গল্প ১০৫

​”একটি বিকৃত রুচির অশ্লীল গল্প”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

একটা খুবই অজপাড়াগা। নাম বলব না,নাম বললে মানুষ যদি খোজ করে,আর এই ঘটনার সম্পর্কে কোনো মিল না পায়,আমাকে সবাই মিথ্যাবাদী বলবে।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ছনের ঘরে থাকে। কিছু কিছু মানুষ, যাদের নিজেদের জমি আছে,তাদের আছে জং ধরা টিনের ঘর। 

এই গ্রামের আশেপাশের ৫/৬ টা গ্রামের মধ্যে কারেন্ট নাই। তবে ৫/৬ টা গ্রামের পরের গ্রামটায় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এর গ্রাম। চেয়ারম্যানের ছেলেরা সবাই আধুনিক,তারা ঢাকা থাকে। চেয়ারম্যানের ঘরটা জালালাবাদের রঙিন টিন দিয়ে বানানো। আর তার বাসায়ই শুধু অষ্টপ্রহর কারেন্ট থাকে,কিভাবে যেন ম্যানেজ করেছে। সেইই প্রসেস জ্ঞানীরা জানে,আমি জানি না।

ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের গ্রামটারও আরো দুইগ্রাম পর একটা স্বাস্থ্যকম্পলেক্স। সেটা একটা একতলা বিল্ডিং। বিল্ডিং টাতে কেবিন টেবিন নেই। ডাক্তারের ঘর নেই।  ওয়ার্ড আছে বড় একটা। তাও নারী পুরুষ শিশু,সার্জারি মেডিসিন আলাদা নেই। আর একটা ঘর আছে,ওটাকে অপারেশন থিয়েটার বানানো হয়েছে।যদিও দুই তিনমাস পরপর ফোড়া ফাটানো ছাড়া ওঘরের বেশি একটা কাজ নেই।

উপজেলায় ভ্যান আর রিকশায় ইদানীং মোটর বসানো হয়েছে। ইট বিছানো কিছু রাস্তা। উপজেলার আশেপাশে যত ইউনিয়ন আছে,তাদের মধ্যে একমাত্র পাকা রাস্তা এখানেই।

এই উপজেলা থেকে জেলায় যেতে লাগে ৮ ঘন্টা।  নৌকায় করে নদী ধরে যেতে হয় ৫ ঘন্টা,ট্রলার নেই। নদীর ওপাড়ে একটা ঘাটে নৌকা থেকে নেমে ৩ ঘন্টা গাড়িতে চেপে যেতে হয়।  জেলা থেকে বিভাগে যেতে লাগে আরো ৪ ঘন্টা। মানে বলা যায়,সেই অজপাড়াগা থেকে বিভাগে আসতে ১৩/১৪ ঘন্টা লাগে।

এখন যে অজপাড়াগায়ের কথা বলছিলাম। সেখানে একটা কামলা থাকত। কাল মিশমিশে তার গায়ের রং। তার নাম ছিল কুদ্দুস। 

কুদ্দুসের একটা বউ ছিল। বউটার রং ছিল সাদা,বউটা ছিল অল্পবয়সী। 

কুদ্দুস কামলা খাটত পাশের গ্রামের একটা লোকের ক্ষেতে। ফসল ফলানো,কাটা,মাথায় চাপিয়ে জমির মালিকের গুদামে উঠানো সবই কুদ্দুস আর ৪/৫ জন কামলা মিলে করত।

বিনিময়ে ফসলের ১০ ভাগের ৩ ভাগ এই ৪/৫ জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হত।

কুদ্দুস আর কুদ্দুসের বউকে অধিকাংশ দিনে এক বেলা করে খেতে হতে। ফসল কাটার মৌসুমে তারা দুইজনই ২ বেলা করে খেতে পারত।

গ্রামের মধ্যে সাদা রঙের ছিল একমাত্র কুদ্দুসের বউ। বউ ভাগ্যে কুদ্দুসকে হিংসা করত আশেপাশের ৪/৫ টা গ্রামের পুরুষরা। আর কুদ্দুসের বউকে হিংসা করত সেই পুরুষ দের বউরা।

কুদ্দুসের বউকে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রায়ই মানুষজন দেখত। পুকুরঘাটে,নদীঘাটে। মাঝখানে খিদের জ্বালা সইতে না পেরে কুদ্দুসের বউ বেশ কয়েকটা ঘরে কাজের বুয়ার কাজ নিয়েছিল। ঘরটর লেপত আর কি,আর গোয়াল পরিষ্কার করত। সেখানেও এসব লুকিয়ে আর প্রকাশ্যে কিছু দেখাদেখি আর “দুর্ঘটনাবশত” স্পর্শের জন্য শেষমুহুর্তে কুদ্দুসের বউ খিদা সহ্য করেও কাজ ছেড়ে ঘরে বসে থাকত।

মানুষের বাড়ি কাজ করার সময় তার একটা ভুল হত না। কাজের বিনিময়ে যে খাবারটা পেত,সেটা নিয়ে সে কুদ্দুসের কাছে যেত,দুইজনে মিলে খাবারটা খেত। 

কাজ শেষে ঘরে বসে থাকলেও দুপুরে খাবার নিয়ে না গেলেও কুদ্দুসের বউ এমনিই যেত কুদ্দুসের ক্ষেতে। আশেপাশের কামলাদের বউরা খাবার নিয়ে যেত,কিন্তু খাবার না নিয়েও কুদ্দুসের কাছে এসেছে,কুদ্দুসও খিদে পেটেও মেজাজ খারাপ না করে কথা বলছে বউয়ের সাথে,এসব দেখে আশেপাশের লোকেরা মুখ ভেচকাত।

এরমধ্যেই কুদ্দুসের বউ প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল। কুদ্দুস আর কুদ্দুসের বউ প্রথমে বেশ খুশি হলেও পরে চিন্তায় পড়ল,কি করা যায়,এখন তো উপার্জন বাড়ানো লাগে।

কুদ্দুসের বয়স কম। এতদিন সে ধানচাষ করে এসেছে। অন্যকিছু করেনি কখনো।  কুদ্দুস তার বউ প্রেগন্যান্ট হবার পর বর্ষাকাল চলে আসায় পাটক্ষেতে কাজ নিল।

দিন যায়, কুদ্দুস গাধার মত খাটে,পাটক্ষেতে কিছু সময়,আমার ধানক্ষেতে। পাটাক্ষেতের কাজটা ভাল। এইজমির মালিকের সাথে কোনো কোম্পানির যোগাযোগ আছে,দিনের টাকা দিনেই পায়।

এরকম একটা সময় ঈদ আসল। ঈদে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের ঢাকা থেকে ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে তার ৩ বন্ধুকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে এল।

কুদ্দুসের ঈদ নেই। তাও বিয়ের পর প্রথম ঈদ বলে সে চিন্তা করছিল বউয়ের জন্য একটা শাড়ি কিনবে। উপজেলায় পাওয়া যায় একটা দোকানে।

দোকানে শাড়ির খোজ নিতে গিয়ে দেখল দাম অনেক বেশি। জমির মালিকের বউয়ের পুরনো শাড়ি প্রথম ঈদে বউকে সে দেবে না সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তাই সে দুই মালিককেই বলল, সে দিনরাত খেটে পুষিয়ে দেবে,তাকে যেন, কিছু টাকা দেওয়া হয়। বউকে শাড়ি কিনে দেবে।

মুখ ভেচকালেও কিছু টাকা তাকে দেওয়া হল। কুদ্দুস একটা শাড়ি কিনে এনে তার বউকে দিয়ে বলল,”ঈদের দিন এইটা পরবি।”

ঈদের দিন বা আগের দিন,বা আগের এক সপ্তাহ,কুদ্দুসকে বাড়িতে পাওয়াই যায় না। শাড়ির টাকা ধার করতে বকেয়া কাজগুলো তাকে করতে হচ্ছে।

এদিকে ঈদের দিন এল। কুদ্দুসকে আজকেও কাজ করতে হবে। পাটক্ষেতের মালিক কোম্পানির লোক। ঈদের দিন ছুটি দিল সব শ্রমিককে। কিন্তু কুদ্দুসকে ধানী জমির মালিকের কাজ গুলো করতে হচ্ছিল।

কুদ্দুসের বউ নতুন শাড়ি পরে একটু সেজে টেজে পাটক্ষেতের দিকে রওনা দিল। কুদ্দুস তো তাকে আগে বলে নি এদিকে আজ বন্ধ,এই সময়ে পাটক্ষেতে থাকার কথা কুদ্দুসের।

পাটক্ষেতের কাছে গিয়ে কুদ্দুসের বউ দেখল জায়গাটা নির্জন। কেউ কোথাও নেই।

কুদ্দুসের বউকে একা পেয়ে চেয়ারম্যান এর আধুনিক ছেলেটা তার বন্ধুদের নিয়ে তাকে পাটক্ষেতের ভিতরে ঢুকে ধর্ষণ করে দিল।

এদিকে কুদ্দুস জমির মালিককে বলল,ঈদের দিন তার বউ তার জন্য ঘরে বসে আছে। তাকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।

সন্ধ্যার দিকে কুদ্দুস বাড়ি এসে দেখল ঘরটা শুনশান,একদম ফাকা। কেউ কোথাও নেই।

কুদ্দুস বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার বউয়ের খোজ নিল। মানুষজন বলল,বউটার চালচলন কেমন জানি। দেখ কার সাথে আছে। 

এই করতে করতে কুদ্দুসের হঠাৎ খেয়াল হল তার বউকে সে বলে নি আজ পাটক্ষেত এ কাজ নেই। সে কি ওখানে গেল কুদ্দুসকেই খুজতে?

কুদ্দুস পাটক্ষেতে গিয়ে কুদ্দুসের বউওকে রক্তাক্ত, উলঙ্গ অবস্থায় পেল। নতুন শাড়িটা পাশে ছিড়ে পড়ে আছে।

 কুদ্দুস যখন তার বউয়ের কাছে গেল। তার বউয়ের রক্তে সবুজ পাট পাতা গুলোতে লাল লাল ছোপ পড়েছে। জ্বরে মেয়েটার গা পুড়ে গেছে।কাপতেছে,শ্বাস পড়ছে কি পড়ছে না। 

কুদ্দুস কি করবে বুঝছে না। উপজেলার হাসপাতাল টা অনেক দূরে। এই রাতে কিভাবে যাবে? ঈদের সময় ডাক্তার কি পাবে?

তাও কুদ্দুস ওর বউকে কোলে নিয়ে হাটতে হাটতে হাসপাতালের দিক রওনা দিল। 

পথিমধ্যে বিদ্যুতের চমক দিয়ে ঝড় উঠল। বৃষ্টির পানিতে কুদ্দুসের কাল কুচকুচে মুখের অশ্রু ধুয়ে ওর কোলে থাকা মেয়েটার গালে গিয়ে পড়ল।

বৃষ্টির ফোটার মধ্যে  কুদ্দুসের চোখের জলের টের পেল তার বউ। দুর্বল হাতে কুদ্দুসের গালের পানিগুলো মোছার বৃথা চেষ্টা করল। কুদ্দুস বাচ্চাদের মত কাদতে কাদতে কাদার ভিতর হাচড়ে পাচড়ে দৌড় দিল। হাসপাতাল আর কত দূর।

হাসপাতালে পৌছানোর পর ভেবেছিল ডাক্তার পাবে না। ডাক্তার শহুরে মানুষ,ঈদে পরিবারের কাছে যেতে পারে।

ডাক্তার তখন ফাকা ওয়ার্ডে রোগীর বিছানায় আধশোয়া হয়ে মোমের আলোয়, “হতাশা দূরীকরণের কবিরাজি উপায়” নামক বই পড়ছিল। তার পাশে বিছানায় গাদা করে রাখা হতাশা দূরীকরণের মেডিকেলের বই। ওতে কাজ হবে না বুঝতে পেরে গভীর মনোযোগ এর সাথে ডাক্তার কবিরাজি বই পড়ছে।

এদিকে বৃষ্টিতে ভিজে কুদ্দুস যখন ওর বউকে নিয়ে বারান্দায় এল,তার গলা দিয়ে “ডাক্তার সাপ” কথাটাও বের হবার জোর ছিল না।

ডাক্তার সাপ মোমের আলো নিয়ে কাছে এল। কুদ্দুসের মুখ দেখে আর তার অজ্ঞান বউকে দেখে ডাক্তার সাপের চোখে একটা আতংক এসে পড়ল।

ফোড়া কাটার রুমে কুদ্দুসের বউকে নিয়ে গেল ডাক্তার। কুদ্দুসকে বলল,”মোমটা ধর্”

কুদ্দুস মোমটা ধরল। ডাক্তার সাপের সামনে বউকে বে আব্রু হতে দেখে একটা রাগ কাজ করল মাথায়। তবে রাগের চেয়ে তখন আশংকা বেশি।

ডাক্তার সাপ বুঝতে পারল কিছু জিজ্ঞেস না করেই। কিছু বলল না,পাশের আলমারি থেকে ওষুধ, স্যালাইনের ব্যাগ,ক্যাথেটার বের করল। স্যালাইনের ব্যাগ ক্যানুলায় লাগিয়ে দিল। কিছু ওষুধ ইঞ্জেকশন করে দিল। সুই তার বউয়ের গায়ে ফুটতে দেখে কুদ্দুসের গা শিউরে উঠল।জিনিসটাকে তার বিশাল ভয়।

এদিকে ক্যাথেটার পরাতে গিয়ে   কুদ্দুসের বউয়ের গুপ্তাঙ্গের দিক কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল ডাক্তার সাপ। কুদ্দুসের তখন ইচ্ছা হচ্ছিল মোমের আলো দিয়ে ডাক্তার সাপের চোখ গালিয়ে দিতে।

কিন্তু ডাক্তার সাপ লাফিয়ে উঠে বলল,”এই,তোর বউ কি পোয়াতি ছিল নাকি রে?”

কুদ্দুস চোখ বড় করে মাথা ঝাকাল। ডাক্তার সাপ বলল,”সর্বনাশ, কি যেন একটা দেখলাম রে, মোমটা কাছে আন। আমি যন্ত্র নিয়ে আসি।”

ডাক্তার যন্ত্র এনে কুদ্দুসের বউয়ের গুপ্তাঙ্গ প্রসারিত করতেই কুদ্দুস একটা চিৎকার দিয়ে উঠল।

ডাক্তার কাপা কাপা হাতে আরেকটা যন্ত্র দিয়ে কুদ্দুসের বউয়ের পেটের ১৫ সপ্তাহের বাচ্চাটার ভেঙে ভেঙে পড়া অংশটা বের করে আনল।

এধরণের ঘটনায় অনেক আনুষঙ্গিক কাজ লাগে। বিভাগীয় মেডিকেলে রোগী পাঠাতে হয়,আরো উন্নত চিকিৎসা লাগে। কিন্তু কুদ্দুসকে ডাক্তার সাপ এই উপজেলায় আসার পর থেকেই চেনে। ১৩/১৪ ঘন্টা জার্নি করে এমনিই বউকে নিয়ে সে যেতে পারবে না।  তার টাকা পয়সাও নেই। অগত্যা সেই রাতে নির্ঘুম চোখে ডাক্তার  তার জ্ঞানে ধরে এমন সবকিছুই করল কুদ্দুসের বউকে বাচাতে। কুদ্দুস ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল মোম হাতে,ডাক্তারকে সাহায্য করতে।

৩ দিন পর কুদ্দুসের বউ কথা বলা শুরু করলে ডাক্তার বুঝতে পারল মেয়েটার কপাল ভাল। ইনফেকশন হয় নি,কোনো জটিলতাও হয় নি,এই মেয়ে তার এই উপজেলার চিকিৎসায়ই সারবে।

কিন্তু ডাক্তার সাপ যখন শুনল কুদ্দুসের বউয়ের সাথে এই ঘটনা কারা ঘটিয়েছে,সাথে সাথে মন পরিবর্তন করল। নাহ,মেয়েটার কপাল খুবই খারাপ। এর চেয়ে ওর মরে যাওয়াই ভাল ছিল।

কুদ্দুসের বউয়ের মুখ থেকে কুদ্দুস সব কাহিনী শুনে একটা বাশ হাতে নিয়ে একটা দৌড় দিল।কুদ্দুসের বউ ডাকল কত,শুনল না। 

এদিকে ঈদের ছুটি শেষ,হাসপাতালের অন্য কর্মীরাও এসেছে। কিছু ডায়রিয়া আর নিউমোনিয়া রোগী এসেছে। কিন্তু কুদ্দুসকে ওভাবে দৌড়াতে দেখে,আর কুদ্দুসের বউয়ের কান্না শুনে  ডাক্তার রোগী দের দায়িত্ব অন্যদের উপর দিয়ে,কুদ্দুসের পিছে পিছে দৌড় দিল।

কুদ্দুসের সাথে পারবে কেন, কুদ্দুস ততক্ষণে চলে গিয়েছে ঘাটে, চেয়ারম্যান এর ছেলে মাত্র নৌকায় উঠবে বলে,এই সময় বাশ টা দিয়ে ছেলেটার মাথা লক্ষ্য করে একটা বাড়ি দিল। ছেলের বন্ধুরা আগে দেখতে পেল,তাই সময় মত ছেলেটাকে সরিয়ে দিল। চেয়ারম্যান এর ছেলের হাতে বাড়িটা পড়ল,সশব্দে ভেঙে গেল হাতটা।

 আরেকটা বাড়ি মারতে উঠাতেই,চেয়ারম্যান এর প্রহরীরা তাদের লাঠি উঠাল। এমন সময় ডাক্তার সাপ গিয়ে কুদ্দুসকে পিছ থেকে চেপে ধরল।

চেয়ারম্যান খবর শুনে দৌড়ে আসল। ভিড় হয়ে গেল। ছেলে ভাঙা হাত দেখে চেয়ারম্যান রাগে কুদ্দুসের দিক তাকিয়ে কিছু বলতে গেল। ডাক্তার সাপ তখন বলল,” গাঁজা খেয়েছে চেয়ারম্যান সাহেব। তারপর হাসপাতালে একটু অসাবধান হওয়ায় পালিয়ে আসছে। মাথায় এখন কিছু নাই। খালি পেটে গাঁজা খেয়েছে তো।”

চেয়ারম্যান ডাক্তারকে অসতর্কতার জন্য বেশ বকাঝকা করল। আর এদেশের চিকিৎসা ব্যাবস্থা যে কত খারাপ,এবং ডাক্তাররা যে কসাই এ ব্যাপারে একটা দীর্ঘ বক্তব্য পেশ করল।

এদিকে ডাক্তার কুদ্দুসকে টানতে টানতে ওখান থেকে নিয়ে এল। চেয়ারম্যান এর ছেলের হাত প্লাস্টার করতে হাসপাতালেই আনা হচ্ছিল তাকে।

ডাক্তারকে কুদ্দুস বলল,”ছাইড়া দেন আমারে,ছাড়েন কইতাছি।ওরে মাইরা ফালামু আমি।”

ডাক্তার সাপ হিসহিসিয়ে বলল,”তোর বউ কিন্তু বেচে আছে,এখন মাথা গরম করে কিছু করলে কি হবে বল তো? ওরে যদি মেরে ফেলে? ধামাচাপা দিতে?”

কুদ্দুস ঠান্ডা হল। শান্তা ছেলের মত ডাক্তার সাপের পিছপিছ গেল।

চেয়ারম্যানের ছেলের হাত প্লাস্টার করে দেবার পর তাকে বিভাগীয় শহরের উদ্দেশ্যে পাঠানো হল। যাবার সময় কুদ্দুসের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলেটা।

এদিকে কুদ্দুসের বউকে ডাক্তার ছেড়ে দিল। কুদ্দুসকে বলল,”দেখ্,বিষয়টা চেপে রাখ। গরীব মানুষ এর জন্ম হইছে সব হারাতে,বেশি কিছু করিস না,আরো হারাবি। ঘটনাটা আপাতত চাপা আছে। আমরা তিনজন ছাড়া কেউ জানে না।”

কুদ্দুস ডাক্তারকে শাসিয়ে বলল,”আপনে আপনারটা বোঝেন,আমি ওই শালারে দেইখা লমু,আসুক আবার।”

এভাবে ৬ মাস কেটে গেল। আস্তে আস্তে ঘটনাটা কুদ্দুস আর কুদ্দুসের বউ ভুলে যাবার চেষ্টা করল। কুদ্দুসের বউয়ের তো সহজে ভোলার কথা না। তবে কুদ্দুসের কাছাকাছি এসে আসলেই সে ভুলতে পারল। নতুন করে সব শুরু করতে চাইল।

কুদ্দুসের দেওয়া নতুন শাড়িটা ছিড়ে গিয়েছিল অনেক জায়গা। কুদ্দুসের বউ খুব যত্ন করে শাড়িটা আবার সিলাই করল। আবার পরবে এটা সে। কুদ্দুসকে কখনওই দেখানো হয় নি পরে।

এদিকে চেয়ারম্যানের ছেলে আবার বেড়াতে আসল। হাত সেরে গিয়েছে। এসে দেখল ডাক্তারের কথায় চেয়ারম্যান কুদ্দুসকে কিছুই বলে নি। শাস্তি পায়নি সে।

এটা দেখে ছেলেটার ফর্সা স্মার্ট মুখ রাখে লাল হয়ে গেল।

কয়েকদিন পর ছেলেটার এক বন্ধুর দামীঘড়ি হঠাৎ খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আশেপাশের সবাইকে খুজতে বলা হল। কোথাও পাওয়া গেল না। তখন চেয়ারম্যান এর ছেলে একটা কবিরাজ ভাড়া করল। গ্রামের সবাইকে বলল ভার্সিটির বড় বড় বইয়ে আছে,এসব চুরি যাওয়া ঘড়ি কবিরাজির মাধ্যমে বের করা সম্ভব।

কবিরাজ গণনা করে পেল সেই অজপাড়াগায়ের এক কামলা, নাম তার কুদ্দুস,তার ঘরে আছে ঘড়িটা।

কুদ্দুসের ঘর থেকে ঘড়িটা উদ্ধার হল। কুদ্দুসের বিচার হবে পরেরদিন শালিসে।

কুদ্দুস সেরাতে হাসপাতালে গেল। বলল,”ডাক্তার সাপ,আশেপাশের ৫ গ্রামের মানুষ আসবে আমার বিচার করতে,এই সুযোগ। আমি বলব সবাইকে সেই কাহিনী,ওরা আমার বউকে কি করছে,আপনি সাক্ষ্য দেবেন।আপনি সব বলবেন,গ্রামের মানুষ সত্য জানবে,আর বুঝবে ওই হাতঘড়ি ওরাই আমার ঘরে লুকিয়েছে,হাত ভাঙার শোধ নিতে।”

ডাক্তার সাপ মাথা ঝাকাল। বাসায় এসে বলল তার বউকে,”তুই বিচার পাবি বউ,ডাক্তার সাপ বলছে সে সব বলে দেবে।”

কুদ্দুস জানত না,সে হাসপাতাল থেকে চলে যাবার পর চেয়ারম্যান এর ছেলে আর তার বন্ধুরা ডাক্তারের কলার ধরে বলে গিয়েছে,”এই মোটকু,কালকে তোরে যদি শালিশের আশেপাশে দেখি,নলি কাইট্টা দিমু।”

পরেরদিন বিচারের সময় হাজার খুজেও কুদ্দুস ভিড়ের মাঝে ডাক্তার সাপকে খুজে পেল না।

বিচারে কুদ্দুসকে গাছের সাথে বেধে ৫০০ লাঠির বাড়ির সিদ্ধান্ত হল।আর তাকে আর তার বউকে একঘরে করে রাখা হল।

সেরাতে ৫০০ বাড়ি খেয়ে যখন কুদ্দুস অজ্ঞান। রাতে এক বাড়ি থেকে এক প্লেট ভাত চুরি করে কুদ্দুসের বউ গাছের সাথে বেধে রাখা কুদ্দুসকে খাওয়াতে এল। দুইচোখের পাতায় রক্ত  জমে কুদ্দুসের চোখ ঢোল। সে দেখতেও পেল না,তার বউ তার দেওয়া প্রথম শাড়িটা পরে এসেছে।

হঠাৎ হাতের থালাটা পড়ে গেল।কুদ্দুস ওর  বউয়ের মুখ চাপা আর্তনাদ শুনল। আর ৪/৫ টা অত্যন্ত পরিচিত কন্ঠের শিয়ালের মত হাসি।

কুদ্দুস বুঝতে পারল ওর ঠিক পাশেই কি হচ্ছে।কিন্তু ওর মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না। সে তাই বেধে থাকা গাছটার সাথে নিজের মাথা ঠুকতে লাগল।

আশেপাশের সব নিস্তব্ধ হবার পর চেয়ারম্যানের ছেলে আর বন্ধুরা যখন চলতে শুরু করল,কি মনে করে ফিরে এল। একটা কাঠ দিয়ে কুদ্দুসের মাথায় আরেকটা বাড়ি দিল। 

গভীররাতে কুদ্দুসের বউয়ের জ্ঞান ফিরল। কুদ্দুস নড়ছে না। কুদ্দুসের বউ গুমরে উঠল দুর্বল কন্ঠের,তারপর নতুন শাড়িটা ওই গাছের ডালেই বাধল। একটা ফাঁস তৈরি করল। 

গলায় পরার সময় কুদ্দুস বলে উঠল,”কি করিস বউ?”

 কুদ্দুসের বউ কুদ্দুসের সামনে চোখ বড় করে ঝুকে পড়ল।

কুদ্দুস বলল,”তুই মরতে চাইলে ওই লাঠিটা দিয়ে আমারে আরেকটা বাড়ি দিয়ে মর। তুই শেষ হয়ে গেলি আমার জন্য।”

কুদ্দুসের বউ দৌড়ে পালাল। কোথা থেকে পুরনো পায়ে চালানোর ভ্যান নিয়ে এল। চুরি করে এনেছে,শিকল ভেঙেছে পাথর দিয়ে।

কুদ্দুসকে অনেক কষ্টে ভ্যানে উঠিয়ে ভ্যানটা টানতে লাগল সে। 

শীতকাল। কিন্তু অসময়ে আজো বিদ্যুৎ চমক হল,সাথে ঝড় আর বৃষ্টি।

কুদ্দুস কত কিছু বলে, “বাচ্চাটা থাকলে এতদিনে আইত না বল্?”

কুদ্দুসের বউ বলে, “হুম।”

আরো কত কিছু বলে। “কিছু ভাবিস না বউ,এবার তুই আর আমি শহরে যাব। ওখানে থাকব। তুই আর আমি মিলে ইট ভাঙব। একটা ছাতার নিচে,প্রচন্ড রোদে। তুই আমার ঘাম মুছিয়ে দিবি।আমার কিনে দেওয়া প্রথম শাড়িটা দিয়ে।”

কুদ্দুসের বউ ব্যাথায় কাদে,রক্তক্ষরণ এ কাদে,নাকি কামলার মুখের রোমান্টিক কথা শুনে কাদে,কেউ বলতে পারে না।

হাসপাতালের বারান্দার সামনে কুদ্দুসের বউ যখন দাঁড়ায়, ডাক্তার সাপ তখন বই পড়ছে,”কাপুরুষের জন্য কবিরাজি ওষুধ ”

কুদ্দুসের বউ বলে,”ডাক্তার সাপ।”

ডাক্তার সাপ বের হয়। ভ্যানের উপর বৃষ্টিতে ভিজছে কুদ্দুস। রক্তাক্ত সে। কিন্তু শুয়েই বিরক্ত হয়ে  মুখ ফিরিয়ে নেয় সে।

ডাক্তার সাপ বলে,”তোরা আমাকে ডাক্তার সাপ বলিস না কুদ্দুস? সাপ এর মেরুদন্ড থেকেও নেই রে। মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে চলে।”

কুদ্দুস অজ্ঞান হয়ে গেল। কুদ্দুসের বউ ৫ সেকেন্ড পর পর গুমড়ে উঠছে। এর চেয়ে বেশি জোরে কাদতে পারছে না সে।

ডাক্তার সাপ কুদ্দুসকে ফোড়া কাটার ঘরে নিয়ে গেল।

মাথার অনেক জায়গায় ফেটেছে,শরীরের আঘাতে মরবে না,মাথারটায় মরবে। বিশেষ করে শেষ আঘাতটায়।

ডাক্তার জানে কয়েক মিনিটের বেশি ও বাচবে না।

ডাক্তার তখন ভয়ংকর একটা কাজ করে। বিভাগীয় হাসপাতালে মাথায় হাড় ফুটা করে জমাট রক্ত বের করে যে অপারেশন করা হয় আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে। কোনো প্রযুক্তি ছাড়া কুদ্দুসের বউয়ের ধরা মোমের আলোয় সেই অপারেশনটা ফোড়া কাটার রুমে বসে করে।

 তারপর ফুটাটতে গজ ঢুকিয়ে উপরে মাথার হাড়ের টুকরাটা রেখে ভারী ব্যান্ডেজ করে এন্টিবায়োটিক দিয়ে কুদ্দুস আর কুদ্দুসের বউকে ভ্যানে উঠায়।

তারপর সেই ভ্যানটা বৃষ্টুর মধ্যে থেকে চালিয়ে নিয়ে যায় অন্ধকারে।

কুদ্দুসের বউ কুদ্দুসকে জড়িয়ে ধরে। কুদ্দুস চোখ খুলে তাকায়।

ডাক্তার ভ্যান চালায়। 

পিছে পিছে কারা যেন কাদায় হাচড়ে পাচড়ে বুকে ভর দিয়ে ভ্যানের সাথে পাল্লা দেয়। বলে,”ও বাচবে না,আমাদের দিয়ে যা,পেটে অনেক ভুক।”

ডাক্তার ভ্যান টানে। কাল কাল বীভৎস ওরা বলে,”তোদের জায়গা নেই রে কোথাও,আমাদের সাথে চল।”

ভ্যান নিয়ে নদীর পাড়ে যায় ডাক্তার। একটা জেলে নৌকা বৃষ্টির ভিতর মাছ ধরছে।

 ডাক্তার কুদ্দুস আর কুদ্দুসের বউকে সেখানে তোলে। নৌকা চলতে শুরু করে।

আশেপাশে থেকে কারা যেন বলে,”বাঁচবে না,বাঁচবে না,,, দিয়ে যা,,,”

৪ ঘন্টা পর  নৌকা ঘাটে যায়। নৌকার মাঝি ভয়ে ফেরত যায় না। বরং সামনে গিয়ে একটা মাহিন্দ্রা ভাড়া করে।

ডাক্তার, মাঝি,কুদ্দুস আর কুদ্দুসের বউ ওঠে গাড়িতে। গাড়ি চলতে থাকে। 

বিকৃত কারা যেন গাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে আসতে থাকে। পচাগলা শরীর,পোড়া পোড়া মুখ নিয়ে।

মাঝি বলে,”মরে নাই তো,তোরা কেন আসছিস পিছু পিছু,,,”

ওরা বলে, “মরবে মরবে,,,গলায় ফাঁস দিয়ে মরবে,,,, ও অপবিত্র।”

কুদ্দুস ওর বউয়ের কোলে শুয়ে বউকে আকড়ে রাখে।

গাড়িটা কিছুদূর গিয়ে উলটে পড়ে যায়।

মাঝি,ড্রাইভার,আর কুদ্দুস মরে যায়। ডাক্তার ভাঙা পা নিয়ে দেখতে থাকে,,,

কুদ্দুসের বউ যখন দেখল,এবার আর কুদ্দুস বলবে না,”কি করিস বউ?”  কখনওই আর বলবে না। তখন সে উঠে দাড়াল।

নতুন শাড়িটা পরতে কুদ্দুস ওর বউকে দেখল না। 

তবে সেটা গলায় পরে কুদ্দুসের বউকে পরেরদিন সবাই ঝুলতে দেখল।

Advertisements

গল্প ১০৪

​”বেস্ট ফ্রেন্ড”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

আসাদ স্কুলের গেটের কাছে গিয়ে দেখল বাচ্চাটা কাদছে। বাচ্চাটা সাদা স্কুল শার্ট কলম দিয়ে দাগানো। কিছু অংশ ছেড়া,বাচ্চাটার ঠোট কেটে গেছে।

আসাদ বাচ্চাটার কাছে গিয়ে বলল,”সাব্বির,কাঁদছ কেন?”

৮ বছরের সাব্বির বলল,”আমাকে মাইনুল মেরেছে” বলে ফুঁপিয়ে উঠল।

আসাদ বলল,”মেরেছে কেন?”

সাব্বির বলল,”টিফিন কেড়ে নিতে এসেছিল। দিতে চাইনি বলে। কেড়ে নিয়েছে।স্যারকে নালিশ করায় মেরেছে। স্যার কিছু বলে নি ওদের। ওর বন্ধুরা কলম দিয়ে জামা দাগিয়েছে,আর আসার সময় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।”

সাব্বির এবার কাঁদতে লাগল।কেঁদে আসাদকে জড়িয়ে ধরল। আসাদ বলল,”চল তো দেখি।”

সব গার্জিয়ান আসে নি।কিছু কিছু বাচ্চারা স্কুল মাঠে খেলছে। আসাদ বলল,”কোন ছেলেটা মাইনুল?”

সাব্বির বলল,”ওই যে ওইটা।তুমি কিছু বল ওকে।”

আসাদ বলল,”আমি কিছু বলব না। তুমি যাও ওর কাছে।আমি তোমার ব্যাগটা ধরছি। গিয়ে ওর মুখে একটা ঘুসি মেরে আসো যাও।”

সাব্বির আসাদের দিক তাকাল। আসাদ বলল,”কি হল,যাও।”

সাব্বির চলে গেল। আসাদ দেখল ছোট্ট ছেলেটা ওর চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় সাইজের বাচ্চাদের কাছে যাচ্ছে।

কাছে যাবার পর সাব্বিরকে মাইনুল আরেকটা থাপ্পড় দিল।থাপ্পড় খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে সাব্বির আসাদের কাছে ফিরে এল।

আসাদ ওর চোখ না মুছেই বলল,”যাও,মুখে একটা ঘুসি মেরে আসো,তুমি ওর মুখে ঘুসি না মারা পর্যন্ত আমি এখান থেকে তোমাকে নিয়ে যাব না।”

সাব্বির অসহায়ভাবে তাকাল।তারপর আবার গেল ওখানে। এবার পেটে একটা ঘুসি খেয়ে ফিরে আসল। ছেলেটার গুণ আছে একটা,চিল্লিয়ে কাদে না,যাই হোক।এটা ভাল গুণ,আসাদের উলটা,আসাদকে ছোটবেলায় ক্লাসের জনপ্রিয় ছেলেরা যখন পিটাত,সে ভ্যা করে কেদে দিত। খুবই বিরক্তিকর।

সাব্বির ফ্যালফ্যাল করে আসাদের দিক তাকিয়ে ফোপাতে লাগল।

আসাদ বলল,”সাব্বির,তুমি যদি ওর মুখে আজ একটা ঘুসি না দিতে পারো, আরো ৭ বছর তুমি এই স্কুলে পড়বা,এই ৭ বছরের প্রত্যেকটা দিন তোমাকে ওরা মারবে।তোমার জীবনটা অতিষ্ঠ করে দেবে। আমার এমন হয়েছিল।কারণ আমি গিয়ে ঘুসিটা মারতে পারি নি।আমি জানি।”

এবার সাব্বির আবার ফিরে গেল। এবার মাইনুল আর ওর বন্ধুরা ঘিরে ধরল। আসাদ বুঝল,এবার সবাই মিলে ওকে মারবে। কিন্তু ধরা খাবে না,টিচার দেখলে শাস্তি সাব্বিরকেই দেবে। উত্তম চলে সবলের সাথে।

সাব্বিরের ছোট হাতের মুঠি মাইনুলের মুখের উপর গিয়ে পড়ল। মাইনুল উপুড় হয়ে পড়ে গেল। পুরো মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

সাব্বির ফিরে আসল। কি মনে করে আবার ফিরে গেল। গিয়ে মাইনুলের এক বন্ধুর জামায় থু দিয়ে আসল।আসাদ বুঝল এই ছেলেই ওর জামা দাগিয়েছে।

একটু পর মাইনুলের মা এসে ছেলেকে মাঠে পড়ে থাকতে দেখল। প্রত্যক্ষদর্শীরা সব বলল।মাইনুলের মা হেডস্যারের কাছে নালিশ করল। হেডস্যার সাব্বিরের সাইজ,আর ওর শরীরে মাইরের দাগ বেশি বলে কিছু বলল না,ওয়ার্নিং দিল জাস্ট।

যাওয়ার সময় মাইনুলের মা আসাদকে বলল,”আপনি নিজেও জানোয়ারের মত দেখতে,ছেলেকেও জানোয়ারই বানাচ্ছেন।”

আসাদ বলল,”না,এই ছেলেটাকে এমনভাবেই বানাচ্ছি,যা আমি কখনওই ছিলাম না। আর ভবিষ্যতে এই ছেলের আশেপাশে যদি আপনার ছেলে আসে,এরপর মুখের উপর ঘুসি দিয়েই শেষ হবে না ব্যাপারটা,হাড্ডিগুড্ডি ভাঙা হবে।”

মহিলা এরকম অভদ্রতার পর আর কোন কথাই বলতে পারল না। চলে গেল। আসাদ সাব্বিরকে নিয়ে বাইরে গেল, প্রথমে হাসপাতালে নিতে হবে,তারপর যত দামী চকলেট আছে দোকানে,আর খেলনা,সব কিনে দেবে।

সাব্বিরকে নিয়ে আসাদের প্লানের প্রথম ধাপ শেষ। পুরো স্কুল লাইফের জন্য নিশ্চিন্ত। সাব্বিরকে স্কুলে অত্যাচারিত হতে হবে না। পরের ফেজ টা অনেক দেরি। বুঝানোর সময় পাওয়া যাবে।

সাব্বির একদিন রাতে আসাদ যখন ওকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে,তখন বলল,”আসাদ,আমি তোমাকে বাবা বলে ডাকি?”

আসাদ বলল,”না সাব্বির,আমি তোমার বাবা না। আমাকে তুমি আসাদ বলেই ডাকবা।নাম ধরে।”

সাব্বির বলল,”সামনে তো আমার স্কুলে প্যারেন্টস ডে। বাবা বা মাকে নিয়ে যেতে হবে। আমি কাকে নিয়ে যাব?”

আসাদ বলল,”তুমি একা যাবে। গিয়ে ঘুরে ঘুরে সব প্যারেন্টসকে দেখবে।কেউ কিছু বললে বলবে তোমার বাবা মা নেই।”

সাব্বির বলে,”ওরা যদি তোমার কথা বলে? যদি বলে যে লোকটা আমাকে আকুলে দিয়ে যায়,নিয়ে আসে,সে কে?”

আসাদ বলল,”তাদেরকে বলবা,সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”

সাব্বির বলল,”বেস্ট ফ্রেন্ড কি?”

আসাদ বলল,”সবচেয়ে ভাল বন্ধু। ”

সাব্বির বলল,”তুমি তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ডই তবে।”

আসাদ বলল,”না,তুমি এখনো বোঝো না বেস্ট ফ্রেন্ড কি। বড় হও। তারপর আমি তোমার মুখে শুনব যে আমি তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”

সাব্বির ঘুমিয়ে গেল।

প্যারেন্টস ডে তে সাব্বির ঘুরে ঘুরে সব দেখল।টিচাররা বাবা আর মা সম্পর্কে কি কি বলে সব শুনল।

সেরাতে ঘুমানোর আগে সাব্বির আসাদকে বলল,”আসাদ,টিচার বলেছে,বাবারা নাকি রাতে গল্প শুনিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়ায়। তুমি আমার বাবা না হলে আমাকে এভাবে ঘুম পাড়াও কেন?”

আসাদ বলল,”কারণ বাচ্চাদের কে এভাবে ঘুম পাড়াতে হয় কারো না কারো। তোমার বাবা নেই।তাই কাজটা আমি করি।”

সাব্বির বলল,”টিচার বলেছে,মায়েরা নাকি অসুস্থ হলে রাত জেগে পাশে বসে থাকে,সকালে ঘুম থেকে উঠায়,চুল আচড়ে দেয়, টিফিন বানিয়ে দেয়। তুমি এগুলো কেন কর?”

আসাদ বলল,”কারণ একটা বাচ্চার এসবকিছু দরকার। তোমার মা নেই,কে করবে? তাই আমি করি”

সাব্বির ঘুমিয়ে গেল।

এদিকে ৮ বছর পর জেল থেকে একটা লোক বের হল। খুনের দায়ে ৮ বছর জেল খেটেছে সে। প্রেমিকাকে খুনের দায়ে। 

লোকটার নাম মহীতোষ পাল। লোকটার সাথে ৮ বছর আগে একটা মেয়ের সম্পর্ক ছিল। মেয়েটার নাম ছিল আফিফা হক। মেয়েটা যখন গর্ভবতী হয়ে যায়,মহীতোষ পাল ভয় পেয়ে যায়।ভারত পালিয়ে যায়। ৯ মাস পর ফিরে এসে দেখে,আফিফা সেই বাচ্চাটাকে গর্ভে লালন করেছে। কলংক নিয়েও। সমাজে অনেক কানাঘুষা হয়েছে,আফিফার বাবা আবার চেতনাধারী,তাই চেতনার উদাহরণ টেনে মেয়েকে সামলিয়েছে। মেয়েও সত্যিকারের ভালবাসার ফসল  গর্ভে লালন করেছে।

এদিকে ৯ মাস পর মহীর বাংলাদেশে ফেরার কারণ ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে।মহী বেশ ফুর্তিতেই আছে।পাত্রী অনেক সুন্দরি আর টাকাওয়ালা, আফিফার চেয়েও। কিন্তু পাত্রীর মামা রঞ্জু ঘোষ এর গোয়েন্দাগিরির ঝোক।সে কিভাবে যে আফিফার কথা জেনে যায়। এও জেনে যায়,অবৈধ সম্পর্ক হলেও বাচ্চা সে জন্ম দেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাত্রীরা বিয়ে ক্যান্সেল করে দেয়। মহী পাল রাগে অন্ধ হয়ে আফিফাকে ছুরি মারে। আফিফার  বাবা মেয়েকে কাতরাতে দেখে ওই অবস্থায়ই হার্ট এটাক করে। 

আফিফাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে, আফিফা একটা ছেলের জন্ম দেয়। হাসপাতালের এক ডাক্তার চিরকুমার কুৎসিত চেহারার আসাদুল্লাহ  অপারেশন থিয়েটারে অনেক চেষ্টা করেও বাচাতে পারে নি আফিফাকে। তবে ছেলেটা বেচে যায়।

দুষ্টু লোকে বলে,অপারেশন থিয়েটারে আসাদ ডাক্তারের চেহারা দেখলেই নাকি রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়,অজ্ঞানের ওষুধ লাগে না। যাই হোক,সেটা অপ্রাসঙ্গিক।

জেলে বসে মহী শুনতে পায়,চেতনাধারী পাগল আফিফার বাবা, “ভালবাসাটাই আসল,বিয়ে শুধু সামাজিক বেড়াজাল” শ্লোগানে সারা জীবন কাটিয়েছে। যখন তার মেয়ের ওই অবস্থা ছিল,সেটাকে উদাহরণ আর সমর্থন দিতে নাকি সেই অনাগত সন্তানের নামে নিজের সব সম্পত্তি উইল করে দিয়ে গেছে।

বিজয় দিবস উপলক্ষে নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের সাধারণ ক্ষমা উদ্যোগে খুনের আসামী মহী পাল মাত্র ৮ বছর পরেই মুক্তি পায়।

মুক্তি পেয়েই মহী পালের জীবনের একটাই লক্ষ্য,নিজের জারজটাকে খুজে বের করতে হবে,পাগলা বুড়ো তো আর আইনকানুন মানে নি। আইনত নাবালক ছেলের সম্পত্তি পেতে বৈধ বাবা হতে হবে। নিজের নাম এফিডেবিট করে মোহাম্মদ ইয়াসিন রাখে। আর আফিফা হক আর মোহাম্মদ ইয়াসিন নামে জাল বিয়ের সনদ বানায়। পাবলিক জিজ্ঞেস করলে বলবে,পাগলা চেতনাধারী বুড়ো বিয়ে করা বৈধ জামাইকে চক্রান্ত করে জেলে ঢুকিয়ে মেয়েকে কুমারী মা নামে প্রচার করে নিজের শ্লোগানটাকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিল। 

ব্যাস এখন জারজটাকে খুজতে হবে।

ওদিকে চিরকুমার ডাক্তার আসাদুল্লাহ যখন দেখল আফিফা হকের নবজাতক ছেলের তিন চার কুলে কেউ নেই। এমনকি  নানা পাগল হওয়ায় আত্মীয়রা ধনসম্পদ দেখেও সম্মানহানির ভয়ে ছায়া মাড়ায় না। তখন সে নবজাতকটাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। কোনো কাগজপত্র ছাড়া। দত্তক ফত্তক,কোর্ট কাচারিতে না গিয়ে।

আসাদুল্লাহরও নবজাতকটাকে নিয়ে প্লান আছে। এই প্লানটা হল,এই জীবনে অসংখ্য ভুলের কারণে সে এখন একা,চিরকুমার, বন্ধুহীন।  তার বয়স ৩৪। তার স্বভাব, আচরণ আর চেহারা ফিগারের যে অবস্থা,এই জীবনে টাকা পয়সা দেখেও কোনো মেয়ে আসবে না।বন্ধুরাও তার সান্নিধ্য যায় না। আজ পর্যন্ত বন্ধু কি জিনিস তাই জানল না সে। জীবনসঙ্গিনী না পেতে পারে সে,নিখাদ বন্ধু তো পেতেই পারে।

এই নবজাতকটাকে বড় করবে সে। নবজাতকটার সব সুখে দুঃখে পাশে থাকবে। নবজাতকটাকে সুপার কুল,স্মার্ট একটা ছেলে হিসেবে গড়ে তুলবে। নবজাতকটা বড় হলে,যাতে তাকে ভালবাসে, আর আসাদের বন্ধু হয়,বেস্ট ফ্রেন্ড। এমন কোনো বন্ধু না যে,বিপদের সময়,দুঃখের সময়,দুর্বলতার সময় লাত্থি মারবে কপালে,অপমান করবে। বরং এমন বন্ধু,যেরকম বন্ধুর বর্ণনা ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজে দেখে সে।

আস্তে আস্তে সাব্বির বড় হয়,দেখতে বেশ সুন্দর হয়,ওর মা খুব সুন্দরি ছিল। একদম পুরোই ওর মায়ের মতই দেখতে।

বড় হবার পর আসাদের সাথে বিভিন্ন ব্যাপারে সাব্বিরের খিটিমিটি লেগেই থাকে। টিভির চ্যানেল চেঞ্জ,খাবারের মেনু,দলের সাপোর্ট, সবকিছুই আলাদা আলাদা। আসাদ এমনটা চায় নি। এমনটা হলে বেস্ট ফ্রেন্ড কিভাবে হবে।

যাই হোক, বড় হবার পর সাব্বিরের উপর আসাদের জোর নজরদারি বাড়ে। যেমন সাব্বিরের চুলের স্টাইল। সাব্বির নিজের চুল যেভাবে আচড়ায়,আসাদও ওর বয়সে একইভাবে আচড়াত,আসাদ সাথে সাথে ওর চুল এলোমেলো করে ইউটিউব দেখে একটা স্টাইল খাড়া করে দিত।

টিনেজ বয়স থেকে খাওয়া দাওয়ার বিষয় থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা বিষয়ে কেউ ইন্টারফেয়ার করলে মেজাজ তো খারাপ হবেই।এজন্যই সাব্বিরের সাথে আসাদের ঝগড়া বাড়তে থাকে।

পরীক্ষার আগে প্রেশার যাতে না পড়ে,সাব্বির আগে আগে পড়ে রাখতে চায়। আসাদ এতেও বাধা দেয়।বলে,”না না,এভাবে পড়া যাবে না। পড়বা পরীক্ষার আগের রাতে, সারারাত জেগে যতটুকু পড়া যায়।”

সাব্বির রাগ হয়ে বলে,”কেন?”

আসাদ বলে,”এভাবে পরীক্ষার আগের রাতে নিশ্চিন্ত থাকতে আগে পড়ে রাখতাম আমি। তুমিও এমন করলে আমার মত হয়ে যাবা।আমি সেটা চাই না।”

সাব্বির মেজাজ খারাপ করে পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে।কিন্তু সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়। এটাও একটা ভাল লক্ষণ,ভাবে আসাদ। যথেষ্ট আতলামি করেও সে স্কুলে কখনো ৩ এর আগে আসতে পারে নি। সাব্বির ছোট থেকেই রোল ১। এটা একটা আসলেই ভাল লক্ষণ।  নাহ,ছেলেটার ভবিষ্যৎ আছে।

একবার কলেজে ওঠার পর সাব্বির কলেজের এক প্রোগ্রামে ৩ টা সুন্দরি মেয়েকে একসাথে বসতে দেখে। মেয়ে ৩ টাই সাব্বিরের দিক তাকিয়ে কিভাবে যেন হাসে আর চোখের দৃষ্টি দেয়।

সাব্বির মেয়ে ৩ টার কাছে গিয়ে বিভিন্ন কৌতুক বলতে  থাকে। অঙ্গভঙ্গি করে।মেয়েগুলো খিলখিল করে হাসে।

হঠাৎ সাব্বির তার কানে একটা টান অনুভব করে। 

তাকিয়ে দেখে আসাদ ওর কান টানছে।বলছে,”এখনি বের হও আমার সাথে।”

মেয়ে ৩ টা এই ব্যাপার দেখে হেসে কুটিকুটি।  এবার অপমানজনক। সাব্বির রাগে ফুলতে লাগল। বলল,”এটা কি হল? কান ছাড় আমার।”

আসাদ বলল,”এখনি তুমি বাইরে যাবে,নাকি তোমার কানটাকে নিয়ে যাব শুধু?”

সাব্বির আসাদের জিদ জানে। সে চলে গেল ওর সাথে।

বাইরে গিয়ে সে রাগে ফেটে গেল। “এটা কি করলা তুমি? তুমি কি বলদ? ”

আসাদ বলল,”যা করলাম ঠিকই আছে।”

সাব্বির রাগে বলল,”তোমার কি হিংসা লাগে? তোমার দিক কেউ ফিরেও তাকায় না বলে?”

আসাদ বলে,”ওই মেয়েগুলোর সামনে যা তুমি করছিলে,ওরা যদি তোমাকে পাত্তাও দিত,দিত তোমার চেহারার জন্য।”

সাব্বির বলল,”হ্যা,জানি,এজন্যই তো তোমার হিংসা,তুমি কদাকার বলে।”

আসাদ সাব্বিরের হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল,”আসো আমার সাথে।”

সাব্বির দেখল,একটা অন্ধ মুখে বিচিওয়ালা এক ভিখারির বউ ভিখারিকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে।

আসাস বলল,”কদাকার জিনিসটা ফ্যাক্টর না। কিছু কাজ করা ফ্যাক্টর।  তুমি যেই ভাবে কৌতুক করছিলে,ভাড়ামি করছিলে,ওতে মেয়েরা হাসে, চেহারা সুন্দর হলে পটে,না হলে অপমান করে। আমি জানি,কারণ কাজ গুলো আমি করতাম। আর চেহারার জন্য যদি কোনো মেয়ে পটে,সে বেশিদিন থাকবে না। তোমার খারাপ দিন আসলেই ভাগবে।”

সাব্বির ঠান্ডা হল। বলল,”এসব কি বল?”

