গল্প ৮৫

​”শয়তানে স্যুট পরে”

(মৌলবাদের আদ্যোপান্ত গল্পের বর্ধিতাংশ)

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

ইকবাল খান একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা টি-শার্ট,আর একটা জিন্স পরে নিজেকে খুটিয়ে খুটিয়ে লক্ষ্য করছে।একটা চিরুণি দিয়ে সারাজীবনের অগোছালো চুলগুলোকে আচড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে।

ইকবাল খান যে ফ্লাটে থাকে,সেটায় সে পারতপক্ষে যেতে চায় না।অনেক স্মৃতি তার মনে পড়ে।অত্যন্ত দুঃখের কিছু স্মৃতি।

ইকবাল খান আমেরিকায় আসে মেডিসিনে এম আর সি পি করতে,সুদূর বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু আমেরিকায় এয়ারপোর্ট এ নামার প্রথম দিন আরেকটা বাংলাদেশি দম্পতির সাথে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটিরর কাছে লাঞ্ছিত হয় শুধুমাত্র মুসলিম নামের জন্য।

যাই হোক,সেই লাঞ্ছনাটা একটা উপকার করে,আমেরিকায় এসে সেই লাঞ্ছিত বাংলাদেশি দম্পতির (তারা এসেছিল রসায়নে থিসিস করতে) সাথে খুবই আপনভাবে বন্ধুত্বে লিপ্ত হয় ইকবাল। কেটে যায় প্রায় ৩ বছর। তারা ৩ জন ইকবালের বর্তমান ফ্লাটে শেয়ার করে থাকত।

ঠিক ৩ বছর পর,সেই দম্পতির একটা সন্তান আসার সময় হয়। তখন ইকবাল জানতে পারে,রেজা,,মানে যে বাবা হতে যাচ্ছে তাকে ব্রেইনওয়াশ করে একটা ইম্পরট্যান্ট বিল্ডিং এ বোমা হামলা করতে নেওয়া হচ্ছে।

ওদিকে মেয়েটার প্রসববেদনা ওঠে। ইকবাল হাসপাতালে নিতে চাইলেও মেয়েটা জোর করে রেজার কাছে নিয়ে যেতে অনুরোধ করে।ইকবাল তাই করে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে,রেজাকে ব্রেইনওয়াশ করে বোমা হামলা করতে যে উদ্বুদ্ধ করেছে,সে তাকে খেলনা বোম সাপ্লাই দিয়েছে।

পরে প্রকাশিত হয়,,এটা সি আই এর একটা প্লান,একটা গোপন অপারেশন।  নাম “স্টিং অপারেশন “।  কোন একটা মুসলিমকে নিজে মুসলিম সেজে হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কাফের মানে আমেরিকানদেরকে খুন করতে উৎসাহিত করবে,এবং সাপ্লাই দেবে নকল অস্ত্র। ব্রেইনওয়াশড মুসলিম কথিত জিহাদের নামে হামলা চালাতে যাবে।ওৎ পেতে থাকা পুলিশরা ধরে ফেলবে। এভাবে নিরাপরাধ এক মুসলিমকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া হবে,যাতে সত্যিকারের বোমা হামলাকারীরা এই শাস্তি দেখে ভয় পায়। ভাবে,,”জাস্ট হামলার অভিনয় করেই এই শাস্তি,,সত্যিকারের হামলা হলে কি না কি যেন হবে”

রেজাকে এভাবে ধরা হল। প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীকে ঘটনাস্থলে দেখে এরেস্ট অস্বীকার করে রেজা ছুটে আসল তার স্ত্রীর কাছে। পুলিশ অপরাধী পালাচ্ছে বলে সবার সামনে গুলি করল। গুলি শুধু রেজার গায়েই লাগল না,,, তার বউয়ের গায়ের লাগল,,আর লাগল প্রায় ভূমিষ্ট হওয়া বাচ্চার গায়ে।

