গল্প ১৩০

​”জেরেমির বেহালা”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.
১৯৬৫ সাল

শীতলক্ষ্যা নদীতে একবার একটা জেলের জালে একটা কাটা ভাঙা বড় শিংমাছ ধরা পড়ল। শিংমাছটা নদীর শিংমাছের তুলনায় বেশ বড়,এবং এর গলার চারপাশে খুব টাইট করে একটা তাবিজ বাধা। তাবিজটা জীবিত শিংমাছের গলার চারপাশে গোল একটা ক্ষত তৈরি করেছে,রক্ত বের হচ্ছে সেখান থেকে। বোঝা যাচ্ছে মাছটা নদীতে থাকলেও এই ক্ষত নিয়ে বেশিদিন বাচত না।মাছটার শরীর নৌকায় ওঠানোর পরপরই সাদাটে হয়ে যাচ্ছে। এখনই মারা যাবে।

জেলেগুলো একে অপরের দিক তাকাল। বুড়ো জেলেটা বাকিদের বলল,”বাণ মারছে রে কাউরে। মাছটারে ছোট থাকতে কাটা ভাইঙ্গা গলায় এইটা টাইট কইরা পড়াইয়া দিছে। মাছটা নদীতে আইসা যত বড় হইবে,ওই তাবিজটা তত জোরে গলা আটকাইয়া ধরবে,এমনে কইরা একসময় যার নামে বানটা মারছে,সে মইরা যাইবে। তোরা শিগগিরি তাবিজটা খোল। মাছটা মরার আগেই।”

কিন্তু বাণ মারার কথা শুনে কোনো জেলেই হাত লাগাতে সাহস পেল না। বুড়োও না। মাছটা চোখের সামনেই গলায় তাবিজ সহই মরে গেল।

প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে একটা গ্রামে একদা সচ্ছল পরিবারের শেষ সদস্যটা একা ঘরে ছটফট করতে করতে মরে গেল।তার গলায় চারদিকে গাঢ় একটা রক্তাক্ত ফাসের মত দাগ।অনেকদিন ধরে হওয়া ক্ষত বোঝাই যাচ্ছে। চুইয়ে চুইয়ে পড়া শেষ রক্তবিন্দুগুলো এখনো ক্ষততে লেপ্টে আছে।

গ্রামের মানুষ এই পরিবারের প্রথম সদস্যটা মরার পরেই বুঝেছিল,গ্রামের সবচেয়ে ভাল আর জনপ্রিয় পরিবারটার উপর কারো বদনজর পড়েছে।আশেপাশের চার পাচ গ্রামের মধ্যে এই পরিবারটা ছিল সবচেয়ে ধনী, শিক্ষিত, এবং সমাজসেবী। পরিবারটা কখনো কারো ক্ষতি করেছে কিনা কেউ বলতে পারবে না। উলটা গ্রামের মানুষের যেকোনো বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসত এরাই। একবারের একটা ঘটনা মনে পড়ে, এই পরিবারের যিনি কর্তা ছিলের,সবচেয়ে মুরুব্বি লোকটা।তার যুবক বয়সের কথা। তার স্ত্রী তখন সন্তান সম্ভবা।হঠাৎ এক ঝড়ের রাতে খবর এল পাশের বাড়ির আশ্রিত এক কামলার বউয়ের প্রসব বেদনা উঠেছে। কিন্তু এই দুর্যোগের রাতে কামলার বউকে হাসপাতালেই বা কে নেবে, আর হাসপাতালের খরচই বা কামলা কিভাবে মেটাবে? তাই সেই রাতে কামলা স্ত্রীর চিৎকার নিরুপায় হয়ে কামলা শুনছিল,আর আশ্রয় দেওয়া বাড়ির লোকেরা ঘুমের ডিস্টার্ব হচ্ছে বলে গালাগালি দিচ্ছিল।

সেই কান্না শুনে এই বাড়ির কর্তা তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী,যাকে ডাক্তার মানা করে দিয়েছিল হাটাচলা করতে,তাকে নিয়ে গেল সেই বাড়িতে। কারণ তার স্ত্রীর আগে থেকে অভিজ্ঞতা ছিল কারো সন্তান প্রসবে সাহায্য করা।

সেই কামলা,তার বউ, তাদের নবজাতক বাচ্চা কোলে নিয়ে প্রাণ ভরে দোয়া করেছিল এই পরিবারটির জন্য। বলেছিল,এই পরিবারটাকে এবং সামনে যত বংশধর আসবে সবাইকে যেন আল্লাহ নেক আয়ু দিয়ে বাচিয়ে রাখেন অনেকদিন।

কিন্তু এরকম হাজারো মানুষের দোয়াও পরিবারটাকে নির্বংশ হবার হাত থেকে বাচাতে পারল না।

ঘটনা শুরু হয়েছিল ঠিক দেড়বছর আগে থেকে। বাড়ির কর্তা মোতালেব সাহেব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লেন। ডাক্তার দেখানো হল।ডাক্তার কোনো রোগ ধরতে পারল না। বলল,”বয়সের কারণে দুর্বল হয়ে গিয়েছেন।”

আস্তে আস্তে মোতালেব সাহেব একদম শুকিয়ে বিছানার সাথে মিশে গেলেন। তাকে দেখেও ভয় হত মানুষের। শুকিয়ে দাত আর চোখ বেরিয়ে থাকত।বিড়বিড় করে ফ্যাসফেসে গলায় কিসব দুর্বোধ্য ভাষায় যেন কথা বলত।

মোতালেব সাহেবের বড়ছেলেকে তার এক বন্ধু বলল,ডাক্তার যখন ধরতে পারছে না কিছু,কোনো বড় এক হুজুরের কাছেই নেওয়া হোক ওনাকে। 

শিক্ষিত ফ্যামিলি।কিন্তু আপনজনের জীবন বাচাতে বড় ডাক্তারদেরও গুজবে কান দিয়ে বেদে দের শরণাপন্ন হবার কাহিনীও অসংখ্য আছে এদেশে। আপনজনকে হারাতে কেউই চায় না। স্বাভাবিক উপায়েই হোক,অস্বাভাবিক উপায়েও।

বড়ছেলে তার বাবাকে নিয়ে কোনো এক হুজুরের কাছে যায়। হুজুর দেখেই বলে,কাল জাদু করা হয়েছে। হুজুর কিসব যেন রিচুয়াল করে। মোতালেব সাহেব নিজের পায়ে হেটে সেবার বাসায় ফিরেছিল।

তবে মাত্র ৭ দিন তিনি সুস্থ ছিলেন। এরপর এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। এক রাতে তিনি তার স্ত্রীকে বলেন, একটু বাইরে যাবেন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। স্ত্রী বলে,তিনি সাথে যাবেন কিনা। কিন্তু মোতালেব সাহেব মানা করেন। স্ত্রীর একটু জ্বর ছিল সেরাতে। স্ত্রী তাও তাকে অনুরোধ করে ঘরের জানালাটা খুলে বের হতে। কারণ বাড়ির টয়লেটটা এই জানালা দিয়ে দেখা যায়,আঙিনার জাস্ট ওপাশেই।উনি যেন শুয়ে থেকে দেখতে পারেন মোতালেব সাহেব কোথায় যাচ্ছেন,বা ঠিকমত ফিরছেন কিনা।

মোতালেব সাহেব তাই করলেন। জানালা খুললেন,তারপর দরজা খুলে বাইরে গেলেন। জানালার ঠিক সামনে আসতেই মোতালেব সাহেবের স্ত্রী আতংকিত হয়ে দেখলেন মোতালেব সাহেব স্থির হয়ে একা একা ৩/৪ হাত মাটির উপরে ভেসে উঠলেন। হাত আর অয়া ছড়িয়ে গেল তার। তারপর চোখের সামনে অদৃশ্য কিছু সজোরে টান দিয়ে তার চার হাত পা,আর মাথাটা শরীর থেকে ছিড়ে ফেলল একটা কাপড়ের পুতুলের মত।

মায়ের চিৎকারে মোতালেব সাহেবের ছেলেরা,ছেলের বউরা আর নাতি নাতনিরা বের হয়ে গেল। এসে অমানবিক দৃশ্যটা দেখল। মোতালেব সাহেবের খন্ডিত দেহাংশ গুলো সারা উঠানের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব।

সবাই বুঝল এটা মানুষ এর কাজ না। 

স্বামীকে চোখের সামনে এভাবে মরতে দেখে তার অলরেডি জ্বরে ভোগা স্ত্রী আর নিতে পারে নি। ৩ দিন পর তিনিও মারা গেলেন। এটাই ছিল পরিবারের একমাত্র স্বাভাবিক মৃত্যু।

এরপর মরণ ঘন্টা বাজা শুরু হল,পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যকে দিয়ে। বড়ছেলের কিশোরী মেয়ে আগের বছর পালিয়ে বিয়ে করেছিল। কয়েকদিন আগে তার বাবা মা বিয়েটা মেনে নিয়েছিল। সে মেয়ের ১/২ মাস বয়সী একটা বাচ্চা ছিল। সেই বাচ্চাটা গভীর রাতে বিকট পুরুষালি কন্ঠের হেসে উঠত।

বাচ্চাটা মরার আগের রাতে হাসতে হাসতে পুরুষালি কণ্ঠে বলেছিল,”তোদের বংশ নির্বংশ করে দেব। অনেক দিনের জ্বালা আমার,অনেকদিনের প্রতিশোধ… হা হা হা।”

এদিকে এই কান্ড দেখে মোতালেব সাহেবের বড়ছেলে সেই হুজুরের সাথে যোগাযোগ এর চেষ্টা করলেন। হুজুর এর এক সাগরেদ বলল,”আপনার বাবার চিকিৎসা করার ৭ দিনের দিন রাতে হুজুরের খন্ডিত দেহ পাশের শুকনা বিলে স্তূপ করে কে যেন রেখে যায়।”

বড়ছেলে বুঝল ভয়াবহ কিছুর খপ্পরে তারা পড়েছে।

বুঝলে আর কি হবে,তাদের বিপদ থেকে কেউই উদ্ধার করার মত ছিল না। এর মধ্যে তাদের পরিবারের আরো ৫ জন মারা গেল। ছোট থেকে বড় বয়সীর দিকে চলছে মরণ মিছিল।

প্রথম কয়েকটা মৃত্যুর সময়,বা আগে পরিবারের সবাই আশেপাশে অমানবিক কিছুর অস্তিত্ব পেয়েছিল। হয় কন্ঠ,অথবা সরাসরি চোখে দেখা,অথবা সেই জিনিসটার কাজে কর্মে সবাই বুঝেছিল সেটা সাধারণ মানুষ এর চেয়েও অনেক বড় সাইজে,এবং প্রচন্ড শক্তিশালী,এমনকি ওটার কন্ঠের সাথেও সবাই পরিচিত হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু হঠাৎ একদিন ওটার উপস্থিতি আর টের পাওয়া গেল না। ততদিনে পরিবারের বাকি ছিল মোতালেব সাহেবের তিন ছেলে আর ছোট ছেলের স্ত্রী।

সব হারিয়েও তারা বুঝেছিল, তাদের বিপদ যায় নি। সেই জিনিসটা কোনো একটা অজানা কারণের প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে।

এমন অবস্থায় এক তান্ত্রিক এর আবির্ভাব হল ওদের বাসায়। তান্ত্রিক বলল,”তোদের সবকিছু আমি জানি। কিন্তু আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। আসতে আসতে কিছু করার আগেই তোদের পরিবারের প্রায় সবাইকে ওরা মেরে ফেলল।চিন্তা করিস না,তোদের পিছনে কে লেগেছে আমি জানি। তোদের এই বিপদ থেকে আমি উদ্ধার করব।”

তান্ত্রিক লোকটা রয়ে গেল ওদের বাসায়। সেই পিশাচটার ছায়া পাওয়া গেল না আর কোথাও। প্রায় এক মাসের মত।

তান্ত্রিক বলল,”ওই পিশাচটাকে আমি খেয়ে ফেলেছি।তোদের আর ভয় নেই।এবার আমায় বিদায় দেন”

তান্ত্রিককে ওরা কিছু উপহার দিয়ে বিদায় দিল।

তান্ত্রিক চলে যাবার ২ মাসের ভিতর বাকি চারজনও অদ্ভুত সব রোগে বিছানায় পড়ে মরে গেল। শেষ শিকারটা ছিল, ছোট ছেলে। মরার আগে যার গলায় গোলাকার একটা ক্ষত পাওয়া গিয়েছিল।ঠিক ৫ কিলোমিটার দূরে জেলের জালে ধরা পড়া শিংমাছটার মত।

২.

“অভি ভাইয়া,

আমি তোমাদের গ্রামে থাকি। আমাকে তুমি চিনবে না। তোমার বাবা মাও চিনত কিনা জানি না। সম্পর্ক টা অনেক লতাপাতায় জড়ানো।গত মাসে তোমার বাবা মা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে শুনে কষ্ট পেয়েছি। তবে তুমি শুনলাম অনেক বড় হয়েছ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। বড় ছেলেরা এই শোক সহজেই কাটাতে পারে।তুমিও পারবে,পারতে হবে।

তো মূল প্রসঙ্গে যাই, আমি জানি না তুমি কখনো মোতালেব শিকদার নামে কারো নাম শুনেছ কিনা।তোমার দাদার চাচাতো ভাই ছিল সে। মানে তোমার দাদার বাবা আর মোতালেব শিকদারের বাবা দুই ভাই ছিল। এই দুই ভাই এর বাবা এক ইংরেজ ছিল। সে কলকাতা থেকে চলে এসে এদেশে বসতি স্থাপন করেছিল। ধর্ম পরিবর্তন করে এক মুসলিম জমিদারের মেয়েকে বিয়ে করে সে এদেশে,সেই বংশই এতদূর এসে গড়িয়েছে।

ইংরেজ সাহেবের বড় ছেলের বংশের তুমি হলে শেষ বংশধর।  আর ছোটছেলের বংশের সবাই রোগে ভুগে কয়েকমাস আগেই মারা গিয়েছে।

গ্রামে সেই ছোট ছেলের বংশধরদের বিশাল এক সম্পত্তি এখন খা খা করছে। সেই ইংরেজ সাহেবের বংশধর হিসেবে তোমারই এই সম্পত্তির উত্তরাধিকার রয়েছে।

তুমি যদি গ্রামে আসতে,আর তোমার সম্পত্তিটা বুঝে নিতে,ভাল হত। আমি অনেক বুড়ো হয়েছি।এই আছি,এই নেই। আমি চলে গেলে,এই সম্পত্তি তোমাকে বুঝিয়ে দেবার কেউ থাকবে না।

তুমি চলে আসো গ্রামে। যত তাড়াতাড়ি পারো।চিঠির খামেই ঠিকানা লেখা থাকবে।

ইতি

তোমাদের নায়েব

নন্দ গোসাঁই”

বাসে বসে  অভি আহমেদ আরো একবার চিঠিটা পড়ল। চিঠিটা যতবার সে পড়ে,ততবার অবাক হয়।এগুলোর কিছুই সে জানত না।তার বাবাও কখনওই এসব নিয়ে আলোচনা করে নি তার সাথে। আসলে পূর্বপুরুষ নিয়ে আলোচনা করার সময়ই ছিল না তার। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের এদেশের অন্যতম এক নেতা ছিলেন তিনি।রাজনীতিতেই সময় কেটে যেত।

অনেকবার তাকে জেলে যেতে হত রাজনৈতিক কারণে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে জেল খেটেছিলেন।বন্ধুত্বও হয়েছিল দুজনের। এইতো কয়েকদিন আগে বাসার দফতরখানায় শেখ মুজিব এসেছিলেন,আর তাদের শিক্ষাজীবনের কিছু বন্ধু। তারা আইয়ুবের কাছে কি যেন ৬ দফা দাবি পেশ করার কথা ভাবছে সে নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল।

কিন্তু সরকার ভাবছে তারা হয়ত ষড়যন্ত্র করছে। ব্যক্তিগতভাবে গুন্ডা মস্তান দিয়ে আক্রমণ করানো হচ্ছে এসব নেতাদের। তারাই গত মাসে গাড়িতে বোমা রেখে অভির বাবা আর মাকে মেরে ফেলল। শুধু তাই নয়,দেশদ্রোহী বলে তাদের বাড়ি,ব্যাংকের টাকা সব বাজেয়াপ্ত হল।

অভি অথৈ সাগরে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকায়,তার ক্ষতি কেউ করে নি। তবে সব হারিয়ে কিভাবে চলবে সামনে,ভেবে অবাক হচ্ছিল।বাবার বন্ধুদের কাছে সাহায্য চাওয়ার সম্ভাবনাও কম।তারা পালিয়ে যাচ্ছে,বা জেলে পড়ে রয়েছে।

এমন সময়,এমন এক চিঠি। চিঠিতে এমন কিছু লেখা,যা যদি সত্যি হয়,শুধু সম্পত্তি না,নিরাপত্তাও পাবে অভি। গ্রামে গিয়ে নেতার অজানা ছেলেকে ধরার মত অতটা ইচ্ছা থাকার কথা না সরকারের।ঢাকায় থাকলেই শুধু বিপদ।

অভি তাই কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করল না। অবশ্য করার মত কেউ ছিলও না। চিঠি পেয়েই,ঠিকানা অনুযায়ী রওনা দিল সে।

বাস স্টেশনের নেমে রিকশায় নৌকাঘাটে যেতে হয়।সেখান থেকে নৌকায় করে এই গ্রামে যেতে হয়।

গ্রামে গিয়ে অভি অবাক। বিরান গ্রাম। বেশিরভাগ বাড়িই পরিত্যক্ত। কিছুই বুঝল না সে। গ্রামের রাস্তায় লোকজনও চোখে পড়ে না।

তখনও সন্ধ্যা হয় নি। অভি এলোমেলো হাটতে লাগল। এমনসময় খুবই দ্রুতবেগে একটা লোককে হাটতে দেখল সে।

“এই যে ভাই,শোনেন একটু। ”

লোকটা থামল।অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে।বলল,”আপনি কেডা?”

অভি নিজের পরিচয় নিয়ে চিঠির ঠিকানাটা আর নন্দ গোসাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করল।

লোকটা চোখ বড় বড় করে বলল,”নন্দ গোসাই নামে কারো নাম তো জানি না। আর ওই বাসায় যাইতে চান কেন? আপনি কিছুই জানেন না? ওই একটা বাসার জন্য সারা গ্রাম ফাকা হইয়া গেছে। ওটা পিশাচের বাড়ি। বাড়ির সবাইরে পিশাচ মারছে। বাড়ির লোকদের প্রেতাত্মা এখন সারা গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। আপনি ঢাকা শহর থেইকা আইছেন ওই বাড়িতে উঠতে? কে আপনারে চিঠি দিল? ভাই,আপনি সন্ধ্যার আগেই গ্রাম থেইকা ভাগেন। আপনারে আপনার মরণ ডাকছে এখানে।”

লোকটা হাটা দিল। অভি চেচিয়ে বলল,”আমি ওই বাড়ির শেষ বংশধর। ”

এটা শুনে লোকটা একবার পিছু ফিরল। তারপর ঘুরেই একটা দৌড় দিল।

সন্ধ্যা নেমে গেল। অভি এদিক ওদিক হেটে যাচ্ছে। কি করবে,কোথায় যাবে,কিছু জানে না সে। ভাল বিপদে পড়েছে।

হঠাৎ সামনে একটা নারীমূর্তি দেখতে পেল সে। নারীমূর্তিটা আজব একটা পোশাক পড়েছে। অভি খেয়াল করে দেখল, ওর বইয়ে আকা ছবিতে ব্রিটিশ আমলে দেশী নারীদের এই পোশাক পড়তে দেখেছে।

অভি অবাক হয়ে গেল।মহিলাটা পিছু ফিরে তাকাল। অসাধারণ সুন্দরি এক নারী। একটা হাসি দিল অভিকে দেখে। তারপর সামনে হাটতে লাগল। অভি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। সে পিছু নিল মহিলার।

মহিলা ওকে আস্তে আস্তে নিয়ে যাচ্ছে একটা বাঁশঝাড় এর ভিতর। তখনই হঠাৎ ওর কাধে কে যেন হাত রাখল। 

অভি পিছন ফিরে দেখল এক বুড়ো দাড়িওয়ালা সম্ভ্রান্ত চেহারার লোক দাঁড়ানো। লোকটা অভিকে বলল,”আর সামনে যেও না। আমার সাথে চল।”

অভির হঠাৎ মনে হল,লোকটার সাথে ওর আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। অভি লোকটার সাথে হাটতে লাগল।হঠাৎ পিছে একটা নারীকণ্ঠের রাগত ধ্বনি শোনা গেল। আস্তে আস্তে সেই শব্দটা ভয়াবহ এক অমানবিক গর্জনে রূপ নিল। বাঁশঝাড় ভেঙে পড়ছে এমন শব্দ হতে লাগল।

অভি পিছু ফিরতে যাবে এমন সময় পাশে হাটা লোকটা বলল,”পিছনে ফিরো না।তোমাকে আমি এই গ্রামের বাইরে নিয়ে যাচ্ছি।”

অভি কিছু বলল না। বুড়ো লোকটা ওকে হাটতে হাটতে একটা নৌকার কাছে নিয়ে গেল নদীর ঘাটে। বলল,”ওতে বিছানা করা আছে। আজ রাতটা ওখানে ঘুমাও।আমি পাহারা দেব। তুমি বিপদে আছ। যা কথা,কাল সকালে হবে।”

অভি যন্ত্রের মত কাজ করল। নৌকার ভিতর ঢুকে গেল। সারাটা রাত বাইরে ঝড়ের শব্দ শুনল সে,তীব্র ঝড়,কিন্তু নদী একটুও দুলছে না। সাথে শুনল কিছু গর্জন, কিছু হাসি,কিছু কান্না,কিছু আর্তনাদ।

সেরাতটা কেটে গেল। আলো ফুটতে অভি কাপতে কাপতে নৌকা থেকে বের হল। বুড়ো লোকটা এখনো দাঁড়ানো নৌকার সামনে।

অভি কিছু জিজ্ঞেস করার আগে লোকটা বলল,”তাড়াতাড়ি চল আমার সাথে। এই গ্রামে কোনো কথা না। কালকে রাতে যা বুঝলাম।তোমার জন্য এই গ্রাম তো না ই,এই দেশই নিরাপদ না। আসো আমার সাথে। ঢাকা থেকে কলকাতাগামী ট্রেন ছাড়ে।আমরা এখন ঢাকায় ফিরব।তারপর সেই ট্রেনে উঠব।”

অভি বলল,”কি যা তা বলছেন, আপনি কে? ”

লোকটা বলল,”তোমাকে বাচিয়ে রাখতে চায় এমন কেউ।”

লোকটা নৌকায় করেই অভিকে নিয়ে এগোতে লাগল নদী বেয়ে। অভি অবাক হয়ে দেখল,নৌকার গতি অনেক বেশি। এখন নদীর স্রোতের বিপরীতে যাচ্ছে নৌকা। গতকাল যে যুবক মাঝির নৌকায় সে উঠেছিল,তার নৌকায় পাল ছিল,এবং সে স্রোতের দিকে যাচ্ছিল,সাথে বাতাসও ছিল। সেই নৌকার চেয়েও এই বৃদ্ধ লোকটা বেশি গতিতে নৌকা বাইছে।

এমন সময় পিছন থেকে একটা চিৎকার এল। অভি পিছু ফিরল। এক তান্ত্রিকের মত দেখতে কে জানি দৌড়ে আসছে। বলছে,”এই দাড়া,,দাড়া,,, কই পালাচ্ছিস!!!!”

অভি আতংকিত হয়ে দেখল,তান্ত্রিকটা লাফ দিয়ে নদীতে নামল। তারপর পানির উপর দিয়ে বিদ্যুতগতিতে দৌড়াতে লাগল।

নৌকা আরো জোরে ছুটতে লাগল। গ্রামের সীমানা পার হয়ে গেল। সাথে সাথে তান্ত্রিক মুখ থুবড়ে পানিতে পড়ে গেল। তারপর ভাসতে লাগল। এখনো সে চিৎকার করে গালি দিয়ে যাচ্ছে।

নৌকায় থাকা লোকটা বলল,”ওই লোকটাই নন্দ গোঁসাই নাম নিয়ে তোমাকে চিঠি দিয়েছিল। তোমাকে খুন করবে বলে এই গ্রামে এনেছিল।”

অভি বলল,”কেন?”

লোকটা বলল,”কারণ তুমি জেরেমি উডের শেষ বংশধর। ”

৩. 

পুরনো কলকাতার রডেন স্ট্রিট,১৮৪৭ :

শহরের এক কোণায় এক ইংরেজ একটা টিনের ঘরে বসে এক বিছানায় এসে, এক মনে  বেহালা বাজাচ্ছে। পাশে বসে তার স্ত্রী আর তার ৮ বছরের মেয়ে একমনে সেই বেহালা শুনছে। ইংরেজটার রঙ ধবধবে সাদা না। ইংরেজটার বাবা ইংরেজ ছিল,মা ছিল ভারতীয়। তাই ইংরেজটার রং একটু শ্যামলা।ভারতীয়রা একে কাল সাহেব বলে।

ইংরেজটার নাম জোসেফ উড। তার একটা ভাই আছে। এই কলকাতাতেই থাকে,নাম জেরেমি উড। এরা দুইজন জমজ ভাই।

জোসেফ উড প্রেমে পড়েছিল এক সিপাহী বিদ্রোহী অমর কুমারের মেয়ে মালার সাথে। অমর কুমারকে ইংরেজরা ফাসি দিয়েছিল।  তার পরিবারকে যখন অত্যাচার করার জন্য ধরে আনা হয়,জোসেফ উড মালাকে বাচাতে পারে। তারপর একা অসহায় মালাকে সে বিয়ে করে নেয়।এই কাজের জন্য জোসেফের ভাই জেরেমি তাকে তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। জোসেফ জেরেমির মা ভারতীয় হলেও জেরেমি ভারতীয়দের প্রতি খুবই প্রতিহিংসাপরায়ন ছিল।জেরেমি এমনকি মালাকে দেখেও নি। শুধু বিয়ের খবরটা শুনেই জোসেফকে বলে দেয়,যাতে একটা নিগারকে নিয়ে বাড়িতে না ওঠে।

জোসেফ ছিল শিল্পী। বেহালা বাজিয়ে নিত্যনতুন সুর তৈরি করতেই তার দিন কেটে যেত।তার ভিতর রাগ,বিদ্বেষ কিছুই ছিল না। সে ভাইয়ের কথা মেনে নিয়ে মালাকে নিয়ে মালার বাসায়ই থাকতে শুরু করে।

মালা আর জোসেফের একটা মেয়ে হয়।নাম হয় স্টিফানি। স্টিফানির গায়ের রং পুরোই মালার মত হয়,নিখাদ ভারতীয়দের মত।

জেরেমি ছিল দুশ্চরিত্র। সে মদ খেয়ে পড়ে থাকত সারাদিন। আর রাত হলে গরীব ভারতীয়দের মেয়েদের তুলে আনত। এভাবেই ৮ বছর কেটে যায়।

এমন সময় জেরেমি এক খুব জনপ্রিয় লোকের মেয়েকে রাতের আধারে তুলে আনে।এর প্রতিশোধ নিতে সব দেশি মানুষজন এক হয় জেরেমিকে বাড়িতে ঢুকে পুড়িয়ে মেরে ফেলবে।

জেরেমি তাই এক রাতে অসহায় হয় তার ভাই জোসেফের বাসায় আসে তাকে আশ্রয় দিতে।আর একটু বুদ্ধির জন্য।

জোসেফ জেরেমিকে আশ্রয় দেয়। কিন্তু সেরাতে জেরেমির নজর পরে তার ভাইয়ের স্ত্রী মালার উপর।

জেরেমি জোসেফকে বলে,”তোমাকে ভারতীয়রা ভালবাসে,তুমি আজ আমার সাথে আমার বাসায় চল। যদি আমাকে ধরতে ভারতীয়রা বা পুলিশরা আসে,তুমি আমার পক্ষ থেকে কিছু বললেই ওরা শান্ত হবে।”

জোসেফ সাতপাঁচ না ভেবে রাজি হয়ে গেল। মালা অনেকবার মানা করল, জোসেফ শুনল না।

পরেরদিন মালা শুনল সেই রাতে জেরেমির বাড়িতে দুই জমজ ভাইয়ের একজনকে ভারতীয়রা মেরে ফেলেছে।

মালা স্টিফানিকে নিয়ে ছুটে গেল সেই বাড়িতে। বাড়ির নিচে গিয়েই সে শুনল বেহালার শব্দ। তার মনটা খুশিতে ভরে উঠল। জোসেফ বেচে আছে। সে বেহালা বাজাচ্ছে।

মালা আর স্টিফানি বেহালার শব্দ শুনে উপরের তালায় একরুমে গেল। রুমে ঢুকতেই বেহালা নামিয়ে জেরেমি বিকৃত একটা হাসি হেসে বলল,”ছোটবেলায় বাবা দুইভাইকেই বেহালা শিক্ষা দিত।আজ শিক্ষাটা প্রথমবারের মত আমার কাজে আসবে।”

জেরেমি মালার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। স্টিফানি এর মধ্যে আসায়,তাকে উপরতলা থেকে নিচে ফেলে দিল।স্টিফানি মরে গেল।

জেরেমি নিজের কামনা পূরণের পর মালাকে বলল,সে জোসেফকে নিয়ে এসেছে একারণেই,যাতে ওকে জেরেমি সাজিয়ে নিজেই উত্তেজিত জনতাকে বলতে পারে,”এই দেখ,আমার নরপিশাচ ভাই,একে ভাই বলতেও লজ্জা করছ্র আমার। ওকে নিয়ে তোমরা যা ইচ্ছা করতে পারো।”  জোসেফকে ওরা মেরে ফেললে,ও জোসেফ সেজে নিরাপদে কলকাতার সীমানা পার হয়ে যেতে পারবে। আর তার আগে প্লানের শেষ বাধা,জোসেফের বউ আর মেয়েকে সরিয়ে দেবে।

মালাকে মেরে ফেলতে উদ্দত হবার আগেই এক প্রতিবেশি জেরেমির বাসার নিচে স্টিফানির লাশ দেখে চিৎকার করে ওঠে। জেরেমি পালিয়ে যায়। পালানোর আগে মালা ওকে বলে,”আমি এর শোধ নেব জেরেমি।তোকে নির্বংশ করে দেব।”

জেরেমি বাংলাদেশে পালিয়ে এসে মুসলিম নাম নেয়।শ্যামলা রঙের জন্য কেউ পার্থক্য বুঝতে পারে না। তারপর এক জমিদারের মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পাতে।

মালাও আবার বিয়ে করে। কিন্তু এটা করে শুধু সন্তান ধারণের জন্য। যাদেরকে ও এই কাহিনী বলবে,আর কিছু শিক্ষা দিয়ে যাবে,জেরেমির বংশ শেষ করার শিক্ষা।

কলকাতার মানুষ কখনওই জানে নি সেদিন তারা জেরেমির বদলে জোসেফকে খুন করেছিল। আজও সেই বাড়িতে জোসেফ আর স্টিফানির প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়ায়। আর জোসেফ বেহালা বাজায় করুণ সুরে। কলকাতার লোক বলে,জেরেমির ভূত বেহালা বাজাচ্ছে।

৪.

