতে জ্বর আসল। এক সপ্তাহ ভ্রমণের  প্রথমদিনটা গেল না খেয়ে,আর জ্বরে অজ্ঞান হয়ে।

পরের দিন সকালে ধড়মড় করে বিছানা থেকে ২ হাত উপরে লাফ দিয়ে ঘুম ভাঙল।

বাইরে সাউন্ডবক্সে উচ্চস্বরে “তুই যে ভোলার কোকাকোলা” বাজছে।

আমি বললাম,,”সে কি,আমি কি তবে গ্রামে আসি নি? গ্রামের সেই নিস্তব্দতা নির্মলতার বাশটা মারল কে?”

বাইরে এসে দেখি গোয়াল আছে,গোবর আছে,,গরু নিয়ে গেছে হাল চাষ করতে।

আর পাশে সেই সহজ সরল লোকের বাসার পরিষ্কার আঙিনায় একটা চেয়ারে বসে,একটা কালা চশমা পরা ততোধিক কালা এক ব্যক্তি লুঙ্গি, আরেকটা স্যান্ডো গেঞ্জি,আর জুতা আর মোজা পরে কোকাকোলা গানের সাথে মাথা ঝাকাচ্ছে।

আমার এই দৃশ্য দেখে ঘুম চলে গেল,জ্বরও চলে গেল।

বাইরে নেমে,পাশের এক পিচ্চিকে দেখলাম,বললাম,,”ওই লোক কে?”

পিচ্চি বলল,,”ওই লোক ঢাকা থাকে বড় চাকরি করে।বাড়ি আসছে বেড়াতে”

আমি ভাবলাম,,,”বাড়িতে আসা বড় চাকুরে লোকেরা কালা চশমা আর জুতা মোজা লুঙ্গি পড়ে ভোলার কোকাকোলা গান শোনে?”

আমি নদীর পাড়ে গেলাম ফ্রেশ হতে, দিনের আলোয় গোবর টোবর দেখে চলতে লাগলাম।

ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে দেখি,ভোলার কোকাকোলা স্টপ হইছে,কিন্তু সেই ঢাকার বড় চাকুরের আশেপাশে গ্রামের অনেক লোকের ভিড়। বড় চাকুরে পায়ের উপর পা তুলে কি যেন বলছে।আর সবাই উদগ্রীব হয়ে শুনছে।

আমাকে দেখেই একটা লোক ডাক দিল। বলল,,”তুমি তালুকদার বাড়ির পোলা? বরিশালে থাক?”

আমি সালাম দিয়ে বললাম,,”হ্যা।”

আমাকে ইশারায় ডাকল। আমার খিদায় পেট জ্বলছে। ভাবছি একটু বাজারে যাব,কোন দোকানে নাস্তা করতে।

তাও গেলাম,গিয়ে দাড়ালাম।তারা আমাকে দাঁড়িয়ে রেখেই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল।

আমাকে হঠাৎ একজন খুব গর্বভরে বলল,”এই লোককে চেনো,ঢাকায় থাকে,অনেক বড় চাকুরে।”

আমি বললাম,”ভাল তো”

আমাকে তারা বলল,,”বড় মানুষ,বড় তার ব্যবহার,শেখো কিছু,, কালকে নাকি এর বাবা মাকে এসেই তুমি টাকার খোটা দিয়েছ শুনলাম”।

মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।তাও চুপ করে রইলাম।

আমাকে এবার বড় চাকুরে বলল,,”কি করা হয় বরিশালে?”এমনভাবে বলল,,যেন বরিশাল কি একটা জায়গা? এটা তো গোয়াল ঘর।

আমি বললাম,”পড়াশুনা করি”

সে বলল,,”পড়াশুনা কর? তা কোথায় পড়?”

আমি বললাম,,”কলেজে পড়ি”

সে বলল,,”ওহ কলেজ স্টুডেন্ট,তা বাবা শুনেছি উকিল,ভদ্রতা শিখায় নি? কোন কলেজে পড়? বরিশালে আবার কলেজ টলেজ আছে নাকি ভাল,,কোন ইয়ারে পড়,ফার্স্ট না সেকেন্ড?”

আমি বললাম,”ফিফথ ইয়ারে পড়ি”

সে চা খেতে খেতে পায়ের উপর পা তুলে বলল,,”ফিফথ ইয়ারে পড়? তারমানে? ফিফথ ইয়ার হয় নাকি? মিথ্যা বল কেন? তোমার তো কলেজ সম্পর্কেই ধারণা নেই। হা হা হা,, শোনেন আপনারা,, কলেজ হয়ই ২ ইয়ারে,এ পড়ে নাকি ফিফথ ইয়ারে। তা ভাই,পড়াশুনা ছাড়লা কেন সেটা বল,,বাবার টাকা বেশি হইছে?”

আমি বললাম,,”মেডিকেল কলেজে ফিফথ ইয়ারে পড়ি”

সে মুখের চা ফেলে দিল।

আমার দিক চোখ বড় করে ভিরমি খেয়ে চেয়ে রইল। আমি একটা তীব্র দৃষ্টি দিয়ে চলে আসলাম।

সেদিন ভাবলাম,শান্তিতে নদীর পাড়ে বসি,উপন্যাস লেখা শুরু করব,পরেরদিন।তা আর হল না, নদীর পাড়ে বসে থাকা সুখ আছে ভাবছিলাম,আসলে নেই।

ভাবলাম,পরের প্লান করি। জেলের কাছ থেকে মাছ কিনব,তাজা মাছ,কোন একটা বাড়িতে দিয়ে তাদের সাথে একসাথে খাব।

তো একটা ইলিশ কিনে একবাড়ি দিয়ে এসে বললাম,,”এই মাছটা রান্না করেন,রাতে আর দুপুরে আপনার বাসায় খাব”।

তারপর নিজের ঘরে ফিরব,বাট আবার কোকাকোলা গান শুরু।

তাই ভাবলাম, কোন একটা ডিঙি নিয়ে নদীর বুকে ভাসব।একটা ভাঙা ডিঙিতে চড়লাম। গাছের ছায়া পড়েছে নদীতে।আমি চিৎ হয়ে শুয়ে আছি।হঠাৎ চিৎকার শুনলাম।

দেখি একটা লুঙ্গি পরা সহজ সরল লোক চেচাচ্ছে আর বলছে,”আমার ডিঙিটায় চড়ে আমার ডিঙিটা ভাইঙ্গা দিল রে।”

আমি অবাক,এটা তো ভাঙাই ছিল।দেখে মনে হয় অনেক দিনের ভাঙা।

আশেপাশের লোকেরা জড় হল।লুঙ্গি পরা লোক গালাগালি দিচ্ছে।কিন্তু আশেপাশের লোক চুপ।আমি শিওর হলাম।যদি আমিই ভাঙতাম,এই লোকেরা ওই লোকের সাথে চিল্লাত।কিন্তু এরা চুপ,মানে এরা জানে লোকটা খালি খালি গালি দিচ্ছে।

শেষে শালিশে ভয় দেখাতে,আমি আমার পকেট থেকে টাকা বের করে লোকটাকে দিলাম। ক্ষতিপূরণ হিসেবে।কি ক্ষতি করলাম কে জানে।হয়ত,টাইম ট্রাভেল করে এসে ভেঙেছিলাম কোনোদিন।

লোকটা টাকা নিয়ে চলে গেল।যাওয়ার সময় একটা হাসি দিল।

আম দুপুরের খাবার খেতে মাছ কিনে দেওয়া বাড়িতে গেলাম। তারা বলল,,মাছ নাকি বিলাই খাইছে।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে আসলাম।

পরে বিকেলে দেখি,মাছ কিনে দেওয়া বাড়িতে মেহমান আসছে,আকাশে বাতাসে ইলিশ মাছের গন্ধ।

এক সপ্তাহের দুইদিন কেটে গেল।আমি তখন টাকার অভাবে পড়লাম। যা আছে,তাতে আর একসপ্তাহ থাকা হবে না।

ভাবলাম চলে যাব। পরেরদিন সকালে গোসল করতে গেলাম। ফিরে এসে দেখি,আমার মোবাইল,টাকা সব চুরি করে দিয়ে গেছে ঘরের ছিটকিনি খুলে।

নৌকার মালিকের চোট্টামির পর যা ছিল তাতে হয়ত দুইদিন থাকা যেত,,এবার যে বাসায় ফেরার উপায়ও নেই,বাসায় জানানোর উপায়ও নেই।

আমি মানুষের কাছে মোবাইল চেয়ে বেড়াতে লাগলাম। কেউই দেয় না। আমার উপর শহরের মত গ্রামের মানুষদেরও কেমন জানি একটা ক্ষোভ দেখলাম।

যাই হোক,কি আর করা, সেদিন রাতে জোরে বৃষ্টি নামল। আমি ভাবলাম খয়েরি চোখের স্বপ্নে ফুন দিব।কিন্তু ৩ দিনের হতাশায় আর সেটা হল না। হঠাৎ খেয়াল করলাম ঘরের পিছের রুমের চাল দিয়ে পানি পড়ছে।পানিতে ঘরের মেঝের মাটি ধুয়ে যাচ্ছে।ঘরের মেঝের মাটি ধুইতেই সেখানে আমি একটা ধাতব কিছু দেখতে পেলাম।কাছে যেতেই দেখি,বেশ বড় একটা বাক্স।ট্রাংক বলা যায়।

ট্রাংকটা বেশ ভারি,তাও আমি উঠাতে পারলাম।উঠিয়ে আমার রুমে হারিকেনের আলোয় দেখি,ট্রাংকটার ভিতরে টাকা,আর গয়না।

হঠাৎ ঘরের বাইরে অস্থায়ী (বা স্থায়ী)   গোয়ালের গরুগুলো ডেকে উঠল।দরজায় একটা নক হল।আমি ট্রাংকটা খাটের নিচে ঢুকালাম।তারপর দরজা খুললাম।

দেখি হলুদ শাড়ি পরা একটা সুন্দরি মেয়ে বাইরে দাঁড়ানো।আমি মেয়েটার দিক তাকালাম। মেয়েটার সারা শরীর পানিতে ভেজা।মেয়েটা আমার দিক চেয়ে রইল।

আমার প্রথম প্রথম কেমন জানি লাগল।এত সুন্দর একটা মেয়ে,সারা গা ভেজা বৃষ্টির রাত,,,, তারপর হঠাৎ চোখের ভিতর এক জোড়া খয়েরি চোখ ভাসল।খয়েরি চোখ ভাসার পর খয়েরি চোখের মালকিনের মুখটাও ভাসল।

তখন খেয়াল করলাম হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটার মুখ অবাক হয়ে গেল। তারপর একটা হাসি দিল। হাসিটা এমন যে গুরুজন,বাচ্চাদের মনের কথা বুঝে ফেলেছে।

হলুদ শাড়ি পড়া মেয়েটা ভিতরে আসল,তার গা তখনো ভেজা,বাইরে তখনো বৃষ্টি।

আমাকে বলল,,”টাকা গয়নার ট্রাংকটা খাটের নিচে রেখো না,তুমিও আর এখানে থেকো না।”

আমি বললাম,,”মানে?”

সে বলল,,”বাঁচতে চাও তো আমার সাথে এসো”

আমি তীব্র ভয় পেলাম,,বৃষ্টির রাতে গ্রামের অন্ধকারে আমাকে বাইরে নিতে চায় কেন? আসলে এই জিনিস কি সেই জিনিস? যা গ্রামে এসে মানুষ প্রায় দেখে টেখে আর ভিরমি খায়?

আমাকে হলুদ শাড়ি বলল,,”কি হল,আসো।”

বলতে না বলতে পিছের দরজায় একটা খচখচ আওয়াজ হল। আমি পিছে তাকালাম।

দেখি,একটা রামদা দিয়ে কেউ পিছের দরজা কাটছে।

আমি আবার সামনে তাকাতে দেখি মেয়েটা নিচেই ট্রাংকটা খাটের নিচ থেকে বের করছে।

অমানুষিক শক্তি নিয়ে ট্রাংকটাকে উঠাল সে।

তারপর বৃষ্টির রাতে বের হয়ে গেল,পিছে ফিরে বলল,,”বাঁচতে চাইলে বের হও।”

আমি কিছু না ভেবে বের হলাম বৃষ্টির মাঝে। মেয়েটা আমাকে নিয়ে যেতে লাগল,জঙ্গলের ভিতর দিয়ে,যেখানে গাছপালা অনেক।

মেয়েটা বলল,,”তুমি যা ভাবছ,আমি কিন্তু ঠিক তাই। কিন্তু তোমার ভয়ের কিছু নেই।”

আমার রক্ত জমে গেল।বলে কি!

মেয়েটা হাটতে লাগল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। মেয়েটার হাতে ভারী ট্রাঙ্ক।

হঠাৎ আমার ঘরের ভিতর কিছু লোকের রাগান্বিত কণ্ঠস্বর শুনতে লাগলাম।

মেয়েটা মুচকি মুচকি হাসল।

আমি ভয় পাব না অবাক হব বুঝলাম না।

মেয়েটা আমাকে বলল,,”তোমার আব্বু এসব বিশ্বাস করে না। আসলে যুবক হবার পর তো আর এখানে থাকে নি সে বিশ্বাস করার কথাও না। তাই হয়ত তুমি কিছু জানো না”

আমি অবাক হলাম,,গ্রাম্য মেয়ে সুন্দরি হয় মানলাম,এত স্পষ্ট শুদ্ধ কথা কিভাবে বলে?

মেয়েটা বলল,,”আমি তোমাদের বংশের সাথে আছি ১২৩ বছর। তোমাদের এক পূর্বপুরুষ আমাকে এনেছিল।আমি কিভাবে যেন তার চোখে পড়ে যাই বাচ্চা বয়সে,আমার মা বাবা কে আমি জানি না। জ্বিনদের দেশেই আছে হয়ত।তোমার সেই পূর্বপুরুষ আমাকে মেয়ের মত করে বড় করে তোলেন”।

আমি বৃষ্টিতে ভিজছি।আর আড়ষ্ট হয়ে আছি।

মেয়েটা বলল,,”সেই থেকে তোমাদের বংশকে আমি আমার পরিবার ভাবি। তোমাদের পরিবারকে কখনওই বড় বিপদে পড়তে হয় নি,,কেন জানো? আমার জন্য।”

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

মেয়েটা বলল,,”কিন্তু তোমার কাকা মারা যাবার পর তোমরা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে গেলে,আমি কাদের সাথে থাকব বল,,আমি তাই ঘুরে বেড়াই।ভিটায় আসি কখনো  কখনো ইচ্ছা মত নদীর মধ্যে হাটি,উড়ি।”

অন্তরাত্মা কেপে উঠছে আমার।

“কিন্তু আমি জানতাম না,আমার অনুপস্থিতি তে আর তোমাদের অনুপস্থিতিতে তোমাদের ঘরটাকে ডাকাতরা ডাকাতির মাল রাখার জায়গা হিসেবে রাখছে।

এবং যদি কখনো কেউ ফিরে আসে,তারা যেন থাকতে না পারে গোয়াল বানিয়ে রেখেছে এই ঘরের উঠানে।

কেউ কিছু বললে তারা গালাগাল করে তাড়িয়ে দিচ্ছে।যাতে ধরা না পড়ে।

তুমি যাতে এখানে না থাক,ওরা অনেক চেষ্টা করেছিল,যেন তুমি বাধ্য হয়ে এখান থেকে সরে যাও।ডাকাতদলের লোকেরা শুরু থেকে তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করছে।

সবাই ভেবেছিল,নৌকার জন্য টাকাপয়সা রেখে দিলে তুমি টাকার অভাবে চলে যাবে।

কিন্তু ডাকাত সর্দারের ছেলে,যে নিজেকে বড় চাকুরে বলে,সে আসলে ঢাকার এক মুদি দোকানের কর্মচারী, সে তোমার মোবাইলটার লোভে পড়ে।

তুমি যখন ছিলে না,তোমার মোবাইল আর টাকা চুরি করে নিয়ে যায়।

এই কাজটা করার পর ডাকাতের সর্দার ছেলের বোকামির মাসুল গুণতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়,তোমাকে মেরে ফেলবে আজ।কারণ,টাকা নাই মানে তুমি আছ তুমি আছ মানে ওদের ডাকাতির মাল ওরা নিতে পারবে না।

আমি দেখলাম ঘটনাটা দুইদিন ধরে।

মজা হবে আজ বুঝেছ। আসতে দাও ওদের,,, তোমাকে খুন করতে ওরা এই জঙ্গলে আসবে, পায়ের ছাপ দেখে।

মজা হবে কেন বললাম জানো?

আমি আজ যে মেয়েটার রূপ ধরেছি গত ডাকাতির সময় এই মেয়েটাকে ওরা খুন করে।”

আমি কি বলব বুঝলাম না। রামদা হাতে লোকগুলো ততক্ষণে আমার পিছনে এসে দাড়িয়েছে।

মেয়েটা হাসছে ,, ভয়ংকর সে হাসি। অস্থায়ী গোয়ালের গরুগুলো গোয়াল ভেঙে কোথায় যেন পালিয়ে গেল।

আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

পরেরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙল ঘরের বিছানায়।গায়ে শুকনো কাপড়। ঘরের মেঝে সুন্দরভাবে লেপা।ঘরে যে কাল কিছু হয়েছিল বোঝাই যায় না।

আমি দরজা খুললাম,সামনে গোয়াল ঘরের অস্তিত্ব নেই।তকতকে উঠান।।

আশেপাশে কয়েকটা বাসায় মহিলাদের মরা কান্না।

একটা বুড়ি মহিলা উঠানের মাঝে এল। সকালের আলোর মত মিটিমিটি তার হাসি।

আমাকে বলল,,”কোথাও যেতে হবে না। কাদছে কাঁদুক। এই গ্রামে আর কোনো ডাকাতদল নেই।”

আমি বললাম,,”আপনি কে?’

বুড়ি একটা মুচকি হেসে বলল,,”তোমার মোবাইল,আর সব টাকা,তোমার বালিশের নিচে, ইলিশটাতো পেলাম না। টাকাটা এনে দিলাম। তুমি চাও তো টাটকা ইলিশ এনে দিই।”

আমি তোতলিয়ে বললাম,,”আ-আ-আপনি?”

বুড়ি কাছে এসে বলল,,”মাঝে মাঝে বাড়িতে এসো,,আর তোমার খয়েরি চোখকে কাল রাতে একফাকে গিয়ে দেখে এসেছিলাম।তোমাকে ঘরে এনে তোলার পর। খুব ভাল লাগল দেখে”

আমি তাকিয়ে রইলাম।

বুড়ি বলল,,,”বাসায় চলে যাও।ধকল গেছে তোমার উপর অনেক। ভয় নেই।এই ভিটা ছেড়ে আর যাব না। খয়েরি চোখ,তোমাদের বংশধর নিয়ে তোমরা যখন আবার আসবে এখানে,দেখবে,অতিথিপরায়ণতা কাকে বলে? উপন্যাসের চেয়েও মুগ্ধ হবে গ্রাম দেখে। দায়িত্ব আমি নিলাম

আর হ্যা, টাকা আর গয়নার ট্রাংকটাকে নদীতে ফেলে দিয়েছি। ওইটাকায় মিশে আশে কত রক্ত,কত অভিশাপ। তালুকদার পরিবার রক্ত আর অভিশাপ থেকে দূরেই থাকুক কি বল?”

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। সামনের উঠান শূন্য। হলুদ পরী চলে গেছে। তবে সূর্যের হলুদ আলো এখনো উঠানের সেই জায়গাটাকে আলোকিত করে আছে।

গল্প ৮১

​”একটি ডেটিং সংক্রান্ত জটিলতা”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

৯৫ কেজি ওজনের বিশ্রী চেহারার একটা বছর তেইশ চব্বিশের ছেলে একটি কোচিং সেন্টারে এসেছে। কোচিং সেন্টারের ছাদ হল আকাশ,বেঞ্চ,চেয়ার,টেবিল সব হল ঘাস,হোয়াইট বোর্ড,ব্লাক বোর্ড কাল্পনিক। চক,মার্কার,ডাস্টারও কল্পিত। ছাত্র পেটানোর বেত বলতে কোচিং এর লিকলিকে শিক্ষকের ততোধিক লিকলিকে হাত। 

কোচিং এর একমাত্র ছাত্র উপরোক্ত ছেলেটি। আর শিক্ষক তার বেস্টফ্রেন্ড,একজন জননন্দিত ডেটিং স্পেশালিষ্ট।

কোচিং সেন্টারটি এইমাত্র খোলা হল। বেতন এক কাপ দুধ চা।চাচীর দোকানের।কারণ চাচী ডেটিং এক্সপার্টরে ভাল পায়।

যাই হোক,কোচিং বলার কারণ,৯৫ কেজি ওজনবিশিষ্ট নব্য প্রেমিক তার জীবনের প্রথম একটা ডেটিং এ যাবে। প্রেমিকা অত্যন্ত সুন্দরি,এবং নব্য প্রেমিকের প্রোফাইলের এডিট করা ছবিই দেখেছে কেবল। নব্য প্রেমিক অত্যন্ত কৌশলে তার ৯৫ কেজিওয়ালা দেহটা সুপ্ত রেখে ছবি আপলোড করে।

যাই হোক,ছেলে মেয়ে দুইজনই যখন সেইম শহরের,তাই মেয়ে তাকে বলে,কেন তারা মিট করছে না? ছেলে আনন্দের আতিশয্যে কিছু না ভেবেই বলে দেয়,”আচ্ছা আমি রাজি। চল মিট করি। ইটস এ ডেট।”

মেয়েও খুশি,ছেলেও খুশি। কিন্তু ছেলের খুশি হওয়া মিলিয়ে যায় আনন্দে নাচতে নাচতে আয়নার সামনে দাড়াতেই। ৯৫ কেজি আসলে কি জিনিস এই প্রথম তার চোখে মারাত্মকভাবে পরিস্ফুটিত হয়।

৯৫ কেজির ধাক্কায় ডেটিং এর প্রিপারেশন উচ্ছন্নে যায়। ডেটিং এর বাকি আছে আর ৩ দিন।এই ৩ দিনে ১৫ কেজি ওয়েট কমানোর জন্য ছেলেটা দিনরাত লাফালাফি করে। ফলে দুটো ঘটনা ঘটে,এক. প্রতিবেশীরা ভূমিকম্প হচ্ছে ভেবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে তীরবেগে রাস্তায় চলে আসে (একজন আবার টয়লেটে ছিল,ভয় বেশি পেয়ে বদনা হাতেই চলে আসে)। দুই. হঠাৎ লাফালাফির দরুণ নব্য প্রেমিকের গায়ের হাড্ডির গিটগুলো নড়েচড়ে বসে।

নড়বড়ে হাড়ের গিটসহ নব্যপ্রেমিক বিছানায় বসে ভাবে,”নাহ,এযাত্রা ওজন আর কমবে না। মেয়েকে ডেটিং এ ইম্প্রেস করতে হবে,যেন মেয়ের চোখে ৯৫ কেজির ধাক্কাটা একটু কম লাগে।”

এখন ডেটিং এ ইম্প্রেস করতে দরকার এক্সপার্ট এডভাইস। নব্য প্রেমিক জানে কে করতে পারে তাকে সাহায্য। শিগগিরি সে ডেটিং এক্সপার্ট এর কাছে ধরনা দেয়,ডেটিং এর ছোটখাটো টিপস তো বটেই,৯৫ কেজি ওজনের ধাক্কা কাটানোর জন্য কিছু স্পেশাল টিপসও তার দরকার।

তো ডেটিং এর আগের সন্ধ্যায় একটা টি-শার্ট,একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট (নিন্দুকেরা বলবে হাফ প্যান্ট),আর টয়লেটে যাবার চটি পরে ডেটিং এর এক্সপার্ট হাজির হয় তার মাত্র খোলা কোচিং সেন্টারে,মানে কুদ্দুস মোল্লার পুকুরপাড়ের মাঠে,যেখানে নব্য প্রেমিক ঘাসের বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করছে।

এক্সপার্ট : তো আমরা কালকে মেসেঞ্জারে কি নিয়ে আলোচনা করছিলাম?