পাশে দাঁড়িয়ে ইকবাল খান সব দেখল। ইকবাল খান স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। রেজা আর রেজার বউকে পরেরদিন দাফনের সময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়েছিল। তৃতীয় বিশ্বের মুসলিম ইকবাল খানের মনে হচ্ছিল অন্যায় দেখে লজ্জিত হয়ে আকাশ কাদছে।

যাই হোক,এরপর থেকে ফ্লাটটায় গেলে,ইকবাল রেজা আর তার বউকে সোফায় বসে থাকতে দেখে,আর অনাগত বাচ্চাটাকে সে ৩/৪ বছরের একটা মেয়ে হিসেবে দেখে,,ইকবাল খানকে ডাকছে,,”ইকবাল চাচ্চু,আইসক্রিম খাব।”

যাই হোক,এম আর সি পি ডিগ্রির সময় ইকবালের হাসপাতালে এক হেরোইন আসক্ত,হতাশ কিন্তু অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট এক আমেরিকান সাদা চামড়ার ছেলে রয় ট্রেভরের সাথে দেখা হয়। বাবা মার বিতাড়িত,স্ত্রীর থেকে প্রতারিত রয় ট্রেভরকে নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা এবং মোটিভেশন করে ইকবাল। রয় ট্রেভর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ইকবালের উপর। ইকবাল জানতে পারে রয়ের ইচ্ছা পুলিশ হবে,সে নিজ দায়িত্বে রয়কে পুলিশ একাডেমিতে ভর্তি করায়,,এসব ঘটনা ঘটেছিল রেজা আর তার বউ বেচে থাকতেই।

রয় সব পরীক্ষায় টিকে গেলেও শেষে বুঝতে পারে মাদক হিস্টোরি নিলে রয় ধরা খাবে,আর চাকরি হবে না। ইকবাল নিজে শয়তানি করে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসারকে মারধোর করে হাত পা বেধে পুলিশ একাডেমিতেই কুকিয়ে রাখে,,তারপর রয় ট্রেভরকে মাদক ক্লিন হিসেবে ঘোষণা দেয়।আর রয়ের চাকরি হয়ে যায়।

সেই থেকে রয় ট্রেভর ইকবাল খানকে শুধু বেস্ট ফ্রেন্ডই ভাবে না,,নিজের ভাই বলে পরিচয় দেয়।

রয় ট্রেভর গোয়েন্দাগিরি করে নিজের কৃতিত্বে নিউ ইয়র্কের বড় পুলিশ পোস্টে যায়।তাকে এক নামে সবাই চেনে,যমের মত ভয় করে অপরাধীরা।

যেই স্টিং অপারেশনে সি আই এর এক এজেন্ট রেজাকে ফাদের ফেলে,সেরকম ৫ জন এজেন্ট সারা নিউ ইয়র্কে ছড়িয়ে আছে বলে রয় ট্রেভর বের করে। সে আগেই সাবধান করে দেয় ইকবালকে। তবে রেজা যে এই ফাদে পড়বে সে বুঝে নি। কারণ ইকবাল রেজার চেয়ে কট্টরপন্থী মুসলিম।৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। অনেক কিছু জানে ধর্মের ব্যাপারে।জান প্রাণ দিয়ে ইসলামকে ভালবাসে। রয়ের সন্দেহ হয়েছিল ইকবালকে সি আই এ এজেন্টরা টার্গেট করতে পারে।

যাই হোক,সেই ৫ সি আই এ এজেন্টের মধ্যে একজন কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী।  সে স্টিং অপারেশনে তার টার্গেটকে খেলনা বোম না দিয়ে আসল বোম সরবরাহ করে। ব্রেইনওয়াশড টার্গেটের হামলায় একটা চত্বরের ৩০০ আমেরিকান নিহত হয়।

ইকবাল খানের এম আর সি অই ততদিনে হয়ে যায়। তার বাবা মা তাকে বাংলাদেশে ডাকে,, ৩ বছর হয়ে গেছে,ছেলে তাদের কাছছাড়া।ইকবালের মা তো ছেলে ছেলে করে বিছানায় পড়েছে।