আসাদ বলল,”আমি তোমাকে জনপ্রিয় বানাব। সুপার কুল,স্মার্ট,সবার আকাঙ্ক্ষিত, সবার বন্ধু হতে চাওয়া এরকম একটা ছেলে। এসবই আমার চরিত্রের বিপরীত। তাই আমি আমার সারাজীবনে যেসব কাজ করে এসেছি,তোমাকে সেই কাজগুলোর বিপরীত কাজ গুলো করাব।”

সাব্বির চুপ করে রইল।

আসাদ বলল,”আমি ভিলেন,কমেডিয়ান।  কিন্তু তোমাকে আমি নায়ক বানাব। তবে এর বিনিময় আছে। ছোটবেলায় বলতা না,আমি তোমার বাবা না,মা না,তবে আমি কেন ওসব করি তোমার জন্য? এখনো করছি? কারণ আমি একটা বিনিময় চাই। তুমি যখন প্রতিষ্ঠিত হবা,জনপ্রিয় হবা। তুমি সবাইকে বলবা আমি তোমার বেস্টফ্রেন্ড।সারাজীবনের জন্য।”

আসাদ এই বলে একটা রিকশা ডাকতে গেল। সাব্বিরের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগল।

সেদিন থেকে আসাদ সাব্বিরকে রেগুলার লাইফ এভেন্ট সম্পর্কে উপদেশ দিতে লাগল। 

“যদি কেউ তোমার কাছে কোনো কাজের সাহায্য চায়, সে যদি ছেলে হয়,কাজটার ৫০% করে দেবা,মেয়ে হলে ২৫%। কখনওই কেউ সাহায্য চাইলে সাথে সাথে তাকে পুরো সাহায্য করবে না। এতে ছেলেরা মনে করে শালায় একটা আবাল,আর মেয়েরা মনে করে কেনা গোলাম,আঙুলের ইশারায় নাচানো যাবে।”

সাব্বির তাই করতে লাগল। এতে দুইটা কাজ হল,এক, সবাই মনে করতে লাগল,ছেলেটা চাইলে সাহায্য করতে পারে আর দুই, এই সাহায্যটা পেতে হলে ছেলেটার স্পেশাল কেউ হতে হবে।  সাব্বিরের ব্যাক্তিত্বের দৃঢ়তা দেখে মানুষ মুগ্ধ হতে লাগল।

আসাস বলল,”চুপচাপ থাকবা। অনেকে তোমাকে বলবে আড্ডা দিলে জ্ঞান হয়,যতসব ফালতু কথা। আড্ডা খুবই জঘন্য একটা জায়গা। এখানে আজ যার মূল্য বাড়বে,কালকে কমবে। যদি কখনো তোমার কোনো আড্ডায় যেতেই হয়,চুপ করে সবার কথা শুনবে,সবার হ্যা এর সাথে হ্যা মিলাবে,না এর সাথে না,সবাই যখন মতামত দেয়,নিজেরটা দেবে না। নিনেরটা দেবে একদম শেষে,এমন ভাবে বলবে,তাতে তুমি ভুল হলেও মানুষ তোমার মত মানবে,কারণ তুমি তর্কে জড়াও নি।”

সাব্বির সেটাই করতে লাগল। কলেজ পেরোল,ভার্সিটিতে গেল।

ভার্সিটিতেও কলেজের মতই নিজের ব্যাক্তিত্বটা প্রকাশ পেতে লাগল।এরপর আশেপাশের দৃশ্যপট দেখে,স্বভাবতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা নিয়ে আসাদের সাথে আলোচনা করতে লাগল, সেটা হল প্রেম।

আসাদ বলল,”এক্ষেত্রে সবচেয়ে সাবধান। কারণ এতে একটা মেয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে। তুমি মুগ্ধ করার মত কোনো কাজ কর নি। কিন্তু রেজাল্ট,টাকা আর চেহারার জন্য মেয়েটা মুগ্ধ হচ্ছে,সে যদি এমা ওয়াটসনও হয়,ফিরেও তাকাবে না। প্রেম মানে আবেগের অন্তর্ভুক্তি।  যারা  কোনো বিশেষ কারণে কাছে আসে,তারা আসে আবেগ নিয়ে খেলতে। আমি আতেল ছিলাম। টাকা পয়সাও ছিল,বেশি ছিল না,কিন্তু ছিল,,আমি জানি। মনে রাখবা,তোমার টাকা,ফিগার,চেহারা ভাল হলেও,তোমার চেয়েও এসব বেশি এরকম মানুষ আছে দুনিয়ায়। যারা তোমার এগুলো দেখে আসবে, তারা আরো ভাল অফার পেলে চলে যাবে।”

সাব্বিরের একটা মেয়েকে পছন্দ হয়ে গেছিল। সাব্বির তাই এই উপদেশটা শুনল না। একটা প্রেম করেই বসল।

প্রথম প্রেম। নতুন আবেগ। কয়েকদিন ভালই গিয়েছিল। আস্তে আস্তে সাব্বিরের ভাড়ামি করা কমে গেল,ব্যক্তিত্বের বাইরে গিয়ে সাহায্যপ্রবণতা,চাইলেই সব করে দেওয়া,অতিরিক্ত কেয়ার করা,এসব করতেই মেয়েটা আস্তে আস্তে দূরে সরতে লাগল।

সাব্বির উপদেশ চাইল আসাদের। আসাদ বলল,”আমি তো কখনো প্রেম করিনি।  কিভাবে উপদেশ দেব? আমি তো নরমাল্লি তোমাকে যা যা বলি সেটা হল,আমি তোমার বয়সে যা যা করেছি,সেটার বিপরীত। ”

আসাদ সাব্বিরকে যেভাবে চায়,সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে গেল সাব্বির। এই রিলেশনে,এই মেয়েটার সাথে। এই মেয়েটার মনের মত হতে গিয়ে বাইরের মানুষের সাথেও মেয়েটার ইচ্ছামত চলতে লাগল। এতদিনের গড়া ব্যাক্তিত্ব চলে গেল। চেহারা আর টানে না কাউকে। শেষ বর্ষে এসে সাব্বিরকে ছেড়ে দিল মেয়েটা,কয়েকদিনের মধ্যেই একটা বড়লোকের ছেলেকে বিয়ে করল।।

সাব্বির এই খবর শুনে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে গেল। আসাদ সাব্বির বড় হলেও রাতে ও ঘুমালে ওর রুমে গিয়ে দেখে আসত ও ঠিক আছে কিনা,ছোটবেলা থেকে করে আসছে কিনা। সময়মতই বুঝতে পারল সাব্বির কি করেছে, হাসপাতালে নিয়ে গেল।

সাব্বির জ্ঞান ফিরলে আসাদকে ধরে অনেক কান্নাকাটি করল। আসাদ বুঝল,সাব্বির ভার্সিটি লাইফের আসাদ হয়ে গেছে।  খালি চেহারাটা মায়াবী এই যা। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

সাব্বিরের প্রেমিকার যেদিন বাসর,খোজ নিয়ে সেদিন আসাদ ওর বরের বাসাটা খুজে বের করল। ভাগ্যক্রমে  বেডরুমের জানালাটা ছিল রাস্তার দিকে।

বরের নাম জোগাড় করে,জানালায় একটা ঢিল মেরে সাড়া পাড়া শুনতে পায় এমন চেচিয়ে বলে উঠল,”তোর বউ একটা পতিতা,এখনো টের পাইস নাই? স্কুল থেকে এ পর্যন্ত কত ছেলে গেছে ওইজায়গায়। আমার কাছে ভিডিও আছে,চাইলে দিতে পারি।”

এ বলেই আসাদ দৌড়ে পালাল।

সাব্বির আস্তে আস্তে সেরে উঠল। ওর প্রেমিকার বিয়ের পরেরদিনই ডিভোর্স হয়ে গেছে শুনল। 

আশাতীতভাবে খবরটা শুনে সাব্বিরের মনমরা ভাব চলে গেল।  

যাই হোক,এখন হারানো ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সাব্বিরকে আসাদ বলল,”যে কানাঘুষা করে,চুপ করে থাকবা। একটা কথাও বলবা না। তারপর তুমি আর আমি মিলে সবচেয়ে বেশি এই ব্যাপারগুলো নিয়ে যে আড্ডা দেয়,তাকে টার্গেট করব। তার জীবনের একটক লজ্জাজনক ঘটনা খুজে বের করব। তারপর সুবিধা বুঝে সবার সামনে সে যখন আবার আড্ডায় বিষয়টা উঠাবে,তার লজ্জার বিষয়টা জোরে পুরো ক্লাস শুনিয়ে বলবা। সে হবে নতুন আড্ডার বস্তু। আর মানুষ তোমাকে ঘাটাতে সাহস পাবে না।”

সাব্বির আর আসাদ মিলে এরকম একজন কে টার্গেট করে,তার এক গার্লস স্কুলের সামনে প্রপোজ করতে গিয়ে থাপ্পড় খাবার ঘটনা বের করল।

সাব্বিরের শীতল প্রতিশোধপ্রবণতা দেখে,সারা ক্লাস ঘুমন্ত বাঘের জেগে ওঠার সাথে তুলনা করতে লাগল।

ভার্সিটির সমাপনীতে সাব্বির হল ভার্সিটির ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছেলে।

সাব্বিরের বড় একটা কোম্পানিতে চাকরি হল। আসাদ বসদের সাথে কিভাবে চলতে হয় ব্যক্তিত্ব রেখে,শিখিয়ে দিল। ব্যক্তিত্ব ধরে রাখলে,সৎ আর ধর্ম মেনে চললে চাটুকারিতার দরকার নেই। চরিত্র ধরে রাখার জন্য ধর্মের উপর কোনো অস্ত্র নেই। আর চরিত্র শক্ত হলে কেউই ঘাটাতে আসে না।অন্তত সারাজীবনের ঘটনা থেকে এটা সাব্বির বুঝেছে।

সাব্বিরকে কোম্পানির বসের খুব ভাল লেগে গেল। বস তার একমাত্র মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল সাব্বিরের। 

ওদের কয়েকদিন লাগল বোঝাপড়া আর পরিচিত হতে। আর ঘনিষ্ঠ হতে। আসাদ এই ব্যাপার থেকে দূরে থাকে,আগের প্রেমটাতেও সে দূরত্বই রেখেছিল।

এদিকে জেল থেকে বের হবার পর থেকে টানা ১৭ বছর ধরে নিজের জারজটাকে খুজেছে মহী পাল। পায় নি।এতদিনে তো সে আর নাবালক নেই। সাবালক হয়ে গেছে। চেতনাধারী বুড়োর বাড়িতে তালা। তারমানে জারজটা নিজেও জানে না সে কত বড় সম্পত্তির মালিক।

এদিকে অনেক খোজ নিয়ে সেই যে ছুরি মারার পর তড়পাতে তড়পাতে আফিফা যে হাসপাতালে গিয়েছিল,সেখানের রেকর্ড ঘেটে আসাদুল্লাহ কে বের করল সে। তারপর তার সম্পর্কে খোজ নিয়ে দেখল। হঠাৎ করে একটা বাচ্চাকে পেয়ে শহরের পর শহর ঘুরেছে সে। এখন সেই বাচ্চার ২৫ বছর। এখন তারা ঢাকায় থাকে।

মহী পাল ঢাকায় গেল। ঢাকায় গিয়ে যে খবরটা পেল এতে আনন্দে তার মন ভরে উঠল। 

হ্যা,ছেলেটাকে চিনতে পেরেছে সে। একদম আফিফার মত দেখতে। এসে দেখল,বিশাল কমিউনিটি সেন্টারে এক নামি কোম্পানির মালিকের মেয়ের সাথে ছেলেটার এংগেজমেন্টের ঘোষণা হবে।

ছেলেটার নাম জেনে নিল সে। এংগেজমেন্টের দিন কমিউনিটি সেন্টারে এক হৃদয়ঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। নাস্তিক নানার চক্রান্তের শিকার জামাই মোঃ ইয়াসিন জেল খেটেছে প্রিয়তমা স্ত্রী আফিফা হক কে হত্যার মিথ্যা দায়ে।জেল থেকে বের হয়ে কলিজার টুকরাকে কত খুজেছে সে।

এদিকে কোম্পানির বস এর রাজনৈতিক চেনাশোনা ছিল। একমাত্র মেয়ের এংগেজমেন্ট।মিডিয়াও এসেছিল। ঘটনাটা চোখের সামনে ঘটতে দেখে মিডিয়া ক্রেইজ সৃষ্টি হল।

এদিকে সাব্বির আজ প্রতিষ্ঠিত। যতটাসম্ভব স্মার্ট পোশাক পরে আসাদ এসেছিল। সাব্বিরকে আগেই বলেছিল,”আজ বলবা সবাইকে,আমি তোমার বেস্টফ্রেন্ড। আমার ছেলেবেলা,ছাত্রজীবনে আমাকে উপেক্ষা করা লোকেরা জানবে আমারও বন্ধু হতে পারে,তাও যে সে বন্ধু না,প্রতিষ্ঠিত নামী দামী বন্ধু। একদম ফেসবুকের পোস্টগুলোর মত।”

বাবা ছেলের পুনর্মিলন এর দৃশ্য দেখে আসাদ আর এগোলো না। জন্মদাতা বাবাকে পেয়ে সাব্বিরও তাজ্জব। হতভম্ব ভাব কাটতেই,বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে সে।

আসাদ বাসায় ফিরে এল।

সাব্বির কয়েকরাত বাসায় ফিরল না। আসাদকে ফোনও দিল না।বাবা পেয়ে ব্যস্ত।

এদিকে আসাদের কেন জানি মোঃ ইয়াসিনের ভাবভঙ্গি ভাল লাগল না,একাকী মানুষ এর স্বভাবই ছোঁকছোঁক করা। কৌতুহল দমাতে না পেরে,এই মোঃ ইয়াসিন কে নিয়ে একটু গবেষণা করল।

আফিফা হক,তার বাবা,তার বাবার শ্লোগান, আফিফার প্রেম,মহী পাল,জেল খাটা,সব সে এক সপ্তাহের মধ্যে বের করে ফেলল। তারপর খুজে বের করল,এফিডেবিট করে মোঃ ইয়াসিন নাম রাখা,জাল বিবাহ সার্টিফিকেট তৈরি করা।

সাব্বিরকে ফোন দিল আসাদ। ওরা সবাই সাব্বিরের হবু শ্বশুরের ড্রইংরুম এ। সাব্বির আসাদের ফোন দেখে  অনেক অপরাধী বোধ করল। সে তাই ফোন ধরল না। এই সময়টাতে। আসাদ বুঝল, সম্পত্তির লোভে এই খুনি মহী পাল সাব্বিরের পিছু লেগেছে। এই সম্পত্তি নিতে ও যা খুশি করতে পারে।

আসাদ নিজেই সাব্বিরের হবু শ্বশুরের বাসায় গেল। সাব্বিরকে টেনে নিয়ে পাশে আড়ালে নিয়ে সব কথা খুলে বলল।

কয়েকদিন পর বিয়ে।তাই ঘরের বিভিন্ন জায়গায় মাইক্রোফোন সেট করে ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছে। গান বাজবে জোরে। যেন অনেক দূর যায়।

আসাদ ভুলে সেরকম একটা জায়গায় গিয়েই সব কথা প্রমাণসহ খুলে বলল সাব্বিরকে।

হবু কনের পুরো পরিবার জেনে গেল সাব্বিরের জন্মপরিচয়। বিয়ে ভেঙে গেল।

সাব্বির মহী পালকেও তাড়িয়ে দিল। আসাদকেও। আসাদকে তার কাছ থেকে দূরে যেতে বলার সময়,সাব্বির বলল,”তুমি কারো কিছু হবারই যোগ্য না। বন্ধু তো দূরে থাক।তুমি একটা অভিশাপ।তোমার ছায়া মাড়ালেই জীবন নষ্ট হয়ে যায়।”

আসাদ চলে গেল। অনেক করে বুঝাতে চেষ্টা করল। সাব্বির সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিল।

এদিকে কনেপক্ষ যখন বিয়ে ভেঙে দিল। পাত্রীর মন ভেঙে গেল। মেয়েটা সাব্বিরকে অনেক ভালবেসে ফেলেছিল একয়দিনে। ওর ব্যক্তিত্ব। ওর আচার ব্যবহার দেখে। কিছুদিন পর মেয়েটা সাব্বিরকে ফোন দিয়ে বলল তার কোনো সমস্যা নেই সাব্বিরের অতীতে। যে ঘটনা ঘটেছে,এতে সাব্বিরের হাত ছিল না। আর বিয়েটা সে করবে,তার পরিবার না। এছাড়াও,কথাগুলো ঘরের লোকেরাই শুনেছে,বাইরে যায় নি।একসময় না একসময় মেনেই নিবে পরিবার।

মেয়েটা সাব্বিরকে বিয়ে করে নিল। মেয়ের বাবা দুইদিন খুব ক্ষেপে ছিল। কিন্তু সাব্বির নিজে যখন নিজের কথাগুলো বলল,ওর ব্যক্তিত্বের আলোয় মেনে নিল, মানতেই হল।

যখন স্ত্রীকে সাব্বির বলল,”এত বড় ঘটনার পরেও তুমি কেন ফিরে এলে? আসার তো কথা না, যুক্তি তো তাই বলে।”

মেয়েটা তখন সাব্বিরের ব্যাপারে কিছু মুগ্ধ হবার কথা বলল। যখন বলল,তখন সাব্বিরের কানে আসাদের বলা কথাগুলো বাসতে লাগল। “মানুষকে মুগ্ধ করার কাজ করতে হবে,দেখেই যে মুগ্ধ হবে,সেটা টিকবে না। ”

সাব্বির আসাদের বাড়ি গেল। বাড়িটা তালা মারা। প্রতিবেশী বলল,”খবর শোনো নাই? ওই যে লোকটা তোমার বাবা সেজে এসেছিল,সে পরশুরাতে এসে আসাদ সাহেবকে ছুরি মেরেছে।হাসপাতালে আছে সে।তাড়াতাড়ি যাও।”

সাব্বির হাসপাতালে গেল। আসাদকে অনেক কিছু বলার আছে তার।

আসাদ বেডে শুইয়ে সাব্বিরকে যখন দেখল,চিনতে সময় লাগল। একটা অক্সিজেন মাস্ক। কিন্তু চোখে কিছু একটা শোনার আকুতি।

সাব্বির বলল,”বাবা,,,”

আসাদ হতাশা প্রকাশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

সাব্বির বুঝতে পারল না,সেটাই আসাদের শেষ নিঃশ্বাস ছিল।

সাব্বির বলল,”বাবা,তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”

গল্প ১০৩

​”হাঙরের ডানা”

লেখা : ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

আমাকে কেউ বিশ্বাস করে না, কেউ না। আমি কিন্তু রাখাল বালক নই। তাও আমাকে কেউই বিশ্বাস করে না। আমি ২ বার বাঘ এসেছে বলে চেচাইও নি। যে তৃতীয়বার বাঘ সত্যি আসলেও মানুষ আসবে না বাঁচাতে।

বাঘ প্রথমবারেই আসে। কিন্তু বাঘ এসেছে বলে চিৎকার করলে বাঘ কেন জানি কাছে আসে না। লোকেরা এসে দেখে বাঘ নেই।আমি বলি,ওই যে দেখো,ঝোপের আড়ালে হলদে কালো ডোরা।ভাটার মত জ্বলজ্বলে দুটো চোখ,দেখো দেখো।

কেউ তাকায়ও না পর্যন্ত। এমন একটা বিরক্তিসূচক ভঙ্গি করে,আমার মনে হতে থাকে,বাঘ কেন আমাকে মেরেই ফেলল না,,,,,

আচ্ছা,এসব ঘোরপ্যাচ ওয়ালা কথা অসহ্য লাগছে পড়তে? সত্য কথা আপনারাও মিথ্যা ভাববেন? কমেন্টে lol বলবেন? আচ্ছা শুনুন তবে, ঘটনাগুলো আপনাদের বলি আমি,প্রথম ঘটনাটি ঘটে,আমি যখন ক্লাস ৫ এ পড়ি।

আমাদের যুগ থেকেই হয়ত,বাচ্চাদের ইঁচড়েপাকামি শুরু হয়। ক্লাস ৫ এ থাকতে আমি বাদে আমার ক্লাসের সবাই একটা নির্দিষ্ট কোচিং এ পড়ত। মানে ক্লাসের ভাল ছাত্রগুলো। আমি পড়তাম এক স্যারের কাছে আমাদের স্কুলের। ওখানে সব পিছনের সারির ছাত্ররা পড়ত।

আমি যার কাছে পড়তাম,উনি শুধু ছেলেদের পড়াতেন। মানুষ বলত,বাচ্চা কাচ্চাই তো,শুধু ছেলে কেন পড়ান,মেয়ে পড়ানোরও তো জায়গা আছে।

স্যার কিছুই বলত না। এমতাবস্থায় বৃত্তি কোচিং এ স্কুল থেকে কয়েকজনকে মনোনীত করল।আমাদের একয়জনকে স্কুলের ক্লাস করতে হত না।শুধু বৃত্তি কোচিং।

তো সেসময় ওই যে প্রথম যে কোচিং টার কথা বললাম না? ভাল ভাল ছাত্রছাত্রীরা পড়ত? সেই কোচিং এ, ক্লাস ৫ এর দুইটা ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে একটা কিংবদন্তি ভালবাসার গল্প বের হল। সবার মুখে মুখে চলে সে গল্প।

আমার খুবই শখ জাগল ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখার। কিংবদন্তি বলে কথা। প্রেম ভালবাসা জিনিসটা কি তখনো জানতাম না। আসলে ওই যে টিভি সিরিজ বা মুভিতে কিছু ক্যারেক্টার থাকে না? যারা এক কোণে পড়ে থাকে? তাদের ক্যারেক্টারটা বানানো হয় হাস্যরসের জন্য। বোকাসোকা চেহারা,বোকাসোকা কাজ। আমি ক্লাস ৫ থেকেই ওরকমই একটা ক্যারেক্টার হয়ে গেলাম।

যাই হোক,আব্বু আম্মু বুঝেছিল এটা মহাবিপদ। তারা নিজ থেকে আমাকে দায়িত্ব নিয়ে বিকেলে প্রতিদিন  ক্লাসের রোল ১ এর বাসায় পাঠাত,যাতে আমি বাইরে চলতে পাড়ি,বড় হল প্রবলেম না হয়।

এমন একদিন আমি সেই কিংবদন্তি জুটির মেয়েটাকে দেখলাম। ওদের বাসা রোল ১ এর বাসার সামনেই ছিল।

এখন আব্বু আম্মু ভেবেছিল মানুষ এর সাথে মিশলে আমি আর অদ্ভুত অসামাজিক জীব হিসেবে গড়ে উঠব না। আমিও মেশার চেষ্টা করেছিলাম ওদের সাথে।কিন্তু আমাকে আমার ক্লাসমেটরা গ্রহণ করে নি। আমি কিছুদিন চেষ্টা করে সরে এলাম।

এক বিকেলে দেখি,সেই কোচিং এর যেই কিংবদন্তি জুটিটা আছে,সেই মেয়েটা নিচে।আর জুটির ছেলেটার বেস্টফ্রেন্ড উপরে।

বেস্টফ্রেন্ডটা এমন কিছু কথা লুকিয়ে লুকিয়ে বলছিল মেয়েটাকে দেখে,আমি এর মানে তখন বুঝি নি। এখন বুঝি,কিন্তু অপ্রকাশ্য।

বেস্টফ্রেন্ডটা বুঝে নি আমি পিছে দাঁড়ানো। অবশ্য হঠাৎ ভয় পেয়ে পিছু ফিরেছিল। যখন দেখল আমি দাঁড়ানো,ভাবল আমি আর এমন কে,তারপর যা যা বলছিল তাই বলতে থাকল আস্তে করে।

কেউ বিশ্বাস করছেন না আমার কথা? ক্লাস ৫ এ? ছিঃ,,, লেখকের মানসিকতা কি খারাপ। ভাই,বোন,আপনারা নিজে ক্লাস ৫ এ কি কি করেছিলেন ভেবে দেখুন তো।।

আমি করলাম কি রোল ১ কে বলে দিলাম ও কি কি বলেছে,আমি তো আর মানে জানতাম না কথাগুলোর। তবে মানুষজন এর রিএকশন দেখে বুঝলাম মারাত্মক কিছুই,সবাই জিভ কামড়াল। কিংবদন্তি জুটির ছেলেটা জানতে পারলে খবর আছে,হেন তেন।

রোল ১ আর তার বন্ধুদের মাধ্যমে সারা স্কুল জানল এই কাহিনী।

কিন্তু মাইরের ভয়ে কান্নাকাটি করে আর নায়কের মত আমার কলার চেপে ধরে বেস্টফ্রেন্ড এমন এমন কিছু ডায়ালগ দিতে লাগল,আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। আমি না আবার শেষে মাইর খাই। নায়কের মত বলতে লাগল,”বল যা বলেছিস সব মিথ্যে,বল,,”

আমি না বলেই দিলাম সব মিথ্যে। 

আমি টিভি সিরিজের সেই আতেল খারাপ ছেলেটা। ভদ্র ভাষায় বলে weirdo।  নায়কেরা বলে সাইকো,সমস্যা আছে অনেক।

স্কুলে তখন থেকে আমার নামে দুইটা কথা ছড়াল। আমি মিথ্যে বলি,আর প্রচন্ড অশ্লীল কথা বলি। বানিয়ে বানিয়ে অশ্লীল কথা বলেছি।

মিশত না কেউ তখন থেকেই। মাঝে মাঝে লুকিয়ে কিছু ছেলে আসত,অশ্লীল কথা শুনতে,কারণ তারা খুব মজা পেত।আমি তো পারতাম না।

স্কুল লাইফটা চলে গেল। সেই ঘটনার পর যে দূরত্বটা আমার ভাল ছাত্রদের সাথে তৈরি হল,সেটা আর ঘুচল না। পিছনের সারির ছেলেদের সাথে মিশতে লাগলাম। মানুষ বলে,পচা আমের ঝুড়িতে একটা ভাল আম ঢুকলে সেটাও পচে যায়। তবে আমার ঝুড়ি পচা আমগুলো কিন্তু আস্তে আস্তে ভাল হয়ে উঠল।

হয়ত শেষ মুহুর্তে ভালবাসা পেতাম সবার। কিন্তু বেঢপ চেহারা আর শরীরের জন্য ক্লাসের ভাল ছেলেরা,স্টাইলিশ ছেলেরা বর্জনই করতে থাকল। আমি ছিলাম বিকৃত একটা জিনিস।

কলেজ লাইফটার কথা আর বললাম না।বন্ধু বানানোর চেষ্টা করি নি পূর্ব অভিজ্ঞতার জন্য। এটা লাইফের বেস্ট ডিসিশন ছিল। নিজেকে একটা রহস্যের ভিতর রেখেছিলাম।কলেজের ক্লাসমেটরা আমাকে বিশেষ কিছুই ভাবত। রহস্যময়, অলৌকিক কিছু।

তবে শেষের দিকে কোন বইয়ে যেন পড়লাম কলেজে বন্ধু থাকতে হয়।স্কুলে ছিল না বলে কি কলেজেও থাকবে না? ভাবলাম এখন মনে হয় বন্ধু বানাতে পারব।

বন্ধু বানাতে গিয়ে এমন একটা ছেলেকেই বাছলাম যে আমার অতীত জানত।বুঝতে পারি নি কত বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম। তবে সমস্যা শুরু হবার আগেই এইচ এস সি পরীক্ষা এসে গেল।

এরপর চান্স পেলাম মেডিকেলে,কলেজে শেষ দিকে যাকে বন্ধু বানাতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলাম,সেও ভর্তি হল আমার সাথেই। আমার স্কুলের একটা ছেলেও ভর্তি হল। আমি যতটা পারি দুইজনকে এভয়েড করতে লাগলাম।

স্কুলের যেই ছেলেটা চান্স পেল।তার নামে কলেজে কিংবদন্তি ছড়িয়েছিল।

কোন ইমামের মেয়েকে নাকি সে কলেজ লাইফে পটানোর মত অভূতপূর্ব কার্যসাধন করেছিল। শুধু পটানো না,এমন ভাবে পটিয়েছিল,ইমামের মেয়ে নাকি জন্মদিনের গিফট হিসেবে নিজের শরীর দান করেছিল তাকে।

ঘটনাটা আমাদের স্কুল কলেজের  এমন কেউ ছিল না,যে না জানত। আমারো কানে এসেছিল।

ইমাম সাহেব এই ঘটনা জেনে মেয়ের লেখাপড়া বাদ দিয়ে বিয়ে দিয়ে দিল। মানুষ তো বলতে লাগল,হায়রে ধর্ম,মেয়েদের শিক্ষালাভ করতে দেয় না। আসল কাহিনী যদিও এর থেকেও লজ্জাজনক ছিল।

ক্লাস ৫ এর পর আমি আরেকবার বলদামি করলাম।কিছু কথা গোপন রাখতে হয়। সবার জন্য ভাল তাতে।

ছেলেটার ক্রাশ খাওয়া একটা মেয়েকে আমি বলে দিলাম ওর অতীত।  মেয়েটা প্রচন্ড ভালবাসত তাকে। আমার কথা শুনে মেয়েটা সেসময় ছেলেটাকে প্রত্যাখ্যান করল।

আপনারা জানেন,যে পাপ কখনো চাপা থাকে না,সত্য প্রকাশ পাবেই।

আচ্ছা,কোনটা পাপ ছিল,সত্যই বা কোনটা ছিল। আমি যেটা তখন করেছিলাম সেটা?

নাকি আমার এভাবে স্কুল মেটের নামে কথা ছড়ানোটা পাপ ছিল। এটা সত্য ছিল। এটা প্রকাশ পেল?

কলেজের সবাই জানল একটা পবিত্র প্রেমে আমি বাধা দিয়েছিলাম।আমি শয়তান। আমি ভিলেন। আসলে ছেলেটার এমন কোনো খারাপ অতীত নেই,সব আমার বানানো।

ছেলেটা কিন্তু প্লেবয় আর থাকল না। যেই মেয়েটাকে “বাঁচাতে” আমি ওর অতীত বললাম।তাকেই সে বিয়ে করে নিল।সুখি দম্পতি।

তাহলে আমি যে মিথ্যাবাদী, এটা সবার কাছে প্রমাণ হয় না কি? 

পরের ঘটনাটা ঘটল,আমি যখন ইন্টার্র্নি করি। একটা ছেলে কীটনাশক  খেয়ে হাসপাতালে ঢুকল। মুখ থেকে গেজলা বের হচ্ছে।

আমি ছেলেটার কাপড় চোপড় খুলে,পেটটা ওয়াশ করলাম। পেট থেকে কিন্তু একটুও বিষ বের হল না। বুঝলাম,অনেকক্ষণ আগে খেয়েছে। আত্মীয়রা ওকে আনতে অনেক দেরি করে ফেলেছে।

তাড়াতাড়ি এট্রোপিন ইঞ্জেকশন দিতে লাগলাম। গুনে গুনে ২৪ টা দিলাম। আর চোখে লাইট ধরলাম। চোখের সুইয়ের মত ছিদ্রটা যদি বড় হয়,রোগীর বাচার সম্ভাবনা আছে।

কিন্তু ছিদ্র আর বড় হল না।এন্টিডোট প্রালিডক্সিম দিয়েও লাভ হল না। বইয়ে ঠিকই বলে ২৪ ঘন্টা হয়ে গেলে রোগী বাঁচে না।

রোগী মরতেই রোগীর আত্মীয়রা আমাকে ঘুষি মারতে লাগল। এদিক থেকে একজন মারে,ওদিক থেকে আরেকজন।আমার সহকর্মীরা দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।

আমি যখন রক্তাক্ত,তখন সাংবাদিকরা এল। তারা আসতেই আমি বই নিয়ে এলাম। রোগীর আত্মীয়রা এতক্ষন আমাকে মারতে মারতে বলছিল আমি নাকি ২৪ টা ইঞ্জেকশন দিয়ে তাদের রোগী মেরে ফেলেছি। 

আমি দেখলাম,সাংবাদিকরা সেই আত্মীয়ের কান্নার ভিডিও করছে। আমি বই খুলে চিকিৎসার পৃষ্ঠায় ক্যামেরা ধরতে বললাম,সাংবাদিকরা যখনি দেখল আমি যা করেছি,সেটা ঠিক,সাথে সাথে ক্যামেরা বন্ধ করে দিল।

সেই আত্মীয়টা পরে নিজের জবানবন্দি পরিবর্তন করে নিল। বলল আমি ২৪ টা ইঞ্জেকশন দিই নি।একটাও ইঞ্জেকশন দিই নি। উলটা তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুন্দরি নার্সের সাথে গল্প করছিলাম।

আমার সহকর্মীরা তো আমাকে চেনে,আমি মিথ্যাবাদী।আমি রাখাল বালক।সবটা দেখেও আমার পাশে তারা দাড়াল না। 

আমাকে আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর হেড বলল,”কয়েকদিনের জন্য পালাও।পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে ফিরে এসো।”

আমি বললাম,”স্যার আমি তো কোনো দোষ করি নি।”

স্যারের কাছে উত্তর ছিল না।

আমি পালালাম।আমাদের গ্রামে। আমাদের গ্রামটা এখন ভুতুড়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক গ্রাম। যোগাযোগব্যবস্থা খুব খারাপ। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন।

ভাবলাম,এখানেই থাকব। আমার জন্য উপযুক্ত জায়গা।

তবে শহরে পরিস্থিতি ঠান্ডা হতেই আবার ফিরে আসতে হল। তবে যেখানেই যাই,মানুষ আমার দিকে আঙুল তোলে।বিড়বিড় করে কি জানি।

আমি তখন একা,আমার কেউ নেই। বয়স ৩০।  ঢাকার এক হাসপাতালে চাকরি করি। 

একদিন একটা মেয়ে এল খুবই খারাপ অবস্থা তার। প্রচন্ড জ্বর। গায়ের চামড়ার নিচে লাল লাল ছোপ।

স্থানীয় ডাক্তারের কাছে নাকি অজ্ঞান অবস্থায় গিয়েছিল। ডাক্তার তার অবস্থা দেখে ধারণা করেছিল ডেঙ্গু। বলেছিল,এক্ষনি আমার হাসপাতালটায় যেন আনে। এটা আধুনিক। রোগী বাচার সম্ভাবনা আছে।

মেয়েটার ক্লাসমেটরা  মেয়েটাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে এল। বেশ সুন্দরি মেয়ে। প্রচন্ড শরীর খারাপের ভিতরও রূপ কমছে না।

একটা সুদর্শন ছেলে সামনে থেকে নায়কের মত করছে।পুরো বাংলা সিনেমার মত আমার কলার চেপে বলল,”ও আমার সবকিছু ডাক্তার সাহেব,ওকে বাঁচান প্লিজ।”

আমিও বাংলা সিনেমার কমেডিয়ান ডাক্তারদের মত বললাম,”হ্যা হ্যা”

ওরা রক্ত পরীক্ষার রক্ত নিয়ে গেল। আমি কনফিউজড, ডেঙ্গু মাঝে মাঝে রক্তে ধরা পড়ে না। স্বাভাবিক পরীক্ষায় তো না ই।ডি এন এ এন্টিবডি পরীক্ষায়ও না। আর ডেঙ্গুর চিকিৎসা স্পেসিফিক নেই। শুধু স্যালাইন দিয়ে রোগীর ভলিউম ঠিক রাখা।রোগী যাতে শকে গিয়ে না মরে। তবে মেয়েটা অলরেডি শকে গেছে।

আমি রুমটা খালি করলাম। রুমে শুধু আমি আর মেয়েটা। আমি নার্সের অপেক্ষা না করে নিজেই ওর হাতে ক্যানুলা পড়াচ্ছি। হাতটা ধরতেই সে আমার হাতটা চেপে ধরল। আমি ওর দিক তাকালাম।

ও বলল,”আমাকে বাচান। আমার ডেঙ্গু হয় নি। আমার বয়ফ্রেন্ডটা অমানুষ। ও আমাকে প্রেগন্যান্ট করে দিয়েছিল। বিয়ের চাপ দিতেই বলেছিল পরে করব। এবরশনটা হাসপাতালে এনেও করায় নি।একটা নোংরা জায়গায় করিয়েছে। এবরশনের পর থেকে আমার এই অবস্থা।”

আমি সাথে সাথে বুঝে গেলাম,এটা একটা সেপটিক এবরশনের কেইস।

আমি এন্টিবায়োটিক দিতে লাগলাম ক্যানুলায়। মেয়েটা এক ঘন্টার ভিতর স্বাভাবিক হতে শুরু করল। আমি এক গাইনেকোলজিস্টকে ডাকতে গেলাম। রোগীর সাথে আসা লোকদের বললাম,”রোগী ভাল আছে।”

ক্লাসমেটগুলো রাত হওয়ায় আস্তে আস্তে চলে গেল। শুধু রয়ে গেল বয়ফ্রেন্ডটা।

আমি গাইনেকোলজিস্টকে খবর দিয়ে এসে রুমের বাইরে আসতেই মেয়েটার গোঙানি শুনলাম। আর ছেলেটার হিসহিসানি, “মাগী,তুই বেচে থাকলে তো আমার সমস্যা। বদনাম করবি আমার। নতুন যে মেয়েটাকে পছন্দ হইছে,তার কানে লাগাবি,,,”

আমি যখন রুমে ঢুকলাম,বয়ফ্রেন্ডটা ঘুরে আতংকের সাথে তাকাল।তারপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে একছুটে বেরিয়ে গেল।

আমি মেয়েটার কাছে গেলাম। মেয়েটা হা করে চোখ খুলে আছে। মরে গেছে।

পরেরদিন হাসপাতাল ভাঙচুর হল। ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু। আমাকেও আমার অফিস থেকে বের করে বেশ কয়টা ভাঙানি দেওয়া হল। রক্তাক্ত হলাম আবারো।

সাংবাদিকরা এল। আমার ছবি তুলতে লাগল। অনেক করে কালকে রাতের ঘটনা বলছিলাম। এও বলছিলাম। এটা ডেঙ্গু ছিল না। সেপটিক এবরশন। মেয়েটা নিজে আমাকে বলেছে। আমি ওষুধ দেওয়ায় সেরেও উঠছিল।

কেউ বিশ্বাস করল না। কারণ আমি মিথ্যাবাদী।  এত ভাল একটা মেয়ের নামে অপবাদ? মেয়েটা পবিত্র ছিল। মৃত্যুর পর তার চরিত্রে কালিমা লেপন? একে মেরে ফেলেছি,আবার কলঙ্ক দিচ্ছি? নির্দোষ মানুষ এর নামে অন্যদের কানে লাগানো তো আমার পুরনো স্বভাব।সেই ক্লাস ৫ থেকে।

ওদিকে আমার নাক ফাটিয়ে দেওয়া বয়ফ্রেন্ড।এখন সাংবাদিক দেখে একটু পর পর অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে প্রেমিকার অকালমৃত্যুর শোকে।

সবাই বলছে,এক ডাক্তার নিজে বলল ডেঙ্গু, রিপোর্ট করতে দিয়ে না দেখেই আমি ভুল চিকিৎসা করে মেরে ফেলেছি রোগীকে।

আমার পাশে কেউ দাড়াল না। কোনো ডাক্তার কমিউনিটিও না। এক ডাক্তার তো বলেছেই ডেঙ্গু। আমার ডায়াগনোসিস এর কোনো ভিত্তি যে নেই।এছাড়া,আমার তো ইতিহাস আছে,২৪ টা এট্রোপিন ইঞ্জেকশন দিয়ে রোগী মেরে ফেলার।

আমার জেল হল। ডাক্তারির লাইসেন্স বাতিল হল। ১৪ বছর পর আমি যখন জেল থেকে বের হলাম,চারিদিকে  অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য আগের ডাঙাগুলো আস্তে আস্তে পানি ভরিয়ে দিচ্ছে,লোনা পানি।সাগরের জীবেরা নদীতে ঢুকছে। হাঙরও।

আমি আমার গ্রামের ভুতুড়ে বাড়িতে গেলাম। বাকি জীবন এখানেই কাটাব। 

তবে আমার বাড়ি এখন ভুতুড়ে নেই। শান্তিময় গ্রাম আর সুন্দর নদী বলে আমাদের পাশের নদীটার  নাম ছড়িয়েছে। দেশ বিদেশের মানুষ আসে দেখতে এই নদী। আগে নদীটার ওপার দেখা যেত। এখন যায় না। লোনা পানি ভরে গিয়েছে।

আমি যখন গেলাম সেখানে,দেখি আমাকে অনেকেই চেনে,স্পেশালি বাংলাদেশিরা। তারা বিদেশিগুলোকেও কানে কানে কি জানি বলে। সবাই আমাকে এড়িয়ে চলে।

নদীতে অনেক ঢেউ।স্পিডবোট,নৌকায় মানুষ ঘরে,বাচ্চারা রাবার টিউবে করে বাসে, পাড়ে ঠাইয়ের জায়গায় মানুষ অর্ধনিমজ্জিত থাকে।

আম নামি না। আমি নদীর পাড়ে বসে এসব দেখি।

হঠাৎ একটা হাঙরের ডানা দেখলাম,নদী কেটে আসছে পাড়ে। একটা বাচ্চার দিকে। 

আমি আতকে উঠলাম। বাচ্চাটাও চিৎকার দিল। হঠাৎ করে শেষ মুহুর্তে হাঙরের ডানা মাথায় তুলে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। পাড়ের সবাই হেসে উঠল।

এরকম অসংখ্য হাঙরের ডানা দেখা গেল নদীতে। বন্ধুদের ভয় দেখাচ্ছে বন্ধুরা। আমার তো বন্ধু নেই। তবে এসব বন্ধুত্ব দেখে আর আমি হিংসায় কষ্ট পাই না।

হঠাৎ একটা হাঙরের ডানা কেমন জানি দেখাল। এটা তুলনামূলক জোরে চলছে। একে বেকে নদী কেটে আসছে মানুষ এর দিকে।

মায়ের হাত ধরে একটা বাচ্চা খেলছে পানিতে।মা হাসছে। হাঙরের সেই ডানাটা কাছে এল। বাচ্চাটা মায়ের হাত ছেড়ে পানির নিচে তলিয়ে গেল। 

মা তো অবাক। তবে এখন হাসছে।”এই দুষ্টুমি করিস না,বাবু আমার ভয় পাবে।”

আমি নদীর পারে একটা বড় গাছে উঠলাম। সেই নির্দিষ্ট হাঙরের ডানাটা দেখে। উপর থেকে ডানার নিচে ৩০ ফুটের মত লম্বা একটা দানবীয় মাছের কাল ছায়া দেখলাম। একটা গ্রেট হোয়াইট হাঙর।

আমি চিৎকার করে বললাম,”হাঙর, হাঙর,,পানি থেকে উঠে যান,সবাই,,হাঙর হাঙর।”

কয়েকজন ভয়ে আশেপাশে ফিরল।”কই? কই হাঙর?”

বিস্ময়ের সাথে দেখলাম,হাঙরটা গতি কমিয়ে দিল।একে বেকে না সাতরে অন্য সব ভান করা মানুষ এর মত আস্তে আস্তে সোজা সাতরাতে লাগল।

আমি বললাম,”ওই যে,ওই কালো টা। ওই যে।”

সবাই বলল,”কোন কাল টা? সবই তো কালো।”

একজন বলল,”আরে এর কথা কি শুনছিস? এ তো মিথ্যাবাদী,জেল খেটে এসেছে।খুনী।”

সবাই চিল্লিয়ে বলল,”মিথ্যুক।”

হাঙরটা আস্তে আস্তে সাতরাল। আমি দেখলাম। মানুষ এর কাছে এল,যার কাছে যায়,সে তলিয়ে যায়,আর ওঠে না। তার আত্মীয়রা ভাবে,হাঙর ডানা মাথায় তোলা বন্ধু গুলো খেলছে।

আমি দৌড়ে বাড়ি এলাম। পুরোনো মাছ ধরার একটা বর্শা খুজলাম।পেয়েও গেলাম। ওটা নিয়ে দৌড়ে নদীতে নামলাম। নদীর পানি চাপড়ে চিল্লিয়ে বললাম,”ওই,এদিকে আয়,ওদের ছাড়,আমাকে ধর।আমার কাছে আয়,আয়।”

হাঙরটা আসতে লাগল আমার দিকে,ডানা টা পানির তল কাটছে। আমি বর্শা উচিয়ে আছি। কাছে এলেই মারব।

সিকিউরিটি পুলিশ বন্দুক তুলে দৌড়ে এল। আশেপাশের মানুষ ডানাটা দেখল,বলল,”আরে মানুষ খুন করবে নাকি? ওটা তো মানুষ। খেলতে যাচ্ছে মিথ্যুকটার কাছে।মেরে ফেলবে নাকি মিথ্যুকটা?”

হাঙরটা আসছে। হাঙরের বিশাল মাথার দু পাশের ভাবলেশহীন চোখ আমি দেখতে পাচ্ছি। বিশাল বড় গহবরের মত মুখটা হা হল। মুখের বর্ডারে ছুরির মত দাত।আমার দিকে এগোচ্ছে।

মানুষ চেচিয়ে সিকিউরিটি পুলিশকে বলছে,”করছেন কি আপনারা? ওকে ঠেকার,বর্শা দিয়ে মানুষ খুন করবে তো।”

আমি বর্শা উচিয়ে রইলাম।কাছে এলেই এটা আমি হাঙরটার মাথায় ঢুকাব। 

সিকিউরিটি পুলিশের বন্দুকটার লক খোলার শব্দ শুনলাম। আমি বর্শাটা চালাতে গেলেই,ওরা আমাকে গুলি করে মারবে।

গল্প ১০২

​”পিশাচিনী”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

সেদিন এনাটমি ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা বসে ছিল। এনাটমি ডেমো ক্লাস। এরা সবাই ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা দিয়ে ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখেছে সেকেন্ড টার্মের জন্য তাদের গ্রুপে নতুন এক স্যার এসেছে।

মাত্র ৩ সপ্তাহের মধ্যেই পুরো গ্রুপের মধ্যে স্যার জনপ্রিয় হয়ে গেল। স্যারের বয়স কম। অন্য স্যারদের মত রাগীও না,ছাত্রছাত্রীদের পেইন দিতে পৈশাচিক মজাও পায় না। বরং এত সুন্দর করে বুঝায় যে,গ্রুপের সবচেয়ে অনিয়মিত এবং অমনোযোগী ছেলেটাও প্রত্যেকটা দিন অন্য কোনো ক্লাস না করলেও শুধুমাত্র এনাটমি ক্লাসটা করতে আসে।

এনাটমির টপিকগুলো এত সুন্দর করে বুঝায়,যে এই গ্রুপের ছেলেমেয়েরা বাইরে গিয়ে তাদের রুমমেট, বন্ধু বান্ধবীদের যখন বর্ণনা দেয়,হিংসায় মরে যায় অন্যরা,কেন এই স্যার তাদের কপালে পড়ল না!

মাত্র ৩ সপ্তাহে স্যার এতই জনপ্রিয় হয়ে গেল,যে তার গ্রুপের ছাত্রছাত্রীগুলো একদম ফ্রি হয়ে গেল তার সাথে।মেডিকেল জীবনে ছাত্রছাত্রীদের স্যার ম্যাডামদের সাথে ফ্রি হবার ঘটনা খুবই বিরল। মাঝে মাঝে অন্য গ্রুপের ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের এনাটমি ক্লাস বাদ দিয়ে এই ক্লাসে এসে নিজেদের ঘাটতিগুলো পূরণ করে।

স্যারকে তার ক্লাসে গন্ডগোল থামাতে আলাদা ভাবে কথা বলার দরকার হয় না। মানুষ কে কনভিন্স করা,কাজ আদায় করে নেওয়ার শিল্পটা তিনি খুবই ভাল করে জানেন। এমন অবস্থা যে,অন্য ক্লাসে পিছে বসে ফেসবুকে ঢোকা ছেলেমেয়ে গুলোও স্যার পড়ানো শুরু করলে খাতা কলম বের করে স্যার এর মুখ থেকে বের হওয়া প্রত্যেকটা অক্ষর তুলে রাখে।

স্যারের নাম আমিনুল ইসলাম। ডাঃ আমিনুল ইসলাম। কলেজের সব ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় আমিন স্যার।

একদিন ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানার ঠিক দুইদিন আগে,সারা সকাল ধরে ঝুম বৃষ্টি।এতটাই প্রবল বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপটা যে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত রাস্তাটা ফাকা,পানি জমে গেছে। 

স্বভাবতই কলেজে কোনো গ্রুপের ছাত্রছাত্রী ই আসে নি। তবে আমিন স্যারের গ্রুপের কয়েকজন ভাবল,স্যার তো কলেজের উপরেই একটা রুমে থাকে,স্যার ক্লাসে আসতেও পারে। তারা তাই গ্রুপের সবাইকে বলে দিল যে এই দুর্যোগ এর ভিতরেও তারা আমিন স্যারের ক্লাসে যাবে।

অন্য সময় হলে গ্রুপের আতেলদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠত।তবে আমিন স্যারের ক্লাস বলে কথা। হোস্টেলের ছেলে মেয়ে হাটুর উপর প্যান্ট/পায়জামা তুলে পানি ডিঙিয়ে তো এলই,যারা লোকাল,তারাও ১০০ টাকা রিক্সাভাড়া দিয়ে রিকশার পর্দার আড়ালে এই বৃষ্টিতে শুকনো থাকতে ব্যর্থ  হয়ে কলেজে চলে এল।

এসে দেখল,স্যার আসলেই ক্লাসে দেখতে এসেছে কয়জন এসেছে।একদম পুরো ক্লাস চলে এসেছে  দেখে স্যার রীতিমত ঘাবড়ে গেল। এ কেমন আতেল পোলাপান!

যাই হোক,স্যার স্টোমাক এর ভিসেরাটা ধরে পড়ানো শুরু করল। একদম ছোট সাবজেক্ট, ইম্পরট্যান্ট প্রশ্নগুলো বলে,আর ভিসেরাটা বুঝাতে ৩০ মিনিট এর বেশি লাগল না। ক্লাসের সময় ২ ঘন্টা। স্যার কখনো একদিনে একটা ভিসেরা বা বোনসের বেশি পড়ান না। এটা তার স্টাইল। তো এখন কি হবে? 

কাচের জানালার বাইরে বৃষ্টির তোড় আরো বাড়ল। সাথে বাতাসের ঝাপটা। ঘূর্ণিঝড়টা আসতে দুইদিন বাকি। তাও এই অবস্থা।অনেক কষ্টে ছাত্রছাত্রীরা আসতে পেরেছে বটে,তবে এখন যে অবস্থা,বের হবার পথ নেই। একহাত দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সাথে একটু পরপর বাতাসের শো শো শব্দ,আর বিজলীর চমক,এবং বজ্রপাত…..

হঠাৎ ছাত্রদের মধ্যে একজন বলল,”স্যার গল্প বলেন একটা”

ক্লাসের সবাই হেসে দিল। মেডিকেলের স্যার ক্লাসের ভিতর ইতিহাসে কখনো গল্প বলেছে কিনা পড়ার বাইরে সেটা জানা যায় নি।

আমিন স্যার বললেন,  “কিসের গল্প শুনবা?”

সাহস করে একটা মেয়ে বলল,”স্যার,ভূতের গল্প”

ক্লাসের কয়েকজন হেসে দিলেও বেশ কয়েকজন বলল,”হ্যা স্যার,অসম্ভব সুন্দর আবহাওয়া। ভূতের গল্পের জন্য পারফেক্ট। ”

বলতে না বলতে কারেন্ট চলে গেল। মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে কারেন্ট যায় না। যদি যায়,বুঝতে হবে কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে।

ক্লাসের সবাই বলে উঠল, “পারফেক্ট।”

আসলেই পারফেক্ট। সকাল ৯ টা বাজে।এখনই পাশের চেয়ারে বসা ছেলেটাকে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।বাইরে বৃষ্টির তোড় যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

স্যার একটা শ্বাস নিয়ে বলল,”আচ্ছা শোনো তবে,,,”

ক্লাসের সবাই চুপ করে শুনতে লাগল। স্যার গল্প বলা শুরু করলেন।

“এম বি বি এস পাশ করার পর ইন্টার্নের সময়ই বি সি এসের জন্য প্রিপারেশন নিতে শুরু করেছিলাম। সবাই বলত,”ইন্টার্নের চাপে এই প্রেশার কেন নিচ্ছ? ব্যাচের সবার সাথে আগামী বছরই দাও।”

কিন্তু সবার আর আমার ব্যাপারটা আলাদা। আমার স্ত্রী তখন আমার প্রেমিকা ছিল। ওর বিয়ের কথা হচ্ছিল অন্যত্র। তার ফ্যামিলি প্রতিষ্ঠিত ছেলে চায়। মেয়ের পছন্দে মেয়ে বিয়ে দেবে না। আগে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। 

ও অনেক কষ্টে,অনেক মিথ্যা বলে বলে এমন পরিস্থিতি বানাল যে অন্তত এক বছর যেন ওর বিয়ে নিয়ে কেউ মাথা না ঘামায়। তাই আমার হাতে সময় ছিল এক বছর। এর মধ্যেই অন্তত বি সি এস করতে হবে।যাতে একটা সরকারী চাকরি পাকাপোক্ত ভাবে থাকে।

আমি শুধু জানতাম বি সি এস আমাকে দিতেই হবে,এবং টিকতে হবে। তবে বি সি এস দেবার পর কি হবে তা নিয়ে আমি কখনওই কারো সাথে কথা বলি নি। আমার তখন একটা কথাই মাথায় ছিল,ইন্টার্ন শেষ হতে না হতেই যাতে আমার একটা চাকরি হয়।

আল্লাহ এর কাছে অনেক দোয়া করতাম এজন্য।কারণ যদি পাশ না হয়,সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমার স্ত্রী,মানে তখন যে আমার প্রেমিকা ছিল,তাকে আমি খুবই ভালবাসি এবং ভালবাসতাম। এতই বেশি,যে আমি তাকে হারানোর কথা চিন্তাই করতে পারতাম না।

আল্লাহ আমার কথা শুনল। আমার বি সি এস হল। আমার চাকরিও হল। আমি আমার স্ত্রীর বাবার কাছে গিয়ে আমার স্ত্রীকে চাইলাম। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি রাজি হলেন। অনিচ্ছার কারণ আছে অবশ্য।আমার স্ত্রীর জন্য অনেক বড়লোক আর অভিজাত পাত্রের প্রস্তাব আসত।

যাই হোক,আমাদের বিয়ে হল। বিয়ের পর চাকরিতে জয়েনের যখন সময় এল,তখন আমি দেখলাম,আমার পোস্টিং পড়েছে একটা উপজেলায়। এই জেলার সবচেয়ে প্রত্যন্ত উপজেলা সেটা। শিক্ষা,স্বাস্থ্য,যোগাযোগব্যবস্থায় খুবই পিছানো।

ভাগ্য ভাল,উপজেলার যে স্বাস্থ্য কম্পলেক্সে আমার পোস্টিং পড়ল,সেই জায়গাটা মোটামুটি ছোটখাটো একটা শহরই। কারেন্ট আছে,পাকা রাস্তা,তবে ইন্টারনেট স্লো খুব।

তবে উপজেলার মধ্যে যত ইউনিয়ন আছে,একটাতেও একটাও তৃণমূল স্বাস্থ্য কম্পলেক্স নেই,যদিও থার্ড ইয়ারে কমিউনিটি মেডিসিনে পড়েছিলাম বাংলাদেশের সবজায়গাতেই এগুলো থাকার কথা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কম্পলেক্সটায় ডাক্তার আমি একাই ছিলাম। আর ছিল দুইটা নার্স। একজন পুরুষ নার্স,সে বুড়ো। আরেকটা মেয়ে নার্স,সে যুবতী,এবং হাসপাতালের কাছেই থাকত।

আমার থাকার কোয়ার্টারটা ছিল উপরতলায়। এখন যেরকম থাকি সেরকমই অনেকটা।তবে সুযোগ সুবিধা খুবই কম। একটা ফ্যান,একটা লাইট,একটা ছারপোকায় ধরা বিছানা। একটা ভাঙা চেয়ার টেবিল।

আমি বুঝলাম,আমার স্ত্রী এজায়গায় একটুও থাকতে পারবে না।  এমনকি ও এই যে বিভাগীয় শহরে আমি থাকি এটাতেও থাকতে পারে না। ও অনেক বিলাসের ভিতর বড় হয়েছে।

আমি এখনকার মতই ব্যবস্থা করলাম। স্ত্রীকে সাথে নিলাম না। প্রত্যেক শুক্রবার তার সাথে দেখা করতে ঢাকা যেতাম। বাকিদিন আমরা আলাদা থাকতাম। ও ঢাকায়,আমি সেই উপজেলায়। ও কান্নাকাটি করত বলে একবার কয়েকদিনের জন্য রেখেছিলাম উপজেলায়,অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।

যাই হোক,বি সি এস এর জন্য পড়ার সময় বুঝতে পারি নি। হাড়ে হাড়ে টের পেলাম উপজেলায় ডাক্তার হয়ে যাওয়াটা কি জিনিস।

কুসংস্কারে ভরা এখানকার লোকেরা। এই যুগেও। সাপে কামড়ালে ওঝা ডাকে,মৃগীরোগের জন্য চামড়ার জুতা শুকায়,হিস্টিরিয়া হলে ভূত ধরেছে বলে ঝাটা দিয়ে পিটিয়ে আধমরা করে দেয়।

হাসপাতালে আমার অফিসের চেয়ার টেবিল,আলমারি  সেখানের স্বাস্থ্যকর্মী,পিয়নরা ভাগ বাটোয়ারা করে বিক্রি করে দিয়েছিল। নিজ খরচে চেয়ার টেবিল, আলমারি আনা পোষায় না।প্রথম কয়েকদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বা রোগীর ফাকা বিছানায় বসে বসে অফিসের কাজ করলাম।

পিয়নগুলো ছিল লাটসাহেবের বেটা। কোনো কাজে ডাকলে ফোন টিপতে টিপতে আঙুল উচিয়ে আমাকে অপেক্ষা করতে বলত।

উচুগলায় ধমকিয়েও লাভ হত না। উলটা বেশ কিছু কথা শুনিয়ে দিত,পিছন থেকে ফোড়ন কাটত। 

একদিন করলাম কি,ওদের শুনিয়ে আমার স্ত্রীকে ফোন দিলাম। দিয়েই চিল্লিয়ে বললাম,”হ্যালো স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পি এস? আমি ডাক্তার আমিন বলছি। আমি অভিযোগ দায়ের করব। আমার অফিসের আলমারি,চেয়ার টেবিল স্বাস্থ্য কম্পলেক্সের পিয়নরা চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে। ধরা পড়াতে তারা এখন উলটা আমাকে জীবননাশের হুমকি দিচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে কাজ করা সম্ভব না।”

আমার স্ত্রী তো কিছু বুঝল না। আমি বলতে থাকলাম,”কি বললেন? ঢাকায় এসে অফিসিয়াল অভিযোগ করব? নামগুলো লাগবে আপনার? আচ্ছা,,,”

পরেরদিন ঘুম থেকে উঠে অফিসে গিয়ে দেখি,বিশাল একটা টেবিল। বেশ বড়সড় একটা চেয়ার,আলমারি, রোগীর বেড। নতুন ইন্সট্রুমেন্ট,রোগী বসার চেয়ার,ফ্যান লাইট,সব সেট করা আছে।

আমি এমন ভাব করলাম যেন মোটেই অবাক হই নি।

পিয়নরা আমার এতই বাধ্য হয়ে গেল যে সুইপার না আসায় তাদের দিয়ে আমি রোগীর পায়খানাও সাফ করিয়েছিলাম।

দিন যায়,উপজেলার উন্নয়ন হয় না। রাতের বেলা নদীর দিকে ভাল নেট পাওয়া যেত। আমি ফেসবুকে ডাক্তারদের গ্রুপে বিভিন্ন ডাক্তারদের অভিজ্ঞতা পড়তে লাগলাম। আল্লাহ এর কাছে শুকরিয়া করতে লাগলাম। আল্লাহ আমাকে অনেক অনেক ভাল রেখেছে।

এট লিস্ট,আমার কর্মস্থলটা এখন বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে। আমাকে সম্মান করে আমার অধঃস্তনরা। যেভাবে মিথ্যা ফোনকলের নাটক করে সম্মান অর্জন করেছিলাম,ফেসবুকে এমন অনেক জায়গার কথা শুনলাম যে,এই কাজ ওই জায়গায় করলে পিয়নদের হাতের মাইর খাওয়া লাগত।

সেই জঘন্য জায়গাটা আস্তে আস্তে সয়ে গেল। কারণ,ওই শহর তো বটেই,উপজেলার ভিতর যত ইউনিয়ন ছিল,তাদের প্রত্যেকটা গ্রামের মানুষ আমাকে এক নামে চিনে গেল। আমাকে তারা খুবই ভালবাসত। 

অথচ আমি কিছুই করতাম না। সামান্য একটা রোগের সামান্য একটা ওষুধ।  এতেই কষ্টমুক্তির আনন্দে তারা যে এতটা ভালবেসে ফেলত,তা ভোলার নয়। প্রতিদিন সিরিয়াল ধরে কয়েকশ রোগী দেখতে হত,সবার চেহারাও ভাল করে দেখা হত না। তবে এরা দূর থেকে দেখে সালাম দিত। বাজারে গেলে,মাছওয়ালা সবচেয়ে বড় মাছটা জোর করে ফ্রি তে দিয়ে দিত। টাকা তার পকেটে গুজে দিলেও ফেরত দিয়ে বলত,এটা নিলে নাকি তার পাপ হবে।

অন্য জায়গার ডাক্তারদের বর্ণনার সাথে মিলত না আমার অভিজ্ঞতা। প্রথম প্রথম ভাবতাম,আমার পোস্টিং তো এখানে ৩ বছরের জন্য আবশ্যক। কোনোরকম ৩ বছর কাটলেই এখান থেকে পালাব।

তবে মানুষের ভালবাসায় পুরো উপজেলাটা আমার পরিবার হয়ে গেল।পিয়নরা,নার্সরা প্রথমে অবজ্ঞা,পরে ভয়,পরে মেকি সম্মান দেখালেও,আস্তে আস্তে ওরা আমাকে ভালবেসে ফেলল।

ফেসবুকে বিভিন্ন ঘটনা পড়তাম। মুমূর্ষু রোগী বাচাতে না পারলে নাকি আত্মীয়রা মারে,ভাংচুর করে।হ্যা এটা সত্যি।কিন্তু এই সমস্ত ব্যাপারে আমার পড়তে হয় নি। অন্তত প্রথম ২ বছরে না। গ্রাম্য রাজনীতির প্রভাবশালীরা অনেককে ডাকে মাঝে মাঝে,সর্দি কাশির চিকিৎসা নিতে লাটসাহেবের ব্যাটারা রাত বিরেতে ডাক্তারকে নিয়ে যায় সাথে করে। আমার এরকম হয় নি। ওই যে বললাম, প্রথম দুই বছরে না।

রাত বিরেতে আমি যেতাম বাইরে। হ্যা,কিছু রোগোর লোক ছুটে এসে ঘুম ভাঙাত,তাদের মুখে লক্ষণ শুনেই বুঝতাম,মারাত্মক ব্যাপার,যেতাম সেই হিসেবেই।

তো নদীর পাড়ে রাতে আমি যেতাম, তাতো তোমাদের বলেছিই। নেট ভাল আসে। হেটে হেটে তোমাদের ভাবীর সাথে কথা বলতাম। মুভি দেখতাম। নদীর পারে একটা ধইঞ্চা ক্ষেত ছিল। এই ক্ষেতটার পাশ দিয়ে হাটতাম। এই ক্ষেতটার পরেই নদীর পাড় শেষ। এরপর অন্য রাস্তা। সকালে অনেক যেতাম। রাতে যেপথে নদীর পাড় যেতাম,সে পথেই ফিরতাম কোয়ার্টারে। রাতে কখনো সে ভিতরের পথটায় যাওয়া হয় নি।

একরাতে আমি ফেরার সময় ভেবেছিলাম ওই পথ দিয়ে আসব।একটু হাটাও হবে। যারা গ্রামের সেই অন্ধকার নির্জনতা  দেখ নি,তারা তার ভিতর একা হাটার মজা বুঝবে না।আগেই তো বলেছি,উপজেলার কিছু শহর হলেও এর ভিতর গ্রামের অংশও ছিল।যেখানে কারেন্ট ছিল না।

আমি ওই পথের দিকে যেতেই নদীর দিক থেকে এক মাঝি নৌকায় বসে চিৎকার দিল,”কেডা,ওইখানে কেডা যায়?”