ছেলে: আমার জীবনের প্রথম ডেটিং এ যাব। তাও অত্যন্ত সুন্দরি একটা মেয়ের সাথে। কিছু টিপস লাগবে।জেনারেল টিপস,আর ৯৫ কেজির ধাক্কা প্রতিরোধক স্পেশাল টিপস?

এক্সপার্ট (ভিরমি খেয়ে): মাইয়ার ওজন ৯৫ কেজি?

ছেলে: ধুরো হালা,আমার ওজন

এক্সপার্ট : তোর ৯৫? আমি তো ভাবছিলাম ১২০-৩০ হবে।

নব্যপ্রেমিক তীব্র চোখে এক্সপার্ট এর দিকে তাকাল। এক্সপার্ট সামলে নিয়ে বলল।

এক্সপার্ট : তো যেটা বলছিলাম। ডেটিং এ কখনওই টি শার্ট পরে যাওয়া যাবে না। যেতে হবে শার্ট পরে। আর প্যান্ট হিসেবে জিন্স।

ছেলে: জিন্স তো একটাও কোমর এ লাগে না ভাই।

এক্সপার্ট : ওহ,থাক তাইলে। গাভাডিং পড়লেই হবে।

ছেলে: কাপড়ের প্যান্ট হলে হয় না? সুতি কাপড়?

এক্সপার্ট : আচ্ছা,আচ্ছা হবে। তবে শার্ট যেন ফুলশার্ট হয়।

ছেলে: হাফ শার্ট হলে হয় না? আসলে ফুলশার্টে গরম বেশি।

এক্সপার্ট : আচ্ছা,ভাই,তুই একটা কিছু পড়িস,খালি গায়ে যাস না।

ছেলে: (😒 এই ইমোর মত মুখ করে) কোন রঙ  পরব?

এক্সপার্ট : কাল প্যান্ট। আর হালকা কালারের শার্ট।আকাশী নীল হলে ভাল হয়।

ছেলে: আকাশী নীল নাই। অ্যাশ কালার হলে হবে?

এক্সপার্ট :(ডাবল 😒 ইমোর মত মুখ করে) দোস্ত,আমার টিপস কি তোর আসলেই লাগবে?

ছেলে: ডেফিনিটলি দোস্ত।তুই ছাড়া আমি কেমনে ৯৫ কেজির ধাক্কা থেকে সুন্দরি মেয়েটার চোখ আর মস্তিষ্ক রক্ষা করব?

এক্সপার্ট : আচ্ছা,তাইলে গেট আপ বাদ। ডাইরেক্ট এপ্রোচে চল।তুই মেয়েকে ফোন দিয়ে আসতে বলবি। তারপর এক্সাক্ট টাইমের ১৫ মিনিট আগে যাবি।খবরদার, মাইয়া যেন ওয়েট না করে প্রথম ডেটেই।তাইলে ওটাই শেষ ডেট হবার একটা ওয়ার্নিং বেল হিসেবে গণ্য হবে।

ছেলে: তারপর?

এক্সপার্ট : তারপর তুই খেয়াল করবি মেয়েটা কোথা থেকে আসে। মেয়েটাকে আগেই খেয়াল করবি। লাগলে লুকিয়ে খেয়াল করবি।মেয়ে যেন তোকে আগে না দেখে,তুই মেয়েকে বেশ কিছুক্ষণ দেখে ফোন দিয়ে বলবি,,”তুমি কি এসেছ? কি ড্রেস পরে? কি রঙ এর?”মেয়ে নিশ্চয় বলবে,তখন তুই বলবি,,”ও আচ্ছা,তুমি ওই সুন্দর মেয়েটা? দেখেছি তো। আমি আসছি,ওকে?”

ছেলে: হ্যা বুঝছি,তারপর?

এক্সপার্ট : তারপর তুই মেয়েকে নিয়ে কোন রেস্টুরেন্ট এ বা পার্কে যাবি

ছেলে: রেস্টুরেন্ট এ? আসলে টাকা পয়সা নাই হাতে।

এক্সপার্ট : (তীব্র চোখে তাকিয়ে) তাইলে খয়রাতি মানুষ,তোর প্রেম করার এত সাধ কেন? আমি গেলাম,,,

ছেলে:  (প্রস্থানরত এক্সপার্টের হাত চেপে ধরে)  দোস্ত,,, রক্ষা কর ভাই। এই যাত্রা বাচিয়ে দে।

এক্সপার্ট : কই ভাবলাম তোরে কমু মাইয়ার জন্য একটা গিফট কিনবি। তুই রেস্টুরেন্ট এ নাকি নিতে পারবি না।তোরে আর কি কমু?

ছেলে: আমি আইস ক্রিম খাওয়াতে পারব তো।চা ও খাওয়াতে পারব। ঝালমুড়ি, ফুসকা,,,,

এক্সপার্ট : থাক থাক,ওতেই চালাতে হবে। ওকে,তাইলে রেস্টুরেন্ট বাদ,পার্কে বসবি কোন।

ছেলে: হ্যা হ্যা,নদীর পাড়ের পার্কটায়।

এক্সপার্ট : ও আচ্ছা। তাইলে শোন প্রথমে মেয়েটাকে বেঞ্চের কাছে নিয়ে যাবি।তারপর আগে বসতে দিবি। তারপর নিজে দূরত্ব রেখে বসবি।

ছেলে: (মুখস্ত করল কথাগুলো,আর রিপিট করল) হ্যা তারপর?

এক্সপার্ট : তারপর তাকে একটু প্রশংসা করবি।  সময়ানুবর্তিতার প্রশংসা। বলবি,,”আমি শুনেছি মেয়েরা অনেক লেইট করে। বাট তুমি এত সুন্দর পাংকচুয়াল।”

ছেলে: মেয়ে যদি ১ ঘন্টা লেইট করে তাইলেও এটা বলব?

এক্সপার্ট : এক দিন দেরি করলেও এটাই বলবি বলদ।

ছেলে : আচ্ছা বলব নে। তারপর?

এক্সপার্ট : তারপর মেয়েকে কোনো হাসির কথা বলবি। তারপির নিজেই হেসে বলবি,”সরি,ব্যাড জোক।”  তাহলে দেখবি,হাসি না হাসলেও মেয়েটা হাসবে। আর তখন বলবি,বাহ তোমার হাসিটা তো সুন্দর। আরেকটা কথা,তুই তো সারাদিন মোবাইল টিপস,কক খেলস। ভুলেই মাইয়ার সামনে মোবাইল বাইর করবি না।

ছেলে: আমার ককের ভিলেজে কেউ এটাক দিলেও না?

এক্সপার্ট চোখ গরম করে কিছু বলতে যাচ্ছিল হঠাৎ আকাশে মেঘ ডাকল,আর ঝড়ো বারাস ছাড়ল।বিদ্যুৎ চমকাল। এক্সপার্ট সাথে সাথে দিল দৌড়। দৌড়ের আতিশয্যে তার বাথরুমের চটি ছিড়ে গেল।সেটা হাতে নিয়েই সে দৌড় দিল।

ছেলে: আরে আরে যাস কই? আমার টিপস???

এক্সপার্ট : দোস্ত,ঠাডা পড়বে। কাইল পরীক্ষা আছে একটা,বেস্ট অফ লাক। যা বলছি ওতেই চালাইয়া নিস।

সত্যিকারের ঠাডা পড়তে পারে বুঝে ছেলেও রওয়ানা দিল বাসায়। কালকে জীবনের প্রথম ডেট,আজকে ঠাডা পড়ে মরা চলবে না।

(পরেরদিন) 

অত্যন্ত সুন্দরি মেয়েটা রিকশায় চড়ে মানুষের বৈকালীন ভ্রমণের জায়গায় যাচ্ছে। আজকে সেখানেই ছেলেটা তাকে দেখা করতে বলেছে। প্লান হল,ওখানে কিছু সময় থেকে নদীর পাড়ে যাওয়া। আজব প্লান।ছেলের মাথা থেকেই আসছে। তবে ছেলেটা একটু আধটু লেখে টেখে।লেখকরা আবার একটু ভাবুক টাইপের হয়। আজব প্লান এজন্যই হয়ত।

এটা মেয়েটার জীবনেরও প্রথম ডেইট। ভয়ে মেয়েটা সারারাত ঘুমায় নি।আসার সময় আয়নায় দেখেছে চোখ লাল।নিচে কালি। মেয়েটার ছোটবোন বলল,”কিরে কিছু খাইছিস টাইছিস নাকি?”

এটা শুনে মেয়ে আরো ভীতু হয়ে গেছে।

এদিকে নব্য প্রেমিক ছেলে তার ৯৫ কেজি ওজন নিয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে (এবং ব্যার্থ হয়ে,কারণ গাছটা চিকন) আশেপাশে তীক্ষ্ণ নজর দিচ্ছে। মেয়েটা আসলেই কিছুক্ষণ পর তাকে কল দিয়ে বলতে হবে,”তুমি কি এসেছ? তুমি কি ওই  রং এর (যে রংটা মেয়েটা বলবে) ড্রেস পরা কিউট মেয়েটা?” তারপর মেয়েটা হ্যা বললেই সে বের হবে। ডেটিং এক্সপার্ট তাকে এটা বলে দিয়েছে।

সে ভেবেছিল তার কাছে টাকা থাকবে না। কিন্তু আজ সকালে তার কাছে কিছু টাকা এসেছে।তাই সে ভেবেছিল প্রেমিকাকে রেস্টুরেন্ট এ নেবে। এখন আগে তো মেয়েকে বলা যে নদীর পাড় দেখা হবে। এখন হঠাৎ রেস্টুরেন্ট এর কথা বললে মেয়ে যদি কিছু ভাবে? তাই সে বুদ্ধি করে মেয়েকে এখানে আসতে বলেছে। এখান থেকে নদীর পাড় হেটে যেতে মাঝে রেস্টুরেন্ট পড়বে। তখন সে মেয়েকে বলবে,”চল রেস্টুরেন্ট এই ঢুকি।”

এদিকে মেয়ে রিকশা থেকে নামল ছেলে যেখানে লুকিয়েছে তার ঠিক পিছনেই। নেমেই ফোন দিল। ছেলে ফোন রিসিভ করে পিছনে ঘুরেই মেয়ের একদম মুখোমুখি।

ছেলে আর মেয়ে দুইজনই টাসকিত। ছেলে টাসকিত মেয়ের রূপ দেখে। আর মেয়ে টাসকিত ৯৫ কেজি দেখে। 

বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ছেলে মিনমিন করে এক্সপার্ট এর শেখানো কথা বলে দিল,,”তুমি কোনটা? ক-কি র-র-রঙের ড্রেস পরা? এই রংটার নামও তো জানিনা ধুর। তুমি কি একটা বিশেষ রঙের ড্রেস পরা কিউট মেয়েটা?

মেয়েটা ৯৫ কেজির ধাক্কা সামান্য সামলে বলল,,”অফ হোয়াইট কালারের ড্রেস।”

যাই হোক,ছেলে আর মেয়ে পাশাপাশি হাটা শুরু করল। বৃষ্টির পানির জন্য প্রায়ই  হঠাৎ হঠাৎ সরে যেতে হচ্ছে। এতে প্রায়ই ছেলে আর মেয়ের ধাক্কা লাগছে। ধাক্কা লাগতেই গ্যাসের অণুর সংঘর্ষ তত্ত্বের মত তারা দূরে সরে যাচ্ছে।

মেয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল,,”আপনার ওজন কত?”

ছেলে মিনমিন করে বলল,,”৯৫ কেজি।”

মেয়ে তার দিকে না তাকিয়েই বলল,,”আমার খালুরও ৯৫ কেজি।”

ছেলের লেখক মন বিস্মিত হয়ে গেল। বিদেশী মেয়েরা ছেলেদের “Friendzone” এ ফেলে। এদেশী মেয়েরা ফেলে “ভাইzone” এ। আর এই মেয়ে কি তাকে “খালুzone ” এ ফেলে দিল?

নদীরপাড়ে তারা যাচ্ছিল। এর মাঝেই পড়ে সেই রেস্টুরেন্ট।  ছেলে কখনো এখানে আসে নি।ভেবেছিল প্রথম ডেটে আসবে। এই রেস্টুরেন্ট এর সম্পর্কে তার কোন ধারণাই ছিল না।

সে মেয়েকে বলল,,”আচ্ছা,নদীর পাড়ে না গিয়ে আমরা এই রেস্টুরেন্ট এ তো বসতে পারি। তোমার পরিচিত কেউ আবার নদীর পাড়ের পার্কে তোমাকে আমার সাথে দেখলে কিছু বলে যদি?”

মেয়ে একবার চোখ উচিয়ে রেস্টুরেন্ট এর নাম দেখল। তারপর তীব্রচোখে ছেলের দিকে চাইল। ছেলে ভাবল,হয়ত তার ৯৫ কেজি।আবার সে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এ ঢুকতে চাচ্ছে।এজন্য মেয়েটা তাকে পেটুক ভেবে তীব্রচোখে তাকাল।

যাই হোক,মেয়েটা একটা কথাও বলল না। সরাসরি পার্কেই ঢুকল। সামনে নদী।নদীতে একটা উদ্ধারকারী জাহাজ। আর জাহাজটার বিশাল বড় জাহাজ উত্তোলনের ক্রেন।

অত্যন্ত সুন্দরি মেয়েটার দিকে অনেক মানুষ ফিরে ফিরে তাকাল। মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলল,,”মানুষ এভাবে অদ্ভুতভাবে কেন তাকায়?”

ছেলেটা আঁচ করতে পারল কেন তাকায়। নিহের ভুড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সে ব্যাথাতুর নয়নে আকাশের দিক তাকাল।

মেয়েটা একটা বিসার জায়গা খুজে বের করল। ছেলেটা মেয়েটার সাথে ওখানে গেল।তারপর মেয়েটার আগেই বসে পড়ল। বসার পর তার মাথার উপরে এক্সপার্ট এর কথা ভাসতে লাগল,,”মেয়েটাকে আগে বসতে দিবি।”

আবার ব্যাথাতুর নয়নে আকাশপানে চেয়ে ছেলেটা উঠে দাড়াল।মেয়েটা বসার পর একটু সরে বসল। মেয়েটা ভ্রু কুচকে এই কান্ড দেখতে লাগল।

চলল কিছু বিব্রতকর নীরবতা।  এর মাঝে একটা গরু এসে ছেলে এবং মেয়েকে তাদের জীবনের প্রথম ডেটের শুভেচ্ছা জানাল লেজ উচিয়ে সামনে একদলা তাজা গোবর ছেড়ে দিয়ে। আর একটা ছাগল এসে মেয়েটা আর ছেলেটার সামনে দিয়ে বারবার উদাসী একটা কবিকবি ভঙ্গিতে হেটে যেতে লাগল।ছেলেটা বড্ড ডেটিং এক্সপার্টের কথা মনে হতে লাগল।

অসহনীয় নীরবতা ভাঙতে ছেলেটা হঠাৎ সামনের উদ্ধারকারী জাহাজের বিশাল ক্রেন দেখে বলে উঠল।

ছেলে: জানো? ওই বিশাল ক্রেনটা দেখে আমার না ওটা বেয়ে উপরে উঠতে ইচ্ছা করছে।একেবারে মাথায়।

মেয়ে: খবরদার ওই কাজটি ভুলেও করবেন না। ক্রেনটা ভেঙে পড়বে। যেহারে লঞ্চডুবি হচ্ছে,ওগুলোকে তখন টেনে তোলা যাবে না।

ছেলেটার জবান আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ হাসির কোন কথা ভাবতে গিয়ে সে বলল,,,

ছেলে: ভালই তো। তুমি ভিডিও করবা। আমি হব ইনক্রেডিবল হালক। যে এত বড় ক্রেনে চড়ে ক্রেন ভেঙে ফেলেছে। তুমি হালককে চেন? ওই যে সবুজ রঙ এর দৈত্যটা। সবুজ আবার আমার বেশ প্রিয়,,,

মেয়ে: সবুজ একটা অসহ্য রঙ। আমি সেদিন একজোড়া জুতা কিনতে গেছিলাম।সবুজ দেখে কিনি নাই।

ছেলে: (😒 এই ইমোর মত মুখ করে) বুঝছি না,আমি কি ক্ষেপব নাকি ক্ষেপব না। ক্ষেপলেও কোন টপিকে ক্ষেপব। তুমি আমার প্রিয় রঙকে অসহ্য বলছ বলে,নাকি সেই রঙ এর জুতা কিনতে গেছ বলে? নাকি সেই রং এর জুতা পছন্দ কর নাই বলে।

মেয়েটা এবার হেসে দিল। হাসিটা অনেক সুন্দর। ছেলেটা এই প্রথম সহজ হল। এতক্ষণ এর স্ট্রেস কেটে গেছে।

সেই ছাগলটা বারবার এসে ঘোরাঘুরি করতে লাগল। ছেলেটা বিস্ময় প্রকাশ করল।

ছেলে: ছাগল বারবার আসে কেন?

মেয়ে: আপনার পারফিউম এর গন্ধ শুকে।

ছেলে: ( অধিক শোকে পাথর হয়ে) শেষ পর্যন্ত ছাগল? টিভিতে তো দেখায় কত সুন্দরি মেয়েরা আসে।

মেয়েটা আবার হেসে দিল।ছেলেটা ওই ভুবনভোলানো হাসি দেখে ভাবল আরো পাচ ছয়টা ছাগল এলেও আপত্তি নেই।

মেয়ে: আচ্ছা আপনি কি ছাগল ভয় পান?

ছেলে: আশ্চর্য তো,ছাগল ভয় পাব কেন?

মেয়ে: মানে ছাগল না,অন্যকিছু?  সবচেয়ে কি বেশি ভয় পান?

ছেলে: (কম্পিত কন্ঠে) হিজরা।

মেয়েটা আবার হেসে দিল। ছেলেটা মাথা নিচু করে রইল।

মেয়েটা হঠাৎ চেচিয়ে বলল,,”হিজরা হিজরা।”

ছেলেটা একটা লাফ দিয়ে বলল,,”ইয়া মাবুদে ইলাহী।” এই বলে পার্কের পিছনের দেয়াল বেয়ে উঠে ওপাশে পালানোর বৃথা চেষ্টা করল। মেয়েটা খিলখিল করে হেসেই চলল।

আশেপাশের মানুষ তাকিয়ে আছে। ছেলেটা মেয়েটার মানসিক ভারসাম্যের ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিগ্ধ হয়ে ভ্রু কুুচকে তার পাশে আবার এসে বসল।

ছেলে: এভাবে ভয় দেখানো ঠিক না। হার্ট এটাক ফেটাক হিয়ে যেতে পারে।

মেয়ে: হ্যা,তা পারে আপনার। যেই একটা ভুড়ি।

ছেলেটা ব্যাথাতুর নয়নে সুদূরপানে চেয়ে রইল।মেয়েটা হেসেই চলল।

ছেলে: এই নদীর পাড়ের পার্কটা আমার জন্য একটা কুফা। একদা আমি মোটা ছিলাম না। আমার ওজন ছিল ৭৫ কেজি। তখন এখানে বসে আমি  কক খেলছিলাম। হঠাৎ আমার বয়সী এক বেদে মহিলা আমার কলার চেপে ধরে বলল,,”মাইয়া বিয়া দিমু। একশ টাকা দে।” আমি তো অবাক। তবে সেটা কি এভাবে পাবলিক প্লেসে আমার কলার চেপে ধরার জন্য,নাকি আমার বয়সী একটা মেয়ে তার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য সাহায্য চাইছে সেজন্য বুঝলাম না।তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, এক টাকাও দেব না।

মেয়ে: তারপর?

ছেলে: মহিলা আমাকে অভিশাপ দিয়ে গেল,”তোর বউ আরেক বেটার লগে ভাগবে।”

মেয়েটা আবার হেসে দিল। 

ছেলে: তবে এখন তো মনে হচ্ছে অভিশাপটা ফলবে না।

মেয়ে: কেন? কেন?

ছেলে: বিয়েই তো হবে না। কারণ মেয়েদের চোখ সবার আগে পড়বে আমার ভুড়িতে। বিয়ে না হলে বউ কেমনে অন্য লোকের সাথে ভাগবে? আমি এর চেয়ে সুফি হব। জঙ্গলে যাব।

মেয়ে: এটা একটা ভাল ডিসিশন যদিও।

ছেলে ব্যাথাতুর নয়নে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়ে: আমার এই পার্কে আসলে একটা কথাই মনে পড়ে। একটা সিনেমার পোস্টার। সাকিব খান চ্যাগাইয়া দাঁড়িয়ে আছে। আর ওর দুই নায়িকা ওর গা বেয়ে উঠতেছে। কিন্তু সাকিব খান এর গেট আও জেন্টলম্যান দের মত। গলায় শিকল। ভ্রু ফুটানো,,,,

ছেলে: আমি কল্পনা করতে পারছি,থ্যাংকস। তবে আশ্চর্য হচ্ছি কোন জিনিসটা বেশি আজগুবি? একটা সুন্দরি মেয়ের মুখে “চ্যাগানো” কথাটা,নাকি সাকিব খানের গা বেয়ে মেয়েদের বেয়ে ওঠাটা,নাকি জেন্টলম্যানরা গলায় শিকল পরে এই কথাটা।

মেয়েটা এবার হাসতে হাসতে এক পর্যায়ে বলল,”আমার গাল ব্যাথা হয়ে গেছে হাসতে হাসতে। কতদিন এভাবে হাসিনি।”

ছেলেটা কিছু বলল না।

মেয়েটা আকাশের দিকে চাইল। বলল,,”মেঘ অনেক।বৃষ্টি হবে তো।”

ছেলে: হোক,ভিজব একসাথে।

মেয়ে: ভিজব নে। তবে আগে কথা দিতে হবে, কুরবানি ঈদের আগে ওজন ৮০ কেজির কম করবেন।

ছেলে: (আশা জাগিয়ে)  তারমানে আজই শেষ না? আশা আছে আমার?

মেয়ে: (কিছু না বলে)  চলেন ওখানে আপনার ওয়েট মাপিয়ে আসি।

ছেলে ভাবল ডেটিং এক্সপার্ট এর মতানু্যায়ী যদি দেখা যায়, ওজন আসলে ৯৫ কেজি না,সেঞ্চুরি করেছে তাহলে? না,থাক,আজ আর অপমানিত হওয়া যাবে না।

ছেলে : কখনওই না। আপনার সামনে আমি ওজন মাপাব না?