ইকবাল প্লেনে উঠে যায়।রয় বিদায় জানাতে আসে এয়ারপোর্ট এ। তখনি ঘোষণা আসে,তদন্ত হবার আগে কোনো মুসলিম আমেরিকা ছাড়তে পারবে না। ইকবাল এর আর বাংলাদেশ ফেরা হয় না। আমেরিকা নামক বিশাল কারাগারে আটকা পড়ে সে। ছেলের চিন্তায় বাবা মা দুইজনই মরে যায়।

বোমা হামলায় ৩০০ আমেরিকান মরার পর সারা আমেরিকায় অসংখ্য মুসলিম বিদ্বেষী গ্রুপ তৈরি হয়। তারা গ্রুপ করে করে মুসলিমদের উপর হামলা জরতে থাকে। ৩০০ আমেরিকান মরার প্রতিশোধ।

এই আক্রোশের শিকার হয়ে ইকবাল খান প্রায় ১০/১৫ বার বেদম প্রহারের শিকার হয়। এভাবে একদিন মেরে ডাস্টবিন এর পাশে ফেলে রাখার সময় তার দেখা হয় এই মহাকাব্যের শেষ পর্যন্ত ইকবাল খানের সাথে থাকা কুকুর “কুত্তা” র। কুত্তা তখন ছিল একটা বাচ্চা মাত্র। সেই মহাকাব্য আমি বেচে থাকলে একদিন লিখব হয়ত।

যাই হোক,রয় ট্রেভর  জানতে পেরে মুসলিম বিরোধী কয়েকটা গ্রুপের সদস্যদের পিটিয়ে হাত পা ভেঙে দেয় তার বন্ধু ইকবাল খানকে এভাবে মারার জন্য। সারা নিউ ইয়র্ক জেনে যায়,ইকবাল খানের গায়ে একটা আচড় লাগলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।  সে নিউ ইয়র্কের সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকর আর দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা রয় ট্রেভরের পাতানো ভাই।

রয় ট্রেভরের নতুন একটা গার্লফ্রেন্ড হয়েছে ততদিন। তার নাম শেলি। শেলি প্রথম প্রথম মুসলিম বলে ইকবালকে ভাল চোখে দেখত না। কিন্তু এখন সেও ইকবাল এর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। ইকবাল এখন দিনের বেশির ভাগ সময় রয় আর শেলির ফ্লাটেই থাকে।

গত ক্রিসমাসের ইকবালের সাথে পরিচয় হয় এনি হার্ভার্ডের সাথে,, এনির ৮ বছরের একটা প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। ইকবাল এনি আর তার ছেলে জ্যাকের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। মাত্র দুই মাসে জ্যাক আর এনি ওকে আপন করে নেয়। এমনকি জ্যাক বাবা দিবসে ইকবালকে গিফট কার্ড দেয়। ইকবাল বিব্রত হয়ে পড়ার আগেই এনি ওকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়।

আজ এনি আর ইকবালের প্রথম ডেট। তবে এই ডেটে জ্যাক থাকবে। ইকবাল বলে দিছে। এনি হেসেছে খুব। ইকবাল এর সাথে সারাজীবন সে কাটাতে চায়। কিভাবে তা সম্ভব সে জানে না। তবে সম্ভব করাতেই হবে।

যাই হোক,ইকবাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে। এমন সময় শেলি এসে পিছনে দাড়াল।শেলি একটা জিমের ট্রেইনার। রয় শেলিকে বলেছে ইকবালের আত্মরক্ষা শিকতে হবে,শেলি যাতে নিজ দায়িত্বে ওকে এক্সারসাইজ করায়,আত্মরক্ষা শেখায়,রয় মাঝে মাঝে তাকে অস্ত্র চালাতে শেখায়।তবে শেলি নিজ থেকে আরেকটা দায়িত্ব নিয়েছে। ইকবালকে স্মার্ট করা।

শেলি: শ্রমিকের মত গেট আপ নিয়ে কই যাও?