আমি দাঁড়ালাম। মাঝি আস্তে আস্তে তীরের কাছে আসল। বলল,”ডাক্তার সাব? আপনে?”

আমি বললাম, “হ্যা।”

মাঝি বলল,”ওম্মে কই যান? ফিররা আহেন।”

আমি কি মনে করে ফিরে আসলাম। মাঝি নৌকা ভিড়াল। একে আমি চিনি। এর ছেলের নিউমোনিয়া হয়েছিল। এখন সুস্থ।আমাকে এর পুরো পরিবার অনেক ভালবাসে।দূরে কোথাও রোগী দেখতে হলে,এর মাছ ধরা নৌকায় করে সেধে সেধেই আমাকে দিয়ে আসে,আবার নিয়ে আসে।

মাঝি বলল,”রাতে ওম্মে যাইতে আছিলেন ক্যান ডাক্তার সাব? ওম্মে যাইতে হয় না রাতে। খারাপ জায়গা।”

আমি বললাম,”আমাকে তো সবাই ই চেনে,আমিও সবাইকে চিনি। খারাপ,ভাল সবাইকে। আমাকে কে কি করবে?”

মাঝি বলে,”ডাক্তার সাব,ওইহানে একটা পুরানো আমগাছ আছে,জানেন?”

আমি বললাম,”হ্যা জানি,সকালে দেখেছি অনেক বার।”

মাঝি বলল,”ওই গাছে একটা পিশাচিনী থাহে।”

আমি বলি, “কি থাকে?”

মাঝি বলে,”পিশাচিনী। অনেকে দ্যাখছে। ওম্মে যাইবেন না রাইতে, বোজ্জেন? আমনে তো মাত্র কয়দিন হইল আইছেন। এহন গাছটা বাইন্ধা দেওয়া।তয় হুজুরে কইছে,কেউ যাতে হ্যারপরও না যায় রাইতে ওইটার ধারে। কয়েক মাস আগেও প্রায় প্রতিরাতে ওই গাছের নিচে মানুষরে কাইট্টা ফালাইয়া রাখত।”

আমি বললাম,”বল কি?”

মাঝি বলল,”আমনে শিক্ষিত মানুষ। হাসবেন হেইয়া মুই জানি। কিন্তু এর আগে এক ডাক্তাররেও ওই গাছের নিচে কাইট্টা টুকরা কইরা দেছেলে,এই থানায় আগে যে ওসি আছিল? এরাও তো শিক্ষিত মানুষ,এরেও কাইট্টা ফালাইছিল। ওম্মে যাইয়েন না।”

আমি বললাম,”আচ্ছা যাব না।”

এটা আমার ওই উপজেলায় যাওয়ার প্রথম বছরের ঘটনা। প্রথম দুই বছর আমি কখনওই পিশাচিনীর হাতে কাউকে মরতে দেখি নি।

৩য় বছরে বি সি এস দিয়ে আমার জুনিয়র আরো দুই ডাক্তার ওখানে পোস্টিং নিল। একজন ছেলে আর একজন মেয়ে। আমরা এখন ৩ জন। কাজের চাপ অনেক কমে গেল।বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়াতে ওই এলাকায় রোগ টোগ অনেক কমে গেল।আমি তাই প্রায়ই ছুটি নিয়ে তোমাদের ভাবীর সাথে দেখা করতে আসতাম।

তো উপজেলার চেয়ারম্যান এর মেয়াদ তখন শেষ হল। আমার ভোটাভুটি হবে। আম গত চেয়ারম্যানটাকে কখনো চোখে দেখি নি। অন্যদের কাছে শোনা,চেয়ারম্যানগুলো নাকি ক্ষমতা দেখাতে হ্যাংলামি করে ডাক্তারদের সাথে।কিন্তু আমার উপজেলার এই প্রাক্তন চেয়ারম্যান গত দুইবছরে আমার সাথে ঝামেলা তো দূরে থাক,দেখাও করে নি।

তো একবার ছুটি কাটিয়ে এসে দেখলাম চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রচারণা শুরু। এটা আমার ৩য় বছরের কাহিনী।  গত চেয়ারম্যান এবারো দাঁড়াবে। আর তার বিপক্ষে দাঁড়াবে এই এলাকার কুখ্যাত এক মাস্তান।

এই মাস্তানের সাথে এর আগে আমার দুই একবার দেখা হয়েছিল। মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে এসেছিল একবার,আরেকবার সাপের কামড় খেয়ে। এখন ঢাকা থাকে সে,সরকারি দলের এক নেতার সাথে।ওখান থেকেই নির্বাচনী প্রচারণার ব্যবস্থা করতেছে। এখানকার মানুষ মোটেই পছন্দ করে না তাকে।

তাকে পছন্দ করে না,কিন্তু তার ছোট ভাইকে রীতিমত ভয় পায়। তার ছোটভাই খুবই উগ্র। অত্যাচার করে মানুষ কে। খুন টুনের রেকর্ডও নাকি আছে।তবে মানুষ বলে না। সেই যে মাঝি আমাকে বলেছিল এক ডাক্তারকে নাকি পিশাচিনী মেরে ফেলেছে,সেই ডাক্তারের সাথে নাকি ছোটভাইয়ের ঝামেলা ছিল। ডাক্তারকে পিশাচিনী মারার পর থানার ওসি নাকি এই ছোটভাইকে সন্দেহ করে। পিশাচিনী একেও মেরে ফেলে।

খোজ নিয়ে জানলাম এর আগে যত মানুষকে পিশাচিনী মেরেছে,সবার সাথেই নাকি এই ছোটভাইয়ের ঝামেলা ছিল। ওসি মরার পর নাকি ছোটভাইও ঢাকায় চলে যায়।আর তখন থেকেই নাকি পিশাচিনীও আর খুন করে না। হুজুরও তখনি গাছটা বেধে দেয়।

বুঝতে বাকি থাকে না কে এই পিশাচিনী।

ভাইয়ের পক্ষে নির্বাচনীর প্রচারণা করতে ছোটভাই আবার আসে উপজেলায়। 

কয়েকদিন পর খবর পাই পিশাচিনী অনেকদিন পর আমগাছ তলায় কাকে যেন মেরে ফেলেছে। আবার সবাই হুজুর ডাকতেছে। হুজুর গাছ আবার বেধে দিল। 

কয়েকদিন পর আবার পিশাচিনীর হাতে কে জানি মরল। গ্রামের অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে গেল। অনেক বাচ্চাও অসুখে পড়ল। এরা নাকি পিশাচিনীকে নিজ চোখে দেখেছে গাছের নিচে। চোখ লাল,সাদা কাপড়,চুল লম্বা,একদম ফরসা,হাত পা নাকি অনেক বড়,নখওয়ালা।

কেউ অসুস্থ হলেই বলা হতে লাগল পিশাচিনীর নজর পড়ছে। ওই আমগাছের আশেপাশে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হবার ঘটনা বাড়তে লাগল।

হাসপাতালে আমার কাজ বাড়ল।ভাবতে লাগলাম,এই ব্যপারটা আমার দুই কলিগ আসার আগে ঘটলে আর দেখতে হত না।কিছুতেই এত রোগী সামলাতে পারতাম না।

এমন সময় পুরনো চেয়ারম্যান এর কয়েকটা লোক আমাকে হাসপাতালে এসে বলল,”চেয়ারম্যান সাহেবের বউ অজ্ঞান হয়ে গেছে,আপনি একটু আমাদের সাথে চলেন।”

তখন হাসপাতালে ভীষণ চাপ। কিন্তু অনেক লোকই আমাকে ডাকতে এল। আমি দেখলাম,ফেসবুকের মত যদি এখন মুখের উপর না করি,যদি মাইর খাই?

আমি  বললাম,”অজ্ঞান হওয়া তো খুব খারাপ ব্যাপার। মাঝে মাঝে অক্সিজেনও দেওয়া লাগে,যন্ত্রপাতির কাজ আছে,সব তো নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। রোগী মরেও যেতে পারে এই সনয়ের ভিতর,আপনারা বরং তাড়াতাড়ি রোগী নিয়ে আসেন।আমি সব রেডি রাখি।”

ওরা বিড়বিড় করে বলল,”ক্ষমতা নাই তো,চামচিকাও লাথি দেয়।”

ওরা চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এক সুন্দরী যুবতীকে নিয়ে একটা ভদ্রলোক হাসপাতালে এল। পিছনে সেই আগের লোকেরা ভিড় করল।

মহিলাকে শুইয়ে দিলাম। লোকগুলো এখনো ভিড় করে আছে বিছানার কাছে। বললাম,”উনি কি বিবাহিত? বিবাহিত হলে স্বামী কে?”

লোকগুলো একসাথে চিল্লাতে শুরু করলে,ভদ্রলোকটা হাত উচিয়ে থামাল।বলল,”আমি ওর স্বামী।”

আমি বললাম,”আপনি এখানে থাকেন। বাকি সবাই এখান থেকে বের হন। পরীক্ষা করতে রোগিণীকে বে আব্রু করতে হতে পারে। আপনাদের সামনে করব সেটা?”

স্বামীটা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। হাতের ইশারায় ঘরটা ফাকা হয়ে গেল।

আমি মহিলাকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম,কিছু পরীক্ষা করলাম। করে বললাম,”মনে হচ্ছে উনি প্রেগন্যান্ট। তাও সিওর হতে দুইটা পরীক্ষা দিচ্ছি।”

মহিলাটা আর তার স্বামী এমনভাবে একটা হাসি দিল,আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। স্বামী স্ত্রীকে প্রাইভেসি দিয়ে আমি চলে আসলাম রুম থেকে।

পরেরদিন ওয়ার্ড থেকে রোগীদের লোকেরা একসাথে কাকে যেন সালাম দিল। আমি গিয়ে দেখলাম কালকের সেই স্বামীটা। ঘুরে ঘুরে ওয়ার্ড দেখছে।পিছে কিছু লোকেরা আছে তার পিছনে। আমার কলিগরা কোনায় দাঁড়ানো,এত লোক ওয়ার্ডে ঢোকা নিষেধ। কিন্তু সেটা বলবে কিনা বুঝতে পারছে না।

লোকটা আমার দিক ফিরল। একটা হাসি দিল। আমি বললাম,”এত লোক ঢোকার নিয়ম নেই।”

লোকগুলো চোখ গরম করল। কিন্তু সেই লোকটা ওদের বের করে দিল। তারপর আমার অফিসে বসল।

আমি ঢুকতেই বলল,”আপনি মনে হয় আমাকে চেনেনই নি।কখনো দেখা হয় নি তো।আমি আপনাকে চিনি। অনেক নাম শুনেছি। আমি রকিব মৃধা। এই উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলাম।”

আমি বললাম,”ওহ। ”  কি বলব বুঝছিলাম না।

রকিব বলল,”আমার ভুল হয়েছিল আপনাকে ডেকে পাঠাতে,ওয়ার্ডের যা অবস্থা দেখলাম। ডাক্তারদের এক মুহুর্ত নড়ার সময় নেই।আমি দুঃখিত। ” 

আমার লোকটার প্রতি সম্মান এল। আমি বুঝলাম কেন ইনি চেয়ারম্যান হিসেবে জনপ্রিয়  ছিল। কেন এনার আমলে কেউ এনাকে না দেখলেও ইনি আছেন বুঝত।

আমাকে রাজনীতি বা ভোট নিয়ে উনি কিছুই বলল না। বরং ওনার স্ত্রীর ব্যাপারে পরামর্শ চাইল। আর হাসপাতালে কিছু লাগবে কিনা আমাকে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম,”৩ মাস ভারী কাজ,দূরের ভ্রমণ নিষিদ্ধ। ”

উনি চলে গেল। পরে মানুষের কাছে শুনলাম,ওনার স্ত্রীর দেখাশোনার জন্য শহর থেকে নাকি উনি ওনার শ্যালিকাকে এনেছেন।সেই শ্যালিকার মত সুন্দরী নাকি এই এলাকায় আগে কখনো দেখা যায় নি।

এদিকে পিশাচিনীর হাতে আরো একটা মৃত্যু হল। প্রত্যেকটা মৃত্যুই বীভৎস।  মানুষ জানত আমি রাতে নদীর পাড়ে যাই।আমাকে মানুষ খুব করে অনুরোধ করতে লাগল,রাতে যাতে আমি না বের হই।

কয়েকমাস পর একটা কান্ড ঘটল। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য সেই যে মাস্তানের ছোটভাই এসেছিল এখানে,তার কিছু ঢাকাইয়া সহচর এল এখানে,তারাও দেখতেই গুন্ডাদের মত। তো একদিন রকিব মৃধার বউ আর শালি একটা মেলায় গেলে,সেই  গুন্ডাদের একজন  রকিব মৃধার শালির ওড়না কেড়ে নিয়ে জামার কিছু অংশ ছিড়ে নিল।

রকিব মৃধা নাকি ভয়ানক ক্ষেপে গিয়েছিল।মেলার মধ্যেই সেই গুন্ডাটাকে মাটিতে ফেলে মারতে লাগল। মেরে মুখ ফুলিয়ে দিল।

পরেরদিন বিকেলে মাস্তানের ছোটভাই আলম আমার অফিসে এল। একটা সার্টিফিকেট লিখতে হবে। ইঞ্জুরি রিপোর্ট।  এতে আমাকে লিখতে হবে, তার সহচরকে রকিব মৃধা “গ্রিভিয়াস হার্ট” করেছে।

গ্রিভিয়াস হার্ট হল এমন আঘাত,যা একটা মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। আর এই গ্রিভিয়াস হার্টের অভিযোগ যদি কারো বিরুদ্ধে করা যায়,সেই লোকের খুনের অপরাধের সমান শাস্তি হয়। আর এই রিপোর্ট টা ডাক্তারই লিখতে পারে।শহরে ফরেনসিক মেডিসিনের প্রফেসররা এই রিপোর্ট লেখে।আর গ্রামের দিকে এই রিপোর্ট লেখে বি সি এস ক্যাডার ডাক্তাররা।

আমি বুঝলাম,যদি এই রিপোর্ট আমি লিখি।নিরাপরাধ লোকটার জীবন শেষ হয়ে যাবে।কিন্তু না লেখলে?

আমি বললাম,”দেখেন,গ্রিভিয়াস হার্ট হতে হলে এনার চেহারা পার্মানেন্টলি বিকৃত হয়ে যেতে হবে,বা পুরুষাঙ্গ কেটে দিতে হবে,বা হাত,পা,চোখ অথবা কান চিরজীবন এর মত হারাতে হবে,দাত ভাঙতে হবে। যদি এসব কিছু না হয়,এটা গ্রিভিয়াস হার্ট হবে না।আমি না হয় লিখলাম গ্রিভিয়াস হার্ট,কিন্তু আদালতে মামলা গেলে শহরের প্রফেসররা ধরে ফেলবে,আদালতে সাক্ষী দেবে।এমনকি কোন প্রফেসর এটাও আপনারা জানবেন না। কেউই জানে না। এখন বলেন,গ্রিভিয়াস হার্ট কি লিখব? ধরা খাইলে কিন্তু মিথ্যা মামলার জন্য জেলে ভরবে।”

আলম ঠান্ডা চোখে আমার দিক তাকাল। তারপর বলল,”এখান থেকে গ্রিভিয়াস হার্ট এর রিপোর্ট না নিয়ে আমি যাব না। ”

আমি বললাম,”তাহলে এই লোকের কোনো গ্রিভিয়াস হার্ট এখন করেন। নইলে আমিও মিথ্যা লিখব না।”

আলম চোখের পলকে আমার টেবিলের উপর থেকে পেপার ওয়েটটা নিয়ে লোকটার মুখের উপর বাড়ি দিতে  লাগল। সামনের দাত ভেঙে মাড়ি,ঠোট রক্তাক্ত হয়ে গেল।লোকটার আর্তনাদে ভরে গেল চারিপাশ।

রক্তাক্ত পেপার ওয়েটটা আমার টেবিলে রেখে আলম ভাবলেশহীন ভাবে ঠান্ডা চোখে আমাকে বলল,”এবার গ্রিভিয়াস হার্ট হয়েছে। রিপোর্ট লেখ।”

আমি রিপোর্ট এ লিখে দিলাম “গ্রিভিয়াস হার্ট”

ওরা হাসপাতাল থেকে বের হবার সাথে সাথেই আমি বের হলাম। রকিব মৃধার বাড়ি গেলাম রাতের আধারে।গিয়ে তাদের কাহিনী বললাম। রকিব মৃধা জিদ ধরে বলল,”আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না।” আমি বললাম,”আমি নিজে গ্রিভিয়াস হার্ট লিখে রেখেছি,হাজার মানুষ সাক্ষী দিলেও কোর্ট আমার রিপোর্ট অনুযায়ী রায় দেবে। আপনার সন্তানকে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করবেন? আপনি পরিস্থিতি ঠান্ডা হবার আগে পালান।ওরা কিন্তু থানায় গেছে।”

রকিব মৃধার বউ কান্নাকাটি শুরু করল। রকিব মৃধা বলল,”এই রাতে কই পালাব?”

আমি বললাম,”আমার সাথে চলেন”

ওদের আমি নদীর পাড়ে নিয়ে এলাম। আমার সেই পরিচিত মাঝিকে খবর দিলাম। মাঝি রকিব,তার বউ আর শালিকে নিয়ে নদী ধরে চলে গেল।

আমি বুঝতে পারি নি যে আলম আমার পিছে লোক লাগিয়েছিল। ওর লোক পুরো ঘটনাটাই দেখে ফেলেছিল।

পরের দিন হাসপাতালে পুলিশ আসল আমাকে গ্রেফতার করতে।আমি নাকি অপরাধীকে পালাতে সাহায্য করেছি।

এখন কালকের ঘটনাটা হাসপাতালের ডাক্তার,নার্স,পিয়ন এমনকি রোগীরাও দেখেছিল।পুলিশ যখন আমাকে ধরতে এল,সবাই বলল,”না,ডাক্তার সাহেব কালকে সারারাত হাসপাতালেই ছিল।এমনকি কোয়ার্টারেও যায় নি।”

পুলিশ এত লোকের বিপক্ষে গেল না। আমাকে না নিয়ে চলে গেল।

আমি বুঝে গেলাম,আলম আমাকে ছাড়বে না। আমি ৭ দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। 

তবে ৭ দিন আমি কাটাতে পারলাম না। ২ দিন যেতেই ফোন এল,আমার যে পুরুষ কলিগটা ছিল,সেদিন নাকি এক রোগীকে ঠিকমত না দেখার অভিযোগে রোগীর আত্মীয়রা মেরেছে। 

আমি বুঝলাম,আমাকে উপজেলায় নিতে আলম এসব করেছে।শুধু শুধু ছেলেটাকে মেরে রক্তাক্ত করেছে,যেন আমাকে ছুটি বাদ দিয়ে যেতেই হয়।

আমি যেদিন রওনা দেব,সেদিন রাতে অনেক কুয়াশা পড়ল। আমার উপজেলায় যাবার কথা ছিল সন্ধ্যায়। আমি উপজেলায় পৌছলাম পরেরদিন সকালে।

আমাকে ব্যাগ হাতে টার্মিনাল থেকে হাসপাতালে আসতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল সবাই।আমি বুঝছিলাম না কেন।

আমার ছেলে কলিগটাকে তো মেরে অজ্ঞান করে দিয়েছিল ওরা। কালকে রাতে আমার মেয়ে কলিগটাকে রেইপ করে খুন করে আমার কোয়ার্টার রুমে ওরা রেখে গেছে। ওরা জানত আমার কালকে আসার কথা। কিন্তু ফেরি আটকে যাওয়ায় আমি বেচে গেলাম। পুলিশও বুঝল আমাকে ফাসাতে এই কাজ করা হয়েছে।

এদিকে এক ডাক্তারকে পিটানোর পর তো সব চুপ ছিল,কিন্তু আরেক ডাক্তারকে রেইপ করে খুন করায় সারা বাংলাদেশের ডাক্তাররা আন্দোলন এ ফেটে পড়ল।সারাদেশে ডাক্তাররা কর্মসূচি দিল।ধর্মঘট করল।

এদিকে গ্রামের এক লোক সাক্ষী দিল,আলম নাকি সেরাতে ডাক্তারকে হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। 

আলমকে ধরতে পুলিশ লাগল পিছে।আলম পালাল। তবে পালানোর আগে সেই আমগাছের নিচে সেই সাক্ষীর ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া গেল। পিশাচিনীর আরেকটা শিকার।

আলমের দেখা আর পাওয়া গেল না।গ্রামে না, ঢাকায় ও না। সবাই ধারণা করল,ভারতে পালিয়ে গেছে। চেয়ারম্যান রকিব  মৃধা ফিরে এল উপজেলায়।ভোট হল।রকিব বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় জিতে গেল।

পরিস্থিতি ঠান্ডা হল। আমি ফিরে গেলাম উপজেলায়। অন্যসব ইস্যুর মত ডাক্তার হত্যার ইস্যুও ঠান্ডা হয়ে গেল।এতো আর নতুন না,ডাক্তার তো কত মরে।এই তো ৩ বছর আগেও আমগাছের নিচে লাশ পাওয়া গিয়েছিল আরেকজনের।সবাই বলেছিল পিশাচিনীর হাতে মরেছে।

এক রাতে আমাকে একটা লোক এসে বলল,তার ছেলে শ্বাস নিতে পারতেছে না। আমি যেন তার সাথে যাই।

আমি আমার ব্যাগ নিয়ে ঘুম মাথায় তুলে তার পিছু পিছু গেলাম।

লোকটা আমাকে কোন রাস্তায় যেন নিয়ে গেল। আমি রাতে এ রাস্তায় কখনো আসি নি।

একটা জায়গায় এসে লোকটা হঠাৎ দৌড় দিল।

আশেপাশে অনেক গুলো টর্চ জ্বলে উঠল। আমি টর্চের আলোয় আতংকিত হয়ে দেখলাম,আমি পিশাচিনীর আমগাছটার নিচে দাঁড়ানো।

আমাকে পিছমোড়া করে কয়েকজন বাধল।তারপর কুরবানির গরুর মত শুইয়ে দিল।

গরু জবাইয়ের ছুরি হাতে আলম এসে দাড়াল। বলল,”তেল বেশি হইছে না তোর? আয়,তেলটা কমাইয়া দিই।”

ছুরিটা আমার গলায় চালানোর আগেই আকাশ বাতাস কাপিয়ে,একটা মহিলার নারকীয় হাসি শোনা গেল। রক্ত হিম করা হাসি।

আমাকে ধরে থাকা লোকেরা আমাকে ছেড়ে দিল। আলম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সাদা কাপড়,লম্বা চুল,লাল চোখ,ধবধবে সাদা,হাতের জায়গায় নখওয়ালা থাবা,এক নারীমূর্তিকে দেখলাম।

সাথে সাথে কয়েকটা লোকের আর্তনাদ। আর আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম এক সমুদ্র রক্তের ভিতর।আলমের ছিন্ন মাথাটা আমার মুখোমুখি। 

পিশাচিনী আমার দিকে তাকিয়ে রইল। একটা হিমশীতল হাসি দিল। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।”

বাইরে বৃষ্টির তোড় এখনো বেড়ে চলেছে। স্তব্ধ ক্লাসরুম এর একটা ছেলে হঠাৎ নিরবতা ভেঙে বলে উঠল,”স্যার,পিশাচিনী আপনাকে বাচাল কেন?”

ডাঃ আমিন বলল,”আমি জানি না। প্রতিদিন আমি ওকে একই প্রশ্ন করি,আমার স্ত্রীও ওকে একই প্রশ্ন করে। কি গো? ওদের কে অন্তত বল,কেন তুমি সেদিন আমাকে বাচিয়েছিলে?”

ক্লাসের সবাই আতংকে নড়ে উঠল।পাশের করিডোরে একটা মহিলা হাসছে,রক্ত হিম করা সেই হাসি।

গল্প ১০১

​”সর্পিণী”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১-মেয়েদের বয়স বাড়লেই কেন তাদের বিয়ের জন্য উদগ্রীব হতে হবে?

২-একাধিক প্রেম করলেই কেন মেয়েদেরকে চরিত্রহীনা বলতে হবে?

৩-শরীর দেখানো টাইটফিট জামা পড়লেই কেন মেয়েদেরকে দেখে পুরুষদের লোভ লাগবে?

৪- মেয়েদের স্বাধীনতা দিতে কেন সবার এত আপত্তি?

৫- মেয়েদেরকে কেন অন্যের ইচ্ছায় সন্তান জন্ম দেবার মেশিন হতে হবে?

৬- মেয়েদেরকে কেন আলাদাভাবে ট্রিট করা হবে? ছেলে মেয়ে তো সমান। ছেলেরা যখন ইচ্ছা ঘুরতে যেতে পারলে,রাত বিরেতে বন্ধুর সাথে আড্ডা দিতে পারলে মেয়েরা কেন পারবে না?

৭- বাসে,ট্রাকে মেয়েদের গায়ে হাত দেবার প্রতিবাদ কেন মেয়েটাকেই করতে হবে? আর কেউ কেন এগিয়ে আসবে না?

৮-মেয়েদের উত্তক্ত করার যথোপযুক্ত বিচার কেন এখনো করা হচ্ছে না?

৯-গায়ে গ্রামে কেন মেয়ে মানুষকে এত অত্যাচার করা হয়?

১০-মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে কেন এই যুগেও মানুষের এত মাথা ব্যাথা?

১১-পুরুষদের ঘর সামলাতে,তাদের বাচ্চা মানুষ করতে কেন মেয়েদের ক্রীতদাসের মত খাটতে হবে?

নোটে এই পয়েন্টগুলো তুলল কল্পনা নীলুফার। সার্টিফিকেট এর নাম ছিল কল্পনা ওয়াসিম। নারী নেত্রী হবার পর বাবার নাম টা বাদ দিয়ে মায়ের নামটা নিয়ে হল কল্পনা নীলুফার।

নোটগুলোতে তোলা প্রশ্নগুলোর উত্তর একটু বড় করে লিখতে হবে তার। বড় করে পুরুষদের বিরুদ্ধে নিজের মনে যত ঘৃণা আছে,সব প্রকাশ করে সাজিয়ে লিখবে।এটাই হবে তার পরবর্তী নারী সংগঠনের মিটিং এর ভাষণ।

এমন না যে কল্পনার খারাপ অতীত আছে,এমন না যে তার বাবা তার মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করত,হ্যা ছোটবেলা থেকে কল্পনাকে শাসন করত,কল্পনার ছোটবেলা থেকে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার ইচ্ছা জাগে,তার বাবা তাতে বাধা দিত।বাবাকে সে এজন্যই দুই চোখে দেখতে পারে না।সে কথা পরে বলছি।

এমনও না যে কল্পনাকে কেউ কখনো উত্তক্ত করেছে,ছেলেদের মত গেঞ্জি,জিন্স,আবার একটা ক্যাপ,কোনো প্রসাধনী ইউজ হত না,দেখতে সুন্দর হলেও, পরিচ্ছন্ন হলেও এই সমস্ত মেয়েদের ওই অবস্থায় দেখলে কেন জানি নোংরা লাগে। হ্যা উত্যক্ত তাই হয় নি কখনো কল্পনা। দুই একবার দুই একটা কমেন্ট সে পেয়েছে। হ্যা,বাবার অফিসে যাবার সুযোগে ছেলেদের মত পোশাক পরে ছুটাছুটি করে ঘর্মাক্ত দেহে যদি কোনো মেয়ে বাসে করে ফেরে,যে পুরুষ তাকে হ্যারাস করবে,বুঝতে হবে পুরুষটার ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। খুবই নোংরা রুচির জন্য।

তবে সেই উত্যক্ত গুলোকেই প্রত্যেকটা ছেলের বৈশিষ্ট্য ধরে নিয়ে সে লড়াইয়ে নেমেছে। নারীর পক্ষ,পুরুষজাতির বিপক্ষে।

পুরুষদের ঘৃণা করার জন্য মেয়েদের কিছু জোরালো কারণ থাকতে হয়, খারাপ বাবা,ইভটিজিং,ধর্ষণ, প্রেমে প্রতারণা।  এবং প্রত্যেকটাই অনেক গভীরে যেতে হয় পুরো পুরুষজাতির প্রতি ঘৃণা আসতে।

তবে কারো কারো ক্ষেত্রে কোনো কারণ লাগে না। এই মেয়েটা তেমনই। কোনো কারণ ছাড়াই পুরুষদের তার অসহ্য লাগে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজবিরোধী, বিবাহবিরোধী,ধর্মবিরোধী  হতে কল্পনাকে কখনো ধর্ষিত হতে হয় নি,শিক্ষায় বাধাও পেতে হয় নি,প্রেমে ছ্যাকাও খেতে হয় নি। বরং ৭/৮ টা যেসব ছেলের সাথে সে রিলেশন করেছে,নিজেই রিলেশন ভেঙেছে।ভাল লাগে নি কয়েকদিন পর।ইমোশনাল বন্ডে যেতে চায় নি সে।মুক্ত থাকতে চেয়েছে।

যাই হোক,তার ইতিহাস বলার আগে গল্পের প্লটটা বলে নি। নয়ত কল্পনার ইতিহাস পড়তে পড়তে ছেলে পাঠকরা বিরক্ত হয়ে পড়া বন্ধ করে দেবে। আর নারীবাদীরা আগের “অপাঙক্তেয়” গল্পটার মত না পড়েই আমাকে গালাগালি দিতে বসে যাবে। বিশাল একেকটা কমেন্ট করবে পারসোনাল আঘাত করে।

গল্পের প্লট হল,  ২৭ বছর বয়সী কল্পনা দেশের প্রভাবশালী একটা নারী সংগঠনে যোগ দেবার পর আস্তে আস্তে কর্মী থেকে গুরুত্বপূর্ণ এক নেত্রী হয়ে যায়। নারী সংগঠন বাক্যবাণ অস্ত্র ব্যবহারের চেয়ে কৌশলে তাদের কর্মসূচি নিতে থাকে। কোনো একটা নারী নির্যাতন এর ঘটনার সাথে এই কর্মসূচি প্রস্তাবিত হতে থাকে। এতে নির্যাতিতা নারী ন্যায়বিচার পায়,ক্ষতিপূরণ পায়,আর নির্যাতনকারী পুরুষ গুলো মারাত্মক শাস্তি পায়। 

কল্পনা এসব কর্মসূচির পরিকল্পনা করে।সংগঠন এবং মিডিয়ায় সে জনপ্রিয় হয়।নির্যাতিতাদের নায়িকা হয়ে যায়।

তবে গোপনে সে তার প্যাথলজিকাল পুরুষবিদ্বেষটাকে লালিত করে। তক্কে তক্কে থাকে বড় আঘাতটা করার।

এমন একটা সমাজ সে চায়, যেখানে সবকিছু উলটা হবে।মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। এখন মেয়েরা যা করে,তখন পুরুষ তা করবে। পুরুষ দের টা মেয়েরা। এটার জন্য কিছু আইনি ব্যবস্থা লাগবে। কিছু নিয়মের পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনই ঘটাবে সে। তার প্রস্তুতিই নিচ্ছে।

নারী নির্যাতন মামলায় বিচার বা আদালত ছাড়াই অভিযুক্তদের শাস্তি দিতে হবে।সব ধরণের নারী নির্যাতন এর শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।  এবং শুধু পুরুষ দের জন্যই এই বিচারটা প্রাপ্য। 

মোট কথা কোনো নারী যদি কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে,তাহলে সাথে সাথেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে।

এই আইনটা কোনোভাবে,যত প্লানই লাগে, তৈরি করে দিতে পারলে,নারীদের ভয় পেয়ে চলতে হবে পুরুষদের,যেকোনো ব্যাপারে,নির্যাতিত না হলেও পুরুষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এর স্বাধীনতা থাকবে মেয়েদের। আস্তে আস্তে মাতৃতান্ত্রিক সমাজটা তৈরি হবে।

এই কর্মসূচিটা উত্থাপন করবে কল্পনা সামনের মিটিং এ।সংগঠনে তার ভক্তদের মোটিভেট করতে হবে।

এটাই গল্পের প্লট। কল্পনা কম্পিউটার বন্ধ করে বিছানায় শুতে গেল। পাশে শুয়ে আছে একটা হ্যান্ডসাম ছেলে। চালচলন আর চামচামিতে ভাল লেগে গিয়েছিল ছেলেটাকে,রাতে তাই ফ্লাটে নিয়ে এল। মোবাইলে বয়ফ্রেন্ডের অনেকগুলো মেসেজ এসেছে। সাড়া না পেয়ে দুশ্চিন্তায় আছে বেচারা,মেসেজ,কল সবই করছে। 

বিরক্ত মুখে কল্পনা ভাবল,ব্রেকাপের সময় হয়েছে।বড্ড জ্বালাচ্ছে এটা।

হ্যা এবার আমরা একটু ইতিহাস নয়ে ঘাটাঘাটি করতে পারি।আশা করি গল্পটা পুরোটা  পড়ার মত ইন্টারেস্ট তৈরি করতে পেরেছি।তা সে যত বড়ই হোক না কেন।

কল্পনা যখন স্কুলে পড়ার বয়স হয়েছিল। তার মা চেয়েছিল বাসার কাছে একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে। কিন্তু তার বাবা বলল,না,শহরের সবচেয়ে বড় মেয়েদের স্কুলটাতেই ভর্তি করাবে তার মেয়েকে। কল্পনার মা অনেকবার বলেছিল,অত বড় স্কুলে পড়াতে অনেক কষ্ট হবে,খরচের ব্যাপার,এছাড়া স্কুল অনেক দূর,যাওয়া আশাই সমস্যা।

কল্পনার বাবা তার বেতনের অধিকাংশ দিয়েই মেয়ের স্কুল,বই আর প্রাইভেটের খরচ চালিয়েছিল। এমনকি মেয়ের যাতে বিপদ না হয়ে,অফিস থেকে ছুটি নিয়ে প্রতিদিন তাকে বাসায় দিয়ে যেত।সময় লাগত অনেক,এই সময়টার জন্য তাকে অফিসে ওভারটাইম করতে হত।

অসুস্থতা, দুর্যোগ, কখনওই তার বাবার এ রুটিনটার পরিবর্তন হয় নি,এমনকি কল্পনা কলেজে ওঠার পরেও,এমনকি ধনী বান্ধবীদের সামনে সাধারণ পোশাক পরে তার জন্য অপেক্ষা করা বাবাকে বাবা বলতে লজ্জায় অস্বীকার করার পরেও,তবে ততদিনে কল্পনা বড় হয়ে গিয়েছিল,প্যাথলজিকাল পুরুষবিদ্বেষ অজানা কারণে শরীরে দানা বেধে উঠেছিল।

বয়ঃসন্ধিতে যাবার পর কল্পনার ইসলামিক চেতনার বাবা,মেয়েকে ধর্মের দিকে আনতে চেয়েছিল। মাথায় কাপড়,হিজাব,অকারণে বাইরে যাওয়া মানা,ছেলেদের সাথে দূরত্ব রাখা ইত্যাদি। কল্পনা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। ছোটবেলা থেকে জেদি কল্পনা,তবে ইসলামিক চেতনার মানুষ দের কাছে এই ব্যাপারগুলো সন্তানের জেদের চাইতে অনেক বড়,সন্তানদের মানুষ না করতে পারলে জাহান্নামে যেতে হবে। কল্পনার বাবার সাথে নিয়মিত কথা কাটাকাটি সেসময় থেকেই শুরু।

কথা কাটাকাটি হত,গালে থাপ্পড়ও পড়েছে বেশ কয়েকবার।  তবে কেন জানি মেয়ের গায়ে কখনো একবার হাত দিলে কল্পনার বাবা সেই হাতে ব্লেড দিয়ে পোচ দিত,রাতে,সবাই ঘুমানোর পর।

কল্পনা যত বড় হতে লাগল,তার বাবার হাতের পিছনে ব্লেডের পোচও বাড়তে লাগল। কল্পনার হাত খরচও বাড়তে লাগল,সন্ধ্যার পর বাইরে থাকাও বাড়তে লাগল।

তবে মেয়ের ইচ্ছা পূরণে তার বাবা কখনওই বাদ রাখত না। কল্পনার মা ছেলেদের মত ড্রেস কেনা,চালচলন গোপন রাখত তার বাবার কাছ থেকে।

শেষ পর্যন্ত বাবা আর মেয়ের কনফ্লিক্ট চূড়ান্ত পর্যায়ে গেল। বাবাকে শিক্ষা দিতে তার মেয়ে সিদ্ধান্ত নিল সানি লিয়ন হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী স্বাধীনতা দরকার। নারীর পোশাক ধর্ম বা বাবা মা ঠিক করে দেবে না,সমাজও না,পোশাক পড়বে কি পড়বে না,এই সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাও মেয়েদের থাকতে হবে।

তো ততদিনে অলরেডি বয়ফ্রেন্ড দুই তিনটা হয়ে গিয়েছিল,১৮ এর আগে কুমারীত্বও গিয়েছিল। এদিকে বাবা ভাবছে মেয়ে বড় স্কুল কলেজে পড়েছে,এখন মেডিকেল,বুয়েট বা ভার্সিটি, নিজের ইচ্ছায় পড়বে।অন্য বাবাদের মত এক্ষেত্রে সে মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে না। এসব কথা যখন ওয়াসিম তার স্ত্রীকে বলছে,কল্পনা তখন তার ৩য় বয়ফ্রেন্ডের পরিচিত এক পর্নো কোম্পানির এজেন্টের সাথে কথা বলে সানি লিয়ন হওয়ায় ব্যস্ত।

কিন্তু ওয়াসিমের এক কলিগ কিভাবে যেন জেনে ফেলল ব্যপারটা। দেখে চিনল আর কি  আর কাউকে না বলে ওয়াসিমকেই সাবধান করল। ওয়াসিম আর সেই কলিগ সেখানে গিয়ে হাতে নাতে মেয়েকে ওই অবস্থায় দেখল। ওয়াসিমের কিছু করার শক্তি ছিল না। ওয়াসিমের কলিগই এজেন্ট আর সেই বয়ফ্রেন্ডকে তার কিছু পরিচিত ছেলেপেলে নিয়ে ঠেঙাল,যা যা রেকর্ড হয়েছে,সব কিছু, পেনড্রাইভ,ক্যামেরা,কম্পিউটার জ্বালিয়ে দিল। 

ওয়াসিমকে কথা দিল এ কথা কাউকেই বলবে না সে। ভাল লোক ওয়াসিম,এরকম অসম্মান ডিজার্ভ করে না।

ওয়াসিম মেয়েকে নিয়ে সেরাতে বাড়ি আসল।কল্পনা লজ্জিত হবার কোনো রকম লক্ষণ দেখাল না। উলটা নারী স্বাধীনতারর ব্যাপারে নিজের যুক্তি বলতে লাগল,অনেক টাকা বা খ্যাতি হয়ত পেতে পারত,কিন্তু বাবার জন্য পেল না এই অভিযোগও করতে লাগল। তবে তার বাবার হতভম্ব হওয়া চেহারাটা দেখে কেন জানি আর এগোল না,চুপ করে রইল।

ওয়াসিমের ঝুলন্ত লাশ পরেরদিন পাওয়া গিয়েছিল।আসল কারণ ওয়াসিমের কলিগ আর কল্পনা ছাড়া কেউই জানল না। কল্পনা তার বাবাকে এখনো ঘৃণা করে। এক. তার বাবা সেরাতে তাকে বাফহা না দিলে সে খ্যাতি আর টাকা পেতে পারত, দুই. তাদের পরিবারটা নিঃস্বই হয়ে গিয়েছিল।কল্পনার আর ভাল কোথাও পড়া হল না। গ্রাজুয়েশন করার জন্য ছোটখাটো একটা কলেজে পড়তে হয়েছিল।

সেই কলেজে ঢুকে কিন্তু কল্পনার দূরদর্শিতা প্রথম ফুটে উঠেছিল। পুরুষবিদ্বেষ,অনেক বড় কিছু হবার আকাঙ্ক্ষা সবকিছুকেই সে খুব গোপনে পুষেছিল। নিজের প্রয়োজনমত ছাত্ররাজনীতিতে যোগ দিতে লাগল।প্রভাবশালী নেতাদের সাথে বিছানায় গেল। টাকা,ক্ষমতা কি,সবকিছুরই ধারণা পেল সে। আস্তে আস্তে এর ওর হাত ধরে কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েই বের হল। তবে রাজনীতি ছাড়ল না। যে দলের শক্তি বেশি,ক্ষমতা ছাড়ার সম্ভাবনা কম,সেটাতেই যোগ দিল।

ছাত্ররাজনীতিতে উচু পর্যায়ে যেতে,টাকা পয়সা পেতে ছাত্রনেতাদের সাথে রাত্রিযাপনগুলোও তার পুরুষবিদ্বেষের কারণের লিস্টে আসল। তার মাথায় চিন্তা এল তখনি প্রথম,আজ সমাজ নারীতান্ত্রিক হলে কিছু পেতে নারীদের পুরুষের লিপ্সার বস্তু হতে হত না।

নারীবাদ তখনি তার মনে পাকাপোক্তভাবে গেড়ে বসল। সংগঠন থেকে সংগঠনের ঘুরতে লাগল সে। সংগঠনের ক্ষমতা নিয়ে বেশ ভাল চাকরি তে যোগ দিল সে। স্বপ্ন দেখল,একদিন নিজের এক কোম্পানি থাকবে।

নারী সংগঠনগুলোয় ঢুকে সে বুঝল,বেশিরভাগ সংগঠনগুলোরই প্রথমদিকে,নেতৃস্থানীয় থাকে তার মত মেন্টালিটির মানুষেরা,আর কর্মী হিসেবে থাকে এককালে নির্যাতিতা নারীরা। আর কিছু পুরুষ থাকে,পুরুষরা প্রত্যেকটাই একটা উদ্দেশ্যেই থাকে,সব মেয়েই সেটা বুঝতে পারে। এক রাতের জন্য কল্পনার পাশে শোয়া ছেলেটার মত ভাগ্যের লোভে নিজেদের আত্মসম্মান নষ্ট করে থাকে পুরুষেরা। নারী সংগঠনের কর্মী,বা নারীবাদী পুরুষরা মুখে যাই বলুক,মমে মনে শুধু এ জিনিসটাই চায় তারা।

নারী সংগঠনগুলোর কাজই হল,কোনো স্থানে নারী নির্যাতন হলে মিডিয়া ডেকে একটু  চিল্লানো,তারপর একটু নাচ গান,মঞ্চনাটক, তারপর বিরিয়ানি।  যত বড় ধরণের নির্যাতন হবে,তত বেশি গলা ফাটবে।

কল্পনা ছাত্রনেত্রী হিসেবে শুরুতেই একটা নারী সংগঠনের উচু একটা পর্যায়ে চলে গেল।জুনিয়র নেত্রী,কর্মসূচির জুনিয়র আহবায়ক। সংগঠনে যোগ দেবার পর প্রথম সে নারী নির্যাতন এর ঘটনা ঘটল,মানে একটা ধর্ষণ হল শহরের এক হোটেলে।নারী সংগঠন গুলো স্বভাবত চিল্লানো শুরু করল, তবে কল্পনার সংগঠন কিছুই করল না। 

এদিকে কল্পনার সংগঠনের নেত্রী কল্পনাকে গালাগালি দিতে লাগল,তাদের সমাবেশ করতে দেরি কেন হচ্ছে। কল্পনা বলল,”যে কাজটা করেছে,সে এক প্রভাবশালী লোকের ছেলে,লোকটা একটা ফোন করলে সাথে সাথে চুপ করে যাবে সবাই,আমরা একটু ব্যতিক্রম কিছু করি।”

নেত্রী শুনতে লাগল শান্ত হয়ে। প্রভাবশালীর শাসানিতে অন্য সংগঠন যখন চুপ। কল্পনার প্লান অনু্যায়ী এই সংগঠনের কর্মীরা গোপনে মাঠে নামল,কৌশলে সেই ছেলের থেকে স্বীকারোক্তি এনে প্রচার করে দিল। ছেলেটা গ্রেফতার হল,প্রভাবশালী এই মিডিয়া ক্রেজের কারণে ছেলেকে বের করতেও পারল না। কারাদন্ড হল ছেলেটার।

ধর্ষিতা যখন জানতে পারল,কার জন্য সে বিচার পেয়েছে,এসে কল্পনাকে জটিয়ে ধরেছিল।সংগঠন এর অন্য নেত্রী কর্মীরা দৃশ্য দেখে আবেগে কেদে দিলেও,কল্পনা ছিল ভাবলেশহীন।

মানুষ উন্নত হলেও প্রাণী। আর প্রাণী বলতেই জৈবিক চাহিদা আছে। কেউ ধর্ম আর আইনের বেড়াজালে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করে,কেউ পারে না। তাও অপরাধ কম হয়। তবে আইন আর ধর্ম যখন কিছু সমাজে থাকে না,কেউই নিরাপদ থাকে না,ছেলে মেয়ে কেউ না। বাচ্চা বুড়ো কেউ না।

তবে এই অপরাধ গুলো অপরাধীর না বানিয়ে,যখন একটা নির্দিষ্ট লিঙ্গকে বুঝানো হয়,এর পিছনে এজেন্ডা থাকে, সে এজেন্ডা ব্যাক্তিগত থাকে,বা রাজনৈতিক,বা ক্ষমতা বা টাকা। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে কিছুই লাগে না। জাস্ট একটা পৈশাচিক আনন্দ।

কল্পনা ২৪ বছর বয়সে এই নারী সংগঠনে এসেছিল। ৩ বছর পর আজ তার ২৭।এই ৩ বছরে নিজের বুদ্ধিতে অসংখ্য নির্যাতিতা নারীকে বিচার পাইয়েছে সে।শুধু তাই না,তার জন্য পারভার্ট,ধর্ষক,সে রেগুলার হোক,প্রথমবার হোক,,এমন অসংখ্য মানুষ জেলে আজ।

কেউ কিন্তু জানতেও পারে নি।এটা নিঃস্বার্থ উপকার না, এটা চেপে রাখা এক অজানা আনন্দের বহিঃপ্রকাশ।

যাই হোক,সেই রাতে দুশ্চিন্তায় থাকা বয়ফ্রেন্ড এর সাথে পরেরদিন সকালে ব্রেকাপ করল সে। তারপর দিনরাত তার ৩ বছর ধরে প্লান করা আইনের সংশোধনী আনার কর্মসূচির ছক করতে লাগল সে। এই প্রস্তাব পেশ করলে সারা দেশে হইচই পড়ে যাবে। গত ৩ বছর ধরে কল্পনা নীলুফারের নামে নারী পুরুষ নির্বিশেষে যত জয়ধ্বনি করেছে তার অর্ধেক কমে যাবে। তবে নারীতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এই প্রস্তাব টা সফল হতেই হবে। তবে তার আগে দরকার বড় কোন ঘটনা। এমন একটা পৈশাচিক নারী নির্যাতনের ঘটনা,যেটা সারা বাংলাদেশকে নাড়া খাইয়ে দেয়। তখনি হবে প্রস্তাব উত্থাপন এর উপযুক্ত সময়। তবে তার আগে নিজ সংগঠনটার সমর্থন পেতে হবে।

ছোটবেলা থেকে পুরুষ যে খারাপ,সেগুলো পেপারে পড়ে,আশেপাশের ঘটনা দেখে কল্পনা নিজ মনে পুরুষের একটা কদাকার রূপ তৈরি করে নিয়েছিল। কোনো পুরুষই সেই কদাকার রূপটাকে সরাতে পারে নি। বরং যত পুরুষের সাথে সে মিশেছে, তাদের বিভিন্ন স্বভাব সেই কদাকার মূর্তিটার বীভৎসতা বাড়িয়েছে।

তবে কয়েকদিন পর যে ঘটনাটা ঘটল,কল্পনার মনেও পুরুষের সেই ধরণের বীভৎস রূপ কখনওই আসে নি।

৫ বছর ধরে শহরের একটা বাসায় ২ থেকে ৮ বছরের মেয়েদের অপহরণ করে এনে একটা সংঘ চাইল্ড পর্ন বানাতো। সংঘটার সাথে যোগাযোগ ছিল আমেরিকার একটা খুবই জঘন্য পেডোফাইল পর্নো ইন্ডাস্ট্রির।অবৈধ এবং ঘৃণিত এই ইন্ডাস্ট্রি তৃতীয় বিশ্বের বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে,যারা বয়ঃসন্ধি তে আসতে অনেক দেরি,তাদেরকে দিয়ে পর্নো বানাত,এগুলোর চাহিদাও ছিল প্রচুর।

এই ঘটনাটা যখন প্রচার পেল,সাথে সাথে মিডিয়া ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করল। অন্যান্য নারী সংগঠনগুলোও প্রমাণের অভাবে চুপ থাকল।

কল্পনা ঘটনাটাটা প্রথম শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। কারণটা তো আগেই বললাম,কল্পনার কল্পনায় পুরুষদের বীভৎস রূপটার চেয়েও এই রূপটার তুলনা হয় না।

প্রস্তাব পেশ,কর্মসূচি মাথায় উঠল। কল্পনা উঠে পড়ে লাগল এই অপহরণকারী আর পেডোফাইলগুলোকে বিচার পাইয়ে দিতে।

সে নিজে মাঠে নেমে ঘুরে ঘুরে চাইল্ড পর্ন নির্মাতাদের খুজতে লাগল। এটা খুবই আলাদা জিনিস অন্য কেইস থেকে। বাংলাদেশে এসব জিনিস হাতেগোণা। মাঝে মাঝে বাচ্চা ধর্ষণ এর কাহিনী পেপারে আসে।এরকম অনেক পিশাচকে কল্পনা জেলে ভরতেও সাহায্য করেছে। তবে কেউই এরকম প্রফেশনাল ছিল না।।

তবে এই চাইল্ড পর্নের পিছনে বড় কোনো প্রভাবশালী লোক যে ছিল,সেটা সে বুঝতে পেরেছিল,মিডিয়া হঠাৎ করে চুপসে যাওয়ায়।

যাই হোক, নিজে যখন সে এইসব ভিক্টিমদের পরিবারের সাথে কথা বলতে লাগল,তখন সে খেয়াল করল,একটা ছেলের সাথে প্রতিনিয়ত দেখা হয়ে যাচ্ছে।

প্রথম প্রথম ভাবল,ছেলেদের মত ড্রেস পরা বাদ দেবার পর থেকে তার পিছনে ছেলেরা লাগা শুরু করেছিল। এই ছেলেটা হয়ত তেমনি। কিছু বলল না সে। ছেলেটার বডি ভাল,দেখতেও সুন্দর। সত্যি ওর পিছু নিয়ে থাকলে আজ রাতে ছেলেটার ভাগ্য ভাল হতে পারে।

তবে একটু পরেই ভুলটা ভাঙল তার।বুঝতে পারল ছেলেটা আসলে অনুসন্ধানে এসেছে।

একটা ভিক্টিমের পরিবারের বাসায় ছেলেটাকে ঢুকতে দেখে,কল্পনা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

ভিতরে ছেলেটা জিজ্ঞেস করছে, “দেখেন,আপনারা তো সব জানেন হয়ত,আমি একটা সংঘের পিছু নিয়েছি। আমি একটা প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থার সাথে আছি। এই যে মেয়েটাকে দেখছেন,এই মেয়েটার বয়স ৯ বছর, ওকে ৩ মাস ধরে পাওয়া যাচ্ছে না।আম এই মেয়েটাকে খুজছি।পুলিশ ব্যর্থ হওয়ায় ওর বাবা মা আমাদের কাছে এসেছিল। আমি জানতে পেয়েছি,ওরা এই মেয়েটাকে মেরে ফেলে নি,বড়লোকের মেয়েদের ওরা মারে না। কারণ এতে বিপদ বাড়ে।গরীব মানুষের বাচ্চাদের মেরে ফেলে কাজ শেষে,আর মেরে লাশটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে। আপনারা এখন যেদিন আপনাদের মেয়েটাকে চুরি করেছিল,সেদিনের কাহিনী বলেন।”

কল্পনা শুনতে লাগল সব। আশ্চর্য বুদ্ধি ছেলেটার। মৃত মেয়ের বাবা মাকে এমনভাবে কনভিন্স করল,সব গড়গড় করে বলে দিল। 

ছেলেটা বের হবার পর নিজ থেকেই কল্পনা ছেলেটার সাথে পরিচিত হল। এ বিদ্যা ভাল জানে সে,কলেজে ছাত্রনেতাদের সাথে কিভাবে পরিচিত হয় শিখেছিল।

ছেলেটা ওর নাম বলল রেজা হাসান। কিন্তু এটা বলল না ও প্রাইভেট ডিটেক্টিভ।হুম,বুদ্ধি আছে,ভাবল কল্পনা।

যাই হোক,আস্তে আস্তে কল্পনা নিজের পরিচয় দিল। টিভি দেখে রেজা মেয়েটাকে আগেই চিনতে পেরেছিল।এবার নিশ্চিত হল। যেহেতু সে জানত গত ৩ ববছর ধরে নারী নির্যাতন এর বিরুদ্ধে কল্পনা কিভাবে এগিয়ে এসেছে,কিভাবে বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে,সফল হয়েছে,তাই কল্পনার বিরুদ্ধে সে গোপনীয়তা অতটা বজায় রাখল না।

ওর দুইজন একসাথে কাজ শুরু করল। কয়েক সপ্তাহ গেল। কেউ কিছু সুরাহা করতে পারল না। ক্রিমিনালগুলো যেন গায়েব হয়ে গেছে জাস্ট।

কয়েকমাস চলে গেল। রেজা যেই মেয়েটাকে উদ্ধার করতে কাজে নেমেছিল। মেয়েটাকে আর পাওয়া হল না। খুবই হতাশ হয়ে গেল সে। 

এদিকে কল্পনা রেজাকে অন্যসব পুরুষ এর মতই দেখত। তবে চেহারা সুন্দর বলে,জৈবিক আকর্ষণটা বেশি ছিল। তবে রেজা পাত্তা দিত না।তার আগের সব বয়ফ্রেন্ড,বা একরাতের প্রেমিকরা কখনো এভাবে কল্পনাকে অবজ্ঞা করে নি।

উত্তেজিত পোশাক পরে বাংলাদেশের রাস্তায় এলে রাস্তা ভরা মানুষ চেয়ে থাকলেও রেজা প্রশ্ন করত,”এ কি অবস্থা?”

ভাবলেশহীন দেখে কল্পনা বলত,”আন্ডারকভারে এসেছি। তদন্তে যাব তোমার সাথে।”

রেজা বলল,”এই জিনিস পড়লে শরীরের কভারও হবে না,তদন্তের কভারও না।আমি একাই যাব আজ।”

যতই রেজা এড়াত,ততই কল্পনার জেদ বাড়ত।

রাতের বেলায় তদন্তের কথা বলার নাম করে রেজার বাসায় কামনার জন্য গেলেও  রেজা একইরকম ভাবলেশহীন হয়ে থাকত। 

কল্পনা বুঝতে পারল,তার বাবা আর এই ছেলেটার মেন্টালিটি একইরকম। কিন্তু তার বাবাকে তো ঘৃণা করে সে।

যতদিন রেজার সাথে সময় কাটাত সে,বাসায় ফিরত একরাশ প্রশ্ন নিয়ে,আর নির্ঘুম একটা রাত এর অপেক্ষায়।

পুরুষ দের সারাজীবন ঘৃণা করে এসেছে সে,তবে রেজার প্রতি ঘৃণাটা দিন দিন কমছে,এখন ঘৃণার বদলে অন্য একটা আবেগ চলে এসেছে মনে। এমন তো হবার কথা না।

রেজাকে ভালবেসে ফেলার জন্য যতটা না হতভম্ব হয় সে,তার চেয়ে বেশি হয় রাগ।নিজের গালে থাপ্পড় মারে সে। এগুলো মুখোশ, তলে তলে সব পুরুষই খারাপ।চরিত্রহীন।

ভিতর থেকে একটা কণ্ঠ বলল,”আজ পর্যন্ত কোন পুরুষ তোমার সাথে খারাপ কিছু করেছে?”

সে উত্তর দিল,” অনেকে”

কণ্ঠটা বলল,”সত্যি?”

কল্পনার নির্ঘুম আরেকটা রাত কাটল।

রেজার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল কল্পনা।এমনকি ওকে ভুলতে পরপর কয়েক রাত অচেনা চামচামি করা বিভিন্ন ছেলের সাতগে রাত কাটাল সে। তবে রেজা মন থেকে গেল না। এমনকি রেজা ফোন দিয়ে হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করার কারনও জিজ্ঞেস করল না।

কল্পনা পাগলের মত হয়ে গেল। এদিকে চাইল্ড পর্নের সাথে জড়িত একটা লোকের খোজ পেল সে। ধন্যবাদ দিল ভাগ্যকে। অবশেষে রেজাকে ভোলার কোনো ঘটনা তো ঘটল।

লোকটার ঠিকানা খুজতে লাগল সে। জিজ্ঞেস করে করে এলাকা পেয়ে গেল। দোকানে জিজ্ঞেস করল লোকটাকে চেনে কিনা। সবাই চেনে, উলটা জিজ্ঞেস করে, “ওই মাতাল,জুয়াড়ি, বউ পিটানো লোকটা?”