মেয়েটা ছেলেটার হাত ধিরে টানতে লাগল। ছেলে বলল,,”না,নেভার”

মেয়ে: পাবলিকের মার খাওয়াব কিন্তু ওজন না মাপালে।

ছেলে সুবোধ বালকের মত ওজন মাপাতে গেল।

তবে ওজন মেশিনে ওঠার আগেই ওজন মেশিনওয়ালা ছেলের হাত পা ধরে বলল,,”ভাই,আপনি মেশিনে উইঠেন না,আমার মেশিন ভাইঙ্গা যাইব।”

ছেলেটা পার্কের বাইরে চলে এল।মেয়েটা হাসতে হাসতে পিছু নিল।

ছেলে: আর কি যোগাযোগ রাখবেন?

মেয়ে: দেখি, রাখি কিনা।

ছেলে: না রাখতে চাইলে আপত্তি নাই। আজকে মেসেজ দিয়ে বলে দিয়েন,”খালু,আমার নাম্বার ডিলিট করে দেন। আর যোগাযোগ করবেন না।”

মেয়ে : (হাসতে হাসতে) আচ্ছা খালু।

ছেলে মেয়েকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে বাসায় চলে এল।

রাতে ডেটিং এক্সপার্ট ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করল,”কিরে মাম্মা,ডেট কেমন হইল?”

ছেলেটা মোটামুটি সব খুলে বলল।এক্সপার্ট কিন্তু শুধু একটা কথাই বলল,, “কোন রেস্টুরেন্ট এ নিতে চাইছিলি?”

ছেলেটা নাম বলতেই বলল,,”হালার পো হালা,তুই রেস্টুরেন্ট এ নিবি পরের দি  তো ফোন দিয়া কবি,,আমি তাইলে আগেই কইতে পারতাম। বলদ,পেপার টেপার পরছ? ওই,রেস্টুরেন্ট এ খোপ খোপ করা। ওজায়গায় মাইনষে যায়ই আকাম কুকাম করতে।”

ছেলেটা শূন্যদৃষ্টি তে চেয়ে রইল। অবশেষে বুঝতে পারল মেয়েটার তীব্রদৃষ্টির কারণ।

ছেলেটা ওয়েট করে কবে মেসেজ আসবে,”খালু,আমার নম্বর ডিলিট করে দেন।”

কিন্তু সেই মেসেজটা আসে না। বরং উলটা মেসেজের কথাগুলো ওপাশ থেকে “আপনি” থেকে “তুমি” তে পরিণত হয়।

গল্প ৮০

​”কমন জেন্ডার”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

কাহিনীটার নাম “কমন জেন্ডার” না লিখে “প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ” রাখা উচিৎ ছিল। কিন্তু ওই নাম রাখলে একবিংশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করা পিচ্চিসমাজ আমার গল্পের উপর সমালোচনা করতে গিয়ে তাদের বাংলা ব্যাকরণ ফ্রিতে পড়িয়ে আসতে তাগাদা দিত।তাই আর সেই ঝামেলায় গেলাম না। একটা খিচুড়ি গল্পই লিখব এজ ইউজুয়াল। বাংলা ইংলিশ শব্দমিশেলে।

এই গল্পটা ভেবেছিলাম জুবায়েরকে দিয়ে লেখাব। কারণ,যাদের নিয়ে লিখছি,তাদেরকে আমার ভীষণ ভয়। এছাড়া,আমি নাহয় বাইরের অংশ নিয়ে লিখব।কিন্তু জুবায়ের একদম ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল। ওর বর্ণনাটাই ভাল হত। কমেডি না হয়ে সিরিজের অষ্টম কাহিনী অবশেষে একটা এডভেঞ্চার এডভেঞ্চার ভাব আনত।

কিসব ছাইপাঁশ লিখছি। আসলে কাহিনীর ভয়াবহতায় আমার হাত পা কাপছে। জুবায়েরকে দিয়ে না লেখানোর আরেকটা কারণ আছে। আমার সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্ট এর স্যার বলেছিল, “মানুষের মস্তিষ্ক একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে চাপা গ্রহণ করতে পারে,একটা লিমিটের মধ্যে থেকে,এটা ক্রস হয়ে গেলে মানুষ ভায়োলেন্ট হয়ে যায়,কামড়াকামড়ি করে।”

জুবায়ের আবার চাপাবাজির র‍্যাংকিং এ অপ্রতিদ্বন্দ্বী  অনেক আগে থেকেই। সেই ২০০৩ সাল থেকে একচ্ছত্রভাবে চাপাবাজির র‍্যাংকিং এ বিশ্বের মধ্যে আমাদের জুবায়ের শীর্ষে। কিন্তু চাপাবাজ হলেও ওর লেখার সাহিত্যমান আমার চেয়েও ভাল। ওর নিজের তথাকথিত আত্মজীবনী (!) ,( যেটা দুর্জয় এর মতে চাপাজীবনী,আর জিহাদের মতে অমূল্য এক সাহিত্যসম্পদ) “সুপারহিরো জুবায়ের” উপন্যাসের শব্দচয়ন,আর সাহিত্যরস ছিল হৃদয়গ্রাহী। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাত্রাতিরিক্ত চাপাবাজি থাকায় ৩ মাসের জন্য বাংলাদেশে বেস্ট সেলিং বই হলেও সেই চাপা সইতে না পেরে মানুষের ভায়োলেন্ট হয়ে যাওয়ায় দেশে সেবার অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে,তাই বাধ্য হয়ে বইটিকে বাজার থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

এখন যতই সাহিত্যবিশারদ হোক এরকম চাপাবাজকে দিয়ে কি গল্প লেখানো ঠিক? আল্লাহই জানে কি না কি লিখে দেয় ওরে দায়িত্ব দিলে,আর সেটা পড়ে দেশ ও দশের মানুষ আবার রাহাজানিতে লিপ্ত হয়,এর চেয়ে বরং আমিই ভয় ভীতি উপেক্ষা করে ক্রেজি ৪ এর অষ্টম গল্পটা লিখতে বসি।

ক্রেজি ৪ এর অষ্টম গল্প যেহেতু,ক্রেজি ৪ এর সদস্যদের সবার চেনা উচিৎ।  তবে সেদিন শুনলাম আমাদের মেডিকেলের এক বিখ্যাত গাঁজাখোর,ক্লাবের টাকাচোর তার গুণমুগ্ধ বিশাল বাহিনী সমেত সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে আমি ফালতু গল্প লিখি,কেউ পড়তেও চায় না,রুচি নাই। হাতেগোণা ৫ জনের প্রশংসা শুনে নাকি আমি নিজেকে খুব কেউকেটা ভাবি।তাই ভাবছি,সে কেউকেটা জনপ্রিয় গাঁজাখোরের কথা মেনে নিয়েই আমি ধরে নিব,আমার গল্প মোট ৫ জনই পড়ে এবং তাদের ভাল লাগে। তাই যদি মনের ভুলে ৬ষ্ঠ কেউ গল্পটি পড়ে বসে,তার জানার সুবিধার্থে ক্রেজি ৪ কি বস্তু তা আবার বলছি।

ক্লাস এইটে থাকতে আমি আমার ৩ বেস্টফ্রেন্ডকে নিয়ে একটা সংঘ খুলি। আসলে সেসময় থেকে কোনো স্যার বা কোন দুর্যোগ কখনো আমাদের একসাথে থাকা থেকে বিরত রাখতে পারে নাই,তাই এটাকে একটা গ্যাং ধরে নিয়েই নামকরণ করি,ক্রেজি ৪। এর মধ্যে ক্রেজি ১ আমি, রায়হান মাসুদ বিপু ওরফে ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব। একজন গ্রান্ডিউর ডিলিউসন এ ভোগা লেখক,যে কল্পনায় নিজেকে নোবেল প্রাইজধারী সাহিত্যিক ভাবে,যদিও ভক্তসংখ্যা ৫। ক্রেজি ২,  জিহাদুল ইসলাম, ঘাড়ত্যাড়া,এবং যেকোনো জিনিস এনার মাথায় ঢুকতে মিনিটখানেক সময় নেয়। এনার প্রিয় সংলাপ, “এখনো পোলাপানই রয়ে গেলি।” কিন্তু ওদিকে ফোন একদিন রিসিভ না করলে তার মান ভাঙাতে ভাঙাতে আমরা ভাবি,সত্যিই আমি পোলাপানই রয়ে গেছি। ক্রেজি ৩,আপনাদের সবার প্রিয় ওয়ান এন্ড অনলি আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের,ওরফে চাপাবাজ জুবায়ের,আচ্ছা ভাই,জুবা,তেড়ে আসিস না,লিখতেছি সুপারহিরো জুবায়ের,খুশি? 

যাই হোক,, ক্রেজি নম্বর ৪ হল,দুর্জয় দে,বিখ্যাত গার্লফ্রেন্ডপাগলা,ভবিষ্যৎ স্ত্রৈণ।যদিও প্রায় মানুষজন তাকে জামাত শিবির হিসেবে সন্দেহ করে। কথিত আছে,একবার মন্দিরে পূজা দিতে গেলেও  অন্যান্য লোকেরা জামাত শিবির ভেবে পুলিশে খবর দিয়েছিল নাকি।বেচারাকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। বেচারার সেই থেকে অনেক দুঃখ।প্রায়ই বলে,”ইসসস,কেউ যদি আমার ফেইসের জিওগ্রাফি চেঞ্জ করে দিত,তার সাথে আমার  মেয়ে দিতাম ৩০ বছর পর।”

ফালতু পেচাল অনেক হইছে। এবার মেইন কাহিনীতে আসতে হয়। আসলে মেইন কথা হল,মেইন কাহিনীর মাঝেই লুকিয়ে আছে আমার জীবনের মেইন ভয়,তাই এড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু কি আর করার,আমার ৫ জন ভক্তের জন্য কষ্ট করে লিখি। কারণ এই ৫ জন ভক্ত আমার কাছে ৫ মিলিয়ন ভক্তের সমান। গল্প টল্প লেখা ছেড়ে দিলে ৪ জন চলে যাবে,মানে ভক্ত সংখ্যা ঠেকবে একজনে। সেই ভক্ত কখনওই আমার ভক্ত হওয়া থেকে দূরে সরবে না। কারণ,সেই ভক্তটা আমি নিজেই। নিজেই নিজের প্রথম ও শেষ ভক্ত।

ঘটনা শুরু এ বছরের গোড়ায়। আমার ওজন বেড়ে গিয়ে সবে নব্বইয়ের কোঠায় এসেছে। জিহাদের পেট তখন এখনকার চেয়ে ২ ইঞ্চি কম। জুবায়ের একইরকম চাপাবাজ,আর দুর্জয় একই রকম গার্লফ্রেন্ড পাগলা।

জুবায়ের আমাদের ৩ জনকে দাওয়াত দিল ওদের বাসায় দুপুরে খেতে।কিন্তু আসতে বলল,বেলা দশটায়। আমরা অবাক হয়েছিলাম,বেলা দশটায় লাঞ্চ? পরে দেখলাম,না,ও চায় আমরা ৪ জন ত্রিশ গোডাউনে বসে একটু আড্ডা ফাড্ডা দিব।৪ জন একসাথে তো সেই স্কুলের পর বেশি একটা হয়ে ওঠে না। আমি হাসপাতালে ব্যস্ত থাকি ক্লাসে। দুর্জয় ঢাকায় পড়ে,আর জিহাদ একটু কিছু হলেই,”এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি” বলে।মুখ ফুলিয়ে অভিমান করে। তাই অবশেষে ৪ জনকে একসাথে পেয়ে জুবায়ের সকাল সকালই ত্রিশ গোডাউনে নিয়ে গেল। নদীর পাড়ে বসে ১৫ মিনিট ভালই আড্ডা হল।

কিন্তু এরপরেই হঠাৎ জানা গেল দুর্জয় গতদিন ওর গার্লফ্রেন্ড রাগিনীর সাথে ঝগড়া করছে,আর এখন আবার মিল হবার জন্য ফোন দেবার ট্রাই করছে। ফোন  লাগতেই কিছুক্ষণ কথা বলার পর বেচারার ব্যাটারি আইমিন ফোনেরটা ডাউন হয়ে গেল। ফলে আমার ফোন নিয়ে সিম ঢুকিয়ে কথা বলা শুরু করল। একদম মেগা আলাপ যাকে বলে। ও ফোন আজ আর আমার হাতে আসবে না বুঝতে পেরে আমি উঠে গেলাম। উঠেই পিছনে ফিরে দেখি জিহাদের গার্লফ্রেন্ড বান্ধবীদের সাথে এসেছে বেড়াতে। জিহাদ  তৎক্ষণাৎ উঠে গেল ওর গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতে,(যদিও এভাবে বন্ধুদের সময় না দেওয়ায় আমরা কেউই ওকে বলি নি, “এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি।”)।

ব্যস আমি আর জুবায়ের একা পড়ে গেলাম। কি আর করা,দুই জোড়া প্রেমিক প্রেমিকাকে একা ছেড়ে আমরা হাটাহাটি করতে লাগলাম।

হাটতে হাটতে জুবায়ের আমাকে বলতে লাগল,”জানিস,কত্ত মেয়ে আমারে পছন্দ করে? প্রোপোজও করছে,পিছু ছাড়াইতে শেষমেশ আমার ওদের ধমকানো লাগছে। এই যেমন দেখ আজকেও আমাকে একটা মেয়ে বলল আজ আমাকে সে কি যেন বলবে , ওর সাথে যেন বের হই। আমি বললাম, আমার পেট ব্যাথা বের হব না।তারপর তোদের সাথে বের হলাম। আমার বন্ধুরা  আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুঝলি তো।”

আমি প্রমাদ গুণলাম। বিশাল সাইজের চাপা আসছে।এটা একটা প্রারম্ভিকা মাত্র।

জুবায়ের আমাকে ওর জন্য পাগলপ্রায়  আরো কয়েকটা কল্পিত প্রেমিকার চাপাকাহিনী বলতে লাগল। আমি বুঝতে পারছিলাম লিমিট ক্রস হচ্ছে আস্তে আস্তে।কেমন যেন কামড়ানোর একটা আকাঙখা বোধ করলাম ভিতরে।

আমার ফোন দুর্জয় আর রাগিনীর রিইউনিয়ন ঘটাতে ব্যস্ত,হেডফোন দিয়ে যে চাপা প্রতিরোধ করব তার উপায়ও নেই। বাধ্য হয়ে জুবায়েরকে বললাম,,”খবরদার, আর বলিস না জুবায়ের,লিমিট ক্রস করতে বাকি নেই বেশি। এখানে কিন্তু কামড়ানোর মত আশেপাশে কেউ নেই,শেষে কিন্তু তোকেই কামড়াব বলে রাখলাম।”

জুবায়ের ব্যথিত হয়ে বলল,,”দোস্ত,এটা তুই বলতে পারলি? সেই ২০০৩ সালে ক্লাস ৪ থেকে আমারে চিনস,তুই ক,এই জীবিনে আমি কি একটা মিথ্যা কথা কইছি দোস্ত? একটাও চাপা মারছি?”

এরকম একটা ইনোসেন্ট লুক দিয়ে জুবায়ের এমনভাবে কথাটা বলল যে আমি প্রায় বিশ্বাসই করে বসেছিলাম যে নাহ জুবায়ের ছেলেটা চাপাবাজ না,অতি সত্যবাদী। কিন্তু তখনি আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল “সুপারহিরো জুবায়ের” বইয়ের ধাক্কায় এই দেশে সৃষ্ট রাহাজানিরর কথা,তারপর বান্দরবান গামী বাসভর্তি লোকের কামড়াকামড়ির দৃশ্য।

শিগগিরি বলে উঠলাম,,”তুই আমার কাছ থেকে জানতে চাস তুই মিথ্যা বলিস কিনা? চাপা ছাড়িস কিনা? তোর চাপার সবচেয়ে বড় ভিক্টিম এই আমার কাছ থেকে? তোর এত্তবড় সাহস?”

জুবায়ের হঠাৎ একটা সুন্দরি মেয়েকে রিক্সায় দেখল।আমাকে বলল,,”বিশ্বাস করলি না? ওই দেখ,,ওই রিকশায় বসা ওই মেয়েটা আজকে আমাকে বলছে কি জানি বলবে,প্রোপোজ করতে। আমি না বললেও মনে হয় প্রোপোজ প্রাকটিস করতে একাই এসেছে।”

আমি তৎক্ষণাৎ ওর চাপা ধরিয়ে দিতে চিল্লিয়ে ডাকলাম,,”এই রিকশায় বসা সুন্দরি আপু,এই যে জুবায়ের?”

জুবায়ের আতংকিত চোখে আমার দিক তাকাল। ভাবতেও পারে নি ওর চাপা ধরতে এই পদক্ষেপ নেব। সাথে সাথে সেই সুন্দরি আপু রিকশা থেকে উকি দিল আর,রিকশা থেকে নেমে আমাদের দিক আসতে লাগল।

আমি আর জুবায়ের দুইজনই অবাক। আপু এদিক আসছে কেন? আর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথা,এভাবে হেলেদুলে কেন হাটছে?

আপু আমাদের একদম কাছে এসে হাতে একটা  তালি দিয়ে বলল,,”এ্যাই চ্যালেরা,তোমরা কিবাবে বাবলে আমার নাম সুন্দরি? এ্যাই,বলো না,কিবাবে?”

এই মাথা ছুয়ে বললাম,জুবায়ের,জিহাদ আর দুর্জয়ের গার্লফ্রেন্ডদের কসম সুপ্রিয় পঞ্চপাঠকবৃন্দ,,, আমার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। বুক ধড়ফড় শুরু করল,গলা শুকিয়ে গেল,সারা শরীর হিস্টিরিয়ার মত কাপতে লাগল। আমার সারাজীবনের একমাত্র ভীতি, সশরীরে আমার সামনে দাঁড়ানো,,, হিজরা।

জুবায়ের ততোধিক আতংকিত দৃষ্টিতে আমার দিক তাকাল।আমিও জুবায়েরের দিকে তাকালাম।

হিজরা আপু আবার পুরুষ কন্ঠে বলল,,”এ্যাই,দুষ্টু চ্যালেরা,কতা বলচ না ক্যানো?”

আমার শ্বাস উঠে গেল।আমি জুবায়েরকে বললাম,” দোস্ত,ইনি তোকে আজ প্রোপোজের জন্য দেখা করতে বলছে?তোর জুনিয়র, না? বরিশাল ভার্সিটির সেরা সুন্দরি?”

সুন্দরি আপা আবার বলল,,”এ্যাই চ্যালেরা,আবার আমার নাম বলছ ক্যানো?”

জুবায়ের ঘুরেই একটা দৌড় দিল।আমিও পিছে পিছে দৌড় দিলাম চিল্লিয়ে বললাম,,”জুবা,একটু দাড়া ভাই,আমাকে ফেলে যাস না।”

জুবায়ের বলল,,”দোস্ত পরে কথা বলছি।বড্ড প্রকৃতি ডাকছে রে,আমার কোথাও বসে তাকে সাড়া দিতে হবে।”

ও তো হালকা পাতলা মানুষ। এক ছুটে হারিয়ে গেল। আমি তো পারলাম না। সুন্দরি আইয়া,অথবা ভাপা আমাকে পিছ থেকে জাপটে ধরল। বলল,,”এ্যাই দরেছি,, এ্যাই চ্যালে,যাচ্চ কোতায় এ্যাভাবে? পাচশ টাকা দাও একনি।”

আমি বললাম,,”আমি আম্মুর কাছে যাব,আম্মুউউউউ।”

সুন্দরি আইয়া অথবা ভাপা আমাকে কিঞ্চিত সময়ের জন্য ছেড়ে দিল তার হাতে সেই একটা ট্রেডমার্ক তালি দিতে। এই ফাঁকে আমি আল্লাহু আকবর বলে দিলাম দৌড়।

একদৌড়ে একটা অটোতে উঠে বললাম,,”কাক্কু,আপনি আমার আপন কাক্কু,,,শিগগিরি গাড়ি টানেন।”

কাক্কু পিছে হিজরা দৌড়াতে দেখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে একটানে অটো বান্দরোডে নিয়ে নিল।আমি আর কাক্কু  হাফ ছেড়ে বাচার ভঙ্গি করতে দেখি,সেই হিজরা আরেকটা অটো নিয়ে আমাদের অটোর পিছু নিয়েছে। সেই অটো আবার অনেক শক্তিশালী।

কাক্কু আতংকিত গলায় বলল,,”ভাই,আপনি নামের আমার অটো থেইকা,আপনার জন্য ওই জিনিসটা আমার পিছু নিচে,নামেন কইতাছি।”

আমি বললাম,, “কাক্কু,এভাবে বইলেন না কাক্কু,আমরা মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই,কাক্কু। আরেক ভাইয়ের বিপদে পাশে দাড়ান প্লিজ কাক্কু।”

কাক্কু আমার হৃদয় ভেঙে বলল,,”আমি হিন্দু।এইবার নামেন।নইলে কিন্তু আমি চিৎকার করব আপনি ছিনতাইকারী। ”

আমি চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে একটা বালিকা বিদ্যালয়ের গেটে ঢুকে ঝোপঝাড় এর মধ্যে ঢুকে রইলাম।কোনা দিয়ে দেখলাম  কাক্কুর অটোর পিছপিছ হিজরাটা গেছে। আমাকে আর দেখে নি।

হঠাৎ আজবকিছু সাউন্ড শুনলাম। পাশে ফিরে দেখি,ঝোপের মধ্যে ঢুকে কয়েকজন বালিকা মোবাইলে বিশেষ ভিডিও দেখছে।

আমি দেশ ও জাতি এই বিশাল আধুনিকায়ন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সচক্ষে দেখা আর মনে হিজরাভীতি এই দুই প্রেশারে স্যান্ডুইচ হয়ে অধিক শোকে পাথর হয়ে ফ্রাংকেনস্টাইনের সেই সত্যিকার এর কুৎসিত দানবের মত অনুভূতিহীন জোম্বি হয়ে হাটতে লাগলাম।

বাসায় ফিরে আমি সেরকম অধিক শোকেই পাথর হয়ে বসে রইলাম। আব্বু আম্মু এত জিজ্ঞেস করে কি হইছে কিছুই বললাম না। 

হঠাৎ জুবায়ের বাসায় ঢুকল,ঢুকেই হম্বিতম্বি করে বলল,,”পাইছস কি তুই? কথায় কথায় রাগ করস? রাগ কইরা কিছু না বইলা চইলা আসছস? এক থাপ্পড় দিব কানের দুই ইঞ্চি নিচে,দাত খুলে পড়বে।”

আমি কোনটায় অবাক বেশি হব বুঝতে পারলাম না। কানের দুই ইঞ্চি নিচে থাপ্পড় মারলে দাত কেমনে পড়ে সেই মেকানিজম চিন্তা করে,নাকি জুবায়ের আমারে বিপদে ফেলে ভেগে যাবার পর এভাবে বাসায় এসে হম্বিতম্বি করে আরেকটা চাপা মারল বলে,নাকি জুবায়েন এরকম একটা চাপা মেরেও আমার সামনে যে ভয়াবহ ভাবে ধরা খেয়েছে সেটা ভুলে ও আবার আমাকে মুখ দেখাতে এসেছে বলে।

যাই হোক,অনেক ভেবে বুঝলাম, আমার অবাক হবার অনুভূতিটাই নেই।

আমি আমার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। দাওয়াতে আর গেলাম না। শুনলাম জুবায়ের চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে আব্বু আম্মুকে চাপা শোনাচ্ছে কিছু। ভয় হল,আব্বু আম্মুও না ভায়োলেন্ট হয়ে যায়।

ভয়টাই ঠিক হল,আব্বু ওই চাপা শুনে ভায়োলেন্ট হয়ে আমাকে এসে কথা শুনাল,,,”ঘরে বসে থেকে ছেলেটার বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে কোন জ্ঞান হল না। বাইরের মানুষের সাথে ডিলিংস কি জিনিস সেটাই বোঝে না।”

এদিকে জুবায়ের দুর্জয়ের কাছ থেকে আমার ফোন নিয়ে এসেছিল। শুনলাম,আমি চলে আসছি বলে জিহাদ আবার আমাকে বলছে,”এখনো বাচ্চাই রয়ে গেল” এ বলে মুখ ফুলিয়ে অভিমান করে আছে।

আমি আমার জামা খোলার সময় হঠাৎ দেখলাম,আমার জামার হাতার বোতামে একটা লকেট ঝুলে আছে। চেইনটা মনে হয় সোনার। তখন আমি বুঝলাম, কেন ওই হিজরা বেডি আমারে অত তাড়া করছিল। আমাকে জাপ্টে ধরে ৫০০ টাকা আদায় করতে গিয়ে সে খেয়াল করেছিল তার ৫০০০ টাকার জিনিস আমার কাছেই চলে আসছে। এটা একটা হিজরার গলায় ছিল ভেবে ভয়ে শিউরে উঠে ফেলে দিলাম মেঝেতে।

সাথে সাথে টকাস করে লকেটটা ফেটে গেল। আর একটা মেমোরি কার্ড বের হল।

সাথে সাথে আমি ক্রেজি ৪ এর সবাইকে ইমিডিয়েটলি দেখা করতে বললাম। জুবায়েরের বাসায় দাওয়াত খেয়ে ওরা ফিরছিল,অল্প কথায় সব বলতেই ওরা চিলে আসল। জুবায়ের আসতেই চোখ গরম করলাম আমি।ফর্মে ফিরে আসছি দেখে জুবায়ের মাথা নিচু করে ফেলল।

জিহাদ বলল,,”কই দেখা মেমোরি কার্ড।এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি?”