ইকবাল: ডেটিং এ। আজকে এনির সাথে প্রথম ডেট।

শেলি: এনি মানে ওই চোখ ধাধানো সুন্দরি মেয়েটা? ওরকম একটা মেয়ের জন্য লোকেরা লাইন লাগায়,আর তুমি ডেটিং এর অফার পেয়ে ক্ষেত সেজে যাচ্ছ। থাম্বস আপ।

ইকবাল: (ঘুরে তাকিয়ে)  ক্ষেত? কই? আমার কাছে তো ভালই দেখায়,, জাস্ট চুলটাকে নিয়ন্ত্রণে আনলেই হয়।

শেলি: (কপালে চাপড় দিয়ে)  কাকে যে আদিম মানুষ থেকে সভ্য করার দায়িত্ব নিলাম ঈশ্বর জানে,, এই বেটা কাপড় খোল।

ইকবাল: নাউজুবিল্লাহ।সে কি?

শেলি: চুপ থাক। ডেট কখন?

ইকবাল: এই তো ৪৫ মিনিট পর।

শেলি: সর্বনাশ। এর মধ্যে তৈরি কেমনে করব?

ইকবাল: আমি কি মেয়ে নাকি আজব? আমার রেডি হতে ৩০ সেকেন্ড লাগে,,শুধু চুলটা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

শেলি ততক্ষণে একটা ফিতা দিয়ে ইকবালের মেজারমেন্ট নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। বিশেষ জায়গার আশেপাশে হাত যাচ্ছে বলে ইকবাল লাফালাফি করে বলছে,,”সে কি?!”

মিজারমেন্ট নিয়ে রয়কে ফোন দিয়ে শেলি কি সব জানি বলল।১৫ মিনিটের মধ্যে রয় এল ইকবালের সাইজের একটা স্যুট নিয়ে।

বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড মিলে ইকবালকে স্যুটটার ভিতরে ঢুকানোর কসরত চালাতে লাগল। রয় তারপর ডেটিং বিষয়ক কিছু টিপস দিতে লাগল ইকবালকে। আর শেলি ওর মাথার চুল ঠিক করে দিতে লাগল জেল টেল লাগিয়ে।ইকবাল মাথায় সেই জিনিসগুলো লাগানোর কারণে শেলিকে ধমকাতে গেলে শেলির চোখ রাঙানিতে চুপসে গেল।

ইকবালের কুড়িয়ে পাওয়া কুকুর কুত্তা,যাকে সে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা তাকায় নিজের ঘরে ঢুকায় না বলে সারারাত ঘরের বাইরে শুয়ে থাকে (শেলি প্রচন্ড ক্ষেপে এজন্য),,এবং অন্য কেউ কুকুরটাকে ইকবালের থেকে সরাতে এলে কামড়াতে চায়,,সেই কুকুরটা এতক্ষণ ইকবালের সামনে আসে নাই,, একটু আগে ইকবাল তাকে “বিড়ালের বাচ্চা ” বলে গালি দেওয়ায় কুকুরটা ভীষণ অভিমান করেছিল।

ইকবাল যখন বাইরে ট্যাক্সিতে উঠছিল কুকুরটা তারস্বরে ডাকছিল। রয় আর শেলি ভাবল,কুকুরটা কখনো ইকবালকে ছেড়ে থাকে না বলে মনে হয় নিতে অনুরোধ করছে।

ইকবালের মনে হল,”কুকুর তো শয়তান দেখলে এভাবে ডাকে।”

নিউ ইয়র্কের পাশ দিয়ে যে নদীটা বয়ে গেছে। তার পাশে রেলিং এ হেলান দিয়ে রাতের নদীটাকে দেখছে এনি আর জ্যাক হার্ভার্ড। জায়গাটা মেইন শহর থেকে দূরে। এখানে লোকজন তেমন আসে না। হাইওয়ে বলে গাড়ি মাঝে মাঝে আসে। পিছনে হার্ভার্ডের গাড়িটা। মা আর ছেলে ওয়েট করতেছে আজব একটা ডেটিং এর জন্য।ইকবাল খান আসবে যেকোনোসময়।

জ্যাক: মা,শয়তান কি ভাল?