১৯৬৫, কলকাতাগামী ট্রেন:

অভিকে প্রাণে বাচানো লোকটা এই কাহিনী বলল অভিকে। এও বলল, কিভাবে মোতালেব শিকদারের বংশসহ মারা হয়েছে। মালার নাতি হল সেই তান্ত্রিকটা,যে অভির পিছু ছুটে এসেছিল।সে অভি না মরা পর্যন্ত থামবে না। সে সবার প্রথমে মোতালেবকে কাল জাদু করে। তবে এক হুজুরের কাছে তাকে নিয়ে যাওয়ায় মোতালেব এর উপর থেকে কাল জাদুর প্রভাব কেটে যায়। তান্ত্রিক তখন বুঝল সে কাল জাদু করে এই পরিবারের আর ক্ষতি করতে পারবে না। তাই সে নিজের আত্মা বিক্রি করে শয়তানের সাহায্য চায়। শয়তান তার আত্মার বিনিময়ে ৭ টা খুন করতে রাজি হয়। এভাবে কাল জাদুর প্রভাব দূর করা হুজুরটা,মোতালেব,আর মোতালেবের পরিবারের ৫ শিশু মারা পড়ে।

শয়তানের কাজ শেষ হয়ে গেলে শয়তান চলে যায়। তান্ত্রিক তখন দেখে আরো ৪ জন বাকি মোতালেবের পরিবারে। তখন সে পরিবারের উপকার করার কথা বলে তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ৪ জনের উপরই জাদু করে। এভাবে ৪ জনই মারা যায়।

তখন মালার প্রেতাত্মা এসে তান্ত্রিককে বলে যায়,আরো একজন বাকি আছে। সে তখন তোমার কথা জানতে পারে।

অভি বলে,”এখন আমি কিভাবে বাচতে পারি?”

লোকটা বলল,”এজন্যই তো আমরা কলকাতায় এসেছি। তোমাকে বাচাতে হলে সবার আগে মালার প্রেতাত্মার রাগ সরিয়ে দিতে হবে,মালাই তারপর তান্ত্রিককে বাধা দেবে তোমাকে মারতে। আর মালাকে শান্ত করতে একজনই পারে। যার বেহালার সুর রডেনস্ট্রিটেত মানুষেরা প্রতিরাতে শোনে,,,”

অভি আর লোকটা কলকাতায় নামল। সেরাতে তারা রডেন স্ট্রিটের সেই বাড়িটায় গেল। বাড়িটা থেকে ভেসে আসছে বেহালার করুণ সুর।

অভি আর লোকটা বাড়ির ভিতরে ঢুকল। সাদা কাপড় পরা ৮ বছরের একটা মেয়ে ফুপিয়ে কেদে সারা বাড়ি হেটে বেড়াচ্ছে। আর বেহালার শব্দ আসছে একটা রুম থেকে।

অভি রুমে ঢুকল। কাল সাহেবের ভূত বেহালা থামিয়ে তার দিক চোখ তুলে তাকাল। তারপর ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল,”মোতালেব মিয়া,বেচে থাকতে আমার কাছে আসলে তোমাদের পরিবার এখনো বেচে থাকত।কিন্তু তখন এসব বুজরুকি ভেবেছ।”

অভি পিছু ফিরল এক ঝটকায়। এতদিনের সহযাত্রী মৃত লোকটা গুমড়ে উঠে জোসেফকে বলল,”এই ছেলেটাও আপনার মতই নিরপরাধ ছিল। আমার,আমার পরিবারের মত। যে আপনার ক্ষতি করেছিল,তার মৃত্যুটা স্বাভাবিকই হয়েছিল। ভুক্তভোগী হলাম সব নিরাপরাধরা।”

জোসেফ বলল,”এটাই দুনিয়ার নিয়ম। আসো ছেলে, তোমাকে বেহালার একটা সুর শিখিয়ে দিই। দেশে ফিরে এই সুরটা তুলবে এই বেহালাতে,ঠিক সেখানে গিয়ে,যেখানে তুমি মালাকে দেখেছিলে।”

বেহালার খুবই করুণ কিন্তু বুকটা উষ্ণ করে দেওয়া একটা সুর বেজে উঠল। প্রায় একশ বছর আগে এই সুরটাই মোহিত হয়ে শুনছিল মালা আর স্টিফানি।

Advertisements

গল্প ১২৯

​”Other Side of the Sky”

Written By: The Ugly Monster From The Book Frankenstein (Raihan Masud Bipu)

“What the hell are you doing?” stuttered Miraj Hasan. A flower bouquet just dropped from his hands which he was hiding to surprise his girlfriend, Who by the way is now trying to cover her sweaty body,panting hard on her bed,while the  playboy of the varsity just got pissed off for the unwanted interruption.

Miraj’s gf is looking down the floor. The playboy shouted,”You fucking creep,you are now sneaking up to girls’ house?”

Miraj is looking straight at his gf. She is trembling for being caught, her fair skin reddened.

Miraj’s open mouth didn’t close. the playboy wore a towel around  his hips and began to stroll slowly towards Miraj.

Miraj said,”What happened to the “this is prohibited by religion? ” what happened to the “I have self-respect I am not a slut..”, what happened to, “Marry me first,then think about it,you have disgusting thoughts, you are a pervert”  WHAT HAPPENED TO THOSE WORDS!!!!!”

Playboy began to push Miraj. “I was there first,, I have been her friends for 3 fucking years,she was supposed to be mine,, you interfered and sneaked in,,,I always understood her,she was happy with me,,, last one year, she was so sad and pathetic,, and mentally weak,, just for you,,you sadistic prick… now you sneaked up in her house and question her???”

Miraj’s grief suddenly vanished. Suddenly he felt like the man,her gf always doubted him to be over the last year. He punched the playboy on his nose.

Her gf didn’t move. Blood splash confirmed her current lover’s nose just broke.

The playboy flattened on his back. miraj sat on his chest and began to unleash every grief,every compromise, every insult, every humiliation, which made him less of a man over last 1year,with every punch of his right hand. He continued to punch until his knuckles got sore and eyesight became hazy with tears and his gf’s lover’s face became permanently deformed.

He stormed out of her gf’s house. Her parents and sister aren’t at home,he knew it though. They were out shopping for his and his gf’s marriage after the engagement last weak. So they allowed his visiting her while they were out. Even they knew he can’t do anything to their daughter. His face says it.

His gf vacantly kept staring at the fallen bouquet.  Her lover is groaning with pain,drenched in blood.

Miraj was walking on the street. Tears drenched his face and his hand was blood stained,both from his and the playboy’s.

One year of relationship with a 3 years junior girl was supposed to be ended in marriage. That was Miraj’s plan.But last 1 year,the fantasy and meaning of relationship totally inverted for him. Relationship happens to make people happy. But he doesn’t remember when he was last happy. He tried to be happy and make his gf happy. Always did everything his gf wanted.Totally changed his personality for his gf. But nothing was enough for his gf. However changes he underwent his gf just looked for and found out faults which other people couldn’t.  Last one year,kept telling him that he was a loser,ugly,her friends laughed at her for having a relationship with him,he was making her life fucked up. If Miraj wanted to have sex in his vulnerable momentary, she downright used to tell him,his mentality was sick. He is a Jahannami.

Miraj never found happiness from her. But kept hoping and hoping. He loved her,he wanted her, he wanted her forever.He always thought he really fucked up her life,whatever she said was true. She used to say,her family wanted to marry her off with some rich and handsome man,but she refused,so,her family is facing conflict among each other.

Miraj felt so guilty,so pathetic for being the cause of her misery. He knew his father was also against the relationship.  He went against everyone and last week two families announced their engagement at long last.

Miraj really hoped it would finally change everything. His gf aka fiance finally would give him happiness.

His gf always used to lose temper with him for little or no reason at all. Even when explained to her,still kept being obnoxious.  She kept the playboy friend,who was rich but educationally beneath miraj,positively comparing with miraj.

Even when the mental stress of her gf became eminent, miraj proposed a psychiatric evaluation.  She took her friend with her there instead of miraj.

Now Miraj knows why. Now Miraj knows it was never meant to be.

Miraj went to the main road,eyes still hazy, unaware of everything around him,kept walking in the middle point, and a varsity bus was approaching.  Suddenly something blue and fragnant long haired thing pushed him out of the way and kept holding him tightly.Miraj was slammed on his back at the side of the road.

“Are you out of your mind?” said a very familliar voice. 

Miraj instantly recognized the voice of his best friend and whimpered, “She cheated on me,Nila, I caught her right now,,,”

Miraj kept sobbing.  A beautiful girl got frozen on his chest,still lying on the road. People started to gather around. Miraj kept sobbing.

Nila got back to her senses. She suddenly looked around and shrilled at the surrounding people,”Circus is over,get out!”

She held Miraj up, “Come on Buddy, let’s get you up.”

Miraj tried to get up. but the slam on the back did something. So,he howled amd sobbed together.

Nila called a rickshaw and and the rickshaw puller helped Miraj getting up on his rickshaw.Nila rode beside him with her arms around Miraj’s back to steady him.

Miraj sobbed,,”She… with her…”

Nila said,”don’t say it… now or ever.. it doesn’t help.try to think something else,Spiderman died in Infinity War…”

Miraj continued to sob.  Not a single period of fluctuations. Nila felt miserable.

One of the back muscle got sprained.  That night Miraj broke off the engagement.  His gf’s family demander the cause.But he didn’t say anything.  Her gf’s mother cursed him for his betrayal and her family conflict and 1 year of drama.

It turned out the rich playboy wasn’t rich at all. He used to borrow money from Miraj’s gf and dressed up like a rich boy. His father was a peon in an office. But the playboy part was true. So,after the confrontation earlier,he lost 2 teeth and the nose,causing grievous hurt. So,taking that as an issue,his gf’s family filed a case against Miraj on behalf of the playboy as a revenge.

But when the police was searching for a warrant, Nila texted the ex gf from an unknown number that she knew it all and if they didn’t withdraw the case,she would expose it herself because the moron Miraj was still trying to protect a slut like her.

But this text backfired. The ex gf attempted a suicide which she previously did once for Miraj,acclaiming,Miraj was bullying her. So,now the second attempt lead her family to file a second case against Miraz.

Miraz’s father sent him away from the town.Gave him some cash and advised him to keep moving around Bangladesh until he can manage something here..

Miraz ran away abruptly.  Nila heard about the second case,and tried to meet him.But he was already gone.

Nila came back home. Feeling empty,like she felt one year ago,when Miraz came joyfully that he was in a relationship.

She didn’t know why she felt it.She was his classmate. Same year or she may be older than him a bit. When she and he first met,within 1 week, he proposed to her. She knew he never dealt with girls before. He doesn’t know how to talk to them. She denied him,but for some reason didn’t leave him or avoid him like she used to do to other guys she rejected,who were more handsome than him. And Miraj didn’t know the awkwardness too,so,they kept being friends.Gradually Nila started to repent for that decision. But she knew boys,Miraz woild never see her like that once she made it clear he wasn’t for her.

So she used to hint him so much for years. He just wouldn’t know.Then came the time,when he kept running to her,and said,”Nila,I am in love…”

Nila never felt so much empty in her life,like she does now. She has a feeling that she might never see the moron again.

Nila opened a box. It was a gift from Miraz. They pulled each other leg by giving birthday presents one seemingly can’t use. 

But what Miraz didn’t know,when he gifted her with this violin, she started to learn it… to do her first music with it specially for him.

She started to rehearse like she does every night.  The first 2 years was joyous tone,last one year was tone for broken heart,, now,,emptiness… 

“I knew when you spent sleepless night for her,I knew she wasn’t the one for you,, but didn’t tell you,because it might break you to hear it from me,whom you think as your best friend,,,,

I should have told you before. At least you wouldn’t be shattered now….”

Miraz rode on a bus,went on to go to Bagerhat. He has no relatives there. even if he had,it would’ve been unwise.

He just rode on the bus that would carry him away from this place. the air is so congested….

He dropped off the bus in front of the Shat Gambuj Mosque. Went in there,washed himself from the hige pond there,and stood for prayer.

He suddenly felt he doesn’t feel remorse anymore. No tears came down.It’s funny. Because the whole last year,he became less of a man like his gf used to tell him,he used to cry every night after each humiliation, his gf mocked that too,,it was a vicious cycle. Suddenly she felt nothing like that. The congestion in the air somehow lifted.

He began to question himself, “did I really love her? how can I not feel anything for her so soon? I used to become restless if I couldn’t reach her for an hour… what happened now? true love isn’t supposed to melt away so soon,is it? Was she right? I didn’t love her? Did her secret lover truly love her? That’s why she was so obnoxious, because I was not made for her? and she knew it?”

When Miraz got out of that mosque,for the first time in his life he felt like he was free,a shackle broke off….

He went on walking around the mosque compound. Couples,groups of friends, Families were visiting too,taking pictures,chattering. But seeing them all happy,didn’t make him feel alone and call his gf as he used to do many more time in the last year.He didn’t feel at all.

Suddenly she noticed a white girl was standing beside the big pond,and trying to read the signboard there. She had a bagpack with a long box handle poking outwards from it,most probably a guitar.

She was European. Most probably British,Miraz was sure about it. She was paper white,unlike the americans, her chin was higher and formed a beautiful jaw line.She was wearing jeans and a sleeveless top with her cleavage being slightly shown. She was sweating,though their was no evidence of straining. So it was clear,she was from a north European country which was winter-prone.

Suddenly the girl looked up and saw Miraz staring at her. Miraz immediately gazed down and turned back to walk hurriedly.Yep,he was being creepy, he knew it.Now she will judge every Bangladeshi as creepy.

Miraz was walking between smaller colourful bushes made to increase the attractiveness of the area. But they didn’t know some of them contained poison,severe poisons.

It didn’t feel any different anyway. He is certain he wouldn’t suicide at least. He knew it now the one year of deception he was playing with himself.  The congestion in the air was almost smoked away.

“Excuse me?” -A pure British accent from a sweet voice asked frok behind. The accent is very difficult to understand the English studied in Bangladesh.

Miraz spinned around.  That white girl from the pond is standing behind him. She is the most beautiful human being Miraz ever saw. But,He didn’t see many white people in real life to distinguish among them anyway.

“I saw you looking at me there,but you kinda ran off when I looked at you,like you saw some kinda ghost,may I ask why?” said the girl.

Miraz stuttered, ” I was staring at you without knowing it was creepy, that’s why I freaked.”

“well,guys always look at me like that,at home,at the other places I visited,here,,everywhere,, but never saw anyone ran off like you,even not the nerdest guy in my high school ” the girl smirked.

Miraz felt his face burning.  He had nothing to say.

The girl smiled,”All right, I am Grace,I am from England, Cardiff.My passion is to travel arounethe world. I started travelling when I was 16.  The first two years were with my mother,but she died in a shipwreck when I was 18,we were on a trip to America,and wanted to travel by sea poetically, my mum was a literature prick,after that I travel alone,it’s my first time in south asia,I was going for Goa in India, but a hurricane was nearby,so the captain anchored at Mongla sea port here in khulna,,, I talk a lot.. my mother used to call me Robin,cz I won’t just stop tweetering as she used to say.. but really I haven’t talked in seven days though,,, I tried but the English from people here is..ummm..well… you are the first person today,with whom I could talk and ge talked back…”

Miraz’s eyes rolled themselves. Grace saw it and laughed out loud. Then she said,”Okay Okay, I will just go to my business…  can you translate every signboard here? this place is historical I suppose, so,I want to know all about it…”

So Miraz went on giving her a tour. A lot of people stared.  Most probably for the cleavage. Miraz felt uncomfortable. But he didn’t bring that up. Grace said,”Ok,I wanted to enter in the mosque,But a man with long dress and beard won’t let me..”

Miraz grabbed the thread of the conversation and quickly said,”you are not appropriately dressed. You have to cover you hair and every thing except hand and foot to get into the mosque,it’s for the girls only.”

Grace opened the jacket she was keeping around her hips and put those on. she also took a handkerchief, made her hair into a bun and tied the handkerchief around it.

Grace looked really graceful.She pulled off her sandal and entered the mosque. The caretaker glared for the tight jeans but didn’t say anything.

The internal room fascinated grace even more. She pulled her camera out to take pictures.

Afterwards it was at noon. So,Miraz told her he would say his prayer. Grace left the mosque. After prayer,Miraz was astonished to see Grace still standing there. tge complex was almost empty,people went for lunch he supposed.

Grace said,”So,I suppose, you know a place where to have lunch?”

Miraz said,”I have to ask. But can you stand it? I mean people from outside country often fall sick after eating in Bangladesh. The cheap restaurant is even more unhygienic,even Bangladeshi people fall sick themselves after eating outside in these places.”

Grace said,”I am hungry,that’s what I know,I will buy some.medicines afyerwards,if I fall sick,,so, are you a local or something?”

Miraz said,”No, I am from another division, I am a tourist myself.”

They went into a restaurant where they order polao. but when Grace saw polao means oily rice she downright declined and took plain rice and some local fish. Miraz forbid repeatedly. But she said,in her country people practically live on oily food and meat. She is here to try something different.

While eating,she asked Miraz about himself.  Miraz told her his name,educational status etc. Also told that He was on a mission to travel his own country as study was over. After travelling was complete,  he  would return to his home town,and try for a job.

Well,he lied mostly about that. He couldn’t go back.He had to be on the run.Even if He didn’t have too,he would still not return. The air in that town was so congested for one year….

After lunch,Grace and Miraz went to see other sites from Bagerhat. In the afternoon, Grace suddenly started to feel sick. Miraz knew the signs of food poisoning.  The hospital was so far,and not well equipped, so he bought some medicine, gave her to Grace and boarded on a cheap hotel renting two rooms one after another.

Grace underwent fever at the night, and she had diarrhoea. The toilet was not comfortable.  so, she needed help from miraz. Miraz went into her room,helped her. Made her some saline,gave some medicine for fever and diarrhoea.

Grace gave him the room’s key.Miraz was surprised. She barely knew him,and still trusted him with keys to her room. “then again,” Miraz thought “these are the people who meet people at bar and have sex then disappear,,”

Grace didn’t call that night.  The next morning, Miraz’s sleep broke,when she called through the thin walls.  He abruptly woke and went into her room. She was in her bed,pale and sweaty. 

She said,”well,no more fever or toilet going,,, but I am feeling very much sick. I can hardly walk,I tried and fell on the bed.”

Miraz said,”Ok,stay here for sometime. You can go anywhere when you are well.”

Grace said,”I can? where will you go? you will leave me here? all sick? ”

Miraz could not find what to say.

Grace smiled and said,”it’s all right, I was kidding,you can go travelling. I fell sick a lotta travelling here and therexi can manage”

Miraz suddenly said,”No,I am kind of responsible for this. It was I who took u in the cheao restaurant, if I tried harder I could find you a good one,so,it’s on me,,I will stay with you until you need me”

Grace looked at him with a weird, soft, sad look. then she said,”ok,done”

Grace spent most of that day sleeping. Didn’t take lunch or breakfast. Miraz bought loaf and some milk and banana for grace. And took out the medicine on her table. then went back to his room.

At evening, after Miraz prayed his evening prayer. Grace talked aloud, “hey Miraz,you brought me packet milk,is it safe to drink?”

Miraz said,”yeah,that’s pasteurized and I also boiled it from the hotel kitchen”

Grace finished her eating,then she said,”you seem to know what to give in food poisoning, but you are not a doctor.Often see these cases?”

Miraz said,”two times,once my best friend fell sick on a study tour,I bought these things after googling it,then I applied these another time,when my…”

Miraz stopped. Grace said,”When your..? ”

Miraz said,”take your medicine.”

Grace said,”It’s a girl, isn’t it? you are not travelling,you are running..  somebody broke your heart.”

Miraz didn’t want to talk about it.He kept quick.  Grace remained silent for some time, then said,”Hey Miraz,Tell me a local fairy tale you grew up listening here in Bangladesh ”

Miraz smiled. Then said,”well,I will tell you one,but i saw a guitar case maybe in your backpack.you sing me a song.”

Grace said,”Ok done ”

Miraz told her the story about Behula and Lakhinder. the story took hours to end…

Grace kept listening, then said,”promise is promise..”

She took her guitar and start playing,,, 
 “Once there was a little nerdy boy
  He saw my eyes,and swelled with joy

He told me, “Can I be more than your friend? ”

I told her,”Why do you want the friendship to end?””

She stopped. Miraz said,”then? ”

Grace said,”Have patience,boy. I will sing you the whole song, when I finish travelling with you.”

The next day Grace was as healthy as ever. She knocked Miraz’s door at dawn. Miraz woke up and opened the door.Still sleepy.  He saw grace was all dressed up to go out. She poked his head and said,”Come on boy,You have to guide me your whole country ”

They went on to a bus and headed for rajshahi. During the journey, Grace kept talking without stopping. if anybody looked at ger annoyingly, she would say,”well I kept my mouth shut for a week or something till I med this boy..”

Miraz grimaced everytime this beautiful girl called him “boy”.  He was a man by the way. But then he remembered, his gf didn’t also think he was a man… 

night fell. They were travelling amidst the chalan bil. It was so vast and so dry in this season. it was like never ending desert.  Moon shone wildly at the horizon.it reflected on Grace’s face,making her the most desired woman for anyone. Miraz didn’t dare to look at her again. He didn’t know the reason.

Suddenly Grace said,”Hey Miraz,can you see that?”

Miraz peered through the window across her from her side. He saw a big white Thing was standing in the bil,and running at the same speed of the bus,and shaking its head from side to side,as to forbid somebody…

other people from the bus saw it too. they started screaming saying,”demon”.  Driver accelerated the bus. and suddenly it’s bright face was so sad. then it vanished.

Miraz was so scared.but didn’t express it. Grace looked at him with the same weird,soft and sad look she gave him the other day.

The bus went on. Grace told Miraz,”Tell me another fairy tale…”

Miraz told her the fairy tale of Dalimkumar. 

It took 30 minutes to finish. Grace asked,”Does every fairy tale end with happy ending, Miraz?”

Miraz’s chest clenched within. He said,”yes,in fairy tale only,,,”

Garce dozed off on Miraz’s shoulder,saying, “That’s what I am looking forward to,boy…”

They travelled almost every historical site in the rajshahi division. Miraz was a very helpful guide, Months disappeared,after they met. Miraz got no phone call from home.it’s still unsafe to return.

Grace and Miraz grew very close. Miraz was thinking about Grace everytime,More than a friend. Grace just used to laugh with him everytime,and called him,a boy.in a manner that she was a big girl. But Miraz supposed she would be youger than him.Then,she didn’t have the courage to tell her what he felt about her. It didn’t work for him the last two times.

From rajshahi, they started for sylhet with train. Grace took a second class ticket,they should save cash,it’s a rule for travelling.but Miraz thought she knew what he felt about her,and then she didn’t want it to be awkward when they would be in a same room.

In the Train,at night, the passengers from that carriage left for their stations. Miraculously, in the whole carriage, only Grace and Miraz were present.  Miraz went to tell her what he feels then,finally , gathering courage. That’s when Grace took out her guitar for the second time and suddenly Miraz remembered the first song.  “why do you want the friendship to end?”

Miraz sat down. Grace sang,, 

 “The friendship went on,like I wanted to,

The little nerdy boy, didn’t have the clue,
 

For I wanted now to be more than his friend

but what if he told me,the feelings can’t mend,,”

Miraz said,”then?”

Grace said,”patience, boy,,, I will sing it to you”

They went to Sylhet. It was the most beautiful part of Bangladesh for both of them. As Miraz was also seeing all of these for the first time.They went on seeing swamp lake,Tanguar Haor,Tea garden,Waterfall,and the rain. They boarded to a bungalow for tourist thia time.It was tinshed. Both of them would talk until sleep through thin walls.  And the sound of rain would mystically give their conversation a background music.

After sylhet,they started for Chittagong by bus. Miraz suddenly understood, Grace was moving round Bangladesh with Dhaka and Barisal at the center. Miraz is wanted in Barisal. Ans Grace said a lot of time, she hates noise and pollution. Miraz was downright scared, It was his last journey with grace.

When everybody slept in the bus.Grace told him,”tell me another fairy tale…”

Miraz told her the story of Kajolrekha….

Grace said,”Are you sure boy? everything has a happy ending? ”

Miraz said,”yes,if everybody wants..”

Grace looked at ger with so much pitiful eyes. She brought her guitar down and sang,,

 “Then oneday the little boy ran towards me with joy,

” I found the love of my life,don’t call me a boy,

I am a man now,love made me wise”

I felt the emptiness began to rise..”

Suddenly Miraz understood.  “Grace,I am not the only one running, am I? you are not travelling either,, you are running too. Somebody broke your heart”

Grace looked outside. Tears dripping on her face. “No boy, I broke his heart first,,,”

Suddenly the bus stopped.  Some robbers went abroad with local sharp weapons, and demanded to give them everything.  as they were approaching towards Miraz and Grace, one of them looked at Grace and licked his lip. Miraz suddenly understood.  He stood up and shouted,”I will rip your heart out,if you try to do what you are thinking,, ”

The robber got offended and raised his weapon, before anybody could do anything, he stabbed on Miraz’s shoulder. Before fainting, Miraz heard a gunshot… 

He woke up in a soft big bed.His shoulder was bandaged.  A graceful figure was standing by the window beside the bed. Her blonde hair flew as night breeze howled imside frim the sea. They were in Chittagong.

“The police came suddenly like it was a movie. Mum would have been proud, she always thought stories are real,except fairy tales.I on the other hand,thought stories are mask for sadness in reality.  But I always wanted life would be like fairy tales..” 

Miraz said nothing. Grace was weird today.

Grace said,”Come on boy,I will finish my song today…”

Miraz rose from bed,shoulder aching. Grace took him to a hill near the sea. The sky was clear.

At the top of the hill,Grace suddenly hugged Miraz. Miraz was dumbstruck. Grace said,”look at the sky,Boy”

Miraz looked up. Stars were twinkling.

Grace said,”Can you see the other side of the sky,little boy?”

Miraz said,”Grace?”

Grace said,”You know boy? Fairy tales are real,but there’s no happy ending… ”

Miraz couldn’t find anything to say. Grace said, “My little nerdy boy told me he loved me. seven days after we met. I told him I want to be his friend.  My little nerdy boy,that moron,took that so normally, he was happy as my friend.But Days went by,months went by,,, I fell for the little nerdy boy,,, the nerdy boy gifted me this guitar,,,because I couldn’t play guitar,, it was a prank. But I learnt to play guitar. To say my little nerdy boy,I love him too. but couldn’t, what if he rejected me now? but I was too late,,, He fell in love with someone else,She was wrong for him. She made my little nerdy boy,very miserable. I saw it all,couldn’t do anything.Oneday she cheated on him.My littleboy ran away, I couldn’t stop him.

I waited for him. For the last verse of my song ready.Oneday he would come back and I would sing it for him,to cure his heart,, to have him for me until I die.

Well he did come.  Apparently, that cheating girlfriend texted him “sorry” for the first time in their relationship.  He forgave her. He came back for her. I stood there with my song….”

Miraz’s chest was drenched with Grace’s tears. “But they killed him. They called him back,because they already knew he was the only one to see that girl was a slut… and sluts weren’t good product for marriage. so,fearie,he would tell that to her future husband, they killed hI’m. Her family killed him….

I sang the song at his grave. and prayed, I wanted to spend some more time with him…

then an angel came, he said, “you wrote 4 verses of my song,,, you get to sing to him each verses at 4 different cities… and you can feel him,see him,touch him,hear him for the time it takes…”

Grace looked at miraz. “But in the other side of the sky,in that earth,you were gone, but in this side of the sky you are,here….in a different body,in a different world…

but I can’t have you,little boy.because,already another one here wrote a song for you.That angel at that Chalan Bil told me that.  How can I snatch you from me in this side of sky? how can I?”

Miraz’s Eye became hazy. Grace pulled out her guitar.

 “Little nerdy boy, I wish you were mine

Little nerdy boy,I wish you were my rain

I would be so drenched in you,saying a hundred times

you were mine,in every side of sky…”

Grace began to vanish…. Miraz shouted, “GRACE”

Text tone rang. Miraz washed his tears. saw the message,, his ex texted,” sorry,can you forgive me and come back?”

Miraz gasped,”Nila?”

Long distance from there, a girl with a violin, stood beside a window. She has prepared a song. She is waiting for someone to sing it to…

গল্প ১২৮

​”নীল পাথারের আতংক”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

পাহাড় ঘেরা ছোট একটা সমুদ্র সৈকত। উজ্জ্বল রোদে হীরের মত চকচক করছে সাদা বালি।বেশিক্ষণ চোখ দিয়ে তাকানো যায় না,চোখ ধা ধা করে। 

সমুদ্রের পানিটা এখানে গাঢ় নীল।ঝড়ো হাওয়া ছাড়াই,সমুদ্রের উচু উচু ঢেউ ভেঙে পড়ছে সৈকতে। আকাশটাও গাঢ় নীল। সমুদ্রের সাথে নীল সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা যেন।তবে প্রতিযোগিতা হলে আকাশই জিতবে,কারণ তার নীল কপালে সাদা উজ্জ্বল একটা টিপ হিসেবে সূর্যটা আছে।

প্রচন্ড গরম এই সৈকতে। তাই সৈকতের দিক মানুষ আসে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে। দিনটা তারা কাটা পাহাড়ে উপরে নিজ নিজ রিসোর্টের আঙিনায়,অথবা টুরিস্ট লিফলেটে লেখা দর্শনীয় স্থানে ছায়ার ভিতর দিয়ে হাটাহাটি করে।

এই জায়গাটা অন্যান্য সৈকতের চেয়ে তুলনামূলক বেশি নির্জন।  বিশাল বড় সমুদ্রসৈকত এর তাই ছোট এই অংশটিতে যেই রিসোর্ট গুলো তৈরি হয়েছে,সেগুলো মূলত হানিমুনের কাপলদের জন্য। পাহাড়ের দর্শনীয় স্থানগুলোও এমন ভাবে সাজানো যাতে বিবাহিত দম্পতিরাই বেশি সুবিধা পায়। সিঙ্গেল মানুষেরা আসতে পারে। তবে আশেপাশে এত কাপল দেখে তারা একাকীত্ব বোধ বেশি করে,যেটা ভ্রমণের আনন্দই মাটি করে দেয়। তাই তারা বেশি একটা এখানে আসে না। পাহাড়ের বুকে প্রাচীন কিছু স্থাপত্য,আর মানুষের তৈরি কৃত্রিম বনই এখানের দর্শনীয় স্থান,আসল সৈকতে এর চেয়ে ঢের বেশি দেখার জিনিস আছে। তাই হানিমুন কাপলদের সাধারণত অন্যরা নিজেদের মতই এখানটাতে থাকতে দেয়।

তবে অন্যসব পাহাড়ের মত এখানেও পাহাড়ি উপজাতিরা থাকে। তাদের জীবিকার মূল উপায় হল সমুদ্রে মাছ ধরা,ঝিনুক আর শঙ্খ সংগ্রহ করা।যখন এই জায়গাটা রিসোর্ট মালিকরা কিনে নেয়,তখন থেকেই উপজাতিদের বনে,পাহাড়ে অবাধ ঘোরাঘুরির উপর কিছুটা রেস্ট্রিকশন আছে। এটা তারা নিজ থেকেই করেছে।সমতল ভূমির মানুষ কে এড়িয়ে চলা এদের ভিতর অনেক যুগ হতে চলে আসছে।

এই বর্ণনাটা এই নতুন টুরিস্ট স্পটটার বিজ্ঞাপনে দেওয়া আছে। এই বর্ণনাটার জন্যই নববিবাহিত দম্পতিরা জায়গাটার প্রতি আকৃষ্ট হয়।

সাংবাদিক নূর তার নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে এখানে হানিমুনে এসেছে।হাতে ১০ দিনের বিশাল ছুটি। তবে এই নির্জন রিসোর্ট গুলোর নাম শুনেই সে এখানে উঠেছে। টুরিস্ট সিজনে মূল সৈকতে ঢাকার মতই কোলাহল। সে চাচ্ছে তার স্পেশাল মুহূর্তগুলো শান্ত,মনোরম কোন জায়গায় কাটাতে। সে আর তার স্ত্রী এমন একটা রিসোর্ট বেছে নিল,যেটা একটা পাহাড়ের উপরে আছে। বেডরুমে দুইটা জানালা,একটা থেকে সমুদ্র দেখা যায়,একটা থেকে জঙ্গল,প্রাকৃতিক অংশটা,যেখানে মানুষ এর হাত পরে নি।

প্রথম দুইদিন পুরোটা সময় নবদম্পতি রুমেই থাকল। এরপর থেকে টুর গাইড অনুযায়ী তারা একটার পর একটা স্পটে ঘুরতে লাগল আর ছবি তুলতে লাগল।

নূরের স্ত্রীর সাথে একটা উপজাতি বাচ্চা ছেলের অনেক খাতির হয়ে গেল। বাচ্চা ছেলেটা টুরিস্টদের কাছে ঝিনুকের মালা,শঙ্খ, বুনো ফুল বিক্রি করে বেড়ায়। নূরের স্ত্রী কাছে ডেকে বাচ্চাটাকে আদর করে, খাতির জমিয়ে অনেক কথা শোনে। নূরও পাশে বসে ওদের আলাপচারিতা শোনে আগ্রহ নিয়ে। এই বাচ্চা ছেলেটা প্রাকৃতিকভাবেই পাহাড় আর বন সম্পর্কে অনেক কিছু জানে,যা বইপত্র পড়েও জানা যায় না।

বাচ্চা ছেলেটা পরবর্তী কয়েকদিনের জন্য গাইড হয়ে গেল নূর আর তার স্ত্রীর। তাদের সাথে সকাল আর দুপুরে খাবার খায়,আর সন্ধ্যায় নূর ওর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দেয়।

হাতে দশদিনের ছুটি টুরিস্ট স্পট অল্প কিছু, মূল সৈকতের কোলাহলে স্বামী স্ত্রী কেউই যেতে চায় না। খুব তাড়াতাড়িই সব দেখা হল। নূর বাচ্চা ছেলেটাকে বলল,”আর কোনো জায়গা আমাদের দেখাতে পারো? সুন্দর জায়গা,তবে লিফলেট এ নেই,তোমরা স্থানীয়রাই শুধু জানো,আছে এমন জায়গা?”