আমি এর মধ্যেই মেমোরি কার্ড ওর হাতে দিতে গেছিলাম। কিন্তু শেষ কথাটা বলার কারণ অনুসন্ধান করতে কনফিউশন এ পড়লাম।

দুর্জয় বলল,,”মেমোরি কার্ড নিয়ে পড়লি কেন? আমার ধারণা সোনার চেইন গেছে দেখে তোরে তাড়া করছিল।”

জিহাদ চেইনটা দেখে বলল,,”নারে দুর্জয়, এটা সোনা না,ইমিটেশন,আমি চিনতে পারি এগুলো। বোনের জন্য কিনতে গিয়ে শিখছিলাম এক স্বর্ণকারের কাছে,কিভাবে চিনা যায় দেখেই।”

জুবায়ের বলল,,”তাইলে মেমোরি কার্ডের জন্যই তাড়া করছে তোরে? কি এমন আছে এই কার্ডে?”

আমি বললাম,”একা দেখতে সাহস পাই নি, তাই তোদের ডাকছি।”

জিহাদ বলল,,”এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি।”

জিহাদ আমার কার্ড রিডারে মেমোরি কার্ড ভরে আমার ল্যাপটপ এ ঢুকাল। সাথে সাথে আমরা দেখলাম, কার্ডে বরিশালের বিখ্যাত শিল্পপতি মফিজ মিয়ার ছেলে স্টাইলিশ বয় বক্করের পুরো স্টোরি,রুটিন দেওয়া। মানে সে কোথায় যায়  টায়,কখন কি করে। সবকিছুর তথ্য।

আমরা চার বন্ধু অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম,হিজরাটা বক্করের কাছে কি চায়।

জিহাদ বলল,,,”বক্করের কাছে যাই চল,দেখি কি এমন রহস্য এতে”

আমি বললাম,,”তোরা যা,আমি অসুস্থ বোধ করছি।”

ওরা সবাই আমার দিক তাকিয়ে রইল।

আমি বললাম,,”মামা,আমি হিজরা ভয় পাই,ভাই অনেক।আমারে তোরা মাফ কর। হিজরা রিলেটেড কিছুতে আমারে টানিস না।”

জিহাদ ওর এক ভুরু উচাল। দুর্জয় চিবুক চুলকাল,বুঝলাম হিজরার ব্যাপারে ওরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কিন্তু জুবায়ের অট্টহাসি হেসে উঠল।বলল,,”হালায়,হিজরা ভয় পায়,,হো হো হো,,, আরে শোন,,একবার একটা হিজরারে কি করছি,,,”

এট্টুকু বিলার আগেই আমি চোখ গরম করে ওর দিক তাকালাম। জুবায়ের চুপ হয়ে গেল।

যাই হোক,অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমরা সবাই স্টাইলিশ বয় বক্করের ক্যাম্পাসে গেলাম। ওর প্রতি হিজরাদের এত আগ্রহ কেন বুঝতে।

ওর কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। প্রায় ২০/৩০ টা হিজরা কলেজের প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে হাত তালি দিয়ে নাগিন ড্যান্স দিচ্ছে। কলেজের স্যারদের তা দেখে চোখ বন বন করে ঘুরছে।

এদিকে ছাত্রছাত্রীরা ভয়ে সিটিয়ে আছে ক্লাস রুমের সামনে। অনেক সাহসী পোলাপান হিজরাদের ভয় পায় না বলে মেয়েদের সাথে হাসাহাসি করছে।বাট নাগিন ড্যান্স দিয়ে হিজরারা ওদের দিক ধেয়ে যেতেই মেয়েদের পিছে পালাচ্ছে।

এই ছেলেগুলোর মধ্যেই হঠাৎ আমি স্টাইলিশ বয় বক্করকে দেখলাম। বক্কর এসব দেখছে না। সে তার আই ফোন নিয়ে কোণার বিল্ডিং এর দোতলার বারান্দায় গুঁতাগুঁতি করছে।

আমার মনে পড়ল।মেমোরি কার্ডে লেখা ছিল,,বক্কর জটলা পছন্দ করে না। সে একা একা থাকতে পছন্দ করে।

আমার মাথায় একটা অসম্ভব কথা খোচা দিল। বক্কর বড়লোকের ছেলে। হিজরারা ওর ব্যাপারে সব তথ্য মেমোরি কার্ডে রেখেছে। এবং কাকতালীয়ভাবে এখনি হিজরারা ক্যাম্পাসে এসে নাগিন ড্যান্স দিয়ে কলেজের প্রত্যেকটা প্রাণিকে তটস্থ করে রেখেছে। বক্কর লিটারেলি এখন সম্পূর্ণ নির্জন একটা জায়গায়। কেউই ওকে দেখছে না।

আমি জিহাদ,দুর্জয় আর জুবায়েরকে বললাম,,”ওই দেখ বক্কর। শোন,আমার কেন জানি মনে হচ্ছে,কাকতালীয় ভাবে আমরা একটা অপহরণ কেইসে ফেসে গেছি।”

জিহাদ বলল,,”মানে?”

আমি বললাম,,”দেখ,বক্কর সম্পর্কে এমন তথ্য রাখা ছিল কার্ডে,যা নরমাল্লি কিডন্যাপাররা রাখে। আবার হিজরাদের কাছে ছিল কার্ডটা। এখন এসে দেখলাম হিজরারা কলেজে এসে নাচানাচি করে সবাইকে তটস্থ করে রাখছে।সবাই ভয় পেয়ে ওদেরই দেখছে। বক্কর একা। এমন তো হতে পারে,হিজরারা ওকে কিডন্যাপ করতে এসেছে। এতদিন খোজ নিয়ে এখন ক্যাম্পাসে এসে সবাইকে ডায়ভার্ট করে সুযোগ পেলে ভাগবে বক্করকে নিয়ে?”

ওরা সবাই ভাবল কিছুক্ষণ। জিহাদ বলল,,”হুম, ৫১% সম্ভাবনা আছে সেটার।”

আমি কিছু বললাম না,পাছে আবার বলে আমি বাচ্চা। আমি বললাম,,”দুর্জয় তুই নিচে থাক,সমদেহজনক কাজ যদি কেউ করে,মানে ধর নাগিণ ড্যান্স বাদ দিয়ে কোন হিজরা সরে গেলেই আমাকে ফোন দিবি। জিহাদ,জুবায়ের আর আমি উপরে গিয়ে বক্করের সাথে ভাব জমানোর ট্রাই করি।”

আমরা দোতলায় গেলাম। বক্কর আইফোন টিপতেছে একমনে। জিহাদ বলল,,”হ্যালো বক্কর।”

বক্কর বলল,,”হেই ড্যুড,ডু আই নো ইউ? ডোন্ট কল মি বক্কর,ইটস বিকি।”

জিহাদের মুখ অটোমেটিক ভেচকিয়ে গেল। জুবায়ের পদক্ষেপ নিল,কিছুক্ষণ একটু চাপাবাজি করে বক্করের সাথে ভাব নিয়ে ফেলল।

আমি আর জিহাদ ওদের একা রেখে বারান্দার অন্যপাশে গিয়ে হিজরাদের গতিবিধি দেখতে লাগলাম।

হঠাৎ জিহাদ বলল,,”বিপ,ওই দেখ।”

আমি বললাম,”কি?”

ও বলল,,”ওই লোক দুটা,ওই যে গুন্ডার মত চেহারা।”

আমি দেখতে পেয়ে বললাম,,”ওরা কারা?”

জিহাদ বলল,,”ওরা ভাড়াটে মাস্তান,বুঝলি? বিভিন্ন পার্টি ওদের টাকা দিয়ে ভাড়া করে মারামারি,ছিনতাই,ডাকাতি,অপহরণ এসব করায় পুকিশের সাথে ওদের খাতির আছে,ধরা কখনো খাইলে টাকা পয়সা দিয়ে বের হয়।”

আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম,নাগিন ড্যান্সের ভিতরে থাকা এক হিজরা হঠাৎ থেমে গিয়ে আমার দিক চোখ বট করে তাকিয়ে আছে,সাথে সাথে চিনে গেলাম এটা সকালের সেই হিজরাটা।শিগগিরি নাচ থামিয়ে হিজরাটা আশেপাশের হিজরাদের কানেকানে কি যেন বলে আমাকে দেখাল। প্রত্যেকে আমার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। বাকিরা ড্যান্স চালাতে লাগল।

এদিকে দুর্জয় লাল শাড়ি পড়া একটা বয়স্ক হিজরার পিছে পিছে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। হিজরাটা সেই ভাড়াটে গুন্ডাদের কি যেন বলল,,,গুন্ডারা বারান্দায় একবার তাকিয়ে মাথা নাড়াল।। এটা দেখেই দুর্জয় এক ছুটে দোতলায় আসতে লাগল। আর নাগিন ড্যান্স থেকে সকালের সেই হিজরা তার ৪ জন সাথী নিয়ে উপরে উঠতে লাগল। খেয়াল করে দেখলাম সকালের মত হিজরাদের ট্রেডমার্ক হেলেদুলে হাটছে না এরা।বরং শক্ত পদক্ষেপে হেটে আসছে। দুর্জয় আগে উঠল,বলল,,”বক্কররে লুকা,, ওই গুন্ডাদের ওই লাল হিজরাটা বলছে উঠিয়ে নিতে,ওরে কিডন্যাপ করবে।”

বক্কর বুঝতে পেরে অসহায়ের মত আমাদের দেখতে লাগল।বলল,,”আপনারা কি পুলিশের লোক? আমাকে বাচাবেন?”

আমরা কিছু বললাম না। আমি জিহাদকে বললাম,,”শোন সকালের সেই হিজরাটা বুঝে গেছে আমি মেমোরি কার্ড দেখে ফেলছি ও আসতেছে। এটা একটা অপহরণকারী চক্র রে। ও আসতেছে আমাকে কিডন্যাপ  করতে। বাট আমাকে ছাড়বে না,মেরে ফেলবে।”

জিহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। হিজরাগুলো দোতলায় উঠে গেল। দুর্জয় আর জিহাদ লাফিয়ে পড়ল ওদের উপরে। হিজরারা একটুও হিজরাদের মত করতেছে না। প্রত্যেকের কন্ঠ ভরাট।চোখে ভয়ংকর দৃষ্টি। আমি শিগগিরি একটা টেবিলের নিচে গিয়ে লুকালাম। দেখলাম জুবাউএর আগেই ওখানে বসে আছে।

আমি বললাম,,”দেখ জুবা,আমার এদের বিশাল ভয়,তুই যা,,আমাকে লুকাতে দে।”

জুবায়ের বলল,,, “দেখ,প্রত্যেকবার আমি লুকাই,তুই এবার লুকাতে চাস কেন?”

আমি বললাম,,”প্রত্যেকবার লুকিয়ে পরে বলিস শটগান খুজতে খাটের নিচে ঢুকছিলি। শোন,এবার ব্যপার সিরিয়াস। এখান থেকে সর।”

হঠাৎ খেয়াল করলাম, বক্কর বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে দুর্জয় আর জিহাদের হিজরা ফাইট দেখছে। আর সেই ভাড়াটে গুন্ডারা ওর পাশে চলে এসেছে।

কিন্তু এ কি,বক্করকে না ধরে ওরা এই টেবিলের দিক আসছে কেন?

গুন্ডারা টেবিল জাগিয়ে ছুড়ে ফেলল। তারপর জুবায়েরকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেল। জুবায়ের চেচাতে লাগল। 

আমি বুঝে গেলাম। বক্কর আর জুবায়ের কথা বলতেছিল। লাল হিজরা গুন্ডাদের বক্করকে দেখালেও গুন্ডারা জুবায়েরকে বক্কর ভেবেছে।

আমি কিছু বলার আগেই একটা মাইক্রোতে করে জুবায়েরকে নিয়ে ওরা পালিয়ে গেল। সাথে সাথে লাল হিজরা বাশিতে ফু দিল। সবকটি হিজরা নাগিন ড্যান্স রেখে মুহুর্তে ক্যাম্পাস ফাকা করল। দুর্জয় আর জিহাদ  এর সাথে মারামারি করা হিজরারা আমার দিক একবার অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে চলে গেল। কিন্তু কেউই বক্করকে দেখল না।

এদিকে হিজরারা চলে যেতে আমি বললাম,,”ওই ওরা তো বক্কর ভেবে জুবায়েরকে ধরে নিয়ে গেছে।”

জিহাদ,আমি আর দুর্জয় হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম।

যাক গে,বক্করকে আমরা ওদের বাসায় দিয়ে আসলাম। বক্করের মা কেঁদে কেটে ছুটে এসে বক্করকে জড়িয়ে বলল,,”ও বক্করে বাপ,এই তো আমাগো বক্কর,তোমারে তাইলে ফোন দিয়া টাকা চায় ক্যা?”

মফিজ মিয়া চিন্তিত মুখে এসে বক্করকে এসে হাফ ছেড়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। তারপর বলল,,”ওরা যে মাত্র আমাকে ফোন দিয়ে দুই কোটি টাকা চাইল?”

জিহাদ বলল,,”হিজরারা?”

মফিজ মিয়া বলল,,”হিজরা? কই হিজরা? আমার কাছে কয়েক সপ্তাহ ধরে চাদা চাইতেছিল একটা ছাত্রসংগঠন। ওরা বলল,এতদিন চাদা দিই নাই,এবার আমার ছেলেকেই নিয়ে গেছে। এবার টাকা না দিয়ে যাব কই।”

সাথে সাথে মাথা খুলে গেল। এত্ত বুদ্ধি? নিজের ছাত্রসংগঠনের উপর যাতে দোষ না পড়ে।সরকারের দুর্নাম যাতে না হয়। তাই চাদা চেয়ে ক্ষান্ত হয়ে শেষে হিজরা সেজে অপহরণ?  হিজরাদের সবাই এড়িয়ে চলে। কেউ সন্দেহ করবে না। তাই প্রতিশোধ নিতে হিজরা সেজে অপহরণ করে মুক্তিপণ?  বাপ যে পুলিশের কাছে যাবে সেই প্রমাণ তো নেই। ফোনে জাস্ট বলছে। সবাই সাক্ষী দিবে হিজরারা ছেলে অপহরণ করছে।ওদিকে তারা তো রিয়েল হিজরা না।পুলিশ শুধুশুধু হিজরাদের হয়রানি করবে। সব দিক দিয়ে চাদাবাজ কিডন্যাপাররা সেইফ।টাকা না দিয়া যাবা কই?

কিন্তু বাদ সাধলাম আমরা ক্রেজি ৪। একটু বাড়াবাড়ি করতে মজা নিতে হিজরা সাজা এক লোক আমাকে জড়িয়ে ধরছে আজ,ভাগ্যের পরিহাসে যে লকেটে অপহরণ এর প্লানওয়ালা কার্ড রাখা ছিল সেটাই আমার কাছে রয়ে যায়। আমরা যাই অচেনা বক্করকে বাচাতে। বাচাতে পারি বটেই।বাট ভুল বোঝাবোঝিতে আমাদের এক বন্ধুকে নিয়ে যায় ওরা। এবার যদি জানে যে এটা বক্কর না,তাহলে কি হবে জুবায়েরের? শিউরে উঠলাম।

আমরা মফিজ মিয়াকে সব বললাম। মফিজ মিয়া বুঝল,আমরা না থাকলে তার ছেলেকে আর পাওয়া হত না। সে বলল,”তোমাদের বন্ধুকে বাচাতে আমরা সব করতে রাজি।”

আমি বললাম,,”দুই ভাড়াটে গুন্ডা ওকে ধরে নিয়ে গেছ্র। হিজরা সেজে থাকা ছাত্রনেতাকর্মীরা যতক্ষণে ওদের কাছে যাবে। ততক্ষণ এ বুঝে যাবে ও আপনার ছেলে না।তাই এর আগেই আমাদের ওই গুন্ডাদের খুজে বের করতে হবে। ভাগ্যের বিষয়,ওদের জিহাদ চেনে,ওরা জিহাদের বাসার এলাকাতেই থাকে। ভাড়া করে ওদের দিয়ে কাজ করানো হয়।পুলিশকে ঘুষ দেয় বলে পুলিশ ওদের ঘাটে না। আপনি যদি আপনার পরিচিত ক্ষমতাবান কাউকে দিয়ে,,,,”

মফিজ মিয়া বলল,,”থাক,আর বল না,বুঝছি,আমাকে কয়েকটা ফোনকল করতে হবে।”

আধঘণ্টার মধ্যে ভাড়াটে গুন্ডাদের গ্রেফতার করা হল। ততক্ষণে রাত হয়ে এসেছে। ভাড়াটে গুন্ডাদের একটু ডলা দিতেই তারা বলে ফেলল,”ছেলেটা যে বক্কর না,ওরা বুঝতে পেরেছে। তাই প্রমাণ মুছতে ওকে নদীর পাড়ে ইটের ভাটার চুল্লিতে পুড়িয়ে মারবে আজ রাতে।”

আমাদের হৃৎপিন্ড গলায় চলে এল শুনে। পুলিশ বলল,,”কোন ইটের ভাটা?”

ওরা বলল,,”তা তো জানি না”

এখন নদীর পাড়ে অনেক ইটের ভাটা আশেপাশে মানুষ আছে বলে ওরা রাতের অন্ধকারের অপেক্ষা করবে জুবায়েরকে খুন করতে। কিন্তু এর আগেই পুলিশ গেলে ওরা সাথে সাথেই কিছু একটা করে বসতে পারে। তাই পুলিশ সাদা পোশাকে গেল এলাকার উপর নজর দিতে।

আমি,জিহাদ আর দুর্জয় করলাম অন্য প্লান। আমরা আমার সারাজীবনের ভীতি,সেই রিয়েল হিজরাদের খুজে বের করলাম। করে তাদের বললাম,”ইটের ভাটাগুলোতে আজ অনুষ্ঠান হবে কোন বার্ষিকী উপলক্ষে। তোরা গিয়ে টাকা চাইলে দেবে।

এটা বলার সাথে সাথে কথাটা সারা বরিশালের রিয়েল হিজরাদের মধ্যে চাইরাল হয়ে গেল। তারা হাততালি দিয়ে ছাইয়া ছাইয়া ড্যান্স দিতে দিতে ইটের ভাটার গুলোর দিকে রওনা দিল।

 শয়ে শয়ে হিজরা ইটের ভাটায় হামলে পড়ল। আমরা ওদের পিছ পিছ ঢুকতে লাগলাম ভাটাতে। আগেই প্লান জানিয়েছি পুকিশকে,সাদা পোশাকে ওরাও পিছে আসতে লাগল। 

এভাবে একটা ইটের ভাটায় ছাত্রসংগঠনের ২০/৩০ জনকে পেলাম।সাথে মহিলাদের শাড়ি আর সাজ পোশাক। হিজরারা সেটা দেখে তো বিশাল খুশি।ভাবল ইটের ভাটায় বুঝি বিয়ে হচ্ছে,ওরা জেকে বসল নেতাকর্মীদের উপর। এই ফাকে আমি,জিহাদ আর দুর্জয় আসন্ন মৃত্যুভয়ে কম্পমান অর্ধমৃত জুবায়েরকে হাত পা বাধা অবস্থায় পেলাম।উদ্ধার করলাম।

পুলিশ সব অপহরণকারীকে হিজরাদের ড্রেস আর প্রসাধন সমেত প্রমাণসহ গ্রেফতার করল।

কিন্তু টাকা না পেয়ে ক্ষুণ্ণ হয়ে হিজরারা আমরা ক্রেজি ৪ এর উপর চড়াও হল।

আতংকিত হয়ে আমি,জিহাদ, দুর্জয় আর জুবায়ের কীর্তনখোলা নদীতে লাফ দিলাম।

গল্প ৭৯

​”একটি অনুর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা”

মস্তিষ্কের মালিক: ফ্রাংকেস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১. নায়কের কথা

সেদিন রাত ১ টার সময় সি এন্ড বি রোড দিয়ে হেটে আসছিলাম। আসলে বাসায় আম্মু আর আব্বুর সাথে ঝগড়া করে বের হয়েছিলাম ১১ টার দিকে। আমার আবার রাগ হলে অন্ধকার নির্জন রাস্তায় হাটতে ইচ্ছা হয়,২/৩ ঘন্টার হাটাহাটি মস্তিষ্কের জন্য খুবই এফেক্টিভ। এটা রাগকে কমিয়ে দেয়। বাসা থেকে যদিও অনেকগুলো ফোন এসেছে। ধরি নি,ফোন ধরলে রাগ কমানোর এই চেষ্টাটা বৃথা হবে।

হঠাৎ প্রায় দশ হাত দূরে একটা সাদা অবয়বকে রাস্তায় শুয়ে থাকতে দেখলাম। দেখেই ভাবলাম সিওর ভূতপ্রেত,ভূত এফ এমের গল্পের মত,রাত একটায় সাদা কাফন পড়ে রাস্তার মাঝে শুয়ে থাকে,পড়ে সাহস দেখিয়ে উক্ত ব্যক্তি ওই জিনিসটার কাছে গেলে দেখা যায়,মৃত লাশ তার চেহারা নিয়েই হা হা করছে।

ঘুরে দৌড়ে ৫/৬ পা দূরে যেতেই মনে হলে,আহা এ কি,এতক্ষণে তো ভূত এফ এম লজিকে সেই সাদা জিনিসটা আমার সামনের ওই বটগাছের মাথায় থাকার কথা।

পিছে ফিরে দেখলাম,সাদা অবয়বটা এখনো ওখানেই শোওয়া। 

আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। এর আগে ভূত এফ এমে পাঠানো আমার দুইটা ঘটনা রিজেক্ট হয়েছে। এটা যদি রিয়েল ভূত হয় দেখাই যাক এবারের বর্ণনা রাসেল ভাই প্রচার করতে পারে,একটা ভৌতিক অভিজ্ঞতার এটেম্পট নেওয়াই যাক।

আমি ধীরে ধীরে সাদা অবয়বটার কাছে গেলাম। দেখি,ওটা একটা দেহ,উবু হয়ে আছে,পিঠে বড় বড় তিনটা আঘাত। রক্তে সাদা পাঞ্জাবী লাল হয়ে গেছে,শরীর থেকে একটা হাত বিচ্ছিন্ন।আরেকটা হাতের বাহু থেকে মাংস গ্রিন্ডারের মত ফালা ফালা করা হয়েছে।

মাথায় আরেকটা কোপ,সেখান থেকে মগজ বের হচ্ছে।

লোকটাকে আমি উল্টালাম। চোখটা খোলা,মৃত সেই চোখে সীমাহীন কষ্ট।

আমি লোকটার পকেট হাতড়ালাম। পকেটে মোবাইল,মানিব্যাগ, হাতে একটা সোনার আংটি আছে। মানিব্যাগে ৪০০ টাকা।আর একটা খুবই সুন্দর একটা মেয়ের দুইটা ছবি,একটা একটু পুরনো, মেয়েটার বাচ্চা অবস্থার,আরেকটা বড়,মেয়েটার বর্তমান ছবি। বোঝা গেল ভদ্রলোক তার মেয়েকে অনেক ভালবাসে।

পকেট থেকে কিছু সরানো হয় নি। মানে ডাকাতি বা ছিনতাই না। পরিকল্পিত খুন। আমি কি করব বুঝছিলাম না। লোকটার পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করলাম। বয়স্ক লোক তো,স্ক্রিনলক নেই,ওগুলো আমার বয়সীদের মোবাইলে থাকে,যেন ফ্যামিলির লোকজন মোবাইল কাছে পেলে ভিডিও ফোল্ডারে না যেতে পারে।

মোবাইলের কন্ট্রাক্ট লিস্টে দেখি ওনার বউ লেখা একটা নাম্বার। সেটায় আমি কল দিলাম,কেউ ধরল না। তারপর আবার খুজে দেখলাম ওনার মেয়ের নম্বর। কল দিলাম। একটা মেয়ে ফোন ধরেই বলল,”আব্বু,তুমি কই? এতক্ষণ লাগল কেন? আম্মু আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। আমি ডাক্তার আংকেলকে ফোন দিয়েছি। উনি এসে বলে অপারেশনটা অবশ্যই করতে হবে শিগগির। তুমি কি পাওনা টাকাটা পেয়েছ আব্বু।ওরা কি দিয়েছে এবার?”