ঠিকানা ধরে যায় কল্পনা। ব্যাগের ভিতর টেপরেকর্ডার অন করে,,,তার অন্যসব মামলার তদন্তের মত,স্বীকারোক্তি নেবে।

লোকটার বাসার কাছে গিয়ে ভিতরে গালাগালি আর মহিলার কান্না শোনা যায়। বোঝা যায় লোকটা বউকে মারছে।

কল্পনা দরজা নাড়ায়। দরজা খোলে লোকটা,লোকটার চেহারা দেখেই কল্পনার বিরক্ত লাগে,বলে,”আপনি মারছেন কাউকে? কান্না শোনা যায় তো।” 

লোকটা বলে,”আমি কি করি তাতে আপনার কি?”

দরজা আটকে রাখে সে। কল্পনা আবার কড়া নাড়ায়,এবার লোকটা একটা পিস্তল নিয়ে বের হয়,বলে,”মাগী,এখান থেকে গেলি,,কপাল ফুটা করে দেব।”

আবার দরজা আটকে দেয়। কল্পনা ভয়ে পিছাতে থাকে, হঠাৎ পিছে ফিরে দেখে রেজা দাঁড়ানো।

রেজা বলে,”আরে কল্পনা,তুমি এখানে? সাতদিন কোনো খোজই তো পেলাম না।”

কল্পনা বলে,”রেজা,ওই লোকটা,,,”

রেজা বলে,”হ্যা জানি তো,সেই মেয়েটাকে অবশেষে আমি খুজে পাব। পেয়েছি কুত্তাটাকে।”

কল্পনা সাবধান করে,”ওর কাছে পিস্তল।”

রেজা গিয়ে দরজায় লাথি দিতে থাকে। বউ মারা বন্ধ করে লোকটা চিল্লায়,”এক্ষনি দরজা থেকে সর,মাথা গরম,খুন করব আজ।”

রেজা বলে,”কুত্তার বাচ্চা,বের হ তুই। আজ লাশ এখানে পড়বেই একটা।”

লোকটা চুপ হয়ে যায়। রেজা লাথি দিতে দিতে দরজাই ভেঙে ফেলে,ভিতরে থাকা লোকটা পিস্তল তুলতেই হাতটা মুচড়ে ভেঙে দেয় সে।

এদিকে পুলিশকে রেজা খবর দিয়েই এসেছিল। পুলিশ চলে আসে।লোকটাকে ধরে নিয়ে যায়।

কল্পনার সেদিন মনে হয়,রেজার প্রতি ভালবাসা চেপে রাখার মানে হয় না। প্যাথলজিকাল পুরুষবিদ্বেষ এর ফাক গলে এই প্রথম ভালবাসার আলো আসল।

সেদিনই রেজাকে সে মনে কথা খুলে বলল। রেজাও তো পুরুষ।  এত সুন্দরি একটা মেয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিল,কোনো পুরুষ এর এটা প্রত্যাখ্যান করার শক্তি নেই।

প্রেম চলল। প্রেমের ভিতর কল্পনা অনেক হিন্ট দিত রাত কাটানোর। রেজা নিয়ন্ত্রণ করত।একদিন বলেই দিল সে,ইসলামিক চেতনাওয়ালা পরিবারের ছেলে সে,তার জন্য তো প্রেমই নিষিদ্ধ, তাও সামলাতে পারল না সে,প্রেমে রাজি হল।তবে ধর্ম ত্যাগ করবে না,বিয়ের আগে যত কষ্টই হোক,নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে।সে খুবই খুশি হবে,কল্পনা এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করলে।

কল্পনার বাবা গায়ে হাত তুলেও তাকে অশালীন কাপড় ছাড়াতে পারে নি। রেজার এই একটা কথাতেই সে অশালীন কাপড়গুলো ড্রেনে ফেলে দিল।

এদিকে রেজা আর কল্পনা মিলে যে লোকটাকে পুলিশে দিয়েছিল,তার জবানবন্দির উপর অনেক অপহৃত মেয়েদের খুজে পাওয়া নির্ভর করছিল।

রেজা কল্পনাকে এতটাই বিশ্বাস করত যে,তার আরেকটা কেইস আসায়,সে কল্পনাকে থানায় পাঠাল,পুলিশের কাছ থেকে অপরাধীর জবানবন্দি শুনতে।

এতে অবশ্য কল্পনারও লাভ। কারণ তার সংগঠনও তো চাচ্ছে এই মিডিয়ার নিশ্চুপের আড়াল থেকে আসল ঘটনা জানতে।

তো পুলিশ কল্পনাকে কাছে রাখল জবানবন্দি নেবার সময়। কল্পনা শুনল,সেই যে হোটেলে এক ধর্ষণ মামলায় এক প্রভাবশালীর ছেলেকে সে জেলে পাঠিয়েছিল,তার বড় ভাই,মানে প্রভাবশালীর বড় ছেলে এই দেশে চাইল্ড পর্নের এজেন্ট।

প্রভাবশালীর নাম ছিল বিশুনাথ চ্যাটার্জি। এই নামটা বলার পরই পুলিশ বুঝল মহাবিপদ। বিশুনাথ সরকারি দলের নেতা। এবং এতই জনপ্রিয় যে পরেরবার মন্ত্রী হতে পারে। ছোট ছেলের এইভাবে ধর্ষণের মামলায় ফাসার পর নিজের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অনেক চেষ্টা করেছে সে।গত ৩ বছরে সক্ষমও হয়েছে।দুই নম্বরি ব্যবসা যা ছিল অনেক গোপন কপ্রে দিয়েছে। এখন তার মন্ত্রী হবার আগে তার বড়ছেলেও যদি এত বড় একটা মামলায় ফাসে,সে একদম ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা সে কিছুতেই করতে দিবে না। এই কেইসের সাথে জড়িত সবাইকে পরিবারসহ মেরে ফেলবে।

এদিকে কল্পনা তো খুশিতে আটখানা।  বিশুনাথকে যদি আবার ফাসাতে পারে, তার নারীতান্ত্রিক সমাজের প্রথম প্রস্তাবটা পেশ করতে পারবে।এবং খুব জোরালো ভাবেই।

জবানবন্দি নিয়ে যখন কল্পনা বের হল। এর মধ্যে পুলিশ বিশুনাথকে সব বলে দিল। বিশুনাথ বউ পেটানো লোকটাকে মেরে ফেলতে বলল।তারপর নিজে কল্পনাকে ফোন দিল।

কল্পনা তো কন্ঠ শুনেই অবাক। সে সাথে সাতগে ফোনের রেকর্ডে চাপ দিল। বিশুনাথ বলল,”রেকর্ড করে কাজ হবে না। কারণ আমি এখন যা যা বলব ভাল করে বুঝে নে। তুই কে,তোর বাবা মা কে,তোর ইতিহাস,আমি সব জানি। ১৮ বছর বয়সে পর্নোগ্রাফিতে নাম লিখিয়েছিলি। সেই ভিডিও গুলোতে আগুন জ্বালানোর ফাকে,একটা ছেলে একটা ভিডিও লুকিয়ে এনেছিল।সেই ভিডিও আমি জোগাড় করেছি। আমার ছোট ছেলে তোর জন্য জেলে গেছে,একটু কেচাল করলে,আমার বড়ছেলের বিরুদ্ধে লাগলে,এই ভিডিও যারা দেশে ছড়াব,তোর নারীবাদী নেত্রীর জনপ্রিয়তা কই যাবে ভেবে দেখিস।”

কল্পনা কিছু বলতে গেলে বিশু বলে উঠল,”না না,এখনি  না।কথা শেষ হয় নি। ধরে নিলাম তুই একটা জাত মাগী। তোর লজ্জা শরম নাই।কিন্তু শুনলাম একটা খুব ভাল ফ্যামিলির ছেলেরে বাগাইছিস, সেই ছেলে যদি জানে,তোর সাথে রাখবে সম্পর্ক? তাও ধরে নিলাম,তুই এত বড় মাগী যে এই ভাল ছেলেটা গেলেও তোর সমস্যা নাই,তোর মাকে যদি কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিই? আজ রাতের ভিতরই? কি করবি?  খুব সাবধানে পা ফেলিস।”

ফোনটা কেটে গেল। কল্পনা হা করে তাকিয়ে রইল।

সেদিনই রেজাকে সে গিয়ে বলল,”আমাকে বিয়ে কর।”

রেজা অবাক হয়ে গেল। বলল,”হঠাৎ করে?”

কল্পনা বলল,”না,আমি একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছি,এছাড়া মা একটা সম্বন্ধ ঠিক করেছে,আমি তোমাকে হারাতে পারব না।”

রেজা কল্পনার মিথ্যা কথাটা ধরতে পারল না। বিয়ে করে ফেলল।

বিয়ের রাতেই কল্পনা বুঝতে পারল,আসলেই সে রেজাকে পাগলের মত ভালবাসে,রেজাকে সে হারাতে পারবে না।

কিন্তু রেজা পরের দিন মন খারাপ করে রইল। কল্পনা বলল,”কি হয়েছে?”

রেজা বলল,”তুমি কি এর আগে পাপ করেছ? কেন জানি মনে হল,তাই খারাপ লাগছে।”

কল্পনার বুক কেপে উঠল। সে বলল,”না না,তুমি আমার প্রথম পুরুষ, আমাকে এত বড় একটা অপবাদ দিতে পারলা?” এই বলে কেঁদে দিল।

রেজা বলল,”না না,স্যরি।”

কল্পনা বুঝল,ওর অতীত ফাঁস হয়ে গেলে রেজাকে হারাতে হবে।

আস্তে আস্তে দুই বছর কেটে গেল। সেই লোকটা রিমান্ডে মারা যাবার কথা যখন শুনেছিল রেজা,অনেক কষ্ট পেয়েছিল। নিজ মুখে,হারিয়ে যাওয়া মেয়েটার বাসায় গিয়ে তার বাবা মাকে বলতে হয়েছিল,”পারলাম না আপনার মেয়েটাকে ফিরিয়ে আনতে,আমাকে মাফ করে দিয়েন।”

সেদিন মেয়েটার মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,”আপনি ওয়াদা দিয়ে ভাঙলেন।আপনি মুনাফিক।”

সেদিনের পর থেকে রেজা মনমরা হয়ে থাকত। 

এদিকে কল্পনা আস্তে আস্তে এই বিষয়টা থেকে বের হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল,তার পুরুষবিদ্বেষ যায়নি। তবে দুনিয়ার একমাত্র যে মানুষটাকে সে ভালবাসে সেও একজন পুরুষ। সে রেজা। এই ব্যতিক্রমটা সে মেনে নিয়েছে।

কল্পনার নারী সংগঠন মেয়েদের নির্যাতন বন্ধে এখনো কাজ করে যাচ্ছে। কল্পনা আস্তে আস্তে প্লান করছে,নারীতান্ত্রিক সমাজ কায়েমে নতুন আইনের প্রস্তাব জোরালোভাবে প্রকাশের।

এদিকে রেজাও কাজ করে যাচ্ছে,নিখোঁজ মেয়ের মায়ের মুখে মুনাফিক শোনার পর থেকে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাড়িয়েছে, চাইল্ড পর্নের হোতাদের খুজে বের করা।

এমন অবস্থায় অনেকগুলো ঘটনা একসাথে ঘটল। সারা বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেওয়া একটা গণধর্ষণের ঘটনা ঘটল চলন্ত বাসে,কর্মস্থল থেকে ফেরার সময় এক মহিলা ডাক্তার শিকার হল এর।

সাথে সাথে নারী সংগঠনগুলো চিল্লিয়ে উঠল,প্রচন্ড চাপে অপরাধীদের ধরে ফেলল পুলিশ। আর অবশেষে বিনা বিচারে নারী নির্যাতনকারী পুরুষের মৃত্যুদন্ড ঘোষণার আইন এর প্রস্তাবটা পেশ করল কল্পনা।

প্রস্তাবটা সামনে আসতেই সারা বাংলাদেশে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ল।

তবে একই সাথে আরেকটা ঘটনা ঘটল। রেজা বিশুনাথের বড় ছেলেকে চাইল্ড পর্নের গোপন আস্তানা থেকে হাতে নাতে ধরে ফেলল।

এদিকে ততদিনে বিশুনাথ মন্ত্রী হয়ে গেছে। তবে হাতে নাতে প্রমাণসহ রেজার ডাকে মিডিয়া চলে আসায় তার বড় ছেলেকে কিছুতেই সে বাচাতে পারল না। স্বামী স্ত্রীর জন্য তার দুই ছেলে এভাবে শেষ হয়ে যাওয়ায় সে প্রতিশোধ এর সিদ্ধান্ত নিল।

এদিকে রেজার ল্যাপটপটা নষ্ট হওয়ায়,সে কল্পনার কম্পিউটার থেকে অফিসের কাজ করার অনুমতি চাইল। কল্পনা বলল,”আমার কাছে কখনওই তোমার অনুমতি চাইতে হবে না। আমি তোমাকে সব অধিকারই দিয়ে দিয়েছি।”

রেজা কল্পনার কম্পিউটারে ঢুকে কম্পিউটারে কল্পনার এতদিনে করা নারীতান্ত্রিক সমাজের প্লান দেখে নিল,আর দেখল তার পুরুষদের প্রতি ঘৃণার একটা পার্সোনাল নোট।

নিজের কাজ বাদ দিয়ে সেগুলো পড়তে লাগল রেজা। এমন সময় একটা ইমেইল আসল। ইমেইলটা খুলল সে,একটা ভিডিও।আর একটা হুমকি,কল্পনাকে করেছে,”তোর স্বামীকে দিয়ে মিডিয়ায় বলাবি আমার ছেলে নির্দোষ, তোর স্বামী আমার ছেলেকে ফাসিয়েছে,নইলে এই ভিডিও আমি বিটিভি নিয়ে প্রচার করাব।”

ভিডিও তে ক্লিক করল রেজা। বউয়ের ১৮ বছরের ভিডিওটা দেখল।

এদিকে কল্পনা ওর মোবাইল থেকেও সেইম ইমেইল পেল। ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এদিকে ও দেখল, সরকার এক মাসে জন্য কল্পনার প্রস্তাবিত আইনটা চালু করবে,দেখবে,আসলেই এতে নির্যাতন কমে কিনা। এই এক মাসে কোনো নারী কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ আনলেই সেই পুরুষ কে বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।

কল্পনা বাসায় গেল।কিভাবে রেজাকে বলবে বুঝছে না। গিয়ে দেখল,রেজা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। এই হতভম্ব দৃষ্টিটা কল্পনা চেনে। অনেক আগে আরেকটা পুরুষের মুখে এই ভাবটা সে দেখেছিল।তার নিজের বাবা।

কল্পনা কাছে গেল রেজার।রেজাকে বলল,”শোনো একটা কথা আছে আমার।”

রেজা চুপ। কল্পনা কিসব বলে গেল রেজা শুনল না। একটা কথাই বলল,”তুমি যখন একেবেকে,বুকের উপর ঘষটাতে ঘষটাতে এসে আমার কানে হিসহিসিয়ে বলেছিলে,”ভালবাসি শশশশশস,,,” সেদিন তোমার ফণাটাকে আমি ভেবেছিলাম ভালবাসার চিহ্ন ( সে দুই হাতে লাভ চিহ্ন বানয়ে দেখাল),,,,”

রেজা চলে গেল। কল্পনা ওর কম্পিউটার এর সামনে ধপ করে বসে পড়ল।কম্পিউটারে ফুটে আছে সেই যে ওর ভাষণের জন্য লেখা প্রশ্ন গুলো। রেজা সব প্রশ্নের নিচে উত্তর টাইপ করে দিয়েছে।

“কারণ মেয়েরা “মা” হয়।এর চেয়ে বড় সম্মান নেই।”মা” এর সম্মান সবাই রাখতে জানে। যারা জানে না,ফল পায়। যারা “মা” হয়,বোঝে,ফল পাচ্ছে কিনা। যারা “মা” হয় না,তারা সব পেয়েও কিছু পায় না।কিছুই যথেষ্ট হয় না।”

২ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটা কোথায় আছে সন্ধান পেল রেজা। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসায়। ছুটে গেল সেখানে। একটা পুরনো বিল্ডিং থেকে মাদক দিয়ে রাখা, ১১ বছরের মেয়েটাকে পেল সে। ২ বছর অত্যাচার করেও বাচিয়ে রাখা হয়েছে মেয়েটাকে,শুধুমাত্র সুন্দর বলে,,,,

অজ্ঞান মেয়েটাকে উদ্ধার করে সে যখন নিচে আসছে,উপর থেকে বিশুনাথের সেট করে রাখা একটা  মহিলা চেচিয়ে বলল,”বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে খেলল পশুটা,এখন নামাচ্ছে দেখ। কেউ কিছু কর,কিছু একটা বল,পালাচ্ছে তো?”

বিনা বিচারে নারী নির্যাতনকারীর মৃত্যুর আইনের প্রথম শিকার হল কল্পনা নীলুফারের স্বামী রেজা হাসান।

গল্প ১০০

​”একটি ফালতু গল্প”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

রিয়াদের হাতে ওর রক্ত আর বোন ম্যারো টেস্টের রিপোর্ট এসেছে।রিপোর্ট দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ডাক্তার রিপোর্ট দেখিয়ে যেতে বলেছিল,কিন্তু রিপোর্ট কি দেখাবে,তার দাঁড়িয়ে থাকতেই কষ্ট হচ্ছে।

রিপোর্ট এ লিউকেমিয়া ধরা পড়েছে। প্রায় শেষের দিকে অবস্থা।মানে এখন ফেরার পথ নেই আর কি। ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট নিয়ে গেলে ডাক্তার মুখ ভার করে কি বলবে জানে রিয়াদ। তার চোখের সামনেই এতদিন কত স্যারকে বলতে দেখেছে। সময় শেষ,তবে ঢাকায় নিয়ে প্যালিয়েটিভ চিকিৎসা করানো যাবে।মানে মরার আগে কষ্ট একটু কম ভুগতে হবে। জ্বর কম হবে,নাকমুখ থেকে রক্ত কম যাবে,মাথা কম ঘুরাবে।

হাসপাতাল থেকে আজ তাড়াতাড়ি ছুটি নিল রিয়াদ।ইন্টার্নদের সংখ্যার তুলনায় অনেক রোগী। এরমধ্যে হঠাৎ একজন ছুটি নিলে বাকিদের উপর চাপ পড়ে। বিরক্ত হয় বাকিরা,মহাবিরক্ত।

বাসায় যাবার পথে রিপোর্টটা ড্রেনে ফেলে দেয় রিয়াদ। বাসায় জানানো যাবে না। বাসায় আব্বু বড় গলা করে আত্মীয়,কলিগ আর প্রতিবেশীদের বলছে।তার সারাজীবন এর কষ্ট সার্থক।ছেলে ডাক্তার হয়ে গেছে।কয়েকদিন পর চাকরিতে ঢুকবে।সম্মান পাবে,অর্থ পাবে। গর্বে তার বুক ফুলে উঠেছে।প্রতিদিন ভাঙা রেকর্ডের মত ছেলের সাফল্যের কথা বলায় বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই তার। 

বাসায় কখনওই বলা যাবে না,কখনওই না। মরার আগে,বাবা মায়ের আশাভঙ্গ, স্বপ্নভঙ্গের আতংকিত চেহারা দেখতে দেখতে প্রতিদিন গুমড়ে মরতে পারবে না সে।

রিকশাওয়ালাকে একটু রিক্সাটা থামাতে বলল সে। পাশের ড্রেনে গিয়ে বমি করে দিল। বমির সাথে রক্ত। তাই দেখে রিকশাওয়ালা এসে ধরল তাকে। অজ্ঞান হয়ে গেল রিয়াদ।রিকশাওয়ালা তাকে রিকশায় বয়ে আনল। ঠিকানা মত পৌছে দিল।

ভাগ্য ভাল যে ঠিকানা রিয়াদ দিয়েছে,আশেপাশে অনেক বাসা। রিকশাওয়ালা রিয়াদের বাবা মাকে খুজে বের করতেই রিয়াদের জ্ঞান ফিরল। রিকশাওয়ালা কিছু বলার আগে রিয়াদ তার দিকে অসহায়ের মত তাকিয়ে মাথা নাড়াল। রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে চুপ করে গেল।

রিয়াদ বলল,”কাজের চাপ বেশি হয়ে গেছে,মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম। ছুটি নিয়েছি।”

রিয়াদের বাবা ছেলেকে ধরে ধরে বাসায় নিয়ে শুইয়ে দিল। রিয়াদের মা সাথে সাথে এক গ্লাস গরম দুধ করে দিল।

রিয়াদ গরম দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেল।কেন যে একটু অসুস্থ অনুভব করায় মাতব্বরি করে নিজের টেস্ট নিজেই হাসপাতালে করাল! না করালে মাথার পাশে বসে থাকা বাবা মায়ের কথা গুলো শুনলে তার বুকটা আজ হাহাকার করত না।

বাবা মা বলছে,এই ছোট ঘরে থাকবে না।বড় ফ্লাটে উঠবে,রিয়াদের আলাদা রুম হবে,রিয়াদের জন্য সুন্দর ফুটফুটে একটা বউ আনবে।

রিয়াদ দুঃস্বপ্নের মত করে স্বপ্নগুলো ভুলে যাবার চেষ্টা করল।

সেদিন থেকে রিয়াদ হাসপাতালে যাওয়া বাদ দিয়ে দিল। ইচ্ছা হলে যায়,ইচ্ছা না হলে যায় না। প্রফেসররা ফোন দিয়ে গালাগালি করে। কেউ কেউ তো থ্রেটই দেয়,এসব চালিয়ে গেলে রিকমেন্ডেশন দেবে না। সার্টিফিকেটও পাবে না,লাইসেন্সও না।

রিয়াদ মনে মনে বলে, সেই ঝামেলায় যাবার আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে সে। যতদিন বাঁচে,পৃথিবীটাকে একটু দেখতে চায় সে প্রাণ খুলে। পড়াশুনা, ব্যস্ততা,ইত্যাদির চাপে পৃথিবীটাকে কখনওই ভাল করে দেখা হয় নি রিয়াদের। পৃথিবীটাকে অপূর্ব সুন্দর লাগতে থাকে তার কাছে।এতটা টান বুঝি প্রকৃত প্রেমের মধ্যেও আসে না।

ইন্টার্নের টাকা জমিয়ে একবছর পর একটা মোটরসাইকেল কেনার খুব শখ ছিল রিয়াদের।টাকা জমাচ্ছিল। ব্যাংক থেকে টাকাগুলো তুলে নিল।বাসায় কাউকে না জানিয়ে। রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে দামি দামি খাবার খেতে লাগল। মজার মজার খাবার,যা কখনো খায় নি আগে,হয়ত খাওয়া হতও না। গড়পড়তা মানুষের মত আয়ু পেলে।

খায়,ঘোরে,আর রক্তবমি করে,কাশির সাথে রক্ত পরে,পেশাব,মল সবকিছুর সাথে রক্ত পড়ে।চোখের নিচে কাল একটা রেখা পরে,শরীরটা ইংরেজদের মত সাদা হয়ে যায়,ঠোটটাও,লাশের মত লাগে,কয়েকদিন পর ও যা হবে আর কি। বাবা মা ভাবে অনেক কাজের চাপ তো তা এই অবস্থা।ঠিক হয়ে যাবে।

তো এভাবেই দিনকাল কাটছিল।রাতও কাটছিল।মরণও ঘনিয়ে আসছিল। 

একরাতে অনেকদিন পর হাসপাতালে গেল সে।কি অবস্থা সবার,দেখার জন্য। আজ হাসপাতালে তার ইউনিটে রোগী কম ছিল খুব। মাত্র ৩/৪ টা বেডে রোগী। 

তো হঠাৎ রাত ১২ টার দিকে একটা বুড়ো লোককে স্ট্রেচারে করে ঠেলতে ঠেলতে একটা সুন্দরি মেয়ে কাদতে কাদতে ইউনিটে ঢুকল।

রিয়াদ বলল,”আপনাকে এখানে কে আসতে বলেছে? আজ তো এ ইউনিটে এডমিশন না।”

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল,”আমার বাবার বুকে প্রচন্ড ব্যাথা,কিছু একটা করেন। নিচে কোথাও কাউকে পাইনি। স্ট্রেচারে উঠিয়ে নিজেই ঠেলে এনেছি।প্রথম যে ইউনিট চোখে পড়েছি সেখানেই ঢুকে পড়েছি।কিছু একটা করেন।”

লোকটা সিম্পটম দেখে রিয়াদের ধারণা হল,হার্ট এটাক। এবং খুবই খারাপ অবস্থা। মেয়েটাকে বলল,”এই ওষুধ কয়টা নিয়ে আসেন,আর সামনের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় ইসিজি মেশিন আছে,কোনো লোককে নিয়ে আসতে বলেন,তাড়াতাড়ি।”

মেয়েটা একটু ইতস্তত করল। তখন রাত ১ টা বাজে।সাথে কেউ নেই।একা সে। বাবার দিক একবার তাকিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে গেল। এদিকে লোকটার অবস্থা আস্তে আস্তে আরো খারাপ হচ্ছে।

আধাঘণ্টা পার হয়ে গেল। মেয়েটা এল না। রিয়াদ এরইমধ্যে হাসপাতালের স্টোরে গেল ওষুধ গুলো খুজতে।স্টোর বন্ধ। শেষে বাধ্য হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা এক রোগীকে অনুরোধ করল,তার কাছে ওষুধ আছে কিনা। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বেশ কয়েকজন রোগী,বিভিন্ন ধরণের ওষুধ তাকে দিল,যা হার্ট এটাকের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলাবে।

রিয়াদ সেই ওষুধগুলো দিয়েই লোকটাকে সুস্থ করে দিল। তারপর ঘুম পাড়িয়ে দিল।

অন্য রোগী,যাদের কাছ থেকে ওষুধ এনেছে,তারা সাথে সকালে স্টোর খুললেই ওষুধ ফেরত পায় সে ব্যবস্থা করে দিল। তারপর মেয়েটার আসার অপেক্ষা করল ইসিজির জন্য।মেয়েটা তখনও আসছে না।

রিয়াদের মাথা ঘুরে উঠল।বাথরুমে গিয়ে আরেকবার রক্তবমি করতে হল।আর থাকা সম্ভব না। নার্সকে বলল,”মেয়েটা ফিরলে ইসিজিটা করিয়ে নিয়েন,আর এই প্রেসক্রিপশনটা ধরিয়ে দিয়েন,রোগী ঘুম থেকে উঠলে খাওয়াতে হবে।আমি গেলাম”

রিয়াদ বের হয়ে গেল। রাত ১ টা। রিক্সা,অটো কিছু নেই। পিছনে মেইন রোডে গেলে কিছু পেতে পারে।তাই অন্ধকার ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে হেটে রাস্তার দিক এগোতে লাগল।

হঠাৎ কোত্থেকে একবার “বাচাও” বলে একটা চিৎকার এল,সাথে সাথে কারো মুখ চেপে ধরলে যেমন শব্দ হয়,তেমন অবস্থা।

শব্দ শুনে এগোতেই রিয়াদ দেখল,ওই হার্ট এটাকের রোগীর মেয়েটাকে নিয়ে ৪/৫ টা ছেলে টানা হেচড়া করছে,একটা নির্মাণাধীন বাড়িতে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

রিয়াদ কাছে গিয়ে বলল,”কি হচ্ছে এখানে?”

রিয়াদ দেখতে পেল,যে ৪ জন মেয়েটাকে নিয়ে টানা হেচড়া করতেছে,তাদের একজনকে সে চেনে,হাসপাতালের সামনের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ইসিজি মেশিন এই লোকটা চালায়। বাকিদের কাউকে সে চিনল না,যদিও একজনকে একটু আগে দেখেছে সে,কোনো এক রোগীর আত্মীয়।

একজন একটা ছুরি বের করে রিয়াদের দিক ধরে বলল,”এখান থেকে আস্তে করে ভাগ। নইলে গলা নামিয়ে দেব”

রিয়াদ পিছু হটে গেল। পিছু হটতে দেখে মেয়েটা গুমড়ে উঠল,অসহায় চোখে শেষবারের মত মিনতি করল।

রিয়াদ পিছু ফিরে চলতে শুরু করল। কানের ভিতর কেমন জানি ঝা ঝা শব্দ। পিছে এখনো মেয়েটার আতংকিত গোঙানি শোনা যাচ্ছে।

হঠাৎ রিয়াদের মনে পড়ল। ছুরি দেখে ভয় পাবার কি আছে?আর তো কয়দিনই বাকি। ২ মাস কমই না হয় বাচলাম। মেয়েটা তো আরো অনেক বছর বাঁচতে পারে। মেয়েটাকে আজ রাতেই মরতে দেওয়াটা অপ্রয়োজনীয়।

সে ফিরে গেল। ততক্ষনে ওরা বিল্ডিং এর ভিতরে ঢুকিয়ে মেয়েটাকে শোয়ানোর ব্যবস্থা করছে।রিয়াদ পড়ে থাকা একটা রড হাতে নিল। তারপর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টেকনোলজিস্টটার মাথার পিছনে সজোরে একটা বাড়ি দিল।

মাথার ঘিলু আর রক্ত ছিটকে পাশের দেয়ালে পড়ল। এই অবস্থা দেখে আতংকিত হয়ে বাকি ৩ জন দৌড়ে পালাল।তাদের কাছে যে ছুরি আছে,সেটা তাদের মাথায় এল না।

রড হাতে রিয়াদ,আর ধুলো মাখা পোশাক গায়ে মেয়েটা দাঁড়িয়ে রইল। দুইজনের মুখে কোন কথা নেই।

রিয়াদ হঠাৎ বলল,”আপনার বাবা সুস্থ আছেন,ঘুমাচ্ছেন।” 

এই বলে রডটা ফেলে দিয়ে দ্রুত পারে হেটে গেল সে।

মেয়েটা পিছু পিছু যতটা যাওয়া যায় গেল হাসপাতালের দিকে। হঠাৎ কি মনে হতে রিয়াদের হেটে যাওয়া দেখল সে। আবার ফিরে এল ভবনটায়,রক্তে ভেসে গেছে মেঝেটা। মেয়েটা রডটা হাতে নিল। হাসপাতালে আসার আগে পাশে একটা পুকুর দেখেছিল সে। পুকুরটাতে ফেলে দিল সে রডটা।

পরেরদিন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এর লাশটা পাওয়া গেল।রিয়াদ কিন্তু অসুস্থ লাগলেও আজ হাসপাতালে আসল। কারণ সে জানে পুলিশ আসবে,পুলিশ এসে জিজ্ঞাসাবাদ করবে,এর মধ্যে একজন ডাক্তার যার ডিউটি কালরাতে ছিল,সে হাসপাতালে না এলে সন্দেহ করবে।

হাসপাতালে এসে দেখল,পুলিশ কালকে রাতের সেই মেয়েটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা কি জানি বলছে আর মাথা ঝাকাচ্ছে।

রিয়াদ দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটা সরাসরি রিয়াদের দিক তাকাল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার পুলিশের দিকে তাকাল।রিয়াদ কাছে গেল।

পুলিশ বলছে,”ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লোকেরা বলছে, ভিক্টিমের সাতগে আপনি শেষ কথা বলেছেন,আপনি ইদিজি মেশিন নিয়ে তাকে হাসপাতালে আসতে বলেছিলেন।তারপর কি হল?”

মেয়েটা বলল,”উনি বলল,ইসিজি মেশিন নিয়ে যেতে পারবে না,বাবাকে নিয়ে আসতে বলল,আমি বাবাকে আনতে ফিরে এলাম।”

পুলিশ বলল,”ওনারা যে বলল,আপনি যাবার পরেই লোকটা বের হয়ে গেল?”

মেয়েটা বলল,”আমি কিভাবে জানব?”

পুলিশ বলল,”আপনার বাবাকে নিয়ে আর ইসিজি করাতে যান নি?”

মেয়েটা বলল,”না,এসে দেখি,বাবার অবস্থা ভাল।ডাক্তার সাহেব বললেন,কালকে সকালে করালেই হবে।”

পুলিশ বলল,”কোন ডাক্তার?”

মেয়েটা রিয়াদকে দেখিয়ে বলল,”এই ডাক্তার সাহেব”

পুলিশ রিয়াদের দিক ফিরে বলল,”মেয়েটা যা বলছে তা কি সত্যি?”

রিয়াদ বলল,”হ্যা সত্যি।”

পুলিশ চলে গেল। রিয়াদ হাসপাতালের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। মেয়েটা ওর বাবার পাশে বসে রইল।

হাসপাতালে থাকা পুরো ৫ ঘন্টা সময়ের যে মুহুর্তেই রিয়াদের চোখ মেয়েটার উপর পড়েছে,রিয়াদ দেখেছে,মায়াবী চোখ দুটো ওর উপরই স্থির।

মেয়েটার নাম জানা গেল রিমি। তার বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ৭ দিন ছিল সে আরো। এই ৭ দিনে কারণে অকারণে সে ইন্টার্নদের রুমে যাওয়া আসা করত। রিয়াদও উটকো সন্দেহ না উঠাতে নর্মাল ইন্টার্নদের মতই প্রতিনিয়ত হাসপাতালে যেতে লাগল।

রিয়াদ মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় অজনপ্রিয় থাকায়,তার শারীরিক পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করার মত কেউ ছিল না। তবে এই ৭ দিনে যতবারই সে রিমির বাবার বেডের কাছে গিয়েছে,ততবারই রিমি তাকে জিজ্ঞেস করেছে,সে ঠিক আছে কিনা,কারণ তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে ঠিক নেই।

মৃত্যুর আগে একটা জলজ্যান্ত মানুষ খুনের রক্ত রিয়াদের হাতে।মৃত্যুর দুঃস্বপ্নের সাথে সাথে নতুন এক দুঃস্বপ্ন তাই জেকে ধরল তাকে। সেই খুন করাটা সে প্রতিনিয়ত দেখতে লাগল ঘুমেই। সে খেয়াল করল,রিমিকে দেখলেই তার সেই রাতের কথাটা মনে পড়ে।

রিয়াদ তাই রিমির বাবার বেডে যাওয়াটা অফ করে দিল। অন্য ইন্টার্নদের রিকুয়েস্ট করল সেখানে যেতে।

এভাবে হঠাৎ যাওয়া বন্ধ করায় রিমি শেষে নিজেই ইন্টার্নদের রুমে আসা শুরু করল,রিয়াদের দিক তাকিয়ে থাকতে।

বেশিদিন এড়াতে হল না। রিমি ওর বাবাকে নিয়ে রিলিজ পেয়ে গেল। কয়েকদিন পর আরেকটা টেস্ট করাতে হবে,তখন আবার হাসপাতালে আসতে হবে তাদের। রিয়াদ ভাবল,ভালই হল,আর দেখতে হবে না।বেশিদিন তার আয়ু নেই।

রিমি কিন্তু রিয়াদকে ছেড়ে দিল না। সেরাতে খুন করার অস্ত্র তার নিজের ঝুকি নিয়ে ফেরত গিয়ে পুকুরে ফেলে দেবার কারণও সে ব্যাখ্যা করতে পারে না। নরমাল সাইকোলজি বলে কোনো জায়গায় মেয়েরা ধর্ষিত বা ধর্ষণের চেষ্টা করা হলে,সেজায়গায় ফিরে তারা কখনো যায় না,গেলেই দুর্বিষহ এক স্মৃতি হানা দেয়,সে ঘটনায় শরীরের কোথাও ব্যাথা লাগলে,সাইকোলজিক্যালি সেই ব্যাথা আবার ফিল করে তারা। এটা রেইপ-ট্রমা সিন্ড্রোম। মানে সেটার একটি প্রকারভেদ আর কি। তবে ঘটনার ভুক্তভোগী হবার কিছুক্ষণের মধ্যে এক অজানা অচেনা রক্ষককে বাচাতে অনেকগুলো ঝুকি নিয়ে ঘটনাস্থলে ফিরে যাওয়াটা যুক্তিতে মেলে না।

 মেয়েটার আরো অনেক আচরণই যুক্তিতে মেলে না।মেয়েটা তার বাবা সুস্থ হয়ে যাবার পরেও লুকিয়ে হাসপাতালে আসতে লাগল,রিয়াদের সাথে যেকোনভাবে কথা বলতে।কিন্তু দুঃস্বপ্নের জন্য রিয়াদ এড়িয়ে যেতে লাগল।

ঘটনা একটু পুরনো হতেই রিয়াদ আবার হাসপাতালে অনিয়মিত হতে লাগল। রিমি যেন রিয়াদের শিডিউল মুখস্থ করে রেখেছিল।একদিন না দেখেই অস্থির লাগল তার।

হাসপাতালের রেকর্ডস এ রিয়াদের নাম,ঠিকানা জোগাড় করল সে। এই কাজটা কেন করছে সে তার ব্যাখ্যা নিজেরও নেই। তবে বাংলা সিনেমাকে এতদিন কটাক্ষ করে আসা  রিমির হঠাৎ মনে হল,তার জীবনে প্রথম প্রেমটা বাংলা সিনেমার মতই এল। নায়ক বাচাল নায়িকাকে,নায়িকা মরল নায়কে চোখের মায়ায়।

রিয়াদ কোথায় কোথায় প্রতিদিন যায় রিমি লক্ষ্য  করতে লাগল। একসময় রিয়াদ ধরে ফেলল ব্যাপারটা। সে ইচ্ছা করেই কোনো একটা নির্জন জায়গায় গেল।জানত রিমিও পিছু নেবে। জায়গাটা নির্জন হতেই রিমির কাছে গিয়ে সে বলল,”আপনি আমার পিছু কেন নিয়েছেন?”

রিমির কাছে তো উত্তর নেই।সে বলল,”জানি না।”

রিয়াদ বলল,”দেখেন,আপনাকে দেখলে আমার সেইরাতের কথা মনে পরে,আমি রাতে ঘুমাতে পারি না।দুঃস্বপ্নে জেগে উঠি।”

রিমি বলল,”আমার আপনাকে দেখতেই হয়।আপনাকে দেখলে মনে হয়,যত কষ্ট বা বিপদ আসুক,আপনাকে দেখলে উদ্ধার পাব,সেই রাতের মত।”

রিয়াদ চুপ করে রইল। এই উত্তর আশা করে নি। 

রিমি বলল,”চলেন কোথাও একটু বসি।”

রিয়াদ রোবটের মত ওর পিছে যেতে থাকল। পাশেই একটা বড় দিঘি,সেটার পাশে দুইজন বসে রইল।

গল্পটা যেহেতু ফালতু,কারণ এক খুবই পরিচিত মানুষ লেখককে বলেছে,দুই অক্ষর লিখলেই গল্প হয় না। লেখকের গল্প ফালতু হয়। আর প্রেমভালবাসা সম্পর্কে লেখকের অভিজ্ঞতা ভাল না।তাই ওখানে কি কথা হয়েছিল লেখক সেটা ফুটিয়ে তুলতে অপারগ।

তবে ২ ঘন্টা কিসব কথা বলার পর,রিয়াদ বুঝল সে মেয়েটার প্রতি এতটুকু সময় এর ভিতরে দুর্বল হয়ে গেছে। এই দুর্বলতা রক্তবমির সময় রক্ত হারানোর দুর্বলতা না।

এক স্বর্গীয় সুখ রিয়াদের উপর নেমে এল।যখন মেয়েটাকে সে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখল। এভাবে কেউ যে কারো দিকে তাকাতে পারে তার জানা ছিল না। এতটা আপন করে কেউ তাকাতে পারে?

মেয়েটা বলল,”জায়গাটা ভালই,শীতের সকালে কুয়াশার ভিতর খালি পায়ে মাঠের উপর দিয়ে হেটে দিঘির পাড়ে আসলে মন্দ হয় না। তবে সাথে কাউকে চাই।”

সাথে সাথে মনে হল রিয়াদের বুকে কেউ একটা ঘুষি মারল। আগামী শীত পর্যন্ত তার আয়ু তো নেই।

মেয়েটাকে অবাক করে দিয়ে তাকে ওখানে রেখেই সে দ্রুতপায়ে হেটে গেল। মেয়েটা এই প্রথম খুবই কষ্ট পেল। পিছন থেকে বলল,”আচ্ছা,এই শীতে আমার সাথে আসতে হবে না এখানে,আগামী শীতে হবে নে।ততদিনে আমি কি আপনার খুব পরিচিত হতে পারি?”

রিয়াদ চলে গেল। মেয়েটা নিজমনেই বলল,”আপনার নম্বর পেয়েছি হাসপাতাল থেকে।ফোন দিতে পারি?”

রিয়াদ আজ তাড়াতাড়ি বাসায় এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভাগ্য ভাল আজ বাসায় বাবা মা নেই।কোথায় গেছে কে জানে। ছেলের গুণকীর্তন করতেই গেছে। বিছানায় শুয়ে নিজেকে থামানোর আগেই রিয়াদ অঝোরে কেদে দিল। এই প্রথম তার মনে হল,মাত্র ২ মাস আয়ুতে তার পোষাবে না। রিমির সেই দৃষ্টিটা চোখে ভাসতে লাগল।শেষ রিকুয়েস্ট টাও,”আপনার সাথে আগামী শীতে খালি পায়ে মাঠে হাটব।ততদিনে খুব বেশি পরিচিত হতে পারি কি?”

এদিকে একটা দিন অপেক্ষা করল রিমি। তড়পালো একা একা। তাও অপেক্ষা করল। তারপর ফোন দিল রিয়াদকে। রিয়াদ ধরল ফোন। রিমি কথা বলতে শুরু করল। রিয়াদ উত্তর দিতে লাগল। কি কথা,লেখক জানে না। জানলে গল্পটা ফালতু হত না।

কথা বলার মধ্যে হঠাৎ রিমি ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো একটা কথা বলল। তার স্বপ্নের কথা,স্বপ্নটা পরোক্ষভাবে রিয়াদকে জড়িয়েই। সেই হিন্টও সে দিল। রিয়াদের ভাললাগার ভাবটা চলে গেল আবার।তবে এবার ফোনে বলে রিয়াদের কিছু সাহস হল। সে বলল,”আপনি কি চান? টাকা চান? ব্লাকমেইল করবেন? আমার পিছু কেন নিছেন? এভাবে এই ঘটনা সব মেয়ে ভুলতে চায়।কেউ এই ঘটনার উপর ভিত্তি করে প্রেমে পড়ে না। লাইফটা সিনেমা না।আমি বুঝি সব।টাকা লাগলে বলেন কত লাগবে। আমি দেব। আমার পিছু নেওয়া বন্ধ করেন। আর আমাকে পুলিশে দিয়েন না। পুলিশে দিলে আমার বাবা আত্মহত্যা করবে লজ্জায়।”

এই বলে ফোনটা কেটে দিয়ে বন্ধ করে দিল সে। 

ফোনের ওপাশে রিমির হাত পা কাপতে লাগল। ঠোটটা থরথর করে উঠল।

রিমি তারপরও রিয়াদের পিছু নেওয়া ছাড়ল না। তবে এবার সাবধান হল। রিয়াদ যাতে ভুলেও তাকে না দেখতে পায়।

রিয়াদ কিন্তু ঠিকই দেখতে পায়। এবার তার দুঃস্বপ্নটা খুনেই সীমাবদ্ধ নেই,সেদিনের কারো হৃদয়ভাঙাটাও স্বপ্নের অংশ হয়ে গেছে।

“কেন তুমি স্বাভাবিক মেয়েদের মত না? কেন তুমি অপমানিত হবার পরও আশা ছাড় না?  কেন তুমি স্বাভাবিক মেয়েদের মত অপমানিত হবার পর ঘৃণা শুরু কর না? আমি তোমার কেউ না। কিন্তু বিবাহিত মেয়েরাও তো স্বামীর কাছে অপমানিত হলে সারাজীবন মাফ করে না। সামাজিক দায়বদ্ধতায় সাথে রয়ে যায়। স্বামীকে বুঝতেও দেয় না কতটা ঘৃণা করে। তোমার তো সুযোগ আছে আমাকে প্রাণভরে ঘৃণা করে আমার কবল থেকে মুক্তি নেবার।”

একা একা ভাবে রিয়াদ। যদি সেদিন তার রিপোর্টটা নরমাল আসত,আজ মেয়েটাকে সে এড়িয়ে যেত না। সেও তাকে বলত,”হ্যা,আমারো খুব শখ,কুয়াশামোড়া সকালে খালি পায়ে কারো সাথে এই মাঠে হাটা।”

অবশ্য রিপোর্ট নরমাল আসলে কি সে সেই রাতে জীবনের ঝুকি নিয়ে বাচাতে যেত রিমিকে?

এদিকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট খুনের বিচার বা সুরাহা এখনো হচ্ছে না বলে শহরের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ফোরাম আন্দোলন শুরু করল। রাস্তা অবরোধ করল।গাড়িঘোড়া ভাঙল কিছু। পুলিশ ঝিমুনি দিয়েছিল কেইসটা নিয়ে।আন্দোলনের মুখে কেইসটা আবার জেগে উঠল।

এখন ওই যে ৩ রেপিস্ট পালিয়ে গিয়েছিল সেরাতে রড দেখে। তাদের মধ্যে একজন তো সেদিন সন্ধ্যায় এক রোগী সাথে এসেছিল হাসপাতালে। তো সেই রোগীকে কয়েকদিন পর একটা টেস্ট করিয়ে আনতে বলেছিল ডাক্তার। 

সেদিন রিমিরও ওর বাবাকে নিয়ে আবার আসার কথা ছিল। একসাথে হাসপাতালে এসে দুইজন মুখোমুখি হয়ে গেল। 

ছেলেটা রিমিকে দেখে ভয়ে সিটিয়ে গেল। এই বুঝি মেয়েটা কিছু করে। কিন্তু রিমি চিল্লিয়ে কিছু বলার আগেই রিয়াদের কথা মনে পড়ল।

সে অনেক কিছু ভাবল।রেপিস্টটাকে দেখে সে যদি এখন চিল্লায়,পুরনো সেই কথা উঠবে। রিয়াদ ফেঁসে যাবে। এমনিতেই কয়েকদিন ধরে নিরীহ সেই রেপিস্ট হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশ উত্তাল। 

রিমি চুপ করে রইল।এদিকে রিয়াদের সাথে দেখা হয়ে গেল তার। রিমি রিয়াদকে দেখে সব ভুলে গেল। একটু আলাদা হল ওরা। রিয়াদ মাফ চাইল রিমির কাছে। আসলে ও আর থাকতে পারছিল না। তবে কেন একাজ ও করছিল জানে না। ও ভাল করেই জানে নিজে আশা করেও লাভ নেই,মেয়েটাকে আশা দিয়েও লাভ নেই। তাও সে পারল না আর নিজেকে আড়ালে রাখতে।এই মেয়েটার কাছ থেকে আড়ালে যাওয়া সম্ভব না।

রিয়াদ আর রিমি যখন পরস্পরের দিক তাকিয়েছিল,যেই ওদের দেখছিল সেই বলতে পারবে,নতুন প্রেম শুরু হল সেদিন থেকেই।

সেই রেপিস্টটাও বুঝতে পারল। পুরুষদের মনে হিংসা নেই এটা কেউ বলতে পারবে না। মেয়েদের চেয়ে বেশি আছে আরো। যদি কোনো পুরুষ একমত না হয়,বুঝতে হবে সে মিথ্যাবাদী।

আর অপরাধীদের ভিতর এই হিংসার ভাব টা বেশি হয়। যেই দেহ সে পায় নি,সেটাকে সারাজীবন ধরে আরেকটা পুরুষ পাবে?

রেপিস্টটা থানায় গিয়ে বলল, সেরাতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে খুন হতে সে দেখেছে। তবে ভয়ে কাউকে বলে নি। কারণ কিছু হলেই তো ইন্টার্নরা বিচার চেয়ে ধর্মঘট ডাকে। তবে কৌশলে সে ওখানে রিমির থাকার ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল। কাহিনীটা এটা দাড়াল যে,নির্মাণাধীন বিল্ডিং এর ভিতর ডাক্তার,টেকনোলজিস্ট এর সাথে তর্কের এক পর্যায়ে মাথায় বাড়ি দেয়।রেপিস্ট ভাল ছেলে,সে মায়ের ওষুধ আনতে অত রাতে বাইরে যাওয়ার সময় দেখতে পায় ঘটনাটা।

বিকেলে রিয়াদের সাথে রিমির দেখা করার কথা ছিল। রিমির জীবনের প্রথম ডেইট এটা। সেজেগুজে এল সে। রিয়াদ আসে নি তখনো। সময় কাটাতে ফেসবুকে ঢুকল সে। 

বাংলাদেশের সব নিউজ পোর্টালে একটাই খবর। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হত্যার দায়ে ডাক্তার গ্রেফতার। গ্রেফতারকৃত ডাক্তারের ছবিটা রিয়াদের।

সেদিন থেকে সারা বাংলাদেশ ক্ষোভে উত্তাল হয়ে গেল। এমনিতেই ডাক্তারদের প্রতি মেডিকেলে চান্স না পাওয়া মানুষের একটা ঘৃণা কাজ করে। কোন ইস্যুতেই সেই ঘৃণা উপচে পড়ে। আর এটা তো বেশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। একেবারে খুন।

এমনিতেই মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা নামের আগে ডাঃ বসানোর জন্য এতদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। এর মধ্যে এরকম একটা ঘটনা তাদের দাবিদাওয়া আদায়ে একটা মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

খুনের একেকটা তত্ত্ব একেকটা মিডিয়ায় আসতে লাগল। তবে বেশিরভাগ সাংবাদিক নাকি গোপন এবং বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছে, রোগীকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে শুধু শুধু পাঠালেও টাকা পয়সা প্রাপ্তি মনের মত হয় নি বলে এভাবে খুন করা হয়েছিল।

এদিকে রিয়াদের বাবা খবর শুনে স্ট্রোক করল। তার মা মানসিক ভারসাম্য হারাল। প্রতিবেশীরা পিছনে বসে হাসাহাসি করল। রিয়াদের বাবার গর্বে ভরা বুক ফুটো হয়ে যাবার আনন্দে কথাটা আত্মীয় কলিগদের কাছে হাস্যরসের উদ্রেক করল।

রিয়াদের অজনপ্রিয়তার কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চুপ করে রইল। ইন্টার্ন ডাক্তাররাও। উলটা তারা #Not_all_of_us_is_murderer  বা #দোষীর_সাজা_চাই ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিতে লাগল।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে কেইসটা নেওয়া হল। সবাই অনুমান করতে পারছে কি হবে। ডাক্তারের ফাসি হতে আজ অবধি বাংলাদেশে কেউ দেখে নি। আজ এমন একটা ঘোষণা আসবে বলে দেশের জনগণ উত্তেজনা বোধ করতে লাগল।

এদিকে রিমি তো জানে আসল ঘটনা কি। তবে এও জানে খুন তো রিয়াদই করেছে।তাও সে একটা প্লান করল। কোনো এভিডেন্স নাই খুনের।অস্ত্র সে নিজে ফেলে দিয়েছে। রেপিস্টদের কারো গায়েই রিয়াদের হাতের ছাপ ছিল না। মানে পুরো ব্যাপারটাই একটা সাক্ষীর উপরই নির্ভর করছে।

রিমিই উকিল ঠিক করল রিয়াদের পক্ষে।এমনকি উকিলকেও সে সত্যি কথাটা বলল না।

আদালতে মামলা ওঠার পর বাদীপক্ষের উকিল ডাক্তাররা অমানুষ এই শিরোনামে বিশাল একটা ভাষণ দিল তারপর দুইটা সাক্ষী ডাকল,প্রথম সেই রেপিস্টকে,আর দ্বিতীয় সেই নার্সকে,যাকে বলে রিয়াদ সেদিন বের হয়ে গিয়েছিল।

রেপিস্টটাকে দেখে রিয়াদ রাগে কাপতে লাগল। রেপিস্টটা পুলিশকে যা যা বলেছিল আদালতেও ঠিক সেগুলোই বলল।

এদিকে নার্স সাক্ষী দিল,সেদিন একটা মেয়ের বাবার অবস্থা খারাপ ছিল,তার অবস্থা নিয়ন্ত্রণে এনে ডাক্তার চলে গিয়েছিল। 

ডাক্তার চলে যাবার সময় এবং খুনের সময়টা কাছাকাছি।

এবার আসামীপক্ষের উকিল সাক্ষী হিসেবে রিমিকে ডাকল।

রিয়াদের শরীরটা খুবই খারাপ লাগছে। কাঠগড়ায় বসে রিয়াদ ভাবছে,ফাসির আগেই তার মৃত্যুটা হলে ভাল হত।এই মুহুর্তে মৃত্যুটা হলে আরো ভাল হত।রিমি কি বলবে ও জানে না। তবে গত রাতে হাজতে এসে রিমি বলেছিল,”তোমাকে আমি এখান থেকে বের করবই। শীতের সময় মাঠে কুয়াশার ভিতর খালি পায়ে হাটার প্লান কি ভুলে গিয়েছ?”

রিমি আদালতে বলল,”ডাঃ রিয়াদ আমার বয়ফ্রেন্ড। প্রায় ৩ বছর ধরে। সেরাতে অন্য ইউনিটে ভর্তির কথা হলেও, বয়ফ্রেন্ডের কাছে ভাল চিকিৎসা আর যত্ন পাওয়া যাবে ভেবে আমি তার ইউনিটে আসি। রিয়াদ আমাকে বলল,বাইরে গিয়ে ওষুধ আনতে,আর ইসিজি করানো জন্য হাসপাতালের ব্যবস্থাটা চেক করতে।”

রিয়াদ আর সেই নার্স দুইজনই মিথ্যা কথাগুলো শুনে তাকিয়ে রইল রিমির দিকে।

রিমি বলতে লাগল,”রিয়াদ আমাকে মেসেজে করে জানাল,হাসপাতালের ওষুধ দিয়েই বাবাকে আপাতত সুস্থ করে দেওয়া হয়েছে,আমি তাই আর বের হলাম না ফিরে এলাম। পুরো ঘটনাটা ১৫ মিনিটে ঘটেছে,নার্স বলতে পারবে সত্যতা।”

নার্স বুড়ো মানুষ। পুঙ্খানুপুঙ্খ তার মনে নেই।সে তাকিয়ে রইল।

রিমি বলল,”হাসপাতাল ছিল খালি। আমার বাবাকে আমার বয়ফ্রেন্ড বাচিয়ে দিল। আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের উপর আলাদা একটা টান অনুভব করলাম।তাকে ধন্যবাদ জানাতে চাইলাম। উপরে একটা কেবিন খালি ছিল। আমরা সারারাত সেই কেবিনে ছিলাম। আমরা কেউই এক মুহুর্তের  জন্যও ঘুমাই নি।আমার বয়ফ্রেন্ড সেরাতে আমাকে ওই অবস্থায় রেখে বাইরে গিয়ে খুন করবে,এটা শুনে আমি সেই গ্রেফতারেত পর থেকে তাজ্জব হয়ে আছি। চক্ষুলজ্জার ভয়ে কিছু বলি নি। ভেবেছি অন্যেরা হয়ত এগিয়ে আসবে আমার নির্দোষ বয়ফ্রেন্ডকে বাঁচাতে।কিন্তু সম্ভাবনা দেখছি না। তাই কলঙ্ক নিয়ে নিজেই স্বীকার করলাম। আমাকে কি এর জন্য প্রমাণ দিতে হবে কোনো। আমরা আমাদের প্রত্যেকটা মিলনই ভিডিও করি।আমার কাছে আছে সেরাতের ভিডিও,জমা দেব?”

আদালত নিস্তব্ধ। রিয়াদ নিস্তব্ধ। রেপিস্টটাও নিস্তব্ধ।

আদালত যদি চাইত ভিডিও।রিমি এতদিন ধরে প্লান করে রাখা কোনো পর্ণের সাথে নিজের আর রিয়াদের ছবি জুড়ে দিত। হাসপাতালের কেবিনের একটা ছবি তুলেছিল সে।এডিট করে রুমটা পাল্টেও দেওয়া ছিল।ভিডিও ক্যামেরার মত ভিডিওর তারিখ আর সময়ও ফটোশপ করা ছিল।

তবে আদালত আর সেই ঝামেলায় গেল না। রিয়াদ খালাস পেয়ে গেল।

এরপরের প্রায় একমাস আর আগের মত হল না।রিয়াদের মা আর বাবা আর সুস্থ হল না। রিমির ছবি পেপারে,ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ল। চেহারার সাথে মিল থাকা বিদেশী পর্নোফিল্ম তার নামে প্রচার পেল। মোট কথা সারা বাংলাদেশে বেশ্যা বলেই একটা নাম উঠে গেল রিমির। মজার ব্যাপার যারা রিমিকে বেশ্যা,চরিত্রহীন, নষ্টা মেয়ে বলে চিল্লাচ্ছে,তারাই ফেসবুকে,বা ফোনে সেক্স অফার করছে।

সব দেখেও আমলে নিল না রিমি। তবে রিমির বাবা হার্ট এটাক করল আবার,এবার আর বাচল না। মারা গেল। ২ মাস কেটে গেল।রিমি বড্ড একা হয়ে গেল।

রিয়াদের সাথে একদিন দেখা হল। রিমি বলল,”আমার সব শেষ রিয়াদ। আমি বড্ড একা। আমার পাশে কি দাঁড়াবে তুমি?সারাজীবন কি পারি আমরা একইসাথে থাকতে? কলঙ্কটা কমত একটু।”

সেরাতে মারা যাবার আগে রিয়াদ বারবার চিৎকার করে বলছিল,”আমি বাচতে চাই রিমি,আমি তোমার জন্য বাচতে চাই। আমি তোমার সাথে ঘর বাধতে চাই। প্লিজ,আল্লাহ,,, একটু বাচতে দাও,,,,”

গল্প ৯৯

​”Nobody Cares”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব(Raihan Masud Bipu)

অন্ধকার ঘরটায় জানালা বন্ধ। তবে জানালা বন্ধের কোনো কারণ ছিল না। এই ঘরের দিক কেউ তাকাবে না। এই ঘরে কি হয়,কারো তাতে কোনোই আগ্রহ নেই।এই ঘরে যে থাকে সে মানবসমাজের কেউ না।

ড্রেসিং টেবিলটার উপর ৫ টা সাইকিয়াট্রিস্টের ৫ টা প্রেসক্রিপশন।  এন্টি-ডিপ্রেশন ওষুধ, আর কিছু কাউন্সেলিং এর কথা লেখা,,কষ্টের স্মৃতি গুলো ভুলে যান,যারা যারা কষ্ট দিয়েছে,সবাইকে ভুলে যান। কষ্ট দিয়ে তারা ছেড়ে তো গিয়েছে,চিন্তা করে দেখুন,এই কষ্টটা কয়েকবছর পর পেলে কি করতেন?