বাচ্চা ছেলেটা বলল,”হ্যা আছে।”

ওদের স্বামী স্ত্রীকে পরেরদিন সকালে ও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কোনো এক জায়গার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কোন মানুষ চলাচলের পথ নেই,তারমানে এখানে নিয়মিত মানুষ আসে না। টুরিস্ট তো না-ই,স্থানীয়রাও না। কোনো কোন স্থানে এতই সরু,ছেলেটাই শুধু অনায়াসে ঢুকতে পারল,নূর আর তার স্ত্রীর সেখান থেকে ঢুকতে অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। কাটাঝোপের আচড়ও খেল দুইজনই।

নূর বলল,”মন্টু, তোমার নাম মন্টুই তো,নাকি উচ্চারণ অন্যরকম? ”

বাচ্চা ছেলেটা বলল,”মঁন্তো চাকমা”

নূর বলল,”মন্তু বলি শুধু,একটা উপন্যাসের নায়ক,হা হা হা,,, আচ্ছা,মন্তু,এই গাছ দেখে তো মনে হচ্ছে না এখানে মানুষ এর হাত পড়েছে।তা,বন্য পশুর ভয় নেই তো?”

মন্তু বলল,”বাবু, বাঁদর আছে,শেয়াল আর পাখি আছে, আর হাতি আছে, হাতিকেই শুধু ভয়।”

নূর বলল,”চিতাবাঘ টাগ নেই তো?”

মন্তু বলল,”না বাবু,ওগুলো ওধারের বড় বনে থাকে,এখান থেকে অনেক দূর,হেটে যাওয়া যায় না, হাতির ভয়ে ওরা এখানে আসে না, এছাড়া এ বনে ওদের খাবার কম।হরিণ,খরগোশ, সবই বড়বনে বেশি।”

নূরের স্ত্রী বলল,”আমাকে যাবার দিন একটা খরগোশে বাচ্চা ধরে এনে দিও,ঢাকায় নিয়ে যাব।”

মন্তু বলল,”আচ্ছা,দিদি।”

ক্লান্তিতে একটু পর কথাই বলতে পারল না নূর বা তার স্ত্রী। মন্তুর ভাবলেশ নেই। হঠাৎ এক স্থানে মন্তু থেমে গেল। একটু শ্বাস নিয়ে নূর ও তার স্ত্রী ঝুকে পড়ায়,প্রথমেই বুঝতে পারল না কোথায় এসে পড়েছে তারা। একটু নূরের স্ত্রী মাথা তুলে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

বড় বড় গাছের ফাকে একটা প্রাকৃতিক ফাকা জায়গা,তাতে মখমলের কার্পেটের মত ঘাস। বড় গাছের ফাকে ফাকে কোমড় সমান ফুল গাছ।আর তাতে নাম না জানা অপূর্ব সুন্দর পাহাড়ি ফুল। সেগুলো থেকে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে।

গাছের ডালে বিখ্যাত সুন্দর ধনেশপাখি বসা। ভাল করে লক্ষ করলে অন্য পাখিও দেখা যাচ্ছে,আর সেগুলোর মিষ্টি ডাক।পুরো জায়গাটাতে সূর্যের আলো এসে একটা মায়ারাজ্য বানিয়ে দিয়েছে।

নূর শিগগিরি কিছু ছবি তুলে নিল এই অপূর্ব জায়গাটার। নূরের স্ত্রী ঘুরে ঘুরে ফুল গুলো দেখতে লাগল। হঠাৎ ফুল ঝোপের মাঝে নড়াচড়া টের পেল সে। একটু কাছে যেতেই একটা খরগোশ দেখতে পেল সে।

খরগোশ টা যখন বুঝল একটা মানুষ তাকে দেখছে সে পিছু ফিরে ছুটতে লাগল। নূরের স্ত্রী দেখল খরগোশ অতজোরেও ছোটে না,যতটা গল্পে বলা হয়,সে পিছু নিল খরগোশটার।

 একেবেকে খরগোশের পিছু নিয়ে সে পথ হারাল। এখন সে খরগোশও দেখে না,আর আশেপাশে কোনো পথও না। 

আতংকিত হয়ে মোবাইল বের করে নূরকে ফোন দিতে গিয়ে দেখল মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। আতংকে ছুটাছুটি করে কিছুক্ষণ, ভয়ে সে চিৎকার করে উঠল নূরের নাম ধরে।

এদিকে নূরের স্ত্রী যে পাশে নেই নূর এটা বুঝতে একটু সময় নিয়েছিল।যখন সে দেখল আশেপাশে কোথাও তার স্ত্রী নেই,হন্তদন্ত হয়ে সেও ছুটাছুটি করল।মন্তু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

নূর রাগ হয়ে মন্তুকে বলল,”ওভাবে দাঁড়িয়ে কেন আছ? সাহায্য কর তোমার দিদি কে খুজে পেতে,,,”

মন্তু নূরের সাথে হাটতে লাগল। হেটে হেটে একসময় ওরা এমন একটা জায়গায় এল যেখানে রাস্তা দু’দিকে চলে গেছে। নূর বামদিকের রাস্তার দিক হাটতেই মন্তু ওর হাত টেনে ধরে বলল,”ওপথে না বাবু,,ওপথে না।”

নূর মন্তুর দিক ফিরল। নিখাদ আতংক ওর চোখে।

 নূর বলল,”কেন?”

মন্তু বলল,”এখানে আপনাদের আনাই আমার ঠিক হয় নি। কিন্তু ভাবলাম,এজায়গার দিকে তো আসব না,আমার চোখেই রাখব আপনাদের,কিন্তু দিদি হারিয়ে যাবে বুঝি নি,ওপথে যাবেন না বাবু,ও পথে যাওয়া মানা,,,”

নূরের তখন মাথা গরম। সে চোখ রাঙাল কিছুক্ষণ।  তারপর ডানদিকের রাস্তা ধরে হাটতে লাগল।

হঠাৎ কিছুদূর হেটে ও মন্তুকে আর পাশে দেখল না। অত্যন্ত ভয়ের সাথে সে খেয়াল করল। ও নিজেও পথ হারিয়েছে।

আতংকে কি করবে বুঝতে পারল না সে। এমন অবস্থায় পিছন দিকে সে তার স্ত্রীর আতংকিত চিৎকার শুনতে লাগল।

নূরও পালটা চিৎকার করে স্ত্রীর চিৎকারের শব্দের ছুটতে লাগল। “মায়া,,মায়া!!”

নূর ছুটতে ছুটতে  কোথায় যাচ্ছে বুঝছে না। ও এটাও খেয়াল করল না ও আসলে সেই দুই রাস্তার সংযোগে ফিরে এসেছে। স্ত্রীর চিৎকার বামদিকের রাস্তা থেকে আসছে। নূর পাগলের মত চেচাতে লাগল “মায়া,আমি আসছি।”

ছুটতে ছুটতে নূর হঠাৎ জঙ্গলের রাস্তায় সাদা কাপড় পরা একটা মেয়েকে দেখল। মেয়েটার লম্বা কাল চুলে তার কোমড় ঢেকে আছে। মেয়েটা সামনে কি যেন দেখছে বলে মনে হল।

নূর হাপাতে হাপাতে বলল,”আপু,আমার স্ত্রীকে খুজে পাচ্ছি না, ওর চিৎকার এখান থেকে পাচ্ছিলাম। আপনি কি এখানে লাল কামিজ,নীল সালওয়ার,সাদা ওড়না পরা কোনো ফর্সা  মেয়েকে দেখেছেন?”

মেয়েটা নড়ছে না। হঠাৎ মেয়েটার ওপাশ থেকে নূরের স্ত্রীর চিৎকার শোনা গেল। নূর আবার চেচিয়ে বলল,”মায়া? মায়া,,”

নূর সামনে এগোতে লাগল।মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে সামনে যেতে উদ্যোগ নিতেই মেয়েটার পচা গলা আঁশ ওয়ালা হাতটা পিছনে এসে নিজের লম্বা চুল সরিয়ে ফেলল।

মাথার পিছে চুলের আড়ালে বিকট একটা সাদা মুখ,রক্তলাল চোখ আর দাঁতহীন কাল গহবর ওয়ালা মুখে ভয়াল একটা হাসি দিল নূরের দিক ফিরে। 

আতংকে বুক শুকিয়ে গেল নূরের। জিনিসটার ঘাড় পিছনের দিক ফিরানো,শরীর অন্যদিকে,তারমানে চুলের আড়াল দিয়ে গোটাসময়টাতেই ওটা ওকে দেখছিল।

নূর চিৎকার নিয়ে পিছাতে লাগল। উলটা মাথার জিনিসটা পিঠের দিক উলটা হয়ে উলটা হাত আর উলটা পা নিয়ে বিকট আর অদ্ভুত ভাবে অবিশ্বাস্য গতিতে হামাগুড়ি দিতে লাগল। মুখটা নূরের দিক ফেরানো। বীভৎস কাল গহবরটা এখনো এক পৈশাচিক হাসিতে পূর্ণ।

নূর চিৎকার করে পিছাতে লাগল। ওটা উলটা হামাগুড়িতে প্রায় ধরে ফেলেছে আর কি এমন সময় পিছনে মন্তুর চিৎকার করে কিছু কথা শুনল নূর। চকিতে পিছনে ফিরল সে।

মন্তু আর নূরের স্ত্রী মায়া দাঁড়ানো ওর পিছে,মায়া নূরের সামনে থাকা জিনিসটাকে দেখছে, রক্তশূন্য হয়ে গেছে ওর মুখ।নীরব একটা চিৎকারে মুখটা হা হয়ে আছে,আতংকে শব্দ বের হচ্ছে না।

মন্তু আবার চেচাল ওর উপজাতি ভাষায় কিছু বলল। নূরের সামনের জিনিসটা সোজা হয়ে দাড়ালো,মাথা এখনো ওদের সিক ফেরানো,শরীরটা অপরদিকে। সে বিকট গমগমে কন্ঠে বিজাতীয় ভাষায় উত্তর দিল মন্তুর কথায়। মন্তু আবার কিছু বলল, জিনিসটা এবার মায়ার দিক তাকিয়ে একটা হাসি দিল,তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। মায়া তীক্ষ্ণ কন্ঠে বনের নিস্তব্ধতা চিরে একটা চিৎকার দিল।তারপর অজ্ঞান হয়ে গেল। নূর কাপতে কাপতে মায়ার কাছে গিয়ে ওকে কোলে তুলল। তারপর কাপতে কাপতে মন্তুকে বলল,”এটা কি হল,মন্তু?”

মন্তু বলল,”বাবু আপনাকে মানা করেছিলাম এখানে আসতে,শোনেন নি।”

নূর বলল,”তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে? আমি তোমাকে হঠাৎ খুজে পেলাম না।আর এদিকে মায়ার চিৎকার শুনলাম,সেই চিৎকারের অইছে দৌড়ে এখানে চলে এলাম।”

মন্তু বলল,”আপনাকে তো আমি বললাম,আমি দিদির পায়ের নুপুর একটা ঝোপের পাশে পড়ে থাকতে দেখেছি,বললাম তো আপনাকে দিদি ওদিক গেছে,আপনাকে তো আমার সাথে আসতে বললাম,আমি কিছুদূর গিয়ে দেখি আপনি এলেন না,আমি অবাক হলাম,কিন্তু দিদিকে তো সেখানেই অএয়েছি,একটা খরগোশের পিছু নিয়ে দিদি পথ হারিয়েছিল।”

নূর বলল,”তুমি কখন এসব বলেছ আমাকে?”

মন্তু বলল,”সে কি বাবু,আমি এত জোরে বললাম, আপনি শোনেন নি?”

নূর এখনো একটু আগের কথা ভেবে কাপছে, মন্তুর কথায় বিস্মিত হলেও কিছু বলল না। হঠাৎ ওদের সামনে একটা উপজাতি লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে।

লোকটা চোখ গরম করে মন্তুর দিক তাকিয়ে আছে। উপজাতিদের ভাষায় কিছু একটা বলে কাছে এসে মন্তুকে একটা থাপ্পড় দিল সে।

নূর মায়াকে কোলে রেখেই বলল,”আরে কি করছেন? ”

লোকটা বলল,”এই বেটাকে এখানে আসতে কত মানা করেছি। সে নিজে তো আসেই,টুরিস্টদেরকেও আনে? এত করে বললাম জায়গাটা ভাল না।”

মন্তু ফোপাতে লাগল।নূর বলল,”তাই বলে এতটুকু বাচ্চার গায়ে হাত তুলবেন?”

লোকটা নূরকে বলল,”ও আমার একমাত্র ছেলে, ওকে হারালে আমার কিছুই থাকবে না,আপনিই বলুন,বিপদ থেকে সাবধান করার পরেও যদি সন্তান ইচ্ছা করে বিপদের দিক পা দেয়,রাগ হয় না?”

মন্তু মাথা নিচু করে কি যেন বলল। লোকটার চোখ বড় হয়ে গেল। নূর বলল,”আপনার ছেলে আমাদের জীবন বাচিয়েছে।”

লোকটা কিছু বলল না,মন্তুর সাথে কথা বলতে লাগল উপজাতিদের ভাষায়। নূর আর মায়াকে পৌছে দিল রিসোর্ট এ।

রিসোর্টে এসে মায়াকে শোয়ানোর সাথে সাথে দরজায় নক পড়ল। রিসোর্টের মালিক নিজে দাঁড়ানো দরজায়। নূর একে চেনে।এর ছবি লিফলেটে ছিল।সে অবাক হল।এত দামি এক রিসোর্ট এর মালিক তার দরজায় নিজে কেন এল?

মালিক বলল,”শুনলাম আপনারা নাকি জঙ্গলে বিপদে পড়েছিলেন?”

নূর এখনো কাপছে। সে মাথা ঝাকাল। মালিক বলল,”ভাবি ঠিক আছেন?”

নূর বলল,”ও অজ্ঞান,আমি হাসপাতালে নেব ভাবছি।”

মালিক বলল,”না না,তার দরকার হবে না,আমি নিজে ডাক্তার ডেকেছি কাহিনী শুনে। এই বনের অনেক অংশেই যাওয়া মানা টুরিস্টদের। সৌন্দর্যের মাঝে ভয় থাকবে না তা তো হয় না। আমরা এই খানে ৫ টা মোট রিসোর্ট রেখেছি।হানিমুন রিসোর্ট মূলত, এই রিসোর্ট এর মালিকরা আর কর্মীরা সবাই জানে এব্যাপারে। আমরা রিসোর্ট আর দর্শনীয় স্থানে তাই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা রাখি। অনেক বড় জায়গা এখানে,তাও কেন দর্শনীয় স্থান এত কম,বুঝেছেন?”

নূর কিছু বলল না।

মালিক বলল,”আমি আপনার সাথে একটা ডিল করতে চাই। আপনি আমাকে ১০ দিনের ভাড়া এডভান্স করেছেন, আমি সেগুলো ফেরত দেব,সাথে ভাবির চিকিৎসা, ওষুধবাবদ টাকাও দেব,খাবারও ফ্রি। তবে প্লিজ আপনারা যেটা দেখেছেন সেটার ব্যাপারে ঢাকায় ফিরে কিছু বলবেন না। যদিও রিসোর্ট এলাকার অনেক দূরের ঘটনা।তবে এটা প্রচার পেলে আমাদের ৫ রিসোর্ট মালিকেরই ব্যাবসা শেষ হয়ে যাবে।”

নূর অবাক হল। লোকটা আধুনিক এবং বেশ টাকাওয়ালা। এর ব্যাপারে জানে সে,এর ঢাকায় ব্যাবসাই আছে,কক্সবাজার এর রিসোর্ট ব্যবসা ছাড়াও। এমন একজন লোক ভূতের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র জিজ্ঞাসা করল না। উলটা হয়ত মন্তু বা তার বাবার কাছ থেকে শুনে ডাইরেক্ট কথা বলতে আসল।

নূর বলল,”আচ্ছা আমি কাউকে কিছু বলব না”

ডাক্তার এসে মায়াকে দেখে গেল।সেদিন সন্ধ্যার পর মায়ার জ্ঞান ফিরল। ফিরেই সে কাপতে লাগল। নূর ওকে ডাক্তারের দেওয়া একটা ওষুধ খাইয়ে দিল। একটু স্বাভাবিক হয়েই মায়া বলল,”আমরা এখনো এখানে কি করছি? এখানে এক মুহূর্ত না,চল এখান থেকে।”

নূর বলল,”শান্ত হও।আমরা চলেই যেতাম। ডাক্তার বলে গিয়েছে তোমার নার্ভে অনেক বড় ধাক্কা লেগেছে,কয়েকদিন রেস্ট নিতে,জার্নিতে ক্ষতি হবে।”

মায়া বলল,”তুমি পাগল? এখানে আমার নার্ভ স্বাভাবিক থাকবে? ভুলে গেছ,আজ আমরা কি দেখেছি?”

নূর বলল,”কিছু ভুলি নি মায়া, আমরা একয়দিন রুম থেকেই বের হব না। তোমাকে ডাক্তার ৪ দিন রেস্ট নিতে বলেছে, ৪ দিন এই রুমেই আমরা থাকব,জানালা দিয়ে সাগর আর পাহাড় দেখব।”

মায়া কেঁদে মিনতি করতে লাগল তারপরও,এক মুহূর্ত সে থাকতে চায় না এখানে,নূর মায়াকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিল। তারপর কিছু খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। নূরের ঘুম আসবে না,ঘুমালেই সে বিকৃত চেহারাটা দেখতে পাচ্ছে।

নূর বারান্দায় এসে বসল,সাগরের রাতের মিষ্টি বাতাস আর শো শো শব্দ ভেসে আসছে। রিসোর্ট গুলো আলোকিত। আঙিনায় বসে প্রায় ২০/২৫ টা দম্পতি বসে গল্প করছে,রোমান্টিক মিউজিক বাজছে।

৫ টা রিসোর্ট মোট এখানে। সবই এই রিসোর্ট থেকে দেখা যায়। নূর আজকে যা দেখল,সেটা ভাবতে লাগল।রিসোর্ট  মালিক তাকে ঘুষ দিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। বেশ কিছু টাকা,খাবারও ফ্রি করে দিয়েছে ও যাতে কিছু বাইরে না বলে। কিই বা বলবে সে? কেই বা বিশ্বাস করবে?

নূর হঠাৎ খেয়াল করল। বিশাল বিশাল ডেকচি বের করা হচ্ছে সব রেস্টুরেন্টের কিচেন থেকে। দেখেই মনে হচ্ছে ডেকচিগুলো খালি। এই টাইপের ডেকচি ওরা খাওয়ার সময় পাশেই থাকে,কারো কিছু লাগলে এখান থেকেই খাবার এনে দেয়। খাবার ওয়ালা ডেকচি এখনো আঙিনাতেই আছে। তবে এই খালি ডেকচি গুলো কিচেন থেকে বের করে ভ্যানের উপর নিয়ে বনের দিক কেন যাচ্ছে?

হঠাৎ পাশের রুম এ নতুন গেস্ট উঠতে আসল। নূর নতুন গেস্টদের দেখেই দাঁড়িয়ে গেল। ৪ টা লোক ২ টা মেয়েকে নিয়ে উঠছে। মেয়েগুলোকে সে চেনে না,তবে ৪ টা ছেলেকে সে চেনে, ওরাও নূরকে ভালভাবেই চেনে।

এই ৪ টা লোক সিনেমা বানানোর কথা বলে মেয়েদের ফুসলে নিয়ে এসে রেইপ করত। সিরিয়াল রেপিস্টই বলা যায়। নুরের অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনুযায়ী পুলিশ এদের হাতে নাতে গ্রেফতার করেছিল ৫ বছর আগে, ৫ বছরের জেল হয়েছিল এদের শেষ মুহূর্তে মেয়েগুলো অভিযোগ উঠিয়ে নেওয়ায়,শুধুমাত্র সাইবার ক্রাইমের মামলায় জেল খেটেছে তারা। জেল থেকে বেরিয়ে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে,আগের অভ্যাসে ফিরে এসেছে।

লোকগুলো একটু থমকে সাথে সাথে মেয়েদুটোকে বলল,”এই রিসোর্ট এ না,চল বের হও।”

অবাক হওয়া মেয়েদুটো বের হয়ে গেল। ওরা শিগগিরি চলে যেতে লাগল। নূর পিছু নিল। হঠাৎ রুম থেকে মায়ার চিৎকার ভেসে আসল। নূর থমকে দাড়াল। মায়া চিৎকার করেই যাচ্ছে। স্ত্রীর কাছে ফিরবে নাকি দুইটা মেয়ের জীবন বাচাবে দ্বিধায় পড়ে গেল নূর। ততক্ষণে লোকগুলো মেয়েদুটোকে নিয়ে ভ্যানে করে এই জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। মেয়েগুলো এখনো কিছু বোঝে নি। সিনেমার নায়িকা হবার স্বপ্ন দুই কিশোরীর চোখ মুখে।

নূর মনে মনে নিজকে লাথি দিয়ে দৌড়ে রুমে ফিরল। ততক্ষণে চিৎকার আশেপাশের বেশ কিছু  দম্পতি চিৎকার শুনল। তারাই ঘটনাটা কি দেখতে এল।

নূর রুমে ঢুকতেই মায়া ওর বুকে ঝাপিয়ে পড়ে বলল,”নূর ওটা এসেছিল আবার,জানালা দিয়ে আমাকে দেখছিল,নূর,,, নূর,আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল,প্লিজ,নূর,তোমার পায়ে পড়ি।”

কয়েকজন দম্পতি রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনে বলল,”কি হয়েছে? জানালায় কি ছিল?”

নূর ওখানে তাকিয়ে রিসোর্ট এর কিছু কর্মীকেও দেখল। ওরা ওর দিকে তাকানো। নূর এর ঘুষের কথা মনে পড়ল।নূর বলল,”বাঁদর দেখছে,আমার স্ত্রী বাঁদর ভয় পায়।”

মায়া নূরের দিক ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল,”নূর?” 

নূর আস্তে করে মায়াকে থামতে বলল। মায়া চিৎকার চেঁচামেচি বাড়িয়ে দিল। ওকে একটা ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে দিল নূর।

বাইরের দম্পতিরা চলে গেল অবাক হয়ে। নূর জানালা আর দরজা বন্ধ করে মায়ার পাশে বসল। এই জায়গা ছেড়ে আসলেই চলে যেতে হবে, মায়া এখানে রেস্ট পাবে না।জার্নি করাবে না সে। বিকাশে টাকা এনে প্লেনে করে ফিরবে। মায়ার যাতে কষ্ট না হয়,টাকায় গিয়ে রেস্ট হবে।

হঠাৎ ওর মনে পড়ল ৪ টা লোক আর মেয়ে দুটোর কথা। সে শিগগিরি ঢাকায় এক সাংবাদিক কলিগকে ফোন দিল। ওই লোক গুলোর কথা বলল সে। আর রিসোর্ট এর ঠিকানা দিল। পুলিশকে জানাতে বলল। কক্সবাজার পুলিশকে যাতে ইনফরম করা হয় আজ রাতের ভিতর ওদের গ্রেফতার করার জন্য। নয়ত আজরাতেই মেয়ে দুটোর সর্বনাশ হয়ে যাবে।

সাংবাদিক কলিগ সব শুনে বলল,”আচ্ছা,আমি আপনাকে আপডেট দিব।”

সেরাতে ২ টার দিকে সাংবাদিক কলিগ ফোন দিয়ে চিন্তিত গলায় নূরকে বলল,”নূর,ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন?সরি এত রাতে ডিস্টার্ব করার জন্য”

নূর বলল,”না না,আমি আরো জেগে আছি,তা পুলিশ কি এসেছিল? কি অবস্থা?”

কলিগ বলল,”নূর আপনার রিসোর্ট এর নাম কি বলেছিলেন?”

নূর বলল,”এটা মূল সৈকত থেকে সেপারেটেড। ৫ টা রিসোর্ট একসাথে,নাম তো খেয়াল করি নি।”

কলিগ বলল,”নূর,এরকম পাচটা রিসোর্ট অনেক আগে ছিল ওখানে,আপনার বর্ণনার সাথে মিলেছে। আপনি কালকে ভোরে উঠেই যা হবার হয়,ওখান থেকে চলে আসেন”

নূর বলল,”কি বলছেন এগুলো? পুলিশ কি বলল? আমি কিছুই বুঝছি না।”

কলিগ বলল,”পুলিশ ওখানে যাবে না নূর,আপনার পালাতে হবে ওখান থেকে,,, কররররররর…..”

কথা কেটে যাচ্ছে। নূর হ্যালো হ্যালো বলতে লাগল। ফোন কেটে গেল। সারারাত আর ফোন করা গেল না।

সকালে মায়াকে উঠানোর সময় দেখল ওর গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। প্রলাপ বকছে। এর মধ্যে বের হওয়া যাবে না।

আগেরবার দেখে যাওয়া ডাক্তার আবার আসল। জ্বর দেখে কিছু ওষুধ দিল। জ্বর একটু কমলেও মায়া এতটাই দুর্বল হয়ে গেল,সে বিছানা ছেড়েই উঠতে পারল না। আর আগের দিন নুর ওর কথা বিশ্বাস করেনি বলে নূরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল।

মায়ার চিন্তা আর ওই মেয়ে দুটোর সাথে কাল কি হয়েছে এই আশংকায় নূরের সব অসহ্য লাগতে লাগল। আশেপাশে এত সুখি দম্পতি। সবাই হাসিখুশি। কারো মনেই নূরের মত এত চিন্তা নেই।মায়ার মত কেউ অসুস্থ  হয় নি।

 এভাবে ২ দিন কেটে গেল। নূরের খুব ইচ্ছা ছিল মন্তুর সাথে কিছু কথা বলতে। তবে মন্তুকে কোথাও পাওয়া গেল না।

এদিকে ডাক্তার মায়াকে ৪ দিন রেস্ট নিতে বলেছিল। ৪র্থ দিন মায়ার স্বাস্থ্য একটু ফিরতে লাগল। নূর বলল,”আজ রাতেই আমরা ঢাকা ফিরব”

মায়া বলল,”মন্তুকে একটু খুজো তো। আমি ওর কাছ থেকে একটা খরগোশের বাচ্চা নিব।”

মায়া ধকল কাটিয়ে উঠছে দেখে নূর খুশি হল। মায়া সারাদিন ধরে ওদের লাগেজ প্যাক করল। আজ সন্ধ্যায় ওরা রওনা দেবে।

নূর মায়াকে একা রুমে না রেখে কাপলদের মাঝে একটা টেবিলে বসিয়ে দিল। তারপর রিসোর্টের অফিসে গেল ওদের বলতে যে সন্ধ্যায় একটা ভ্যান এনে রাখতে,যাতে করে স্টেশ্নে যেতে পারে।

অফিসের সামনে যেতেই দেখল অফিস থেকে মন্তুর বাবা বের হচ্ছে। তাকে দেখে নূর বলে উঠল,”এই যে ভাই শোনেন।”

মন্তুর বাবার একবার ঘুরে তাকাল। কিন্তু কিছু না বলে হাটা দিল দ্রুতগতিতে। নূরের তার পিছু নিতে দৌড়াতে লাগল। রিসোর্টের কাছে বনের দিকে যেতেই লোকটাকে হারিয়ে ফেলল নূর।

বনের ভিতর ঢুকবে কিনা ভাবতে লাগল। সেদিনের স্মৃতি মনে পড়ল তার।

হঠাৎ বনের ভিতর থেকে একটা রক্তাক্ত মুখকে উকি দিতে দেখল সে।প্রচন্ডে আতংকে নূর পিছু ফিরে দৌড় দিতে গেল।

একটা কন্ঠ বলে উঠল,”প্লিজ যাবেন না,নূর ভাই,,প্লিজ।”

নূর পিছন ফিরল।৫ বছর আগে ওর রিপোর্টে ধরা খাওয়া ৪ রেপিস্টের একজন। মুখটা রক্তাক্ত। পা একটা ভাঙা। একটা গাছ ধরে এক পায়ে দাঁড়ানো।

নূর কাছে গেল। লোকটা ফিসফিস করে আতংকিত কন্ঠে তোতলাতে তোতলাতে বলল,”প্লিজ ভাই,বাচান।প্লিজ,,,”

নূর বলল,”কি হয়েছে।”

লোকটা যা বলল,তাতে এই দাঁড়ায় যে,ওরা জেল খেটে বের হয়েও পুরনো অভ্যাস ছাড়ে নি। ভিন্ন নাম নিয়ে সিনেমায় পার্ট দেবার কথা বলে দুই সুন্দরি কিশোরীকে ফুসলে ওরা কক্সবাজার আনে। এনে ওরা শোনে বিচের এক কোণা অনেকটা আলাদা প্রায় নির্জন একটা হানিমুন রিসোর্ট আছে। ৫ টা রিসোর্ট এক করা। সেটার কথা শুনে ওরা মেয়েদুটোকে এখানে আনে। তবে এনে দেখে,ওদের বলা হয়েছিল জায়গাটা নির্জন,কিন্তু এখানে ২০/২৫ টা কাপল অলরেডি,আর এরমধ্যে ওদের আসল পরিচয় জানা সাংবাদিক নূর। ওরা আতংকিত হয়ে পালাতে যায়। যে ভ্যানে করে ওরা পালায়,সেই ভ্যানওয়ালা ওদের রাস্তায় না এনে রাতের বেলায় অদ্ভুত এক রাস্তায় করে বনের ভিতর এক ধ্বংস হওয়া পোড়ো  মন্দিরের কাছে নিয়ে আসে। তারপর পালিয়ে যায় ওদের রেখে।

ওরা প্রথমে বোঝে নি কিছু। কিন্তু একটুপর পাহাড়ের গাঢ় অন্ধকার থেকে এক ৩০ ফুট লম্বা বিশাল এক কদাকার নারী মূর্তি বেরিয়ে আসে।জট পরা চুল, বড় হলুদ চোখ, বিশাল বিশাল দাত, সারা শরীর বিচ্ছিরি আশে ভরা, হাত ভর্তি লম্বা ধারাল নখ,,, উফফফ বীভৎস।

সেই জিনিসটা কে দেখার সাথে সাথে মেয়েরা অজ্ঞান হয়ে যায়। ওটা আসতে থাকে, বাকি ৪ জন দৌড় দেয়। তবে ওটার সাথে পারে না। ওটা মেয়েগুলো আর বাকি ৩ লোককে ধরে নখ দিয়ে পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলে দেয়, তারপর মাথা গুলো টান দিয়ে খুলে ছিড়ে ফেলে, আর বাকি দেহ গুলো চিবাতে থাকে।

এটা দেখে সে দৌড়ে পালায় দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে।পালাতে গিয়ে কাটাঝোপের আচড়ে তার মুখ ছিলে যায়,পাহাড় এর ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একটা পা ভেঙে যায়। অনেক কষ্টে সে এখানে এসেছে।

কাহিনী শুনে নূর বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।৪ দিন আগেও এসব যে বিশ্বাস করত না।কিন্তু সেদিন সে যা দেখেছে।আর এমন এক দাগী আসামীর মুখে কথা বলার সময় যে নীরেট ভয় দেখছে,এটাকে সে কিভাবে অবিশ্বাস করে?