আমি আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। কি বলব এবার?

মেয়েটা সাড়া না পেয়ে বলল,,”আব্বু? হ্যালো,,আব্বু?”

আমি কাপাকাপা কন্ঠে বললাম,,”আম,,,মানে,,,আমি আসলে আপনার আব্বুকে রাস্তায় পেয়েছি।”

মেয়েটা বলল,,”মানে? কি হয়েছে আব্বুর?”

আমি সরাসরি বললাম না। বললাম,”আপনি একটু মেডিকেলে আসতে পারবেন?  আমি জানি অনেক রাত,তাও বলছি।”

মেয়েটা চিৎকার করে বলল,,,”আমার আব্বুর কি হয়েছে,বলেন,,,হ্যালো?”

আমি বললাম,,”আপনি মেডিকেলে আসেন একটু কষ্ট করে,,আমি আপনার বাবার পাশে আছি,মোবাইলে কল দিলেই পাবেন।”

আমি ফোন রেখে দিলাম। মেয়েটা আরো অনেক ফোন দিল। আমি ধরলাম না।এখন,এত ভারী একটা লোকের লাশ নিয়ে মেডিকেলে কেমনে যাব,ভাবতেছি। হঠাৎ একদম সিনেমার কাহিনীর মত একটা ভ্যানওয়ালা গান গাইতে গাইতে আসল। আমি বললাম,,”এই ভ্যান,দাড়ান।”

লোকটা দাড়াল,আমাকে দেখল,তারপর লাশটা। সাথে সাথে প্যাডেল মারা শুরু করল। আমি সাথে সাথে এক হাতে ভ্যানের হ্যান্ডেল,আরেক হাতে ভ্যানওয়ালার ঘাড় চেপে ধরলাম।ভ্যানওয়ালা বলল,,”আমি কিছু দেখি নাই ভাই,,আমারে মাইরেন না।”

আমি বললাম,,”ধুর বেটা,আমিও এটারে দেখেই থামছি,,মেডিকেলে নিব।এটা ধর আমার সাথে,ভ্যানে উঠা।”

আমার কন্ঠ শুনে মানুষ এক নিমেষে বুঝে যায়,আমি জোকার টাইপের। আমার কন্ঠে জোরের অভাব। লোকটা বুঝে গেল আমি খুনি না,এও বুঝে গেল আমি জোর খাটাতে পারি না।

লোকটা বলল,,”না ভাই,,লাশ  টানতে পারুম না।”

আমি বললাম,,”লোকটার পরিবারকে আমি ফোন দিয়ে বলছি মেডিকেলে এনাকে নিয়ে যাব। মেডিকেল অনেক দূরে ভাই,ভ্যানটা না পাইলে আমি কেমনে নেব বল?”

ভ্যানওয়ালা বলল,,”আমি কি জানি? এক কাজ করেন,এখানেই রাইখা যান। সকালে মানুষজন দেখবে। মানিব্যাগ আর মোবাইল,আর দামি কিছু আছে নাকি? আসেন আমরা ভাগ করে নি।”

আমি ভ্যানওয়ালাকে চরমভাবে বিস্মিত করে ধরে একটা আছাড় দিলাম। এটাই মানুষের ভুল,চুপচাপ থাকি তো,কাউকে কিছু বলি না,মানুষ জোকার ভাবে,কেউই বোঝে না রাগলে আমি কি হতে পারি। আছাড় খেয়ে ভ্যানওয়ালা হা করে চেয়ে থাকল,আমি ওরে জাগিয়ে আরেকটা আছাড় দিলাম। ওর অজ্ঞান হওয়াটা ইম্পর্ট্যান্ট।আমি ওর ভ্যান চুরি করব। ও যদি এই রাতে তারস্বরে চেচায় তাই ওর ভ্যানচোররে ধরতে আসবে পাব্লিক। তখন ও বলবে,”এই শালা খুনি।খুন করে লাশ গুম করতে আমার ভ্যান চুরি করতেছে।”

৩য় আছাড়টা খেয়ে ভ্যানওয়ালা অজ্ঞান হয়ে গেল।

আমি লাশটা ভ্যানে তুলে,ভ্যান চালিয়ে মেডিকেলে আসলাম।

মেডিকেলে আসার পর এমার্জেন্সি বিভাগ দেখে বলল,,”ইনি তো অনেক আগেই মারা গেছে,আপনি বোঝেন নি কেন? 

আমি বললাম,”বললাম,মগজ বের হওয়া,গায়ে বিন্দুমাত্র রক্ত নাই,ইয়াহ,আমি জানি ইনি মৃত।  কিন্তু এই রাতে একটা লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখলে মানুষ কি করে জানি না। আমার এটাই প্রথমবার।  তাই হাসপাতালেই আনলাম। ”

ডাক্তার বলল,,”ওহ,তাহলে মর্চুয়ারির কাছে নিয়ে যান,আমি পুলিশ ডাকি।আপনি চলে যাবেন না।”

আমি বললাম,”না যাব না,ওনার পরিবারকে আমি ফোন দিয়েছি। মোবাইল আমার কাছে। সব বুঝিয়ে দিতে হবে।”

এদিকে ফোনে তো অনবরত কল আসছেই। এবার আমি রিসিভ করে বললাম,”আপনি কোথায়?”

মেয়েটা বলল,,”আমি মেডিকেলের গেইটে,আমার আব্বু কই?”

আমি বললাম,,”আচ্ছা,আমি আসতেছি,দাড়ান,আপনার আব্বুর কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”

মেয়েটা বলল,,”আমার আব্বু কেমন আছে প্লিজ বলেন।”

আমি কিছু বললাম না। গেটের কাছে বলল,,মেয়েটা এখনো কান্নাজড়িত কন্ঠে হ্যালো হ্যালো বলছে। আমি তো ছবিতে আগেই দেখছি। সুন্দর ফর্সা মেয়েটা আশেপাশে তাকাচ্ছে আর হ্যালো হ্যালো বলছে, তার পাশে আরো দুইটা লোক,একটা বয়স্ক,আরেকটা আমার চেয়েও ছোট।

আমি কাছে গেলাম। বললাম,,”আসেন আমার সাথে,আর এই নেন আপনার আব্বুর মোবাইল আর মানিব্যাগ। ”

মেয়েটা বলল,,”কই আমার আব্বু,কই?”

আমি একটু ইতস্তত করলাম। মেয়েটার সাথে থাকা বয়স্ক লোকটার দিক তাকালাম। আমার তাকানো দেখেই লোকটা যা বোঝার বুঝে গেল। সে মেয়েটার কাধে হাত রাখল।

মেয়েটা একবার আমার দিক আরেকবার ওই লোকের দিক তাকাল। বলল,,”চাচ্চু,কি হইছে? কি হইছে এমন কর কেন?কি হইছে? ”

লোকটা মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটা বুঝতে পারল। হাউ মাউ করে কেদে উঠল।

আমি আমার চেয়ে ছোট ছেলেটাকে বললাম,,”তোমার কি হয়?”

ছেলেটা বলল,,”এটা আমার চাচাতো বোন”

আমি বললাম,,”ওনাকে এনো না সাথে,সহ্য করতে পারবে না।তুমিও এসো না। ওনাকে নিয়ে আড়ালে থাক।”

যাই হোক,আমি মেয়েটার চাচাকে লাশটা দেখালাম। ওর চাচাও দেখি কান্নায় ভেঙে পড়ল।

পুলিশ আসল,আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল। বলল অত রাতে ওখানে আমি কি করছিলাম। আমি বললাম,”বাসা থেকে রাগ হয়ে বের হয়েছিলাম। নির্জন রাস্তায় হাটতে,হঠাৎ ওনাকে পেয়ে গেলাম।”

পুলিশ বলল,,”বটে? এই রাতে  পাড়া বেড়াতে বের হয়ে লাশ উদ্ধার? একদম ভূত এফ এমের কাহিনী?বাড়ি কই?”

বললাম ঠিকানা,,যেটা ঘটনাস্থল থেকে ১০ কিঃমি দূরে।

পুলিশ আমাকে সাথে সাথে ধরে বলল,,”থানায় চলেন।এরেস্ট করলাম।খুনের প্রাইমারি সাসপেক্ট হিসেবে।”

আমি বললাম, “মানে? একটা লাশ পেয়ে সেটাকে শিয়ালের খাদ্য হতে না দিয়ে একটা ভ্যানওয়ালার ভ্যান চুরি করে তার ফ্যামিলির কাছে লাশ পৌছে দেবার নাম খুন তাই না?এছাড়া আমি এনাদের চিনিও না।জীবনে দেখি নি। আর আমি স্বাধীন দেশের নাগরিক। রাতে আমি সব জায়গায় ইচ্ছামত বের হতে পারি। ”

পুলিশ জোর জবরদস্তি শুরু করল। তখনি সেই মেয়েটা বলল,,”না উনি নির্দোষ।  আমার বাবা একটা লোকের কাছে টাকা পেত,সে বাবাকে ফোন দিয়েছিল। টাকা দেবে বলে। ”

পুলিশ বলল,,”কত টাকা?”

মেয়েটা বলল,,”এক লাখ। আমাদের টাকাটা জরুরি ছিল। আমার মায়ের অপারেশন করাতে হবে। তাই আব্বু কয়েকদিন ধরে ওই লোকটাকে অনেক চাপ দিচ্ছিল।”

মেয়েটা হাউমাউ করে উঠল। আগে থেকেই তো মন খারাপ ছিলই। এবার আমার আর পুলিশ দুইজনেরই মন খারাপ হয়ে গেল। আমরা একজন আরেকজনকে দেখলাম। পুলিশ বলল,,”ফোন নম্বর দিয়ে চলে যান। ডাকলে থানায় আসবেন।”

আমি চলে আসলাম। পিছনে তখনো মেয়েটা অসহায় কান্না কানে আসছে।

২. নায়িকার কথা

আমি মিরা। বরিশালে থাকি। বি এম কলেজে ২য় বর্ষে পড়ি ইকোনমিকস এ। বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবে। কিন্তু ইন্টার পরীক্ষার পরেই যখন আমি মেডিকেলের জন্য পড়ছি। আমার আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়ে। ব্রেইন টিউমার। তবে ওটা খারাপ অবস্থায় ছিল না। অপারেশন হলে বাচবে এমন বলেছিল ডাক্তাররা। কিন্তু অসুস্থ তো। আমার পড়াশুনা কমে গেল। আম্মুর দেখাশোনা, ঘরের কাজ সব দেখতে হত।

ডাক্তার বলেছিল অপারেশন করতে এক লাখ টাকা লাগবে। আব্বুর কাছে তখন এক লাখ টাকা ছিল না। আমরা অতটাও ধনী না যে কথায় কথায় লাখ টাকা আনতে পারি। আসলে লাখ টাকা আমাদের ছিল। আব্বু ভেবেছিল তার এক ফ্রেন্ডের সাথে পার্টনারশিপে ব্যবসা করবে।তাই তাকে আব্বু কিছু টাকা দিয়েছিল। আব্বুর ফ্রেন্ড সেই টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছিল। আমাদের ফ্যামিলি তাই বেশ কয়েকবছর টেনেটুনে চলছে। 

যখন আম্মু অসুস্থ হল,আব্বু টাকার জন্য ছোটাছুটি করছিল। আব্বু হঠাৎ শুনল সেই ফ্রেন্ড যে টাকা মেরেছিল সে বরিশালে এসেছে। সে নাকি এখন আওয়ামীলীগ এর বড় নেতা। 

আব্বু তার সাথে যোগাযোগ করতে চাইল। সে তো আব্বুকে চেনেই না যেন। আব্বু অনেক রিকুয়েস্ট করল টাকাটা তার দরকার,তার বউয়ের অপারেশন হবে।লোকটা তো বাজে ব্যবহার করে অনেক। শেষে আব্বু হুমকি দিল,টাকা না পেলে মামলা করবে।

তখন আবার ভোটের সময়।লোকটা অনেক নাড়া খেল হুমকি শুনে।

শেষে একরাতে সে আব্বুকে ফোন দিল যে টাকা দিবে। আব্বু রাতেই হন্তদন্ত হয়ে বাইরে গেল।

আমার আব্বু আর আসে নি। 

আব্বুকে  নিয়ে একটা অপরিচিত লোক হাসপাতালে নিয়ে গেল। আমাকে ফোন দিল। আমি গেলাম। কিন্তু আব্বুর লাশটা আমাকে দেখতে দিল না। না দেখতে দিল চাচ্চু,না ওই লোকটা।

লোকটাকে পুলিশ ধরে নিতে চেয়েছিল। আমি বাধা দিলাম। আমি জানি আব্বুকে কে খুন করেছে। আমি এও জানি বিচার হবে না। একটা নির্দোষ লোককে কেন পুলিশ ধরবে।

আমি যখন কাদছিলাম,আড়চোখে দেখলাম সেই লোকটা চাচ্চুর সাথে কথা বলছে। তারপর লোকটা চলে গেল।

চাচ্চুই সব ব্যবস্থা করল আব্বুর শেষকৃত্যের। আমি তো একদম সাগরে পড়লাম। কি করব এবার? কে দেখবে আমাকে আর আম্মুকে? পড়াশুনা আর হবে না,আম্মুকেই বা বাচাব কি করে? চাচ্চুর অবস্থা তো এমনিই খারাপ। এতই খারাপ যে আমার আব্বু আমার চাচাতো ভাইকে আমাদের বাসায় এনে রেখেছিল,যাতে চাচ্চু আর চাচী বাকি দুই চাচাতো ভাইবোনকে নিয়ে একটু মসৃণভাবে জীবন কাটায়। আব্বু তো নাই। এবার কি হবে।

আমার আম্মুর অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছিল। হঠাৎ একদিন  চাচ্চু বলল,,”তোর আম্মুর অপারেশনের ব্যবস্থা হয়ে গেছে।”

আমি ভাবলাম,আব্বুর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা,আর বীমার টাকা মাসে কিস্তিতে আসে। ওটায় আপাতত আমি আর আম্মু চলছি,এক লাখ টাকা কেমনে ম্যানেজ হল অপারেশনের।

চাচ্চু বলল,,”ওই লোকটার কথা মনে আছে? তোর বাবাকে সে পেয়ে নিয়ে এসেছিল? সে আমাকে সেদিন জিজ্ঞেস করছিল যখন তোকে ফোন দেয় তুই নাকি শুরুতেই তোর বাবা ভেবে অপারেশন আর টাকার কথা বলেছিলি। আমাকে তাই সে জিজ্ঞেস করেছিল। আমি বলেছিলাম যে তোর মায়ের ব্রেইন টিউমার।  এটা শুনে সে আমার নম্বর নিল। আজ সে আমাকে ফোন দিয়ে বলল,তার একটা মামা নাকি নিউরোসার্জন, ঢাকায় প্রাক্টিস করে,বরিশালে এসেছে বেড়াতে,সে নাকি রিকুয়েস্ট করে বলছে তোর আম্মুর কথা। ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আমাদের খরচ লাগবে না।”

আমি কিছুই বললাম না। লোকটার হয়ত আমাকে দেখে পছন্দ হইছে। আমি সুন্দরি বলে। এই ফেভারটা করে হয়ত কিছু বিনিময় চাইবে। ভাগ্য ভাল থাকলে ফেভারটা বিয়ে হতে পারে।নইলে আমি ভাবতে চাই না। আচ্ছা,আমি সুন্দরি না হলে কি সে আমার মায়ের অপারেশন এর ব্যবস্থা করত?

আমি কিছু বললাম না। যথাসময়ে আমার মায়ের অপারেশন হল। আমার মা সুস্থ হয়ে গেল। আমি অপেক্ষায় থাকলাম কবে লোকটা বিনিময় চায়।মনে মনে প্রস্তুত হলাম।

লোকটার আর সাড়া আমি পেলাম না। এদিকে আমার ওই বছর ড্রপ গেল। পরের বছর আমি সেকেন্ড টাইম এডমিশন দিলাম মেডিকেলে। কোন সরকারিতে হল না। প্রাইভেটে পড়ার টাকা নাই। ভর্তি হয়ে গেলাম তাই বি এম কলেজে।

আব্বুর প্রভিডেন্ট ফান্ডে বেশি জমে নি। বীমাতেও নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আব্বু দিতে পারে নি,যতটা দিলে দুর্ঘটনায় ওরা পুরো টাকা দেয়। আব্বু তো এভাবে চলে যাবার প্লান করে নি। আস্তে আস্তে আমাদের ফ্যামিলি পথে বসতে লাগল।

একদিন আমি নির্লজ্জের মত চাচাকে বললাম,”একটা বড়লোকের সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দাও। ২য় বা ৩য় হলে আপত্তি নেই,৪র্থও হতে পারি। শর্ত,আমাকে আর আমার মাকে ভাল রাখতে হবে। টাকা দিতে হবে।”

চাচা মাথা নিচু করে রইল। তার আদরের ছোটভাই,যে না চাইতেও জীবনে অসফল ভাইকে সব বিপদে সাহায্য করেছে,টাকা পয়সা দিয়ে,আরো বিভিন্নভাবে,তার মরে যাবার পর তার পরিবারের সাহায্য চাচা করতে পারছে না,এটা তার জন্য কষ্টদায়ক। চাচা চলে গেল।

কয়েকদিন পর চাচা কিছু টাকা এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। বলল,,, “এটা রাখ। আপাতত,দেখি প্রভিডেন্ট ফান্ড একেবারে শূন্য হবার আগ পর্যন্ত চলুক।”

আমি চাচাকে বললাম,,”তোমার নিজের ফ্যামিলি চালাতে তোমার হিমশিম লাগে,তুমি আমাকে এতগুলো টাকা কেন দিলা? তাও আবার ২০ হাজার টাকা? পাইছ কই এত টাকা,,তোমার বেতন কত?”

চাচা বলল,,”আমি দিই নি। ওই লোকটা দিছে।”

আমি তো ভুলেই গেছি,,বললাম,,”কোন লোকটা?”

চাচা বলল,,”ওই যে লোকটা তোর বাবাকে পেল।”

আমি নাকমুখ শক্ত হয়ে গেল। বললাম,,”তুমি ওই লোকের কাছ থেকে টাকা কেন নিছ?আর ওই লোক তোমাকে দিলই বা কেন?”

চাচা বলল,,”আমি কি করব? হঠাৎ সেদিন রাস্তায় দেখা,আমাকে জিজ্ঞেস করল তোর মা সুস্থ কিনা,কোন সমস্যা আছে কিনা।আমি আর থাকতে না পেরে বলে দিছি সব। লোকটা কিছু না বলে চলে গেছিল। আজ আমাকে ফোন দিয়ে ডেকে বলল,তার বাবা নাকি উকিল। তার নিজের চাকরি করা লাগে না,তাও শখে করে। কিন্তু এই মাসটা তার বাবার কাছেই হাত পাতবে,নিজের বেতনের টাকার কিছু অংশ তোদের দিল।”

আমি বললাম,,”লোকটা আমাকে টাকা দিয়ে বিনিময়ে কি চেয়েছে চাচ্চু?”

চাচা বলল,,”মানে?”

আমি বললাম,,”এধরণের লোকেরা অবশ্যই কিছু বিনিময় চাইবে,এমনি এমনি তো টাকা তারা দেয় নি।”

চাচ্চু বলল,,”আমাকে ওসব কিছু বলে নি।”

আমি টাকাটা নিলাম। আর অপেক্ষায় থাকলাম। লোকটা কবে বিনিময় চায়। আর পেটের দায়ে শেষমেশ কি আমাকে এপথেই নামা লাগল কিনা।

কিন্তু বিনিময় চাইল না আর লোকটা। পরের মাসে চাচা এসে আমার আম্মুকে বলল,,”তোমার একটা সেলাই মেশিন ছিল না মিরার জন্মের আগে? যেটা বিক্রি করে দিয়েছিল তোমার বর,ওই পার্টনারশিপ এর এক লাখ টাকা পূরণ করতে যখন অনেক কিছুই বিক্রি করেছিল তখন?”

আম্মু বলল,,”হ্যা”

চাচা বলল,,”পারবা না এখন সেলাই মেশিল চালাতে? আমিও তাইলে আশেপাশের বাড়িতে বলে আসতে পারব তোমার কথা,মেয়েরা এসে পোশাক বানাতে দেবে।”

আম্মু বলল,” তাইলে তো ভালই হয়,কিন্তু সেলাই মেশিন পাব কই?”