কারো প্রেসক্রিপশন এ লেখা,ভাল স্মৃতি মনে করেন,সুখের স্মৃতি।সুখের শক্তি অনেক,এন্টিবায়োটিক এর কাজ করে,দুঃখকে ব্যাক্টেরিয়ার মত জীবন থেকে তাড়িয়ে দেয়।

কারো প্রেসক্রিপশন এ লেখা,এমন কোনো জায়গায় যান,যেখানে মানুষজন আপনাকে গ্রহণ করবে। সেখানে গিয়ে কনফিডেন্স বাড়ান।

কারো প্রেসক্রিপশন এ লেখা,পার্সোনালিটি চেঞ্জ করুন।এতদিন যা ছিলেন,তার বিপরীত কাজগুলো শুরু করেন।

তবে প্রত্যেকটা সাইকিয়াট্রিস্টের কাউন্সেলিং এর বিশাল রকম ত্রুটি ধরতে পারল আবির হোসেন। আবির এখনো টুলটার উপর দাঁড়িয়ে গলায় দড়িটা পেচিয়ে আয়নায় নিজের জঘন্য চেহারাটা দেখছে,আর প্রত্যেকটা প্রেসক্রিপশন এর ভুল গুলো মনে করছে।

যে কষ্টটা দিয়েছে,তাকে আবির খুব ভালবাসে,তার গোটা জীবনে যারাই আবিরকে কষ্ট দিয়েছে,একজনও তার শত্রু ছিল না। সবাই বন্ধু ছিল। বেস্টফ্রেন্ডও ছিল এর ভিতরে। হৃদয়টা নিংড়ে দিয়ে ভালবাসার একটা মানুষও ছিল এর মাঝে।

কষ্ট যখন পুরো দুনিয়া দেয়,সেগুলো পাত্তা দেবার কিছু না। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় এক ক্লাসরুম ভরা ছেলেরা ৩ টা মেয়ে,অন্যের গার্লফ্রেন্ডকে জড়িয়ে তাকে যখন বাজে কথা বলে,অপমান করেছিল,বানোয়াট কথা বলে তাকে অপমান করে পৈশাচিক মজা নিয়েছিল,তখনো তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে নি।

কিন্তু বুকে হাতুড়ির বাড়ি তখনই লেগেছিল,যখন তার নিজের বন্ধুরা,প্রেমিকা তার এই অপমানের জন্য তাকেই দায়ী করেছিল।

কাছের মানুষের দেয়া কষ্ট ভোলা যায় না। কাছের মানুষকেও ভোলা যায় না। এন্টি ডিপ্রেসন ওষুধে এই হতাশা কমে না।

হতাশা এমন একটা জিনিস,এটার কথা কাউকে বলাও যায় না,৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও,যদি ইসলামিক মাইন্ডেড কেউ শোনে হতাশায় ভুগতেছে কেউ,তার পাশে না দাঁড়িয়ে,দূরে সরে যাওয়াকেই পূণ্যের কাজ ভাবে। কারণ,৫ ওয়াক্ত নামাজই পড়ুক,রোজাই রাখুক,কোরআনই পড়ুক,হতাশা হল কাফেরের চিহ্ন। আর কাফেরদের থেকে দূরে থাকতে হয়। কাফেররা অভিশপ্ত।

প্রথম প্রেসক্রিপশন এর ভুলটা বের করল আবির। টুলটা লাত্থি দেবার আগে আরো কয়েকটা কাউন্সেলিং এর ভুল ধরতে হবে। আল্লাহ কে বলতে হবে,কোনোভাবেই তার হতাশা থেকে বাচার উপায় নেই।মরাই তার একমাত্র উপায়।যাতে আল্লাহ তার জন্য আত্মহত্যাকারী জাহান্নামী এই নিয়মটা শিথিল করে। আল্লাহ পরম দয়ালু,আল্লাহ তাকে মাফ করে দিবেই,অবশ্যই দিবে।

আবির এমনভাবে সামমের ফাকা জায়গায় দাঁড়িয়ে বাকি প্রেসক্রিপশন গুলোর ভুল ধরতে থাকে,আর বলতে থাকে,যেন আল্লাহ নিজে দাঁড়িয়ে আছেন,এই রুমে,তার সামনে,,, ফরিয়াদ করার মত বলতে থাকে।

২য় প্রেসক্রিপশন টার ভুল জপতে থাকে সে,”আমাকে বলা হয়েছে সুখের স্মৃতি মনে করতে,সুখের স্মৃতি নাকি দুঃখের থেকে শক্তিশালী।  আমার সব কষ্ট,হতাশা নাকি,তাড়িয়ে দেবে।কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও একটা সুখের স্মৃতিও আমি মনে করতে পারছি না। কানের মধ্যে একটা কথাই বাজতেছে,,”আমি কারো ভালবাসা ডিজার্ভ করি না” “আমার ভালবাসার কারো দরকার নাই।”   “আমার সাথে সবার প্রবলেম হয়,কারন সমস্যাটা আমার।দুনিয়ার কেউই যখন একটা নির্দিষ্ট মানুষকে দুইচোখে দেখতে পারে না,তারমানে,দোষটা আমার।অবশ্যই আমার। যুক্তিও তাই বলে।”

৩য় প্রেসক্রিপশন এর  ভুল পড়তে থাকে আবির।এখনো ভাবতে থাকে অদৃশ্য হয়ে আল্লাহ দাঁড়িয়ে আছেন,তার সামনে,,,,

“আমাকে বলেছে,আমার পারসোনালিটি চেঞ্জ করতে,আমি এখন যা,তার পুরো বিপরীত কাজ কালকে থেকে করতে। এর মানে কি? আমি ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি,কালকে থেকে পড়ব না? আমি আপনাকে বিশ্বাস করি,আপনি আমার জীবন মৃত্যু ভাগ্যের মালিক,আমি আপনাকে কালকে থেকে বিশ্বাস করব না? আমি কারো ভাল করার চেষ্টা করব না? ক্ষতি করার চিন্তা করব? কাউকে বন্ধু ভাবব না? সবাইকে শত্রু ভাবব?সম্ভব না,এটাও সম্ভব না।”

শেষ প্রেসক্রিপশন।  আবির কাপতে থাকে,বলে, “আমাকে এমন কোনো একটা জায়গায় যেতে বলা হয়েছে,যেখানে মানুষ আমাকে গ্রহণ করবে,আমার অতীত জানবে না,চরিত্র জানবে না,কিন্তু আমি আগন্তুক,আমাকে ভালবাসবে। কিন্তু আপনিই বলুন আমি কয়দিন পালাব? আপনি খুব ভাল করে জানেন,মানুষ আমাকে প্রথম ৩ মাস অনেক ভালবাসে,তারপর আস্তে আস্তে ঘৃণাটা শুরু হয়,শক্তিশালী কারণও লাগে না,,,,”

আবির প্রেসক্রিপশন এর ভুল গুলো পড়ার পর। ফাকা রুমটার দিক চেয়ে বলল,”আমি আপনার কাছে আসব। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আশা করি,আপনি আমাকে মাফ করে দেবেন।আত্মহত্যা করার জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ করে দেবেন না।”

আবির জোরে জোরে শেষবারের মত শ্বাস নিল। টুলটা লাথি দিবে দিবে,হঠাৎ করে,তার ওয়ার্ডরোবের উপর দিয়ে অকারণে ভয় পেয়ে একটা ইদুর দৌড় দিল।ওয়ার্ডরোবের উপর পড়ে থাকা রিমোট টা ঠাস করে নিচে পড়ল,বাটনের দিক নিচে করে,আর রুমের টিভিটা ঠাস করে খুলে গেল,বাংলাদেশি একটা চ্যানেল ধরা ছিল,শুক্রবার বলে গভীররাতে ইসলামিক অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচার হচ্ছে। এক হুজুর কোন বিষয়ে যেন আলোচনা করছিল। শীতের রাতে সাউন্ডটা প্রচন্ড জোরে বেজে উঠল,”আল্লাহ কখনওই আত্মহত্যার পাপকে মাফ করবেন না,কখনওই না।”

সাউন্ড শুনে আশেপাশের প্রতিবেশীরা জেগে উঠল।চিল্লিয়ে বলল,”আমাদের ঘুমাতে দেবে না নাকি? শয়তান লোকটা তো জ্বালিয়ে মারল। এত রাতে টিভিতে এত জোরে সাউন্ড দিয়ে শুনতেছে,আসলে মানুষকে ভুগিয়ে মনে হয় লোকটা মজা পায়।

আবিরের খুবই ইচ্ছা হল,৩য় ডাক্তারের কথা শুনে তার পার্সোনালিটি চেঞ্জ করে টিভির ভলিউম ১০০ করে দিক,আর নিজেও চিল্লিয়ে কিছু একটা বলুক।

কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রীদের মাথা অন্যভাবে কাজ করে। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস, আল্লাহ এই রুমেই দাঁড়িয়ে আছেন। গলা থেকে দড়ি নামিয়ে টুল থেকে নেমে,টিভিটা বন্ধ করে ও বলল,”আপনি চান না আমি আজ মরি? আত্মহত্যা করি? আপনি মাফ করবেনই না? তাহলে বলে দেন আমাকে,এই কষ্ট থেকে বাচান,কিভাবে,বাচব বলেন।”

জানালার ছিটকিনি একা একা খুলে গেল।ঝটকা দিয়ে জানালা খুলে গেল। শীতের ভিতরে হঠাৎ দমকা একটা বাতাস ভিতরে এল।ড্রেসিংটেবিল এর উপরের ৪ টা প্রেসক্রিপশন ফেলে দিল। একটা প্রেসক্রিপশন উলটা দিকে উড়ে আবিরের মুখে পড়ল। এটা আজকের সাইকিয়াট্রিস্ট এর প্রেসক্রিপশন।  এটার কথা আবির আমলেই নেয় নি।এটায় উপদেশ হিসেবে লেখা ছিল,”মানুষের উপকার করতে,২০ টা মানুষকে সাহায্য করতে।হতাশা চলে যাবে।”

আবির ফাকা রুমটার দিকে তাকিয়ে বলল,”আপনি চান আমি মানুষের উপকার করি? এতে আমার ভিতরের কষ্টগুলো চলে যাবে? কিভাবে যাবে সেটা বলতে পারেন? মেকানিজম টা কি? আমি দুঃখী মানুষের কষ্টের সাথে নিজের কষ্ট তুলনা করে দেখব? এতে আমি বুঝব,আমার কষ্টটা ফালতু? এটা বলতে চাচ্ছেন আপনি?”

কেউ সাড়া দিল না। আবির শুধু এটা জানে,আত্মহত্যা করা যাবে না। আল্লাহ মাফ করবেন না,সেটা ভাল করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন।

সেদিন থেকে আবির বাইরে বের হতে লাগল। ২০ টা দুঃখী মানুষের উপকার করতে, কিন্তু সে নিজেই তো বেকার,তার বন্ধুরা অলরেডি পাশ করে বড় বেতনের চাকরি করছে,আর সে এখনো মেডিকেলে পড়ে রয়েছে,ফাইনাল প্রফের আশায়। পকেটে টাকা নেই।টাকা,কাপড় দিয়ে কিভাবে সাহায্য করবে অসহায় মানুষকে?

ভিখারিদের ৫/১০ টাকা করে দিলে,মুখ বেজার করে ফেলে। মিনিমাম ২০ টাকা না দিলে সেটা আবার কিসের ভিক্ষা? চিকন অবস্থার কিছু জামা কাপড় গরীবদের দিতে চায়,এখন অত্যাধিক মোটা হয়ে যাওয়ায় সেগুলো গায়ে লাগে না।কিন্তু এখনো বুড়া বয়সে বাপের ঘাড়ে বসে খায় সে,বাবা অনেক কষ্ট করে অসুস্থ শরীরে সৎ থেকে টাকা উপার্জন করে। ওকালতি করে। কিন্তু তার বাবার কাছে আসলেই সব ক্লাইয়েন্ট গরীব দুঃখী হয়ে যায়।কেস চালানো টাকা চাইলে মুখটা এমন দুঃখী দুঃখী করে যে তার বাবা নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়েই কেস চালায়,কেস চালিয়ে ৫/৬ হাজার টাকা খরচ করে,মামলায় জিতিয়ে দিলে,গরীব দুঃখী ক্লাইয়েন্ট তার বাবাকে ১০০ টাকা মজুরি দেয়।

সেই বাবাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারে না আবির। অন্যান্য মেডিকেল স্টুডেন্ট রা দূর দূরান্ত থেকে ওর শহরে এসে প্রাইভেট পড়িয়ে এত টাকা করে,যে ঘুরতে বিদেশেও যায়,আর সে রিকশা ভাড়ার জন্যো বাপের কাছে হাত পাতে গত ৫ বছরের মেডিকেল জীবনে।

নাহ,বাবা ছেলের জন্য শখ করে কেনা কাপড় দিয়ে কারো উপকার আবির করতে পারে না।

৩ বছর আগে এক রিকশাওয়ালাকে যদিও একটা শার্ট দিয়েছিল সে,উপহার হিসেবে,২ বছরের জন্য একটা ডাইনি পেয়েছিল। যে ডাইনি চলে গিয়েও তার বর্তমান প্রেমিকাটাকেও সরিয়ে দিল তার জীবন থেকে।

যাই হোক, হাজার চেষ্টা করেও ২০ টা মানুষের উপকার করতে পারল না আবির। তার সামনে কেউ বিপদে পড়লে,এমনভাবে পড়ে,যা থেকে তাকে উদ্ধারের উপায় জানা নেই তার,উদ্ধারে সক্ষম বিপদগুলোতে তার আগেই অন্য সুখী মানুষরা উপকার করে ফেলে বিপদগ্রস্ত লোকটার। তো,মোট কথা কারো উপকারই আবির করতে পারে না।

আত্মহত্যা করার ভূত আবার মাথায় চেপে বসে আবিরের।কিন্তু আত্মহত্যার ডিসিশন নেবার আগেই বার বার আল্লাহ মাফ করবেন না,এমন কথা মাথায় এসে পড়ে।কয়েকদিন যাবার পর আবিরের মাথায় জেদ চেপে বসে,নাহ,আত্মহত্যা করেই ছাড়বে সে,পুরনো কষ্টগুলো তাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। তার গার্লফ্রেন্ডের, আর তার বেস্টফ্রেন্ডের কথা গুলো কানে বাজে,সারকাজম গুলো কানে বাজে,,, “ইসসস,সব নাকি সোসাইটির দোষ,,,উনি ধোয়া তুলসী পাতা,কিচ্ছু বোঝে না।”

“হা হা হা,কেনো তোমার লগেই মাইনষের এত বাধে? সবার লগেই বাধে? পুরা দুনিয়া খারাপ? হা হা হা,,,”

“হা হা হা,,হালায় হিজরা,,একটু কিছু হইলেই ফেসবুকে ব্লক দেয়।”

“আমরা নরমাল মানুষের ব্যাপারে এখানে আলোচনা করছি,তুমি এবনরমাল”

ওদিকে তার বাবার গাধার খাটুনি খাটা,টাকা পয়সা না পাওয়া।যদিও বাইরের লোক বলে,”বাপ তো উকিল,কত দুই নাম্বারি করে,বিশাল কাল টাকার মালিক।”   বাবা তার মাকে বলে,”ছেলে ডাক্তার হলে,সব কষ্ট শেষ।”     ওদিকে মেডিকেলের পেইজে বড় ভাই আপুরা লেখে,”এম বি বি এস পাস করে বের হবার পর কুত্তার জীবন ধারণ করতে হয়,না আছে সম্মান,না টাকা,খাটুনি। ”

পাশ যদি কখনো হয়,বাবার মুখের অসহার চাহনির দিক তাকে তাকাতে হবে,ছেলে ডাক্তার হয়েছে,কিন্তু এখনো বাপের ঘাড়ে বসে খায়।

ছিঁচকাঁদুনী ভুল বোঝা প্রেমিকা,তার নিষ্পাপ আল্লাহর দান হ্যান্ডসাম বর নিয়ে চোখের সামনে ঘুরবে,মুখে অনাবিল হাসি,,,তাকে দেখেও চিনবে না,,,,,

নাহ,,২০ জনের উপকারের দরকার নাই। এই জীবন আবির রাখবে না। আত্মহত্যা না হোক,অন্য কোনোভাবে মরবে।

মৃত্যুটা এমনভাবে হবে যে বাইরে থেকে মনে হবে অন্য মানুষ তাকে খুন করেছে। 

অনেক প্লান করতে লাগল আবির। ব্লু হোয়েল গেইমের খোজ করতে লাগল। কোথাও পেল না। হা হা হা,,,ওই গেইম খুজে পাবার মত বুদ্ধি যদি তার থাকত,সারা দুনিয়া তার শত্রু হত না।

১ বছর একটা প্রাইভেট পড়িয়ে জমিয়ে জমিয়ে কেনা ১৫ হাজারের মোবাইলটা পলিশ করে রাতে হাতে দিয়ে অন্ধকার অন্ধকার গলি, কোনা কাঞ্চিতে যাওয়া শুরু করল। প্লান হল,ছিনতাইকারী ধরবে,মোবাইল নিতে চাইবে,মোবাইল সে দিতে চাইবে না।  ছুরি দিয়ে শেষ করে দেবে তাকে,,ব্যস আত্মহত্যা তো না।

সমস্যা হল,পর পর ৭ রাত শহরের কুখ্যাত কিছু জায়গায় রাতের আধারে গেলেও কোনো ছিনতাইকারীর দেখা সে পেল না। এমনকি কুকুরও না,কুকুরের কামড়ে মরারও উপায় নাই। কুকুর তাকে দেখলে পালায়।

৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে ইদানীং মৃত্যু চায় সে। মরণ চায় আল্লাহর কাছে। তার থেকে অনেক ছোট বয়সী মানুষের ক্যান্সার হয়।তার তা হয় না,তার হয় এমন রোগ,যাতে তার সারাজীবন বাকা হয়ে হাটতে হয়।

রাতের পর রাত এভাবে ছিনতাইকারীর হাতে খুন হতে চাওয়ার বাসনা নিয়ে বাইরে বাইরে কেটে যায়। খুন সে হয় না।

অবশেষে একটা আজব মুহুর্ত সে দেখে। ৫ টা লোক মিলে একটা লোককে ঝোপের আড়ালে শুইয়ে জবাই দেবার প্রস্তুতি নেয়।

আবিরের বুকের ভিতর থেকে যেন হৃদয়টা বেড়িয়ে আসবে।অবশেষে সুযোগ এসেছে। কি করবে সে? জবাইটা হতে দেবে? তারপর চিল্লিয়ে বলবে,দেখে ফেলেছি দেখে ফেলেছি? কোর্টে সাক্ষী দেব? আমার বাবা উকিল?

নাহ,হয় পাগল ভেবে ওরা চলে যাবে,অথবা ওরে মরার পর ওর পুরো ফ্যামিলিকে গায়েব করে দিবে।

বাবার কথাটা না বলি? নাহ,খবরে আসবে মরার খবর,গুম করে দিলেও,আব্বু পাগিলের মত বিজ্ঞাপন দিবে,ছোটাছুটি করবে।উকিল দেখে,তাকেই মেরে ফেলবে,মা আর ছোটবোনটা অসহায় হয়ে যাবে।

এর চেয়ে লোকটাকে বাচানোর চেষ্টা করা যাক। ধস্তাধস্তি, এই ফাকে ছুরি ঢুকে যাবে,মরার আগে চিৎকার করতে হবে,ওরা ভয় পেয়ে পালাবে। মাঝখানে লোকটা বেচে যাবে,আমি মরে যাব। বেচে যাওয়া লোকটাই পরে ওদের ব্যবস্থা করবে পুলিশে বলে,আমার পরিবারের দিক তাকানোর সময় পাবে না আর।

আবির দৌড়ে গেল। গিয়ে বুকের উপর চেপে বসা একটা লোককে লাথি দিল। লাথির চোটে,ছুরি চালাতে যাওয়া লোকটার উপর পড়ল। দুইটা লোকই ঢালু একটা জায়গা থেকে গড়িয়ে পড়ে গেলে। লম্বা গরু জবাইয়ের ছুরি আড়া আড়িভাবে ঢুকে গেল দুইজনের শরীরে।

বাকি ৩ জন লোক যারা ভিক্টিমের উপর চেপে ছিল। লাফিয়ে উঠল। একজনের হাতে ছুরি। নিজে পড়ে যাওয়া লোকেরা পা ঝাকাচ্ছে,মৃত্যুর আগের ভয়ানক আর্তনাদ করছে।

আতংকিত হয়ে,বাকি তিনজন দৌড় দিল। যাকে জবাই দিতে যাচ্ছিল। সে দাঁড়িয়ে গেল,আবিরের দিক তাকাল। ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আল্লাহ গো বলে দৌড় দিল।

আবির ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। নিচে লোকদুইটার  মরণ যন্ত্রণা চলে গেল। স্থির হয়ে রইল। দূরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।

আবির সংবিৎ ফিরে পেল।না না,পুলিশকে ধরা দেয়া যাবে না,যারা এতদিন খারাপ লোক বলে জঘন্য ব্যবহার করছিল,তারা আড্ডায় বলবে,”জানতাম,পোলাটা সাইকো,মেন্টাল প্রবলেম আছে,এখন খুনও করল।”

মৃত্যুর আরেকটা উপায়। ফাসি।কিন্তু ছেলে খুনি জানলে তার বাবা মার মনের অবস্থা কি হবে? তারাও তো লজ্জায় মরে যাবে আত্মহত্যা করে। তাইলে ছোটবোনটার কি হবে?

আবির দৌড়ে পালাল ওখান থেকে।

সেরাত থেকে ওর কষ্টের পালা আরো বাড়ল। সে একজন খুনি। 

পেপারে বের হল,কুখ্যাত সন্ত্রাসী জব্বার আর তার সহযোগী মামুন খুন। এক ছুরিতে গেথে থাকা তাদের লাশ পাওয়া গেল।

আবিরের বুকের কষ্ট বেড়ে গেল। ভয়াবহভাবে। সে খুনি। খুন করেছে সে।

আবির আবার রাতে বের হল।জপতে লাগল। প্লিজ,কেউ আমাকে খুন কর। প্লিজ কেউ আমাকে খুন কর। প্লিজ।

এক গলিতে একটা লোককে চেপে ধরেছে ছুরি হাতে দুই তরুণ। বলছে,”টাকা দে।”

লোকটা বলছে,”ভাই,আমার ছেলেটা অসুস্থ।টাকা নিয়েন না।”

“টাকা দিবি নাকি,ভূড়ি নামিয়ে দেব?”

আবির গিয়ে লাথি দেয় একজন কে। এবার সাবধানে একটু আস্তে দেয়। যেন গতবারের মত না হয়।

ছেলে দুইটা ঘুরে তাকায়,মাদকাসক্ত।  আবিরের মোটা শরীরটা দেখে নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক ভাবে,এর সাথে তারা পারবে না। দৌড়ে পালায় তারা,,,

তার বাচানো লোকটা তার দিকে আবার ভয় পাওয়া দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর সেও ছুটে পালায়।

যতদিন যায়,আবিরের মৃত্যুক্ষুধা বাড়ে, প্রায় প্রতিরাতেই তার সামনে কোনো ঘটনা ঘটতে থাকে, ৪/৫ টা পুরুষ মিলে একটা মেয়েকে টানাটানি।বাচ্চা চুরি,ছিনতাই,খুন,,কিছু না কিছু তার সামনে ঘটতেই থাকে। প্রতিরাতে, আবির সব ঘটনায় এগিয়ে যায়, একটাই আশা মনে,ওকে যেন কেউ খুন করে।

কিন্তু না,কেউই ওকে খুন করে না। ভিক্টিমরা বেচে গিয়ে তারাও পালায়।

আবিরের অসহ্য লাগতে থাকে দিন দিন।অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে সে পেপার খুজে খুজে অপরাধের জায়গা খোজে,ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করায় খুন,খুনি ঘুরছে প্রকাশ্যে।এসব খবর। তারপর সে রওনা দেয় সেই এলাকায়। 

ইভটিজিং এ বাধা দেয়,দলবদ্ধভাবে থাকা বখাটে দের ইভটিজিং করার সময়,খালি হাতে,চড় থাপ্পড় মারে প্রকাশ্যে। তারপর সে রাতে একা ওই এলাকায় হাটে। 

কিন্তু তাকে খুন করে না ইভটিজাররা। ওই এলাকায় উলটা ইভটিজিং বন্ধ হয়।

১৫ টা মানুষকে এভাবে আবির বাচায়। নিজে খুন হতে চেষ্টা করে। আবিরের হিসেব থাকে না,তবে উপরে বিসে একজন এই হিসেব রাখে,,,,,

এরপর একদিন একটা অটোর মধ্যে ড্রাইভার আর ও সহ মোট ৫ জন থাকে,হাইওয়েতে করে বাসস্ট্যান্ডে যাচ্ছিল আবির,এক আত্মীয়কে বাসা চিনিয়ে আনতে।

একটা বাসকে আরেকটা বাস ওভারটেক করতে গিয়ে উলটা দিক থেকে তাদের সামনে আসে। আবির আনন্দে চিৎকার দেয়,মৃত্যু আসছে,,,,

ড্রাইভার অটোকে সাইডে সরিয়ে একটা গাচগের সাথে ধাক্কা খায়, ধাক্কায় আবির বাইরে ছিটকে পড়ে।

তবে আবিরের গায়ের উপর দিয়ে কোনো বাস যায় না। গাছের ডাল ভেঙে যায়,অটো ভিতরে ড্রাইভার একটা মহিলা,একটা কিশোর আরেকটা বাচ্চা নিয়ে কাত হয়ে পড়তে থাকে।

আবির দেখে নিচে ধারালো কিছু পাথর,,ওখানে পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু। আবির অটোর রড ধরে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে লাফিয়ে উঠে। যাতে করে অটোটা তাকে নিয়ে নিচে পড়ে। সেও যাতে মরে।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার,শক্ত করে ধরে থাকে সে অটোর সাতগে পড়ার জন্য। কিন্তু অটোর পতনই উলটা থেমে যায়,ওর হাতে যেন আটকে ঝুলে থাকে অটো।

আশ্চর্য হয়ে মরতে বিসা প্যাসেঞ্জার রা এই ঘটনা দেখে। ড্রাইভারের সংবিৎ ফিরতেই সে বের হয়ে যায় অটো থেকে।ভার একটু কমে। ওদিকে আশেপাশের লোকেরাও আবিরের সাথে ধরে থাকে অটো,সমস্ত শক্তি দিয়ে। 

ড্রাইভার,অটোর যাত্রীদের কাত অবস্থায়ই একজন করে বের করে। আবির বোঝে আজ আর মরা হবে না। সে ছেড়ে চলে আসে।

পিছে মানুষ বলতে থাকে,,”আল্লাহু আকবর,আল্লাহু আকবর”

১৯ জনের উপকার করা হয়ে গেছে আবিরের। কিন্তু অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হচ্ছে আন। ভালবাসার মানুষটার হাসি,স্মৃতি ভেসে আসছে। খোজ নিয়ে জেনেছে,সে অনেক ভাল আছে নাকি। তার বান্ধবীরা নাকি বলছে,গত ৫ মাস তাকে খুবই অসহায় আর দুঃখী লাগত,এখন তাকে প্রফুল্ল লাগে। আবির বোঝে কেন,,অবশেষে তার ভালবাসার মানুষটা তাকে ভুলতে পেরেছে,,,,

কিন্তু আবির পারবে না,,সম্ভব না,,,কোনো ভাবেই না।

আবির এবার অন্য টেকনিক হাতে দেয়।ফুলপ্রুফ।বিভিন্ন গ্রাম থেকে গুজব শুনতে থাকে,কোন গ্রামে এমন কোনো গাছ বা পুকুরে ভূত আছে,যেখানে গেলেই নিশ্চিত মৃত্যু।

আবির যায় সেসমস্ত জায়গায় একে একে।কিছুই হয় না।

তবে সে ফিরে আসবার পর থেকে সেসব জায়গায় আর ভূতের হাতে কেউ মরে না।

আবির মরতে চায়,,মরতে চায়। মরণ চায়,,,প্লিজ,,,তাকে কেউ খুন করত। প্লিজ।

আবির পেপার ঘাটতে থাকে,গডফাদার টাইপের নেতা কোন এলাকায় আছে। তাদের চক্ষুশূল এমন কোনো পরিবার কি আছে?

আবির এরকম একটা পরিবারকে পেয়ে যায়।স্থানীয় নেতার লোকেরা নাকি তাদের বাসায় গিয়ে ঝামেলা করে,ভাঙচুর করে।কোনো কারণে নাকি পরিবারটার উপর নেতা ক্ষেপা।

আবির সেই পরিবারটার কাছে যায়। পরিবারটা তাকে ভাবে নেতার লোক। খুব ভয় পায়। কিন্তু নেতার লোক সন্দেহের পরও যখন দেখে কিছু বলছে না,ভাল ব্যবহার করছে। তখন দুর্বল ভিলেন ভেবে গালাগালি জুতা আর ঝাটার বাড়ি দিয়ে বাসা থেকে ভের করে দেয়,কোনো কথা না বলে।

২ দিন সেই এলাকায় থেকে আবির বুঝতে পারে, নেতার ছেলে কোনো একটা মেয়েকে বন্ধুদের সাথে এক হোটেলে নিয়ে রেপ করছে,এই পরিবারের স্বামীটা সেই হোটেলের ম্যানেজার।  এর রক্তে যে হিরোগিরি আছে,সেটা তাকে ভিলেন ভেবে জুতা পেটা করার সময়ই বুঝেছিল আবির। সে এটাও শুনল,হিরোগিরি করে নাকি,সেই মেয়েটার হয়ে নেতার ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে লোকটা, প্রমাণ সংগ্রহ করেছে,নিজে সাক্ষী দেবে। সিসি টিভি ফুটেজ,বিছানার চাদরে,মেয়ের শরীরে বিভিন্ন দাগ থেকে অকাট্য প্রমাণ যে নেতার ছেলে দোষী। নেতা তাই পরিবারটার উপর চাপ দিচ্ছে,প্রমাণ গায়েব করে,মামলা তুলে নিতে,,,স্বামী রাজি হচ্ছে না।

তো আবির এও শুনল,গতবার এসে নেতা নিজ মুখে থ্রেট দিয়ে গেছে,আজকে পরিবারের সবাইকেই মেরে ফেলবে।

তো আবির বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল,গভীররাতে নেতার ছেলে আর তার বন্ধুরা দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকল।আশেপাশের প্রতিবেশিরা ভয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

পরিবারটার আর্তনাদ শুরু হয়ে গেল। আবির ভিতরে ঢুকল বাসার।গিয়ে দেখল,স্বামীটাকে বেধে রাখা হচ্ছে। আর তার বউ আর ৬ বছরের মেয়েটাকে নিয়ে টানা হেচড়া হচ্ছে।আবির বুঝে গেল,ভোগান্তির প্রতিশোধ হিসেবে,স্বামীর সামনে তার বউ তো বটেই, ওই বাচ্চা মেয়েটাকেও গ্যাংরেপ করা হবে।

তো আবির দেখল,যে ৬/৭ জন,ইনক্লুডিং নেতার ছেলে,যারা আছে,সবার কাছে লাঠি,হকিস্টিক,আর দা আছে। এদের বাধা দিতে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত।

আবির ভিতরে গেল। ধস্তাধস্তি শুরু করল।অবশেষে ও যা চেয়েছিল তা পেল এতদিন চেষ্টার পর।

এই প্রথম সে কাউকে বাচাতে গেল,কিন্তু অপরাধীরা পালাল না। উলটা তাকেই মেরে ফেলতে এগিয়ে এল।

৬/৭ জন মিলে হকিস্টিক দিয়ে আবিরকে মারতে লাগলে,আবির টের পেল,তার নরম পাজরের হাড়গুলো ভাঙছে,উরুর হাড় ভাঙছে।শুধু অপেক্ষা,মাথাটা কখন ভাঙবে,,,,,,

সবার চোখে আমি কত দোষী,তাই না,,, হেসো কালকে সবাই তোমরা,,আমি চললাম,,,, মরার আগে আব্বু আর আব্বুর বাকরুদ্ধ দৃষ্টিটা দেখতে হল না। ভালই হল,,,সবদিক দিয়ে আমার লাভ। চরিত্রহীন, লম্পট, মানসিক সমস্যার এই ছেলেটা চলে যাবে পৃথিবী থেকে,,,, পৃথিবীর একটা বোঝা কমবে,,,,

লোকগুলো হকিস্টিক রেখে,দা আনতে গেল,দা দিয়ে কোপাবে এবার। হঠাৎ বাসার ৬ বছরের  বাচ্চা মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে আবিরের কানের কাছে এসে বলল,”আংকেল,বাচাও। প্লিজ।”

মুখ নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে আবিরের। আবির বাচ্চাটার দিক তাকাল। বাচ্চাটার চোখে আতংক। হয়ত ও ও বুঝতে পারছে,, আবির মরলে,কি হবে ওর সাথে,,,,,।

আবির গড়াতে লাগল, একটা রেখে দেওয়া রামদার উপর উপুর হয়ে শুইল।খুবই শ্বাস কষ্ট হচ্ছে তার।একটা পাজর ভেঙে ফুসফুস ফুটা করে দিয়েছে,বাতাস বুকে এসে জমেছে,,,

রামদায়ের হাতলটা ধরল সে উপুর হয়ে। বাচ্চাটার মা ডুকরে কেদে দিল। নেতার ছেলে সেদিক তাকাতে দা নিয়ে আবিরের দিকে এগিয়েও একটু থামল।মহিলার দিকে একটু চুমোর সাউন্ড করে বলল,”আসছি সোনামনি,কাজটা শেষ করি।”

এই ফাকে আবির রামদা টা শরীরের শেষ শক্তি নিয়ে ছুড়ে দিল।

অজ্ঞান হবার আগে দেখল,নেতার ছেলের গলা দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। বাকি বন্ধুরা ওই অবস্থা দেখে পালাচ্ছে। নেতার চগেলের খুনের জায়গায় থাকার সাহস ওদের নেই,,,,,,

জ্ঞান ফিরল যখন।তখন দিন কত,বা সময় কত,,,কিছুই জানে না আবির। শুধু জানে এটা হাসপাতালের স্টুডেন্ট কেবিন। আগেও ভর্তি হয়েছিল সে এখানে। তবে ঘরে,ওর আব্বু চেয়ারে বসা,ক্লান্তিতে চোখ ভেঙে পড়েছে তার,,মাথার পাশে তার মা, তার বোন টেবিলের কাছে,,,,পানি ঢালছে গ্লাসে।

সেই পরিবারের লোকেরা দাঁড়ানো,আব্বুর দিক মুখ ফেরা। চিল্লাচ্ছে কোনো কারণে,, সেই পরিবারের স্বামীটা,,,,

“দেখুন,হয়ত পুলিশ আসবে আপনার ছেলেকে ধরতে,কিন্তু প্লিজ বলে দেবেন ওকে,যে আমরা যাতে না ফাঁসি,আমরা শহর থেকে চলে যাচ্ছি,পারলে দেশ ছেড়ে,এও রেইপ ভিক্টিমকে উপকার করতে গিয়ে অনেক পেরা নিছি,আর নিব না নতুন করে। আপনার ছেলেকে বলতে বলবেন,ও নেতার ছেলেকে তাড়া করে আমাদের বাসায় এনে খুন করেছে,আমরা কিছু জানি না।”

আম্মু মাথার পাশ দিয়ে বলল,”ও তো আপনাদের বাচিয়েছে,এরকমই তো টিভিতে খবর আসছে।”

স্বামীটা বলল,”ওগুলো এখন এসে থাকবেই,নেতা পুত্রশোক কাটিয়ে ঠিকমত ধরলেই আবার উলটা গান গাবে। সব জানি আমরা,আমরা কিছুতে আর জড়াব না।শান্তিতে থাকতে চাই।”

আবিরের বোন বলল,,”আমার ভাই আপনাদের বাচাতে গিয়ে মরতে বসেছে,একটু কৃতজ্ঞতা নেই আপনাদের? ও না থাকলে এগুলো বলার সুযোগ পেতেন?”

স্বামীটা বলল,”I don’t care,মানুষ এর ব্যক্তিগত ব্যাপারে থাকার শিক্ষা হয়ে গেছে আমার।”

আব্বু বলল,”আচ্ছা বলব,বলে দেব। আপনারা যান।আমি ক্লান্ত,প্রতিদিন ৩ তলা সিড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে হয় ছেলের জন্য ডাক্তার ডেকে আনতে।”

পরিবারের বউটা বলল,”আপনার ছেলে নাকি মেডিকেল স্টুডেন্ট? আপনার খাটতে হচ্ছে কেন? ওর ক্লাসের ছেলে মেয়েরাই তো এসব ব্যাপারে সাহায্য করে। আমার ছোটবোনও মেডিকেল স্টুডেন্ট। আমি জানি।”

আব্বু,আম্মু,আর আবিরের ছোটবোন চুপ করে রইল। পরিবারটা চলে গেল। বাচ্চা মেয়েটা যাবার আগে পিছু ফিরল। দেখল,আবিরের চোখ খোলা। দৌড়ে এল সে,আবিরের গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,”থ্যাংক ইউ আংকেল।”

পরিবারটার স্বামী তার নিজের মেয়ের কান্ড দেখে অবাক হয়ে গেল। বউটা মাথা নিচু করল।

আবির সেই মুহুর্ত বুঝতে পারল,খুব ভালভাবেই বুঝতে পারল,,যদিও Nobody Cares, তারপরও তার বুক থেকে জমানো কষ্ট গুলো নাই হয়ে গেল। একটা অকৃত্রিম সুখ এসে বুকটা ভরিয়ে দিল।

সাত আসমানের উপর কুরসিতে বসে,আরশে পা রেখে একজন মুচকি হাসলেন।

গল্প ৯৮

“শিকারী”
লেখা:ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.

অন্ধকার…. ফাকা চারিদিক….

একটা দামি জামা কাপড় পরা সম্ভ্রান্ত চেহারার এক লোক পায়চারি করছে হাইওয়ের পাশের অন্ধকার ঝোপঝাড় এর আড়ালের একটুখানি জায়গায়। একটু পরপর রেডিয়াম দেওয়া ঘড়ির ডায়াল চেক করছে। লোকটা ঘামছে,প্রচন্ড দুশ্চিন্তা তার,বোঝাই যাচ্ছে।

লোকটাকে দেখলে মনে হয় খুবই ভদ্রলোক,নিরীহ।ভূড়িওয়ালা এসিরুমে থাকা শরীর। একটু পরপর রাতের পাখির ডাকে শিউরে উঠছে।লোকটা বুঝতেও পারল না,যার জন্য অপেক্ষা করতেছে,সে অনেক আগে এসেই তার উপর লক্ষ রাখছে।

একটু পর একটা কন্ঠ শোনা গেল,”মিঃ আজিজ”

লোকটা লাফিয়ে উঠে বলল,”হ্যা হ্যা,আমি এই তো।”

আজিজ নামের লোকটা ঝোপের আড়াল থেকে বের হতে লাগল। কন্ঠটা বলল,,”থামুন, আগে আমার নিশ্চিত হতে হবে,আপনার কাছে কোনো টেপ রেকর্ডার, ভা মাইক্রোফোন নেই।”

আজিজ বলল,”না,নেই।তবে একটা রিভলভার আছে।বুঝছেনই তো,ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য।”

ওপাশে কন্ঠটা হাসল। “আপনাকে সার্চ করে যদি এমন কিছু পাই,যা আমার অবস্থান পুলিশকে বলে দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে,রিভলভার তো দূরের কথা,ট্যাংকও আমার থেকে আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না।”

আজিজ জানে তার ভয় পাবার কিছু নেই।তারপরও তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বেয়ে গেল। সে ঢোক গিলল।

কাল পোশাক পরা লোকটার হাতে একটা ইলেক্ট্রনিক ডিটেক্টর, সেটা নিয়ে সে এগিয়ে এল,আজিজের সারা শরীরের কাছে ওটাকে দোলাতে লাগল। বেশ কিছু ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস বের হল,মোবাইল, ব্লুটুথ,পাওয়ার ব্যাংক,কিন্তু কাল পোশাকধারীকে আগ্রহী করার মত কিছুই ছিল না তাতে।

কাল পোশাকধারী বলল,”হ্যা,তাহলে আপনার অফারটা বলুন।”

আজিজ বলল,”আমার ছোটভাইকে আপনি চেনেন,বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি। কাদের রহমান।”

কাল পোশাকধারী বলল,”আপনি কে,আপনার সব আত্মীয়, কারা কি করে সব আমি জানি,বলে যান।”

আজিজ বলল,”সম্প্রতি কাদের একটা রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িয়ে পড়েছে।সেই দলের জনপ্রিয়তা বেশি একটা ভাল না। সামনের সিটি কর্পোরেশন এর নির্বাচনে সেই দলের হয়ে যে প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছিল,নিশ্চিতভাবে সে গোহারা হারবে,অন্তত কাদের যোগ দেবার আগে তাইই মনে হচ্ছিল।”

কাল পোশাকধারী চুপ করে রইল।

আজিজ বলতে থাকল,”কাদের সেই প্রার্থীর হয়ে প্রচারণায় নামল,জায়গায় জায়গায় অনেক টাকা ঢালল,এতে বেশ লাভ হল,আস্তে আস্তে জনগণ এই দলের অযোগ্য প্রার্থীটার প্রতি ঝুকে গেল। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই সিটির মেয়র কে হবে সেটার আমূল পট পরিবর্তন হয়ে গেল।”

কালো পোশাকধারী ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে রইল।

আজিজ বলল,,”তখনি কাদেরের মনে হল,টাকা তার,জনপ্রিয়তা তার,কিন্তু তার পৃষ্ঠপোষকতায় সিটির মেয়র হবার মত এত বড় ক্ষমতা পাবে আরেক জন? সে তো এমনিই অযোগ্য। কাদের দলের আনকোরা সদস্য হয়েও টাকা দিয়ে যে প্রভাব খাটিয়েছে,এত বছর রাজনীতি করেও তো এই প্রার্থী সেটা পারে নি। মেয়র হবার পর সে কি করবে?”

“কাদের মাথায় হঠাৎ আজব একটা বুদ্ধি আসল,টাকা দিয়ে সে যদি পুরো এলাকার জনপ্রিয়তা এক অযোগ্য লোকের উপর নিতে পারে,তবে টাকা দিয়ে সে তাকে সরিয়ে নিজেই প্রার্থী হতে পারে।যতই তার সদস্য হবার সময়কাল মাত্র ১০ দিন”

কাল পোশাকধারী চুপ করে শুনছে।

“অত:পর কাদের আপনার প্রাইভেট এজেন্সির শরণাপন্ন হল,আপনাদের এক লোককে ভাড়া করল,আর সেই প্রার্থীকে বাড়িতে ঢুকে পরিবার শুদ্ধ খুন করাল।”

ভয়াবহ ঠান্ডা একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করল। অবশেষে কাল পোশাকধারী শীতল দৃষ্টিতে আজিজের দিকে তাকাল। একটা কথা বলল,,”আপনি বড্ড বেশি জানেন,সব বিষয়ে এত বেশি জানাটা ঠিক না।”

আজিজ বলল,,”বেশি জানা,বেশি চিন্তা করাই আমার কাজ। কাদেরকে নির্ভেজাল ব্যাবসায়ী জীবন থেকে সরে এসে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া,জনপ্রিয়তা ক্রয় করতে শেখানো,কখন কাকে সরিয়ে দিলে নিজের লাভ,এবং সর্বোপরি আপনাদের সাথে যোগাযোগ করে দেবার ব্যবস্থা করা,এগুলো কার মাথা থেকে এসেছে বলে মনে করেন আপনি?”

কাল পোশাকধারী বলল,”আমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন কেন আপনি?”

“কাদের ওর দলের প্রার্থীকে শেষ করে দেবার পর দুইটা কাজ হয়েছে। সব দোষ বিরোধী প্রার্থীর উপর পড়েছে,কারণ তাদের বৈরিতা অনেক পুরনো ছিল। আর মানুষের সিম্প্যাথিতে আর কাদের জনপ্রিয়তায় কাদেরই হতে যাচ্ছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র।”

কাল পোশাকধারী একটু একটু বুঝতে পারছে আলাপটা কোনদিকে যাচ্ছে। তাও সে বলল,”তো আমার কাছে কি চান?”

“কাদেরের সাথে আপনাদের যত লেনদেন বা আলাপ হয়েছে,সে রেকর্ডগুলো আমাকে দিন। যত টাকা লাগে দেব। কাদেরের টাকার হিসাব আমার কাছে।আমাকে ও বিশ্বাস করত। ওর কাছ থেকে দিনে দিনে আমি অনেক টাকাই সরিয়েছি। আমি জানি ও আপনাকে কত টাকা দিয়ে ভাড়া করেছিল। আমি তার অনেকগুন দেব। রেকর্ডগুলো আমাকে দিন।”

কাল পোশাকধারী দ্বিধায় পড়ল। তার এজেন্সির রেপুটেশন আছে,তার ক্লাইয়েন্টের তথ্য গোপন রাখে। তারা অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যা আর গুম করার অর্ডার পেয়েছিল গত ২০ বছর ধরে। সবকটাতেই সফল ছিল। এবং ক্লাইয়েন্টের পরিচয়ও গোপন আছে এখনো।তবে বিগত কয়েক বছরে পুলিশি তৎপরতা বাড়ায়,এবং অনেক পেশাদারের আটক বা নিহত হওয়ায় অর্থসংকটে আছে তারা। বিশেষ করে আমেরিকান এক পলাতক পেশাদার খুনিকে ভাড়া করবার পর,তার খরচ প্রচুর বেড়ে গেছে  এখন এনেন্সির সুনাম ভাবার সময় নেই।

কাল পোশাকধারী বলল,”আচ্ছা আমি দেব আপনাকে সেই কাগজপত্র, আর অডিও ফাইল।কিন্তু আমার ডিমান্ড অনুযায়ী টাকা দিতে হবে আপনাকে,,,”

কথাটা শেষ হতেও পারল না। আজিজ পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে কাল পোশাকধারীর মাথায় দুইটা গুলি করে দিল  কাল পোশাকধারীর প্রাণহীন দেহটা পড়ে রইল।

আজিজ হাটতে হাটতে হাইওয়ে ধরে চলতে লাগল। মোবাইল বের করে একটা ফোন করল। ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করল। আজিজ বলল,,”ঠিকই বলেছিলি তুই,টাকার বিনিময়ে আমাদের মুখোশ খুলে দিত ও। বিশ্বাস করবি না,এরা নাকি পেশাদার,,সামান্য একটু জাজও করে দেখল না। সাথে সাথে তোর সাথে ওদের লেনদেনের রেকর্ড দিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেল। অন্য কেউ আমার জায়গায় থাকলে কি হত বল তো….”

মোবাইলের ওপাশ থেকে শহরের নতুন মেয়র কাদের বলল,” পথের শেষ কাটাটা সরল তবে বড়ভাই,,,,”

কাল পোশাকধারীর মগজবিহীন দেহটা রক্তের মাঝে গড়াগড়ি খাচ্ছে,,,,

২.

মিঃ উমরের দরজায় নক পড়ল। মিঃ উমর দৈনিক আমাদের সমাজের রিপোর্টার। তার একটা পা খোড়া। নাইজেরিয়ায় সেনাবাহিনীর শান্তি মিশনে ভবন ধ্বসের শিকার দুর্গতদের বাচাবার সময় একটা হেলে থাকা পিলারকে একটা বাচ্চার গায়ের উপর পড়তে দেখেছিল সে। শিগগিরি বাচ্চাটাকে গিয়ে সরাতে  পারলেও,পিলারটার হাত থেকে নিজের বাম পা টা আর বাচাতে পারে না সে। সেনাবাহিনীতে ক্যারিয়ার সেদিনই শেষ।তবে সেই পা হারানোর স্মৃতিটা এখনো বার বার ফিরে আসে তার কাছে,দুঃস্বপ্ন হয়ে আর প্লাস্টিকের প্রস্থেটিক পাটাকে ডেইলি চোখের সামনে দেখে।

এই রাতেও সে স্বপ্নে তা-ই দেখছিল,নাইজেরিয়ায় সেই পিলারড়ির নিজের পায়ের উপর পড়ার দৃশ্যটি। তবে আজ শুধু সেকারণে ঘুম ভাঙেনি তার।

দরজায় আবার কে যেন কড়া নাড়ল। মিঃ উমর দেখল,এখন রাত ২ টা বাজে। এত রাতে তার কাছে আবার কে এল।

৩০ বছর বয়সী সেনাবাহিনীর এক্স-ক্যাপ্টেন মিঃ উমর বর্তমানে সাংবাদিকতার সাথে আরেকটা জিনিসের হন্য পরিচিত।  সেটা হল,প্রাইভেট গোয়েন্দা। গত দুই বছর ধরে সাংবাদিকতার সাথে সাথে সে ছোটখাটো কিছু অপরাধের সমাধান করেছে টাকার বিনিময়ে।মাঝে মাঝে কেস নিয়ে কেউ কেউ আসে তার কাছে,তবে কেউই এত রাতে কখনওই আসে না।

টেবিল থেকে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলটি হাতে নিল সে। পুরনো কেসের কোন অপরাধী কি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সাক্ষাৎ করতে এসেছে? প্রস্তুত থাকা ভাল।

দরজায় কড়া নাড়ার গতি বাড়ছে। এখন আর কড়া নাড়াচ্ছে না যেন,দরজায় রীতিমত কিলাচ্ছে,,দুম দুম শব্দ হচ্ছে।মিঃ উমর ধীর পায়ে এগিয়্র দরজাটা আস্তে করে খুলল। 

সাথে সাথে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে একটা মহিলা আর ৯/১০ বছরের একটা ছেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভিতরে। ধাক্কা সামলাতে পারল না মিঃ উমরের প্রস্থেটিক পা,কাত হয়ে পড়ে গেল সে। পিস্তলটা এখনো হাতে তার,তাক করে ধরল আগন্তুকদের দিকে মেঝেতে শুয়েই। মহিলাটা ছোট একটা চিৎকার দিয়ে মাথার উপর হাত তুলল। বাচ্চা ছেলেটা মাকে হাত তুলতে দেখে নিজের দুই হাতও মাথার উপর তুলে ধরল।

মিঃ উমর পিস্তল নামিয়ে নিল।বাচ্চাটা আর মহিলাটার চোখ মুখ থেকে আতংক সরে নাই।তবে সেটা মিঃ উমরের পিস্তলের কারণে নাও হতে পারে,,,

মহিলাটা কাপতে কাপতে একটু পর পর খোলা দরজাটার দিকে তাকাচ্ছিল। মিঃ উমর পাশের চেয়ার ধরে উঠল, পিস্তলটা হাত থেকে টেবিলে রেখে দিল। বলল,”আপনারা কারা? এত রাতে?”

মহিলাটি বলল,”কিছু যদি মনে না করেন,দরজাটা বন্ধ করি?”

মিঃ উমর বলল,”আচ্ছা”

মহিলাটা দরজা বন্ধ করে দিল। বাচ্চাটা এখনো মাথার উপরেই হাত তোলা।

মহিলাটা বলল,”একটু পানি দিতে পারেন?”

মিঃ উমর কিচেনে গেল। এক গ্লাস পানি নিয়ে এল। এসে দেখল,এই গরমের ভিতর ড্রয়িং রুমের জানালাটা খুলে রেখেছিল মিঃ উমর,মহিলাটা বন্ধ করে দিয়েছে,তারপর বাচ্চাটাকে কোলের ভিতর নিয়ে সোফায় বসে আছে। ফ্যানের কটর মটর আওয়াজেই সে আতকে উঠছে।

মিঃ উমর পানির গ্লাসটা টেবিলে রাখল। মহিলাটা এক নিঃশ্বাসে অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটুকু বাচ্চাটাকে খাইয়ে দিল। মিঃ উমরের খুব অপরাধবোধ হিল দৃশ্যটা দেখে। সে আবার রান্নাঘরে গিয়ে জগ আর একটা গ্লাস নিয়ে এল।

তারপর একটা আরমচেয়ারে বসে বলল,”কি হয়েছে বলুন তো,,”

মহিলাটা বলল,,”আমার বাচ্চাটার পিছনে পেশাদার খুনি লেগেছে,আমার বাচ্চাটাকে খুন করার অর্ডার পেয়েছে সে।”

কিছুক্ষণ নীরবতা। মিঃ উমর বলল,”সরি?”

মহিলাটা কেদে দিল। “আমার বাবু,আমার নিরবকে মারার জন্য একটা কিলার ভাড়া করা হয়েছে।হিটম্যান”

মিঃ উমরের মনে হল, তার মাথা থেকে ঘুমের আবেশ কাটে নি। আবার বলল,”আপনার ছেলের বয়স কত? ও তো বাচ্চা ছেলে”

মহিলা বলল,”১০ বছর।” আবার ফোঁপাতে লাগল সে।

মিঃ উমর বলল,”আমাকে একটু খুলে বলবেন?”

মহিলাটা বলল,,”এক সপ্তাহ আগে,আমার স্বামী রাতে হাইওয়ে ধরে আসছিল গাড়িতে করে,সেদিন তার গাড়িটা হঠাৎ মাঝরাস্তায় খারাপ হয়ে যায়।ইঞ্জিন খুলে সে দেখতে পায় গরম হয়ে গেছে। ঠান্ডা করতে পানি খুজতে সে আশেপাশে পুকুর খুজতে থাকে,তখন সে একটা খুন হতে দেখে,,,”

মিঃ উমর নড়েচড়ে বসল।মহিলা বলতে থাকল,”আমার স্বামী সাথে সাথে লুকিয়ে পড়ল,যাতে পিস্তলধারী তাকে না দেখে। আমার স্বামী বলেছে,লোকটাকে দেখে মোটেও খুনি খুনি লাগে না,খুবই নিরীহ দেখতে,চশমাওয়ালা,ভূড়িওয়ালা লোক। পিস্তল হাতে ফোন করতে করতে চলে গেল। ”

মিঃ উমর বলল,”তারপর?”

মহিলা বলল,”আমার স্বামী দৌড়ে সেই গুলি খাওয়া লোকটার কাছে গেল। লোকটার মাথায় গুলি লেগেছিল।বাচার কোনো আশা আর ছিল না। আমার স্বামী ভাবল তার পকেটে ফোন থাকলে সেটা নিয়ে লোকটার বাড়িতে ইনফর্ম করা উচিত। উনি লোকটা পকেট সার্চ করতে লাগলেন,তখনি পকেট থেকে একটা সাউন্ড আসতে লাগল, পিপ পিপ একটা শব্দ।  আর শব্দটার পর একটা যান্ত্রিক আওয়াজ হল,”এসেট টার্মিনেটেড।”

মিঃ উমর ভ্রু কোচকাল। বলল,”তারপর?”

মহিলা বলল,”তারপর আমার স্বামী ঘাবড়ে গেল খুব। উনি শিগগিরি সেখান থেকে চলে আসল। একটা পুকুর পেল,শিগগিরি পানি নিয়ে ইঞ্জিনে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল। ”

“গাড়ি নিয়ে ফেরার সময় স্পষ্ট সে দেখতে পেল সেই নিরীহ চেহারার লোকটা রাস্তার পাড়ে দাঁড়ানো,চোখে বিস্ময় আর আতংক,হয়ত কোনো কারণে ফিরে এসেছিল সে।গাড়ি চালিয়ে চলে যাবার আগেই লোকটা মোবাইল বের করে গাড়ির আর তার ড্রাইভিং সিটে থাকা আমার স্বামীর কয়েকটা ছবি তুলে নিল মোবাইলের ফ্লাশে।”

মিঃ উমর বলল,”তারপর?”

মহিলা বলল,”তারপর বেশ কয়েকদিন পর আমাদের বাসা,আমার স্বামীর অফিস আর আমার বাবুর স্কুলের আশেপাশে একটা বিদেশী লোককে ঘুরতে দেখা গেল। আমেরিকান আমেরিকান লাগে। সোনালী চুল,চোখে সানগ্লাস, অনেক সাদা,ইয়া বড় লম্বা।”

মিঃ উমর বলল,”নিরবের পিছে লেগেছে বুঝলেন কিভাবে? নিরবই তো ছেলের নাম,তাই না?”