লোকটাকে কাধে ভর দিতে বলে সে। আস্তে আস্তে রিসোর্টের দিকে আনতে থাকে।

রিসোর্ট এর কাছে এসে সে দেখে আশেপাশে কেউ নেই।একটু আগে এত লোক ছিল,তার স্ত্রী ছিল এখানে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তারা কোথায় গেল?

আশেপাশে সব ভয়াবহ নিস্তব্ধ। নূর বলল,”হ্যালো? কেউ আছেন? মায়া? কোথা সব?”

কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আশেপাশে।

লোকটাকে কাধে করে নূর হাটতে লাগল। কেন জানি একটা শীতল আতংক ওর বুকে এসে চেপে বসল।

“মায়ায়ায়ায়ায়া,কোথায় তুমি?”

কেউ সাড়া দেয় না। লোকটাও কাপছে। নূর বুঝতে পারল সেটা।

হঠাৎ রিসোর্ট এর কোনায় মন্তুকে দেখতে পেল নূর। একদৃষ্টে চেয়ে আছে নূরের দিকে।

“মন্তু,মন্তু,,, আমি কিছু বুঝছি না,সবাই কোথায়,মায়া কোথায়? তুমি কিছু জানো?”

মন্তু কিছু না বলে ওর পিছে আসতে ইশারা করল। মন্তুর পিছু পিছু নূর আর লোকটা হাটতে লাগল।

কতক্ষণ হাটল জানে না নূর। হঠাৎ ওরা বিশাল একটা ফাকা জায়গায় চলে এল বনের মধ্যে। পাশের পাহাড়ে একটা ভাঙা পোড়ো মন্দির। নূরের পাশের লোকটা গুমড়ে উঠল। “এটাই সেই জায়গা,, এটাই,, আমি আবার এখানে ফিরে এসেছি,, না, না,, নাআআআআআআ”

ফাকা জায়গার অপর পাশে আগুন জ্বলছে, বড় বড় ডেকচি ভর্তি পানি ফুটানো হচ্ছে,,, সারি সারি বার্বিকিউ মেশিন।আর অনেক মানুষ এর কান্নার শব্দ,মাঝে মাঝে চিৎকার।

লোকটাকে রেখেই নূর দৌড়ে সামনে গেল। চিৎকারটা চেনে সে। ওর স্ত্রী মায়ার চিৎকার।

ও যখন ওখানে পৌছালো। মায়াকে অলরেডি মাটিতে শুইয়ে হাত পা চেপে রেখে কুরবানির গরুর মত গলায় ছুরি চালানো হচ্ছে, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে,,

নূর এর মুখ নিঃশব্দ চিৎকারে হা হয়ে গেল।

বিয়েবাড়িতে যেভাবে ছাগল গরু বেধে রাখা হয়, তারপির একটার পর একটা নিয়ে এসে জবাই দেওয়া হয়,পাশে কিছু জায়গায় চামড়া ছিলা হয়ে,কিছু জায়গায় মাংস কাটা হয়,, এরকম বিভিন্ন জায়গা পৃথকভাবে সাজানো। গরু ছাগলের জায়গায় এতদিন এই পাচ রিসোর্ট এ থাকা দম্পতিরা। যেখানে একের পর এক জবাই দেওয়া হচ্ছে, সেখানে রক্তের বন্যা বইছে, পাশে গাছে উলটা ঝুলিয়ে চামড়া ছেলা হচ্ছে, এর পাশে মাংস কাটা হচ্ছে, মাথা সাজিয়ে রাখা, ভুড়ি আলাদা করা। কাজ গুলো খুবই দ্রুত হচ্ছে। করছে, এই রিসোর্টগুলোর ম্যানেজার,কর্মী,বাবুর্চিরা,,,

কে যেন পিছন থেকে এসে  নূরকে জাপটে ধরল। পিছন থেকে পা ভাঙা লোকটা বলল,”এই সেই ভ্যানওয়ালা,,,”

নূর পিছন ফিরে মন্তুর বাবাকে দেখল। আতংকিত দম্পতিদের যারা বাকি আছে,তাদের সাথে নূরকে বেধে রাখা হল।দম্পতিগুলো গুমড়ে কাদছে। মিনতি করছে বাচার।

নূরকে ঘুষ দেওয়া রিসোর্ট মালিক আর বাকি রিসোর্টের মালিকরা রেস্টুরেন্ট এর ম্যানেজারের মত ড্রেস পরে সব তদারক করছে। মায়ার চামড়া ছিলে, মাথা আর ভুড়ি আলাদা করে, বিশাল এক গ্রিল মেশিনে শিক গেথে আগুনের উপর ঘুরানো হচ্ছে, মশলা মাখিয়ে,,আস্ত মুরগির গ্রিলের মত।

নূর বমি করে দিল।

রিসোর্টের এক মালিক আরেক মাকিককে বলছে, “ওনারা সবাই রাত ১১ টায় আসবেন, এর ভিতর সব রেডি করতে হবে, ওনাদের মিটিং হবে এক ঘন্টা, ১২ টার সময় খাবারের ডিশ গুলো পরিবেশন করতে হবে।”

আরেক মালিক বলল,”দুইজন আগে আসলেন কেন? আরেকটু হলেই তো তাদের জন্য সবাই পাকিয়ে যেত। একজন বনের ভিতর একা সাংবাদিক নূর আর তার স্ত্রীকে দেখে তেড়ে এসেছিলেন। আমাদের পুরোহিতের ছেলে সময়মত  থামিয়ে বলেছিল,এখন কিছু করলে এই খবর বাকি খাবাররা পেলে চলে যাবে।”

আরেক মালিক বলল,”হ্যা, উনি তাই কিছু করে নি। তবে স্পেশাল রিকুয়েস্ট করেছিলেন। নূরের স্ত্রীকে যেন শুধু তার জন্য স্পেশাল রোস্ট করা হয়…”

আরেকজন বলল,”আরেকজন যিনি আগে এসেছিলেন,তিনি তো খিদায় এত অস্থির হয়ে গিয়েছিলেন সে পুরোহিত কে বলে দিয়েছিলেন,এখনই খাবার ব্যবস্থা না করলে রিসোর্টে আক্রমন করে মানুষ খাওয়া শুরু করবেন।”

আরেকজন বলল,”হ্যা, এজন্যই ভ্যানে করে  ৪ দিন আগেই পুরোহিত ৬ জনকে নিয়ে এসেছিল এখানে। কিন্তু একজন পালিয়ে গিয়েছিল। পুরোহিতের ছেলে মঁন্তো এইমাত্র নূর এর সাথে ওকে দেখে নিয়ে এসেছে। ওই যে এখন ওকে জবাই দেওয়া হচ্ছে।”

নূর তাকাল। পা ভাঙা লোকটাকে শুইয়ে ফেলেছে ওরা।

প্রথম মালিক বলল,”তবে বলুন তো, পুরোহিতের ছেলেটা বোকার মত কাজ টা কেন করল প্রথমদিন। সাংবাদিক আর তার বউকে ওখানে নিয়ে গেল কেন? সবাইকে তো আগে থেকেই মানা করা ছিল।”

আরেকজন বলল,”বাচ্চা তো।রিচুয়াল বোঝে না সব। আস্তে আস্তে বুঝানো হবে। বুদ্ধিমান খাবারকে কখনো নিশ্চিত না হয়ে কসাইয়ের কাছে নিতে নেই।”

নূর তাকিয়ে রইল ওকে ঘুষ দেওয়া রিসোর্ট মালিকের দিক। মালিক সেটা দেখল।

সে হেটে আসল নূরের দিক। নূর ভীত চোখে তাকানো। মালিক বলল,” প্রতি ৪০ বছর পরপর পিশাচ দেব দেবীদের একটা সম্মেলন হয় এই জায়গায়।আমাদের পরিবার গুলো আর এখানকার উপজাতিরা অনেক শতাব্দী ধরে এদের সেবা করে আসছে আর এই সম্মেলনের সময় অতিথিপরায়ণতা দেখিয়ে আসছে। এখানে কোনো রিসোর্ট নেই নূর সাহেব, প্রতি ৪০ বছর পর পর মানুষ খাদ্য আনতে বিভিন্ন ভাবে আকৃষ্ট করা হয়। আগের যুগে পানশালা,পতিতালয়, ইত্যাদি বিনোদনের লোভ দিয়ে আনা হত,এখন এত জটিলতা নেই, ভ্রমণের পারফেক্ট স্থানের বিজ্ঞাপন দিলেই মানুষ আসে। স্পেশালি নবদম্পতিরা। একটু নির্জনতার খোজে।

আর পিশাচদের সম্মেলনস্থান থেকে নির্জন জায়গা কিই বা হতে পারে বলুন? আমাদের এখানকার কথা মানুষ গুজব হিসেবে ছড়িয়েও নির্জনতাটকে আরো গাঢ়ো করে।”

আশেপাশের পিশাচসেবকরা বলে উঠল, “ওনারা আসছেন,আসছেন,সবাই শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি নিন।”

মাত্র ৩ জন খাদ্য জীবিত ছিল তখন। মালিক বলল, “এই তিনজনের ভুড়ি বের করে সরাসরি স্যুপে দিয়ে দাও।ওনারা অপরিচ্ছন্ন,বিশৃঙ্খল কাজ পছন্দ করেন না।”

আকাশ বাতাস কাপিয়ে পৈশাচিক হাসি শোনা গেল। অনেক অপার্থিব কারো পদচারণায় বন,পাহাড় কেপে উঠল। পৃথিবীর প্রাকৃতিক যা কিছু আছে আতংকে নিশ্চুপ হয়ে গেল।

নূরের মুখ চেপে পেট চিরে ভুড়ি বের করে,বেচে থাকা বাকি এক দম্পতির সাথে ফুটন্ত গরম পানির ডেকচিতে তে সবজি আর মশলার সাথে ছুড়ে ফেলা হল।

গল্প ১২৭

​”বিকৃত মানসিকতার লেখকদের মৃত্যু চাই”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

ট্রলারে করে একদল মানুষ নদীর এক ঘাট থেকে অন্যঘাটে যাচ্ছে। এই ট্রলার ব্যবস্থা অনেকটা লোকাল বাসের মত। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাত তুললেই এসে তুলে নিবে, তা সে ২৫ জন ধারণক্ষমতার ট্রলার ছাপিয়ে ৬০/৭০ জন হলেও। ঈদের সিজনে তো কথাই নেই।

এমন এক ট্রলারে করে একবার যাচ্ছিলাম গ্রামের বাড়ি থেকে কাছাকাছি উপজেলা শহরে। অনেক দিন বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে বেড়াতে আসলে বুকটা একটু বৈদ্যুতিক আলো দেখতে হাঁসফাঁস করে। সেজন্যই শুধুমাত্র “লোকাল ট্রলারে” ওঠা। ২৫ জন ধারণ ক্ষমতার ট্রলারে তখন প্রায় ৪০/৪৫ জন হয়েছে।

বেশ কিছুক্ষণ ধরেই এক লোক আমি মোটা বলে গজগজ করছিল। আমার জন্য নাকি ৪১ জন দাড়াতে পারছে না। আমি নাকি একাই ৪১ জনের জায়গা দখল করেছি। 

আসলে যারা বিশাল মোটা হয়,তাদের সাথে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়,লাগতে আসে না।ভদ্র ভাষায়ও না,কারণ কখন মেজাজ খারাপ করে লাঞ্ছিত করবে বলা যায় না।সেই টাইপের মোটা যদি হতাম এই লোক এত গজগজ করত না।

যাই হোক,যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল।চিল্লিয়ে বলে উঠলাম,”আর একবার তোর মুখ থেকে একটা সাউন্ড পাই,তোরে আমি নদীতে ফেলে দেব।”

এটা আগে বললে এতক্ষণ চাপাচাপির মধ্যে দাঁড়ানো লাগত না। সাথে সাথে আমার আশেপাশের মানুষ গুলো সরে গেল। আশেপাশে খুব আরামদায়ক একটা জায়গা পেলাম। নদীর বিশুদ্ধ ঠান্ডা  বাতাস গায়ে লাগতে লাগল।

মোবাইল টিপছিলাম। নেট কানেকশন নদীর ভিতর পাওয়ার চিন্তা করা বৃথা। সে যে সিমই যত এডভার্টাইজই দিক না কেন। বসে বসে মোবাইলে ক্রিকেট খেলছিলাম। একটু পর পর চোখ তুলে সহযাত্রীদের দেখছিলাম। একটু আগেও ওই লোক যখন, “কি মোটার মোটা,এত মোটা লোকরে উঠায় কেন এরা,ট্রলার ডুবাইতে?” ইত্যাদি বলছিল,প্রত্যেকজনের মুখে অনাবিল হাসি আর বিনোদন ছিল, একটু আগে লোকটাকে চিল্লিয়ে থ্রেট দেবার পর এখন বাকিদের চোখ আমার ব্যাপারে একটা আতংক দেখছি। এটাই মানুষ এর ধর্ম। আপনি নীরব থাকবেন,সম্মান পেতে চুপচাপ থাকবেন,ভাল ব্যবহার করবেন,অপ্রয়োজনীয় কথা বলবেন না,মানুষ আপনার শরীরের কোনো খুত নিয়ে খোচাবে, শরীরের খুত না পেলে কার্যক্রমের খুত ধরবে সেটাও না পেলে,এমনিতেই বখাটেপনা করবে, সবাই না করলেও, অন্যদের বখাটেপনায় মজা নেবে।

অথচ এই ৫০ জন মানুষ এর মধ্যে আপনি চিল্লিয়ে রুখে দাড়ান,চাইলে আপনাকে এরা একসাথে ফেলে দিতে পারে,অপদস্ত করতে পারে।কিন্তু করবে না, যারা অন্যের অপমানে মজা নেয়,বা অপমান করাকে সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব মনে করে,তাদের প্রতিবাদের সাহস থাকে না।এই মানসিকতার জন্য এদেশে আসল অপরাধীরা ধরা পড়ে না,যাদের বিচার হয়,ম্যাক্সিমাম নিরাপরাধ হয়।

এখনো উপজেলা শহরে যেতে অনেক দেরি। ট্রলারের চালক আর হেল্পার এখনি সবার কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে নিল।

একটু পর হঠাৎ মানুষ এর হইচই শুনে মোবাইল থেকে আবার চোখ তুললাম। ট্রলারের বিপরীত দিক থেকে কি যেন একটা ভেসে আসছে নদীতে। ভাল করে খেয়াল করতেই বুঝলাম এটা একটা মানুষের লাশ। এতদিন শুনেই এসেছি নদীতে লাশ ভাসার গল্প। আজ চোখের সামনে দেখলাম

ট্রলারের পাশে যখন লাশটা এল। আমি একটু কোনায় এসে ভাল করে দেখার চেষ্টা করলাম। তখনই শুরু থেকে মোটা বলে আসা লোকটা একটা ধাক্কা দিল পিছনে। একদম মাঝনদীতে ছিল ট্রলার। নদীর মাঝখানে ঝপাং করে পড়লাম।

মানুষ গুলোর খ্যাকখ্যাক হাসি শোনা গেল। ট্রলার ভাড়া নেয়া হয়ে গেছে। ট্রলার আর থামল না।

আমি যদি সেসময় জাস্ট না চিল্লিয়ে লোকটাকে একটা ঘুষি দিতাম।ওর সাহস হত না এ কাজ করার। জীবনে এত অপরাধের শিকার হয়েছি,অপরাধীর প্রতি মানুষ এর নীরেট ভয় দেখেছি,তারপরও শিক্ষা হয় নি। অস্বাভাবিক গড়ন নিয়ে মানুষ এর তামাশার পাত্র হিসেবে বাচতে না চাইলে অপরাধ করতে হবে, নয়তো অপরাধের শিকার হতে হবে।

ছোট একটা গল্প বলি, বাসে নিয়মিত মেয়েদের শরীরে হাত দেওয়া এক গাঁজাখোরকে আমি চিনতাম। মেয়েরা কখনো যদি ওর কাজের প্রতিবাদের চেষ্টা করত, পকেট থেকে একটা ক্ষুর বের করে ধরত পেটের কাছে। মেয়েরা চুপ করে থাকত ভয়ে।পরের পুরোটা সময়,মুখ বুজে বিশেষ স্থানগুলোতে ছেলেটার হাত অনুভব করতে হত তার,চোখ ফেটে পানি এলেও কিছুই বলত না, আশেপাশের মানুষ দেখত লাঞ্ছনা।  ক্ষুরের ভয়ে কেউ কিছু বলত না।

এমনি একটা মেয়ে,যাকে আগে আমি ওই ছেলের হাতে মলেস্টেড হতে দেখেছি,তার সাথে আবার বাসেই দেখা হয়েছিল। আমার এক বন্ধু সেদিন সাথে ছিল। বন্ধুটির চরিত্র ভাল না খারাপ সেটা বলব না,একটা কথাই বলি, আমার বমি বমি আসছিল গরমে, একটা সিট ফাকা হয়ে গিয়েছিল, বন্ধুটা আগের রাত ঘুমায় নি ওর কি একটা পরীক্ষার জন্য পড়তে হয়েছিল বলে, সে এত ক্লান্ত হয়েও নিজে না বসে আমাকে ওই সিটে বসিয়েছিল আমার অসুস্থ লাগার কারণে। এবার তার চরিত্র সম্পর্কে যে যাই ভাবুক।

কিছুক্ষণ পর সেই মেয়েটা বাসে উঠল, আমার বন্ধুর সামনে। বাস হঠাৎ কোনী কারণে ব্রেক করায়,আমার বন্ধু সামনে হেলে পড়ে পতন ঠেকাতে মেয়েটার গা ধরে ফেলল।

আমার বন্ধু সরি বলার আগেই গালে ঠাস করে একটা চড় খেয়েছিল। বাসের কোকেরা ইভটিজার বলে কয়েকটা চড় থাপ্পড় দিয়ে ধাক্কা মেরে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিয়েছিল। কয়েকজন ছবিও তুলেছিল,বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট দিতে, জানোয়ারের বাচ্চা ক্যাপশনে….

যেই মেয়েটা একটা শয়তানের মোলেস্টিং মুখ বুজে সহ্য করেছিল, সে এক পুরুষের দুর্ঘটনায় তার গায়ে হাত তোলার অপরাধে এতটা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল। এ ঘটনা থেকে একটা শিক্ষা পাওয়ার আছে, আপনাকে মানুষ জানোয়ারের বাচ্চা ভাবলে,শুধুমাত্র জানোয়ারের বাচ্চা সাজলেই আপনি সমাজ ভর্তি জানোয়ারের অন্যায় থেকে বাচতে পারবে  নয়ত আপনাকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে এসমাজ বীর সাজবে,নয়ত ট্রলার থেকে ফেলে দিয়ে…. আর ট্রলার থেকে ফেলে দিলে মোবাইলটাও হারিয়ে যাবে।

ভেসে আসা লাশটা আমার সাথে ধাক্কা খেল। আতংকে মাঝনদীতে হিম হয়ে গেলাম। লাশটার হাত পা বাধা,উপুড় হয়ে ছিল এতক্ষণ, নদীর স্রোতের সাথে এসে আমার সাথে ধাক্কা খাওয়ায় কাত হয়ে আমার মুখের সামনে মুখ ফিরে গেল ওটার।

চোখ দুটো অক্ষিকোটর থেকে বের হওয়া।  হা হওয়া মুখে মৃত্যুর আগের চিৎকারের ছায়া। মুখমণ্ডল ফুলে নীল হয়ে আছে, হা হওয়া মুখে মাছির ডিম।

আতংকে গলার স্বর আটকে গেল। এত বড় নদীর মাঝখান থেকে পাড়ে ফেরার মত সাহস বা শক্তি আমার আছে কিনা আমি কখনো যাচাই করি নি।

প্রচন্ড আতংকেও লাশটাকে আমি ছাড়লাম না। প্রাণপণে আকড়ে রাখলাম প্রাণে বাচতে। মনে হচ্ছিল,লাশটা আর আমার মধ্যে জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক।

হঠাৎ আকাশ কাল হয়ে নিমিষে বজ্রপাত, বিদ্যুৎ এর ঝলক আর প্রচণ্ড কালবৈশাখী শুরু হল। নদী উথাল পাথাল করতে লাগল। লাশটার আতংকিত হা করা মুখ আর অক্ষিকোটর থেকে বের হওয়া চোখ আমার মুখের দিকে স্থির হয়ে চেয়ে রইল।

ভয়াবহ ভূতের ছবির সাথে একটা মানুষ এর পচা লাশের মুখ বাস্তবে নিজ মুখের সামনে ভেসে থাকার তুলনা করা যাবে না। বাস্তব অনেক বেশি ভয়ের।

প্রাণের তাগিদে বিকৃত লাশটাকে চেপে ধরলাম। ঝড়ের প্রকোপ বেড়ে গেল আরো। 

কতক্ষণ কাটল জানিনা। একমুহুর্তের জন্যও লাশটার দিক থেকে মুখ সরে নি।এক মুহুর্তের জন্যও আকড়ে থাকা হাত শিথিল হয় নি।

ঝড় থামল। বৃষ্টি শুরু হল, লাশটা আর আমি এখনো মাঝ নদীতে,,, অন্ধকার হয়ে এসেছে, অজপাড়াগায়ে বৃষ্টির রাত নামছে…. 

কোত্থেকে একটা জেলে নৌকা এল। আমি পানিতে কাপছি ভয়াবহভাবে।  হাইপোথার্মিয়া হবে,,,, 

জেলে নৌকা থেকে জোরে দোয়া পড়ার শব্দ পেলাম। আমি দুর্বল কন্ঠে বললাম,”বাচাও।”

আমাকে নৌকায় তুলল কারা যেন। নৌকা ভর্তি মাছের আশটে গন্ধ। আমি ভয়াবহভাবে কাপছি। লাশটাকে শেষবারের মত দেখতে পেলাম না। আড়াল হয়ে গেল ওটা।

 নিজের মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর ও আমার জীবন বাঁচিয়েছিল।  ওর পচাগলা চেহারা আমি দুঃস্বপ্নে দেখি নি। দুর্ভাগা ছেলেটার প্রতি অপরিসীম একটা মায়া এসে গিয়েছিল। খুব করে চাইতাম, যদি ছেলেটার খোজ পেতাম। হয়ত পত্রিকায় নিখোজ বা গুমের খবরে পাওয়া যেত।

কয়েকদিন ধরে ইসলামিক সুপারহিরো ক্যারেক্টার বানাতে গিয়ে সবধরণের মানুষ এর সমালোচনা পেয়েছি। কেউ কেউ বলেছে, সুপারহিরোদের নামে বাংলা নামের জন্য বিশ্রী লেগেছে,কেউ বলেছে ধর্ম নিয়ে লেখেছি কেন,ধর্ম সব জায়গায় টানি কেন, কেউ বলেছে ইসলাম নিয়ে মিথ্যা বলবেন না, কেউ বলেছে, ইসলাম নিয়ে লেখি ভাল কথা,ইহুদি আর খ্রিস্টান ধর্মের মানুষ কে ভিলেন কেন বানালাম,এত সাম্প্রদায়িক কেন আমি, কেউ কেউ এতটাই ক্ষেপে গেল যে আমার প্রোফাইল ঘেটে এমন গল্প খুজে বের করল যেগুলোতে ভিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। অন্তত ভিলেনের নামটা হিন্দুদের মত। সেই গল্পগুলো ছড়িয়েও বিকৃত উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক বানিয়ে দিল। যদিও গল্পগুলো হয়ত ছিল রোমান্টিক বা হরর।

অনেকে থ্রেট দিল ইনবক্সে। জামাতশিবির করি কিনা জানতে চাইল। অনেক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী তাদের ধর্মকে অপমান থেকে রক্ষার জন্য ফটোশপ করে বিভিন্ন অশ্লীল ছবি আর ইসলামি ব্যাঙ্গ কার্টুন পাঠাতে লাগল।

শেখ মুজিবের ছবি দেখলেও লাইক দি,হাসিনার ছবি দেখলেও লাইক দিই, নিজামী,সাইদি,খালেদা,জিয়াউর রহমান সবার ছবিতে লাইক দিই,, কোটার পক্ষের,বিপক্ষের সব স্ট্যাটাসেই লাইক দিই, শাহবাগের পক্ষে বিপক্ষে সব পোস্টে।

তবে নিজামী-সাইদির ছবির লাইকের স্ক্রিনশট মানুষ এর মোবাইলে জমা হতে লাগল। কেউ কেউ তো আমার নামে সেলিব্রেটি পচানোর মত পেইজ খুলে আমার মা বাবা তুলে গালি দিতে লাগল। প্রোফাইলের পিক ডাউনলোড করে বিকৃত ছবিতে ফটোশপ করে বসাতে লাগল।

আমি বিকৃত মানসিকতার গল্পকার। আমার  সব গল্পে ধর্ষণ থাকে, সুতরাং আমি ধর্ষক, আমার ভালবাসার গল্পে একটা নেগেটিভ ক্যারেক্টার হিন্দু ছিল, সুতরাং আমি সাম্প্রদায়িক,  আমি আমার ধর্ম নিয়ে সুপারহিরো ক্যারেকটার তৈরি করি,সুতরাং আমি জঙ্গি।

তো এবার গল্প লেখা বাদ দিয়ে ফেসবুকে গোপনে ঢোকা শুরু করলাম। পুরনো গল্পগুলো ডিলিট করতে লাগলাম, ছবি গুলোও। এমন একসময় আমি তাকে খুজে পেলাম। আমার জীবন বাচানো সেই লাশটাকে….

একটা খুবই কম চলা জাতীয় পত্রিকার ৭ম পৃষ্ঠার বাম দিকের নিচের দিকে একটা খুব সুদর্শন ছেলের ছবি। নাহ,চোখ বের হওয়া নেই, হা করা মুখে পোকা নেই, ফর্সা মুখটা ফোলা আর নীল না। দাত গুলো উপড়ানো না। মিষ্টি একটা হাসি ছেলেটার মুখে।ছবির নিচে ৫ লাইনের কলাম। ৪ সপ্তাহেও মিলল বা মুহিদের সন্ধান। মা বাবা একমাত্র সন্তান হারিয়ে পাগল প্রায়।

মুহিদ তাহলে ছেলেটার নাম। পুরো নাম দেখলাম পেপারে। তারপর ফেসবুকে নাম টাইপ করে সার্চ দিলাম। অনেক গুলো আইডি পেলাম সেই নামের। শুধু আইডি না, পেইজও। পেইজ আর আইডি গুলোতে ছেলেটার ছবি ফটোশপ করে বিকট ছবির মাঝে বসানো। অশ্লীল আর হাস্যকর ভাষায় পোস্ট দেওয়া। এই ছেলেটাকে মানুষ ঘৃণা করত। ঠিক আমার মত। কেন?

আমি খুজতে লাগলাম। আসল আইডি টা কোথায়। 

খুজতে খুজতে পেয়ে গেলাম আসল আইডি টা। মোটামুটি ফেসবুক সেলিব্রেটিই বলা যায়। পোস্টগুলো তে লাইক,কমেন্ট আর শেয়ারের অপশন সব আছে, ছবিও পাবলিক করা। হুবহু আমার আইডির মত। তবে ফলোয়ার আর ফ্রেন্ড অনেক বেশি।

এই ছেলেটাকে নিয়ে এত ফেইক আইডি আর ট্রল পেইজ চলে।তবে টাইমলাইনে সে ব্যাপারে ছেলেটা বিন্দুমাত্র কিছু পোস্ট করে নি। হ্যা,এটা আমার সাথে ব্যতিক্রম তার। আমাকে নিয়ে কেউ এরকম করলে আত্মহত্যার লাইভ ভিডিও দিতাম। কিন্তু ছেলেটা পাত্তাও দেয় নি। তাকে হাত পা বেধে দাত উপড়ে,চোখ গেলে নদীতে কেউ কেন ফেলল?