চাচ্চু বলল,,,”সেই লোকটা এমাসেও টাকা পাঠাতে চেয়েছিল। আমি বলেছি তোমার মেয়ে ভাবছে সে টাকার বিনিময়ে তোমার মেয়েকে চায়। এটা শুনে সে বলল,তাহলে টাকা দেবে না,তোমাদের উপার্জনের ব্যবস্থা করবে,যাতে পরে তার টাকা ফেরত দিতে পার,আমিই তখন বললাম সেলাই মেশিনের কথা। লোকটা একটা কিনে পাঠিয়েছে।”

আম্মু আর আমি দুইজনেই এবার সিওর হলাম,,লোকটা বিনিময়ই চায়।এবং আমাকে চায়। ভাগ্য ভাল হলে বিয়ে করতে চাইবে,নয়ত,,,,,

যাই হোক চাচা সেলাই মেশিন নিয়ে আসল। আর আশেপাশের মহিলাদের আম্মুর কথা বলে আসল। ওই মাসে টেইলরের কাজ করেই আমরা অনেক টালা পেলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটা ব্যাথা। আমার আব্বু কি এটা চেয়েছিল? হয়ত তার পরিবার বেচে থাকার জন্য এসব করছে দেখে উপরে বসে কষ্টে তার বুক ছিড়ে যাচ্ছে।তার কোন স্বপ্নই তো পূরণ হল না।

এরপরের মাসে চাচা আমাকে বলল,,,”মিরা,কোচিং এ পড়াবি? পার্মানেন্ট, ভাল টাকা দিবে। ওখানে নাকি শুধু মেডিকেল স্টুডেন্ট দেরই ডাকে পড়াতে,কিন্তু তোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাসে ভাল বেতন,করবি?”

আমি বললাম,,”ওই লোকটা ব্যবস্থা করেছে?”

চাচ্চু বলল,”হুম”

আমি আর আম্মু প্রতিমাসে যে টাকা আয় করতে লাগলাম টেইলর,কোচিং আর বাসায় প্রাইভেট পড়িয়ে,আব্বু বেচে থাকতেও এর চেয়ে কম আয় ছিল আমাদের। চাচা আর আমাদের দুইজনের পরিবারই সচ্ছল হয়ে গেল। 

আমি সেই লোকটার বিনিময় চাইবার কথা প্রায়ই ভুলতে বসলাম।

একদিন হঠাৎ কোচিং থেকে আসার পথে আমি লোকটাকে দেখলাম। একটা মহিলার সাথে কথা বলছে। আমি একটু দাড়ালাম। স্বামী স্ত্রী নাকি? মহিলার সাথে একটা বাচ্চাও আছে। লোকটা মহিলার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে তার হাতে কি যেন একটা দিল। আর একটা কার্ড। তারপর চলে গেল।

আমি গিয়ে মহিলাকে বললাম,,”ওই লোকটা কে? আপনার পরিচিত? ”

মহিলা বলল,,,”ওই উকিল সাহেবের ছেলের কথা কন? ওনারে তো সবাই চিনি। উনি খুন ভালা লোক।”

আমি বললাম,,”আপনাদের আত্মীয়? ”

মহিলা বলল,,”না,আমাদের গ্রাম আর উকিল সাহেবের গ্রাম একই। আমার স্বামী আমারে আর আমার বাচ্চারে ছেড়ে চিলে গেছে,আমি আসছিলাম সাহায্য চাইতে,দেখি উকিল সাহেব ঢাকায়। তখন ওনার ছেলেকে বললাম আমার সব কথা।সাহায্য চাইলাম।উকিল সাহেবের ছেলে বলল,,”আপনাকে আমি টাকা দিতাম। কিন্তু আমি অভিজ্ঞতা থেকে জানি মহিলাদের যদি টাকা দিয়ে সাহায্য করতে যাই,তবে মহিলারা ভাববে আমি লুচ্চা,কোন বিনিময় চাইব। তাই আপনাকে আমি টাকা দিব না। বরং আজকের রাত বরিশালে থাকার জন্য হোটেল ভাড়া,আর খাওয়ার পয়সা দিব,আর এটা আমার এক বন্ধুর কার্ড,আপনি এখানে কালকে যাবেন,এই কারখানাটা ওর। ওখানে গেলে আমার কথা বলবেন,আমি ওকে বলে দিচ্ছি,আপনাকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে। এভাবে আর হাত পেতেন না কারো কাছে। ছেলে বড় হচ্ছে।”

মহিলা চলে গেল।আমি রাস্তার মাঝখানে হতবাক হয়ে  দাঁড়িয়ে রইলাম।মনে হল,কে যেন সজোরে একটা থাপ্পড় দিয়ে গেছে মুখে।

আমি  চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম,”চাচা ওই লোকটার নাম জানো?”

আমি বললাম,,”নাম জানো না,তুমি তার কাছ থেকে টাকা আর সাহায্য নিয়েছ?”

চাচা বলল,,”সে তো বলতে চায় নি। আমাকে বলল,সে নাকি চায় না তার নাম প্রচার হোক,হাদীসে নাকি আছে এক হাতে দান করলে অন্য হাত নাকি তা জানতে পারবে না।”

আমি কি বলব বুঝছিলাম না।

আব্বুর মৃত্যুবার্ষিকী তে ভাবলাম এতিমখানায় কিছু টাকা দেব। এতিমখানায় এসে দেখি সেই লোকটা একটা সানগ্লাস পরে দাঁড়িয়ে এতিম বাচ্চাদের ক্রিকেট খেলা দেখছে। প্রত্যেকটা বাচ্চার হাতে  ব্যাট,বল।

হুজুরকে আমি জিজ্ঞেস করলাম এই লোকটা কে? হুজুর বলল,,”নাম তো জানি না,নাম ইনি বলে না। প্রতিদিন আসরের নামাজ এখানে বাচ্চাদের সাথে পড়ে। আর বাচ্চারা যখন ওনার কাছে যা চায়,সব নিয়ে আসে। আমাদের এতিমখানা আগে চলত না।  বাচ্চাদের ভিক্ষা করানো লাগত বাসায় গিয়ে। উনি এটা জানতে পারার পর সব বাচ্চাদের খরচ দেন।”

আমি সেদিন বুঝলাম,এই লোক যদি আমাকে সাহায্যের বিনিময়ে কিছু চায়,তা দেবার ক্ষমতা আমার নেই,সে ক্ষমতা নিয়ে কেউ জন্মায় নি।

সেই ঘটনার দুই সপ্তাহ পর ঈদের কেনাকাটা করতে চকে গিয়েছিলাম। হঠাৎ সেই লোকটার সাথে একদম মুখোমুখি হলাম। আমি কি বলব বুঝছিলাম না,বুক কাপছিল। হঠাৎ তার সামনেই ভীড়ের মধ্যে কে যে এক হাত দিয়ে ইচ্ছা করে আমার ডান বুক টিপে ধরল সজোরে।  আমি লজ্জায় আর ব্যাথায় অসহায়ের মত চেয়ে রইলাম।

লোকটার মুখে সেদিন আমি একটা ভয়ংকর পশুর রূপ দেখলাম। সে ওই হাতটা টান দিয়ে ছুটাল। তারপর কনুই বরাবর সজোরে চাপ দিল। মট করে একটা শব্দ হল। আর একটা গগনবিদারী চিৎকার শোনা গেল। 

দেখলাম একটা খুব স্টাইলিশ, সুন্দর দেখতে একটা ছেলে ভাঙা হাত ধরে তড়পাচ্ছে। আমি আবার লোকটার দিক ফিরলাম। লোকটা আর ওখানে ছিল না। আশেপাশে ভিড়ের মাঝে লোকটাকে আর কোথাও দেখলাম না।

এর একমাস পর একদিন কোচিং থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। রাস্তা নির্জন হতেই কয়েকটা ছেলে আমার পথরোধ করল। সেসময় আমি যখন চিৎকার করব ভাবছি। একটা রিকশা আমার পাশে থামল। রিকশাটা দেখেই ছেলে গুলো বলল,,”উকিল সাহেবের পোলা,,”   একটা তীব্রভয় ওদের চোখে দেখলাম,ভাবখানা এমন যে এর আগে হয়ত ওনার হাতে ওরা মার খেয়েছে। 

ছেলেগুলো চলে গেল।লোকটা আমার দিক তাকাল। তারপর রিকশা থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে বলল,,”এই নাও কিছু টাকা। তোমার ছেলের ওষুধ কিনো,আর কিছু আপেল আঙুর খাইও।  আর এই ম্যাডামকে তার বাসায় দিয়ে আসো।”

রিকশাওয়ালা বলল,,”ভাই,আপনার বাসা তো আরো দূর।”

লোকটা কিছু না বলে হাটা দিল। আমি বললাম,,”একটু শুনবেন?”

লোকটা থামল। বলল,”আপনার বাবার জন্য দুঃখিত”

আমি কি বলব বুঝলাম না। অনেক কথা বলার আছে,কোথা থেকে শুরু করব।

লোকটাই হঠাৎ আমার দিকে ফিরল। আমার আপাদমস্তক দেখে বলল,,”আপনার কাকা আমাকে বলছিল,আপনি নাকি ভাবছেন আমি আপনাকে টাকা দিয়ে এর বিনিময়ে কিছু চাইব। এখন মনে হচ্ছে,হ্যা একটা বিনিময় আপনাকে দিতে হবে।”

আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। লোকটা আমার হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে বলল,,”কালকে বিকেলে এই ঠিকানার দোতলার কোনার রুমটায় যাবেন।”

আমি কার্ড হাতে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সে চলে গেল।

পরেরদিন আমি অনেক সেজেগুজে বিকেলে ওই বাসাটায় গেলাম। কেন সাজলাম আমি জানি না। নিজেকে নোংরা লাগল না কেন এটাও জানি না।হয়ত এটা ওই  লোকটা বলেই,,,,,

আমি বাসার সামনে আসলাম দরজা টোকা দিলাম।বুড়ো কণ্ঠে একটা চিৎকার এল,,”এসেছে,আমার মা এসেছে।”

দরজা খুলল। সেই লোকটা বের হল। আমি বুঝলাম না কিছু।লোকটা বলল,,”এই রুমে একটা লোক থাকে। ইনি জেল থেকে ফিরেছেন।  ৩০ বছর কাটিয়ে। জেলে বসেই ওনার একটা দুরারোগ্য রোগ হয়েছিল। উনি আর বেশিদিন বাচবে না। মরার আগে ওনার মেয়েকে দেখার খুব ইচ্ছা।কিন্তু উনি জেলে যাবার পর ওনার বউ আরেকটা বিয়ে করে মেয়েকে নিয়ে বিদেশ চলে গেছে। আপনার কাজ হল,আপনি এই লোকটার সাথে এখন থেকে ৩ ঘন্টা মেয়ের অভিনয় করবেন। আপনি তো আমার টাকা নিয়ে বিনিময় দিতে চেয়েছিলেন। এটাই সেই বিনিময়। ”

বুড়ো লোকটার সাথে আমি ৩ ঘন্টা মেয়ের অভিনয় করলাম। বুড়ো লোকটা চোখে তার মেয়েকে দেখার যে আনন্দটা সেদিন আমি দেখছিলাম, সেটা আমার জীবনে আজ পর্যন্ত দেখা দ্বিতীয় সেরা দৃশ্য।

প্রথম সেরা দৃশ্যটা কি?

প্রথম সেরা দৃশ্যটা হল সেই স্বপ্নটা যেটা সেরাতে আমি দেখলাম। ওই লোকটা আর আমি সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি বলছি,,,,

   “সাগরের তীর থেকে 
    মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে
     তোমার কপালে ছোয়াব গো
       ভাবি মনে মনে,,,,”

লোকটা প্রতি শনিবার সন্ধ্যার পর  যখন আশেপাশে মানুষ কম থাকে,নদীর পাড়ে গিয়ে বসে কি যেন ভাবে।লোকটা অবিবাহিত। এখনো বাবা মার সাথে থাকে। হয়ত কারো আশায় বসে থাকে,যে সেই সন্ধ্যায় কখনো তার পাশে বসবে।

লোকটা নাকি ফুল ভালবাসে। গোলাপ ফুল। কাল গোলাপ। আমি কাল গোলাপ জোগাড় করলাম। শনিবার সন্ধ্যায় লোকটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করব তার কপালে আমি কিছু মিষ্টি হাওয়া ছোয়াতে পারি কিনা।

৩. নায়ককে গ্রেফতার করতে চাওয়া সেই পুলিশ অফিসারের কথা

আমি বরিশাল কোতওয়ালী থানা সদ্যপ্রাক্তন ওসি মারুফ আহমেদ। সদ্য প্রাক্তন, কারণ এই মাত্র,আমার চাকরি খাওয়া হয়েছে।

কেন খাওয়া হয়েছে? আচ্ছা এই কাহিনী বলতে গেলে আমার একটু পিছনে যেতে হবে।

আমি তখন কলেজে পড়ি হয়ত।আমার বাবা তখন আওয়ামীলীগ এর এক জনপ্রিয় নেতা। আর জনপ্রিয় বলতে আমি সত্যিকারের জনপ্রিয়ই বলছি। তখনকার দিনে আওয়ামীলীগকে দেশের মানুষ খুব একটা পছন্দ করত না। এখনও যে করে না তা বলতে পারি না। তবে সেসময় সত্যিই দেখতে পারত না।

এর কারণ ছিল নজরদারির অভাবে সেসময় একেকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী, ক্রিমিনাল,প্রতারক, খুনিরা স্বঘোষিত নেতা হয়ে যেত আওয়ামীলীগে।

যাই হোক,আমার বাবা ছিল সেসময় খুব অল্প কয়েকজনের মধ্যে একজন নেতা,যে সৎ ছিল,নীতিবান ছিল,সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ছিল,ভারতের হোটেলের বিছানা কাপানো মুক্তিযোদ্ধা না। সত্যিকারের মেশিনগান চালানো মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় একটা গুলি লেগেছিল বাবার পায়ে।বাবা খুড়িয়ে হাটত তাই।

এদিকে সেসময় আরেকজন  নেতার আবির্ভাব হয়।সে একটা দালাল আর প্রতারক ছিল। প্রতারণা করে অনেকবার জেলে গেছে। কিন্তু তাকে কেউ কিছু বলত না।

কারণ সেই প্রতারকের একটা পোষা খুনি ছিল। একটা সাইকো খুনি।  মানুষের রক্তে গোসল করা এক খুনি। প্রতারকটা খুনিটাকে পালত,সামান্য কিছু টাকা দিত,মূলত তার খুনের নেশাটা পূরণ জরতে পারত বলেই খুনিটা তার সাথে থাকত। প্রতারণা করে অনেকের কাছ থেকে টাকা খেয়েছে।সেই লোকেরা টাকা চাইলে,বেশি ঘ্যানঘ্যান করলেই খুনিকে লেলিয়ে দিত সে। সাইকো খুনির নেশা পূরণ। প্রতারকের পথের কাটাও শেষ।

সেই প্রতারক একবার সিদ্ধান্ত নিল নেতা হবে। আর ভোটে দাঁড়াবে। এখন আমার বাবা তো জনপ্রিয় নেতা তখন এ অঞ্চলের। আমার বাবাকে রেখে কোন বেয়াক্কেল একটা প্রতারককে মনোনয়ন দেবে? 

জামানত হিসেবে প্রতারক এক লাখ টাকা জমা দিল। পরে শুনি এটা নাকি পার্টনারশিপ এর ব্যবসা করার নাম করে কোন মধ্যবিত্ত এক সরকারি চাকুরের কাছ থেকে এনেছে।

যাই হোক,এত টাকা দিয়েও সে মনোনয়ন পেল না। পেল আমার বাবা। সে ভাবল,আমার বাবা মারা গেলে তো মনোনয়ন আবার তাকে দেওয়া হবে।

এক বৃষ্টিস্নাত রাতে আমাদের ঘরের দরজা ভেঙে সেই ৬.৫ ফুট লম্বা পোষা খুনিটা ঢুকেছিল। খুব স্পষ্ট মনে আছে আমার সেই চেহারা।সারাজীবন ভুলব না,,,,,

আমার চোখের সামনে আমার বাবাকে ওই জিনিসটা মেরে ফেলল।

পরে পাবলিক বুঝতে পেরে গণপিটুনি দিতে সেই প্রতারককে খুজেছিল। প্রতারক তার পোষা খুনিকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার জিদ জাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিল।

আমি এই প্রতারক আর ওর পোষা খুনিকে শাস্তি দিতে পুলিশে যোগ দিলাম। কঠোর ট্রেনিং নিলাম। চোখে শুধু প্রতিশোধ এর আগুন।

অবশেষে দেড় বছর আগে,,,আবার যখন ভোটের সময় এল,সেই প্রতারকটা আবার আসল মনোনয়ন নিতে।এবার সে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেল।বাংলাদেশ এর মানুষের মেমোরি বড্ড শর্ট। বড্ড শর্ট,,,,

আমি তক্কেতক্কে থাকলাম।কবে কেউ এর বিরুদ্ধে একটা মামলা দেয়,সাথে সাথে ওয়ারেন্ট বানিয়ে আমি ওকে এরেস্ট করে হাজতে নিয়ে বাংলা মাইর দিব। আর ওর পোষা খুনিটাকে ক্রসফায়ারে মারব।

কিন্তু সুযোগ আর পাই না। তবে একটা ঘটনা ঘটল। একটা লোক বীভৎসভাবে খুন হল। আমি তার মেয়ে মিরার কাছে শুনলাম,, কয়েকবছর আগে নাকি পার্টনারশিপ এর ব্যাবসা করার নাম করে সেই প্রতারক তার বাবার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিছে।তারপর পালিয়ে গেছে। এখন তার মায়ের অপারেশন করতে হবে।তাই ডেস্পারেট হয়ে তার বাবা সেই টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছিল যখন দেখেছে প্রতারক আবার ফিরে এসে নেতা হবার ট্রাই করছে।

ব্যস,,সব বুঝে গেলাম। নিশ্চয় ওর বাবা হুমকি দিছিল মামলার।আর খুন যখন হয়েছে,সেই পোষা খুনি এখনো আছে।আমার প্রতিশোধের সুযোগ এখনো আছে।

কিন্তু ওকে কি আর ধরা যায়। বাইম মাছের মত পিচ্ছিল।  

আমার কপাল আবার খুলে গেল। যখন দেখি এক লোক প্রতারকটার বিরুদ্ধে বরিশালের এক জাঁদরেল উকিলের কাছে মামলা দিয়ে দিল। সেই উকিল প্রতারকের বিরুদ্ধে সব প্রমাণ খুজে বের করল। ঢাকায় পালিয়েছিল সে আমার বাবাকে মারার পর। উকিল ঢাকায় গিয়ে ওর পালানোর জায়গাটাও দেখে আসল। আশেপাশের সাক্ষী জোগাড় করল।

এদিকে প্রতারক তো বুঝে গেল উকিল তার পিছে লাগছে। উকিলকে তাই সে হুমকি দিল,যদি সে আর সামনে আগায়,উকিলের একমাত্র  ছেলেকে মেরে ফেলবে।

উকিল আমার সাহায্য চাইল। আমি দেখলাম উকিলের ছেলেটাকে আমি চিনি। আমি ওকে খুনি ভেবে গ্রেফতার করতে চেয়েছিলাম একবার,সেই খুনটার জন্য,এই যে বললাম না আপনাদের? মিরার বাবার খুনের জন্য,,পরে দেখি বেচারা সত্যিই লাশটা পেয়ে একটা ভ্যান চুরি করে হাসপাতালে এনেছিল।

আমি উকিলকে বললাম,”আপনি প্রতারক আর ওর পোষা গুন্ডার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট পাবার ব্যবস্থা করেন।আপনার ছেলের সেফটি আমি দেখব।”

উকিল ওয়ারেন্ট বের করল। আমি প্রতারকটাকে গ্রেফতার করলাম। মনোনয়ন পাওয়া নেতাকে গ্রেফতার করেছি বলে আমাকে উপর থেকে ফোন দিয়ে তাকে  ছেড়ে দিতে বলা বল।

প্রতারক আমাকে বলল,,”আমার পিছে লেগে আজ পর্যন্ত কেউ পার পায় নি। তুইও পাবি না। দাড়া,দেখাচ্ছি মজা। আজ ওই উকিলের ছেলেকে মারব।বটে? এত অপমান আমাকে? এত মানা করলাম তারপরও? তারপর তোর ব্যবস্থা করব। তোর বাপের মত তোকেও আমি জাহান্নামে পাঠিয়ে দেব।”

আমি সাথে সাথে গুলি করে মেরে ফেললাম প্রতারককে।  তারপর বললাম,,ক্রসফায়ার এ মরছে। বিপক্ষ দল গুলি করেছে, পুলিশ পালটা আক্রমণ করার সময় মরে গেছে মাঝে পড়ে।

এই কাহিনী অন্য লোকের জন্য প্রযোজ্য হলেও নিজের দলের নেতার জন্য না। আমাকে সাথে সাথে বরখাস্ত করা হল।

কিন্তু আমার এখন অন্য চিন্তা,আজকে উকিলের ছেলেকে মেরে ফেলবে মানে? এত সিওর হয়ে বলল কেন?

আমি উকিলকে ফোন দিয়ে বললাম,,,”আপনার ছেলে কই?”

উকিল বলল,,”প্রতারকটার গ্রেফতারের খবর শুনে ভাবলাম আর ভয় নেই। ও বের হতে চেয়েছিল, বের হতে দিয়েছি।”

আমি চেঁচিয়ে বললাম,,”আরে প্রতারক তো আর খুন করে না। খুন করে ওর পোষা খুনি। ও তো গ্রেফতারের আগেই আপনার ছেলের পিছে লেলিয়ে দিয়েছে।আপনি ওকে একা ছাড়লেন কেন?”

উকিল ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,,”ও প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে থাকে। ওখানেই আছে। ওকে বাচান প্লিজ।”

আমি ফোন রেখে দৌড়ে গেলাম নদীর পাড়। শনিবার এজায়গাটা নিরিবিলি থাকে আমি জানি। পিস্তল নিলাম পকেটে।যদিও জানি এটা লাইসেন্স  করা সরকারি জিনিস,আমার জমা দেওয়া উচিত এখনি।

আমি নদীর পাড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি ৬.৫ ফুট লম্বা কাল ভয়ংকর দেখতে খুবই পরিচিত একটা লোক একটা রামদা হাতে নদীর পাড় থেকে ফিরছে। রামদা থেকে টুপটুপ করে রক্ত পড়ছে। 

সেই চেহারা,,সেই অতি পরিচিত চেহারা,,, যাকে খুজতে,যাকে শাস্তি দিতে,,,বাবার খুনের বদলা নিতে আমার পুলিশ হওয়া।সে আমার সামনে।

লোকটা থমকে দাড়াল।আমি পিস্তলটা বের করে ওর মাথায় একটা গুলি করলাম। ওর নিস্পন্দ দেহটা পড়ে গেল।

আমি শিগগিরি নদীর পাড়ে গেলাম। উকিলের ছেলের রক্তাক্ত লাশটা চিৎ হয়ে নদীর পানিতে ভাসছে। চোখ দুটো খোলা।

নদীর পাড়ে একটা নারীমূর্তি দাঁড়ানো। তার ঠোটটা থরথর করে কাপছে। হাত ভরা একগুচ্ছ কাল গোলাপ।

গল্প ৭৮

​”কারাগার”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব(Raihan Masud Bipu)

১.