এনি: কি বলছ বেবি এগুলো?

জ্যাক: শয়তানকে কি খুব আপন লাগে প্রথম প্রথম? আসল ক্ষতি করে দেওয়ার আগে?

এনি: আমি বুঝছি না কিছু।

জ্যাক: আমি বাইবেলে পড়েছি জিসাসকে শয়তান বলেছিল সে বন্ধু,,,তারপর তাকে বিষ খেতে বলেছিল। এডামকে শয়তান আপেল খাইয়েছিল বন্ধু পরিচয় দিয়ে। কিন্তু জিসাস আর এডাম দুইজনেরই পরে ক্ষতি হয়।

এনি: হ্যা বেবি। শয়তান মাঝে মাঝে মানুষকে ধোকা দেয়।

জ্যাক: বাবা দিবসে সব বন্ধুরা যখন স্কুলে তাদের বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল।আমি ইকবালকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলাম এটা আমার বাবা। আমার বন্ধুরা আমাকে পরে বলেছে,ওই মুসলিম লোকটা তোমার বাবা?

এনি : তারপর?

জ্যাক: আমি বলেছ,হ্যা। ওরা বলল,,মুসলিমরা শয়তান হয়,তুমি জানো না?

এনি : না বেবি,ওরা ভুল বলে,,ইকবাল অনেক ভাল। তুমি নিজেই তো জানো,ও তোমাকে কত হেল্প করে,তোমাকে যারা খোড়া আর বুদ্ধি কম বলে ক্ষেপাত,ইকবাল ওদের দিয়ে তোমাকে হ্যান্ডশেক করিয়েছিল মনে আছে? তারপর তুমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলে,,ও হাসপাতালে নিয়ে গেল কত রাতে ঘুম থেকে উঠে এসে। ও মাম্মিকেও কত সাহায্য করে,কেয়ার করে।তুমি তো জানো।

জ্যাক: কিন্তু শয়তান নাকি এভাবে মানুষ এর আপন হয়। তারপর ক্ষতি করে? মানুষ ক্ষতির আগে বুঝতেই পারে না।

এনি কিছু বলার আগেই একটা ট্যাক্সি থামল। ইকবাল নামল ট্যাক্সি থেকে।ভাড়া মিটিয়ে ইকবাল ওদের দিক তাকিয়ে হাসল। লাইটপোস্টের আলোতে স্যুট পড়া ইকবালকে এনির কাছে কোন হলিউড নায়কের মত লাগল। এনর শ্বাসপ্রশ্বাস বেড়ে গেল।বুক ধুকপুক করে উঠল। স্যুট পরে ইকবালকে কখনওই দেখে নি সে।

জ্যাক প্রতিদিনের মত ইকবালকে দেখে হাত নাড়াল না।ওর কানে বাঁচতে লাগল,,”ও মুসলিম,  মুসলিম মানে শয়তান, বাঁচতে চাইলে পালাও,, ও শয়তান,,ও শয়তান।”

এনি এগিয়ে গিয়ে ইকবালের দুই গালে চুমো খেল। ইকবালকে স্যুটে এর আগে কখনওই দেখে নি সে। অসাধারণ সুন্দর লাগছে ইকবালকে। ইকবালও এনির দিক একদৃষ্টে চেয়ে আছে। কোন মেয়ে এর চেয়ে বেশি সুন্দর এই পৃথিবীতে হতে পারে না সে নিশ্চিত। এর চেয়ে সুন্দরি দেখতে গেলে জান্নাতে যেতে হবে।

এনি: তোমাকে,,,,এত সুন্দর আগে কখনো দেখি নি।

ইকবাল: (এক হাত দিয়ে জ্যাকের চোয়াল নাড়িয়ে) তাই? এখন আমি নিশ্চিত মেয়েগুলো আমার দিকই তাইলে তাকিয়েছিল। আমার ধারণা ছিল আমার ট্যাক্সি ড্রাইভারের দিক তাকিয়ে ওরা চোখ মারছিল।

এনি : (হেসে দিয়ে)  কয়টা মেয়ে? গুণছ?