আমি পোস্টগুলো পড়তে লাগলাম।

“আমি বিশ্বাস করি না,যেসব মেয়ে নিজেদের ধর্ষিত হবার গল্প বলে,বা এটেম্পটের গল্প বলে,তাদের কেউই ভুক্তভোগী। কারণ যেসব মেয়েদের সাথে এমন ঘটনা ঘটে,তারা কখনওই মুখ খুলবে না। সমাজের ভয়ে। যে যাই বলুক, যতই আধুনিক হোক, সব সমাজেই রেপ হওয়া মেয়েদের আলাদা চোখে দেখা হয়,এমনকি রেপ এর এটেম্পট নিলেও। ভাল ঘর এর ছেলেরা বিয়ে করে না। আলাদা টানের কথা প্রকাশ করে যে ছেলেরা এগিয়ে আসে, তারা বিয়ে করলেও এক দুই বছরের মধ্যে ছেড়ে দেয়। রেপ হওয়া মেয়েদের প্রতি বিকৃত যৌনতা বোধ থেকেই এটা করে তারা। এবং পুরুষের সত্যিকারের লালসার শিকার হওয়া সব মেয়েই কথাটা বোঝে। তাই সে যতই নারীবাদী হোক,কখনওই স্বীকার করবে না রেইপ হয়েছে।

যারা ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপে এসব লিখে,জাস্ট ফলোয়ার বাড়াতে করে। কারণ তারা জানে,তারা বিয়ে করবে এমন কোনো চাকরিজীবী পুরুষকে,যারা ফেসবুক ঘেটে মেয়ের চালচলন দেখার অবকাশ পাবে না। মাঝপথে সেলিব্রেটি হলে ক্ষতি কি?”

পোস্ট পড়ে আমি শকড। সবার মনের কথা এগুলো। প্রত্যেকটা কথা।কেউ স্বীকার করুক বা অস্বীকার করুক। 

কমেন্ট সেকশনে গ্রাম্য মানুষ রাই শুধু সাপোর্ট করেছে একে। শহুরে মানুষ রা সবাই একযোগে বিরোধিতা করেছে। বিভিন্ন গালাগালি করা হয়েছে। ছেলেটার মা বা বোন রেইও হয়েছে কিনা এসব জিজ্ঞেস করা হচ্ছে।

আমি জানি যেসব ছেলে শক্ত ভাষায় গালি দিয়ে সেলিব্রেটির বিতর্কিত পোস্টে কমেন্ট করে,তাদের কমেন্টের আকর্ষণে মেয়েরা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। এই মেয়েদের মধ্যেই ভবিষ্যৎ এ কেউ সাইবার ক্রাইম বা সত্যিকারের মোলেস্টের শিকার হয়, কাহিনীগুলো অজানা থাকে। কারণটা লেখকের পোস্টেই বলা।

আমি আরো পোস্ট পড়তে লাগলাম। 

“গ্রুপে কিছু ছেলের ছবি তুলে পোস্ট দিলেন,এরা জানোয়ার। এরা বখাটে,এরাই ভবিষ্যতের রেপিস্ট। এদের জুতাপেটা করে পুরুষাঙ্গ কেটে দেওয়া উচিৎ।  আপনি কি মনে করেন,যারা আপনাকে নষ্ট করার উদ্দেশ্যে আপনার পিছু নেয়, আপনাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে পিছু নেয়,তারা আপনাকে ছবি তোলার সুযোগ দেবে? বাসে ভিড়ের ফাকে শক্ত হাতে যারা আপনার শরীরে হাত দেবে, এক্সপার্ট হাত দিয়ে, আপনি তাদের ছবি তুলতে পারবেন? কয়টা ধর্ষণের বিচার হয়েছে? আপনারা চিল্লান, এদের উপযুক্ত শাস্তি হয় না বলে ধর্ষণ বাড়ছে। আসলেই কি তাই? নাকি এরা ধরা পড়ে না বলে শাস্তি হয় না,কোনটা?

অপরাধীকে ধরিয়ে দেবার প্রচেষ্টায় নিরাপরাধ কারো উপর আপনার অপরিপক্ব মস্তিষ্কের ধারণা অনুযায়ী অন্যায় করেন না। অনেক সময় মনে ভুলে আপনারা আল্লাহর আরশ কাপিয়ে দেন।

যে অপরাধীদের আইনের প্রশিক্ষণ পাওয়া লোকেরা ধরতে পারে না,ধরলেও কয়েকদিন পর বীরবিক্রমে হেটে বেড়ায়,তাদের ছবি তুলে গালাগালি দিয়ে আপন পোস্ট করতে পারবেন? তারা এই সুযোগ দেভে আপনাকে? এত সহজ!”

এই পোস্টের কমেন্টে ছিল,”এই শালায়ই বাসে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়।”  

“বখাটে একটা ছেলে”

আমি আরো নিচে নামতে লাগলাম, পোস্ট পড়তে লাগলাম।

“ভয় পাই না আমি কাউকে, সত্য বলা থেকে পিছুপা হব না। দরকার হলে আমিও তারেক ভাইয়ের মতই হারিয়ে যাব।সত্য বলা থামাব না।”

তারেক ভাই কে?

এরপরের কিছু পোস্ট দেখলাম ইসলামিক পোস্ট।হাদিস দিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণার ব্যাখ্যা দিয়ে পোস্ট।

“ইসলামের সাথে জঙ্গি মিলাবেন না। ইসলামে মানুষ খুনের শাস্তি আজীবন জাহান্নামের আগুনে জ্বলা। অনেকে আবার আয়াতের রেফারেন্স দেয়, “যেখানে বিধর্মী দেখবে,হত্যা কর।” সূরা তাওবার আয়াত এটা। এটা কেন বলেছে?  সাধারণ ব্যাপার, সেসময় বিধর্মীদের সাথে যুদ্ধ চলছিল। কিন্তু মুসলিমরা যুদ্ধে যেতে দ্বিধায় ছিল। ওদিকে যুদ্ধে না গেলে গুটিকয়েক মুসলিমকে বিধর্মীরা নির্বিচারে মারত। কেন মুসলমানরা দ্বিধায় ছিল? কারণ আগে নাযিলকৃত আয়াতে বারবার বলা হয়েছে, “মানুষ হত্যার শাস্তি আজীবন জাহান্নামের আগুণ।”  “যে ব্যক্তি একজন মানুষ মারল,সে যেন গোটা মানবজাতি কে মারল” ইত্যাদি। মানুষ হত্যার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা যখন এসেছেই, যুদ্ধে মানুষ হত্যা কিভাবে করবে তারা?

তখন সূরা তাওবার আয়াত এসেছিল, এই যুদ্ধ অস্তিত্ব রক্কার যুদ্ধ। তুমি যদি নিজেকে আত্মরক্ষা না কর,তুমি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, আর তোমাকে শেষ করতে আসা লোকেরা তোমরা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ ময়দান ছাড়বে না। তোমাদের শেষ করেও তারা থামবে না,তোমাদের পরিবার ধরবে। যুদ্ধ ঘোষণা হয়ে গেছে, তোমাদের বিরুদ্ধে, তোমরা ঘোষণা কর নি।যুদ্ধে বাচতে হত্যা করতেই হবে,এবং সেটা যুদ্ধ ময়দানেই সীমাবদ্ধ। পরের আয়াতেই আবার বলা আছে, “নারী,শিশু, বৃদ্ধ কে স্পর্শ করবে না, কোনো বিধর্মী যদি অস্ত্র ফেলে দিয়ে তোমার কাছে জীবন ভিক্ষা চায়। নিজ দায়িত্বে তাকে যুদ্ধ ময়দান থেকে নিরাপদে সরিয়ে দেবে। তোমার কাছে আশ্রয় চাওয়া মানে তোমার প্রভুর কাছে আশ্রয় চাওয়া। এরপর যদি সে খুন হয়, তুমি রোষানলে পড়বে তোমার প্রভুর।”

আমি পোস্ট পড়ে হা হয়ে রইলাম। এত সুন্দর ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারে?  

প্রত্যেকটা পোস্ট পড়লাম আমি, সব পোস্ট ইসলামের ব্যাপারে মানুষ এর ভুল ধারণা অত্যন্ত সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।

সমাজে ঘটা অন্যায়গুলোর কারণ আর প্রতিকার এমনভাবে বলা আছে পোস্টে, যা করলে অন্যায় প্রতিরোধ হবে। তবে পয়েন্টগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এঙ্গেলে লেখা।

“কোনো গ্রুপ সংঘবদ্ধ হয়ে চুরি,ডাকাতি বা অপহরণ করছে? তাদের গ্রেফতার করে,লাভ হবে না। শাস্তি দিয়েও না,তারা বের হয়ে আবার একই কাজ করবে।তাদের চিহ্নিত করে তাদের পরিবারের কাছে যেতে হবে। তারা অন্যদের জিম্মি করে? তাদের পরিবারকে জিম্মি করুন। আপনাকে মুক্তিপণ চেয়ে ফোন দিবে, আপনিও তাদের মা বাবা বা বাচ্চার কন্ঠ শুনিয়ে দেন। এই প্রথা সমাজে শুরু হলে চুরি,ডাকাতি,অপহরণ কিছুই হবে না।

আবার বলছি, অপরাধ যারা করে হঠাৎ করে করে না। জাত শয়তানগুলোই অপরাধ করে। শয়তানের সাথে ভাল মানুষ পারবে না। মানুষ কে পরীক্ষার জন্য আল্লাহ শয়তানদের অসামান্য শক্তি দিয়েছেন। সুতরাং শয়তানকে ঠেকাতে শয়তানের সাথে শয়তানি করতে হবে।”

প্রোফাইল ঘেটে পড়া বিভিন্ন পোস্টের এক পর্যায়ে “তারেক ভাই” নামক শব্দটা অনেকবার পেলাম। ছেলেটা তারেক ভাই নামে কারো ভক্ত ছিল। কিন্তু এই তারেক ভাই এর প্রশংসা করা পোস্ট গুলোর আগে এক পর্যায়ে বেদনার্ত  পোস্ট করা হল।তারেক ভাই নিখোঁজ হয়ে গেছে।

ছেলেটার বিভিন্ন পোস্ট দেখে আমি তারেক নামে কাউকে সন্ধান করলাম। 

এই তারেক ছেলেটাও লেখক।  বড় বড় রচনা লিখত। ডানপন্থী পোস্ট। বাংলাদেশিজমে ভরা এক একটা শব্দ। দেশের এক নম্বর শত্রু হিসেবে ভারতকে নির্দেশ করা। যাই ঘটে, বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে, যুক্তির মাধ্যমে ভারতকে দায়ী করা। তবে আমার কাছে কোনো যুক্তিই অযৌক্তিক লাগল না।

“পেয়াজের ফলন বাংলাদেশে কম হত না। চাষীরা সিজনে প্রচুর পেয়াজ ফলাত। কিন্তু দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে পেয়াজের দাম যখন একটু বেড়ে গেল,ভারতীয় পেয়াজ কেজিতে ১০ টাকার কিমে বিক্রি শুরু হল। কয়েক বছর চলল সস্তা পেয়াজের আমদানি। দেশি পেয়াজ কেউ খায় না দেখে,চাষীরা আস্তে আস্তে পেয়াজ চাষ ছেড়ে দিল। পেয়াজের জন্য পুরোপুরিভাবে আমরা ভারতনির্ভর হয়ে গেলাম।সাথে সাথে ভারতীয় পেয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে ১০০ টা হয়ে গেল (তারিখ দেখে বুঝলাম,সেসময় ১০০ টাকা কেজিতে পেয়াজ বেচা হচ্ছিল)

এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট।  পেয়াজ দিয়ে শুরু,তারা দেখছে এত দামী পেয়াজ এর সমস্যার ব্যাকাপ কি আছে দেশে। আস্তে আস্তে পেয়াজ ছেড়ে চালে যাবে,ডালে যাবে,মাছে যাবে, একই কাজ করবে। আর দেখবে, দাম বাড়িয়ে বা রপ্তানি বন্ধ করলে এই দেশ কিভাবে সামাল দেয়। তারপর আবার দাম স্বাভাবিক করবে তারা। আর এই ফাকে ব্যাকাপগুলোকে গোপনে ধ্বংস করবে। তারপর আবার রপ্তানি বন্ধ করে দেবে। ব্যাকাপও নাই। দেশে দুর্ভিক্ষ হবে। রাহাজানি,লুটতরাজ হবে। সেভেন সিস্টারের জায়গায় ভারতের এইটথ সিস্টার হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ নামক কোন এক রাষ্ট্র”

গলা শুকিয়ে গেল। কিসব কথা লিখছি তারেক নামে ছেলেটা?আরো স্ক্রল করতে লাগলাম। আরো পোস্ট পড়তে হবে।

” ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রচন্ড লড়াই করে বাংলা ভাষা পেয়েছিলাম আমরা? কেন আমরা তখনকার বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আর সম্মানিত এক শাসকের বিরুদ্ধে গিয়ে উর্দুর বদলে বাংলা প্রতিষ্টা করতে পেরেছিলাম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে?

কারণ পাকিস্তানিরা জোর করে জবরদস্তি করে বলেছিল, বাংলা দ্বিতীয় ভাষা হবে, উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা। সাথে সাথে বাংলাদেশিরা বুঝেছিল,যদি উর্দু একবার রাষ্ট্রভাষা হয়ে যায়, এই ভাষা ছড়িয়ে যাবে বই পুস্তক,পত্রিকা,ম্যাগাজিন,মিডিয়া,সবখানে, আকড়ে ধরবে আশপাশ দিয়ে, উর্দুর উপর ভিন্নভাষীরা নির্ভর করে থাকলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক থেকে কখনোই উপরে উঠতে পারবে না।

বাংলাদেশিরা বুকের রক্ত দিল। তবে পাকিস্তানিরা যদি একবারে জোর না করে, সিনেমা,গান,কার্টুন,নাটকের মধ্য দিয়ে উর্দু ভাষাটাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিত তাহলে কি হত?

যেই প্রজন্ম ৫২ সালে জন্মে ৭১ এ যুদ্ধ করেছিল। তারা বেড়ে উঠত উর্দু শুনে শুনে। উর্দু গান,উর্দু সিনেমার কাহিনীর আড্ডা মেরে মেরে। তারা কখনোই বুঝত না, তাদের উপর অন্যায় হচ্ছে। উর্দু তাদের গ্রাস করছে।দেশ স্বাধীন হত না। সারাজীবন পাকিস্তানিদের গোলানী করতে হত।

সেদিন এক বাচ্চা মেয়েকে স্কুলে যাবার পথে নিজের বাবাকে বলতে শুনলাম,” ম্যায় স্কুল নেহি জায়ুঙ্গি,ইতনি সুবহে মে বহৎ তকলিফ হোতি হ্যায়…”

বাংলা ভাষা আর স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ কি?”

এই তারেকের পোস্ট কয়েকদিন পর বিলুপ্ত হল। আর কোন পোস্ট পাওয়া গেল না।

যেদিন থেকে পোস্ট পাওয়া যাচ্ছিল না,সেদিন থেকেই মুহিদ তারেককে নিয়ে বিমর্ষ পোস্ট দিচ্ছিল। বলছিল, তারেক এর আত্মার মঙ্গল হোক।

তারেকের মৃত্যু সংবাদ তো দেখলাম না। তারেকের প্রোফাইল ঘেটে তার কাজের প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় ক্লিক করলাম। অনেক আগে একটা মাত্র পোস্ট তারেকের ছবি দিয়ে, “আমাদের তারেক ভাইকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না,সবাই দোয়া করবেন। তার পরিবার পাগলপ্রায়।”

ব্যস,তারেকের আর সারাশব্দ নেই।

তারেকের পোস্টের সূত্র ধরে আমি মুহিদের ফেসবুক পোস্ট গুলো পড়লাম। ইসলাম ধর্ম, সমাজ সংস্কার, দেশপ্রেম,ভারতবিদ্বেষ,নাস্তিকবিরোধীতা, এই সংক্রান্ত পোস্টগুলো যেন একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে মশালের মত হাত বদল হয়েছিল।

তারেকের প্রোফাইল ঘেটে আমি এক দেড় বছর আগে গিয়ে আরেকজন লোকের নাম পেলাম। এই লোকের নাম হাবীব। এই লোকের ফেসবুক প্রোফাইল নেই। তবে তারেক এই লোকের প্রতিবেশি ছিল। এই লোকের কথা গুলো সে ফেসবুক পোস্ট আকারে লিখত সেসময়।

এই লোকের কথা গুলোতেও আমি একই প্রসঙ্গ পেলাম। মুহিদ,তারেক,হাবীব সবার চিন্তাধারণাই এক। সবাই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই সমাজকে দেখে। অত্যধিক প্রচলিত ধর্ম সংক্রান্ত ভুল ধারণাকে রেফারেন্স সহ ভাঙে। ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করে। এবং এই ৩ জনই নিখোজ। এর মধ্যে তো মুহিদের লাশ আমি নিজে দেখেছি। সে আমার জীবন বাচিয়েছিল।

আমি একটা গল্প লিখলাম। গল্পের প্লট এমন ছিল যে, তিনজন লেখক ইসলামপন্থী, ভারতবিদ্বেষী, আর তাদের যুক্তি গুলো তুলে ধরা হচ্ছে। যুক্তি এবং গল্পের কাহিনী অসমাপ্ত রেখেই এরা উধাও হয়ে যাচ্ছিল….

গল্পটা নিয়ে আমি এক প্রকাশকের কাছে গেলাম। বেশি একটা জনপ্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান না। নতুন লেখকের বই প্রকাশ করে,যাদের বইয়ে ইসলামিক ইলেমেন্ট থাকে।

আমি প্রকাশককে গিয়ে গল্পের প্লটটা বললাম। বললাম যে, তিনটা একই চিন্তাধারার লেখক তাদের লেখালেখি দিয়ে যখন মানুষ কে ক্ষেপিয়ে তুলছিল,একটার পর একটা গায়েব হয়ে গেল।

প্রকাশক বলল,”ইসলামবিরোধী লেখা লিখে কিন্তু প্রকাশ্যে খুনের মত ঘটনা আছে এদেশে। সেই সব খুনের প্রতি মানুষ বেশি সেনসিটিভ ছিল।”

আমি বললাম,”একজাক্টলি। ইসলামকে অপদস্ত করা লোকদের খুন হয়েছিল প্রকাশ্যে। আর এজন্য তারা সিমপ্যাথি তো পেয়েছিলই, এর সাথে তাদের ইসলামবিরোধী কদর্য কথা গুলো মানুষ এর ভিতর জনপ্রিয় হয়েছিল।আপনি যদি উগ্রবাদী লেখা লেখেন,আর এজন্য খুন হন। মানুষ আপনাকে সম্মান দেবে জানলে,আপনার লেখার প্রতি আলাদা আকর্ষণ আসবে। এজন্যই ইসলাম এর পক্ষে লেখা লোকগুলোকে প্রকাশ্যে খুন করা হয় নি। খুন করলে তাদের বই, তাদের ফেসবুক,ব্লগের পোস্টগুলো মানুষ পড়ত,অনেক কিছু জানত এবং ফলো করত। তারমানে কেউ একজন চাচ্ছে ইসলামবিরোধী কথাগুলো জনপ্রিয়তা পাক,আধুনিকতা,চেতনাধারী লেখা গুলো। আর ইসলামের পক্ষের শক্তিশালী কথাগুলো হারিয়ে যাক। তাই ইসলামের পক্ষে যারা কথা বলছে,তাদের সরিয়ে গোপনে খুন করা হচ্ছে,যাতে তাদের কন্ঠ পাবলিকের কাছে না আসে,তারাই আবার ইসলামবিরোধী দের খুন করছে সবাইকে দেখিয়ে, সিম্প্যাথি অর্জনের জন্য এবং এভাবে তাদের মতবাদকে প্রচার করতে, বুঝছেন কথা টা? কতবড় থ্রিলিং একটা প্লট?

প্রকাশক হা করে রইল। বলল,”একটা বিতর্ক চলে আসবে, মানুষ নিখীজ হওয়া লোকদের লাশ না পেয়ে বলবে,এরা যেহেতু ইসলামিক, তাই এরা আই এসে যোগ দিছে লুকিয়ে।”

আমি বললাম,”বলবে। তবে এই কথার চেয়ে আমার যুক্তিটা বেশি শক্তিশালী। ”

প্রকাশক বলল,”মনে রেখ,যে ছেলেগুলো ইসলামিক কথা বলছে,তারা কিন্তু সমাজে বর্তমানে চলে আসা প্রচলিত স্পর্শকাতর ব্যাপারগুলো নিয়ে এমনভাবে কথা বলেছিল,যেগুলো কে কেউ মানবে না। অজনপ্রিয় দৃষ্টিভঙ্গি।  এই ছেলেরাই যদি একটা গল্পের নায়ক হয়ে ইসলামিক কথাবার্তা বলে,তাদের প্রতি কিন্তু ঘৃণা এমনিতেই আসবে।”

আমি বললাম,”গ্যালিলিওর সারাজীবন ধরে বলে আসা পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে,এটার জন্য অনেক অত্যাচার সইতে হয়েছিল তাকে। তার মৃত্যুর অনেক বছর পর মানুষ বুঝেছিল সেই সত্য ছিল। সত্য কখনো চাপা থাকে না।”

আমি আর প্রকাশক যখন কথা বলছি,তখন অফিসের বাইরে একটা লোক ঘোরাঘুরি করছিল বেশ কিছুক্ষণ।

হঠাৎ প্রেসে ঢুকে সে একটা বই হাতে নিয়ে একে ঈকে জিজ্ঞেস করতে লাগল কি যেন। আমি আর প্রকাশক মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। হঠাৎ এক কর্মী ভিতরে এসে বলল,”স্যার একটা লোক, জসীম ভাইয়ের ঠিকানা চাচ্ছে।”

প্রকাশক বলল,”কেন?’

কর্মী বলল,”বলে,সে নাকি তার দেশের লোক।”

প্রকাশক বলল,”বলে দাও,ঠিকানা নেই এখানে।”

আমি প্রকাশককে বললাম,”জসীম ভাই কে?”

প্রকাশক বলল,”নতুন এক লেখক। নাস্তিকদের ইসলামের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের বিপক্ষে ইসলামের দিক দিয়ে বৈজ্ঞানিক আর গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বই লিখেছে। বেশ হিট হয়েছে বইটা।”

আমি বই এর এক কপি চাইলাম। তারপর বাসায় চলে আসলাম। আর গল্প লেখা শুরু করলাম।

প্রথমে হাবিব নামের লোকটার বর্ণনা দিলাম।এই লোকটা লেখক না। এক শিক্ষিত বেকার। যে চায়ের আড্ডায় ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত। হাদিস কোরআন এর উল্লেখযোগ্য রেফারেন্স তার মুখস্ত ছিল।তার কিছু ব্যাখ্যার বর্ণনা আমি তারেকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে তুলে দিলাম। একরাতে বাইরে গিয়ে সে আর ফেরে নি। পুলিশ,পরিবার সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছে। আমার ধারণা কোনো এক নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে সে ফুলে ঢোল হয়ে।

এরপর আসলাম তারেকের কথায়। তারেক হাবীব যেখানে শেষ করেছিল, সেখান থেকে শুরু করেছিল। ইসলামের ব্যাপারে প্রচলিত ভুল ধারণার বিরুদ্ধে যৌক্তিক ব্যাখ্যা।তারপর সেই ব্যাপারটা থেকে সে চলে গিয়েছিল ভারতবিদ্বেষে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙা ঘটানোর কয়েকটা ব্যর্থ প্রচেষ্টার কথা ছিল তাতে। আর সাথে দাঙার দামামা বাজার প্রারম্ভে ভারতীয় পত্রিকার এমন কিছু খবরের বর্ণনা,যা বাংলাদেশের স্থানীয়দেরও অজানা ছিল। দুইটা মিলিয়ে ঘটনার পিছনে ভারতের হাত এর প্রমাণ পাওয়া যায় তার লেখায়,,,

কলকাতার পেপারে দাঙার আগে আগে বলা হয়েছিল হিন্দুরা নাকি মসজিদে ঢুকে কোরআন পুড়িয়েছে। সেই অনলাইন খবর বাংলাদেশিরা গণহারে শেয়ার করেছিল। এই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে রাতের বেলায় আগুণ হাতে হিন্দুপাড়ায় রওনা দেয় কিছু যুবক। শেষে সেই মসজিদের ইমাম এসে ঘটনা যে গুজব এটা বলার পর দাঙাটা থেমে যায়।ইমামকে নাকি কয়েকদিন পর খুজে পাওয়া যায় না।

হায়দ্রাবাদ,সিকিম এই রাজ্যগুলো আগে স্বাধীন ছিল।ভারত দখল করার আগ মুহুর্তে দুইজায়গাতেই গুজবের ভিত্তিতে দাঙা হয়েছিল।

তারেককেও পাওয়া গেল না আর….

তারেকের পর ভারতবিদ্বেষ,ইসলাম এর ব্যাপারে ভুল ধারণার ব্যাখ্যার দায়িত্ব নেয় মুহিদ। সাথে যুক্ত করে সমাজে চেতনাধারী,নারীবাদী বা নারীদেহলোভী যৌনবিকৃতদের নারীদের “উদারমনা” এর টোপ ফেলে শিকার করার কাহিনী….

বয়ফ্রেন্ডের সাথে অবৈধ সম্পর্ক করা মেয়েদের তার বোকাসোকা স্বামীর মেনে নেবার কাহিনীকে ভালবাসার গল্প হিসেবে প্রচার করে। এই গল্পে মেয়েরা আকৃষ্ট হয়। মেয়েদের জিনগত বৈশিষ্ট্য হল আশ্রয় চাওয়া। জৈবিক কারণে তারা ভুল করতে পারে, কিন্তু এই ভুলটাকে মেনে নেবে এমন পুরুষের ফ্যান্টাসিতে ভোগে তারা। এটাকে টোপ হিসেবে ফেলে যৌনবিকৃতরা। সেই মেয়েদের উপর্যুপরি ভোগ করে। এই ধর্ষণের কাহিনী সামনে আসে না।

রাতের আধারে একা রাস্তায় হেটে যাওয়া মেয়েদের যৌনবিকৃতরা নষ্ট করে। তবে ছেড়ে দেয় না, মেরে ফেলে। নির্দিষ্ট কিছু লোক কাজগুলো করে।তারা কখনো ধরা পড়ে না,পড়লেও মুক্তি মেয়ে যায়। তবে পুরুষ যে জানোয়ার এই তকমা কপালে সেটে যায় নিরপরাধ পুরুষের। দুর্ঘটনায় গায়ে হাত পড়লে,তারা হয়ে যায় ধর্ষক। তাদের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়।

মুহিদকেও খুজে পাওয়া যায় না। মুহিদের লাশ নদীতে ভাসে, সে আমার নিত কাউকে লাশ হয়ে রক্ষা করে।

আমি এই লেখকদের পক্ষে লিখি। আমিও বিকৃত লেখক।

গল্প লেখা শেষ করে প্রকাশকের অফিসে গিয়ে শুনে। ইসমালবিরোধী মতামতের বিপক্ষে গাণিতিক আর বৈজ্ঞানিক যুক্তি দেওয়া জসীম ভাইকেই অয়াওয়া যাচ্ছে না।

গল্পটা জমা দিই না। আরো যোগ করি। জসীম ভাইয়ের কাহিনী। রাজুর কাহিনী,যে মহানবী (সাঃ) কে নিয়ে চটি লিখত, তাকে প্রকাশ্যে খুন করার পর জনগণ অনেক সিম্প্যাথি দেখায়, তার ইসলাম একটা জঙ্গি ধর্ম শিরোনামের লেখাগুলো মৃত্যুর পর জনপ্রিয় হয়ে যায়।

লিখলাম তূর্যের কথা। যে নাস্তিক্যবাদ আর আধুনিকতাকে দেশমুক্তির লক্ষণ আর ইসলামকে শিকল নাম দিয়ে লেখালেখি করত। এও প্রকাশ্যে খুন হয়েছিল।

যারা ইসলামবিরোধীতা করে,তারা প্রকাশ্যে খুন হয়। যারা ইসলাম প্রচার করে তারা নিখোজ হয়ে যায়,হয় তাদের বলা হয় জঙ্গিদলে যোগ দিতে গেছে, অথবা বলা হয়,ভুল বু্ঝতে পেরে তারা লেখা ছেড়ে দিয়েছে। তাদের লশ যে নদীতে ভাসে সেটা কেউ বলে না।উলটা ইসলামবিরোধী রা প্রকাশ্যে খুন হয়ে শহীদের মর্যাদা পায়।

আমি বলি, দুইটাই ইসলামবিরোধী নাস্তিকদের কাজ। তারা নিজেরাই  জঙ্গি সেজে ইসলামবিরোধী সহযোদ্ধাদের খুন করে সিম্প্যাথি পেতে,আর তারা যে ঠিক এটা প্রমান করতে। আর তারাই ইসলামের পক্ষে, ভারতের বিপক্ষে,আর আধুনিকতার কুফল নিয়ে লেখা ব্যক্তিদের নিখোজ করে দেয়।যাতে তাদের কন্ঠ চাপা পড়ে।

গল্পটা প্রকাশের পর আলোড়ন তৈরি হল দেশে। বিতর্কের ঝড় উঠল। হাতে কিছু টাকা এল। পুরোনো ডিজাইনের একটা দোতলা বাড়ি গ্যারেজ সহ এক বছরের জন্য ভাড়া নিলাম। বাইক কিনলাম। বাড়িতে শুধু আমি থাকি,আর দারোয়ান থাকে গেটের পাশের এক কুঠুরিতে।

একদিন মধ্যরাতে বাইকে করে  বাসায় ফিরলাম। দারোয়ান আমার সাথে গল্প করতে করতে গ্যারেজের কাছে এল। অবাক হলাম। এমন তো ওর করার কথা না। চুপচাপ থাকে তো সবসময়।

গ্যারেজের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। বাইক নিয়ে। সাথে সাথে দারোয়ান গ্যারেজের দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে থেকে তার কেটে দেবার শব্দ পেলাম।বাতি নিভে গেল। দারোয়ান আমাকে গ্যারেজে আটকে দিয়েছে। ও কি আমার বাসায় চুরি করবে কোনো সংঘ ডেকে এনে?

হঠাৎ বুঝে গেলাম কেন আমাকে বন্ধ করে দিয়েছে। ঘাড়ের কাছে একটা গরম বাতাস পেলাম। সাথে সাথে অন্ধকারে গ্যারেজের টিনের দেয়ালে ঝাপিয়ে পড়লাম। দড়াম করে নিশুতি রাত চিরে শব্দ ছড়াতে লাগল।

দারোয়ান বাইরে থেকে বলল,”ভাই,শব্দ কম করলে ভাল হইত।আপনার তো অভিজ্ঞতা আছে। শব্দ করাইয়েন না।।”

হামাগুড়ি দিতে লাগলাম অন্ধকারে।আর বুঝলাম ঠিক পিছে অন্ধকারর একটার পর একটা দায়ের কোপ বাতাস কেটে যাচ্ছে,অল্পতে লাগছে না গায়ে।

হামাগুড়ি দিতে দিতে দেয়ালে ঠেকলাম। আর যাওয়ার জায়গা নেই। দা টা রামদা। লোকটা বুঝে গেছে আমি আটকে গেছি,সে মেঝেতে দায়ের ধাতব শব্দ করতে করতে  এগোচ্ছে।আমার মৃত্যুভীতিটা আরো বাড়াতে।

আমি মোবাইলে করে বিভিন্ন সাইটে এডে ক্লিক করায় আজ ভুলে একটা অ্যাপ ডাউনলোড হয়ে গিয়েছিল। এই অ্যাপটার জন্য আমার ফ্লাশলাইট,মিউজিক,এসব নোটিফিকেশন বারে চিলে আসে। মোবাইলটা টাচ করে সেকেন্ডের ভিতর ফ্লাশ এ চাও দিলাম। অন্ধকার চিরে তীব্র আলো দা হাতে থাকা লোকটার চোখে পড়ল। সেই প্রকাশকের অফিসে জসীম ভাইকে খোজা লোকটা।

এই লোকটাকেই তাহলে ভাড়া করা হয় কিডন্যাপ আর খুন করতে। তবে আমি আমার গল্পে এদের প্লানের নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছি। আমাকে তাই ইসলামী লেখক হলেও গুম করে হাত পা বেধে নদীতে ফেলা হবে না। খুন করা হবে। আমি যে ভুল এটা প্রমাণ করতে। আমি নিশ্চিত এসব বস্তাপএপ্লান কোনো মাতালের মাথা থেকেই বের হয়।

লোকটার  চোখ ধাধিয়ে গেল। চোখ পিটপিট করল। এই সুযোগে আমি ওর উপর ঝাপিয়ে পড়লাম। ওর হাত থেকে দা টা ছিটকে গেল। আমি ওর গলা চেপে ধরলাম। আমার হাত চেপে ছুটাতে চাইল ও। জিভ বের হয়ে যাচ্ছে। পা ছুড়ছে। পা গিয়ে লাগছে টিনের দেয়ালে।

দারোয়ান বলল বাইরে থেকে,”ভাই,জবাই দিছেন নাকি? লাথি দেয় কেন দেয়ালে? সব রক্ত এখন পরিষ্কার করতে হইব।”

লোকটার পা ঝাকানো থেমে গেল। তাও আমি ওর গলা চেপে রাখলাম,ছাড়লেই যদি উঠে বসে?