আমেরিকার নেব্রাস্কার ছোট একটা শহরে একটা প্রাচীন, ঐতিহাসিক হোটেল আছে।আব্রাহাম লিংকনের আগে যখন আমেরিকায় দাসব্যবসা প্রচলিত ছিল।তখন এই হোটেলটি তৈরি হয়েছিল। নিগ্রো দাসেরা অমানুষিক পরিশ্রম করে হোটেলটি তৈরি করেছিল। তখনকার দিনে গোটা আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ট হোটেল।

নিগ্রোরা যখন হোটেল দালানটি তৈরি করে তখন এটি হোটেল হিসেবে পরিচিত ছিল না। এটি ছিল একটি সম্ভ্রান্ত জমিদারবাড়ি। রাজপ্রাসাদের চেয়ে কোনো অংশে কম না। জমিদার পরিবারটার নাম ছিল ম্যাকার্থি।

যার জমিদারীতে তৈরি হয় দালানটি তার নাম ছিল কার্ল ম্যাকার্থি। কিন্তু তৎকালীন সমাজে তার নাম ছিল পিশাচ ম্যাকার্থি।

নিগ্রোরা তখনকার দিনে দাসের বেশি কিছু ছিল না। স্বাভাবিক নিয়মে দাসের মালিকরা দাসদের বিনা পরিশ্রমে খাটাত,যা ইচ্ছা তাই করাত। আধপেটা করে খাওয়াত। গরু লাঙল ভুলভাল টানলে যেরকম বাড়ি পড়ে পাছায় ওভাবে নিগ্রোদের গায়ে দুই একটা চাবুক ছিল ডালভাত।

তবে পিশাচ ম্যাকার্থি যেটা করত সেটা এই “বিশেষ” স্বাভাবিক ডালভাত নিয়ম কানুনের তুলনায়ও ভয়াবহ অস্বাভাবিক এর ক্যাটাগরিতে পড়ত।

প্রথমত, সে নিজেকে অন্যান্য দাসমালিকের চেয়ে অনেক কেউকেটা ভাবত।ভাবতেই হত,কারণ সে জমিদার,এবং বিশেষ টাকাওয়ালা।তাই তার কিছু বিলাসী খেয়াল ছিল। যেমন তার নিগ্রো দাসরা যে তারই এটা তো বোঝাতে হবে।কালাভূতগুলো তো নইলে অন্য দাসদের সাথে মিশে যাবে।

লোহার শিক গরম টকটকে করে তাই তার কেনা দাসদের গায়ে সে নাম্বার,আর নাম লিখে রাখত।কার্ল ছিল খুবই শিল্পে অনুরক্ত। তাই সে লোহার শিক দিয়ে চামড়ায় নাম্বার আর নাম লেখার জন্য বিশেষ ডিজাইনের আশ্রয় নিত।

বলাবাহুল্য এই শিল্পিত নাম্বার আর নাম গায়ে লেখার সময় আশেপাশের আকাশ বাতাস নিগ্রোদের আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে যেত।

একবার কার্ল ম্যাকার্থি ৩য় অথবা চতুর্থ বউকে কার্ল ধরে ফেলে একজন নিগ্রো দাসের সাথে বিছানায়। নিগ্রো পুরুষ দাসরা সেযুগে সাদা চামড়ার মালকিনদেরও কাজে লাগত বিশেষ শারীরিক গঠনের জন্য,যখন বাড়ির কর্তা থাকত না। কিন্তু একে এটা অপরাধ,দ্বিতীয়ত কার্ল ম্যাকার্থি অজানা কারণে কালো চামড়াদের দেখতে পারে না।

সেই সময় সে তার স্ত্রীর হাত পা চারটা ঘোড়ার সাথে বেধে চারদিকে ছুটিয়ে দেয়।স্ত্রীর চারটুকরা লাশ আশেপাশে ছিটিয়ে যায়।

দুশ্চরিত্রা মহিলা মরল তো মরলই,বাশটা মেরে গেল বাকি এবং ভবিষ্যতের কার্লের কেনা সব পুরুষ নিগ্রো দাসের। ভবিষ্যতে যেন এই ধরণের ঘটনা না ঘটে তাই কার্ল দাস কিনেই তাদের লিঙ্গ কেটে দিত।

কালো চামড়ার প্রতি ঘৃণা হলেও,নিগ্রো দাসীদের ক্ষেত্রে রাতে কার্লের এটা মনে থাকত না।থাক,সেই বর্ণনায় নাই বা গেলাম।

যাই হোক,আমেরিকার বিখ্যাত দাসযুদ্ধে এরকম বিভিন্ন প্রান্তের হাজারো কার্ল ম্যাকার্থির বিরুদ্ধে গোটা আমেরিকার নিগ্রো দাসেরা বিদ্রোহ করল।নেব্রাস্কার দাসেরা যুদ্ধ ঘোষণা করে সবার আগেই ঢুকল কার্লের প্রাসাদে। নিজেদের মনিবকেও অতটা কিছু বলে নি,কিন্তু কার্লকে তার প্রাসাদেই তারা টুকরা টুকরা করে মারল। সব পুরুষ ম্যাকার্থিদের খুন করা হল। আর ম্যাকার্থি মহিলাদের ধর্ষণ করে,বেশ কয়েকদিন নিজেদের দাসী করে রাখল দাস বিদ্রোহীরা।

তবে বেশিদিন বিদ্রোহ চলল না। নিগ্রো দাসদের নেতা আব্রাহাম লিংকনের সাথে সমঝোতায় আসায় সারা আমেরিকার নিগ্রোরা মুক্তি পেল,আমেরিকা থেকে দাস প্রথা বিলুপ্ত হল। কিন্তু তখন যেসব দাসেরা এই যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ করেছে মানে খুন ধর্ষণ করেছে,তাদেরকে খুজে খুজে ফাসি দেওয়া হল।

কার্ল ম্যাকার্থি আর তার বংশ ধ্বংস করার পর ধ্বংসকারী নিগ্রো দাসদের জনসম্মুখে ফাসি দেওয়া হল। এবং সেটা হল এই বিশাল ম্যাকার্থি রাজপ্রাসাদের আঙিনাতেই।

তারপর শতাব্দী চলে গেল প্রায়। ম্যাকার্থি রাজপ্রাসাদ পড়ে রইল পরিত্যক্ত হয়ে। অবশেষে ২০১৭ সালে ওয়াল্টার কোম্পানি এই প্রাসাদকে মোডিফাই করে বিলাসবহুল হোটেল বানাল। আর এই হোটেলের ইতিহাসের প্রথম ম্যানেজার হলাম আমি।

২.
এর আগে আমার এধরণের কাজের বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা না থাকলেও ছোট শহরে এমন গ্রান্ড হোটেল তৈরি হবার পর যখন প্রথম এরা নিয়োগ ভাউচার প্রকাশ করে আমিই সর্বপ্রথম চাকরির লোভে এখানে আসি। এসে দেখি ম্যানেজার পদে ইন্টারভিউয়ের জন্য মাত্র ৩/৪ জন এসেছে। ভাগ্যক্রমে প্রত্যেকজনেরই কিছু কিছু সমস্যা ছিল,যা হোটেল ম্যানেজার পদের জন্য তাদের অযোগ্য করে দেয়। 

হোটেল কর্তৃপক্ষ ম্যানেজার পদে শুধুমাত্র আমাকে পেয়ে কিছুদিন অপেক্ষা করে। একজন বাদামী চামড়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীর কাউকে এরকম একটা পদ দেবে কিনা ভাবতে থাকে।আমি নামাজ পড়ে দোয়া করতে থাকি আল্লাহর কাছে,চাকরিটা যেন আমিই পাই।

আসলে শহরটা একটা বিশাল পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত। অনেক উচু পর্বত, যার চূড়া বছরের প্রায় সবসময় বরফে আচ্ছাদিত থাকে। তার স্তরে স্তরে শহরের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত আসে গভীর অরণ্য।রাতে সেখান থেকে নেকড়ে,আর জাগুয়ারের ডাক ভেসে আসে,রাতে আসে রাতপাখি,আর নাম না জানা অসংখ্য অদ্ভুত আওয়াজ।

শহরের অপর প্রান্তে বয়ে গেছে একটা নদী,এই শহর থেকে বের হবার জন্য দুইটা সেতু রয়েছে।সেতু দুটো নদীর ওপারে একটা রাস্তায় মিলেছে। সেই রাস্তাটা আবার নদীর এপারের মত আরেকটা পর্বতে গা ঘেষে বানানো।আসলে ওই পর্বত আর এপাশে পর্বত একই পর্বতমালার অন্তর্গত। শহরটা যে উপত্যকায় গঠিত, সেটাকে এই পর্বতমালার ভিতর একটি সমতল মালভূমিই বলা চলে,যেটাকে উপর থেকে দেখলে মনে হয় একটা থাকা। এই থালার সবচেয়ে উচু অংশে তৈরি ওয়াল্টার হোটেল।

যাই হোক,নদীর ওপারের রাস্তাটা পর্বতের অংশ থেকে যখন শেষ হয়,তখন শুরু হয় ঘন জঙ্গলের আরেকটা অংশ।বলতে গেলে জায়গাটা খুবই দুর্গম।

শহরের ব্যস্ত জীবন শেষে ছুটিতে পাহাড় জঙ্গলের নিস্তব্ধ শান্তির মধ্যে কিছুটা সময় কাটানো যেকোন আমেরিকান ধনীর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, আর সেই ধনী যদি হয় শিল্পের কাণ্ডারি, তাহলে তো কথাই নেই। ওয়াল্টার হোটেল সেসব ধনীদের কথা ভেবেই তৈরি হয়েছে। এটা শুধু একটা গ্রান্ড হোটেল না,প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের,নির্মল সময় কাটানোর এক প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে এটা,আর শিল্প? 

ওয়াল্টার হোটেল কার্ল ম্যাকার্থির যুগে তার সংগ্রহ, তার বিভিন্ন আর্টিফ্যাক্ট,চাবুক,বন্দুক সব জাদুঘরের মত সঞ্চয় করেছে। গেস্টরা এখানে এলে পাবে দাসযুগের ইতিহাস সচক্ষে দেখার সুযোগ।

কিন্তু এই দুর্গম পথ ভেদ করে কোয়ালিটি সময় কাটাতে কয়েক সপ্তাহের জন্য ধনী গেস্টরা না হয় আসবে।কিন্তু কর্মচারী হয়ে এই বিলাসবহুল একাকীত্বে সারাবছর থাকতে কি আপনি পারবেন?

না,এজন্যই ম্যানেজার পদে বিশেষ কেউ এপ্লাই করে নি,যাদের আমি ভয় পাব আমার চাকরির সুযোগ হারানোর জন্য। আমার এধরণের একাকীত্ব অনেক ভাল লাগে,তাই তো বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় পড়তে এসে আমি আর ফেরত যাই নি। আমি একাকীত্ব ভালবাসি,প্রচন্ড ভালবাসি আমি নিঃসঙ্গ জীবন।

এত গ্রান্ড হোটেল শেষ পর্যন্ত ম্যানেজার হিসেবে আমাকেই পেল। আর কেয়ারটেকার, ওয়েটার,রুম সার্ভিস,বাবুর্চি,এসবকিছুর জন্য এই শহরের লোকদেরকেই নিয়োগ করল।

২২ জুন,২০১৭ এই হোটেল খোলার ব্যবস্থা করা হল।উদ্বোধন হবে ওইদিন এই হোটেল। সারা আমেরিকায় বিভিন্ন প্রদেশে নামকরা ধনীদের কাছে পাঠানো হল আমন্ত্রণ পত্র।

এদিকে আমি ম্যানেজার হলাম। আমি আমার আন্ডারের সব কর্মচারীদেরকে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলাম। হোটেলটা খুব সুন্দর করে নববধুর মত সেজে উঠল,অপেক্ষায় রইল নতুন অতিথির।

হোটেলে গেস্টদের জন্য লাক্সারী প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা হল। টিভি,ফ্রিজ,এসি,সব রুমে বসানো হল। বাচ্চাদের গেম রুম সাজানো হল,হানিমুন রুম সাজানো হল। রান্নাঘর ভর্তি করে বিভিন্ন পদের খাবার নিয়ে আসা হল,খাবারের পরিমাণ দেখে ভাবলাম যদি একজন লোককে এই ভান্ডার দেওয়া হত,এজীবনে সে কখনো খাদ্যাভাবে পড়ত না,এমনকি একবেলায় তিনবেলার খাবার খেলেও।

আমি যেহেতু একদম আনাড়ি। এই কাজ গুলো তত্ত্বাবধানে হিমসিম খাচ্ছিলাম। আর লাক্সারী হোটেলে আর কি কি দরকার অনেক জিনিসই ভুলে যাচ্ছিলাম। একটা বিশাল ভুল করলাম মদ আনার ব্যাপারে। আমি যেন হঠাৎ ভুলেই গেলাম মদ আমেরিকান ধনীদের জীবনের অংশ। হয়ত আমার মধ্যে আমার ধর্ম এমনভাবে গেড়ে বসেছে যে নিজের কাজের মধ্যেও আমি পাপ আনতে পারছি না।

তখন আমার কেয়ারটেকার আমাকে বলল,,”তুমি চাকরি পেলে কিভাবে? তোমার তো এই হোটেল ম্যানেজের যোগ্যতাই নেই।”

কথা ঠিক,এই হোটেল ম্যানেজের যোগ্যতা আমার নেই। আমি চাকরিটা পেয়েছি কথার জাদুতে।আমি কথা বলে,ভুংচুং দিয়ে মানুষকে বশ করতে পারি।একাকী জীবনের আরেকটা গুণ। মানুষকে কনভিন্স করার অনেক পন্থা জানা থাকে।

আমার হয়ে কেয়ারটেকার কিছু ব্যবস্থা করতে লাগল। আমি পানির ব্যবস্থা করলাম। অফুরন্ত পানি,পর্বতের উপত্যকার নিচে কোথাও একটা বিশাল লেক আছে।সেখান থেকে শক্তিশালী পাম্প দিয়ে পুরো হোটেলে পানির ব্যবস্থা হল।

হোটেল প্রস্তুত তার অতিথিদের গ্রহণ করতে।অপেক্ষার পালা ২২ জুনের। যেদিন প্রায় ৩০০ অতিথি আসবে এই হোটেলে।

রাতে হোটেলে আমি একা থাকি। এই শহরে প্রত্যেকটা মানুষ একে অপরকে চেনে।কে চোর,কে পুলিশ সবাই জানে। মানুষ খুনের ঘটনা এই শহরে প্রায় ৫০ বছির ধরে নেই।ছোটখাটো অপরাধ হলে পুলিশ থানায় কয়েকসপ্তাহ রেখে দেয়,এরমধ্যে অপরাধী আর ভিক্টিমের মধ্যে সমঝোতা হয়,আমার আগের জীবনে ফিরে যায় সবাই।

সেজন্য হোটেলে নিরাপত্তায় তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। ৪ জন সিকিউরিটি আছে বাইরের আউটপোস্টে।আর হোটেলে আছি আমি,শুধু আমি একা।

পাহাড়ি অঞ্চলে রাতগুলো অনেক দীর্ঘ হয়।এবারো তার ব্যতিক্রম নয়।আমি ঘুমানোর আগে অনেক সময় পাব। রাজকীয় খাবার খেয়ে ঘুরতে লাগলাম পুরো হোটেল।

গেস্টদের রুম চেক করা আগেও হয়েছিল।আমি গেলাম কার্ল ম্যাকার্থির রুমে।এই রুমটা এই হোটেলের সবচেয়ে দামী রুম। সেই দাসযুগের ম্যাকার্থির রুমটা মোটেও পরিবর্তন করা হয় নি। শুধু পরিষ্কার আর কিছু রিপেয়ার করা হয়েছে। এবং এই অত্যাচারী জমিদারের রুমে থাকতে বাঘা বাঘা কয়েকজন ধনী ভাড়ার চাইতেও প্রচুর টাকা অফার করেছিল।আজব একেকজনের খেয়াল।

ঢুকলাম আমি ম্যাকার্থির রুমে। গেস্ট আসবে কালকে। আমি ম্যাকার্থির বিছানায় শুলাম।তারপর আশেপাশে দেখতে লাগলাম। আচ্ছা,সারাদিন এত পাপ,এত অত্যাচার করে ম্যাকার্থি যখন এই আরামদায়ক বিছানায় শুত,ঘুম আসত ওর?

আমি গত কয়েকদিনে,হোটেলে নতুন তৈরি জাদুঘর এ রাখা এ শহর,এ বাড়ি,সব ইতিহাস পড়ে ফেলেছিলাম।দীর্ঘরাত থাকতে হয়,কিইবা করার।ম্যাকার্থিদের ছবি দেখেছি।জলরং এ আকা ছবি,কার্ল ম্যাকার্থি দেখতেও একটা জানোয়ারের মত ছিল।কিন্তু তার বউদের,ছেলে আর মেয়েদের চেহারা ছিল অপূর্ব সুন্দর। কার্লের জন্য আমার কিছু যায় আসে না,কিন্তু সবাই জানে তার পরিবারের লোকেরা দয়ালু ছিল,ভাল ছিল।তবে কার্লের পরিবার হবার অপরাধে নিগ্রো দাস বিদ্রোহীরা এদের সাথে যা করেছিল,তা মনে করে শিউরে উঠলাম।বিশেষ করে নারী গুলীর কথা ভেবে,তিলে তিলে মারার আগে এদেরকে যৌনদাসী করে রেখেছিল নিগ্রোরা,এমনকি এই ১১ বছরের সর্বকনিষ্ঠ ম্যাকার্থি মেয়েটাকেও ছাড়ে নি।

এই দুনিয়ায় কেউ ভাল হয় না,কেউ ভাল থাকে না।সুযোগের অপেক্ষায় থাকে সবাই,নিজের জানোয়ারবৃত্তি প্রকাশের আগে। ম্যাকার্থি তার নিগ্রো দাসদের লিঙ্গ কেটে দিয়েছিল। আর এর প্রতিশোধ নিতে অন্যান্য নিগ্রো দাসরা লিঙ্গের খেল দেখিয়েছে পুরো ম্যাকার্থি বংশকে।

আমি ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে আমার রুমে আর গেলাম না। হোটেলের সবচেয়ে দামি রুমেই ঘুমিয়ে পড়লাম।কালকে গেস্টরা আসবে,ভুলেও যদি অতিরিক্ত ঘুমাই,দামী গেস্ট এসে দেখবে তার দামী রুমের বিছানায় এক ৩য়য় বিশ্বের লোক শুয়ে আছে।কি করবে তখন সে? ম্যাকার্থির রুমে থাকতে যেহেতু এত উদগ্রীব, নিশ্চয়ই ম্যাকার্থিকে সে আইডল ভাবে,আমি ঘুমের মাঝেই মুচকি হাসলাম হারামজাদার মুখের অবস্থা ভেবে।

স্বপ্নে দেখলাম,পর্বতের উপরের সেই সাদা বরফ সারাবছর দেখা যায়। সেটা আস্তে আস্তে বড় হয়ে পুরো পাহাড় ছড়িয়ে পড়ল। শহরের পাশের নদীটা আর সাগরের দিক গেল না। পুকুরের মত স্তব্ধ হয়ে গেল। বন্য রাতপাখিরা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।যেন কেউ গলা আকড়ে ধরেছে। নেকড়েরা ডাকের মাঝে থেমে গেল। একটা মেঘে আস্তে আস্তে পুরো শহরে ছড়িয়ে গেল।একটা অশুভ কিছু যেন আসছে,তার আগমন জানাচ্ছে সবাইকে।

আয়ারল্যান্ড এর বনে রূপকথা অনুযায়ী এক ধরণের পেত্নী থাকে। তার নাম বানশি। বানশি নাকি মৃত্যু টের পায়। কোন বাড়িতে একজন মারা যাবে বুঝতে পারলে,একটা বানশি এসে বাড়ির সামনে ভয়ংকর শব্দে কাঁদে,দুইজন মরলে,দুইটা বানশি,৩ জন মরলে ৩টা,,,,,যদি ৩০০০ লোকবিশিষ্ট একটা শহর ধ্বংস হয়ে যায়,কয়জন বানশি আসবে,,,,,,,,তাদের কান্নার শব্দ কেমন হবে???

ধুর,সে তো আয়ারল্যান্ডে,এটা আমেরিকার নেব্রাস্কা,যোজন যোজন দূর,,,

কিন্তু,,,, লোকাল মানুষ যারা এই হোটেলের কর্মী তারা যে বলল,,”সাহেব,এই বিশাল বনে কিসব যে আছে সাহেব, , কি বলব।,,,, কিছু কিছু ডাক আমরাও বুঝি না,,,,,”

আমার স্বপ্নের মধ্যেই ৩০০০ টা বানশি যেন ভয়ংকর ভাবে কাদতে লাগল। কেপে উঠল আমার বিছানা,ধড়মড়িয়ে উঠলাম।

কিয়ামতের কথা তো কুরআনে পড়েছি।কল্পনা করতে পেরেছি কি কিয়ামত কেমন? আচ্ছা এটা কি কিয়ামত?  না,কিয়ামতে তো মাটি ফেড়ে আগুণ উঠবে,গলিত ধাতু উঠবে,আকাশ বিদীর্ণ হবে,আর পাহাড় তুলার মত আকাশে উড়বে,,,,,,,

কিন্তু পাহাড়ের বরফ যদি ভেঙে তিন হাজার মানুষের শহরটাকে পিষে দেয় এটাকে কি বলা হবে?

পাহাড় যদি কাপতে কাপতে ভেঙে সেই বরফের নিচে থাকা আর্তনাদ করতে থাকা মানুষের আর্তনাদটা মাঝপথেই স্তব্ধ করে দেয়,তাকে কি বলবে?

পুরো পর্বতমালায় ভূমিকম্পটা আঘাত হানল।বরফ একসাইডের পাহাড় আর বন ধ্বসিয়ে শহরটাকে পিষে দিয়েছিল। নদীর ওপারের পাহাড় আর রাস্তা ভেঙে খাদে পড়ে গেল।ভাঙা পাহাড় এবড়োখেবড়ো হয়ে খাদটাকে ভরে দিল। নদীর ওপাশের রাস্তা ভেঙে দুপাশের জঙ্গল কে এক করে দিল। পশুপাখির চিৎকার শোনা যাচ্ছে। হোটেলের আশেপাশে কয়েকশ মানুষের ঘর ছিল,আমার মত তারাও ঘুম ভেঙে এই প্রলয়ঙ্কর কান্ড দেখছিল। তাদের কানেও ৩০০০ টা অশরীরী নারীর ভয়ংকর চিৎকার আর কান্না শোনা গিয়েছে।

ভূমিকম্পের শেষ ধাক্কায় নদীর পানি প্রায় ত্রিশ ফুট উচু হয়ে গেল। পর্বতের মিষ্টি পানির লেক যা হোটেলকে সাপ্লাই দিবে সেই পানিও উঠল।হোটেলের আশেপাশের কয়েকশ মানুষ ভূমিকম্পের প্রথম ধাক্কায় বাচলেও পানির স্তম্ভ দেখে বুঝল আর বুঝি বাচা হল না।

সিকিউরিটি গার্ডরা সেই কয়েকশ মানুষকে নিয়ে হোটেলের দরজায় ধাক্কাতে লাগল,চিৎকার করতে লাগল,,”ঈশ্বরের দোহাই,প্লিজ দরজাটা খোলো,,,”

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। আজ কেয়ারটেকার এর রাতে হোটেলে থাকার কথা ছিল। আমার আনাড়িপনা দেখে হোটেলের চাবিগুলো ও সাজিয়ে রাখে।তবে আমি চাবির চিন্তা কেন করছি? দরজা খুলে দিলেই তো হয়।

বারান্দা থেকে নেমে যখনি আমি নিচে নামব হঠাৎ হোটেল প্রাঙ্গনের বিলাসবহুল উদ্যানের কিছু অংশ সহ ভেঙে নিচের সেই পানির মধ্যে পড়ে গেল। সাথে পড়ে গেল কয়েকশ মানুষ,আর সিকিউরিটি গার্ড, বানশিদের মরণকান্না থামল অবশেষে।হোটেলের সামনের নিরবচ্ছিন্ন কারেন্টের থাম কারেন্ট সহ ছিড়ে ওই পানির মধ্যে পড়ল। হোটেলের সব আলো নিভে গেল।বিশাল হোটেলটা হয়ে গেল নিকষ অন্ধকার। 

গ্রান্ড ওয়াল্টার হোটেল আমাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাথা উচু করে,আশেপাশে কয়েক বর্গমাইলে আর কোন প্রাণের সাড়া নেই। 

৩.