মহিলা বলল,”হ্যা,আর আমি ইয়াসমিন, আর আমার স্বামীর নাম জিসান। আমরা ৩ জনের ফ্যামিলি।বিশ্বাস করেন,আমরা কখনো কারো সাথে শত্রুতা চাইনি,করিওনি,আমাদের শক্তিশালী আত্মীয় নেই।আমরা নির্ঝঞ্ঝাট একটা জীবন চাই, ব্যস।”

মহিলাটা ফোঁপাতে লাগল। মিঃ উমর একটু সময় নিয়ে আবার প্রশ্নটা করল,”বললেন না কিভাবে বুঝলেন নীরবের পিছনে খুনি লেগেছে?”

ইয়াসমিন বলল,”আপনি হয়ত শুনেছেন কয়েকদিন আগে,লিটল স্টার স্কুলের এক টিচার রহস্যময়ভাবে খুন হয়েছে। কিন্তু যেটা পেপারে আসে নি বা টিভিতে আসে নি,সেটা হল,সেই খুনের কাছাকাছি সময় এক আমেরিকানকে  তার অফিসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। আর আমার বাবুর সেদিন ওনার অফিসে থাকার কথা ছিল। আমার স্বামী ওনাকে রিকুয়েস্ট করেছিল যে অফিস থেকে ফেরার পথে ছেলেকে নিয়ে যাবেন,কিন্তু কখনো তার দেরি হলে নীরবকে যেন তার অফিসে একটু বসতে দেয়।

নীরব অপেক্ষা করত সেই অফিসে,খুনি সেটা জানত। খুনটা এমনভাবে হয়েছে আপনি জানেন না, মহিলার ঘাড়টা মটকানো ছিল,কিন্তু অফিস ভিতর থেকে আটকানো ছিল।”

মিঃ উমর ঘটনাটা খুব ভাল করেই জানে। নিজেই সে ঘটনাটার রিপোর্ট করেছিল।এবং এটাও বের করেছিল যে খুনি ঘরের ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকেছে,ভেন্টিলেটর এর গ্রিল ভাঙা ছিল। তবে ভেন্টিলেটর মেঝে থেকে প্রায় ১৫ ফুট উপরে থাকা তার থিওরিতে ভুল ধরেছিল পেপারের সম্পাদক।পয়েন্টটা রাই রিপোর্ট থেকে বাদ দিতে হয়েছিল।

মহিলা ফোপাতে লাগল, “তার কয়েকদিন পর  যে মাঠে আমার বাবু খেলে প্রতি বিকেলে,সেই বিকেলে ওর এক বন্ধু হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল। সেই ছেলেটা আর আমার বাবু সেদিন,বার্সেলোনা ক্লাবের মেসির জার্সির ছোট সাইজটা পরে গিয়েছিল। সেই বাচ্চাটার লাশ সেদিন সন্ধ্যায় পাওয়া যায় মাঠের বাইরের এক ঝোপে।ঘাড় মটকানো। ছেলেটার সেদিন জন্মদিন ছিল, ওহ মামুন!”

ইয়াসমিন কাদতে লাগল আবার।নীরব ওর মায়ের দিক ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।

ইয়াসমিন বলল,”গত পরশু আমার বাবু ওর রুমে বসে পড়ছিল। হঠাৎ আমি ভীষণ জোরে একটা শব্দ পেলাম, তারপর চিৎকার  আমার বাবুর। দৌড়ে গিয়ে দেখি,ওর টেবিলের সামনের জানালাটার পাল্লা ছিন্নভিন্ন হয়ে ভেঙে নিচে পড়ে গেছে,আর আমার বাবু কাপতেছে,, ও পরশু থেকে একটা কথাও বলে নি।”

মিঃ উমর অবশেষে বুঝল,ছেলেটার ফ্যালফ্যাল করে থাকার ভিতরে একটা অসহায়ত্ব ছিল। একটা অস্বাভাবিকতা। যেটা সে ধরতে পারছিল না।

ইয়াসমিন বলল,”আমি ওর বাবাকে ফোন দেবার আগেই ওর ফোন এল। আমি ফীন ধরতেই জিসাব খুবই ভয় পাওয়া গিলায় বলল,ইয়াসমিন পালাও,নীরবকে মারতে ওরা লোক পাঠিয়েছে,আমার উপর প্রতিশোধ নিতে। আমি দেখে ফেলেছি বলে,পালাও ওকে নিয়ে,,,”

“ফোনটা কেটে দিল তারপর,আমি আমার এক বান্ধবীর বাসায় গেলাম আজ। ওকে কিছুই বলি নি। ওর স্বামী আর বাচ্চা ছিল।বাচ্চাটার বয়স ২ মাস।  ”  ইয়াসমিন ভয়াবহভাবে ফোপাতে লাগল।  ” মাঝরাতে একটা চিৎকারে আমার ঘুম ভাঙল। উঠে দেখি নীরব বসে আছে। বাইরে চিৎকার।  বাইরে গেলাম আমি,আমার বান্ধবীর স্বামীর  রক্তাক্ত লাশটাকে চোখ খুলে থাকতে দেখলাম। নিচে আমার বান্ধবী বলছে,”আপনি কে? হু আর ইউ?”

আমি সিড়ি দিয়ে উকি দিলাম। ওই আমেরিকানটাকে প্রথমবারের মত দেখলাম। দোলনা থেকে আমেরিকানটা বাচ্চাটাকে নিল। দুই হাত দিয়ে বাচ্চাটাকে ছিড়ে ফেলল………”

ইয়াসমিন ভয়াবহরকম কাপছে।ওর শ্বাস কষ্ট হচ্ছে, নীরব অসহাতের মত ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

মিঃ উমর কখন যে দাঁড়িয়ে গেল আর্মচেয়ার থেকে, বুঝতে পারল না। বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন। কোথায় যেন যাচ্ছে গাড়িগুলো,,,,

ইয়াসমিন কে একটা ঠোঙায় শ্বাস নিতে দিল মিঃ উমর। টিভিটা চালাল সে স্বাভাবিক হবার ভিতর। ছাড়তেই ব্রেকিং নিউজ,”নগরীর শেষপ্রান্তে এক বাসায় ঢুকে ভয়াবহ হত্যা,বাবা মা আর নবজাতক খুন”

ইয়াসমিন আহত জীবের মত কেদে উঠল।

মিঃ উমর জানতেও চাইল না,পুলিশ রেখে এই রাতে এই মহিলা আর তার বাচ্চা কেন তার কাছে এসেছে, এও জানতে চাইল না,তার ২ বছরের শখের গোয়েন্দাগিরির জনপ্রিয়তা কি এতটাই বেড়েছে যে তার কাছে আশ্রয় নিতে আসে অচেনা অজানা মানুষেরা।

মিঃ উমর মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। কানের ভিতরে মস্তিষ্কের দিকে শো শো করে রক্ত যাবার শব্দ।পিছে শোনা যাচ্ছে ইয়াসমিনের কান্না।

৩.

বব হাওয়ার্ড  ৩৭ তলা বিল্ডিং এর  ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ ভাবে চিন্তা করছে সে। ওই পিচ্চির ভাগ্য দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছে সে।

কন্ট্রাক্ট টা সে পায় তাকে আশ্রয় দেওয়া গোপন বাংলাদেশি হিটম্যান এজেন্সি থেকেই।

আমেরিকাতে গত ১৫ বছর ধরে বড় বড় মানুষকে খুনের কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল সে। সে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই হোক,ব্যবসার প্রতিপক্ষ হোক,বা মাফিয়া হোক,, বব হাওয়ার্ড গত ১৫ বছর ধরে আমেরিকার কুখ্যাত হিটম্যান। অবশ্য বব হাওয়ার্ড তার আসল নাম না, আমেরিকায় তাকে যে নামে চেনা হত,সেটাও তার  আসল নাম ছিল না। তার কাছে ৩০ টা দেশের পাসপোর্ট আছে ৩০ টা নামে।

আমেরিকায় রাজার হালেই ছিল সে,একেকটা খুনের জন্য এক বিলিয়ন ডলার ছিল তার বাধা দাম। ঝামেলাটা বাধল এই বছর আগে। আমেরিকার এক সিনেট নির্বাচনের প্রার্থীর পিছনে টাকা ঢেলেছিল মাফিয়ারা। কিন্তু প্রতিপক্ষ প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। অনেক হুমকি ধামকি দিয়েও সেই প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরাতে পারছিল না মাফিয়ারা। তখনি ভাড়া করা হয় ববকে। তবে না,খুন করতে না,অপহরণ করতে। মাফিয়া দলটার অস্তিত্ব আমেরিকায় ওপেন সিক্রেট ছিল।সবাই জানত তাদের রূপ।কিন্তু হাতে নাতে ধরার অপেক্ষায় ছিল। মাফিয়ারা রিস্ক নেয় নি।হিটম্যান ভাড়া করে প্রার্থীর ১১ বছরের ছেলেকে অপহরণ করতে ভাড়া করে বব কে। 

বব প্রথমে নিতে চায়নি অফার। খুন ছাড়া অন্য কিছুতে সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। শেষ মাফিয়ারা তাকে ৫ বিলিয়ন ডলার দিতে চাওয়ায় রাজি হয়ে যায় সে।

কিডন্যাপটা সে করে ঠিকই।তবে প্রাক্তন মার্কিন সেনা,বর্তমান পেশাদার খুনি ববের একটাই দুর্বলতা ছিল। সে বাচ্চাদের দেখতে পারত না। বাচ্চারা বড্ড শব্দ করে।অসহ্য লাগে তার কাছে এই শব্দ।এই মানসিক সমস্যাটা শুরু হয় ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে। বেসামরিক ইরাকীদের ঘরে হামলার সময় বাপ মায়ের লাশের উপর ডুকরে পড়া বাচ্চাদের চিৎকার,,,উফফফ,,, অসহ্য,,ইচ্ছা করে গলা টিপে ধরতে।

সাবধানী ববের এই মানসিক রোগটাই আমেরিকায় তার রাজত্ব শেষ করল। সিনেট প্রার্থীর ছেলেকে জিম্মি করে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাড়াতে বাধ্য করার অলান ছিল মাফিয়াদের। কিন্তু জিম্মি অবস্থায় বাচ্চাটার কান্না আর চিৎকার সইতে না পেরে বব, ছেলেটা ঘাড়টা ভেঙে দেয়।

নির্বাচন বানচাল তো দূরে থাক। গোটা আমেরিকা এই জনপ্রিয় রাজনীতিবিদের বাচ্চা ছেলের লাশ দেখে ভয়াবহ ক্ষেপে যায়। মাফিয়াদলের টাকা,ক্ষমতা কোনো কাজে আসে না। এফ বি আই এর ঝটিকা অভিযানে বিশাল মাফিয়া দল এক সপ্তাহের ভিতর ভেঙেচুরে যায়,পিছে সাপোর্ট দেয়,প্রত্যেকটা আমেরিকান নাগরিক।

বব হাওয়ার্ডের অস্তিত্ব প্রকাশ পেয়ে যায়,আর তার গত ১৫ বছরের সব অপকর্ম। শিগগিরি মুখে,ঠোটে আর চোখে দ্রুত কিছু সার্জারি করিয়ে চেহারা পালটায় বব। সিদ্ধান্ত নেয়,বাঁচতে হলে এমন কোনো দেশেই তার যেতে হবে,যেখানে আইন শৃঙ্গখলার বালাই নেই।তাকে কেউই চিনবে না। এবং তার আগের পেশা সে চালাতে পারবে,কম টাকায় হলেও। অনেক খুজে তার চোখে এমন নিরাপদ একটা দেশের নামই আসে,,, বাংলাদেশ,,দক্ষিণ এশিয়ায়,ভারতের পাশে,অজানা,অচেনা,সভ্য জগত থেকে প্রায় মুছে যাওয়া একটা দেশ।

এখানে এসে সবার আগে সে যে কাজটা করে,বাংলাদেশের কোনো হিটম্যান এজেন্সি আছে কিনা সেটার খোজ নেয়। খুব বড় একটা এজেন্সি সে পেয়ে যায়। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর যতগুলো বড় রাজনৈতিক হত্যা বা গুম হয়েছে অধিকাংশের সাথেই এই এজেন্সির একটা সম্পর্ক আছে,তবে বিগত কয়েক বছরে এজেন্সির বোকামি এবং কর্মী রিক্রুটিং এ অবিবেচক এর মত কাজ করায়,এজেন্সির গোপনীয়তাটা অত শক্তিশালী নেই। এজেন্সিও দুর্বল হয়ে গিয়েছে।

বব হাওয়ার্ড নিজের পরিচয় লুকিয়ে এজেন্সির কাছে কাজ চায়। এজেন্সির মালিক খুবই সন্দেহপ্রবণ,সে ববকে আজ অবধি বিশ্বাস করে নি।তবে কর্মী সংকট, শীতলতা, আর স্বাস্থ্য দেখে ববকে ভাড়া করে সে ।

এজেন্সির প্রধান মিঃ এম আজ পর্যন্ত ববকে নিয়ে খুশি না। বব গত ১ বছর ধরে এজেন্সিটাকে বাচিয়ে রেখেছে,সব কয়টা কন্ট্রাক্ট এর খুন এতটাই দক্ষতার সাথে করেছে যে পেপারে বা টিভিতে খবর এসেছে, রহস্যময় মৃত্যু, ভূতের হাতে মৃত্যু শিরোনামে।

তবে মিঃ এম ববের ভিতরকার গোপনীয়তার সাগর নিয়ে তটস্থ ছিল,সেটা বব বুঝতে পারত।শুধু তাই নয়,ববের বাচ্চাদের প্রতি প্যাথলজিকাল ঘৃণা সবচেয়ে কম সময়ে ধরে ফেলে মিঃ এম।লোকটার মাথায় প্রচুর বুদ্ধি,বাংলাদেশের মত অচেনা একটা দেশে জন্মেও।

ববের কাজের দক্ষতায় এজেন্সির সুনাম ফেরে আস্তে আস্তে,কয়েকদিন আগে এই শহরের মেয়র নির্বাচনের এক প্রার্থীকে খুনের কন্ট্রাক্ট পায় তারা। ববের য়পর সেই দায়িত্ব পড়ে।কথা ছিল,শুধু প্রার্থীকে মারবে,কিন্তু প্রার্থীর বাচ্চা ছেলেমেয়ের আর্তনাদে তার মাথায় ইরাকের সেই ধ্বংসস্তূপ এর কথা চলে আসে,পাগল হয়ে যায় সে,পুরো পরিবারকেই শেষ করে দেয়।

মিঃ এম বিপদ বুঝে ববকে অনেক দূর পাঠিয়ে দেয়,শহর তো বটেই,দেশেরই অন্য প্রান্তে। 

বেশ কয়েকদিন নীরব ছিল সব।কিন্তু এরপর  হঠাৎ একদিন মিঃ এম নিজে আসে ববের লুকানোর জায়গায়। পেশাদার চোখের আড়ালে ঘৃণার ছাপ।

ববকে বেশি কিছু বলে না সে,একটা বাচ্চার ছবি হাতে ধরিয়ে দেয়। দাত কিড়মিড় করে বলে,”প্রচন্ড কষ্ট দিয়ে মারবা একে,প্রচন্ড কষ্ট,আমি আমার সব সঞ্চয়, সব সম্পদ তোমাকে দিয়ে দেব এর টুকরা গুলো আমাকে দেখাতে পারলে,,এরজন্য যদি তোমার বাড়তি ১০০ খুনও করতে হয় তো কর। আমি সামলাব।”

এই বলে চলে যায় সে।

সেই থেকে বব পিছে লেগেছে নিরবের। কয়েকমাসের খাটুনির পর খুজে বের করেছে নিরবকে। ১১ বছরের নিরব মাহমুদ। লিটল স্টার স্কুলের ক্লাস ৪ এর চাত্র,বাবা জিসান মাহমুদ একটা ড্রিল কোম্পানীর ম্যানেজার, মা ইয়াসমিন মাহমুদ গৃহিণী। এই শহরে আর কোনো আত্মীয় নেই তাদের।গ্রামে নিরবের বুড়ি নানী আর দাদী থাকত,এই বছরের শুরুতে মারা গেছে দুজনই। কেউ নেই ওদের দুনিয়ায়। কেউ খোজও নেবে না,ওদের তিনজনের সাড়া না পেলে,,,

লিটল স্টার স্কুলে নিয়মিত খোজ নেয় সে,জিসানের অফিসেও। প্রতিদিন বেলা  দুইটায় জিসান নিরবকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে যায়।মাঝে মাঝে দেরি হয়,নিরব অপেক্ষা করে ওদের ফ্যামিলি পরিচিত এক টিচারের অফিসে।

সেদিন বেনামে বাইরে থেকে চিঠি পাঠায় সে সেই টিচারকে,জরুরি কাজে বাইরে যেতেই হবে তাকে,প্লান ছিল টিচার চলে যাবে আর নিরব আসবে অফিসে,টিচার যাবার পরই অফিসে ওৎ পেতে থাকবে সে।তারপর…..

কিন্তু না,সে অফিসে ঢোকার পর টিচার কোনো কারণে ফেরত এল। এসেই দেখল ববকে,ববের কিছুই করার ছিল না,টিচারের মুখ বিন্ধ করতেই হত,,, হাত থেকে ফসকে গেল নিরব।

এর কিছুদিন পরে নিরবের বিকেলের খেলার মাঠে যায় বব। বাংলাদেশি সবাইকে একই রিকম লাগে তার কাছে। বার্সেলোনার ১০ নম্বর বাচ্চাদের জার্সি পরা দুইটা ছেলে ছিল বুঝতে পারে নি সে। যে ছেলেটাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেও নিরব ছিল না। কিন্তু বাচ্চাদের চিৎকার,, কান্নার শব্দ,,, উফফফফফ।

নিরবের বাসাটা খুজে বের করেছিল সে। নিরবকে জানালার পাশে পড়তে দেখেছিল সে। রাতের বেলা,বাসার কাছে কেউ নেই। ছেলেটাকে রুমের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে,সেখান থেকেই চাইলে গুলি করে দিতে পারত সে। কিন্তু ক্লাইন্টের আবদার। ছেলেটা টুকরা টুকরা দেহ চায় সে।

নিঃশব্দে দোতলার জানালার পাশে থাকা গাছটা বেয়ে ওঠে সে। দোতলার পাশের ডালটা থেকে লাফ দিতে জানালায় ওঠে সে,নিস্তব্ধে।ছেলেটা তখনও টের পায় নি। খালি হাতে জানালার শিক বাকাতে থাকে সে। ছেলেটা তখনি তাকায় তার দিকে,দুটো চোখ প্রথমবারের মত মুখোমুখি হয়।

জানালার শিক বাকতে থাকে,নিরব ভয়ংকর এক চিৎকার দেয়।উফফফফ,,অসহ্য সে চিৎকার, ইরাকের সেই ধ্বংসের কথা মনে পড়ে,টলে উঠে সে। রাগের চোটে জানালা ফ্রেমটাই ভেঙে ফেলে,কিন্তু ভুলে যায় বাংলাদেশে মানুষের পরিমাণ অত্যধিক, তার চেয়েও বেশি তাদের কৌতুহল।রাস্তায় চেচাতে থাকে কিছু লোক। লাফ দিয়ে নেমে পালাতে হয় তাকে।

আর আজ? ওদের খোজ নেয় সে। মা আর ছেলে লুকিয়েছে মায়ের বান্ধবীর বাসায়।ভেবেছে ও জানবে না,হেহ! তবে আজ গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে সে। আশেপাশের মানুষের জন্য যাতে কাজ অসফল না হয়।

বাসায় ঢুকতেই বাসার লোকটা টের পেয়ে যায়। একটা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে এগিয়ে আসে,নিজের পরিবারকে বাচাতে। অপ্রয়োজনীয় ছিল,সে ওদের মারতে চায় নি,সে চাইছিল নিরবকে।কিন্তু লোকটা ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে বাড়ি দিয়ে বসে ববকে।তাকে আঘাত কিরে কেউ পার পায় নি কখনো। মাথা ভেঙে দেয় সে লোকটার,ওই ব্যাট দিয়েই। লোমটা জানতেও পারল না কেন,,,,

বাসার মহিলাটা আসল।ইয়াসমিনের বান্ধবী, স্বামীর লাশ দেখে চিৎকার করে উঠল,চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল ওদের ২ মাস বয়সী বাচ্চার। উফফফফ,,কি অসহ্য চিৎকার,,,,

বাচ্চাটাকে নিজ হাতে ছিড়ে ফেলল সে। বাচ্চার মা ওটা দেখেই অজ্ঞান হয়ে গেল।কাজ শেষ করতে পকেট নাইফটা বের করে গলায় চালিয়ে দিল বব। অজ্ঞান মহিলাটা সে অবস্থায়ই মরে গেল।

উপরে দুদ্দাড় শব্দ। বব বুঝল,শিকার উপরে আছে। তাড়াহুড়ার কিছু নেই।ওরা কোথাও যাবে না। আস্তে আস্তে কাজটা করতে হবে,কাজের ভিডিও করতে হবে,টুকরা করে ব্যাগে ভরে মিঃ এম কে দিতে হবে।

ক্যামেরা রেডি করে,ছুরি ধার দিতে দিতে বব দোতলায় উঠল,উঠেই ধাক্কা খেল। বারান্দার পাশের রুমে ছিল ওরা। বব ভাবতেও পারে নি এখান থেকে ওই মহিলা কিভাবে পালাবে। বিছানার চাদর পেচিয়ে বারান্দার জানালায় আটকানো। অপরপ্রান্ত নিচে ঝুলছে। শিকার আবারও ফসকাল।

বব এখন এই ৩৭ তলা বিল্ডিং এর ছাদে বসে মুচকি হাসে,খুবই এনজয় করছে সে। শিকার যত ফসকাবে,শিকারের খেলা খেলতে শিকারীর ততই মজা।

৪.

পরেরদিন বিকেলের দিকে ইয়াসমিন মোটামুটি স্বাভাবিক হল। মিঃ উমর সারারাত ঘুমায় নি। নিরব ঘুমিয়ে পড়েছে। ইয়াসমিন নিরবকে এক মুহুর্তও চোখের আড়াল করছে না।

মিঃ উমর বলল,”জিসান ভাই কোথায়? তার খবর পেলেন?”

ইয়াসমিন বলল,”না,সেই যে ফোনটা কেটে গেল,আর চেষ্টা করেও পাইনি। কেমন আছে,কি করছে জানি না।ওই লোকটা ওকে কিছু করে নি তো? ”

মিঃ উমর বলল,” কিভাবে? আপনি না বললেন উনি যখন আপনাকে ফোন দেয়,লোকটা নিরবের জানালার পাশে ছিল?”

ইয়াসমিন বলল,”আমি জানালাটা ভাঙা দেখেছি,শিক গুলো বাকিয়ে পাল্লা,ফ্রেম সহ ভেঙে ফেলা। লোকটাকে আমি কালকে রাতের আগে কখনওই দেখিনি।”

মিঃ উমর বলল,”আপনি আমাকে আপনার বান্ধবীর যে ঠিকানাটা দিলেন,আমার বাসা থেকে কিন্তু সেটা থেকে পুলিশের অফিস কাছে। আপনি ওখানে একটা ডায়রি করতে পারতেন।”

ইয়াসমিন বলল,”আমি টিভি তে দেখেছি,আপনি পুলিশ যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে অপহরণকারীদের কাছ থেকে বাচ্চাদের অক্ষত দেহে ফিরিয়ে এনে মায়ের বুকে দিয়েছেন। আমার মনে হল,আপনি এত মানুষকে যখন বাচিয়েছেন। নাইজেরিয়াতে কোন বাচ্চাকে বাচাতে গিয়ে নিজের পা পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন,আপনিই পারেন আমার বাবুকে বাঁচাতে।”

মিঃ উমর চুপ করে রইল। একটুপর বলল,”সবার আগে আপনার স্বামীকে খুজে পেতে হবে। উনি কিভাবে জানল আপনার ছেলের পিছে খুনি লেগেছে,সেটা জানতে হবে। উনি তো আর গত দুইদিন ছিলেন না,আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে বড্ড উত্তেজিত হয়ে তিনি আপনাকে কথাগুলো বলেছেন। আমার ধারণা উনি কিছু জানেন।”

ইয়াসমিন বলল,”আমাদের কোন শত্রু নেই,আপনার কি মনে হয়,যাকে খুন ক্রতে দেখেছে,সেই এই লোককে পাঠিয়েছে? সে কিন্তু ওর আর গাড়িটার ছবি তুলেছিল। গাড়ির নম্বর, মডেল আর ড্রাইভারের ছবি হলে সহজেই তো খুজে পাবার কথা।”

মিঃ উমর বলল,”তাহলে তো খুনি লাগত আপনার স্বামীর পিছে,আপনার ছেলের পিছে কেন লাগবে? যতটা মনে হচ্ছে,আপনার স্বামীর অফিসের ভিতর সে কখনো যায় নি। কিন্তু আপনার ছেলের স্কুল,প্লেগ্রাউন্ড সব জায়গায় সে গিয়েছে।”

ইয়াসমিন বলল,”আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না,ও কি বাড়াবাড়ি করল খুনের ব্যাপারটা নিয়ে?”

মিঃ উমর বলল,”হতে পারে,এমনও হতে পারে খুনের ছবি আপনার স্বামীও তুলতে পারে,সেটা নিয়ে খুনিকে ব্লাকমেইল করতে পারে,খুনি তখন আরেক খুনিকে পাঠাতে পারে।”

ইয়াসমিন বলল,”আমার স্বামী খুবই সরল সোজা মানুষ,এই প্রযুক্তির যুগেও সে অ্যান্ড্রয়েড ফোনে শুধু কল রিসিভ আর সেন্ড করতে পারে,,মেসেজও দিতে পারে না। আমি আর নীরব ওর মোবাইলের সব প্রয়োজনীয় কিছু তদারক করি।কাজের বাইরে আমার স্বামী কোথাও মন দেয় না। না খেলা,না ছবি,সে কোনো ঝামেলায়ই যাবে না,আর ব্লাকমেইল বলছেন? আমাদের তো টাকার অভাব না,নিজেদের জমি আছে,বাড়ি আছে,গাড়ি আছে,,কোনো ঋণের বোঝাও নেই। ও কেনই বা করতে যাবে?”

মিঃ উমর বলল,,”সব উত্তর শুধুমাত্র আপনার স্বামীই দিতে পারবে। আমার একবার যেতে হবে বাইরে কিছু খোজ নিতে হবে।”

ইয়াসমিন বলল,”আমাকে আর নিরবকে একা রেখে যাবেন?”

মিঃ উমর বলল,”না,থানায় নিয়ে যাব আপনাদের,আমার পরিচিত এক পুলিশ অফিসার আছে,নির্ভয়ে তাকে বিশ্বাস করা যায়।সাব ইন্সপেক্টর প্রিন্স মাহমুদ। ”

৫.

ব্রিজের পাড়ে গাড়ি নিয়ে দাঁড়ানো একটা লোক। লোকটার চোখে পানি। গাড়িটার গায়ে হাত বুলাচ্ছে সে। অনেক শখের গাড়ি তার। তার ছেলের পছন্দ করা গাড়ি। ছেলেকে কথা দিয়েছিল এই গাড়িটায় করে সে,তার মা,আর তার বাবা কক্সবাজার যাবে শীতের ছুটিতে।

কিন্তু এই শখটা পূরণ হবে না তার ছেলের। তার ছেলে,তার স্ত্রী কেমন আছে,বেঁচে আছে না,মরে গেছে তাও জানে না সে।

তবে এই গাড়িটার আশেপাশে থাকলে জিসান মাহমুদ মারা যাবে। তাকে পাগলের মত খুজছে মানুষ। ভয়ংকর, ভয়ংর মানুষ। মায়াদয়াহীন নিষ্ঠুর মানুষ।

ঘটনার শুরু হয় সেই অভিশপ্ত রাতের পর থেকে।যেরাতে খুব ভুলসময়ে,ভুল জায়গায় তার গাড়িটা বিগড়ে গিয়েছিল।একটা খুন হতে দেখেছিল সে,শুধু তাই না,খুনির চোখেও পড়ে গিয়েছিল সে।

ভুলেই গিয়েছিল যে ব্যাপারটা।যদিও প্রায়ই দুঃস্বপ্ন তাকে জাগিয়ে রাখত রাতভর।সেই মগজ ছিটকে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন…..

তারপর হঠাৎ কয়েকদিন আগে,তার অফিসের ফোনে একটা ফোন আসে। ফোনটা তাকে শুধু একটা কথাই বলে,,”অফিসার সোহান,আপনার কাজের তারিফ করতেই হয়,এমনভাবে থাকেন,এমনভাবে নিজের পরিচয় গোপন করে রেখেছেন,যে আমিও বুঝতে পারি নি। ”

জিসান বলেছিল,”আপনি রং নম্বরে ফোন করেছেন,সরি।আমার নাম জিসান মাহমুদ। আমি কোন সোহান কে চিনি না।”

কণ্ঠটা বলেছিল,”হ্যা হ্যা,জিসান মাহমুদ ওরফে বিজয় ভট্ট ওরফে মামুনুর রশিদ ওরফে টনি ভাই ওরফে ব্লা ব্লা ব্লা,,,, অনেক ছদ্মবেশেই তো থাকো অফিসার সোহান,সব ধরে ফেলেছি,,, আমার ছেলেটাকে এভাবে তুই মেরে ফেললি? ”

জিসান দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বলেছিল,”মানে?”

কন্ঠটা বলেছিল,”ছেলে হারানোর ব্যথা বুঝতে চাস? নিরব মাহমুদ,রোল: ১১, ক্লাস ৪,লিটল স্টার স্কুল।খুব শিগগিরি ব্যাথাটা বুঝবি। তোর কাউন্টডাউন শুরু।”

ফোনটা রেখে দিয়েছিল কন্ঠ না। জিসান অনেক চেষ্টা করেছিল কানেক্ট করতে। পারে নি।তারপরের দিন যখন নিরবের টিচার খুন হল,আতকে উঠল জিসান।তখনো বুঝতে পারে নি।তবে পরেরদিন বিকেলে নিরবের মত জার্সি পরা একটা ছেলে খুন হওয়ায় পুরোটাই বুঝে গিয়েছিল সে। পাগলের মত কানেক্ট করার চেষ্টা করেছিল সেই অজানা কন্ঠের সাথে। 

৪ দিন আগে একটা ইমেইল আসল তার কম্পিউটারে। একটা ভিডিও,, জিসান পিস্তল তুলে ক্যামেরার দিকে গুলি ছুড়ছে, স্ক্রিনটা রক্তে ভরে যাচ্ছে। নিচে ছোট একটা নোট,,”কিরে বুঝলি কি ভুলটা হয়েছে? আমার সব এজেন্টের শার্টের বোতামে একটা করে ক্যামেরা থাকে,কোথায় কি হয় সব বোঝা যায়।”

নিচে একটা আই ডি আইডি কার্ডের ছবি,ডিবি পুলিশের অফিসারের একটা কার্ড,লেখা, সোহানুর রহমান,,  ছবির জায়গায় তার নিজের ছবি।

বড় ধরণের একটা ভুল হয়েছিল সে বুঝতে পেরেছিল।তবে সময় ছিল না। শিগগিরি ইয়াসমিনকে ফোন করেছিল,”নিরবকে বাচাও,ওকে মারতে খুনি ভাড়া করা হয়েছে,,,,”

লাইনটা কেটে গিয়েছিল।কেন এমন হল,বুঝতে পারল না সে। মোবাইলের নেটওয়ার্ক বারের জায়গাটা নাই হয়ে গেল। অফিসের জানালা দিয়ে বাইকের উপর দুইটা লোককে দেখল সে,তার দিকে এক দৃষ্টে তাকানো, পিছে বসা লোকটার হাতে একটা যন্ত্র। সেটা চাপ দিতেই অটোমেটিকলি জিসানের ফোনে গান বেজে উঠল।

ভয়ে জিসান মোবাইলটা ছুড়ে ফেলে বাইরে বের হয়ে গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলার পথে নবনির্বাচিত মেয়র কাদের হোসেনের সমাবেশ দেখল। তবে কাদেরের পাশের লোকটাকে দেখে তার গাড়ির স্টিয়ারিং এর কন্ট্রোল হারল সে।

কাদের আর আজিজ দুইজনই একদৃষ্টে তাকাল গাড়ির দিকে,জিসানের সাথে চোখাচোখি হল।

সেই থেকে জিসান পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গাড়িতে করে যেখানেই যায় পিছনে বাইকে করে মানুশ দেখে সে,হয় কাল স্যুট আর গগলস পড়া রোবটের মত দেখতে লোকেরা,,অথবা তরুণ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য। কিন্তু মুখ দেখেই বোঝা যায়,সবার উদ্দেশ্য একই।জিসানের মৃত্যু।

জিসান ব্রিজের গোড়ায় এসে তাই সিদ্ধান্ত নিল,তার নিজের মৃত্যুর মিথ্যা গল্প তৈরি করবে। গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে গিয়ার অন করে দিল সে। অনেক সাধের গাড়িটা একা একা গিয়ে ব্রিজের রেলিং ভেঙে নিজে নদীতে পড়ে গেল।

আশেপাশে আলো জ্বলে উঠল।বাইকের শব্দ। জিসান দৌড়াচ্ছে। দৌড়ে দৌড়ে রকটা ডাস্টবিন এর কাছে এল সে।পালানোর পথ নেই। এক ছুটে ডাস্টবিন এর ভিতর ঢুকে নিজের গায়ের উপর ময়লা ছড়াতে লাগল। নিজের বুকের শব্দকে এত ঘৃণা সে কখনো করে নি।

আশেপাশে মানুষের শব্দ। কে জানি বলছে,”আরে,লোকটা নিজের মৃত্যুগল্প বানাতে চাচ্ছে।আমার চোখের সামনে নিজের গাড়ি ব্রিজ থেকে ফেলে দিল। ও মরে নি। দৌড়ে এখানে এসেছে। খোজ তোরা,পাবি।”

জিসান ডাস্টবিন এর ভিতর বসা। ম্যালেরিয়া রোগীর মত কাপছে।

৬.

ইয়াসমিন আর নিরবকে থানায় রেখে এসে মিঃ উমর ইয়াসমিনের কথা অনুযায়ী হাইওয়েটার কাছে গেল। যেখানে কয়েকমাস আগে খুনটা হয়েছে। পেপার বা টিভিতে এই খুনের ব্যাপারে কোনো টু শব্দও হয় নি। এমনকি মিঃ উমরেরও কোনো ধারণাই ছিল না।

মিঃ উমর সেই পুকুরটা খুজে পেল। অনুমান করল খুনটা কোথায় হতে পারে। ইয়াসমিনের গল্প অনুযায়ী খুনের ঘটনাটা আর জিসানের অবস্থানটা অভিনয় করে দেখতে লাগল।

জিসানের মতে যে খুন হয়েছে সে একজন বডি বিল্ডার,শীতল দৃষ্টি, পেশাদার খুনির মত,দেখেই বোঝা যায় নিষ্ঠুর,প্রচন্ড শক্তিশালী।  কিন্তু যে খুনটা করেছে সে ভুড়িওয়ালা,দেখতে নিরীহ,সাধারণ বাংলাদেশি, কেউ কল্পনাও করতে পারবে না,এ খুন করতে পারে।

কিন্তু ক্লোজ রেঞ্জে মাথায় গুলি করেছে সে।এরমানে নিরীহ মুখের ভাবটা ছদ্মবেশ,সে এখানে এসেছিলই খুন করতে।

খুন হওয়া লোকটাকে দেখে খুবই সাবধানী মনে হয়েছিল। এখানে দেখা করতে এসেছিল সে লোকটার সাথে,তারমানে খুনিটাই তাকে ডেকেছিল,সে খুনিকে না। 

বর্ণনা শুনে খুন হওয়া লোকটাকে ডিফেন্স অথবা ডিফেন্সের ট্রেনিং প্রাপ্ত বলে মনে হয়। শখের বডি বিল্ডাররা মুখের অভিব্যক্তি শীতল রাখে না।তারা মুখকে পুরুষালি এবং নারী আকর্ষী রাখতে চায়। শীতলতা কোনো নারীই পছন্দ করে না।তার মানে লোকটা অবশ্যই সার্চ করেছিল খুনিকে। পিস্তলও পেয়েছিল।তবে সেও বুঝতে পারেনি যে পিস্তল ব্যবহারের সাহস বা শক্তি খুনির আছে।

একটা নিরীহ চেহারার লোক কেন একটা ডিফেন্স (বা তার মত) লোককে আড়ালে ডাকবে,কেন খুন করতে চাইবে? নারীঘটিত বা টাকাঘটিত ব্যপার? নাহ,নারী বাদ,কারণ ওই যে শীতলতা,,টাকা? নাহ,টাকার জন্য কেউ পাওনাদার আড়ালে ডাকে না। আর আগেই তো বোঝা গেছে খুনিই ডেকেছে লোকটাকে।

তবে? ব্লাকমেইলিং? নাহ,ব্লাকমেইলিং হলে ওরকম বডি বিল্ডার কেউ আড়ালে আসত না,ডিল করতে চাইত প্রকাশ্যেই।তাহলে? 

একটা অপশনই খালি থাকে,খুনি লোকটাকে দিয়ে আগেই কিছু করিয়েছে।খুব গোপন কিছু,যা প্রকাশ পেলে ভয়াবহ ক্ষতি। সেই কাজ আবার করানোর কথা বলতেই তাকে এখানে এনেছিল।  তারপর অসতর্ক করে সাক্ষী সরিয়ে দিয়েছিল।

জিসান বলেছে,লোকটা নাকি ফিরে এসেছিল। সেসময় জিসানকে দেখে ফেলে। কেন ফিরে এসেছিল?

খুনের প্লান করে আসা কোনো লোক এমন কিছু সাথে আনে না,যা ঘটনাস্থল এ রয়ে যেতে পারে।আর ধস্তাধস্তি হয় নি,সে কাপড় ছিড়ে হাতে চলে আসবে, তবে?

খুন হওয়া ব্যক্তির কাছেই এমন কিছু একটা ছিল,যা খুনিকে চিনতে পারত। এটা তার মনে পড়েছে কিছুদূর যাবার পর। সেই সেই জিনিসটা সরাতেই এসেছিল।

কি সেই জিনিসটা? টেপ রেকর্ডার? নাহ,এরকম শক্তিশালী লোক লুকিয়ে রেকর্ড করবে না। ব্লাকমেইলিং তো আগেই বাদ দেওয়া হয়েছে।

মিঃ উমরের মাথায় খুন হওয়া ব্যক্তির সম্ভাব্য তিনটি পরিচয় ভেসে উঠল। রেকর্ডার না,,, ক্যামেরা ছিল খুন হওয়া লোকের কাছে,শার্টের বোতামের ভিতরে রাখা ক্যামেরা। এরকম ক্যামেরা থাকে ৩ টাইপের মানুষের কাছে,,, গোয়েন্দা,গুপ্তচর আর পেশাদার খুনিদের এজেন্সি,,,,,

মিঃ উমর গুপ্তচরের কথাটা কেন জানি বাদ দিল। নিজের মনের কথা শুনে। সে সিদ্ধান্ত নিল,প্রিনসের সাহায্যে ডিবি পুলিশের মধ্যে বা বাংলাদেশি প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থার গত কয়েকমাসের মধ্যে কারা নিহত বা গুম হয়েছে,সার্চ করবে।

৭.

সাব ইন্সপেক্টর প্রিন্স কথা বলার চেষ্টা করছে নিরবের সাথে,পাশে বসা ইয়াসমিন,কথা বলছে না নীরব। পাশের টেবিলে বসে মিঃ উমর প্রিন্সের দেওয়া ডাটা ঘাটছে, ডিবি পুলিশ আর লাইসেন্স ধারী গোয়েন্দা সংস্থার খুন আর গুম হওয়া সদস্য।

নাহ,অনেক খুজে দেখল,এমন কেউই নেই। সুতরাং মিঃ উমর সিদ্ধান্তে আসল,খুন হওয়া লোকটা একজন পেশাদার খুনি ছিল। এবং একটা এজেন্সির সাথে যুক্ত ছিল। এজন্যই লাশের অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি। এসব এজেন্সিগুলো মনিটর করে,তার কোন কর্মী কেমন আছে,বেচে আছে না মরে গেছে,মরে গেলে এজেন্সির গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার একটা ভয় থাকে।তাই কোনো কর্মী মারা গেলে তারাই সরিয়ে নেয় লাশ।

এখন প্রশ্ন হল,এজেন্সির কর্মীকে খুন হতে দেখার অপরাধে কারো ছেলের পিছনে কে  লাগবে? দুইটা প্রাইভেট হিটম্যান এজেন্সি কখনোই এক শহর তো দূর,এক বিভাগেও হয় না। তাহলে খুনি লোকটাকে খুন করবার পর,সাক্ষীকে খুন করতে আবার পেশাদার খুনি একই সংস্থা থেকে ভাড়া করবার দুঃসাহস দেখাবে না।এটা হাস্যকর।

আর পেশাদার খুনি সাক্ষীর ছেলের পিছনে ঘুরবে না।

সাক্ষীর ছেলের পিছে কেন ঘুরছে সে? ছেলের পিছে? ছেলে,,,,  ছেলে,,,,

মিঃ উমর দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রিন্স আর ইয়াসমিন তার দিক তাকাল। প্রিন্স বলল,”কি হয়েছে মিঃ উমর?”

“খুন হওয়া লোকটা একটা পেশাদার খুনি,যেন তেন খুনি না,একটা এজেন্সির খুনি।এজেন্সির খুব উচু পর্যায়ে একটা গডফাদার আছে। খুন হওয়া লোকটা সেই গডফাদারের ছেলে। কোনো কারণে গডফাদার ভাবছে,জিসান খুনটা করেছে।জিসানকে শাস্তি দিতে জিসানের ছেলেকে মারতে লোক পাঠিয়েছে।”

ইয়াসমিন বলল,”জিসান কাউকে খুন করতে পারে না। ও মুরগি জবাইও দিতে পারে না। জীবিত মাছ কখনো বাসায় আনে না। অসম্ভব। ”

মিঃ উমর বলল,,”ছবি,,হ্যা হ্যা,,ছবি।খুনি জিসানের ছবি তুলেছিল। সে খুন হওয়া ব্যাক্তির বোতাম ক্যামেরা খুলতে এসেছিল। গাড়ির নম্বর আর ছবি দেখে জিসান এর পরিচয় পায় সে। আরো ছবি কালেক্ট করে সেই ক্যামেরার ফুটেজে জিসানের ছবি ফটোশপ করে দেয়। তারপর টেপটা কোনোভাবে পাটগায় সেই গডফাদারের কাছে।”

প্রিন্স বলল,”অসাধারণ ”

ইয়াসমিন হাউমাউ করে কেদে দিল।” কি সমস্যার মধ্যে পড়লাম বলেন তো?”

মিঃ উমর বলল,”আপনি তো জিসানের অফিসে যেতে পারেন নি। চলেন তো ওর অফিসে গিয়ে একটু খোজ নিই।”

ওরা সবাই জিসানের অফিসের দিক রওয়ানা করল। পথিমধ্যে পুলিশের গাড়িটা নির্জন রাস্তায় চলে আসল। 

হঠাৎ কোত্থেকে একটা গাড়ি এসে ধাম ক্রে পুলিশের গাড়িটায় আঘাত করল।

প্রিন্স গাড়ি চালানো অবস্থায়উ একটা গালি দিল। গাড়ি থামাতে চাইল। মিঃ উমর বাধা দিল,তার দৃষ্টি এখনো রিয়ারভিউ মিররে।

গাড়িটা আবার আসল,আবার একটা ধাক্কা দিতে। প্রিন্স গাড়ির গতি কমাল। শা করে পাশের গাড়ি সামনে চলে এল। তারপর ইউটার্ন নিয়ে ঘুরে মুখোমুখি হয়ে পিছাতে লাগল। মিঃ উমর আর প্রিন্স রিভলভার বের করল। মিঃ উমর ইয়াসমিনকে বলল,”নিরবকে নিয়ে নিচু হন।”

সামনের গাড়ি থেমে গেল।প্রিন্সও ব্রেক করল।উমর আর প্রিন্স পিস্তল হাতে গাড়ি থেকে বের হল। এগোতে লাগল। গাড়ির দরজার কাছে এল। প্রিন্স বলল,”একটু ফাতরামি করার চেষ্টা করবি কি জানে শেষ কইরা দিমু।,আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নাম,নাম!!!”

গাড়ির দরজা খুলে গেল। একটা মেয়ে গাড়ির ভিতর থেকে নামল।আপাদমস্তক কাপছে সে। প্রিন্স হা করে রইল।

মিঃ উমর বলল,”একাজটা কেন করলেন?”

মেয়েটা বলল,”ওই লোকটা বলেছে,বলেছে যেন আপনাদের গাড়ি থেকে নামাই?”

 “কোন লোকটা?”

মেয়েটা আঙ্গুল তুলে বলল,,”ওই,ওই যে ওই লোকটা।”

বব হাওয়ার্ড হাটতে হাটতেই রিভলভার তাক করে গুলি ছুড়ল। প্রিন্স আর উমর লাফিয়ে সরে গেল। গুলি লাগল মেয়েটার মাথায়।

 গুলি থেকে বাচতে উমর আর প্রিন্স মেয়েটার গাড়ির দরজা খুলে আড়ালে গেল।

এই ফাকে পুলিশের জিপের পিছনের ভাগ খুলে বব ইয়াসমিন আর নিরবকে বের করল।

নিরব ভয়ংকর হিস্টিরিয়াগ্রস্থের মত সারা শরীর কাপিয়ে চিৎকার দিল। সাথে সাথে ববের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা গেল। তার মুখের শীতলতা সরে গিয়ে সেখানে তীব্র ঘৃণা, আর বিরক্তি ফুটে উঠল,এই ফাকে  উমার  মেয়েটার গাড়িতে উঠে গেল। 

প্রিন্সও সে কাজটা করতে গেল। তখনি  সৎবিৎ ফিরে পেয়ে বব প্রিন্সের দিক গুলি ছুড়ল। প্রিন্সের হাতে বিধল গুলি।

উমর এক্সেলারেটরে চাপ দিল। গাড়ি গিয়ে ববকে ধাক্কা দিল। বব ছিটকে গেল না। গাড়ির ইঞ্জিন আকড়ে ধরে রইল। তীব্র দৃষ্টি দিয়ে উমরকে দেখতে লাগল। এক ঘুষি দিয়ে গাড়ির সামনের কাজ ফাটিয়ে দিল। উমার ফাটাকাচের পিছ থেকে কিছুই দেখতে পারল না। 

প্রিন্স হাত চেপে পা উঠিয়ে কাচে লাথি দিতে লাগল। কাচ খসে পড়ল। তখনি দেখা গেল একটা ট্রাক সামনে,কোনভাবে টার্ন নিয়ে উমর গাড়ি বাচাল। তারপর ফিরে চলল পিছে। 

বব এখনো রাস্তায় পড়া। উমর ভাবল ওকে চাপা দিবে কিনা। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবার আগেই বব রাস্তা ছেড়ে দিল। 

পুলিশের গাড়ির কাছে আসতেই ব্যাক ডোর খুলে দিল উমর। নিরব আর ইয়াসমিন কাপতে কাপতে ঢুকল ভিতরে। উমার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল।

পিছে যতদূর সম্ভব বব গাড়ির পিছে দৌড়াল। দৃষ্টি মিঃ উমরের দিক।

৮. 

প্রিন্সকে  হাসপাতালে রেখে ইয়াসমিন আর নিরবকে নিয়েই জিসানের অফিসের দিকে গেল মিঃ উমর। যা দেখেছে,তারপর  ইয়াসমিনদের আর চোখের আড়াল করতে সাহস হচ্ছে না।

মনের মধ্যে একটু ভয় যে খুনিটা হয়ত বুঝতে পেরে জিসানের অফিসে আগেই যাবে। ও তো খোজ নিয়েছে। এই রাস্তা যে জিসানের অফিসে যায়,তা সে জানবে। কিন্তু  উমার ভাবল,গাড়ির যে ধাক্কা সে খেয়েছে,ঘন্টার ভিতরে সে আবার একশনে নামবে না।

উমাররা জিসানের অফিসে গেল। অফিসের সবাই স্বাভাবিক। দুই একজন ইয়াসমিনকে জিজ্ঞেস করল,”ভাবি,জিসান ভাই কি ছুটি নিল?” “আপনি হঠাৎ এখানে?” “সে কি এই অবস্থা কেন আপনার?”

কারো কথার ভ্রুক্ষেপ না করে ওরা জিসানের অফিসে গেল।জিসানের কম্পিউটার অফ করা হয়নি। লক হয়ে গেছে। পাসওয়ার্ড হল “নিরব”।  লক খুলতেই একটা ভিডিও,জিসান ক্যামেরার দিক ফিরে গুলি করছে।

ইয়াসমিন সেটা দেখেই মুখে হাত দিল। মিঃ উমার ভ্রু কোচকাল। ভাল করে ভিডিওটা দেখল। নোট টাও পড়ল।

ডিবির আইডি টাও দেখল।গোয়েন্দার দক্ষ চোখ সহজেই বুঝে গেল এটা ফেইক। তবে গডফাদার কেন বুঝল না?

উত্তর জানে উমর, শোক,,পুত্রশোক।

ফটোশপটা বারবার দেখে সে। ভিডিওটা বিভিন্ন এঙ্গেল করে দেখে।মনে হচ্ছে এটা কোন অ্যাপ দিয়ে করা। খুনির একটা ভুল।

ফটোশপ অ্যাপটার ডিটেইলস ভিডিওর অ্যাঙ্গেল দেখে বের করল উমর। বৈশিষ্ট্য গুলো গুগলে সার্চ দিল সে। অ্যাপটা বাংলাদেশের তৈরি। এবং খুবই নতুন অ্যাপ,এখনো বাজারে আসে নি। বুয়েটের এক ছাত্রের বানানো। পৃষ্ঠপোষক কাদের হোসেন। মেয়র নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সেক্টরে টাকা দেয় সে। একটা ভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে দেওয়া হয়।

অ্যাপটার ইউজার বর্তমানে মাত্র দুইজন, যে বানিয়েছে সে আর মেয়র কাদের হোসেনের বড় ভাই আজিজ হোসেন।

আজিজ হোসেনের ছবি সার্চ দিল উমর। হ্যা,,একদম বর্ণনার সাথে মিলে যায় চেহারা। নিরীহ,ভূড়িওয়ালা,সম্ভ্রান্ত, ভদ্র চেহারা।

“মিসেস ইয়াসমিন,আমি খুনিকে ধরে ফেলেছি।”

এদিকে হাসপাতালে একটা মুমুর্ষু রোগী এসে ভর্তি হল। এক লোক সারারাত ডাস্টবিনের ভিতর পড়ে ছিল। সকালে এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। লোকটার গায়ে প্রচন্ড জ্বর।আর বিভিন্ন কাটাছেড়া।

প্রিন্সের পাশের বেডেই শোয়ানো হল তাকে। প্রিন্স একবার বাম দিকে তাকাল। তারপর ব্যান্ডেজ করা হাত নিয়েই লাফিয়ে উঠল। “জিসান? ইয়াসমিনের স্বামী জিসান? নিরবের বাবা?”

জিসান তড়িঘড়ি করে উঠে বসল,ভীতু চাহনি।প্রিন্স বলল,”আমি সাম ইন্সপেক্টর প্রিন্স মাহমুদ,,আপনার স্ত্রী ও ছেলে আমাদের জিম্মায় আছে।”

৯.

“আমি আসতেছি,জান। আসতেছি আমি। তোমাকে দেখব।”   মিঃ উমরের ফোনে ইয়াসমিন কেদে কেদে তার স্বামীকে এই কথাগুলো বলল। ওপাশ থেকে প্রিন্সের ফওনে কথা বলতে বলতে জিসান কাদে।

নিরব এই প্রথম কথা বলল,ফোনের কাছে গিয়ে বলল,”বাবা বাবা”

ফোন কেটে দিল ইয়াসমিন। মঃ উমরকে বলল,”তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চলুন আমাদের, উমর ভাই।”

মিঃ উমর এর মেরুদন্ড শীতল হয়ে গেছে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে সে। বলল,”অফিসের লোকগুলো কোথায় গেল?”

ইয়াসমিন বলল,”মানে? ”

উমর বলল,”বাইরে একটা শব্দ নেই”

সারা অফিসের কারেন্ট চলে গেল। নিকষ কালো অন্ধকার,,,,

মিস্টার উমর রিভলভার বের করল। ইয়াসমিনকে বলল,”আমার কাছাকাছি থাকেন।”

ইয়াসমিন অন্ধকারে কিছু দেখছে না। ওর বুকটা বড্ড ভার গয়ে গেল হঠাৎ। বুঝতে পারল কিছু একটা।

“উমর ভাই, নিরবকে আপনার কাছে রাখুন।”

উমর বলল,”মানে?”

ইয়াসমিন বলল,,”রাখুন, আপনার কাছেই ও নিরাপদ।”

নিরব ফোপাতে লাগল। উমর কিছু বলল না।ইশারা করল,তাকে অনুসরণ করতে।

হঠাৎ নিরব চিৎকার শুরু করল। অন্ধকার ও নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। উমার নিরব কে কোলে দিয়ে অন্ধের মত ঘুরতে লাগিল,চিৎকার করতে লাগল,”ইয়াসমিন, ইয়াসমিন ”

অন্ধাকারে সাদাসাদা কি একটা যেন শূন্যে ঘুরতে ঘুরতে উমারের কাছে উড়ে আস্তে লাগল। উমার বুঝতে পারল ওটা কি। নিরবকে লোকে নিয়ে লাফ দিয়ে নিচে ঝুকল।

একটা গুলির আওয়াজ,আর সাদা পেট্রলের ডিব্বাটা বিস্ফোরিত হয়ে শূন্যে আগুন ছড়িয়ে দিল। নিরবকে কোলে চেপে বেরোবার আগে এক পলকের জন্য বব হাওয়ার্ডের অইশাচের মত মূর্তিটা দেখতে পেল সে,,আলো আধারীতে সে যেন সবচেয়ে ভয়ংকর গল্পের কোন চরিত্র,,, হাতে একটা ছুরি,,,, রক্ত পড়ছে বেয়ে বেয়ে,,,,

পাশে ইয়াসমিন এর গলা কাটা হা করা দেহ।

                          *

মিঃ উমর শেষ কোন জানাযায় কবে শরীক হয়েছিল ভুলে গেছে।হয়ত ছোটবেলায় তার বাবা মা যখন একসাথে রোড এক্সিডেন্ট এ মারা যায় তখন। আচ্ছা,নাইজেরিয়ায় কি ও কখনো জানাজায় গিয়েছিল?

ইয়াসমিনের জানাযায় এসে সেজন্যই হয়ত প্রচমড দুঃখে কান্না চলে আসল মিঃ উমরের চোখে। মেয়েটা স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে বাঁচতে চেয়েছিল,উমারের কাছে আশ্রয় চেয়েছিল।ওর ছেলেটাকে বাচাতে বলেছিল,অপহরণকারীদের কাছ থেকে বাচ্চাদের বাচিয়ে এনে যেমন উমর তাদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিত,সেভাবেই চেয়েছিল নিরবকে আকড়ে ধরতে।সারাজীবন ছেলেকে নিয়ে বাঁচতে। 

তার ছেলে তার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে ওর মায়ের খাটিয়ার দুক তাকিয়ে আছে। জিসান অঝোরে কাদছে।

প্রিন্স জানাযা শেষে ওদের সাথে কবরস্থানে গেল না। থানায় চলে গেল আহত হাত নিয়ে। উমর পুরোটা সময়ই ওদের স্বামী স্ত্রী আর সন্তান, ৩ জনের পরিবারটার সাথে ছিল। ৩ জন হয়ে পরিবারটার শেষ যাত্রায়।

ইয়াসমিনের কবরের প্রথম মাটিটা যখন নিরব মুঠো করে ঢালে।উমরের কানের ভিতর রক্তস্রোত এর শব্দ আরো জোরে বাজতে থাকে। পরিবারটা ভাঙার জন্য অনেককে চড়া মূল্য দিতে হবে। বাচ্চাটাকে এতিম করার ফল অনেককে পেতে হবে।

১০.