ইকবাল: নাহ,বাই দ্য ওয়ে,আমি টি শার্ট পরে আসছিলাম। রয় স্যুট কিনে শেলির সাথে মিলে জোর করে পরিয়ে দিয়েছে। আর শেলি চুল ঠিক করে দিয়েছে। রয় অনেক টিপস দিয়েছিল ডেটিং সম্পর্কে।আমি ভুলে গেছি। আর শেলি বলে দিয়েছে তুমি যাতে ওকে একদিন ম্যাকডোনাল্ডে নিয়ে খাওয়াও।

এনি: (অনেকক্ষণ ধরে হেসে) আচ্ছা খাওয়াব খাওয়াব। 

জ্যাক ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে। ইকবাল সেটা খেয়াল করল।

ইকবাল: জ্যাক সাহেব,বোরড হচ্ছ? তাহলে বল,কোন রেস্টুরেন্ট এ যাই।এমনিই ফেরার সময় রেস্টুরেন্ট এ যাওয়ার প্লান আছে। 

জ্যাক কিছু বলল না।

এনি: (দ্রুত) ওর মুড অফ। স্কুলে ঝগড়া করেছে।

ইকবাল: (ব্যস্ত হয়ে)  সে কি? আবার কারা ঝামেলা করল? সেদিন সবার সাথে তোমার বন্ধু পাতিয়ে দিলাম না?

এনি : বাদ দাও। পরে ও নিয়ে ভাবা যাবে।

ইকবাল আর এনি অনেকক্ষণ ধরে রেলিং এর ধারে বসে নদী দেখতে লাগল।জ্যাক চুপচাপ ভাবতে লাগল কিসব, তার কানে এখনো বাজতে লাগল,,”ও শয়তান,,তোমাকে আর তোমার মাকে শেষ করতে ও এসেছে। পালাও পালাও।”

এনি: ইকবাল,আমি শেষ কবে হেসেছি ভুলে গেছি। সেই কবে থেকে একা হয়ে আছি।আমি আর জ্যাক। যদি হাসতাম সেটা হত লোক দেখানো। কিন্তু সেই ক্রিসমাসের পর থেকে আমার জীবনটা পালটে গেছে। আমি আমার জীবনে সত্যিকারের সুখী হয়েছি। আমার হাসি,আমার সুখ একটাও আর লোক দেখানো না,,একদম ভিতর থেকে আসছে সব।

ইকবাল: আমারো তোমার আর জ্যাকের সাথে পরিচয়ের পর নিজেকে আর একা মনে হয় না। এর আগে অনেক কারণে আমি বারবার একা হয়ে গিয়েছি।কষ্ট পেয়েছি।আমেরিকা আমার কাছে একটা কারাগার হয়ে গেছে। আমি রয় আর শেলির দয়ার পাত্র হয়ে বেচে থাকতাম। তোমার আর জ্যাককে পেয়ে মনে হচ্ছে,আমি একজন স্বাভাবিক মানুষ। ইসসস,, তোমাদের সাথে এভাবে থাকতে পারতাম।

এনি : হুম। আমার জ্যাকের বাবার সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর সব পুরুষের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি আসলেই অনেক একা,,, জ্যাকের একটা বাবা লাগে আর আমার একটা জ্যাকের বাবা।

ইকবাল: (থতমত খেয়ে)  মানে,,জ্যাকের বাবা আবার ফিরে আসছে?