একাকীত্ব,,,, নিঃসঙ্গতা  ,,,,, এটাই তো আমি চাইতাম তাই না? বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ গিজগিজ করছে,শ্বাস নেওয়া যায় না মানুষের জন্য।ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে যেখানে সেখানে মানুষ হচ্ছে। তাই তো রয়ে গেলাম আমেরিকায়,চাকরি নিলাম এমন এক জায়গায়,যেখানে ট্যুরিস্ট সিজন ছাড়া এমনিতেই থাকতে হত একা।

কিন্তু শহরের ৩০০০ লোক তো থাকত। হয়ত সেটাও আমার জন্য খুব বেশি হয়ে যেত। একাকীত্ব চাই তো,৩০০০ লোকের মাঝে আবার একাকীত্ব কি হে,,,,,,,

দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল। আমি একা থাকি এই হোটেলে। আকাশে বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ এখনো। এই গন্ধ যাওয়ার নয়,,,

গত একবছরে আমার সাথে কি কি হল,তার বর্ণনা দেব আমি।

সেই অভিশপ্ত রাত ২২ জুন,২০১৭,,, অভিশপ্ত  তারিখ।

৩০০০ লোকের মৃত্যু, সাথে বানশির চিৎকারে পৃথিবীতে যে ভূতপ্রেত আছে সেটার প্রমাণ,কোনটাতে আমি বেশি বিচলিত হব?

হোটেলের সদর দরজার সামনে বিশাল একটা পাথরের টুকরা,সদর দরজা খুলবে না হাজার চেষ্টায়ও। ফায়ার এক্সিট,পিছনের দরজায় গিয়েও লাভ নেই,হোটেলের ঠিক পিছেই ছিল পাহাড়।এখন সেখানে খাদ। দোতলার বারান্দা দিয়ে লাফ দেওয়া যায়।কিন্তু আঙিনা তো বেশি বড় আর নেই। আর এর পরেই কয়েকশ মাইল জুড়ে মহাশ্মশান। হেটে হেটে পাড়ি দেব এই কয়েকশ মাইল? যাব সভ্যতায়?

একবার আঙিনায় গেলে হোটেলে আর ঢুকতে পারব না। পা ভাঙার কথা তো বাদ দিলাম। নদী এখন বয়ে যাচ্ছে আরো বড় হয়ে,এককালে যেখানে শহর ছিল,কারখানা ছিল,অফিস ছিল,স্কুল ছিল,হাসপাতাল ছিল,,,,,

 আরো আছে,টেলিফোন লাইন,কারেন্টের লাইন সব শেষ,শুধু পানির লাইন আর গ্যাসের লাইন আছে,আর আছে সুয়ারেজ লাইন। পানির লাইন মানে কারেন্ট নেই তো,আমার প্রাগৈতিহাসিক ভাবে টার্বাইন ঘুরিয়ে লেক থেকে হোটেলে পানি আনতে হয়।  আমার মোবাইল সেই অভিশপ্ত রাতে আমি চার্জ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম,সাহায্য চাইতে পারিনি। একটা রেডিও ছিল হোটেলে, ইমার্জেন্সি সাহায্যের জন্য। এটাও ধ্বংস হয়ে গেছে।

আস্তে আস্তে মানুষের অভাবে আশেপাশের বনের পরিধি বেড়ে গেল। নদীর পরিধি,বনের পরিধি,,,, যেসমস্ত লাশ চাপা পড়েনি মাটির নিচে,যারা পানিস্তম্ভে মরেছিল,তাদের লাশ খেতে বন থেকে নেকড়ের পাল,জাগুয়ার, পুমা এসেছিল। মানুষের লাশ কাড়াকাড়ি করে খেয়ে তারা হয়ে গেছে মানুষখেকো। কিন্তু মানুষ তো আর নেই। আছে পাহাড়,বরফ আর মাটি চাপা কয়েক হাজার লাশে গন্ধ,বরফের জন্য এখন টাটকা,,আর আছি আমি।

প্রতিদিন বারান্দায় গিয়ে আমি দেখি নেকড়ে আর শিয়াল মাটি,পাহাড় নখ দিয়ে খুড়ছে। এই বুঝি একটা লাশ ওঠে।মাঝে মাঝে ওরা সফল হয়।

রাতে আমি ঘুমানোর পড় মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙলে শুনি হোটেলের আশেপাশে ওরা ঘুরছে,,ফাকা খুজছে,,, ওরা জানে ভিতরে একটা মানুষ আছে,যার শরীরে এখনো  উষ্ণ রক্ত বইছে।

আমার প্রথম কয়েক মাস কাটল শোকে,আর ভয়ে,,এই বুঝি নেকড়ের দল কোনো ফাক পেয়ে ঢুকল হোটেলে।

খাবারের আমার ভয় নেই। রাজকীয় খানাপিনা হয় আমার প্রতিদিন। মাংস,মাছ।কি নেই। তবে আমি বুঝলাম এটা বেশিদিন থাকবে না। মাংস আছে হিমাগারে,হিমাগার এমনভাবে বানানো যে ঠান্ডা থাকবে ওটা,কারেন্ট থাকলে নিয়মিত,কারেন্ট গেলে অনিয়মিত।  আর আমি যেহেতু মাংসের লোভে দরজা খুলি প্রতিদিন।ঠান্ডা বেশিদিন থাকবে না।

তবে এই ভয়টা বেশিদিন থাকল না। তুষারপাত শুরু হল এখানে,হ্যা,আমি জানতাম ডিসেম্বরের দিল প্রায় ৪ মাস এখানে তুষার পড়ে।ফলে মাংস পচার আর সম্ভাবনা রইল না। আমি মাংস হিমাগার থেকে বের করে চিলেকোঠায় রাখলাম,ভাল করে দরজা আটকে। তারপরও মড়াখেকো কাক শকুন ঘুরতে লাগল গন্ধ শুকে।

কারেন্ট নাই,লাকড়িও শেষ।হোটেলের সব রুমে আমি কয়েকসপ্তাহ করে থাকলাম জমানো গরম পেতে। প্রায় ৮ মাস পর।পুরো হোটেলটা হিমাগার হয়ে গেল। শীত থেকে বাচতে আমি রান্নাঘরের গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রান্নাঘরে ঘুমাতে লাগলাম।

এভাবে চলল আমার একবছর। খাবারটা রাজকীয়। কিন্তু অন্ধকারটা মধ্যযুগীয়।গ্রান্ড হোটেলে মোমের আবার কি দরকার।এই ভেবে ব্যবস্থা রাখা হয় নি। এখন অন্ধকারে রাত কাটে। আর মশার অত্যাচারে। গরমে প্রচণ্ড অস্বস্তি,শীতে ঠান্ডায় শরীর অসাড় হয়ে।

একবছরের সবই আমি বললাম। এখন যেটা বলব,,সেটা দ্বিতীয় বছরের ঘটনা। আমি জানি আমার বর্ণা আপনাদের কাছে কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে। কেন? ভাবছেন আমি হয়ত ফালতু আনাড়ি কথক? আচ্ছা,বলছি দ্বিতীয় বছর থেকে ঘটনা,দেখি আপনারা বুঝেন কিনা।

৪. 

এটা কি আমার অসহ্যের সীমা অতিক্রম হয়েছে বলে? নাকি অতিরিক্ত শীত,গরমের ফলে,নাকি অতিরিক্ত মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া বাধিয়েছি সে কারণে,,,আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে এতটুকু জানি,সেই অভিশপ্ত রাতে যেহেতু আমি রূপকথার বানশির শব্দ শুনেছি,এবং আমি সিওর মরার আগে অনেকেই শুনেছে,তাদের মুখ দেখেই আমি বুঝেছিলাম,আমার ধারণা,ভূত প্রেত আছে। এবং এগুলো আমার হ্যালুসিনেশন না।

ঘটনা শুরু হয় এক বৃষ্টির রাতে। একটা বাচ্চা মেয়ের হাসির শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। আমি ধড়মড়িয়ে উঠি।এক বছর,,,ঠিক এক বছর পর আমি মানুষের গলা পেলাম।

আমি দৌড়ে রুমের বাইরে এলাম। আবার দৌড়াদৌড়ির শব্দ,আর বাচ্চার হাসি।

আমি বললাম,,”কে হাসো তুমি বাবু? একবার দেখা দাও প্লিজ।”

বাচ্চাটা হাসছে।তারপর দুদ্দাড় করে উঠল দোতলার সিড়ি বেয়ে।

আমি গেলাম দোতলায়।হঠাৎ একটা রুম থেকে একটা নারীকন্ঠের গোঙানি শুনলাম। আমি আস্তে আস্তে দরজা খুললাম।

এক নিগ্রো লোক,আরেক সুন্দরি সাদা মহিলাকে আমি বিছানায় দেখলা উলঙ্গ অবস্থায়। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

হঠাৎ রুমের মধ্যে ঢুকল এক জানোয়ারের মত দেখতে লালচে চামড়ার এক লোক। আমি জলছবি দেখে বুঝলাম,এটা কে।

কার্ল ম্যাকার্থি একটা লাথি মেরে নিগ্রো দাসকে ফেলে দিল। তারপর মহিলাটার চুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল। আমি সামনে দাঁড়ানো।ম্যাকার্থি আমাকে বলল,,”নায়েব,ঘোড়ার ব্যবস্থা কর,চারটা ঘোড়া।”

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। হোটেলের দরজা খুলে গেল। যেটা আমি ওই পাথরটার জন্য এক বছর ধরে পারি নি। চারটা ঘোড়ার সাথে মহিলার চার হাত পা বাধা হল। ঘোড়া চারটাকে চাবুক মারা হল। ঘোড়া চারদিক ছুটল।সাদা উলঙ্গ মহিলার দেহ চারটুকরা হয়ে গেল।রক্ত ছিটে আমার সারা গায়ে চলে আসল।

আমি কাপতে লাগলাম ভয়ে।আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। দেখলাম সেই নিগ্রো,আর ম্যাকার্থির যত নিগ্রো দাস আছে সবাইকে সাড়িবদ্ধ ভাবে বসানো হয়েছে আঙিনায়।সবাই তার দাস, বুঝলাম,কারণ তাদের গায়ে ডিজাইন করে লোহার শিক দিয়ে ঘা এর মত নাম্বার আর নাম লেখা।

নিগ্রো দাসগুলোর লিঙ্গ কেটে দেওয়া হল। তারা তড়পাতে লাগল আঙিনায়। সাদা তুষার তাদের রক্তে এক আশ্চর্য  শিল্পের রূপ নিল।

তারপর আবার দৃশ্যপট এর পরিবর্তন।  দলে দলে নিগ্রো হামলে পড়তে লাগল বাড়িটার মধ্যে। কার্ল ম্যাকার্থিকে জীবন্ত অবস্থায় কেটে কুচি করা হল। কার্লের ভাই আর ছেলেদের মাথা পাথর দিয়ে ভাঙা হল। সারা হোটেলের সিড়ি,মেঝে তে রক্ত আর মগজের বন্যা বইতে লাগল।

কার্লের বউদের আর মেয়েদের নিগ্রোরা একটা রুমে নিয়ে গেল।মহিলাদের আর্তচিৎকার শোনা গেল। আমি হা হয়ে থাকলাম।গলা শুকিয়ে গেছে আমার।

একেকজনের শেষ হয়,আর রক্তাক্ত উলঙ্গ সুন্দরিরা কাদতে কাদতে হেটে বেড়ায় সারা হোটেল জুড়ে।

আমার পিছনে কে যেন আমার জামা ধরল। ঘুরে দেখি মিষ্টি একটা বাচ্চামেয়ে বয়স ১১,,হাতে পুতুল। আমাকে বলছে,,”হেল্প মি”

এই মেয়েটার হাসিতেই আমার ঘুম ভেঙেছে আমি বুঝলাম। আমি মেয়েটাকে কোলে নিলাম।বললাম,,”ইয়েস,ইয়েস,মাই ডটার।”

নিগ্রোর দল আসল,দেখল ম্যাকার্থির শেষ মেয়েটা এখনো রক্তাক্ত হয় নি। আমার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে তারা চলে গেল সেই রুমে। মেয়েটা চিল্লাল,,”হেল্প।”

আমি চিৎকার করলাম। ভয়ংকর চিৎকার,,, আমার জীবনে আমি এত জোরে চিৎকার করি নি,,,,,,

আমি হয়ত অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। সকালে আমার ঘুম ভাঙল। দেখি এক ফ্লোর রক্তে আমি শুয়েছিলাম।বাইরে কারা যেন কথা বলে। আমি দেখি, কিছু সৈন্য কালকে রাতের সেই নিগ্রো গুলোকে আঙিনায় ফাসি দিচ্ছে।

সারাদিন,সেই নিগ্রোদের লাশ ফাসির দড়িতে ঝুলল কাক এসে তাদের চোখ খেল। বিকট জিভ বের করা চোখহীন নিগ্রো লাশ। লাশেরা ফাসির দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে দাসদের গান গাইছে।

সারাদিন সেই নগ্ন রক্তাক্ত মহিলারা হোটেল ময় কাদতে কাদতে হাটতে লাগল।মাথা থেতলানো ছেলেরা সেই অবস্থায় ডাইনিং টেবিলে বসে হু হু করে কাদল। কার্ল ম্যাকার্থির কুচানো শরীরটা ঘষটাতে ঘষটাতে আমাকে বলল,,”নায়েব,আমার ঘোড়া আন।”

সারাদিন এভাবে চলল। হঠাৎ রাত হতেই দেখি সব গায়েব।আমি ভাবলাম,এ কি উলটা ঘটনা। দিনে ভূত আসে,রাতে ফাকা? এ কেমন বিচার?

আমি খাওয়াদাওয়া করে ঘুমালাম।সকালের দৃশ্য মনে পড়ল।বমি করে দিলাম। আবার খেলাম। তারপর ঘুমালাম।

ঘুম ভাঙল বাচ্চা একটা মেয়ের হাসিতে। আমি দৌড়ে গেলাম। আবার কালকের ঘটনা ঘটল। সারারাত প্রলয় চলল।সকালে নিগ্রোদের ফাসি হল। লাশগুলো গান গাইল। নগ্ন রক্তাক্ত ধর্ষিতারা কাদতে কাদতে হেটে বেড়াল। থেতলানো মাথা ছেলেরা ডাইনিং এ বসে কাদল।কার্ল ম্যাকার্থির কুচানো দেহ ঘষটাতে ঘষটাতে বলল,,”নায়েব,আমার ঘোড়া আন।”

আবার সন্ধ্যায় সব গায়েব। আবার রাতে বাচ্চার হাসি। ঘটনাগুলো আগের রাতের চেয়ে ভয়াবহ লাগে প্রত্যেকবার। বাচ্চা মেয়েটা প্রতিরাতে একটু করে মায়া বাড়ায়।বলে,,,”আজ অন্তত বাচাও প্লিজ।”

আমি চিৎকার করি।বলি,,”আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দাও।আর সহ্য হয় না। একাকীত্ব চেয়েছিলাম।কয়েকশমাইল ধরে লাশের মিছিলে আমি একা। একাকীত্ব ঘুচাতে চেয়েছি প্রতিদিন আমি ইতিহাসের ভয়ংকর ঘটনাকে পাই সঙ্গী হিসেবে।প্লিজ আল্লাহ, কিল মি,,,”

হয়ত আমি অভিশপ্ত। আমার দোয়া কবুল হয় না। দিন দিন ঘটনার ভয়াবহতা আগের রাতের চেয়ে বাড়ে। আমি জানি না আসলে কি হয়েছিল দাস যুগে।তবে এটা জানি,যারাই আমাকে ঘটনাটা প্রতিদিন ঘটিয়ে দেখাচ্ছে,তারাও আস্তে আস্তে আসল ঘটনা থেকে সরে আসছে। একই ঘটনা বছরের পর বছর দেখলে আমি যদি অভ্যস্ত হয়ে যাই,,,তবে? 

বীভৎসতা বাড়তে থাকে ঘটনা। নিগ্রোদের লাশের গানের শুরে মরণের ভয়াবহতা আরো জোরেশোরে বাজে।

তবে একটা জিনিস বুঝলাম। আশেপাশের বনের মানুষখেকো নেকড়েরা আর এই হোটেলের আশেপাশে এসে আমাকে ঘাটায় না। হোটেলের বহুদূরে তারা চলে যায়। তাদের ডাক আস্তে আস্তে বাতাসে মিলায়। একবার একটা নেকড়ে শাবক হোটেলের কাছে এসেছিল সন্ধ্যায়।যখন হোটেলের প্রেতাত্মারা আমাকে কিছুটা বিরতি দেয়।শাবকটা আমাকে দেখে আর্তনাদ করে পালিয়ে যায়।

কয়বছর কেটে যায় আমিও জানি না। ভান্ডারের খাবার শেষ। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর সেই বরফচাপা শহরের বরফ গলে নিচের নির্মল পানির লেকে পড়ছে। সেখান থেকে পানি আনি আমি। কারেন্ট তো নেই,ডাইরেক্ট পাইপের ব্যবস্থা করেছিলাম। সাইন্স খাটিয়ে টার্বাইন ঘুরিয়ে অনেক কষ্টে পানি আনতাম।

সেই পানিতে এত বছর পর সেই অভিশপ্ত রাতের মৃত মানুষের লাশের টুকরা এসে মিশল বরফের সাথে।নদীতে মিশল।সব পানিতে মিশল। কি পানি খাব? শেষে মানুষের পচা লাশের অংশ মাংশ,চর্বি,জমাট রক্ত মিশানো পানিই খাওয়া ধরলাম। বেশ লাগল খেতে।

প্রত্যেকরাত আর দিনে সেই ম্যাকার্থি আর নিগ্রোরা আসে,তাদের লাশ,রক্ত,আর মগজ,সারা হোটেলে ছড়িয়ে থাকে। খিদার তাড়নায় আমি যেই রক্ত চাটতে লাগলাম।মগজ চাটতে লাগলাম।ম্যাকার্থির কুচানো দেহ কামড়িয়ে চিবাতে লাগলাম। সাথে সাথে ওরা কান্না আর গান বন্ধ করে দিল।প্রতিদিন হিংস্র কুকুরের মত আমি ওদের লাশ খেতাম। আর ওরা হাসত,,ভয়াবহ পিশাচের হাসি,,,, ওদের হাসিতে আমিও যোগ দিলাম। প্রতিদিন ওরা আসে,আমি ওদের মাংস খাই,আবার ওরা আসে,,অফুরন্ত মাংস,রক্তের ভান্ডার।ফুরায় না।

সেই বাচ্চা মেয়েটা সাহায্য চাইলে এখন আমি ওর গলা কামড়ে রক্ত খাই। বাচ্চাটা হাসে। নিগ্রোরাও হাসে। 

আস্তে আস্তে হোটেল ধ্বসে গেল। শেওলা পড়ল।আগাছা জন্মাল। আমাদের হাসি দিন রাত চলল হোটেলে।

বিমান দুর্ঘটনায় একবার এখানে দুইশ যাত্রী নিয়ে বিমান পড়ে গিয়েছিল। আমি যখন চার হাত পায়ে উলঙ্গ হয়ে ওখানে নেকড়েদের সাথে পাল্লা দিয়ে গেলাম। নেকড়েরা খিদা ভুলে ভয়ে পালাল। ২০/৩০ জন যাত্রী বেচে ছিল।আমাকে দেখে সে কি ভয়ংকর চিৎকার।

আহ,,লাশ আর অশরীরীদের মাংসের তুলনায় জীবিত মাংসের স্বাদ এর তুলনা নেই,মুখে নিলে কিভাবে যেন কাপতে থাকে,আর গরম রক্ত তো আছেই।

কোন ডিসকভারি বা জিওগ্রাফির লোকেরা এসেছিল এখানে ডকুমেন্টারি বানাতে। ওহ,সেরাতে ওদের চিৎকার,গরম রক্ত,আর আমার,নিগ্রোদের,আর ম্যাকার্থিদের সে কি হাসি। আমি হাসি খেতে খেতে, ম্যাকার্থিরা হাসে দেখে দেখে।

তবে এটা আমি বুঝলাম,মরার আগে ডিসকভারির  লোকদের অভিব্যক্তি দেখে আমি বুঝলাম,,অবশেষে আমি বুঝলাম,,, ম্যাকার্থি,নিগ্রোরা জাস্ট আমার হ্যালুসিনেশন ছিল। এই হোটেলের একমাত্র বাসিন্দা আমি,কিভাবে সেই আমি এই আমি হলাম,ঠিক কবে, কখন,,,জানি না।

৫.

শুনলাম হোটেলটা নাকি আবার তৈরি হবে। আশেপাশের মহাশ্মশানে নাকি আবার জনবসতি আসবে। আমি আর কি করে জানব।এখন তো সূর্যের আলোর আর সহ্য হয় না। হোটেলটা ধ্বসে পড়েছে যে।আমি থাকি হোটেলের বেসমেন্টে।যেখানটা অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে, আমার আঁশযুক্ত চামড়ার জন্য বড্ড আরামদায়ক।  তবে এটা বুঝি,এখন ৩০১৭ সাল। এক হাজার বছর হয়ে গেছে। শুনলাম এখন নাকি আমেরিকা মুসলিম দেশ। সারা দুনিয়ায় এখন মুসলমানরা রাজত্ব করে।

যে লোকটা হোটেল আবার বানাবে,এক ইমাম সাহেবকে নিয়ে এসেছিল,পুরনো বাড়ি বদজ্বিনটিন থাকলে দোয়া পড়ে যেন বেধে দেয়।

ইমাম সাহেব বলল,,”জনাব,শিগগিরি এখান থেকে চলেন। এখানে খুব খারাপ একটা জিনিস থাকে,,, সে জ্বিন না,সে কি আমিও জানি না। শিগগির চলেন জনাব,,,প্রাণ থাকতে পালান।ওটা বেসমেন্টে বসে আছে। সুচাল, ধারাল দাতের ফাকে,লম্বা জিভ দিয়ে ঠোট চাটছে,, পালান,,,পালান,,,,,”