কাদের হোসেনের ড্রয়িংরুম। আজিজ আর কাদের দুইভাই বসা পাশাপাশি।  পেপার পড়তেছে তারা। মুখ দুটো হা করা।

মিঃ উমর দৈনিক আমাদের সমাজে প্রতিবেদন লিখেছে,অনুমাননির্ভর লেখা,কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।

আজিজ হোসেনকে একটা খুনের জন্য সরাসরি দোষারোপ করা হল। খুনের বর্ণনা দেওয়া হল। জিসান মাহমুদের কথা বলা হল। তার স্ত্রী,আর বাচ্চার কথা বলা হল।ভয়ংকর পেশাদার খুনিটার কথা বলা হল।

সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হল। আজিজ হসেনের মত ভদ্রলোককে খুন বলে এ কেমন নিউজ করা হল? যদিও এখানে খুন হওয়া লোকেরও নাম নেই।লাশের কথাও বলা নেই। 

ফেসবুকে মানুষ বলতে লাগল,,খোড়া গোয়েন্দার মাথাটাও এত অল্প বয়সে গেল রে।

তবে মিঃ উমর জানে সে কেন প্রতিবেদনটা লিখেছে।প্রতিবেদনটার মাথামুণ্ডু সারা বাংলাদেশের কেউই বুঝবে না।বুঝবে কেবল তিনজন,কাদের,আজিজ,আর সেই গডফাদার,যার অঙ্গুলি হেলনেই এতকিছু হল।

এই গডফাদারকে বের করতেই উমরের এই প্রতিবেদনটা লেখা। “আজিজ হোসেন কোনো একটা লোককে দিয়ে কিছু কাজ করায়,তারপর সাক্ষী মুছতে তাকে মেরে ফেলে,একজন দেখে ফেলে,তার ছবি তুলে আর খুন হওয়া মানুষের গোপন ক্যামেরা ফটোশপ করে একীভূত করে সেইফ জোনে থাকে। যাতে কখনো এই খুনের কথা প্রকাশ পেলে দোষ আরেকজনের ঘাড়ে দেওয়া যায়। তবে আজিজ জানত না,যাজে সে খুন করছে,সে দলের মাথা না,দলের মাথা তার বাবা,গডফাদার, এই রহস্যময় গডফাদারের পরিচয় পেয়ে আজিজ আতংকিত হয়ে বেনামে ফটোশপটা তাকে পাঠিয়ে দেয়। গডফাদার ক্ষেপে গিয়ে,নিরীহ একটা লোকের পরিবার ধ্বংস করতে খুনি পাঠায়।”

প্রতিবেদনের মূল কথা এটা।এখন সময়ের অপেক্ষা,গডফাদার টোপ গেলে কিনা।

প্রিন্স মাহমুদ পুলিশ নিয়ে দিনরাত ঘিরে আসে মেয়রের বাড়ি।

স্থানীয় এম পি,মহিউদ্দিন খান মেয়রের সাথে দেখা করতে আসেন। মিঃ উমর এটা শুনে এম পির কার্যালয় এর কম্পিউটার হ্যাক করে তার আজকের শিডিউল ডাউনলোড করে। না,আজ কোনো শিডিউল নেই।  মেয়রের সাথে ভিজিট এর কোনো কথাই ছিল না।

গডফাদার কে,বুঝে যায় মিঃ উমর। আর তার সাথে আশেপাশে ঘুরতে থাকা অসংখ্য পুলিশ। 

প্রিন্স ফোর্স নিয়ে বাসায় ঢুকতে যেতে মিঃ উমর রিকুয়েস্ট করে এখন না ঢুকতে,এখন ঢুকে গ্রেফতার করলে প্রমাণ ছাড়া এম পি সাহেব ছাড়া পেয়ে যাবে।

মহিউদ্দিন বের হয়ে যায়। তখন খুবই গোপনে সাদা পোশাক পরা পুলিশেরা মহিউদ্দিন ওরফে মিঃ এম কে  গ্রেফতার করে।

গ্রেফতার করে তাকে লুকিয়ে রাখা হয় মিঃ উমরের পরামর্শে। প্রিন্স তাকে বলে,”মিঃ উমর,আপনার সব কথা আমি মেনে চলেছি।কিন্তু আমার কাছে আপনি যদি এভাবে লুকান কিছু,আমি এভাবে অন্ধের মত আর চলব না।”

উমর বলল,”আমার ধারণা মহিউদ্দিন কাদের আর আজিজ দুইভাইকে খুন করতে এসেছিল।কিন্তু সে এমনভাবে খুন করতে চায় নি,যা মানুষ কে আকর্ষণ করে। আমার ধারণা সে  দুই ভাইকে কোনো ভাবে বিষ খাইয়ে এসেছে। এমন কোনো বিষ,যা পোস্ট মর্টেমে পাওয়া যাবে না।এবং মৃত্যুটা হার্ট এটাকের মত লাগবে। যেমন ধরেন, “রাইসিন”।

প্রিন্স বলল,”তাহলে তো আমাদের উচিৎ এখনি দুই ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া।”

উমর প্রিন্সের দিক তাকাল। প্রিন্স বুঝল সব। 

কাদের আর আজিজ দুইদিন পর মারা গেল। এই দুইদিন গোপণে মহিউদ্দিন এম পি কে অমানুষিক নির্যাতন করে সব গোপন কথা জেনে নিল পুলিশ।জেনে নিল কাদের আর আজিজের মেয়র হবার জন্য নিজ দলের প্রার্থীকে খুন করার ঘৃণ্য প্লান। কিভাবে পেশাদার না পাঠিয়ে সাইকো পাঠিয়ে পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছিল সে।আর জেলে পাঠিয়েছিল বিরোধী প্রার্থীকে।

                           *

শিকারী শিকার খুজছে হন্যে হয়ে। সে পেশাদার খুনি,টাকা নিয়েছে,নিয়োগকর্তার কি হল,তার জানার দরকার নেই,টাকা নিয়েছে ১১ বছরের এক বাচ্চাকে কেটে টুকরা টুকরা করার,যন্ত্রণা দিয়ে মারার। বব হাওয়ার্ড এই কাজটা করেই ছাড়বে।

বব হাওয়ার্ড ৩৭ তলা বিল্ডিংটার ছাদে উঠে নতুন করে প্লান করছে। নিরবকে কিভাবে মিঃ উমরের আশ্রয় দেখে বের করে হত্যা করা যায়। মিঃ উমর,,,, কখনো ভাবতেও পারে নি বব,তৃতীয় বিশ্বের এক নাম না জানা দেশে এক খোড়া শয়তান তাকে এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াবে।

“সিরিয়াল কিলারদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে,সাইকো তো,,,মানসিক ভারসাম্যহীন। তা সে যতই পেশাদার হোক। মাথা ঠান্ডা করার একটা বিশেষ জায়গাই তার চাই।”

বব হাওয়ার্ড চকিতে পিছে ফিরল। মিঃ উমর দাঁড়ানো সেখানে। হাতে কিছু পেপারের বান্ডিল।

“গত এক সপ্তাহ ধরে তোমাকে ফলো করে আসছি। প্রতিদিন নিরবকে খুন করার এক একটা নতুন পন্থা বের করতে এখানে আসো তুমি। যদিও কোনোটাতেই সফল হও না। তবে তুমি থামতে জানো না,তাই না?”

বব হাওয়ার্ড ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ে রইল।

“তাহলে আমেরিকার সিনেটরের বাচ্চা ছেলেকে খুন করেই তোমার রাজত্ব শেষ হল মিঃ বব হাওয়ার্ড ওরফে আইজ্যাক মার্টিন ওরফে স্টিভ ম্যাকার্থি? হ্যা,,তোকে ধরে ফেলছি।”

বব বলল,,”আমার পরিচয় এই ছাদ থেকে যাবে না কোথাও। বললা না তুমি আমি প্রতিদিন প্লান করতে এখানে আসি? কিভাবে নিরবকে মারব? শেষ প্লানটা শুনে নাও। আমি তোমাকে খুন করব। তারপর নিরবকে মেরে ওর মায়ের কাছে পাটবিয়ে দেব।”

মিস্টার উমর দৌড়ে গিয়ে ববের পেটে একটা ঘুষি দিল। কিছুই হল না।বব উমরের প্রস্থেটিক পায়ে একটা লাথি দিল। অমনি হাটু থেকে পা টা ছুটে গেল।উমর পড়ে গেল।

বব ছুরি বের করে উমরের কাছে যেতে লাগল। উমর গড়াতে লাগল ছাদে। ববের তাড়াহুড়া নেই। শিকারীর শিকার নিয়ে খেলাটা যত আকর্ষণীয়। শিকারি ততবেশি সম্মানীয়।

গড়াতে গড়াতে উমার ছাদের একদম কোণায় চলে গেল। রেলিং ধরে দাড়াল। বব হেলে দুলে আসতে লাগল। 

উমর এক পায়ে লাফিয়ে সামনে চলে গেল। বব এবার পিছনে ছাদের রেলিং এর কাছে। রেলিংটা ধরে গুনগুন গান গেয়ে উমরের দিকে ফিরল সে, নাহ,এবার গলাটা কেটে দেওয়াই ভাল।

উমর পিছে ফিরে একপায়ে বিশাল একটা লাফ দিয়ে শুন্যে উঁচুনিচু হয়ে ঘুরে গেল। প্রচণ্ড বেগে লাত্থিটা ববের বুকে লাগল। রেলিং এর উপর পেরিয়ে শূন্যে চলে গেল ববের দেহ। 

উমর শুয়ে পড়ে রেলিং নিয়ে নিচে উকি দিল। ববের বিস্মিত মুখের বিশাল দেহটা ৩৭ তলা থেকে নিচে পড়ছে,,,,পড়ছে,,,,পড়ছে।

গল্প ৯৭

​”শাপমোচন”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব ( Raihan Masud Bipu)

১.
অন্ধকার,,, ফাকা চারিদিক,,,,,

রাত ১০ টা বাজে। গত ৭ দিন খটখটে রোদের পর আজ রাতে আকাশে প্রচুর মেঘ জমেছে। এত মেঘ যে রাতে আকাশটা লালচে লাগছে। মাঝে মাঝে আকাশের এমাথা থেকে ওমাথা ফুড়ে চৈত্রের ফাটা মাটির মত বিজলীর ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। পরিবেশটা থমথমে,শূন্য পিচের রাস্তায় মৃদু ঠান্ডা বাতাস বইছে।সে বাতাসে ময়লা কাগজের টুকরাগুলো নড়ছে।

খোড়াতে খোড়াতে একটা লোক আবির্ভূত হল ফাকা রাস্তায়।লোকটা কপাল জুড়ে বেল্ট পড়ানোর মত লালচে ছাপ। গায়ের পোশাক সাদা। পোশাকের সামনে লেখা ৬৬৬। আর পিছনে একটা সিল মারা। “ইন্দ্রজিত পাগলাগারদ ”

লোকটা একটু পর পর পিছু চাইছে।এতক্ষণ বোঝা যায় নি। এখন বোঝা যাচ্ছে আস্তে আস্তে তার সাদা জামা পিঠের কাছে ৫/৬ টা ফোটার মত করে গাঢ় লাল রঙের মত হয়ে আছে।

লোকটা একটা ডাস্টবিনের আড়ালে ময়লার মধ্যে বসে পড়ল। ডাস্টবিন এর ইদুর আর ছুচা লোকটা গায়ে উঠতে লাগল,স্পেশাল্লি পিঠের রক্তের জায়গাটায় বেয়ে ওঠার চেষ্টা করল।তেলাপোকা বেয়ে বেয়ে লোকটার মুখে চলাফেরা করতে লাগল,লোকটা ভাবলেশহীন হয়ে সামনে চেয়ে রইল।

ঠকঠক করে দুইজোড়া বুটের শব্দ হতে লাগল। দুইটা সিকিউরিটির ইউনিফর্ম পরা বিশাল সাইজের লোক খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক চাইতে লাগল। তাদের হাতে দুইটা লাঠি।লাঠির মাথায় একটা পেরেক গাথা,পেরেকসহ লাঠির আগা রক্তাক্ত হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে প্রথম লোকটার পিঠে এগুলোর বাড়ি পড়েছিল।

সিকিউরিটির লোকেরা আশেপাশে চাইতে লাগল।তাদের চোখ দেখে বোঝা গেল,এই লোকদুটোর মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ নেই বললেই চলে।

ডাস্টবিনে বসে থাকা লোকটা ভাবলেশহীন হয়ে তাকিয়ে আছে অনন্তের দিক। হঠাৎ কোত্থেকে এক নেড়িকুকুর ডাস্টবিনে কিছু খেতে এসে লোকটাকে দেখে তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল।সাথে সাথে একটা বজ্রপাত পড়ল। সিকিউরিটির লোকদুটো কুকুরের ডাকের উৎসের দিক ছুটতে লাগল।

প্রচন্ড জোরে বৃষ্টি নামল তখন। এতজোরে সে ৫ হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। কোথায় যেন জোরে একটা বাজ পড়ল। কুকুরটা কেউ কেউ করে কোকিয়ে উঠল।

বিদ্যুতের আলোতে সিকিউরিটি দুজন ডাস্টবিনটা দেখল। ওরা লাঠিটা উচিয়ে সেখানে গেল।

আবার বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা গেল। সিকিউরিটি দুটো খালি ডাস্টবিন এর সামনে একটা কুকুরের লাশ পড়া অবস্থায় দেখল। পেটের নাড়িভুঁড়ি কে যেন টান দিয়ে বের করে ফেলেছে। বুকের হৃদপিণ্ডটা রাস্তায় পড়ে তখনো ধকধক করছে। বৃষ্টির পানিতে রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে।

সিকিউরিটি দুইজনের দুচোখের ভাবলেশহীন নিষ্ঠুরতা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গেল। তার স্থান দখল করল বিস্ময় এবং তাদের চরিত্রের সাথে বেমানান ভয়,,,,না না,, এ হতে পারে না। এটা তো শুধু একটা গুজব।

লোকদুটো এতক্ষণ ধরে যাকে খুজছিল। যার রক্তে তাদের পেরেক লাগানো লাঠির আগা রক্তাক্ত ছিল। সাদা ইউনিফরম পরা ভূতুড়ে এক ছায়া হয়ে সে ওদের পিছে দাড়াল।  বৃষ্টির তীব্রতায় শুধু তার সাদা পোশাকটাই দেখা যাচ্ছে। আর কিছু না।

সিকিউরিটি দুজন একই সাথে ভয়ে পিছনে তাকাল। সাদা পোশাক পড়া লোকটা এক লাথিতে একটা সিকিউরিটির পা মড়াৎ করে ভেঙে দিল।তারপর বুকে একটা লাথি দিল।

লোকটা চিৎকার করে ছিটকে পড়ে গেল। বাকি লোকটা সঙ্গীর অবস্থা দেখে পেরেক গাথা লাঠিটা দিয়ে সাদা পোশাকধারীর দিকে একটা আঘাত করল।কিন্তু মাঝ রাস্তায়ই লাঠিটা ধরে ফেলল সাদা পোশাকধারী। কেড়ে নিল লাঠি।সজোরে বুকের মাঝখানে বসিয়ে দিল সেটা। তারপর নিচে পেট পর্যন্ত কাটতে কাটতে আসল। লোকটা তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে শুয়ে পড়ল।সাদা পোশাক পড়া লোকটা সিকিউরিটির উপর চেপে বসল। তার ক্ষতটা চিরে বড় করে ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিড়তে লাগল।

 পা ভাঙা সিকিউরিটি তার সঙ্গীর অবস্থা দেখে কাপতে কাপতে তার পকেট থেকে একটা ট্রাঙ্কুলাইজিং এজেন্ট বের করল। সেটা একটা সিরিঞ্জে ভরল। 

অন্য সিকিউরিটির শরীরের সব অঙ্গ খুবলে আশেপাশে ছিটিয়ে সেটাকে একটা খোসা বানিয়ে সাদা পোশাকধারী এবার চলে আসল অন্য সিকিউরিটির দিকে। সিকিউরিটি সর্বশক্তি দিয়ে লোকটার পায়ে সিরিঞ্জটা পুশ করে দিল।

এরপরে লোকটা তার ঘাড়টা ভেঙে দিল।

ট্রাঙ্কুলাইজার এর প্রভাবে সাদা পোশাকধারীর মাথা ঝিমঝিম করছে।সে ওই অবস্থায় খোড়াতে খোড়াতে হাটতে লাগল। 

একবাড়ির সামনে এসে তার উঠানে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে।

জানালা দিয়ে একটা মেয়ে বৃষ্টি দেখছিল। লোকটাকে দেখতে পেয়ে সে ভিতরে দৌড়ে গেল। 

কিছুক্ষণ পড় বাড়ির কর্তা,একটা মহিলা,সম্ভবত কর্তার বউ,,আর বৃষ্টি দেখা মেয়েটা ছাতা মাথায় বাইরে এসে লোকটা মৃত কিনা চেক করল। জীবিত বুঝতে পেরে ভিতরে নিয়ে গেল।

বাইরে তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি।

২.

ইন্দ্রজিৎ পাগলাগারদ। প্রায় ১০০ একর জমির উপর তৈরি এই পাগলাগারদ। বেশি না,মাত্র ৮ বছর হল এটা বানানো হয়েছে।

নাম পাগলাগারদ।  কিন্তু দুষ্টুলোকে বলে এটা আসলে পাগলাগারদ না।এক ক্ষমতাশালী লোক তৈরি করেছে এই পাগলাগারদ।  পাগলাগারদ এর ভিতরের অবস্থা সাধারণ বাংলাদেশি মেন্টাল হসপিটালের মত না। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সেট করা বিভিন্ন রুমে। কিন্তু এইসব যন্ত্রপাতির কোনোটাই রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসায় ব্যবহার হয় না। এগুলো নির্যাতনে ব্যবহার করা হয়।

ইন্দ্রজিৎ পাগলাগারদ কোন মেন্টাল ক্লিনিক না। এটা একটা টর্চার সেল।

ক্ষমতাশালী নেতা ইন্দ্রজিৎ ভট্টাচার্যের তৈরি এই পাগলাগারদে তার বিভিন্ন শত্রু বা প্রতিদ্বন্দীকে আনা হয়। এদের কাউকে কাউকে মিথ্যা মামলায় আটকে রিমান্ডে পিটিয়ে আদালতে পাগলামি করতে বাধ্য করানো হয়। তারপর আদালত মানসিক ডাক্তারের ব্যবস্থা করলে হুমকি দিয়ে তাদের কাছ থেকে মিথ্যা রিপোর্ট বের করা হয়। আদালত রায় দেয় লোকটা পাগল হিসেবে। তখন লবিইং করে লোকটাকে আনা হয় এই পাগলাগারদে। তারপর শুরু হয় অত্যাচার।

তবে সুযোগ না পেলে কাউকে সরাতে হলে কিডন্যাপ করে এখানে আনা হয়।

পাগলাগারদটি তৈরির সময় সাংবাদিকদের এক সাক্ষাতকারে ইন্দ্রজিত বলেছিল,”অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আর প্রচন্ড দক্ষ দেশী বিদেশী ডাক্তার দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এ হাসপাতাল।”

এক সাংবাদিক বলেছিল,”স্যার,হঠাৎ পাগলাগারদ কেন বানালেন? দেশে তো জনসংখ্যার তুলনায় হাসপাতাল কম। একটা হাসপাতালই তো করতে পারতেন।”

ইন্দ্রজিত বলেছিল,”আরে দেশ এখন উন্নত,এখন দেশের মানুষের বেশি একটা রোগ হয় না।উন্নত বিশ্বের রোগ বলতেই সব মানসিক রোগ,যেমন,ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তা,, এরকম মানসিক রোগ বর্তমানে এই উন্নত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবান তরুণ তরুণীদের দেশের কাজে নিয়োজিত হতে বাধা দিচ্ছে।তাই আমি অনেক ভেবেচিন্তে এই হাসপাতালটা তৈরি করলাম। শুধু পাগলের চিকিৎসাই না,যেকোনো মানসিক রোগের চিকিৎসা করা হবে এখানে।আর তারপরেই দেশের শারীরিক ভাবে অলরেডি শক্তপোক্ত যুবকরা তাদের মানসিক বাধা এড়িয়ে দেশের কাজে লাগবে,আমাদের দেশ আমেরিকা হবে।”

ইন্দ্রজিত যখন এই কথা বলতেছিল,দেশের বর্তমান মধ্যবয়সীরা আতকে উঠছিল। পাগলাগারদ?  এর ছবি দেখেই ১৫ বছর আগে ইন্দ্রজিত এর দল যখন ক্ষমতায় ছিল,তখন ইন্দ্রজিতের কীর্তি তাদের মনে পড়ে গিয়েছিল।

১৫ বছর আগে,ইন্দ্রজিত এতবড় নেতা ছিল না। ছাত্রসংগঠনের একটা সভাপতি টাইপের কিছু ছিল।

কিন্তু মানুষ তাকে এক নামে চিনত কসাই ইন্দ্র বলে। গুন্ডামি,মাস্তানি সব রাজনৈতিক দলের মানুষই করে।তবে ইন্দ্র ছিল ব্যতিক্রম।  তার এক পৈশাচিক নেশা ছিল, প্রতিপক্ষ বা তার অপছন্দের যে কাউকে বিকলাঙ্গ করার এক ভয়াবহ নেশার কথা সবাই জানত।রাতের আধারে ছিনতাই করলেও মানুষ বুঝতে পারত,এটা কার কাজ। ছিনতাইকারীরা টাকাপয়সা,দামী জিনিস কেড়ে নিলেও মানুষটাকে ছেড়ে দিত।

তবে ইন্দ্রজিত ছিনতাই করলে,ট্রফি হিসেবে যার জিনিস ছিনতাই করেছে,তার একটা কান বা একটা জিভ কেটে নিয়ে আসত।

ইন্দ্রজিতের এই পাগলামি কবে থেকে শুরু হয়েছিল,এযুগের মধ্যবয়সীরা তাও বলে দিতে পারবে, ইন্দ্রজিত আরো একটু কম বয়সে,গুন্ডামি,মাস্তানি,খুন,ছিনতাইয়ের প্রতি কোনো ঝোক দেখাত না। তবে তার তখন অন্য একটা নেশা ছিল,নারীদেহের নেশা। এক একটা অপকর্ম করে মাইকিং করে দুঃসাহস দেখিয়ে সেই মেয়ের নাম,পরিচয় আর ইন্দ্রজিতের কয় নম্বর সেটা ঘোষণা করত সে।

দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার হওয়ায়,দলও কিছু বলত না।

তবে বিভ্রাট হয়,একবার এক এইচ এস সি পরীক্ষার্থীর বাসায় হামলা করার পর। মেয়েটাকে বেশ কয়েকদিন ধরেই ফলো করছিল ইন্দ্রজিত। মেয়েটার কয়েকটা পরিচিত আর বান্ধবীদের কি অবস্থা হয়েছিল মেয়েটা জানত। মেয়ে কেন পুরো সমাজ জানত,ভয়ে কিছু বলত না। মেয়েটা ইন্দ্রজিতের টার্গেটে পড়েছে এটাও এলাকায় প্রচার হয়ে গিয়েছিল। এমন একটা অবস্থা হয়েছিল,মেয়েটাকে দেখলে মানুষ মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর মত আচরণ করত। কারণ সবাই জানত মেয়েটাকে বাচানোর উপায় নেই।

তো নির্দিষ্ট দিন মেয়েটার পরিবারকে ঘরের বাইরে বের করে ভিতরে ঢুকেছিল ইন্দ্রজিত, মেয়েটার বাবা কেদে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তবে মেয়েটার চিথকারের বদলে ইন্দ্রজিতের ভয়াবহ রক্ত হিম করা আর্তনাদ ভেসে এসেছিল। সবাই ঘরে ঢুকে দেখেছিল, মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে একটা ছুরি নিয়ে,বিছানার চাদর দিয়ে নিজের গা ঢাকা। ইন্দ্রজিত মাটিতে তড়পাচ্ছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে,,একটু দূরে পড়ে থাকা মাংসপিণ্ডটা দেখে সবাই বুঝে গেল,ইন্দ্রজিত আর জীবনে মাইকিং করে নাম্বার বলতে পারবে না।

সেই থেকে ইন্দ্রজিত প্রায় কয়েকবছর গায়েব হয়ে গেয়েছিল। এলাকার সবাই দুঃসাহসী মেয়েটাকে মাথায় তুলে নিয়েছিল। তবে মেয়েটার পরিবার এই এলাকায় থাকত্র চাইল না।তারা অন্যত্র চলে গেল।

এর ২ বছর পর ইন্দ্রজিত ফিরে এল। আগের মত হাসি নেই,আনন্দ নেই,মুখ গম্ভীর, তবে এই নিস্তব্ধতা প্রচন্ড ভয়ের।

প্রথম প্রথম এলাকার যেসব মানুষ তাকে ভয় পেত,তারা ইন্দ্রজিত কে হিজরা ইন্দ্র বলে ডাকতে লাগল। আগে পাড়ার মেয়েরা ওর চোখে পড়ার ভয়ে  ঘরে নিজের রুমে লুকিয়ে থাকত,তারা ইন্দ্রের সামনে গিয়ে কোমড় দুলিয়ে হেটে,চোখের বাকা দৃষ্টি দিত।

তবে,ইন্দ্রজিতের আগের নেশাটা বদলে কি নতুন নেশা তাকে পেয়ে বসেছে,এটা টের পেতে বেশি বাকি রইল না। 

কয়েকদিন পর ইন্দ্রজিতের দল,একটা ব্রিজ তৈরির টাকা মেরে দেওয়ায়,সেই টাকার হিসেব জনগণ কে দিতে হবে বলে, উলটা জনগণকে ভুংচুং বুঝিয়ে,চেতনা দেখিয়ে দেশের তরে টাকা দানের প্রকল্প চালু করেনেই সুযোগে তৃণমূল থেকে লুট লাগে। এলাকায় এলাকায় কর্মীরা চাদাবাজি শুরু করে।

ইন্দ্রজিতও শুরু করে, এক দোকানে যায়,চাদা চায়,দলের চেতনার কথা বলে। দোকানদার ইন্দ্রজিতের চেতনাদন্ডের প্রতি ইঙ্গিত করল,উপস্থিত জনতা হেসে দিল।

দুই হাতের দুই তর্জনী ব্যবহার করে তখনি দোকানদারের চোখ উপড়ে ফেলল ইন্দ্রজিত।  দোকানদার ভয়াবহ চিৎকার করে তড়পাতে লাগল। উপস্থিত মানুষ ভয়াবহ আতংকে দেখল,সেই চিৎকার শুনে দণ্ডহীন ইন্দ্রজিতের মুখের ভঙ্গিটা এক সুখের আবেশে ভরে গেল। যে ভঙ্গিটা নারী পুরুষ একটা বিশেষ সময়ে করে থাকে।

সেই শুরু। বিষয়টা এমনভাবে গড়াল। এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে গেল। একটা জিনিস খেয়াল করা গেল। দন্ড হারাবার পর ইন্দ্রজিত মহিলাদের আঘাত করা তো দূরে থাক,ফিরেও দেখে না। তার সব টার্গেট পুরুষরা। পুরুষদের অঙ্গহানীর চিৎকার তার কাছে মাদকদ্রব্যের সমতুল্য।

তার দল তখন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে,দেশের জেলায় জেলায় টর্চার সেল তৈরি করতে লাগল। মুখে বলা হল,এগুলো নাকি চেতনার শোধনাগার।সরকারের বিরুদ্ধে কেউ একটু উচ্চবাচ্য করলেই তাকে এই শোধনাগার গুলোয় ঢুকিয়ে শোধন করা হত। অত্যাচার করা হত,পিটিয়ে মেরে ফেলা হত। শুধু তাই না,অত্যাচারের সাথে সাথে পরিবার থেকে মুক্তিপণ চাওয়াও হত।

এই ঘটনা দেখে সারা দেশের কেউ সরকারি দলের বিরুদ্ধে টু শব্দও করত না।

ইন্দ্রজিতের এলাকায় একটা টর্চার সেল তৈরি করা হল। তবে পার্থক্য হল,ইন্দ্রজিতের টর্চার সেলে ঢুকতে কারো সরকারের বিরোধী হওয়া লাগত না। ইন্দ্রজিতের নেক নজরে পড়লেই হত।

৫ বছরকে বাড়িয়ে ক্ষমতা পাকা করে সেবার ইন্দ্রজিতের দল, ৯ বছর থেকেছিল। তারপর একটা ঘটনা ঘটেছিল তাদের ক্ষমতায় যাবার ৯ বছর পর।অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক ১৫ বছর আগে। ইন্দ্রজিতের দন্ড হারানোর ৭ বছর পর।

এক বৃদ্ধ লোক, সিলেটের টর্চার সেলের পাশ থেকে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল,”কি যালিম পাঠাইলা আল্লাহ? ”

এই দীর্ঘশ্বাস এক স্থানীয় কর্মী শুনে ফেলেছিল। ফেলেই বুড়া বেটাকে ধরে বলল,”তুই যালিম বললি কারে? আবার বল।”

বুড়া বেটা এত বলে ভুল হয়ে গেছে।কে শোনে কার কথা, তাকে টর্চার সেলে ঢুকিয়ে বলা হল,এই বেটা আমাদের দলকে যালিমের দল বলছে,এই মিথ্যা অপবাদের জন্য এর শাস্তি হওয়া দরকার।নয়ত,এরকম অপবাদ দিয়ে সাধারণ জনগণও দোজাহানের পাপ কামাই করবে।

বুড়া লোকটার বয়সের জন্য শাস্তি একটু কমানো হল, ১০০ টা রডের বাড়ি। বয়স কম হলে ১০০০ টা বরাদ্দ হত।

বুড়া লোকটা ২৩ টা বাড়ি খাওয়ার পরই মরে গেল। এখন শাস্তি তো অপূর্ণ রয়েছে,তাই বুড়া লোকের পাপের শাস্তি পেতে,তার পরিবারের পুরুষদের ডেকে আনা হল,, ইনক্লুডিং ৯ বছরের একটা বাচ্চা ছেলেকে।

এখন বুড়া বলে একশটা রডের বাড়ি শাস্তি ছিল। কিন্তু বুড়ার পরিবারে তো কেউ বুড়া নাই।তাই শাস্তি আবার ১০০০ রডের বাড়ি করা হল। বুড়া ২৩ টা খেয়ে মরেছে। তাই বাকি ৯৭৭ টা পরিবারের বাকি ৪ জন পুরুষ,ইনক্লুডিং ৯ বছরের ছেলেটাকে ভাগ করে দেওয়া হল।

পরিবারটা সেরাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

পরেরদিন ৫ টা লাশ পেল পরিবারের মেয়েরা। তাও ভাল,এটা সিলেট।ইন্দ্রজিতের শহর হলে সেটাও পেত না।

তো সেই ৯ বছরের ছেলের মা,মানে বুড়া বেটার ছেলের বউ,স্বামী আর বাচ্চা হারানোর শোকে পাগল হয়ে গেল।

সেরাতে এক কন্টেইনার কেরোসিন নিয়ে সে টর্চার সেলের সামনে গায়ে আগুণ লাগিয়ে মরে গেল।

এই মৃত্যুটা এতদিনের চেতনায় পিষ্ট জনগণের বিবেকে চুলকানির সৃষ্টি করল। দলে দলে তারা সিলেটের টর্চার সেল ঘিরে ধরে আগুণ লাগিয়ে দিল। পুলিশ এসে,দুই একটা জনগণকে গুলি করে মারলে,জনগণ গিয়ে থানায় আগুন লাগিয়ে দিল। এই সুযোগে,বিরোধী দলের লোকেরা,যাদের জন্যই মূলত সেলগুলো তৈরি ছিল,শহরে ঘুরে ঘুরে সরকারি নেতাদের বাসায় আগুন লাগিয়ে দিল।

আগুনের মত আগুনের খবরও দাবানলের মত ছড়াতে লাগল। সারা দেশে যেসব টর্চার সেলে আগুণ  লাগতে লাগল। সরকারের হতভম্বতার সুযোগে বিরোধী দল তাদের নামিয়ে দিল।

সরকারী দল,সেই থেকে ১৫ বছর গায়েব হয়ে গেল।

যাই হোক,গল্পের টাইটেলে ফিরে আসি। এই যে এতকিছু হল,ইন্দ্রজিতের শহরে কিন্তু কিছুই হল না। ইন্দ্রজিতের ভয়ে এলাকার মানুষ তটস্থ সেখানে। টর্চার সেলে কোনো বিরোধী দলের লোকের চিৎকার শোনা যায় না সেখানে। শোনা যায়,সাধারণ মানুষের অঙ্গ হারানোর ব্যাথা।

যাই হোক,যে মেয়েটা ইন্দ্রজিতের দন্ড কেটে দিয়েছিল।সে স্বামী আর একটা বাচ্চা ছেলে নিয়ে ৭ বছর পর সেই পাড়ায় ফিরে এল। ফিরে এসে দেখল এই অবস্থা, ইন্দ্রজিত নাকি এখন দন্ড হারিয়ে,মানুষ এর শরীর ছুরি দিয়ে পোচিয়ে আনন্দ নেয়।

এটাও শুনল ইন্দ্রজিত মেয়েদের দিক তাকায় না। তার টার্গেট ছেলেরা। এর কারণও বোঝা যায়,যে আনন্দ সে নিতে পারে না,কোনো ছেলেই তা পারবে না।

যাই হোক, এলাকা তো প্রায় পুরুষশূন্য। পুরুষ বলতে কিছু বুড়ো লোক,আর সেই মেয়েটার স্বামী আর ছেলে।

তো ইন্দ্রজিত খবর পেয়ে,সেই স্বামীর সাথে দেখা করতে লোক পাঠাল। তারা রাতের আধারে মেয়েটার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল।

মেয়েটা যখন দেখল,১ ঘন্টায়ও আসছে না। সে তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে টর্চারসেলের দিকে রওনা দিল।

তখন মাত্র তার স্বামীর চোখ উপড়ানো হবে হবে,এই সময় মেয়েটা ভিতরে গেল, ইন্দ্রজিত ঘুরে তাকিয়েই মেয়েটাকে দেখল। সাথে সাথে সাত বছর আগের দৃশ্যটা তার মনে পড়ল। কিভাবে মেয়েটার কাপড় ছিড়ে তাকে বিছানায় ফেলে এগোচ্ছিল যে। নিজের প্যান্টটা খুলেছিল। কিন্তু মেয়েটাকে স্পর্শ করার আগেই,একটা রূপালী ঝলক দেখা গেল। 

সেই প্রচন্ড ব্যাথাটার কথা ইন্দ্রজিতের মনে পড়ে গেল। ভয়াবহ আর্তনাদ করে নিজের চোখ ঢেকে ফেলল সে। দৌড়ে টর্চার সেল থেকে পালিয়ে গেল সে।

ইন্দ্রজিতের এই পুরুষনাশী নেশার কথা জানাজানি হবার পর,দলের কর্মীরা বেশি একটা তার আশেপাশে থাকত না। যারা ছিল,তাদেরকে সেই মেয়েটা আর তার স্বামী সহজেই পরাস্ত করে দিল। বাংলাদেশের শেষ টর্চার সেলটায়ও আগুন লাগল।

এভাবে মেয়েটা দ্বিতীয়বারের মত ইন্দ্রজিতের কবল থেকে এই এলাকাটাকে বাচাল।

তবে ইন্দ্রজিত চলে যাবার পর সব পুরুষ ফিরে এল। এবার কিন্তু মেয়েটাকে কেউ বাহবা দিল না। উলটা মানুষজন তাকে বলল,”৭ বছর আগে,ইন্দ্রজিতকে ওভাবে দন্ডহীন না করে তার কাছে আত্মসমার্পন করলে,এই কয় বছর এতটা অত্যাচার তাদের সহ্য করতে হত না,,,,,”

এলাকাবাসীর তোপে,মেয়েটা তার স্বামী সন্তান নিয়ে এলাকা ছেড়ে বেড়িয়ে গেল। তবে পিছ থেকে কে যেন অভিশাপ দিল,”তোর জন্য গত কয় বছর যে অত্যাচার সহ্য করেছে আমাদের পরিবারের পুরুষরা,তোর ওই বাচ্চা ছেলে যখন বড় হবে,তার চেয়েও ভয়াবহ কষ্ট পাবে,তড়পাবে তোর চোখের সামনে, চিৎকার করে সাহায্য চাইবে, কেউ তোদের সাহায্য করবে না,,,,,”

১৫ বছর পর বিভিন্ন টানাপড়েন এর পর ফিরে এসেছে আবার সেই সরকারি দল। ইন্দ্রজিত ভট্টাচার্যও ফিরে এসেছে। সরকারি দলের ক্ষমতা পাকা করার ইচ্ছাও ফিরে এসেছে।

ও কিসের পাগলাগারদ,এযুগের ছেলেরা না জানলেও ১৫ বছর আগের মানুষেরা জানে। তারা আর এযুগের ছেলেদের মত চেতনায় পূর্ণ হতে পারে না।

৩.

বৃষ্টির রাতে উঠানে পড়ে থাকা সাদা পোশাক পড়া লোকটাকে ঘরে ঢুকাল,বাড়ির তিন লোক। এই বাড়িতে থাকে ৩ জন মানুষ। স্বামী স্ত্রী আর স্ত্রীর ছোটবোন। স্বামী স্ত্রীর যখন বিয়ে হয়েছিল,ছোটবোনের বয়স ছিল ২। স্বামী স্ত্রীর বাচ্চা আর হয় নি। তাই,এই ১৮ বছরের মেয়েটাকে ছোটবোন বা শ্যালিকা না বলে দম্পতিটার মেয়ে বলাই ভাল। এই দুনিয়ায়,এ তিনজনের এই তিনজনই ছাড়া আর কেউ নেই।

লোকটার শরীরে একটু আগে ২ টা মানুষ, আর একটা কুকুরের রক্তের চিহ্ন বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে।

ঘরের ভিতরে যখন লোকটাকে নেওয়া হল। লোকটা অজ্ঞান,তবে শরীর ঠান্ডা,,প্রচন্ড কাপছে।লোকটার বুকটা ধড়ফড় করছে,ঘরের তিনজন বেশ শুনতে পাচ্ছে।

লোকটার গায়ের জামা খোলা হল।একটা তোয়ালে পেচিয়ে প্যান্টও খোলা হল। তার গায়ে অসংখ্য পোড়া,আর পুরনো ক্ষত। শুধু পিছনের কয়েকটা কাটা দাগ,ফুটা ফুটা,,সেগুলো একদম সম্প্রতি।

বাড়ির কর্তা করিম সাহেব লোকটার গা শুকিয়ে গরম করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তার স্ত্রী মিনু কাপড় চোপড় সরিয়ে রাখল,আর মিনুর ছোটবোন,মিলি এটা ওটা এগিয়ে দিতে লাগল।

একটু পর লোকটার শরীর গরম হল, ক্ষতগুলোয় ব্যান্ডেজ করা হল,শ্বাস স্বাভাবিক হল।বুক ধড়ফড় কমে এল। কিন্তু সে অজ্ঞানই থাকল।

তাকে লোক না বলে ছেলেই বলা ভাল। ছেলেটাকে দেখে বোঝা যায়,অনেও সুন্দর এবং বাবা মার অনেক আদরের। তবে,খুব সম্প্রতি তাকে অনেক অত্যাচার করা হয়েছে,শরীর ভেঙে গেছে, অজ্ঞান হয়ে আছে বলে পুরনো চেহারার মিষ্টি ভাবটা ধরা পড়ে দাড়ি গোফের আড়ালে। তবে করিম সাহেব নিশ্চিত, চোখ খুললে তাকে এরকম লাগবে না।

মিনুর চাপা চিৎকারে সংবিৎ ফেরে করিম সাহেবের। পিছনে ফেরে সে।মিনুর হাতে ছেলেটার সাদা শার্ট,পিছনে লেখা “ইন্দ্রজিত পাগলাগারদ “।

করিম আতংকিত হয়ে তাকায় মিনুর দিকে।মিলিও ভয় পায়। তবে করিম আর মিনু চেয়ে ভয়টা আলাদা,সে বলে,”লোকটা পাগল? পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে এসেছে? জিজু,পুলিশে খবর দেওয়া উচিৎ না?”

করিম আর মিনু হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পায়।মিনু বলে,”না না,পুলিশ না।কার বুকের ধন কে জানে। করিম,তুমি একটু বাইরে গিয়ে দেখ,এমন কিছু যাতে না থাকে পড়ে,যাতে ওকে কেউ খুজে পায়।”

মিলি কিছুই বুঝতে পারে না। করিম ছাতা মাথায় দিয়ে বাইরটা খুজতে যায়। একটা ঘড়ি পড়ে থাকতে দেখে যেখানে ছেলেটা পড়েছিল। ঘড়িটা তোলে সে। বোঝার চেষ্টা করে,ঘড়িটা পাগলাগারদ এর কিনা,জি পি এস থাকতে পারে কিনা।

কিন্তু ঘড়িটা বৃষ্টিতে ভিজে একদম নষ্ট হয়ে গেছে। জি পি এস অন থাকলেও এখন সেটা নেই। করিম ঘড়িটা পকেটে ভরে ভিতরে আসে।

ওদিকে মিনু মিলিকে ইন্দ্রজিত ভট্টাচার্যের কিংবদন্তি সম্পর্কে কিছু ধারণা দেবার চেষ্টা করে। মিলি তাও আশ্বস্ত হয় না। একটা পাগলকে শেষমেশ ঘরে জায়গা দিল? 

এদিকে ইন্দ্রজিত ভট্টাচার্য এর বাসায় রাতে ফোন দেওয়া হয়। ইন্দ্রজিত ঘুমাচ্ছিল।ঘুম থেকে ওঠে,, গত ৩ মাস ধরে খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল সে।আসলে পালিয়ে ভারতে গিয়ে মানসিক চিকিৎসা নিয়ে মোটামুটি সুস্থ সে।এতটাই সুস্থ যে,তাকে এবারের সরকারে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক তরুণসমাজ তাকে খুবই পছন্দ করে, দন্ডহীনতাটা একটা গুজব। আধুনিক,মুক্তমনা, ধর্মনিরপেক্ষ এই মন্ত্রীর প্রেমে দেশের লাখো তরুণী হাবুডুবু খায়।

তবে সরকারের ক্ষমতা পাকাপোক্তের প্রধান অস্ত্র ইন্দ্রজিত। তবে এবার আর সরকার শহরে শহরে চেতনা শোধনাগার নামে টর্চার সেলের মত বোকামি করে নি। বিরোধী পক্ষ মাথাচাড়া দিলে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে কোর্টে চালান,এবং মানসিক ভারসাম্যহীন প্রমাণ, তারপর ইন্দ্রজিত পাগলাগারদ।  বাকিটা ইন্দ্রজিত বুঝবে,, গত ১৫ বছরে যথেষ্ট ম্যাচিওরড সে,নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আছে,আর আছে অঙ্গহীন না করেও বেশ কিছু অত্যাচারের কৌশল। ১৫ বছর বিদেশে পালিয়ে বেশ লাভ হয়েছে তার।

তবে ১৫ বছর আগে সে যে মাত্র একটা মেয়ের মুখ দেখেই চোখ ঢেকে পালিয়েছিল,সেই বীরত্বের কথা কেউ জানে না। জানলে ১৫ বছর আগেই তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যেত। অস্ত্র হিসেবে,১৫ বছর ভারতে নিয়ে দলটা তাকে গড়ে তুলত না।

তবে ৩ মাস আগেও এত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা ইন্দ্রজিত দুঃস্বপ্নের মধ্যে ২২ বছর আগের দন্ড হারানোর ঘটনা দেখত,আর দেখত,সেই মেয়েটার মুখ।

রাতে ঘুম ভেঙে নিজেকে আবার নিয়ন্ত্রণ করতে বেশ কষ্ট হত তার।  তবে ৩ মাস আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল,যা তার জীবন বদলে দিল।মন থেকে ভয়ডর দূর করে দিয়েছিল।

রনক রহমান।হ্যা,ছেলেটার নাম রনক রহমান। পুলিশ হত্যার দায়ে তাকে গ্রেফতার  করে কোর্টে উঠানো হয়েছিল। ভুয়া কথা,ছেলেটাকে দেখলেই বোঝা যেত,মাছিও মারতে পারে না। আসলে যাদের কোর্টে এনে মানসিক ভারসাম্যহীন ঘোষনা দেওয়া হয়,তাদের কেউই কখনো মুরগি জবাইও দেয় নি।

ইন্দ্রজিত খোজ খবর রাখে না সব। তাকে মন্ত্রী বানানো হয়েছে,তবে এমন একটা সেক্টরের।যেখানে কোনো কাজ নেই তেমন। ইন্দ্রজিতের মূলকাজটা কিন্তু আরো বেশি শক্ত,মানসিক ভারসাম্যহীন বলে যাদেরকে পাগলাগারদে পাঠানো হবে তাদেরকে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করা। এটার গুরুত্ব আছে,সাধারণত সেসব মানুষকেই এভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে এখানে পাঠানো হয়,যাদের কাছে এমন তথ্য আছে,যা দিয়ে সরকারের ঝামেলার ভয় আছে।

যাই হোক,এরকম একটা কোনো কারণেই হয়ত রনক রহমানকে এই পাগলাগারদে পাঠানো হয়েছিল।যতদূর মনে পড়ে,ছেলেটার বাবা একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিল। ভ্রাম্যমাণ কোর্টের,ভেজাল খাদ্য দখল করে জরিমানা করত আর জেল দিত। 

তবে একটা অভিযানে একটা বেশ বড় হোটেলকে জরিমানা করা হয়। হোটেলটা ছিল সরকারি দলের এক নেতার। ছোটখাটো হোটেল না। ফাইভ স্টার হোটেল।বিদেশীরাও এসে উঠত। সেখানে এক বাংলাদেশি পরিবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে যাবার পর অভিযোগ করে। সেই নেতা অনেও করে বলার চেষ্টা করে,বাঙালির পচা পেটে বিদেশি ভাল খাবার সহ্য হয় না।

কিন্তু ভ্রাম্যমাণ কোর্ট রেইড করে। রেইড করে যেটা ধরা পড়ে সেটা বাইরে জানাজানি হলে সর্বনাশ হয়ে যেত। 

এই ইন্দ্রজিত পাগলাগারদের প্লানের আগে,সরকার টর্চার সেলের বদলি হিসেবে বিরোধী নিধনের উপায় হিসেবে এক্সপেরিমেন্ট করতে থাকে। এর মধ্যে লাশ গুমের বড় একটা প্লান বের হয়,কেউ যাতে খুজে না পায়,তাই লাশ টুকরা করে মাঝে মাঝে বড় হোটেলের রান্নাঘরে যাবে। ভাল রাঁধুনির গুনে মসলার ভিড়ে কেউই বুঝতে পারবে না কি খেল।

এটাই ম্যাজিস্ট্রেটের টিম ধরে ফেলে। তবে ধরে ফেলার পর উচ্চবাচ্য করার আগেই,টিমটাকে গুম করে দেওয়া হয়। তবে,বাইরের গেস্টদের না জানিয়ে কাজটা নিঃশব্দে সারতে একটু ঝামেলা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ব্যাপারগুলোর ছবি তুলে,কাকে কাকে যেন পাঠিয়ে দেয়।

তাকে মেরে ফেলার পর মোবাইল হাতড়ে দেখা যায়,ইম্পরট্যান্ট ছবিগুলো তার স্ত্রী আর ছেলের মোবাইলে গেছে।

সেই ছেলে আর স্ত্রী অনেক চেষ্টা করে বিচার পেতে আর অনেক কিছু ফাস করে দিতে। তবে উপযুক্ত জায়গায় ভয়, হুমকি আর ঘুষ প্রদান করে,সেই ছেলে আর তার মাকে দমিয়ে রাখা হয়।

অবশেষে সেই ছেলেফেসবুকে সেই ছবি পোস্ট করে কাহিনীর বর্ণনা দিলে,সাথে সাথে ওৎ পেতে থাকা পুলিশ তার বাসায় গিয়ে গ্রেফতার করে,সাইবার ক্রাইমের মামলায়,ফটোশপ করে অবাস্তব এবং দেখার অযোগ্য জিনিশ পোস্ট করায়।

ছেলের মা কিন্তু তথ্যগুলো রেখে দেয়।উলটা হুমকি দেয়,ছেলের কিছু হলে এবার সেগুলো প্রিন্ট করে পোস্টার করে দেয়ালে দেয়ালে দেবে।।

তখন সাথে সাথে ছেলেটাকে একটা পুলিশ হত্যা মামলায় কোর্টে তোলা হয়।যে পুলিশকে খুনের দায়ে এই কাজটা করা হয়,তাকে ৬ মাসের বৈতনিক ছুটিতে বিদেশ পাঠানো হয়।

ঘুরে ফিরে রনক রহমান ইন্দ্রজিতের পাগলাগারদে আসে। সেই রাতে ছেলেটির মা যখন পাগলের মত কাদতে কাদতে ছেলের পিছু পিছু আসে এটা বুঝতে পেরে যে তার কপালে কি আছে,ইন্দ্রজিত ছেলেটির মাকে দেখে ফেলে।

২২ বছর আগের সেই রূপালী ধারালো ঝলকটা চোখে ভেসে ওঠে,আর অঙ্গহানির বেদনা। 

তবে ইন্দ্রজিত এখন পরিপক্ব।  ভয়ে চিৎকার দেয় না।মেয়েটিকে আটকে রাখে,এমন একটা ঘরে যেটা দিয়ে সে দেখতে পাবে,তার ছেলেকে কি করা হচ্ছে,,,,,

৩ মাস ধরে ছেলেকে ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হয়,রড দিয়ে পেটানো হয়, ডিম দেওয়া হয়,আর ছেলের প্রত্যেকটা চিৎকার তার মাকে শোনানো হয়, শরীরে এক একটা আঘাত,আর তড়পানো তার মাকে দেখানো হয়।

অবশেষে সেদিন, মেয়েটাকে দেখানো হয়,দন্ডহীনতা। ইন্দ্রজিত ২২ বছর আগের প্রতিশোধ নেয়,মেয়েটার ছেলেকে  নপুংসক করে দিয়ে।

মা বা ছেলে কেউই অজ্ঞান হয়ে না। যাতে না হতে পারে,আগেই সেই ওষুধ পুশ করা হয়েছিল।

ছেলেকে সেই অবস্থায় মায়ের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়,বেশ কয়েকদিন,যতদিন না তার মা পাগল হয়ে যায়।

ছেলে অত্যাচারে সত্যিই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যায়।আর মা হয়ে যায়,ছেলেকে অত্যাচারিত হতে দেখে।

ইন্দ্রজিত প্রতিদিন এসে মা আর ছেলেকে দেখে যেত,আর তার এতদিনের দুঃস্বপ্ন আস্তে আস্তে চলে যেতে লাগল।

তবে পাগলাগারদ এর এক বিদেশি ডাক্তার ইন্দ্রজিতকে একবার একটা কথা বলে, ছেলেটাকে যেদিন পাগলাগারদ এ আনা হয়,সেদিন বাইরে ছিল ঝুম বৃষ্টি। এখনো যদি কোনো রাতে ঝুম বৃষ্টি হয়,ছেলেটার কি যেন হয়,প্রতিদিন যন্ত্রনায় যে চিৎকার করে,বৃষ্টির রাতে,সে কেন জানি নিস্তব্ধ হয়ে যায়।নিজের মাকে দেখে, তার মা যদিও সারাদিন হাসে আর কাদে।

ডাক্তারের ধারণা,বৃষ্টির রাতে ছেলেটাকে আরো বেশি নিরাপদ করতে হবে। বেধে রাখতে হবে, এরকম শীতল নিস্তব্ধতা খুবই ভয়ংকর কিছুর লক্ষণ।

আজ রাতে ইন্দ্রজিতের সুখনিদ্রা ভাঙল মাঝরাতের ফোনে।

“স্যার,, ওই মহিলা পাগল না স্যার,পাগলের অভিনয় করত,একদম অরিজিনাল পাগলের মত,নিজের কাপড় নষ্ট করত,নোংরা থাকত,কেউ যাতে বুঝতে না পারে। আজ সুযোগ বুঝে ওর ছেলেকে পাগলাগারদ থেকে বের করে দিয়েছে স্যার। ছেলেটা পালিয়ে গেছে,,,,,”

ইন্দ্রজিত লাফ দিয়ে বিছানা থেকে ওঠে। রাগে তার সারা শরীর কাপতে থাকে,মুখটা বিকৃত হয়ে আসে,,,,,,

৫.

রনক রহমান,করিম,মিনু আর মিলির পরিবারে থাকতে শুরু করে। ওদের সবার ধারণা জন্মে যায়,রনক কথা বলতে পারে না। সব শোনে,বোঝে,কিন্তু কথা বলতে পারে না। এও বোঝে ও পাগল না। ওর নাম কি জিজ্ঞেস করাতে ও শুধু লিখে দিয়েছিল রনক।

এদিকে ছেলেটা সারাদিন চুপ করে অন্ধকার ঘরে বসে থাকলেও করিম আর মিনু কেন জানি মায়ায় পড়ে যায় ছেলেটার। ছেলেটার ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য অনেকটা ফিরে এসেছে।চেহারার মিষ্টতা ফিরে এসেছে।

তবে ছেলেটা কখনো কারো চোখের দিকে তাকায় না। করিম ভাবে,এতে ভালই হল।তার ধারণা ছেলেটা চোখের দিকে তাকালে সেখানে তারা ভয়াবহ কিছু একটা দেখবে। তা না দেখাই ভাল। ১৫ বছর আগে,ইন্দ্রজিত ভট্টাচার্য কি ছিল আর কি করতে পারত,সে ভাল করেই জানে।তার শিকার করা মানুষ, আর কখনওই মানুষ হয়ে ওঠে না।

এদিকে মিলি রনকের প্রতি একটু আলাদা টান অনুভব করে। এটা শুধু মায়া না,একটা আলাদা আকর্ষণ।

এদিকে পাড়ার একটা ছেলে মিলিকে খুবই বিরক্ত করত। ওদের বাসায় পরিবারের তিনজন ছাড়া যে আর কেউ থাকতে পারে তা সে জানত না।

এদিকে মিনু আর করিম একটা কথাও না বলা রনককে অজানা কারণে এতই বিশ্বাস করতে শুরু করল,মিলিকে ওর সাথে একা রেখেই বাইরে যেতে দ্বিধা করত না। এছাড়া,ইন্দ্রজিতের বা তার  দলের শিকার হওয়া মানুষ খারাপ হয় না বলেই তাদের বিশ্বাস।

মিলির কলেজে ছুটি।এই সময়টায় রনকের ইয়াছে বসে অনেক কথাই সে বলত,আস্তে আস্তে রনককে সে ভালবেসেই ফেলে। আরো বেশি আকর্ষণ অনুভব করে।  রনক কোন সাড়া দেয় না। মিলি সেটাকে ভদ্রতা ভাবে,সম্মান ভাবে,কৃতজ্ঞতা ভাবে,তার আকর্ষণ আরো বাড়ে।

এমন একদিন মিলি রনকের সাথে ক্যারাম খেলছিল। রনকও চুপ করে খেলছিল।হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ হয়।

মিলি খুলতে যায়। রনক মিলির একটা চিৎকার তারপর মুখ চাপা দেবার আওয়াজ শোনে। সে ধীরপায়ে এগিয়ে যায়।

যেই ছেলেটা মিলির পিছনে লাগত,সে মিলিকে বাসায় একা ভেবে ঘরে এসেছে,মিলি ধস্তাধস্তি করছে।

রনক পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।ছেলেটা ওকে দেখে মিলিকে ছেড়ে দেয়। তবে চলে যায়না। মিলি রনকের পিছে গিয়ে লুকায়। ওকে ধরে থাকে। ছেলেটা বুঝতে পারে,মিলি রনককে পছন্দ করে,মিলিকে বেশ্যা বলে,ছেলেটা রনকের দুই পায়ের ফাকে লাথি দিয়ে বলে,”এবার দেখি,কত মজা দিতে পারে।”

রনক ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে,ঘাড় বাকা করে কৌতুহল নিয়ে ছেলেটাকে দেখে।

বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। ছেলেটা অবাক হয়ে রনকের দিকে তাকায়। ছেলেটা একটা থাপ্পড় দেয় রনক কে। রনক এক মুহুর্তও পলক ফেলছে না। 

ছেলেটা পালাতে যায়। রনক কলার ধরে ওকে রান্নাঘরে নিয়ে যায়।

এদিকে ছেলেটাকে মিলির বাসায় ঢুকতে দেখে পাশের বাসার আন্টি করিম আর মিনুকে ফোন দিয়েছিল। তারা ছুটে আসে বাসায়।

করিম মিনু আর মিলি অবাক হয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোতে থাকে। রান্নাঘরে হুটোপুটির আওয়াজ। রক্তের বন্যা বইছে। ছেলেটার যন্ত্রনার মোচড়ানি দেখে রনক আশ্চর্য এক মুখভঙ্গি করছে। এই ভঙ্গি সাধারণত নারী পুরুষ বিশেষ মুহুর্তে করে,,,,,

                         *

করিম,মিনু আর মিলি রক্ত মুছতে থাকে সারাদিন। করিম একজন কেমিস্ট।  তারা ছেলেটার লাশ টুকরা করে,এসিড দিয়ে গলিয়ে ফেলে।রনক তার রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে থাকে।

করিম,মিনু আর মিলি বুঝতে পারে,কতটা বিপদে তারা পড়েছে। ইন্দ্রজিতের শিকার বলে মায়া করে রনককে তারা আশ্রয় দিয়েছিল।সেই রনক যে আসলেই একটা মানসিক রোগী সেটা হাড়ে হাড়েই তারা বুঝল।

এদিকে সেই মিলিকে বিরক্ত করা ছেলেটা নিখোঁজ। তাকে শেষ দেখা গিয়েছিল মিলিদের বাসায়। পুলিশ আসে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। ঘর সার্চ করতে। এখন রনক যেহেতু ইন্দ্রজিত পাগলাগারদে ছিল,এটার বাইরে করিম আর কিছু জানে না। এখন ও একটা বদ্ধ উন্মাদও হতে পারে,পাগলাগারদই যেহেতু,রাজনৈতিক কয়েদিই ভরবে এমন তো কোন কথা নেই। কিন্তু পুলিশ রনককে খুজে পেলে যদি চিনতে পারে সত্যিই অনেক বিপদে পড়বে তার পরিবার।

অনেক কৌশলে রনককে পুলিশের পিছনে পিছনে প্রত্যেকটা রুমের বাথরুমে পালা করে লুকিয়ে এযাত্রা বেচে গেল করিম পরিবার।

এদিকে রনককে তো ইন্দ্রজিত খুজছে। সে টের পেল,রনকের পালানোর দিন সিকিউরিটি গার্ডের শেষ কল এসেছিল এই এলাকা থেকে, লাশও পাওয়া গেছিল সেই গার্ডদের।। তবে,তারা যে গার্ড ছিল পাগলাগারদ এর সেই চিহ্ন রাখা হয় নি উচ্চবাচ্য যাতে না হয়। রনকেরই কাজ, বুঝল ইন্দ্রজিত। সুতরাং ওই লাশ পাবার জায়গার আশেপাশে কোথায় থাকতে পারে আন্দাজ করে,সার্চ শুরু করেছিল সে। এর মধ্যে এক বাসায় ঢুকে একটা ছেলের নিখোজ খবর পেয়ে সন্দেহ হয় তার।

রনকের মায়ের গলাটা কেটে ইন্দ্রজিত প্রতিশোধ পূরণ করে।তারপর সেটাকে একটা শপিংব্যাগে ভরে রওনা করে নিজে,সেই বাসার উদ্দেশ্যে,,খুবই গোপনে।

করিমদের বাসায় ঢুকেই রনককে পেয়ে যায় ইন্দ্রজিত।  ওর লোকদেরকে রনককে আশ্রয় দেবার অপরাধে ক্করিম পরিবারকে অত্যাচার করে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়।  আর রনকের পায়ের কাছে শপিং ব্যাগটা ছুড়ে মারে। শপিং ব্যাগ থেকে রনকের মায়ের মাথাটা বের হয়।

রনকের চিৎকার সেই প্রথম করিম,মিনু আর মিলি শোনে। তারপরের ১ ঘন্টা ঠিক কি হল বুঝতে পারল না তারা। শুধু রান্নাঘর থেকে এক দৌড়ে রনকের বটি আনাটা দেখে তারা।

ভয়ে আর্তনাদ করতে করতে একঘণ্টা পর যখন করিম,মিনু আর মিলি দৌড়ে নিজেদের বাসা থেকে পালায়,তখন রক্ত,মগজ,হাত পা আর নাড়িভুঁড়ির ভিড়ে রনক ইন্দ্রজিতের বুকের উপর বসে ওর হৃদপিন্ডটা ছিড়ে,খুবলে খুবলে খাচ্ছিল। মুখে সেই তৃপ্তির বিশেষ ভঙ্গি।

৬.