অনেকক্ষণ পর দারোয়ান বলল,”ভাই, এবার বের হন। আজ ক্রসফায়ারে দুই জঙ্গি মরছে, এর লাশটাও ওদের সাথে রাখতে বলছে বস। জবাই দিলে তো ঝামেলা। ক্রসফায়ার কইয়া কেমনে চালাইবে? এরে জঙ্গি সাজাইতে হবে। নয়তো ওর লেখা বইটার জন্য ইনেক ঝামেলা পোহাইতে হবে।”

আমি চুপ করে থাকলাম। দা টা হাতে নিলাম। রাগে গা জ্বলছে। দারোয়ান জানে,এই কাজগুলো কে করায়,আজ সবার খবর আছে।

দারোয়ান বলল,”ভাই হইছে?”

আমি কথা না বলে শব্দ করলাম,”হুম”

দারোয়ান আস্তে আস্তে দরজা খুলল। আমি দা হাতে ঝাপিয়ে পড়লাম ওর উপর।

দারোয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল। আমি দা হাতে ওর গলায় চেপে ধরে বললাম,”ক্র পাঠিয়েছে,বল তোদের,,কে পাঠিয়েছে,এই প্লানগুলো কাদের,বল?”

দারোয়ান চোখ বড় করে রইল। আমি সামনে তাকালাম,ওখানে হা করে ৫/৬ জন পুলিশ দাঁড়ানো। এরা তবে অলরেডি চলে এসেছিল,আমার লাশ এ গুলি করে জঙ্গিদের সাথে রেখে দিতে। আমার বইটাকে জঙ্গি বই বলে আগুনে পোড়ানো হত,,,,

 পুলিশের বন্দুক আমার বুকের দিকে তাক হল। লাশের বুকে গুলি করলে ফরেন্সিক ডাক্তারকে টাকা খাওয়াতে হত।ভালই হয়েছে,ক্রসফায়ারটা সত্যিই হবে।

ট্রিগার টিপার আগ মুহুর্তে দারোয়ান দৌড়ে পালাল।আমি দা হাতে হা করে রইলাম।

আমি,মুহিদ,তারেক,হানিফ,,আমরা হয়ত আসলেই বিকৃত লেখক। ধর্ম হয়ত আসলেই মধ্যযুগীয় বর্বর বিষয়, আধুনিকতা হয়,আসলেই সমাজের সামনে এগোনোর চাকা। ভারত হয়ত আসলেই আমাদের বন্ধু। এগুলোই হয়ত সত্য। আমরা যে দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজকে দেখি সেটাই হয়ত মিথ্যা। 

এজন্যই মিথ্যাকে গ্রাস করা হচ্ছে এখন। জঙ্গি লেখক তকমা পেয়ে,আমার লাশটা জঙ্গির লাশ হবে।

আমরা বিকৃত মানসিকতার লেখক। পশ্চাৎপদ লেখক। আমাদের মৃত্যুই ভাল। প্রগতির বাধা হয়ে থেকে লাভ কি।

গল্প ১২৬

​”এপ্রিল ফুল”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

একটা মাল্টিন্যাশনাল গ্যাস উত্তোলনকারী সংস্থার বাংলাদেশি শাখার ইন্টার্ভিউ রুম।

অফিসে ঢুকতেই অনেক ফাঁকা কিউবিকল,যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের এম্পলোয়িতে ভরা থাকে।তবে এখন রাত ১১ টা বাজায় পুরোটাই ফাকা।কাচের দরজার কাছে দুইজন সিকিউরিটি গার্ড। কিউবিকল গুলোর একটায় গম্ভীরমুখো এক সিনিয়র অফিসার বসা।

ইন্টার্ভিউ রুমে ইন্টারভিউ হচ্ছে না। আজ সকালে এই সংস্থার দক্ষিণ আফ্রিকান ব্রাঞ্চে দীর্ঘদিন কাজ করা দুই বাংলাদেশি কর্মী অবশেষে দেশে ফিরে এসে দেশীয় ব্রাঞ্চটায় যোগ দিয়েছে। ইন্টারভিউ রুমে এখন এই দুইজনের সাথে এই ব্রাঞ্চের ম্যানেজার আড্ডা দিচ্ছে। এতরাত পর্যন্ত তাদের থাকার কথা ছিল না। কিন্তু সন্ধ্যায় অফিস টা ফাকা হবার পর থেকেই সারাদিন জুড়ে হুমকি ধামকি দেওয়া ঘনকাল মেঘ অবশেষে নিজের রাগ ঢেলে দিয়েছে শহরের ভিতর। সিনিয়র অফিসার,ম্যানেজার আর আজ এই ব্রাঞ্চে জয়েন করা অভিজ্ঞ কর্মীরা সম্মানের দিকে অফিসের সবার বড় হওয়ায় তাদের বাসায় পৌছে দিতে কোম্পানির গাড়ি ব্যবহার করা হবে। তবে ড্রাইভারকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না,ফোনও বন্ধ, অফিসে তাই এরা সেই সন্ধ্যা থেকেই আটকে আছে। অন্তত আজ জয়েন করা কর্মীদের সেটাই জানানো হয়েছে।

রুমটা বেশি বড় না। একটা দরজা,এক পাশের দেয়ালের পুরোটা জুড়েই কাচঢাকা জানালা। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি,সাথে ঝড়,একটু পরপর বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে।

একথা ওকথা বলে রাত ১২ টা বেজে গেল। বৃষ্টির তোড় এতটাই বেড়ে গেল,কাচটা ঝাপসা হয়ে আছে। ড্রাইভারের এখনো কোনো খবর নেই। গোমড়ামুখো সিনিয়র অফিসার হঠাৎ রুমের দরজা খুলে বলল,”আমি একটু রেস্ট রুমে যাচ্ছি,ড্রাইভার এলে ডেকে দিও।”

সিকিউরিটি গার্ড দুটো ঘুমিয়ে পড়েছে অফিসে ঢোকার দরজার কাছে। এক এপ্রিল শুরু হল।

আজ জয়েন করা কর্মী ২ কাচের বিশাল  জানালার কাছে গিয়ে বৃষ্টি দেখছে। আট তলা অফিসে বসে বৃষ্টি দেখায় নীচতলার আরাম নেই। তাও খারাপ লাগছে না।

ম্যানেজার কর্মী ১ কে বলল,”রাত ১২ টার বেশি,রাস্তা ফাকা, বাইরে বজ্রপাত,বৃষ্টি,বিশাল অফিসে আমরা ৩ জনই জেগে আছি,ভূতের গল্প হবে নাকি ভাই?”

কর্মী ১ মুচকি হাসল। “আচ্ছা বলুন, শুনি ভূতের গল্প।”

ম্যানেজার হেসে বলল,”না ভাই,আমি ভূত বিশ্বাস করি না, তবে এরকম আবহাওয়ায়,রুমটা অন্ধকার করে একটা ডিম লাইট জ্বালিয়ে ভূতের গল্প শুনতে খুবই পছন্দ করি। আপনারা তো দক্ষিণ আফ্রিকায় মাঠ পর্যায়ে কাজের তদারক অফিসার ছিলেন।দক্ষিণ আফ্রিকা তো মোটামুটি নির্জন, বন পাহাড় ঘেরা জায়গা,আছে নাকি স্টকে কোনো ভূতের গল্প?”

কর্মী ২ জানালা থেকে ফিরে তাকাল ওদের দিকে। মুচকি একটু হাসল। তারপর বলল,”আমি একটু পানি খেয়ে আসি…”

ম্যানেজার বলল,”বিশাল অফিস,নির্জন এখন। এইরকম গভীররাত,বাইরে বৃষ্টি। এসব পরিবেশ আমাদের হ্যালুসিনেশন দেখায় কিন্তু ভাই,ভয় টয় পেয়েন না। আমাদের অফিস কিন্তু ভূতুড়ে না।”

কর্মী ২ পানি খেতে রুম থেকে বের হয়ে গেল। সিকিউরিটি গার্ড দুইজন তাদের জায়গায় নেই। একটু অবাক হল সে। ফিল্টার থেকে পানি খাচ্ছে সে,তখনই বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে  ঝুম ঝুম করে নূপুর এর শব্দ শুনল সে।

চকিতে মাথা উচু করে তাকাল।একটা সাদা শাড়ি পরা নারী মূর্তি আস্তে আস্তে হেটে অফিসের অপরদিকে রেস্ট রুমের দিক যাচ্ছে।

কর্মী ২ এর খেয়াল হল,ওখানে তো গোমড়ামুখো অফিসারটা রেস্ট নিচ্ছে,অফিসে তো কেউ ছিল না। কে যাচ্ছে ওখানে?

কর্মী ২ অনুসরণ করতে লাগল। হঠাৎ নারীমূর্তি অদৃশ্য হয়ে গেল। রেস্টরুমের দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে খুলে গেল।কিন্তু ওখানে কাউকে দেখতে পেল না সে।

আস্তে আস্তে রেস্টরুমের দিকে এগোতে লাগল সে।খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকল।

গোমড়া মুখো সিনিয়র অফিসারকে কে যে দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে। বুকে রক্তের দাগ,মাথা নিচু করে ঝুলে আছে তার।

কর্মী ২ আস্তে আস্তে সিনিয়র অফিসারের কাছে গেল।কাপছে সে। একদম কাছাকাছি চলে গেল সে…

দেয়ালে টাঙানো গোমড়ামুখো সিনিয়র অফিসার হঠাৎ ভয়ংকর চোখে তাকাল কর্মী ২ এর দিকে। বিকৃত কন্ঠে বলল,”বাঁচতে চাইলে পালাও,,পালাও!!!!”

কর্মী ২ পিছনে ফিরে দৌড় দিতেই  রুমের দরজায় সিকিউরিটি গার্ড দুটোকে দাড়াতে দেখল। চেহারা মড়ার মত ফ্যাকাশে,,গাল বেয়ে রক্ত পড়ছে। ওরা হাত বাড়িয়ে আসতে লাগল কর্মী ২ এর দিক। কর্মী ২ আতংকে চোখ বিস্ফোরিত হয়ে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর সাদা শাড়ি পরা মহিলাটা নুপুরের শব্দ করে সারা অফিসময় আবার ঘুরে বেড়াতে লাগল। কর্মী ২ মাতালের মত হেলে দুলে ইন্টারভিউ রুমের দিক এগোতে লাগল।মহিলাকে পাত্তাই দিল না। কর্মী ২ এর চেহারাও মড়ার নত ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে…..

ইন্টারভিউ রুমে ম্যানেজার কর্মী ১ কে তখনো রিকুয়েস্ট করছে ভূতের গল্প শুনতে।কর্মী ১ এতক্ষণ ধরে এড়িয়ে যাচ্ছে রিকুয়েস্টটা,সে তার এই ব্রাঞ্চের কাজের ব্যাপারে খুঁটিনাটি আরো প্রশ্ন করছে।

এমন সময় ইন্টারভিউ রুমের দরজা খুলে গেল। ফ্যাকাশেমুখো কর্মী ২ একা একা যন্ত্রের মত রুমে প্রবেশ করল।

ম্যানেজার জিজ্ঞেস করল,”কি ভাই,পানি খেতে এত সময় লাগে?”

কর্মী ২ উত্তর দিল না। ম্যানেজার আবার জিজ্ঞেস করল,”কি ভাই? এত ফ্যাকাশে কেন লাগছে আপনাকে? ভূত টুত দেখলেন নাকি?”

কর্মী ২ এখনো নিশ্চুপ। ম্যানেজার বিস্ময়ের একটা হাসি দিল। কিছু বলল না আর।

কর্মী ২ যন্ত্রের মত কর্মী ১ এর দিক ফিরে বলল,”ভূতের গল্প বলুন…”

কর্মী ১ বলল,” আচ্ছা বলছি একটা ভূতের গল্প,,,”

কর্মী ১ শুরু করার আগে,কর্মী ২ বলল,”একটা খেলা খেলব চলুন। আমাদের ৩ জনের মধ্যে। ৩ জনই ভূতের গল্প বলবে। যে দুইজনের গল্প সবচেয়ে ভাল হবে তারা আজ অফিস এর গাড়িতে করে বাসায় যাবে, যার গল্প ভাল হবে না,সে সারারাত অফিসে রয়ে যাবে…”

কর্মী ১ ভাবল,ম্যানেজারকে জব্দ করতে কর্মী ২ একথা বলেছে। ম্যানেজার এই মাত্র স্বীকার করে নিয়েছে সে ভূত বিশ্বাস করে না। ভূতের গল্প শোনে কিন্তু বলতে পারে না। কর্মী ২ তার দীর্ঘদিনের কলিগ। সে জানে কর্মী ২ মজা করতে ভালবাসে। এখান থেকে পানি খেতে যাবার আগে ম্যানেজার তাকে ভয় দেখিয়েছিল,সেটার প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে।

কিন্তু ম্যানেজার অবাক করে দিয়ে বলল,”আচ্ছা রাজি। প্রথমে কে শুরু করবে?”

কর্মী ২ বলল,”আমি।”

ম্যানেজার আর কর্মী ১ বলল,”আচ্ছা,শুনি আপনার গল্প।”

কর্মী ২ বলল,”গল্পটা খুবই ছোট।  এক দেশে একটা গ্যাস উত্তোলন কোম্পানি ছিল। তাদের অফিস ছিল একটা ১০ তলা বিল্ডিং এর আটতলায়। তারা এই অফিসে আসার আগে,অফিসটা একটা ডিবি এর গোপন অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেসময় ডিবিতে একজন অত্যন্ত খারাপ চরিত্রের অফিসার কাজ করত। টাকার জন্য নিরাপরাধ মানুষজনকে ধরে নিয়ে আসত,তারপর ফ্যামিলির কাছে টাকা চাইত।না দিতে পারলে,বিভিন্ন ভয়ংকর মামলায় অজ্ঞাত আসামী পরিচয়ে ঢুকিয়ে দিত নিরাপরাধ ছেলেটাকে। আসল অপরাধী বেচে যেত। পুরো ঘটনাটাই ঘটত আসল অপরাধীর কাছ থেকে টাকা খেয়ে।

একদিন একটা এলাকার এই মাদ্রাসার শিক্ষককে জব্দ করতে সেই শিক্ষকের এক শত্রু এই অফিসারকে কিছু টাকা দেয়। শিক্ষককে খুব বাজে একটা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে গভীররাতে সেই অফিসার,সোর্স নিয়ে শিক্ষককে গ্রেফতার করতে যায়,সেরাত ছিল এক এপ্রিলের রাত….

শিক্ষক আগেই বুঝতে পেরে পালিয়ে যায়। শিক্ষকে না পেয়ে অফিসার তার কলেজে পড়ুয়া মেয়েকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। মেয়েটা ছিল অপূর্ব সুন্দরি….

সেরাতে সেই অফিসে সেই অফিসার সহ প্রত্যেকজন উপস্থিত ডিবি সদস্য অফিস এর রেস্টরুমে নিয়ে মেয়েটিকে অত্যাচার করে,অত্যাচারিত হয়ে লজ্জায় মেয়েটি অফিসের রেস্টরুমের জানালা দিয়ে লাফ দেয়।

এরপর থেকে প্রতি এক এপ্রিল রাতে মেয়েটি সেই অফিসে ঘুরে বেড়ায়। পুরুষদের উপর তীব্র ঘৃণা নিয়ে। যদি কখনো সেই অফিসে সেইরাতে কোনো পুরুষ থাকে,তাকে সে প্রথমে পসেস করে,তারপর তাকে দিয়ে অন্যদের খুন করায়,সবার শেষে পসেসড লোকটাকে মারে।”

বাইরে বৃষ্টির তোড় আরো বেড়ে গিয়েছে।ম্যানেজার ঢোক গিলল। কিন্তু একটু কষ্ট করে মুচকি হেসে বলল,”আপনি পারেনও বটে,ভাই।অসাধারণ গল্প…”

কর্মী ১ মুচকি হাসল।কর্মী ২ এর অসাধারণ বুদ্ধি দেখে। আসলেই পারেও বটে ছেলেটা। তবে, কর্মী ২ ভাবলেশহীন। 

ম্যানেজার বলল,”ভাই,এবার আপনার পালা…”

কর্মী ১ বলল,”আমার কাছে একটা ভূতের গল্প আছে। তবে আমি এটা বলতে চাই নি।আপনি অনেক রিকুয়েস্ট করেছিলেন।তারপরেও না। এখন তো আবার বাজি লাগল,যার গল্প খারাপ হবে,তাকে নাকি এখানেই রাত কাটাতে হবে,সেই ভয়েই বলছি।আমার এখানে রাত কাটানোর ইচ্ছা নেই। কর্মী ২ এর গল্পে ভয় পেয়ে গেছি।

যাই হোক,এই গল্পটা দক্ষিণ আফ্রিকার।তো গল্পটা একটা প্রাক্তন হীরা খনির,যেটাত হীরা শেষ হবার পর খনন বন্ধ হয়ে পরিত্যক্ত হয়।এবং আমাদের কোম্পানি বহুবছর পর ওখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পায় বলে খনিটা আবার জেগে ওঠে।

তো গল্পটা আমাকে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্রাঞ্চের ম্যানেজার বলেছিল। উনি যখন আমার ফিল্ড তদারকের কাজে তদারকি করতে এসেছিলেন,তখন। ভদ্রলোক কালো। তার পূর্বপুরুষ ছিল বুশম্যান জাতের শিকারী। এই গল্পটা তার পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসছে। গল্পটা হল, একবার শিকার করতে গিয়ে বুশম্যানদের এক বীর এক পিশাচের খপ্পরে পড়ে। পিশাচটির বাদুরের মত ডানা ছিল। লোমশ গা। লাল চোখ,মুখভর্তি সারি সারি দাঁত,চেরা জিভ,বিকট পোড়া পোড়া চেহারা। তো পিশাচটি শিকারীটিকে খেয়ে ফেলে। তো শিকারীর সাথে তার ছোট ছেলে গিয়েছিল। বাবাকে ওই জিনিসের খাদ্য হয়ে যেতে দেখে সে এক দৌড়ে গ্রামে ফিরে এসে ঘটনাটা ওর দাদাকে বলে। এখন ওর দাদা ছিল এক বিখ্যাত ওঝা গ্রামের। ওঝা যখন জানল তার ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলেছে পিশাচটা,সে মন্ত্রবলে পিশাচটাকে আটকে ফেলল,আর টর্চার করতে লাগল। একমাস ধরে প্রচন্ড অত্যাচারের পর পিশাচকে যখন মেরে ফেলার সময় এল, তখন পিশাচটা অনুনয় বিনয় করে বলল, তাকে প্রাণে না মেরে ফেলতে,বিনিময়ে সে সব করবে।

এখন বুশম্যানরা ততদিনে হীরা চিনে ফেলেছিল। সাদা চামড়ারা হীরার কত মূল্য দেয়,তারা জানত। আর ওঝা এও জানত,পিশাচরা হাজার বছর বেচে থাকে।

তো সে পিশাচকে প্রাণে পারল না। সে পিশাচকে মাটির নিচে বন্দি করে রাখল। শর্ত দিল,তাকে মাটির নিচে বসে হীরা তৈরি করে দিতে হবে। এভাবেই নাকি হীরার খনিটার জন্ম।

ওঝা পিশাচকে বন্দি করতে একটা কষ্টিপাথরের সাথে সাতটা লাল সুতা বেধে খনির মাঝে রেখে দিয়েছিল। যাতে করে তার মৃত্যুর পরেও মন্ত্রের জোরে পিশাচ পালাতে না পারে।

এভাভে অনেক বছর কেটে যায়। হীরার খনির মালিকানার বদল হয়,আফ্রিকায় ক্রীতদাস প্রথা চালু হয়। একবার এক অত্যাচারী সাদাচামড়া নাকি হীরা পেয়েও সন্তুষ্ট হচ্ছিল না,মাটি খুড়তে খুড়তে সে কষ্টিপাথরটা পেয়ে যায়। বুশম্যানদের বংশীয়রা,যারা এই কাহিনী জানত,তাকে মানা করে।কিন্তু সে শোনে না। কষ্টিপাথরটা সে টেনে তোলে,সুতাগুলো সরিয়ে ফেলে।বিক্রির উদ্দেশ্যে উপরে উঠে আসে।

পিশাচটা মুক্তি পায়। মাটি ভেদ করে পালিয়ে যায়।আকাশে,বিস্তৃত ডানা মেলে।

কালো ম্যানেজার আমাকে খনির একটা নির্দিষ্ট আকৃতির গর্ত দেখিয়ে বলেছিল,এখান থেকে পিশাচটা পালায়।আমিও মাটিতে ডানার ছাপ পেয়েছিলাম। বিশাল আকারের বাদুরের ডানা।

এরপর অনেক বছর পর আমরা এসে ওখানে গ্যাসের সন্ধান পাই।পুরোদমে গ্যাসের উত্তোলন চলে।

কালো ম্যানেজার আমাকে জোহানেসবার্গ যেতে বলল তখনি তার সাথে,কি একটা কাজ আছে।হেলিকপ্টারে উঠতে বল। আমি উঠলাম। হেলিকপ্টার বেশ কিছুটা যাবার পর যে হঠাৎ বলল,”আরেকটা কিংবদন্তি আছে পিশাচটাকে নিয়ে, ওর এই কয়েশ বছর বন্দি থাকার দুঃসহ স্মৃতির গল্পটা যদি কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে বলা হয়। ১৫ মিনিট পর সেই স্থানে ও দেখা দেয়,আর জায়গাটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।”

আমি কিছু বললাম না।ভূতের গল্প তো এমনই হয়।ব্লাডি মেরি,স্লেন্ডার ম্যান,,কত আজগুবি লিজেন্ড আছে এই টাইপের।নাম নেওয়া হলে নাকি ওরা আসে। মানুষ কে ভয় দেখানোর মাধ্যম, আর কিছু না।

হেলিকপ্টারটা জোহানেসবার্গে আসার পর আমরা টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখলাম। আমাদের হেলিকপ্টারটা খনি ছাড়ার ১৫ মিনিট পর,বিশাল একটা বিস্ফোরণ এ খনিটা নাকি মাটির সাথে মিশে গেছে,ওখাবে যারা ছিল,কেউই বেঁচে নেই….”

কর্মী ১ এর গল্প শেষ হল। ইন্টারভিউ রুমে একটা নীরবতা বিরাজ করল। হঠাৎ ম্যানেজার হো হো করে হেসে উঠল।

“সিরিয়াসলি ভাই? এইসব আজগুবি গল্প কোথা থেকে বানান। পিশাচের পালানো পর্যন্ত তো ভালই ছিল। শেষেরটুকু জুড়ে দিয়েই তো গল্পটাকে লেইম করে দিলেন।,হো হো হো।”

কর্মী ১ এর গাল লাল হয়ে গেল। কর্মী ২ এক দৃষ্টে ম্যানেজারকে দেখছে। কোনো ভাবলেশ নেই। কর্মী ১ বলল,”এবার আপনার গল্পের পালা….”

ম্যানেজার আমতা আমতা করল।বলল,”আচ্ছা, বাজি যখন ধরেছি,গল্প তো বলতেই হবে।আচ্ছা শুনুন…”

হঠাৎ ক্যাচক্যাচ শব্দে রুমের দরজাটা খুলে গেল। ওপাশে কেউ নেই। 

ম্যানেজার বলল,”সিকিউরিটি?  নাকি স্যার? স্যার রেস্টরুম থেকে আসলেন নাকি?”

কেউ কথা বলছে না। কোনো শব্দ নেই।

হঠাৎ সাদা শাড়ি পরা কে যেন দরজার সামনে দিয়ে চলে গেল।

কর্মী ১ আর ম্যানেজার তারস্বরে চেঁচিয়ে বলল,”কে? কে ওখানে?”

কর্মী ২ ভাবলেশহীন।

কর্মীদের ম্যানেজার বলল,”আপনারা বসেন,আমি একটু দেখে আসছি…”

কর্মী ১ আর কর্মী ২ বসে রইল। ম্যানেজার বাইরে গেল। কিছুক্ষণ পর, ম্যানেজারের আর্তনাদ শোনা গেল,”বাচাও,বাচাও…”

কর্মী ১ দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কর্মী ২ যন্ত্রের মত পিছু নিল।

কর্মী ১ বের হয়ে ভয়ে চিৎকার দিল। পুরো অফিস ভর্তি সাদা ফ্যাকাশে চেহারার রক্তাক্ত কিছু পুরুষ। ওদের মাঝে সাদা শাড়ি পরা বিকট চেহারার এক মহিলা। সবাই মিলে ম্যানেজারকে নিজেদের ভিতর টেনে নিচ্ছে,ম্যানেজারের গলা চেপে ধরেছে,, ম্যানেজার এর আর্তনাদ আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেল।

 আতংকে কর্মী ১ পালাতে কোনো একটা রুমের দিক ছুটতেই কর্মী ২ ওর সামনে এল। ওর গলা চেপে বলল,”কই পালাচ্ছিস? আজ এক এপ্রিল। ওই মেয়েটার মৃত্যুর প্রতিশোধের শিকার আমরা সব পুরুষ হয়েছি। তুইও হবি…”

রুম ভরা সকলে পৈশাচিকভাবে হাসতে লাগল। কর্মী ২ কর্মী ১ এর গলায় চাপ বাড়িয়ে দিল। কর্মী ১ ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

হঠাৎ সারা অফিসের আলো জ্বলে উঠল। অসংখ্য কন্ঠ হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “এপ্রিল ফুল।”

কর্মী ১ চোখ খুলল। কর্মী ২ মুচকি হাসছে। বলছে,”সরি ভাই,পানি খেতে আসার পর,ওরাও আমাকে এপ্রিল ফুল বানিয়েছে, আপনি আমার চেয়েও সিনিয়র,তাই আমার পর আপনাকেও বানাতে চাইল। এসবি বানানো। ওদের ড্রাইভার পালায় নি। সন্ধ্যায় অফিস ছুটি হলেও কেউই বাসায় যায়নি। আমাদের দুইজনকে এপ্রিলফুল বানাতে সবাই মিলে প্রাঙ্ক করেছে।”

কর্মী ১ ভীষণ বিরক্ত হল। বলল,”কাজটা মোটেও ভাল করেন নি।আমি ভীষণ ভয় পেয়েছি। এছাড়া,যেই গল্পের ভিত্তিতে পুরো ঘটনাটা বানালেন,সেটা নিষ্ঠুর ছিল। আর আমাদের দুইজনকেই কেন এই প্রাংকের শিকার হতে হল?”

গোমড়ামুখো সিনিয়র অফিসার বলল,”আমাদের অফিসের প্রত্যেকজনকেই বিগত বছরগুলোতে এই দিনে বা রাতে প্রাংক করা হয়েছিল।আপনারা দুউজন আমাদের পরিবারের নতুন সদস্য,আপনাদেরকেও এভাবে বরণ করে নিলাম আমরা।”

বেশ হাসিঠাট্টা হল দুই তিন মিনিট ধরে। ম্যানেজার হাসতে হাসতে বলতে লাগল,”কর্মী ১ ভাইয়ের মুখটার অবস্থা যা হয়েছিল,,,”

গোমড়ামুখো সিনিয়র অফিসার হঠাৎ বলল,”অনেক রাত হয়েছে, সব কটা গাড়ি নামাতে বল ড্রাইভারদের,সবাই বাড়ি চল। কালকে সকালে অফিস,কারী যেন মিস না হয়।”

সবাই অফিস থেকে বেরোতে লাগল। হঠাৎ কর্মী ১ বলে উঠল,”ম্যানেজার সাহেব,আপনি কোথায় যাচ্ছেন? বাজি হয়েছিল তো ভূতের গল্পের। যার গল্প বাজে হবে সে অফিসে রাত কাটাবে।আমার গল্প নাহয় বাজে হয়েছে,আপনি তো বলেনই নি।”

সবাই “উউউউউ” করে উঠল। ম্যানেজারের হাসি মিলিয়ে গেল। সবাই বলতে লাগল,”হ্যা হ্যা বাজিতে তো ম্যানেজার আসলেই হেরেছে,,,”

কর্মী ২ কর্মী ১ এর পিঠ চাপড়ে বলল,”আসলেই মোক্ষম একটা চাল দিলেন ভাই,হা হা হা।”

ম্যানেজার আর কি করবে,রয়ে গেল অফিসে। বাকিরা গাড়িতে করে বের হয়ে গেল সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে।

ম্যানেজার ইন্টারভিউ রুমে গেল। এখানের জানালাটা সবচেয়ে বড়। এখনো ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় পানি উঠে গেছে বোঝা যাচ্ছে। গাড়িগুলোকে একে একে চলে যেতে দেখল সে।

কর্মী ১ এর গল্পটা শেষ হবার ১৫ মিনিট পার হয়ে গেল। ম্যানেজার বৃষ্টি দেখছে। বৃষ্টির তোড় বাড়ছে আরো,,,,

হঠাৎ একটা বিদ্যুৎচমক।  ম্যানেজার দেখল, আটতলা অফিসের জানালার বাইরে ওর মুখোমুখি একটা জিনিস ভেসে আছে বৃষ্টির ভিতর।

বাদুড়ের মত ডানা,লোমশ শরীরের বৃষ্টির পানি,মুখ ভর্তি ধারাল দাত,চেরা জিহবা,লাল চোখ,পোড়া বিকট চেহারা…

মুখটায় একটা পৈশাচিক হাসি।

গল্প ১২৫

​”তুমি আসবে বলে”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

একবার আমি প্রেমে পড়েছিলাম….