এনি: (ইকবালের হাত জড়িয়ে)  জ্যাকের বাবাকে ফিরে আসতে বলি নি তো। কিন্তু জ্যাকের বাবা তো কেউ হতে পারে,,,যাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি,,,,,

এনি ইকবালের বুকে সেধিয়ে গেল। ওর ঠোট প্রায় ইকবালের ঠোটের কাছে,,,,

জ্যাকের কানে তীব্রভাবে বাজতে লাগল,,, “ও শয়তান,ও শয়তান,,, আজ কেউ মরবে,,, হয় তোর মা,নয়ত তুই,,, শয়তানের নজর পড়ছে তোদের মা বেটার উপর,,শয়তানের,,,,”

একটা বিয়ারের ক্যান ঝনাৎ করে রাস্তায় গড়িয়ে পড়ল। ইকবাল আর এনি লাফিয়ে সরে গেল। একটা মাতাল লোক টলে টলে ওদের তিনজনের দিক আসছে। হাতে একটা রিভলভার।

ইকবাল কেন যেন বুঝে ফেলল,লোকটার মতিগতি ভাল না। সে এনি আর জ্যাককে তার পিছনে আড়াল করে সামনে দাড়াল।

ইকবাল: প্লিজ স্যার,আপনি ক্ষতি করবেন না। আপনি যদি টাকা চান,আমি দিয়ে দিচ্ছি।

লোকটা: তুই মুসলমান? হ্যা,,কপালে দাগ দেখতেছি,,এই দাগ মুসলমানদের থাকে,,,তুই মুসলমান।

জ্যাকের কানে “ও শয়তান ” কথাটা এত জোরে বাজতে লাগল যে জ্যাক কান চেপে ধরল।

লোকটা: মনে পড়ে? দুই বছর আগে? নিউ ইয়র্ক চত্বরে বোমা হামলা? ৩০০ জন মরছিল,, তোর মত কোন মুসলিম কুত্তার বাচ্চা মারছিল,,,ওই ৩০০ জনের মধ্যে আমার বউ ছিল,,,,,,

এনি ইকবালের স্যুট খামচে ধরল।

লোকটা: আমার প্রিয়তমাকে তোর মত কেউ একজন এই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। আর তুই আজ এখানে তোর প্রিয়তমাকে নিয়ে সময় কাটাচ্ছিস?

এনি ইকবালের সামনে এসে দাড়াল।

জ্যাক: মা!!!!!

ইকবাল: এনি পিছনে আসো।

এনি: প্লিজ স্যার ওকে কিছু বলেন না,,ও তো কিছু করে নি। আপনি মাতাল। আপনি তাই বুঝছেন না। আমাদের ছেড়ে দিন।ওকে মারবেন না।

লোকটা: ওকে কে মারবে?  আমি জাস্ট ওকে বুঝাচ্ছি,এবং ভবিষ্যতে ওর মত আরো শয়তানদের বুঝাব,,, নিজের প্রিয়তমাকে হারালে কেমন লাগে,,,,

লোকটা রিভলভার উচিয়ে এনির বুকে দুইটা গুলি করল,ইকবালের স্যুটে আর মুখে রক্ত ছিটে উঠল।

লোকটা পালিয়ে গেল। জ্যাক তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল।

ইকবাল এনিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। এনির ঠোটটা কাপতে কাপতে বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে ইকবালের দিক শেষবারের মত তাকাল।

ইকবাল এনির নিস্পন্দ দেহটা আকড়ে পাথরের মত বসে রইল।

পুলিশের গাড়ি এল। পুলিশ আসল। রয় ও আসল। ইকবাল তখনো ঠায় বসা,এনি ওর কোলে।

জ্যাক তারস্বরে চিৎকার করল,,”শয়তান,, তুই শয়তান,,, তোর জন্য আমার মা মরে গেল,তুই আমার মাকে নিয়ে নিছিস আমার কাছ থেকে,তুই শয়তান,,তুই নরকের শয়তান।  যা শয়তান,নরকে যা,,,, নরকে পচে গলে মর,,,,,

ইকবাল এনির দেহ কোলে নিয়ে ঠায় বসা।এবার ইকবালের কানে বাজছে,,”তুই শয়তান,,তুই শয়তান।”

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s