“ছোট্ট রনককে তার মা জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। তার বাবা পাশে। বাবা বলছে,”আরে ধুর এসব বিশ্বাস কর কেন?”

মা কেদে কেদে বলল,”ওই মহিলাটা আমাকে যা ইচ্ছা বলত,আমার রনককে কেন অভিশাপ দিল,ও কি করেছে?”

বাবা বলল,”পাগল মহিলা কি না কি বলেছে,ভুলে যাও তো।”

মা বলল,,”না,আমার বাবুর গায়ে আমি ফুলের টোকাও লাগতে দেব না।আমার বাবুর কান্না আমি সইতে পারি না। ওকে কেউ আমার সামনে কষ্ট দিতে পারবে না। ”

২২ বছর পর রনক রহমান সেই এলাকায় এসে দাড়াল। যেখানে সব শুরু হয়েছিল।

কিছু প্রবীণ লোক তাকে দেখে বলল,”তোমার চেহারা চেনা চেনা লাগে,তুমি কে?”

রনক একটা শীতল হাসি দিল। যে অভিশাপে আজ তার এই অবস্থা। সেই শাপমোচন এর সময় এসেছে।

টর্চার সেলের ধ্বংসাবশেষ এর কাছে চলে এল রনক। এটাতে আস্তানা গাড়তে হবে। তাকে অভিশাপ দেবার শাস্তি,আর তার নতুন নেশার সমাধান দুটোই করতে হবে।

২২ বছর পর আবার ইন্দ্রজিত ফিরে এল। দুইদিন পরই তা জানতে পারবে এই এলাকার মানুষ। 

গল্প ৯৬

​”নিষিদ্ধ গল্প”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.
“বিপু ভাই,আপনি কেষ্টপুরের ঘটনাটা জানেন?”

আমি বই থেকে মাথাটা তুললাম। কথাটা বলল আমার এক পরিচিত ছোট ভাই,এহসান খান তকী।খুব কৌতুহল নিয়ে আমার দিকে তাকানো সে। আমার শখের লেখালেখির বড় ফ্যান সে। সে জানে আমি বাস্তবের কিছু বিতর্কিত আর প্রচলিত ঘটনা নিয়ে গল্প লিখি, গল্পের সমাপ্তিটা নিজের মত দিয়ে। এজন্য আমার পরিচিত অনেক ফ্যানরাই আমাকে দেশের কোনা কোনা থেকে বিভিন্ন প্লট সংগ্রহ করে দেয়। যা দিয়ে আমি গল্প লিখতে পারি। গল্পের প্রথম অংশ হয় পুরো সত্যটার বিবরণ, শেষটা হয় আমার কল্পনা,যেটা সত্য ঘটনাটায় ঘটাটা প্রকৃতির দাবি হত।

আমাকে কেউ কোনো ঘটনা বলতে চাওয়ার মানেই হল সুন্দর একটা প্লট দিলাম,গল্পটা লিখে ফেলেন। নইলে আমার সাথে আড্ডা দিতে কেউ কনভারসেশন শুরু করে না। আমার সাথে কথা বলার পিছনে সবারই স্বার্থ থাকে,সেটা বাস্তব হক,কিংবা ভার্চুয়াল।

যাই হোক,আমি তকীকে বললাম,”কেষ্টপুর আবার কোথায়?”

তকী খুব আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে ঝুকে বলল,”কেষ্টপুর সুন্দরবনের ঠিক পাশের একটা গ্রাম, হয়ত বাংলাদেশ এর সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম।কারেন্ট তো দূরের কথা,ওই গ্রামে যেতেই টুরিস্ট স্পট হিরণ পয়েন্ট  থেকে ৪০ মাইল নৌকায় ভিতরে গিয়ে দুই মাইল কাদায় হাচড়ে পাচড়ে উঠে ৭ মাইল পায়ে হেটে যেতে হয়। ওই গ্রামের অস্তিত্ব আছে কিনা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না। শহুরে কিছু পর্যটকও জানলে দৈবক্রমে জেনে ফেলে।ধরেন সুন্দরবন ভ্রমণে গেলে বাওয়ালী বা মাওলিদের কাছ থেকে শোনে,তাও সবার কাছ থেকে না। বর্তমানের বাওয়ালি,জেলেদের কাছেও কেষ্টপুর একটা অজপাড়াগা। যদিও তাদের গ্রামেও কারেন্ট নাই।কি বলছি বুঝতে তো পারছেনই।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। ভ্রু কুচকে রইলাম। একটু পর বললাম,”হ্যা,বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য গ্রাম আছে,যারা কখনো  সভ্যতার মুখ দেখে নি,শহরের আলো দেখেনি। মানুষ সেসব মধ্যযুগীয় দরিদ্র গ্রামগুলো সম্পর্কে জানার প্রয়োজন বোধ করে নি কখনো ”

তকী বলল,,”আরো এরকম গ্রাম আছে? আপনি কয়টার নাম জানেন? বলেন তো ভাই।”

আমি বললাম,”আমিই যদি জানতাম,তাহলে তো আমার আগে আরো অসংখ্য লোক জানত,তাহলে তো আর সেই গ্রামগুলো অজানা থাকত না। তবে তোমাকে একটা উদাহরণ দিতে পারি।যেমন সুন্দরবনের কাছে একটা চর আছে,দুবলোর চর। ২০০০ সালের আগে ওটার সম্পর্কে কারো কোন ধারণা ছিল না। যখন খোজ মিলল দেখা গেল,, প্রায় ৩০/৪০ বছর ধরে ওখানে শুটকির ব্যবসা করা হয়,ওখান থেকে শুটকি বানিয়ে অনেক দূরে জেলেদের এসে সাপ্লাই দেওয়া হত,জেলেরা সেগুলো বাজারে নিয়ে আসত। শুটকি কোথা থেকে আসছে কেউ জানত না। পরে জানা গেল এই শুটকি তৈরিতে ৫-১৫ বছরের বাচ্চা ক্রীতদাস ব্যবহার করা হত,,এই যুগে,বাংলাদেশে ক্রীতদাস প্রথা চলত। অথচ আমরা জানতামই না।”

তকী মুখে একটা আশ্চর্য হবার অভিব্যক্তি নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করতেই আমার একটা ফোন এল।

ফোনটা ধরলাম, ফোনের ওপাশ থেকে একজন বলল,”আমি খুলনা কোতোয়ালি থানা থেকে এস আই নজরুল বলছি।আপনি কি রায়হান মাসুদ? বরিশালে থাকেন?”

আমি অবাক হয়ে ভাবলাম পুলিশ কেন কল দিল।বললাম,”হ্যা,কেন?”

এস আই বলল,”আপনি  প্রিন্স মাহমুদ বলে কাউকে চেনেন?”

আমি বললাম,”হ্যা,চিনি,আমার ফ্রেন্ড,কেন?”

এস আই বলল,,”খুলনার শিবসা নদীর তীরে আমরা একটা লাশ পেয়েছি,পানিতে মোবাইল নষ্ট হয়ে গিয়েছে,একটা আইডি থেকে আমরা লাশ শনাক্ত করেছি। তার পকেটে একটা পলিথিনে একটা পাথর আর একটা কাগজ ছিল।কাগজে আপনার নাম আর ফোন নাম্বার ছিল।”

আমি ফোন হাতে বসে পড়লাম। প্রিন্স মারা গেছে? গত পরশুই তো ওর সাথে কথা হল,ও বলছিল ও সুন্দরবন যাবে ঘুরতে। আমি তাই ওকে বলে দিয়েছিলাম “তুই ওখানে গেলে আমার জন্য কিছু লোকাল উপকথা কালেক্ট করিস। গল্পে ঢুকাব।”

আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে। এমন ঘনিষ্ঠ যে আমার মত ইন্ট্রোভার্টেড মানুষ নিজের গল্পের জন্য প্লট চেয়ে পাঠাতাম। যারা লেখালেখি করে তারা বুঝবে একটা গল্পের প্লট একটা লেখকের কাছে কি। প্লট জিনিসটা খুব গোপনীয় রাখতে হয়,এবং যার প্লট যত স্বনির্ভর হয়,সে তত ভাল লেখক। এখন কোনো গল্পের প্লট যদি লেখা প্রকাশের আগেই মানুষের মুখে মুখে ফেরে,সে লেখা মুখ থুবড়ে পড়ে।প্লট কারো সাথে শেয়ারের জিনিস না। 

প্রিন্সের সাথে ঘনিষ্ঠতা বুঝাতে এট্টুকুই যথেষ্ট বলা।বাকিগুলো নাই বা বললাম। কিন্তু প্রিন্স মারা গেল? কিভাবে। নিজের আত্মীয় মরে গেলে যেরকম লাগে সেরকম লাগতে লাগল আমার।

আমাকে চুপ থাকতে দেখে পুলিশ বলল,”আপনি একটু আসতে পারবেন থানায়?”

আমি বললাম,”আমি তো বরিশাল থাকি।আসতে একটু সময় লাগবে,আমি রওনা দিচ্ছি।”

তকী আমার মুখ দেখেই বুঝেছিল দুঃসংবাদ। আমি সংক্ষেপে বলতেই সে বলল,সেও আমার সাথে খুলনায় যাবে। কারণ আমাকে যে কথাটা ও বলতে এসেছিল সেটা সুন্দরবন সম্পর্কিত।ওর এমনিও যাওয়ার কথা। আমার সাথে আগেই যাবে,আমার বন্ধুর মৃত্যুতে ওর পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে।

আমি রওনা দিলাম খুলনার উদ্দেশ্যে। ৫ ঘন্টা লাগল বাসে যেতে। গিয়েই থানায় গেলাম। থানা থেকে বলল,”আমরা ওনার আত্মীয়দের খবরটা দিয়েছি,একটু খোজ করতেই তাদের ঠিকানা পেয়েছি।তারা মর্গে গেছে।আপনিও যান।দেখে এসে আমাদের কিছু কথার উত্তর দেবেন।”

মর্গে গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখলাম।অনেক ভিড় মর্গে।গুরুত্বপূর্ণ কেউ মারা গেলে তার লাশ নিয়ে এলে যেমন ভিড় হয় ঠিক তেমন।আমি জানতাম প্রিন্সকে চেনে না খুলনায় এমন মানুষ খুব কমই আছে। মর্গের আশেপাশে আহাজারির শব্দ। এর মধ্যে কে যে ওর বাসার লোক খুজে পেলাম না।

যাই হোক,আমি ডাক্তার,সো আমার আইডি দেখালে আমাকে যেকোনো মর্গেই ঢুকতে দেবে। তাই আগে ফরেনসিক প্রধানের রুমে গিয়ে তাকে আইডি দেখালাম। তিনি বললেন,”এখনো শুরু করি নি, আপনি আগে গিয়ে একবার দেখে আসেন।যদি আত্মীয় বা বন্ধু হয়ে থাকেন,সহ্য করতে পারবেন বলে মনে হয় না।”

আমিও দেখলাম হ্যা তাই তো। পোস্ট মর্টেমে থাকব না। আগেই গিয়ে একবার দেখে আসি।

ভুল সিদ্ধান্ত। যা দেখলাম,তাও সহ্য করতে পারলাম না।

প্রিন্সের ঘাড়টা ভাঙা। মৃত্যুর পরে ভাঙা না। আগে ভাঙা। ঘাড়ের আকৃতি পালটে গেছে। যেখানে ভেঙেছে,জায়গাটা ফুলে গেছে,আর রঙটা বেগুনী হয়ে গেছে।

চামড়াটা সাদা,আর জায়গায় জায়গায় ফাটা,খোবলানো। খোবলানো দেখে বুঝলাম ওগুলো পানিতে থাকার সময় মাছের কাজ। 

কেউ ঘাড় মটকে মেরে,প্রিন্সকে পানিতে ফেলে দিয়েছে,সারা শরীরে মৃত্যুর আগের কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই।

কিন্তু পানিতে দীর্ঘদিন থাকলে চামড়ার রঙ যেভাবে সাদা হয়,এটা দেখে তো তেমন মনে হচ্ছে না। কেমন যেন লাগতেছে,বুঝতে পারছি না,,,,

এর মধ্যে অটোপসি রুমে ডাক্তার চলে এল।আমাকে বলল,”থাকবা তুমি?”

আমি সংবিৎ ফিরে পেয়ে মাথা নাড়িয়ে বললাম, “না”

ডাক্তার বলল,”আচ্ছা,তুমি আমার অফিসে বস”

আমি তাই করলাম। বাইরে তখনো কান্নার শব্দ আসছে।

“ওহ মাই গড!”   ডাক্তারের আর্তনাদ শোনা গেল।

আমি দৌড়ে গেলাম অটোপসি রুমে।প্রিন্স এর শরীরে ততক্ষণে আই,ওয়াই আর প্রিন্স-লু তিনটা ইনসিশনই দেওয়া হয়ে গেছে।

অস্বাভাবিক চামড়া,আর ভিতরের মাংস। আমি ডাক্তারের দিকে তাকালাম। ডাক্তার হা করে হাফাচ্ছে।

আমি বললাম,”স্যার,জীবিত অবস্থায় মৃত্যুর আগে ঠান্ডায় জমে গেলে এই অবস্থা হয় না লাশের শরীরের? বাংলাদেশে এত ঠান্ডা জায়গা তো নেই। এতো তুষারের দেশের ঘটনা।”

ডাক্তার ইশারায় আঙ্গুল দিয়ে দেখতে বলল।আমি সামনে গেলাম। ইনসিশন গুলো দেখে গল গল করে গলে যাওয়া কিছু বের হচ্ছে,যেন পাম্প করা হচ্ছে ভিতর থেকে। গড়িয়ে গড়িয়ে অটোপসি টেবিলে পড়ছে সেগুলো। তারপর বাকা বাকা অক্ষরে একটা শব্দ সাজিয়ে রেখেছে,, “নিষিদ্ধ। ”

২.

আমি বরিশালে ফিরে এলাম। আমার মৃতবাড়ির আহাজারি পছন্দ না। আহাজারি শুনলে আমি সেই স্বজনদের মধ্যে আপন লোকদের দেখি। আমার আপন লোকেরা এরকম আহাজারি করলে  আমার কেমন লাগতে পারে,এই চিন্তাটা মাথায় চলে আসে।আর সেটাই আমি সহ্য করতে পারি না।

বরিশালে এসেও আমি প্রিন্সের ভাগ্য মেনে নিতে পারছিলাম না। ওকে খুন করা হয়েছে। তবে কিভাবে খুন হল,আসলেই কি দেখলাম আমি,ডাক্তার আর ডোম,সেই অটোপসি টেবিলে,আমি জানি না। এ কিভাবে সম্ভব?  কিভাবে? 

প্রিন্সের সাথে  একটা পলিথিন পাওয়া গিয়েছিল। পলিথিনটা ওর জ্যাকেটের ভিতরের দিক বাধা ছিল। পলিথিনটার ভিতরে কিছু পাথরের টুকরা পাওয়া গিয়েছিল। আমি সেই পাথরের টুকরা গুলো দেখেছিলাম। এর মধ্যে একটা টুকরা নবজাতক শিশুর মাথার মত।

অটোপসি থেকে আমি থানায় গিয়েছিলাম। থানায় পুলিশ যে আমাকে কি জিজ্ঞেস করল,আমিও যে কি উত্তর দিলাম,আমি জানি না। তবে যে উত্তরই দিলাম না কেন,পুলিশ বুঝল,আমি স্বাভাবিক নেই। আমাকে যেতে বলল। আমি কোথাও না দাঁড়িয়ে,সোজা বরিশালের বাসে উঠলাম।

তকী আমাকে পরে ফোন দিল অনেক।আমি রিসিভ করলাম না। আমি সে অবস্থায় ছিলাম না। চোখের সামনে যেসব ঘটতে দেখেছি,সেগুলোর ব্যাখ্যা খুজছি আমি,গল্পে সম্ভব এগুলো,বাস্তবে কেমনে ঘটল….

আমি প্রিন্সকে সুন্দরবন যাবার আগে বলেছিলাম,”দোস্ত আমার জন্য গল্পের প্লট আনিস,ভাল কোন,,”

প্রিন্স নিজেই গল্পের প্লট হয়ে এসেছে। তবে না,,, এত বড় অমানুষ হই নি এখনো,,, মৃত বন্ধুকে নিয়ে গল্প লিখে মানুষকে আনন্দ দিব।

৩ দিন পর,একটু স্বাভাবিক হতেই তকীর ফোন ধরলাম। তকী এই ৩ দিন কেন ফোন ধরি নি,সে নিয়ে কিছুই বলল না।আমাকে বলল,”ভাই,আমি তো সুন্দরবনে আসছি।”

আমি বললাম,”ভাল তো।”

তকী বলল,”ভাই,আমি আজ সন্ধ্যায় কেষ্টপুর যাব। ওখানে যেতে নৌকা লাগে,নৌকার লোকেরা কয়েক মেইল কাদার আগে নামিয়ে দেয়। সেই কাদা পেরিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরতে হয়। অত রাতে ওই কাদায় কুমির উঠে থাকে। তাও মাঝিরা সকালে কেউ ওখানে যাবে না। রাতে যাবে,কারণ কেউ যদি জানতে পারে তারা ওই গ্রামের চৌহদ্দির ভিতর গেছিল,তাহলে তাদের একঘরে করে রাখবে।”

আমি বলল,”এত ঝুকি নিয়ে ওখানে কেনই না যাবা,আজব তো।কি আছে এমন কেষ্টপুরে?একটা দুর্গম,অচেনা,অজানা গ্রাম।তো? এমন তো অনেক গ্রাম আছে।”

তকী বলল,”ভাই, কেষ্টপুরের একটা কাহিনী আছে,কেউ জানে না। জানতে পারে না। সেই গল্প কেষ্টপুরের বাইরে যেতে পারে না। একটা নিষিদ্ধ গল্প।”

তকী এমন ভাবে কথাটা বলল,বিশেষ করে নিষিদ্ধ কথাটা,আমি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলাম।চোখে ভাসতে লাগল,ইনসিশনের ফাক দিয়ে প্রিন্সের গলিত মাংস,অঙ্গের বের হয়ে যাওয়া,বের হয়ে চোখের সামনে একটা শব্দ তৈরি করা,,, নিষিদ্ধ।

আমি তকীকে বললাম,”তুমি ওখানে একা যেও না। দুর্গম গ্রাম,যেখানে কেউ যেতে চায় না,সেখানে কোন অঘটন ঘটে গেলেও কেউ জানবে না।এছাড়া একা একা ওই পর্যন্ত যাবাই বা কেমনে? কাদায় কুমিরের মুখে পড়লেই বা দেখবে কে।”

তকী বলল,”ভাই,আমাকে জায়গাটা কেন জানি টানতেছে,আমাকে যেতেই হবে”

 আমি বললাম,”আচ্ছা তাহলে,আজকে থাক,আমি আসতেছি,দেখি কি করা যায়।”

আবার খুলনার বাস ধরলাম। খুলনায় গিয়ে সুন্দরবনের বাস ধরব।তকী আমাকে সুন্দরবনের একটা রেস্টহাউজের ঠিকানা দিয়েছে। ওখানে গিয়ে উঠব।

বাসে উঠে ফেসবুকে ঢুকলাম। ঢুকতেই প্রিন্সের প্রোফাইল সামনে চলে এল।স্টিল মানুষ ওর টাইমলাইনে লিখছে,ওর জন্য দোয়া করছে।

আমি প্রোফাইলে ঢুকে সেগুলো পড়তে লাগলাম। হাহাকার করে উঠল বুকটা। 

হঠাৎ একটা ছেলের লেখায় দেখলাম,বেশ কিছু কমেন্ট।  ছেলেটা লিখেছে,”কি করলি এটা ভাই?তোর পরিবারের কথা ভাবলি না? তোর এডভেঞ্চার এর কি এতই দরকার ছিল? কেন তুই অজানা অচেনা জায়গায় যেতে এত পাগল হলি?”

ভিতরে ঢুকলাম আমি। কমেন্টে লেখা,”মানে? ও না সুন্দরবনে গিয়েছিল?”.

আবার একজন বলতেছে,”ওকে কেউ খুন করছে শুনছিলাম।  কিন্তু এত বড় শত্রু তো ওর নাই,যে ওকে সুন্দরবনে পিছু নিয়ে খুন করবে।”

পোস্টদাতা সবার নিচে লিখেছে,”শেষ যেদিন ওর সাথে আমার ফোনে কথা হয়,ও আমাকে বলেছিল,কেষ্টপুর নামে নাকি সুন্দরবনের একটা জায়গা আছে,দুর্গম,ওখানের মানুষ নাকি ওই জায়গার নাম শুনলেই দোয়া কালাম পড়ে,আর একদম চুপ হয়ে যায়।অনেক চেষ্টা করে নাকি ও জানিতে পারছিল,ওখানে নাকি একটা কাহিনী আছে,কাহিনীটা নাকি নিষিদ্ধ।  কারো জানতে মানা। যে জানে সে নাকি মারা যায়,আমরা অনেক হাসাহাসি করছিলাম এটা নিয়ে,একবারো মনে হয় নি,এটা এত বড় ইস্যু হবে।”

কমেন্ট এর রিপ্লাইয়ে অনেকেই অনেক কথা বলল,”কি বলেন এসব?” কেউ বলল,”আরে একথা পুলিশকেও বলা হইছে,পুকিশ নাকি সুন্দরবনের থানায় এ ব্যপারে কথা বলছে,যে ওখানে কোনো ক্রিমিনাল ট্রিমিনাল আছে কিনা, সুন্দরবনের থানার ওসি নাকি ওই জায়গার নাম শুনেই একদম চুপ মেরে গেছে।এই নিয়ে  কোনো কথাই বাইরে প্রচার হচ্ছে না,আমরা কাছের কয়েকজনই জানি। খুলনার পুলিশ বলছে,সুন্দরবন থেকে হেল্প না আসলে এর সুরাহা করা সম্ভব না,খুব সম্ভবত গোয়েন্দা ভাড়া করতে হবে।”

বাস চলছে,আর চলছে আমার মাথার চিন্তা গুলো। কেষ্টপুর? কেষ্টপুর,,, কি আছে ওই কেষ্টপুরে? নাহ,যেতেই হবে আবার ওখানে,তকীকে মূলত ওখানে যেতে মানা করতে আমি সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত নিলাম,গিয়েই ছাড়ব কেষ্টপুর।

খুলনায় নেমে কিছু খেয়ে আবার সুন্দরবনের বাসে উঠলাম।কেন জানি বাসটা ফাকা। সব সিট ভরে নাই।আমি সামনের বেশ কয়েকটা খালি সিট রেখে,পিছের কিছু আগের সিটে একা বসে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর পাশে এসে কেউ দাড়াল। আমি তাকালাম,চেহারাটা পরিচিত লাগছে।ছেলেটা আমার দিক তাকিয়ে হাসল। বলল,”আপনি বিপু ভাই না,রায়হান মাসুদ বিপু? লেখালেখি করেন?”

আমি বললাম,”হ্যা”

ছেলেটা বলল,”আমার নাম আদিব।শাহরিয়ার আদিব।আপনার ফেসবুক ফ্রেন্ড আমি।”

আমি হাত মিলালাম।হয়ত আমার ফেসবুকে লেখালেখি দেখে আমার সম্পর্কে ধারণা আছে ছেলেটার। ছেলেটা আমার পাশে না বসে বিপরীত দিকের সিটে আমার দিকে ফিরে বসল।

তারপর বিভিন্ন কথা শুরু করল। আমি উত্তর দিতে লাগলাম। ও বলল,ও নাকি আগে কখনো সুন্দরবন দেখে নি। আমি যখন বললাম,”আমিও আগে কখনো আসি নি সুন্দরবনে।” এটা শুনে সে সত্যিই বিশাল একটা হা করল। বলল,”তাহলে আপনার গল্পে যে সুন্দরবনের বর্ণনা দেওয়া আছে বেশ কয়েক জায়গায়? ”

আমি বললাম,”সেসব বই পড়ে,বা যারা আগে গেছে ওখানে তাদের কথা শুনে।”

আদিব এখনো হা করে মাথা দোলালো।

একটু পর আরেকটা ছেলে সামনে থেকে উঠে পিছে এল। এসেই বলল,”সরি,আপনাদের কিছু কথা কানে যাচ্ছিল আমার, ভাইয়া,আপনাকে এজন্যই আমার চেনা চেনা লাগছিল। ফেসবুকের ছবি থেকে আপনি একদম আলাদা।”

ছেলেটার কণ্ঠ শুনেই বললাম,”তুমি সোহাগ না? ক্লাশ অফ ক্লানসেও আমার ক্লানে তুমি আছ,সেই সোহাগ না? আমার নাম্বার নিছিলা।”

সোহাগ সবকটা দাত বের করে হেসে দিল। সেও অপোজিট পাশের একটা সিটে বসল।আমরা সুন্দরবন যাওয়া পর্যন্ত গল্প করতে লাগলাম। ওদের আগে রেস্ট হাউজ বুকিং ছিল না। তকীকে ফোন দিয়ে আরো দুইটা রুম বুকিং দিতে বললাম। তকী ম্যানেজ করে নিল।

সুন্দরবনে যখন বাস থামল,তখন রাত হয়ে গেছে। আমি,সোহাগ আর আদিব আমাদের লাগেজ নিয়ে রেস্ট হাউজে গেলাম। তকী বারান্দাতে দাঁড়ানো ছিল। সে আমাকে ওয়েলকাম করল। আমি বাকিদের সাথেও ওর পরিচয় করিয়ে দিলাম। সোহাগ আর তকী একই বয়সি,আদিব সবার ছোট। এখনো স্কুলে পড়ে,সামনে এস এস সি।

সেরাতে খাওয়া দাওয়া করে আমরা চারজন বারান্দায় বসে আড্ডা দিলাম। সাথে রেস্ট হাউজের বাবুর্চি, আর ফাইফরমাশ এর ছেলেটাও ছিল। ওদের বাড়ি বেশ দূরে। রেস্ট হাউজে এই যখন রাতে  গেস্ট থাকে না,ওরা বাড়ি যায়,গেস্ট থাকলে ওরা পাহাড়া দেয়,আরেকজন চৌকিদার আছে এখানে, সে রেস্টহাউজের গেটে শীতের কাপড় পরে বসা। বেশ শীত এখানে,কনকনে,অথচ বরিশালে দুপুরে বাইরে বের হলে মনে হয় আগুন লাগিয়ে দিছে কেউ গায়ে।

আদিব গেটের উপরের জায়গাটা লম্বা তারকাটা দিয়ে ঘেরা দেখে বলল,”দেয়াল তো এমনিই অনেক লম্বা,ওগুলো আবার কেন?”

বাবুর্চি বলল,”কয়েকবছর আগে মানুষখেকো একটা বাঘের উৎপাত হয়েছিল এখানে,এর পর থেকে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

সোহাগ বলল,”বাঘ কি ভিতরে এসেছিল?”

ফাইফরমাশ খাটা ছেলেটা আদিবের থেকেও ছোট,তাই সে মুখ ফসকে বলে দিল,”হ স্যার,ওই রুম থেকে একটা লোকরে টেনে নিয়া গেছিল বড়মিয়ায়”

বলাবাহুল্য ওই রুমটা আমার জন্য বুকিং করা হয়েছিল।

আমরা ৪ জনই চোখ বড় করে চেয়ে রইলাম। তকী বলল,”কই,আমাকে তো বলেন নি এসব।”

বাবুর্চি ফাইফরমাশ এর ছেলেটার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে চাইল। 

বাবুর্চি বলল,”না না সাহেব,বাঘ না,বাঘ ভিতরে ঢুকলে পায়ের ছাপ পেতাম। দুইটা কাদামাখা ছাপ ছিল বটে,তবে ওটা বাঘের না,ওটা কিসের,তা জানি না,বেশ বড়।”

তখনো বুঝি নি,বারান্দার একদম কোনায় বসে একটা লোক সিগারেট খাচ্ছিল,লোকটা নড়েচড়ে বসল,এদিক তাকাল। তাকাতেই আমি দেখলাম,এই লোকটা আমাদের বাসে ছিল।

সোহাগ বলল,”কিসের ছাপ চেনেন না মানে?”

বাবুর্চি বলল,”বাদায় বুড়া হইছি সাহেব,সব জন্তুর পায়ের ছাপ চিনি। মানুষের তো সবাই চিনে। ও ছাপ আমি কখনো দেখি নি।”

তকী বলল,”তো মানুষ টাকে টেনে নিয়ে যায় নি? সেসময় পায়ের ছাপ অনুসরণ করেন নি?”

বাবুর্চি বলল,”টেনে নেয় নি তো,,,ঘরে কেবল ও দুটি ছাপই ছিল, আর বিছনার উপর মানুষটার ঘাড় ভাঙা,সাদা,জমাট বাধা ঠান্ডা লাশ।”

এটা শুনে আমি আর বারান্দার ওপাশের লোকটা দুইজনেই দাঁড়িয়ে উঠলাম।

আমরা পরস্পরের দিক তাকালাম। লোকটা ওখান থেকেই বাবুর্চিকে বলল,”কবের ঘটনা?”

বাবুর্চি বলল,” তা ২ বছর তো হইছেই।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,”মামা,কেষ্টপুর সম্পর্কে কি কি জানেন?”

তকী আমাকে ইশারায় খুব করে না না করতেছিল। বাবুর্চি এটা শুনেই  একদম গম্ভীর হয়ে বলল,”শুতে যান সাহেবরা,সব কথা শুনতি হয় না।”

বাবুর্চি চলে গেল। বারান্দার ওপাশের লোকটা আমার দিকে কিছুক্ষণ নাকিয়ে থাকল,তারপর রুমে চলে গেল।

ফাইফরমাশ খাটা ছেলেটা বলল,”জ্যাডার ছাওয়ালরেও বড়মিয়া নিছে,কেষ্টপুরের ওহান তে। তাই জ্যাডায় কিছু কয় নাই।”

আমি বললাম,”তুই জানিস কিছু কেষ্টপুরের ব্যাপারে?”

ছেলেটা বলল,” না সাহেব,মায় কইছে,কেষ্টপুর খারাপ জায়গা,ওখানে যে যায়,তার গায়ে অভিশাপ লাগে,,সে নাকি কখনো ফেরে না,ফিরলেও তারে নিয়ে যায়,,,,”

আদিব ঢোক গিলে বলল,”কে নিয়ে যায়?”

ছেলেটা বলল,”বড়মিয়া।”

ছেলেটা হাই তুলল। বলল,”সাহেব,যাই আমি। বেন্নে উঠা লাগব।”

ছেলেটা চলে গেল। 

সোহাগ বলল,”শীতের রাতে ভূতের গল্প বেশ লাগে। তবে পুরোটা শুনলে ভাল লাগত।”

তকী বলল,”আরে আমি দুইদিন ধরে ওই চৌকিদার বেটা আর বাবুর্চিকে কেষ্টপুরের কথা বলে বলে শেষ।বেটারা কিছুই বলে না। এখন তো কাছে গেলেও এড়িয়ে যায়। এখন বুঝতেচগি,ওদের না জিজ্ঞেস করে এই পিচ্চিরে জিজ্ঞেস করলেই অনেক কিছু বলে দিত।”

আদিব বলল,”আজ আমি একা ঘুমাতে পারব না। ভয় করছে।”

আসলে একা আমিও ঘুমাতে পারতাম না। এস্পেশাল্লি এটা যখন শুনলাম যে আমার রুমেই ঘটনাটা ঘটেছে।লজ্জায় ছোটদেত বলতেও পারি নি। এখন আদিব যখন বলল ওর ভয় করছে,হাফ ছেড়ে বাচলাম। বললাম,”আচ্ছা তুমি আমার রুমে শুইও।”

বাবুর্চি একটা এক্সট্রা চৌকি,আর আদিবের রুমের তোষক এনে আমার বিছানার একদন পাশে বসিয়ে দিল। সিঙ্গেল রুমে গাদাগাদি হয়ে গেল। বিছানার মাঝে ফাক নেই। আদিব শুয়ে পড়ল,আমিও শুলাম। ঘুম সাথে সাথে এল না। গত কয়েকরাতের মত চোখ বুঝলেই প্রিন্সের লাশ থেকে সেই জিনিসগুলো বের হতে দেখলাম, আজ তীব্রভাব্র,,দেখতে দেখতে ঘুম আসল,অথবা অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

স্বপনে ঘাড় ভাঙা সাদা জমাট বাধা শরীরের একটা লোক ভয়ংকর ভঙ্গিতে বেকে বেকে হেটে এল। আমাকে বলল,”কেষ্টপুর যেও না,যেও না।”

                          *

পরেরদিন সকালে বাবুর্চি আমাদের জন্য চা নাস্তা দিয়ে গেল। দুপুরে কি রান্না করবে শুনে গেল। ভাবলাম পাশের রুমের লোকটাকে আমাদের সাথেই খেতে বলব।বাবুর্চিকে ওনার কথা জিজ্ঞেস করতেই মুখ গোমড়া করে বলল,”উনি বের হইছে।”

আমি বললাম,”তা আপনার মুখ গোমড়া করলেন কেন?”

বাবুর্চি বলল,”উনি পুলিশের লোক,আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিল,আমি তো জানি না কিছু। তারপর কেষ্টপুরে কিভাবে যায়,আমাকে জিজ্ঞেস করল। বলতে চাই নি,অনেক কথা শুনিয়ে জানছে।”

আমি ভাবতে লাগলাম,প্রিন্স এর ব্যাপারটার তদন্ত করতে খুলনা থেকে গোয়েন্দা আসার কথা। রটাই কি সেই গোয়েন্দা?

আদিব বলল,”আচ্ছা আপনাদের ওই ছেলেটা যে খালি বড়মিয়া বড়মিয়া করল,বড়মিয়াটা কি?”

আমিই বলে দিলাম,”বড়মিয়া মানে বাঘ,এখানের লোকেরা বড়মিয়া বলে বাঘকে।”

বাবুর্চি আনমনে বলল,,”হ্যা,আমরা তো বাঘকেই বড়মিয়া বলে,তবে আমি জানতাম,ওই ছেলেটা বাঘকে বাঘই বলে,বড়মিয়া কাকে বলছে,আমি জানি না,,,”

 আমরা ৪ জন পরস্পরের দিক তাকালাম। বাবুর্চি চলে গেল। ফাইফরমাশ এর ছেলেটাকে দেখলাম না কোথাও,দেখলে জিজ্ঞেস করতাম।

তকী আমাকে বলল,”ভাই কেষ্টপুরের ব্যাপারটা?”

আমি বললাম,”এত লোকেরা যখন নিষেধ করছে,একবারে যাওয়াটা ঠিক হবে না। এক কাজ করব,আমরা একটা নৌকা ভাড়া করে কেষ্টপুরের দিক সেই কাদার জায়গাটায় যাব। ওখানে  মাঝিকে দাড় করাব। তারপর আমরা টর্চ নিয়ে জায়গাটা পেরোব। কেষ্টপুর খুজে বের করব। কিন্তু ভিতরে ঢুকব না।জায়গাটা প্রদক্ষিণ করব। ওখান থেকে বের হবার সহজ রাস্তা দেখব। শুধু নদীপথই আছে,নাকি অন্য রাস্তাও। সবাই মোবাইলে ম্যাপ বের করে যাব। গিয়ে জায়গা মার্ক করব। তারপর চলে আসব। তারপর আমরা পুলিশকে জায়গার কো-অরডিনেট দিব। বলব যে আমরা যাচ্ছি,আমাদের সাথে আপনারা কেউ যাবেন কিনা,যেহেতু এখানে একটা খুন হয়েছে বলে খুলনায় সন্দেহ করা হচ্ছে। তারপর স্পিডবোটে করে সকালে আসব। দিনে এসে,কাহিনী শুনে দিনে ফেরত যাব।”

সোহাগ আর আদিব বলে,”কেষ্টপুরে যাবেন কেন? আমরা তো ভাবলা আজ সব ট্যুরিস্ট স্পটে যাব।”

আমি বললাম,”তোমরা কয়েদিনের ট্যুরে এসেছ? ”

ওরা বলল,”এক সপ্তাহ,,, ”

আমি বললাম,”এই দুইদিন তাহলে কেষ্টপুরে খরচ করি,বাকি ৫ দিন আমরা ৭ দিনের ঘোরাঘুরি করব নে।”

আদিব বলল,”ভাই,আমি যাব না ওখানে।”

তকী বলল,”তুমি একা আসছ তো,তাইলে থাক রেস্ট হাউজেই।”

আদিব বলল,,”এই ভূতের বাড়ি? না না।”

সোহাগ বলল,”আমারো আগ্রহ হচ্ছে। আমিও যাই তবে। এক্সট্রা ঘোরাও হল।”

এভাবে আমরা ৪ জনই কেষ্টপুর যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।

৩.

সেরাতে তকীর আগে থেকেই ঠিক করা নৌকায় আমরা উঠলাম। মাঝি মুখ ঢেকে রেখেছে। কোনো পরিচিত লোক যাতে তাকে না দেখে। কেষ্টপুরে যাচ্ছে শুনলে একঘরে করে দিবে।

আকাশে আজ ভরা পূর্ণিমা।পূর্ণিমার আলোয় শিবসা নদী চকচক করছে। একটু পরপর জোৎস্নামুগ্ধ নদীর বুক চিরে হাঙরের ডানা দেখা যাচ্ছে। অথবা দেখা যাচ্ছে কুমিরের বড় কাটাওয়ালা পিঠ,একটু পরপর ভুস করে পানি ফুড়ে বের হচ্ছে।

আমরা মোবাইলে ম্যাপ বের করে মার্কিং করতে গেলাম। একসাথে ৪ জনের ৪ কোম্পানির সিমেরই নেটওয়ার্ক চলে গেল।আমরা একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম দুনিয়া থেকে।

মাঝি কাদার পাড়ে নৌকা থামাল। আমি বললাম,”আমরা গ্রামে ঢুকব না, বাইরে থেকে দেখব,কিছু দেখা যায় কিনা। আপনি যাবে না। আমরা ১ ঘন্টার ভিতরে চলে আসব।”

মাঝি বলল,”১ ঘন্টার পরে আসলে কিন্তু আমাকে পাবেন না।”

আমরা কোমড় সমান কাদায় হাচড়ে পাচড়ে আছাড় খেয়ে কেষ্টপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

কাদা পেরুতেই একটা মেঠো পথ। দুইধারে তার বন।

আমি বললাম,”বনটা ঘন অনেক। কেউ আগে পিছে থেক না।পাশাপাশি হাটো। আর পাশের দুইজনকে আকড়ে ধর। বাঘ এলে যেন চারজন দেখে সাহস না পায়। 

তকী একটা ছুরি বের করল। আমরা তাকাতেই বলল,”প্রিন্স ভাইয়ের কথা শুনেই কিনেছি এটা,ঝামেলা হলে,,,”

আমরা হাটলাম। মাঝিকে এক ঘন্টা বলে এসেছি। কিন্তু মনে হচ্ছে দুইঘন্টা হয়ে গেছে। পথই শেষ হচ্ছে না।

আমরা হঠাৎ,, দুম দুম দুম শব্দ পেলাম। আর কিছু মেয়ে মানুষের চিৎকার, গোঙানি,,এসব।

আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ দেখলাম,কে যেন দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে আমাদের দিক। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। তকীর হাতের ছুরিটা বাগিয়ে ধরল।

লোকটা কাছে আসতেই দেখলাম আমাদের রেস্ট হাউজের সেই গোয়েন্দা ভদ্রলোক।

লোকটা আমাদের দেখে পিস্তল বের করল ডান হাতে,বাম হাতে কিব্যেন ধরা। কাছে আসতেই চাদের আলোয় দেখলাম,তার শরীরে লাল লাল ছোপ। রক্ত!

লোকটা বলল,”আমি জানতাম তোমরা আসবা। কালকে তোমাদের কেষ্টপুরের ব্যপারে আগ্রহ দেখেই বুঝেছিলাম। কেষ্টপুরের কথা খুব কম লোকেই জানে,যারা জানে,তার এটা দেখতেই আসে….”

এতক্ষণ পর ওনার বা হাতে  ধরা জিনিসটার দিক আমাদের চোখ গেল। জিনিসটা কি বুঝতে পেরে আমাদের রক্ত হিম হয়ে গেল।

কাল পাথরের মত,আকৃতিটা নবজাতক মানুষের বাচ্চার মত। তবে সারা গায়ে আশ। মুখটা বিকট। চোখ ফোটেনি এখনো। কিন্তু হাত পায়ে এক ইঞ্চি বড় নখ।

আমি হা করে বললাম,”এটা তো পরিচিত মনে হচ্ছে,,,”

উনি বলল,”হ্যা,প্রিন্স মাহমুদের জ্যাকেটের ভিতর এগুলোর টুকরা পাওয়া গিয়েছিল। এয়াতা জীবিত। প্রিন্স মাহমুদ মৃত্যুর আগে,তার সাথেরটাকে মেরে ফেলতে পেরেছিল। এটাকেও আমাদের মেরে ফেলতে হবে,যত তাড়াতাড়ি পারি।”

লোকটা জিনিসটার দুইটা পা ধরে মাটির সাথে আছড়াতে লাগল। জিনিসটা কেদে উঠল। কান্নাটা মানুষের বাচ্চার মতই। তবে শুনলে।মায়া লাগে না। গলা শুকিয়ে যায়।

ভয়াবহভাবে আছড়াতে আছড়াতে জিনিসটাকে মেরে ফেলল লোকটা। তাই থামল না,অপার্থিব একটা ক্ষোভে আছড়াতেই লাগল। চোখে তার পানি। টুকরা টুকরা হয়ে গেল জিনিসটার দেহ।

আমি লোকটাকে ধরলাম। “শান্ত হন,প্লিজ”

লোকটা ফুপিয়ে  কেদে উঠল। আমাকে বলল,”ভাই,ওইগুলা মানুষ না,জানোয়ার,,,, মেয়েগুলোকে ওরা,,,,, ”

হাউমাউ করে কেদে দিল লোকটা। কান্না জড়িয়ে বলল,,”১০০ বছর পরপর,,, মেয়েদের,,,,,,পাঠায়,,,,, ওটা,,,ওটা,,,,ওটার মত আরো বানাতে,,, ওটা,,,ওটা,,,”

লোকটার চোখ বড় হয়ে গেল আতংকে। বলল,,”ওটা ওদের সোনা দেয়,,,কেষ্টপুর সোনা আর রত্ন দিয়ে তৈরি,,,”

আমরা অনেকগুলো আগুনের গোলা দেখতে পেলাম। আমাদের দিক আসছে। কাছে আসতে বুঝলাম,ওগুলো মশাল। লাল রঙের আলখাল্লা পরে ওরা দৌড়ে আসছে। কি যেন জপছে।

গোয়েন্দা অমানবিক একটা চিৎকার দিল। “আমি মেনে নিতে পারি নি বাচ্চা মেয়েটার ভাগ্য,,,আমার মেয়ের বয়সও অমন,,, পারিনি মানতে,,,,, পারিনি,,, এখন ওদের রক্ত লাগবে,, মাংস গলিয়ে ভোগ দিতে হবে,,, সাহসী মানুষের মাংস,,,, দেবতাপুত্রের খুনির মাংস,,,,, বাচাও,,আমাকে বাচাও।”

লোকটা পাগল হয়ে গেল। পিস্তল বের করে মশালের দিক ফিরে ফায়ার করল। কয়েকটা মশাল পড়ে গেল। আর্তনাদ শোনা গেল,,,,,

আমরা পিছ ফিরে দৌড় দিলাম। নৌকায় যেতে হবে। দৌড় দিলাম।

কে কিভাবে দৌড়াচ্ছি জানি না। আদিব আমার সামনে একটু পরপর পিছনে তাকাচ্ছে। হঠাৎ ওর গতি কমে গেল। আঙুল তুলে আমার পিছন দেখিয়ে বলল,”ব-ব-ব- বড়মিয়া,,,”

আমি পিছু ফিরলাম। কিছুই দেখলাম না। তবে গোয়েন্দা কে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। প্যান্টে পেশাব করে দিয়েছে সে,ভয়াবহভাবে কাপছে,,,,

মশাল ওয়ালারা ওকে ধরে নিয়ে বয়ে নিয়ে চলল,,,, একজনের হাতে ছুরি। সেটা দিয়ে পোচাচ্ছে তাকে একটু পরপর,,লাল লাল তরল পড়ছে,, আর ভয়ংকর রক্ত ঠান্ডা জরা চিৎকার।  হঠাৎ শুনলাম আদিবের চিৎকার, সামনে ফিরলাম,,, ও চিলে যাচ্ছে। সবার পিছে এখন আমি। আমিও দৌড় দিলাম। কাদায় এসে পড়লাম। হাচড়ে পাচড়ে সামনে যাচ্ছি। ওই তো নৌকাটা।

আমি পিছে,আদিব সামনে। নৌকায় বসে,সোহাগ আর তকী পাগলের মত কি জানি বলছে,আমি বুঝছি না। কিছু একটার ফিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। আমাদের কোনো দিকে দৃষ্টি ন্রি। সামনে যেতে হবে,নৌকায় উঠতে হবে,,, কারণ পিছে কিছু একটার পায়ের শব্দ শুনছি। থপ থপ থপ,,, যদিও আমি জানি,,,সবার পিছনে আমিই আছি,,পিছে কারো হাটার কথা না।

হোচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লাম। চোখের সামনে থেকে কাদার ভিতর থেকে কিছু একটা লাফ দিল।দানবীয় কিছু। নাহ,ওটা অলৌকিক কিছু না,,,বাস্তব কিছু,,বাস্তবের ভয়াবহ বিভীষিকা।

কুমিরটা বিশাল এক গ্রাসে আদিবের শরীরের উপরের অংশ কামড়ে ধরল। ঠকাশ করে অনেকগুলো হাড় ভাঙার মিলিত শব্দ পেলাম।আদিবের নিচের অংশ শেষবারে ঝাকুনি দিচ্ছে,,,,

না,,,না,,,প্লিজ,,ও বাচ্চা ছেলে,,, এস এস সি দেবে সামনে,,, প্লিজ না।

আমার বাম পায়ে তীব্র একটা যন্ত্রনা টের পেলাম। এওন যন্ত্রণা জীবনেও হয় নি। আমি আবার হাড় ভাঙার শব্দটা পেলাম। ঘুরলাম শুইয়েই পিছনে। প্রায় ১৬ ফুট লম্বা একটা কুমির আমার পাটা মুখের ভিতর পুরে নিয়েছে।

অজ্ঞান হবার আগে দেখেছিলাম, নৌকার মাঝি এসে কুমিরটার চোখ দুইটাতে বৈঠা দিয়ে খোচা দিয়ে অন্ধ করে দিল। কুমির মুখ হা হরে আমার পা ছেড়ে দিল।আর সোহাগ আর তকী আমার হাত ধরে টানতে টানতে নদীর দিকে নিয়ে এল।

৪.

আমার লিখতে ভাল লাগছে না। প্রথম ৩ খন্ড অনেক আগেই লিখে রেখেছিলাম। শেষ অংশটা লিখতে ভাল লাগছে না। কারণ শেষ অংশটাই কেষ্টপুরের নিষিদ্ধ গল্প টা। এটা একটা অভিশপ্ত কাহিনী। ফাইফরমাশ এর ছেলেটা ঠিকই বলেছিল,কেষ্টপুরের আশেপাশে গেলে অভিশাপ লাগে।

তবে সুন্দরবনে নিখোজ আর রহস্যময় মৃত্যুর সংবাদ পাচ্ছি আমি আবার কয়েকদিন ধরে। আমি বুঝতে পারছি,কেন হচ্ছে এগুলো। গল্পের শেষাংশ আমাকে লিখতেই হবে,যাতে কখনো কেউ এই গল্প পড়ে,পড়ে বোঝে,,যা নিষিদ্ধ, তা নিষিদ্ধই থাকতে হয়।নিষিদ্ধ হবার পিছনে কারণ থাকে,,, 

আমাকে সোহাগ আর তকী হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। সুন্দরবনে কোন রকম ব্যান্ডেজ, ওষুধ আর বেধে দিয়ে  আমাকে খুলনা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছিল। আমি খুব করে চেয়েছিলাম যাতে সোহাগ আর তকীও আসে। ওরা আমার বাসায় জানানোর ব্যবস্থা যেন করে। আমার মোবাইলটা সেই কুমিরটার পেটে।

কিন্তু সোহাগ আর তকী গেল না। আমাকে বলল,আদিবের লাশটা উদ্ধারে যাবে। তবে আমার কেন জানি মনে হল,ওরাও আমার মত জানে,আদিবের লাশ উদ্ধার হবে না।ওরা যাচ্ছে এই ঘটনার শেষ দেখতে। আমার বাধা দেবার অবস্থা ছিল না। রক্তক্ষরণ এ শ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছিল।

আমার অবস্থা উন্নত হবার পর আমি খুলনায় বললাম,আমার বাড়ি বরিশাল,তাই বাকি চিকিৎসা আমি বরিশালেই করাতে চাই। ডাক্তাররা আমাকে যেতে দিল। আমার আব্বু আম্মু আমার সাথেই ছিল গত কয়েকদিন। আমাকে নিয়ে গেল।

সোহাগ আর তকীর কোন খোজ আর রাখা হয় নি। ওদের নম্বর মোবাইলে সেইভ ছিল। মুখস্ত ছিল না। ওরা আমাকে কল দেয় নি। আমি ধরে নিয়েছিলাম,ওরা বেচে নেই। আরেকটি গোয়ার্তুমির শিকার।

একরাতে হঠাৎ আমার মোবাইলে ফোন এল,ফোন করেছে সোহাগ। সোহাগ বলল,”ভাই, কেষ্টপুরের ঘটনাটা শুনবেন? আমি আর তকী ঘটনা শোনার জন্য ওদের দলে যোগ দিয়েছিলাম। ওদের মত সবকিছু করেছিলাম। কি কি করে সব। কিন্তু অবশেষে সেই রাত এল। সুন্দরি মেয়েদেরকে ওরা দেশের আনাচে কানাচে থেকে তুলে আনে,,,সেসব সুন্দরিদেরকে,,সেরাতে,,,,,”

মানুষ এর মুখ বেকে গেলে,পেচিয়ে পেচিয়ে অস্পষ্ট করে কথা বলে না? সোহাগও “সেরাতে” বলার পর ওভাবে কথা বলতে লাগল,,, তারপর হঠাৎ ওর মুখ থেকে কুকুরের কান্নার মত আওয়াজ বের হতে লাগল,,তারপর সব চুপ। আমি ডাকলাম,”সোহাগ সোহাগ”

ওপাশ থেকে ঠান্ডা একটা অট্টহাসি শোনা গেল,, “হা হা হা হা হা হা হা হা,,,,”

আমি কি করব বুঝছিলাম না। সেই হাসি শুনে আমি ২ রাত ঘুমাতে পারলাম না।

৩ দিন পর আবার ফোন এল। আমাকে কাপতে কাপতে বলল,,”ভাই,সোহাগ মরে গেছে,, ৩ রাত আগে,,, ওইভাবে,, ওই যে প্রিন্স ভাইয়ার মত,,ঘাড় ভাঙা,,শরীর বরফের মত্ম”

আমি বললাম,”তকী,তোমরা কেন জিদ করে আবার ওখানে গেলা? সেরাতে আমরা যা দেখেছিলাম,যা হারিয়েছিলাম,এটা কি যথেষ্ট ছিল না?”

তকী বলল,”ভাই, কথা শুনেন,,,সময় নাই, ভাই সবাইকে জানান,এই কথাটা,,,, ভাই, ওটা একটা অভিশপ্ত জায়গা।ওখানে ওরা সোনা দানা,রত্ন,হীরা,খাবার,পোশাক এসবের জন্য একটা অপদেবতার পূজা করে,,, আর এই অপদেবতা যাতে ওদের ১০০ বছর ভাল রাখতে পারে,,,তাই ১০০ বছর পরপর ওরা অনুষ্ঠান করে,অপদেবতার জন্য,,,, অপদেবতাকে ভোগ দে,,,,,,,,,ভাই,প্রচন্ড শীত করতেছে,, এত ঠান্ডা লাগে কেন,, মা গো,, আল্লাহ,,, এত শীত,,এত শীত কেন??????”

তকীর ওপাশ থেকে মনে হল,রেস্ট হাউজের বাইরে থেকে ফাইফরমাশ খাওয়া ছেলেটা চিৎকার করছে,,”বড়মিয়া,আইছে,,,বড়মিয়া আইছে,,,,”

কেষ্টপুরের জন্য আমি আমার ৪ জন্য বন্ধুকে হারিয়েছি,, প্রিন্স,আদিব,সোহাগ আর তকী। কেষ্টপুরের শিকার আর কেউ হবে না। আমি গল্প লিখব কেষ্টপুরের। নিষিদ্ধ গল্প।

গোয়েন্দা আমাকে বলেছিল ওখানে নাকি মেয়েদের আনা হয়,সুন্দরি বাচ্চা মেয়ে,,গোয়েন্দার বয়স বেশি।তাই ধরে নিলাম,বাচ্চা মেয়ে বলতে সে কুমারী তরুণীদের বুঝিয়েছে,কারন এসব পূজার অনুষ্ঠানে কুমারীদের একটা ব্যপার আছে সবখানে।আর আমিও নিজ খানে ঢাকের শিব্দ,মেয়েদের চিৎকার,আর গোঙানি শুনেছি।

গোয়েন্দা আমাকে আরো বলেছিল,ওরা নাকি মেয়েদের ইউজ করে ওটার মত আরো বানাতে,, এর মানে,,, ওটা বলতে আমি ধরে নিলাম,কোনো ভয়ংকর জিনিস,যেটাকে ফাইফরমাশ এর ছেলেটা,আদিব এরা বড়মিয়া বলেছে। ধরলাম বড়মিয়া একটা অন্য প্রজাতির প্রাণী। মেয়েদের দিয়ে ওটার মত বানানো হয়,আর গোয়েন্দার হাতে আমরা একটা বাচ্চা দেখেছিলাম। আমি ধরে নিলাম,ওই জিনিসটা মেয়েদের সাথে মিলন করে,এবং অলৌকিক ভাবে,বাচ্চাটাও সাথে সাথেই হয়ে যায়।

সোহাগ ও মেয়েদের কথা বলে। সুন্দরি মেয়ে লাগে,গ্রামে সুন্দরি কই পাবে? তাই ওরা সারাদেশ থেকে বাছাই করে অপহরণ করে।

তকী সাহসী মানুষের রক্ত, মাংসের কথা বলল। ধরলাম,বড়মিয়া,এই জিনিসটা খায়। সাহসী মানুষ,,মেয়েদের ওই অত্যাচার দেখে সহ্য করতে না পেরে,প্রিন্স আর গোয়েন্দার মত লোকেরা পূজার জায়গা থেকে সেই দানবশিশু চুরি করে মেরে ফেকে। এর চেয়ে সাহসী আর কে আছে? আর রক্তের কথাও বলছিল। হয়ত নরবলিও হয়।

বাবুর্চি আমাকে বলেছিল,,নিষিদ্ধ গল্প যে বলে,যে শোনে,,অভিশাপ লাগে,,, আমি ৪ জনের কাছ থেকে শুনে অনুমান নির্ভর করে যোগ করে মনের মত একটা গল্প লিখলাম। সত্যি না হয়ত,সত্যি নিষিদ্ধ গল্পটা আমি কাউকেই জানাতে পারতাম না। কাউকে জানানোর আগেই বড়মিয়া…..

এ কি ঘরটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কেন? এত শীত লাগে গেল। আমার হাত পা সাদা কেন হয়ে যাচ্ছে? শ্বাস নিতে কেন কষ্ট হচ্ছে? ঘরের বাইরে ও কার শব্দ শুনি আমি? থপ…. থপ…. থপ…..