প্রেমে পড়েছিলাম আমার মতই এক বাংলাদেশির উপর। 

পার্থক্য হল,সেই বাংলাদেশির জন্ম আমেরিকাতেই ছিল। আর আমি পড়াশুনা করতে আমেরিকা গিয়েছিলাম।

সেই বাংলাদেশি নীলনয়নার নাম বলব না। তবে তার চুলে লালচে আভা আর চোখে সবুজাভ একটা ছায়া ছিল। তার মা আমেরিকান আর বাবা বাংলাদেশি ছিল বলে এই অবস্থা।

তার শরীরের ত্বক সাদাদের থেকে কাল আর বাদামীদের থেকে সাদা ছিল।

তার চেহারায় বাংলাদেশি ভাবটা ছিল না।বাংলাদেশি বাবার কারণে রং টা সাদাদের থেকে গাঢ় হলেও চেহারার প্রকৃতি সম্পূর্ণটাই আমেরিকানদের মত ছিল। 

সে একদম বাংলাদেশিদের মত বাংলা বলতে পারত। নিজের বাবা ছাড়া কখনো বাংলাদেশি চোখে দেখে নি। তাই সেধে সেধে আমার সাথে আমি এখানে ভর্তি হবার নবমদিনে কথা বলতে এসেছিল। তার মা বাবার ডিভোর্স হবার পর থেকে তার মা বাংলাদেশিদের দেখতে পারত না। মেয়েটার বাবা নাকি গ্রীণকার্ডের জন্য মেয়েটার খ্রিষ্টান মাকে বিয়ে করেছিল,তারপর গ্রীণকার্ড পেয়ে গর্ভবতী বানিয়ে ছেড়ে গিয়েছে।

তার মায়ের কড়া নির্দেশ ছিল তার উপর,বাংলাদেশিদের সাথে মেশা যাবে না।তবে মেয়েটা তার সারাজীবন তার বাবাকে খুজেছে, আশেপাশের বন্ধু বান্ধবীদের বাবাদের সাথে দেখে খারাপ লাগত বলে। বাবার সাথে কখনো দেখা হলে যেন পুরোদস্তুর বাংলা বলে অবাক করে দিতে পারে,বিনিময়ে বাবার ভালবাসা পায়,তাই লুকিয়ে লুকিয়ে নিজে নিজে বাংলা শিখেছিল।

ফেসবুক না স্কাইপে তে কার কাছে জানি বাংলা শিখেছিল,সেই বেটায় ওকে বাংলা গালাগালিও শিখিয়ে দিয়েছিল।

যাই হোক,এলোমেলো কথা বলছি। কারণ আমি হয়ত ওকে হারিয়ে ফেললাম। চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। রুমাল ঠেকিয়ে চোখটাকে কিছুক্ষণের জন্য স্পষ্ট করেও দুই সেকেন্ড পর আবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য এক অবস্থা। হয়ত বাইরে বৃষ্টি বলে, হয়ত এখন অনেক রাত বলে, হয়ত আমি দরজাটা খুলে রেখেছি,তুমি আসবে বলে…..

যাই হোক,হ্যা কি যেন বলছিলাম? আচ্ছা, হ্যা এখানে ভর্তি হওয়ার পর ৯ দিন মুখ বন্ধ করে ছিলাম। ইংলিশ বই পড়া সহজ,লেখা সহজ,সিনেমা দেখা সহজ,গানের কলি বোঝা সহজ,কিন্তু বিদেশিদের সাথে কথা বলা সহজ না। প্রথমদিন পিপাসা লাগায় কার কাছে যেন পানি চেয়েছিলাম, ৫ মিনিট পর এক বোতল পানি কেনার পর সেই বেটা বলেছিল, “ওহ আচ্ছা, উয়াচার চাচ্ছিলে? আমি তোমার উচ্চারণ বুঝতে পারি নি,সরি”

যাই হোক, নবম দিনে এসে কানের কাছে মিষ্টি কন্ঠে ভিরাট কোলির ট্রেডমার্ক গালি শুনে চোখ বড় করে পাশে চেয়েছিলাম। পরে বুঝেছি,যেই বান্দর ওকে বাংলা শিখিয়েছে সে ওই শব্দের অর্থ তাকে বলেছে গুড ম্যান।

সেদিন থেকে কথা বলা শুরু। ওই একদিনে ও বাংলায় আমাকে বেশ কিছু গালাগালি আর জোরে জোরে আঞ্চলিক ভাষার সম্মিলনে যা বলেছিল,তাতে বুঝেছিলাম,ওর বাবা বাংলাদেশি, কিন্তু বাবাকে সে কখনো দেখে নি, কিন্তু বাংলাদেশি দেখার ওর অনেক শখ,যে ওকে বাংলাদেশের কালচার সম্পর্কে জানাবে, ফেসবুকে তো অতটা বোঝা যায় না।আর বাংলাদেশি পাড়ায় ওর মা যেতে দেবে না (কারণটা সেদিন বলে নি,৬ মাস পরে বলেছিল)।

যাই হোক, দুইদিন কথা বলে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আর বন্ধুত্ব হবার পর তাকে আমি বললাম,”তোমার কথায় এত গালাগালির শব্দ কেন আসে? তাও এত বিশ্রী গালাগালি?”

বেশ অবাক হয়ে সেদিন,গালাগালির প্রকৃত অর্থ আর ও যা জানত অর্থ হিসেবে,সেই পার্থক্যটা করে দিলাম।ও খুবই হতাশ হয়ে গেল। তারমানে প্রতি স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশি পেইজে গিয়ে ও যা উইশ করেছে এতদিন, সেগুলোর অর্থ, “ভালবাসি,ভাল মানুষেরা” ছিল না। “ভালবাসি,***** ” ছিল।

যাই হোক, কয়েকদিন ক্লাসের ফাকে ফাকে বাংলা শব্দ শিখাতে লাগলাম। এও জিজ্ঞেস করলাম,গুগল ট্রান্সলেটর কেন ইউজ করে না সে? বলল,ট্রান্সলেটর দিয়েই মূলত মূল ভাষাটা শিখেছে,চলতি ভাষায় বাংলাদেশিরা কি শব্দ ইউজ করে এটা জানতেই এক বাংলাদেশির সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ করে সে। সেই বেটাই নাকি এসব শব্দ শিখিয়েছে,এগুলো গুগল ট্রান্সলেটরে নাই।

আমি আমার ভাইদের রসবোধ দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।

বাংলাদেশি বলে হয়ত পরিচয়টা হল। পরে আস্তে আস্তে জানলাম,সে স্কুল আর হাইস্কুলের টপ গ্রেড ছাত্রী ছিল।শুধু বাংলা না,সে বেশ কিছু ভাষা জানে, মারামারি জানে, সাইকেল চালাতে জানে,সাতার জানে,সবই জানে।

এক মাস সে বাংলাদেশি হাইপে এত পরিমাণ কথা বলল যে,এখন কেউ তাকে ফোন দিলে বাংলায় কথা বললে,কেউ বুঝতেই পারবে না এর চুল লাল,চোখ সবুজ,ত্বক ফর্সা।

ওই এক মাসই লেগেছিল তার প্রেমে আমি পড়তে। কিন্তু ও জানত না,বোঝার কথাও না। এটা ভুল কথা যে মেয়েরা নাকি সব বুঝতে পারে,কেউ ভালবাসে কিনা,পছন্দ করে কিনা।

যাই হোক,কেমিস্ট্রি পড়ি, দুইজন ল্যাব পার্টনার হয়ে গেলাম। আমি বাংলাদেশে যা একটু মেধাবী বলে সম্মান পেতাম,ওখানে সব মাটিতে পড়ল। ল্যাবে ডেইলি আমার জন্য ছোটখাটো দুই একটা বিস্ফোরণ হত। বড়সড়ই হত,যদি সে শেষ মুহুর্তে ভুল শুধরে না নিত।

বেশিরভাগ প্রাক্টিকাল ক্লাস শেষেই আমাদের দুইজনের মুখ কাল আর চুল এলোমেলো থাকত। ভার্সিটিতে দুইজনকে তাই একনামে সবাই চিনতে পারল। “বিস্ফোরণ জুটি”।

মেয়েটা আমি ভুল করল,চিল্লাত আমার সাথে,বকাবকি করত। কিন্তু কখনওই এক মুহুর্তের জন্য আমাকে ছাড়ত না। যত ভুল করতাম,বেশি বকাবকি করে আরো বেশি করে যেন আমার কাছে আসত….

একদিন সকালে উঠে দেখি প্রচন্ড বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে বাংলাদেশে কখনো কোনো ক্লাস হয় না,তাই আর বিছানা ছেড়ে উঠলাম না।পরেরদিন তার গালাগালি শুনলাম নিখাদ বাংলা ভাষায়। না,এবার অর্থ জেনেই দিয়েছিল গালিগুলো। কেন ক্লাসে আসি নি সেকথা জিজ্ঞেস করল।

তাকে বললাম, “বৃষ্টির শব্দে বিছানা ছেড়ে না উঠতে চাওয়াটা বাংলাদেশি সংস্কৃতি।  বৃষ্টির শব্দের ভিতর আমরা ভালবাসার গান শুনতে পাই,,,”

এর দুইদিন পর আবার ঝুম বৃষ্টি হয়েছিল,তবে তার গালাগালির ভয়ে আমি ওই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ক্লাসে গিয়েছিলাম। দেখি সে আসে নি।

সেদিন তাকে না দেখে দুনিয়াটা ফাকা ফাকা লাগছিল। 

পরেরদিন সে আসার পর বলল,”আসলেই,বৃষ্টির শব্দের সাথে কেমন একটা গান শুনতে পারা যায়,বিছানা থেকে ওঠা যায় না।”

বৃষ্টির দিন,স্পেশালি রবিবার (এখানে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন) তাকে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট এ নিয়ে খিচুড়ি আর ইলিশ খাওয়াতাম,এমন একটা টেবিলে বসতাম যেখানে বৃষ্টি দেখা যায়,শব্দও সবচেয়ে জোরে পাওয়া যায়।

মেয়েটা আস্তে আস্তে সারাদিন আমার সাথে থাকত। আমি ভাবতাম মেয়েটা বুঝি আমাকে ভালবাসে। ওর মা কাজের জন্য বাইরে থাকত, আর ও আমার সাথে ক্লাস,ক্লাস এর বাইরে,সিনেমা হলে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরত,সব শেয়ার করত,,, ওর ভাললাগা,খারাপ লাগা,,,,

এরপরেও নাকি এগুলো ভালবাসা না,,, এটা কি করে সম্ভব।

এমনও সময় গিয়েছে, রাতে তার ভাল লাগত না বলে এই বাসায় ওই দরজা দিয়ে সে এসে আমাকে বিছানা থেকে ঠেলে উঠিয়ে এই চেয়ারে বসিয়ে দিত,নিজে কিচেনে কফি  বানিয়ে আমার সামনের ওই চেয়ারটায় বসত। সারারাত গল্প করত, কোনো একটা বাজে স্বপ্ন হয়ত,বা ভাল স্বপ্ন, বা কোনো একটা খারাপ মুভি তার খুব ভাল লেগেছে,এটা নরমাল কিনা,এগুলো জিজ্ঞেস করত।

আমি বলতাম,”এই কথা গুলো তো ফোনেও বলা যেত,এত দূরে ট্যাক্সি ভাড়া করে এই রাতে আমার বাসায় আসার দরকার কি?”

কোন যুগে যেন দেখেছিল,মোবাইলে চাপ পড়ে সাইলেন্ট হয়ে আছে।সে বলত,”তোমার মোবাইল সাইলেন্ট থাকে,ফোন করলে নাও  ঘুম ভাঙতে পারে।”

কোনো কোনোদিন ওই দরজা দিয়ে সে ঢুকে যখন সামনের চেয়ারটায় বসত,হাতে,বা ঠোটে রক্ত দেখতাম। বলত,এতরাতে রাস্তা ফাকা ছিল বলে গুন্ডা ধরেছিল। মারামারি করে এসেছে,,,

আমি এর পর থেকে প্রতিরাতে দরজাটা খুলেই রাখতাম, আর এই চেয়ারে বসেই ঘুমাতাম। পাছে সে আসে, এসে আমার ঘুম ভাঙাতে তাকে কষ্ট করতে হয়!

১৮ বছরের পর আমেরিকান মায়েরা ছেলেমেয়েদের ছেড়ে দেয়। অথবা ছেলেমেয়েরাই স্বাধীন থাকতে মা বাবাদের ছেড়ে দেয়। তবে সে তারমায়ের সাথেই থাকত, তার মা সারাদিনই অফিসে থাকত,অনেক কষ্টে একা তার মেয়েকে মানুষ করতে হয়েছে,মেয়েটা সারাজীবন বই পড়ে,সিনেমা দেখে,আর গুগল দেখে বিভিন্ন বাস্তব জিনিস একা একা শেখার ট্রাই করেই জীবন কাটিয়েছে। 

এই তাইপের মেয়েরা সাধারণত ১৬ বছর থেকে মদ খাওয়া শুরু করে,হয়ত একটু গাজা নেয়,অথবা বয়ফ্রেন্ডদের সাথে থাকে, সুন্দরি হলে তো কথাই নেই,,,

তবে এই মেয়েটা কেন যেন সেরকম হল না। এই মেয়েটা তার জীবনে কেন যেন শুধু আমাকে স্থান দিতেই অপেক্ষা করছিল,এতটা বছর।

একবার আমার বাসায় এসে  একটা এসাইনমেন্ট রেডি করে আমার ড্রয়িংরুম এ শুয়ে পড়েছিল। আমি আমার রুম থেকে কম্বল এনে গায়ে দিয়ে দেওয়ার সময়,আমার হাতটা ধরে ফেলেছিল। সারাটা রাত আমার কাউচের পাশে চেয়ারে বসে থেকে গল্প করতে হয়েছিল, আর সে ঘুমে ঘুমে থেকেও বিভিন্ন প্রশ্ন করছিল।

মানুষ একই সঙ্গে যে ঘুমায় আর আড্ডা দিতে পারে সেটা সেদিন প্রথম জেনেছিলাম।

সে এরপর থেকে এমনও সময় যেত,টানা ৩/৪ দিন আমার বাসায়ই থেকে যেত,তার মাকে বলত,খুবই ক্লান্ত সে,তাই ভার্সিটির পাশে ই এক বন্ধুর বাসায় থাকতেছে।

এরকম একসময়ে সে যখন গোসল করছিল, আমি তার মোবাইলটা কি মনে করে হাতে নিলাম। মোবাইলের ওয়ালপেপারে তার আর আমার ছবি, গ্যালারিতে আমার ছবি,শুধু আমার ছবি,,,,

নোটে আমার নাম দেখলাম,কিন্তু পড়ার আগেই মোবাইলটা হাত থেকে কেড়ে নিল সে, সেদিন আমি অধিকার লঙ্ঘন করেছিলাম,সে সত্যিই প্রচন্ড রেগে গিয়ে বাসা থেকে চলে গিয়েছিল….

এতকিছুর পরও সে আমাকে ভালবাসত না। আমি বুঝি না মেয়েদের। কখনো বুঝতাম না,পারবও না।

এই মোবাইল ধরার রাগটা ভাঙাতে অনেক দিন লেগেছিল।

এরমধ্যে একদিন ও আমাকে ওর বাসায় নিয়ে গেল। আমাকে তো কখনোই বলে নি ভালবাসে,আমিও বলি নি ভালবাসি। তাহলে নিজের মায়ের সাথে ঘটা করে কেন পরিচয় করাল বুঝি নি।

আমি ততদিনে ওর মা বাবার কাহিনী জানতাম। ওর বাবাকে ভালবেসে ঠকেছিল বলে ওর মা গোটা বাংলাদেশি জাতটাকে ঘৃণা করত।

তবে সেদিন আমাকে দেখে ওর মায়ের চোখেমুখে আমি যেটা দেখেছিলাম,সেটাকে ঘৃণা বলে না, আতংক বলে,তীব্র আতংক।

আমার হাত থেকে বাচ্চা মেয়েকে আগলে রাখছে, এমনভাবে নিজের মেয়েকে আগলে রেখে বলেছিল, “ফ্রম বাংলাদেশ?  হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট উইথ মাই ডটার?”

আমার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছিল মেয়েটা। সেও বুঝতে পেরেছিল, ঘৃণা আর আতংক ভিন্ন জিনিস। মেয়েটার বাবা কি এমন করেছিল যে মা টার এই মানসিক অবস্থা?

সেদিন আমি বাসায় চলে এলাম। এই চেয়ারে বসলাম,হয়ত ও আসবে,সামনের চেয়ারটায় বসবে।

তবে ও এল না,তবে একটা ফোন এল ওর। কাপা কাপা গলায় বলল,”আমাদের নিজেদের মনের কথাটা বলে দিয়ে একসাথে কোথাও গিয়ে বসবাস করাটা উচিৎ ছিল…..”

এরপর থেকে তার সাথে আর যোগাযোগ হল না। সে ভার্সিটি ছেড়ে দিল। মাত্র কয়েকটা মাস ছিল গ্রাজুয়েট হতে।ভার্সিটির সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট মেয়েটা পড়াশুনা ছেড়ে দিল,শহর ছেড়ে দিল,এটা কেউই মানতে পারল না। আমাকে সবাই জিজ্ঞেস করতে লাগল ও কোথায়। ওর এক বান্ধবী বলল,আমরা ব্রেকাপ করেছি কিনা। আমি বললাম,আমরা তো বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড না, ব্রেকাপ কেমনে করব?

মেয়েটা প্রথমে নাক কুচকে আমাকে নীচ মানসিকতার লোক ভাবল। পরে আমি অভিনয় করছি না বুঝে বলল,সে নাকি আমাকে প্রথম দেখা থেকে ভালবাসে,,একথা নাকি তারকাছের বান্ধবীরা জানে,,,

শুধু আমার একটা প্রপোজই তাকে আমার করে দিত। কিন্তু প্রপোজ করলে সে।প্রত্যাখ্যান করলে যদি বন্ধুত্বই না থাকে,সে কারণে সে বা আমি কেউই সামনে আসি নি। অপেক্ষা করেছি,অপরজনের সাড়া দেওয়ার….

তখন বুঝলাম,মেয়েটা যেভাবে বুঝাতে চেয়েছিল সে আমাকে ভালবাসে,এর চেয়ে বেশি ভালভাবে বুঝানো সম্ভব না। কিন্তু মেয়েটা তো অদ্ভুত ছিল… কিভাবে বুঝতাম,এই অদ্ভুত ভাব টা শুধু আমার কারণেই ছিল….

মেয়েটাকে খুজে বের করতে আমার ১ মাস লেগেছিল। খুব দূরে তারা চলে যায় নি।আমার কাছাকাছিই আছে,সাবওয়ের সাতগে কানেক্টেড। ইচ্ছা করলেই যেন লুকিয়ে আমাকে দেখতে আসা যায়,,, ইচ্ছা করলেই যেন বান্ধবীদের কাছ থেকে শোনা যায়,আমি কেমন আছি,,,

সে আর আমি মুখোমুখি হয়েছিলাম সে শহরের রাস্তায়,, জীবনে প্রথমবারের মত বলেছিলাম,”ভালবাসি,,,”

মেয়েটার চোখে আনন্দের অশ্রু দেখলাম না। মেয়েটার নীচের ঠোট কাপতে দেখলাম না। শুধু চোখে একটা আতংক দেখলাম। সে আমাকে বলল,”আমরা জাস্ট ফ্রেন্ড,তোমাকে ওভাবে কখনো দেখি নি।বন্ধুত্বটাকে তুমি অকওয়ার্ড করে দিলে,এখন তো দেখা করাও সম্ভব না,,,”

তাকে বুঝাতে বুঝাতে,সে মিথ্যা কথা কেন বলছে জানতে চাইলাম। মেয়েটা আমাকে জাহান্নামে যেতে বলে হাটতে লাগল। আমিও তার পিছু নিতে লাগলাম।এমন সময় একটা গাড়ি আমাকে ধাক্কা দিল।

৩ বছরে প্রেম বা নাপ্রেম,,যে সম্পর্কই আমাদের থাক সেদিন শেষ হলে ভাল হত আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে,,,,

মেয়েটা নিজের শরীরের রক্ত দিল আমাকে, সারারাত বিছানার পাশে হাত ধরে বসে রইল,আমি যেভাবে বসতাম,,,,এক মুহুর্তের জন্য চোখ খুললে দেখতাম,ঠোট কাপিয়ে মেয়েটা আমার দিকে তাকাচ্ছে, আর এমনভাবে মুখটা দেখছে,যেন এটাই তার শেষ দেখা,,,,

ব্যাথার ওষুধে ক্রিয়ায় মাথাটা ঝিম থাকলেও আমার কেবিনের পাশে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এর কিছু কিছু শব্দ কানে আসল,,,

“আমার টাকা কই? টাকা দে!”

মেয়েটার মায়ের আমেরিকান উচ্চারণে ভাঙা ভাঙা বাংলা,”আমার কাছে এখন টাকা নেই,,আমার চাকরি চলে গিয়েছে,,,”

একটা বাংলাদেশি কণ্ঠ, পুরুষ কন্ঠ,”তুই আমাকে বলেছিলি তোর জীবন তোকে ফিরিয়ে দেব,তোর মেয়েকেও ছেড়ে দেব,যদি তুই আমাকে মাসে মাসে টাকা দিস। ৩ মাস ধরে টাকা দিচ্ছিস না,,,”

মেয়েটার মা বলল,”বললাম তো,আমার চাকরি চলে গিয়েছে,এখন জমানো টাকা দিয়ে দিলে মেয়েকে নিয়ে থাকব কিভাবে?”

পুরুষ কন্ঠ বলল,”তাহলে ২১ বছর আগে যে কাজটা করতে বলেছিলাম,সেটা তো করতে হবে, তুই বুড়ি হয়ে গেছিস,তোর মেয়েকে লাগবে,,,”

মেয়েটার মা এবার চিল্লিয়ে ইংরেজিতে বলল,”দেশে আইন আছে,, বাইরের দেশের একটা নোংরা লোক হয়ে ২২ বছর ধরে জ্বালাচ্ছিস, কিছু বলি নি,আমার মেয়ের দিক নজর দিলে চোখ উপড়ে দেব,,,”

পুরুষকন্ঠ বলল,”আইনের আশ্রয় নিলে তো তুই ই ফাসবি,তুই তো আমাকে গ্রীনকার্ড টার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলি,তোর রিকমেন্ডেশনে। এখন পুলিশ যদি জানে,এক নারী পাচারকারী, বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে আমেরিকায় এসে তরুণীদের দুবাইয়ের বেশ্যাখানায় পাঠানোর কাজ চালাচ্ছে, আর তুই সব জেনেও ভালবাসার কারণে তাকে গ্রীনকার্ড পাইয়ে দিয়েছিস, তুই আর আমি দুইজনই জেলে যাব,মেয়েটাকে আমাদের দলের লোকেরাই সাবাড় করবে,,,এই কনভারসেশন টা ২১ বছর ধরে বার বার হচ্ছে,,, কেন তাও উঠাচ্ছিস, আগে তোকে তুলে নেওয়ার কথা বলতাম,এখন মেয়েটাকে,,, পুলিশকে জানালেও যা না জানালেও তা,, মেয়েটাকে তো বাচাতে পারবি না। আমাকে মাসে মাসে টাকা দে,কিছু বলব না,,,আর এভাবে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলে মেয়েটা আর বাসায় ফিরবে না।”

ব্যাথার ওষুধ এর ক্রিয়ায় আরেকবার অজ্ঞান হবার আগে লোকটা আর্তনাদ শুনেছিলাম,,, আর আমার প্রেমিকা বা অদ্ভুত সম্পর্কিতার বাছা বাছা কিছু বাংলা গালি আর লাঠি দিয়ে পিটানোর শব্দ,,,,

 পরের রাতেও যখন আমার ঘুম ভেঙেছিল একটু সময়ের জন্য। মেয়েটা আমার হাত ধরে পাশের চেয়ারে বসা ছিল। হাতে একটা রুমাল,যে অজানা ভালমানুষ বাংলাদেশি বাবার ভালবাসা পেতে বাংলাদেশি সংস্কৃতি শিখেছিল, বাবার আসল পরিচয় পেয়েও সেই সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে পারল না আর। কারণটা মনে হয় আমি….

কারণ ইউটিউব দেখে রূমালে বাংলাদেশি নকশা উঠাচ্ছে সে, সুই সুতার আচড়ে অপূর্ব বাংলা অক্ষরে লিখছে,”ভালবাসি,প্রিয়তম,,, ”

রূমালটা পরেরদিন সকালে নিচে পরে গিয়েছিল। ফোনে আমার প্রেমিকা বা অদ্ভুত সম্পর্কিতা কারো সাথে আতংক নিয়ে কথা বলছিল,,”দোহাই লাগে,আমার মাকে তোমরা কিছু কর না,,, তোমরা যা বলবে আমি সব করব,,,সব…”

এক্সিডেন্ট এর ৫ দিন পর জ্ঞানটা সম্পূর্ণ ফিরেছিল। আমার বিছানার আশেপাশে একটা মানুষের বসার চিহ্ন,,,, চিহ্ন দেখেই বোঝা যায়,,, মানুষটার মনে আমার জন্য অপার্থিব একটা মায়া আছে,,,,

মানুষটা ঢুকল কেবিনে। আমাকে বসে থাকতে দেখল বিছানায়। কিছুক্ষণ দুইজন নিশ্চুপ থেকেছিলাম।

একটুপর সে বলল,”আমি একটা বাংলাদেশির সাথে সম্পর্কে জড়াব না,,, তোমরা খুবই জঘন্য প্রাণী,,অত্যন্ত নীচু জাত,,মা ঠিকই বলেছিল,,,”

আমি কিছু বলার চেষ্টা করলাম। সে বলল,”নেহাত আমার পিছু নিয়ে আসতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কা খেলে,পুলিশের ভয়ে এখানে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি,ডাক্তার আজ ফোন দিল,তোমার জ্ঞান ফিরেছে,তাই দেখা করতে এলাম শেষবারের মত,,আমার পিছু নেওয়া ছেড়ে দাও,তোমার এক জাতের লোক আমার মা এর জীবন শেষ করে দিয়েছে,তুমি দেবে আমারটা,,আমি সেটা হতে দেব না….”

মেয়েটা জানে না,আমি জানি ও আমাকে রক্ত দিয়েছে,,মেয়েটা জানে না আমি জানি ও আমার পাশে বসে ৪ টা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে আমার চেহারার দিক তাকিয়ে,,মেয়েটা জানে না,আমি জানি ও আমার জন্য একটা উপহার বুনে রেখে গিয়েছে,যেটা আমার বিছানার নিচে পরে আছে,,মেয়েটা জানে না আমি সব জানি,,,

মেয়েটা বলল,”আমি এদেশেই থাকব না,এখানে থাকলে তোমার আর ওই জানোয়ারটার সাথে বারবার দেখা হবে, আমি দুবাই যাচ্ছি। একটা কাজ পেয়েছি,,,”

আমি চিৎকার করে উঠলাম আতংকে। ওর মাকে বাচাতে ও কি করতে যাচ্ছে বুঝতে পারলাম। চিৎকার করে বলতে লাগলাম,”না,প্লিজ এটা কর না,,”। বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলাম। ডাক্তার আর নার্সরা এসে ধরে ফেলল।

মেয়েটা চলে গেল। আমার চিৎকারে আর ফিরল না….

আমি এখন আমার বাসায় সেই চেয়ারটায় বসা,যেখানে বসে অসংখ্য রাত তার সাথে কথা বলে,হাসতে হাসতে কাটিয়েছি,,,,

বাইরে বৃষ্টি। কিন্তু আমার চোখ ঝাপসা,,, “ভালবাসি প্রিয়তম,,”লেখা রুমালটা চোখে ধরলে স্পষ্ট হচ্ছে,,,

সামনের চেয়ারে সে বসা থাকে। চোখটা ঝাপসা হলেই। সে আমাকে বলে,”মাকে উদ্ধার করতে পেরেছি। দুবাইয়ের বেশ্যাখানায় আমার যেতে হয় নি মায়ের জীবনের বিনিময়ে,ওরা ধরা পড়েছে,,, চল বৃষ্টির শব্দ শুনি দুইজনে একসাথে,দেখি,একই ভালবাসার গানটা সগুনতে পারি কিনা,,,,”

রুমালটা দিয়ে চোখ মুছলেই সে চলে যায়। এটা তো ভালবাসার গল্প না। যে সব লেখকের কলমের আচড়ে পূর্ণতা পাবে। বাস্তবে সে ফেরে না, সে দুবাইয়ের বেশ্যাখানায় নিয়মিত অত্যাচারিত হয়,মায়ের জীবনের বিনিময়ে। ওদিকে তার বাবা তার কথা রেখে মাকে মুক্তি দেয় না,খুন করে ব্রিজের উপর দিয়ে ফেলে দেয়। মেয়েটা কখনো জানবেও না,যে বিনিময় হিসেবে সে প্রতিরাতে অত্যাচারিত হয়,যে বিনিময়ের জন্য সে তার পুরো ভুবন জুড়ে যে থাকে তাকে মিথ্যা বলে পালিয়ে যায়,, যে বিনিময় সে পায় নি।তার মা বাচে নি,,,,,,

তাও আমি দরজাটা প্রতিরাতে খোলা রাখি। হয়ত গুন্ডাদের সাথে যেভাবে মারামারি করে হলেও আমাকে দেখতে,একটু কথা বলতে এ চেয়ারে যেভাবে বসতে, ওখান থেকে মুক্ত হয়ে আবার এসে বসবে,,,, 

এখনো অপেক্ষা করি,,, তুমি আসবে বলে….

গল্প ১২৪

​”Dimension Origins: Part 3″

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.

আরিজোনা,আমেরিকা।

The Lobby এর আরেকটা গোপন আস্তানা।  লবি হল ১৩ জন উগ্রপন্থী ইহুদী রাবাই এর গড়ে তোলা একটা দল। যারা বিশ্বাস করে এই পৃথিবী একটা দেহ,ইহুদিরা তার মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিন্ড। খ্রিষ্টানরা তার বলিষ্ঠ ক্রীতদাস হাত, বৌদ্ধরা দেহের আকৃতি,আর হিন্দুরা দেহের পা।

আর মুসলমানরা রোগ। সংক্রামক যন্ত্রণাদায়ক রোগ।রোগটাকে গুটিবসন্তের মত নির্মূল করে ফেলাই পৃথিবীর প্রধান,ইহুদি জাতির একমাত্র লক্ষ্য।

একটা মুসলিমও পৃথিবীর জন্য অনেক বড় হুমকি।

মুসলমানদের সমূলে উৎপাটন করে ফেলার পরিকল্পনা পূর্বপুরুষ ররা সেই মুসা (আ) এর সময় থেকে করে আসছে। কিন্তু সাপের মত যেন পিচ্ছিল,ভয়ংকর, বিষধর এই মুসলমান জাতটা।হাজার চেষ্টা করেও এদের বিলুপ্ত করা গেল না। কত সভ্য জাতি বিলুপ্ত হল,স্বর্ণালী দিন। কিন্তু অসভ্য মুসলিম জাতি টিকে গেল। তেলাপোকার মত।

তবে আর না, পূর্বপুরুষ ভুল করেছে। এযুগে সেই ভুল আর হবে না।অনেক দিনের পরিকল্পনা,অতি গোপন,অতি কৌশলী পরিকল্পনা।

পরিকল্পনার প্রথম ধাপ ঘটে জার্মানিতে। জার্মানি আর আর্জেন্টিনায় পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতি গুটি কয়েক ইহুদি বাস করত। তবে মস্তিষ্ক তো সারা শরীরের তুলনায় ছোটই হয়,তাই নয় কি?

লবির আবির্ভাব সেসময়ই।লবিতে সবসময় ১৩ সদস্যের প্রবীণ রাবাই থাকত,কেউ মরলে,পরবর্তী প্রবীণ লোকটা তাদের জায়গা দখল করত। 

ব্যবসা,বিজ্ঞান, শিক্ষায় অনেক এগিয়ে গেল সেই ইহুদিরা। আর অনেক অনেক টাকা উপার্জন করতে লাগল। প্রচুর টাকা জমাতে থাকে, সব টাকা উপার্জনই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগোতে থাকে।

জার্মানির ইহুদিরা টাকা পয়সা দিয়ে সারা দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের বন্ধুত্ব অর্জন করতে থাকে।

কিন্তু জার্মানিতে ক্রিশ্চান বেশি ছিল। ইহুদিরা যেটা চাচ্ছিল,সেটা হল একটা আস্তানা। একটা ঘাটি।একটা ইহুদি রাষ্ট্র। সেযুগে সারা পৃথিবীতে অনেক খালি জায়গা ছিল।এত বন্ধু তাদের ছিল,চাইল যেকোনো জায়গায় কিন্তু তারা বসতি গড়ে ইহুদি রাষ্ট্র তৈরি করতে পারত। সেটা করা যেত,বিনা রক্তপাতে।

তবে সেটা করলে পৃথিবীর বুকে যে তারা কতটা শক্তিশালী, সেটা প্রমাণ করা যেত না। জাতশত্রু মুসলমানদেরও কোনো আগমনী চ্যালেঞ্জ করা যেত না।

জার্মানির প্রভাবশালী ইহুদিদের সংস্থা ততকালীন ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ইংল্যান্ড এর প্রধানমন্ত্রীর সাথে গোপন একটা চুক্তি করে। সেকালে জেরুজালেমে ঔপনিবেশ ছিল ইংল্যান্ডের,আরব নেতাদের চাপে জেরুজালেম ছেড়ে চলে আসার প্রস্তুতি চলছিল।

কিন্তু জার্মানীর ইহুদিরা একটা চুক্তি করল। জেরুজালেম ঐতিহাসিক ভাবে ইহুদিদের সম্পত্তি,এরপর খ্রিষ্টানদের। এই দাবিতে জেরুজালেম তাদের পাওয়া উচিত ছিল।মুসলমানরা এই সেদিন এল। ওদের তো জেরুজালেমের দাবির প্রশ্নই ওঠে না।

যদিও সব নবী রাসুলই মুসলমান ছিল,তবে ইংল্যান্ডের নাস্তিক প্রধানমন্ত্রীর সেদিকে মাথাব্যথা ছিল না। তার চোখ চকচক করছিল উপহার হিসেবে ইহুদিদের টাকা,আর তার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষমতায় থাকার প্রতিশ্রুতি।  অতি গোপন একটা চুক্তি হল, আরবের লোকেরা জেরুজালেম কে কেন্দ্র করে একটা রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করছে,নাম ফিলিস্তিন।  এটাকে ঔপনবেশের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ইহুদিদের করে দিল।

এখন গুটিকয়েক ইহুদি ওই ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করতে চাইলে সারা বিশ্বে বিতর্ক উঠবে,বিতর্কের তোপে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে শেষ করে দেওয়া হবে,ইহুদিদের ওই দেশে ওঠা হবে না।

সারা বিশ্বের পাবলিকের সমর্থন পেতে হবে,এই সমর্থনের জন্য দরকার করুণ কিছু ঘটনা,পাবলিকের চোখের পানি,করুণা,

আর গণহত্যা ছাড়া চোখের পানি সহজে কিভাবে আসবে?

বিশ্বের উঠতি শক্তি তখন আমেরিকা। জার্মানির বড় বড় ধনী কিছু ইহুদি আমেরিকায় চলে এল। এসে ব্যাবসা পাতল।মার্কিনীদের কর্মসংস্থান দিল,জনপ্রিয় হল,রাজনৈতিক নেতা,আন্ডারওয়ার্ল্ড এর মাফিয়া সবাইকে মাসোহারা দিয়ে সন্তুষ্ট রাখল,বন্ধু হল। তারপর আস্তে আস্তে আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিডিয়ার সত্ত্ব কিনে নিল। 

সেই মিডিয়ার দেখাদেখি ইহুদিদের টাকার লোভে কাছে এল সারা বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া।

এখন পরিকল্পনার পরবর্তী অংশ। 

জার্মানীতে তখন এক যুদ্ধপাগল,স্বৈরাচারের শাসন চলে। নাম তার এডলফ হিটলার। যুদ্ধ করে আশেপাশের দেশ দখল করা,আর ভয়াবহ উগ্রমেজাজ এর জন্য সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়। ইতালির আরেক স্বৈরাচার মুসোলিনী বাদে সারা পৃথিবীকে তাকে ভালবাসে এমন কেউ নেই। প্রত্যেকটা মানুষ হিটলারকে এতটাই ঘৃণা করে যে,হিটলার যদি “হ্যা” বলে,মানুষ ধরেই নেয়,যে সত্য ঘটনা হল “না”।

যুক্তরাষ্ট্রের বড়লোক ইহুদিরা একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করল। একটা মহৎ উদ্দেশ্য,বিশ্বের ইহুদীদের রাজত্ব,আর জীবাণুর মত কদাকার মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য এখন কিছু বলি চড়াতে হবে, রক্ত লাগবে,অনেক রক্ত।

জার্মানি তে তখন যেসব ইহুদি ছিল ম্যাক্সিমাম গরীব ছিল। এর মধ্যে প্রজননক্ষম স্বাস্থ্যবান নারী পুরুষকে মার্ক করে একটা নির্দিষ্ট তারিখ যুক্তরাষ্ট্র আর জেরুজালেমের জাহাজ ধরার টিকেট দেওয়া হল,আর টাকা।তাদের আলাদা রাখা হল।

তারপর লোক দিয়ে হিটলারের কানে তোলা হল,”ইহুদিরা তোমাকে ক্ষমতা থেকে বের করার চক্রান্ত করেছে,পোল্যান্ড আর রাশিয়ার সাথে হাত মিলিয়েছে। সবাই গুপ্তচর। তোমাকে শেষ না করা পর্যন্ত থামবে না।”

মাথা গরম হিটলার কিছু চিন্তা না করে,গণহারে যত ইহুদি আছে,তাদের খুন করা শুরু করল। হলোকস্ট হল একটা,পৃথিবীর অন্যতম এক গণহত্যা।

স্বজাতির অকেজোদের বলি দিল ইহুদিরা। উদ্দেশ্য সফল।মিডিয়ার জোরে সারাবিশ্বে প্রচার পেল এই গণহত্যার খবর। বিভিন্ন লাশের ছবি।সারা বিশ্বের মানুষ কেঁদে বুক ভাসাল। আহারে,বেচারা ইহুদিরা।

অসহায়, আশ্রয়হীন জাতি ইহুদিরা যখন আবদার করল ফিলিস্তিনে একটা ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য। এক কোণে পড়ে থেকে পবিত্রভূমিতে তারা খোদার নাম নেবে বাকি জীবন। করুণাময় পৃথিবীবাসী আর না করতে পারল না।

ফিলিস্তিনের মুসলিম নামক অজাতদের জন্মগত অধিকার এভাবে ইহুদিরা নিয়ে নিল। অনেক বছর পর মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ মতে আল্লাহ কর্তৃক অভিশপ্ত ইহুদিরা আরবে ফিরল।

সেই শুরু,আস্তে আস্তে ফিলিস্তিনের এক কোনা থেকে সারা ফিলিস্তিন দখল হয়ে গেল। কেনা মিডিয়া আরব ইসরাইল যুদ্ধের খবর প্রচার করল না। সব জানা গেল যুদ্ধের শেষে।

৩ টা যুদ্ধ হল। ১৯৬৫ সালের দিকে, প্রায় গোটা ফিলিস্তিন,এমনকি পবিত্রভূমি জেরুজালেমসহ  খুবই শক্তিশালী একটা ঘাটি হল ইহুদিদের।

এবার পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ।

অনেক যুদ্ধ করে,গুপ্তচর ঢুকিয়ে দুই মুসলিম দেশ,মুসলিম-খ্রিষ্টানদের দেশে যুদ্ধ বাধানো হল,যাতে মুসলিমরা নির্মূল হয়। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের সাথে দেখল,পৈশাচিক মুসলিম জাতি টিকে গেল। বীরবিক্রমে টিকে রইল।

শেষ চেষ্টা হিসেবে, মুসলিমদের মিডিয়া দিয়ে সন্ত্রাসী বানিয়ে নাটকের আয়োজন হল। লোভী কিছু মুসলমানদের সাহায্যও নেওয়া হল। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমরণ যুদ্ধে সারাবিশ্বের সব ধর্ম আর জাতির মানুষ কোটি কোটি মুসলমান মেরে দোজাহানের অশেষ নেকি অর্জন করল।

ইহুদি নেতাদের চোখ কপালের ভিতর তখনি ঢুকল,যখন দেখল এত করেও পৃথিবীতে মুসলিমদের সংখ্যা কমছে না। ইদুরের মত এরা বংশবৃদ্ধি করে,আর অন্য ধর্মের মানুষ এই ধর্মটা গ্রহণ করে।

সেটা ঠেকাতেও এক সংক্রামক ভয়ংকর ব্রেইনওয়াশ “লাভ জিহাদ” এর গুজব ছড়ানো হল। তাতেও কাজ হল না।

বিজ্ঞানের আশ্রয় নেওয়া হল। টাইম মেশিন বানিয়ে মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মানুষ শেষ নবী (সাঃ) কে জন্মের সাথে সাথেই হত্যার প্লানও হয়েছিল (Annihilator origins দ্রষ্টব্য), ব্রেইনওয়াশ এর মাদক ছড়িয়ে মুসলিম যুবকদের জীবন্ত লাশ বানানোর প্লানও হল ( Villaino origins আর দানব কথন: গল্প ৪ দ্রষ্টব্য),  কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।

মিডিয়ার জন্য মুসলমানদের মুখ সারা দুনিয়ায় এত খারাপভাবেই উপস্থাপিত,যে এখন একটা মুসলিম মরলে,আতশবাজি পোড়ানো হয় অমুসলিম দেশের সাধারণ মানুষের শহরে। 

The Lobby এবার অলৌকিক একটা পরিকল্পনা হাতে নিল। পৌরাণিক একটা জীব বানাবে।

একটা দানব।কদাকার মুখ। প্রচন্ড ক্ষমতাশালী। অমর। পাথর আর কাদা দিয়ে তৈরি।  যার ভিতর প্রাণ সঞ্চার করতে পারে একটা রাবাই। সেই রাবাইয়ের কথায় সে সব করবে। রাবাইয়ের আদেশ শেষ না হবা পর্যন্ত  থামবে না। ইচ্ছামত রূপ পরিবর্তন করতে পারবে। মুখ থেকে বের করবে আগুণ। অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকবে। 

“গোলেম”

গোলেমটা তার সাদা উজ্জ্বল চোখজোড়া খুলে দাড়াল আরিজোনার সেই ঘাটিতে।

রাবাই বলল,”আগে দরকার অনুশীলন।  এক্টা ছোটদেশ থেকে শুরু। দক্ষিণ এশিয়ার একটা গরীব অজানা দেশ আছে। পাবলিক চেনেও না ঠিকমত। মুস্লিম দেশ। নাম বাংলাদেশ।  এই দেশটায় যত হাফেজ আছে কোরআন এর,যত ইসলাম প্রচারক,, সবার মাথা ছিড়ে এনে দিতে হবে। আর এই কাজ শেষ হবার পথে যারা বাধা দেবে টুকরা টুকরা করে ফেলবি। 

ওরা বাংলাদেশি, ওদের রক্তের মূল্য নেই।”

গোলেম বলে উঠল,”গোলেম”

সাদা উজ্জ্বল চোখের আলোটা গোলাপী হয়ে গেল।

২.

চট্টগ্রামের আর্মি ট্রেনিং সেন্টার থেকে একটা ট্রেন ঢাকার পথে আসছে। এই ট্রেনটায় থাকা বেশ কয়েকজন তরুণ লেফটেন্যান্ট কে ঢাকায় ক্যাপ্টেন পদে আনুষ্ঠানিক ভাবে পদোন্নতি দেওয়া হবে এবং কোয়ার্টার দেওয়া হবে পরিবার নিয়ে থাকার জন্য।

এই ট্রেনে এমনি এক পদোন্নতি প্রার্থী রেজা ইসলাম। ক্যাপ্টেন হবার চিঠি আগেই পেয়েছে সে। এবার সেটার আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এরপরই বিয়ে করবে সে। পকেট থেকে তার পছন্দ করা পাত্রীর ছবি বের করল সে,গত ৪ বছর ধরে বছরে দুইটা ঈদ ছাড়া তার সাথে দেখা হয় না রেজার,তবে ছবিটা কখনো সে বুকপকেট ছাড়া অন্য কোথাও রাখে না। রাতে শুয়ে শুয়ে ফোনে তার মিষ্টি কন্ঠ শুনতে শুনতে ছবিটা দেখে ঘুমের অতলে হারিয়ে যায় সে… ছবির মানুষটার সাথে মিষ্টি স্বপ্নে।

প্রায় ১০ বছর আগে রেজার ধারণাও ছিল না মেয়েটি সম্পর্কে। মেয়েটার বাবা একজন হাফেজ ছিল,এবং উচ্চশিক্ষিত, এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির লেকচারার। কিন্তু মেয়েকে সবসময় পর্দায় থাকার অভ্যাস করিয়েছিল,নিজেকে রক্ষা করার ইসলামি শিক্ষায় বড় করেছিল। 

রেজা পরে অবশ্য জেনেছিল লোকটি মেয়েটার পালক বাবা ছিল। মেয়েটির আসল বাবা বিল্ডিং ধ্বসে মারা পড়ে,মেয়েটি তখন এক বছর বয়সী। তার পালক বাবা তাকে উদ্ধার করে সেখান থেকে।

তার আসল বাবা সম্পর্কে ইতিহাস বেশি একটা ভাল না। গুজব আছে যে,তার বাবা তার মাকে খুন করে মেয়ের পিতৃপরিচয় সম্পর্কে সন্দেহে। গুজবটা এখনো মেয়েটার আশেপাশে ঘোরে। এমনকি মেয়েটার আপন দাদিও তাকে একথাই মনে করিয়ে দেয়।

তবে আসল সত্যিটা রেজা জানে। মেয়েটা বলেছে তাকে,আর মেয়েটা আজ পর্যন্ত কখনওই মিথ্যা বলে নি। প্রচন্ড বিনয়ী,আর নরম মেয়েটাকে হাজার আঘাত করলেও কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বলতে কেউ কখনো দেখে নি। নিজের আসল বাবা মা সম্পর্কে মিথ্যা কথা শুনলেই চোখ ফেটে নীরবে পানি ফেলত।

রেজাকে মেয়েটা বলেছিল তার বাবার আসল কাহিনী।  তার বাবা আশ্চর্য এক ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিল। নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী জীব এর গতি এবং জড় পদার্থের প্রকৃতি পরিবর্তন করতে পারত সে। তবে তার ছিল প্রচন্ড বদমেজাজ।যেটা আশেপাশের সবাই জানত।শুধুমাত্র একজনই তাকে ঠান্ডা করতে পারত,একজনের সাথেই সে কখনো মেজাজ দেখাত না,সে হল মেয়েটার মা।

ভাগ্যের ফেরে মেয়েটার বাবা এক পিশাচসাধকের দলের খপ্পরে পড়ে যায়। কিন্তু সেখান থেকে সে ফিরে তো আসেই, সাথে করে বলির জন্য রাখা, মেয়েটার পালক বাবা যিনি এক হাফেজ সাহেব,তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।আর সাথে যে পিশাচটার আরাধনা করত দলটি,তাকে খুন করে।

এর প্রতিশোধ নিতে সে দলের এক প্রচন্ড শক্তিশালী তরুণী সদস্য মেয়েটার মাকে খুন করে,মেয়েটার বয়স তখন মাত্র কয়েকদিন। আর ঘটনাটা এমনভাবে সাজায় যেন মনে হয় মেয়েটার বাবা খুনটা করেছে, কারণ তার স্ত্রী দুশ্চরিত্রা,তাদের মেয়ে এই দুশ্চরিত্রার অবৈধ সন্তান।

মেয়েটার বাবা এই অপবাদ মাথায় নিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে পালায়।তবে সেই পিশাচপূজারিনীর হাত থেকে বেশিদিন সে বাচতে পারে না। তার বাসায় এসে তাকে খুন করে। 

তবে মেয়েটাকে মারতে আসার সময় এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। সেই ডাইনিটাই প্রচন্ড আতংকে চিৎকার করতে থাকে,এবং তার উপর অর্ধেক বিল্ডিং ধ্বসে পড়ে…

ঘটনাটা অনন্যা প্রতিদিন স্বপ্নে দেখে। ওহ হ্যা,রেজার প্রিয়তমার নাম অনন্যা আহমেদ। বাবার নাম আহাদ আহমেদ,মায়ের নাম তাসনিম আহমেদ। পালক বাবার নাম হাফেজ মোঃ নবীন রহমান,আর পালক মায়ের নাম,জিনাত রহমান।

তবে ভাগ্যের ফেরে অনন্যার কেউ নেই এখন,সে মানুষ হচ্ছে তার ছোট চাচা,দাদা আর দাদীর কাছে,সেখানের অভিজ্ঞতা তার খুব ভাল না,,,,

১০ বছর আগে,রেজার সাথে অনন্যার দেখা হওয়াটা একটা আশ্চর্য ঘটনার মাধ্যমে হয়েছিল। বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে এক ভূতুড়ে  বাড়িতে রাত কাটাতে গিয়ে সে বুঝতে পেরেছিল,এই বাড়িতে ভূত থাকে না,বরং এক পাগল বিজ্ঞানী একদল অপহৃত মানুষ এর উপর পৈশাচিক এক্সপেরিমেন্ট চালায়। ঘটনাটি টের পাওয়ায় রেজার মাথায় লেজার চালানো হয়। রেজা মস্তিষ্ক এবং নার্ভাস সিস্টেম সারাজীবন এর মত অচল হয়ে যায়।

তখনি সহপাঠী বলে অনন্যা রেজাকে দেখতে আসে। সে বুঝতে পারে রেজার মস্তিষ্ক সাধারণ মানুষ এর মস্তিষ্কের মত না,বিকৃত আকৃতির হয়ে গেছে। সে তখনো নিজের শক্তি সম্পর্কে জানত না। সে শুধু কল্পনা করেছিল,মস্তিষ্কের আসল আকৃতি কেমন হওয়া উচিৎ। আর সাথে সাথে রেজার স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়া মস্তিষ্ক স্বাভাবিক আকৃতিতে ফিরে আসে।

রেজা জানে,তার এই আজকে অবস্থানটা কার জন্য সম্ভব হয়েছে। ছবিটার মানুষ টার ঠোটের উপর হাত বুলিয়ে দেয় সে।

এসব অলৌকিক ক্ষমতা টমতা কিছুই কিন্তু রেজা জানত না।এসব কথাই সে জানতে পারে পরে। যখন সে নিজ চোখে জিনিসটা দেখতে পায়,তারপর থেকে,,,,

অনন্যার পালক বাবা আর মা হঠাৎ একদিন গুম হয়ে যায়। অনন্যাকে তার ছোট চাচা তাদের বাসায় নিয়ে যায়।অনন্যার দাদীর তার উপর অত্যাচারটাও তখন থেকেই শুরু হয়।

আর এসময়েই খুব আপন কারো অনুপস্থিতিতে পালক বাবার রক্ষণশীল শিক্ষা থেকে সরে এসে অনন্যা রেজার সাথে বন্ধুত্ব করে।

রেজাকে একবার সে বলেছিল তখন তার স্বপ্নের কথা,মাঝে মাঝে তার চোখ থেকে সাদাটে নীল রং এর আলো বের হয়,সে কথা। রেজার কাছে সাদাটে নীল আলোটা পরিচিত ছিল। সে যখন হাসপাতালে অলৌকিক ভাবে সুস্থ হচ্ছিল, এই আলোটা তখন সে দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু রেজা তখনো এই বিষয়টা নিয়ে গুরুত্ব দেয় নি। একটা সুন্দরী মেয়ের কথায় মাথা ঝাকানোটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

যাই হোক,অনন্যাকে ইম্প্রেস করতে সে তাকে প্রস্তাব দেয় যে তার পালক বাবা মাকে কেউ খুজছে না যখন,রেজা নিজেই খুজবে। অনন্যাও সাথে আসে।

তখন তারা আস্তে আস্তে বের করে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অন্যান্যদের সাথে নবীন র জিনাতকেও অপহরণ করে সেই ভূতুড়ে বাড়িটায় এক্সপেরিমেন্ট এর জন্য আনা হয়েছে (বিভিন্ন কারণে নবীনের চাকরি চলে গিয়েছিল, Dimension origins:part 2 দ্রষ্টব্য)।

অনন্যা আর রেজা যখন সেখানে পৌছায়,পাগল বিজ্ঞানী এরিক পামার একটা ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলেছে নবীনের রক্তের সাহায্যে। রক্তে আশ্চর্য এক শক্তি ছিল,কারণ সে ১৪ ববছর ধরে অনন্যার কাছাকাছি ছিল। 

ওষুধটা নিজের শরীরে নিয়ে সে ১৫ ফুট লম্বা ভয়াবহ এক দৈত্য হয়ে যায়।তারপর শহরের রাস্তায় নেমে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে।

এই ঘটনার ফাকে অনন্যার চোখের সামনেই নবীন মারা যায়। রেজা আর্তনাদ করতে থাকা অনন্যাকে নিয়ে  একটা ভাঙাচোরা বাসের ভিতর আশ্রয় নেয় দানবটার হাত থেকে বাচতে।

তখনি নিজের চোখে সে অনন্যাকে দেখে,মাটি থেকে কয়েক হাত উপরে ভাসতে, চোখদুটো থেকে সাদাটে আলো বের হতে,আর বাইরে ১৫ ফুট লম্বা দানবটা বাসের পেষণে থেতলে যেতে থাকে,,,

অনন্যার রাগ থামলে তার নাকমুখ থেকে গলগল করে রক্ত পড়তে থাকে। রেজা সেই ছোট বয়সে অনন্যাকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে যায়,,,পুরোটাসময় অনন্যার হাত ধরে রাখে সে।

সেই হাত সারাজীবন ধরের রাখার সংকল্প করে সে।

ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। ঢাকার স্টেশন এ পৌছাতে আর ১ ঘন্টা লাগবে। ট্রেনটাকে দূরের রাস্তা থেকে একটা গাড়ি ফলো করা শুরু করে।

রেজা তার স্মৃতি রোমন্থনে আবিষ্ট থাকে।

সেই ১৪ বছর বয়স থেকে অনন্যা আর রেজা মানিকজোড় এর মত বেস্ট ফ্রেন্ড থাকে।জীবনের সব ব্যাপারই পরস্পরের সাথে শেয়ার করে তারা। এদিকে ১৪ বছর বয়স থেকে ওই অপার্থিব রূপের জন্য অনন্যাকে বিয়ে করতে বিভিন্ন বয়সী আর পেশার লোকেরা বিয়ের প্রস্তাব দিতে থাকে। অনন্যার দাদী তার নাতনি,যাকে সে উঠতে বসতে গালিগালাজ করে,তার জন্য নিলামের মত ডাকে, তার নাতনিকে বিয়ে করতে হলে তাকে টাকা দিতে হবে। যে সবচেয়ে বেশি টাকা দেবে,তার নাতিনির সাথে বিয়ে হবে।

এই অফার চালু করার পর,কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে বিত্তশালী,অথবা নারী ব্যবসায়ীরা হুমড়ি খেয়ে পড়তে থাকে অনন্যার দাদাবাড়ি। রেজা খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়ে,অনন্যাকে সে হয়ত কিছু বলার আগেই হারিয়ে ফেলবে।

কিন্তু অস্বাভাবিক ভাবে অনন্যার দাদী হঠাত স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে যায়।তার শুধু দেখতে আর শুনতে পাবার ক্ষমতা থাকে। এবং সে অনন্যাকে আশেপাশে দেখলেই আতংকিত হয়ে পড়ত।

১৬ বছর বয়সে অনন্যা যখন রেজাকে বলছিল,সে তার বাসার সামনে রাখা একটা গাড়িকে কিভাবে হাওয়ায় উঠিয়ে অন্য জায়গায় রেখেছে,এবং শুধু শুধু কাজটা সে করে নি। গাড়িটার জন্য তাদের এবং প্রতিবেশীদের বিরক্তি হচ্ছিল,কিন্তু গাড়ির মালিককে কিছু বললে গালাগালি করছিল,তবে গাড়িটা হাওয়ায় ভাসিয়ে অন্য জায়গায় রাখার কাজটি সে সূক্ষভাবে করতে পারে নি,জোরে নিজে পড়ায়,গাড়ির চাকাগুলো ছুটে গেছে।

তখনি রেজা জীবনের প্রথমবারের মত অনন্যাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল।

অনন্যা যেন কারেন্ট এর শক খেয়েছিল এটা শুনে,প্রচণ্ড লাল হয়ে গিয়েছিল তার ফর্সা গাল। সে চিৎকার করে “না” বলে চলে এসেছিল।

রেজা অনেক কষ্ট পেয়েছিল। অনন্যাকে এড়িয়ে চলছিল। অনন্যা অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছিল।রেজা এড়িয়ে যাচ্ছিল।

একদিন এভয়েড বেশি করায় অনন্যা রেগেই তার সামনে এসেছিল। কথা না বলায়,তার রাগ এতটাই বেড়েছিল,যে সে হাওয়ায় বেসে উঠছিল,চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল।

কেউ দেখে ফেলার আগেই রেজা শিগগিরি ওর হাত ধরল। সাথে সাথে জাদুর মত অনন্যা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।

রেজা সেদিন বুঝেছিল অনন্যাও ওকে ততটাই ভালবাসে,যতটা ও তাকে বাসে,ওই একমাত্র অনন্যার সব গোপন কথা জানে। ওই অনন্যাকে ঠান্ডা করতে পারে।

রেজা তখন আরেকবার বলেছিল অনন্যাকে সে ভালবাসে। অনন্যা কেদে দিয়েছিল। বলেছিল তার পালক বাবার স্মৃতিকে সে অপমান করতে পারবে না।

রেজা বুঝল,অনন্যার প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে প্রেম করবে না তার সাথে।তার পালকবাবার তার জন্য বেধে দেওয়া শেষ নিয়মগুলো এমনিই ভাঙছে সে ইসলামি আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে ওর সাথে জাস্ট কথা বলার জন্য,এমনকি নিজের চুলও দেখানোর জন্য,প্রেম করলে এই বয়সে অনেক কিছুই হতে পারে,যেটা হবে তার মৃত বাবার জন্য চূড়ান্ত অপমান।

রেজা অনন্যাকে এরপর দুইবছর আর কখনওই অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও প্রেমের প্রস্তাব দেয় নি। 

একসাথে কম্পিউটার গেমস,দাবা, ক্যারাম সব খেলত তারা,পড়াশুনাও একসাথে করত। যেকোনো খেলায় নিজের অলৌকিক শক্তি ব্যবহার করে রেজাকে রাগানো একটা স্বভাব ছিল অনন্যার। কপট রাগ দেখালেও মনে মনে রেজা হাসত অনন্যার দুষ্টু হাসি দেখে।

কমিশনার র‍্যাংকে যখন সে ক্যাডেট হয়ে সেনাবাহিনী তে চান্স পায়,তখনো বলে নি অনন্যাকে। একদিন আবার প্রেমের প্রস্তাব দেয়। ঠোট কাপিয়ে অনন্যা সেবারো প্রত্যাখ্যান করে। চোখ থেকে একবিন্দু পানি পড়ে যায়।

রেজা বলে,”তুই যদি আমাকে হ্যা ও বলতি,ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো পাপ করার সুযোগও আমরা পেতাম না। শুধু মনে রাখতাম,যে তুই আমার হয়ে আছিস। আমি চলে যাচ্ছি সেনাবাহিনীতে,ছুটিছাটা ছাড়া এভাবে আর দেখা হবে না হয়ত।”

অনন্যা এই কথা শুনে এতটাই শকড হয়ে গিয়েছিল যে তার এতদিনের গোছানো জীবন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। রেজা সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার পর অনন্যা জীবনের লক্ষ্যের উপর থেকে বিতৃষ্ণ হয়ে গিয়েছিল। 

রেজা যখন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এর মধ্যে শুনল ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী মেয়েটা কোনো ভাল ভার্সিটি তে চান্স না পেয়ে  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ বাংলায় সাধারণ ডিগ্রিতে চান্স পেয়েছে,অনেক।কষ্টে ছুটি নিয়ে এসে আবার দেখা করল অনন্যার সাথে।

অনন্যা চুপ করে থাকে সারাদিন।শেষ কবে ওর হাসি কেউ দেখেছিল,বলতে পারে না। একদম শুকিয়ে গিয়েছে সে,চোখের নিচে কালি পড়েছে।

রেজা যখন ওর হাত ধরল,ও কেপে উঠেছিল। কিন্তু কিছুই বলছিল না। রেজা ওকে নিয়ে একটা পার্কে বসল।

রেজা ওকে বলেছিল,”হ্যা বলে দিতি, এত কষ্ট তো পেতি না। আমি তো জানি তুই আমাকে ভালবাসিস।”

অনন্যা ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।

রেজা বলেছিল,”অথবা তোর ক্ষমতা বলে রেখে দিতি আমাকে তোর কাছে,,,”

অনন্যা শুকনো কন্ঠে বলল,”কোনো ক্ষমতা আর নেই।সেই স্বপ্নটাও আর দেখি না।”

রেজা অনন্যার হাত ধরল। পার্কে ওরা হাটল। অনেক কথা বলল। এমন সময় ওরা পাশের রাস্তায় একটা এম্বুলেন্স কে প্রচন্ড জ্যামের ভিতর আটকে থাকতে দেখল। এম্বুলেন্স টার সামনে ১ মেইল আর পিছে এক মাইলের মত জ্যাম। এমনকি সেটার দরজা খোলারও উপায় নেই। এম্বুলেন্স এর ভিতর এক প্রসূতির চিৎকার শোনা যাচ্ছে,লোকেরা চেঁচামেচি করছে,প্রসূতির পেটের বাচ্চাটা নাকি আটকে আছে অনেকক্ষণ। শিগগিরি হাসপাতালে না নিলে বাচবে না।

রেজা অনন্যাকে বলল,”অনন্যা কিছু একটা কর।”

অনন্যা বলল,”বললাম তো শক্তি নেই,,,”

রেজা অনন্যার দুইগাল ধরে বলল,”প্রেম করবি না ভাল কথা,করতেও বলছি না। অপেক্ষা করতে পারবি? একটু কষ্ট করে? আমার সাথে প্রতিদিন ফোনে কথা বলবি,দুই ঈদে দেখা করবি। আর ৪ টা বছর পর আমি ক্যাপ্টেন হয়ে বের হব। তোকে বিয়ে করে সরকারি কোয়ার্টারে উঠব। এই চার বছর আমাকে না দেখে যত কষ্ট পাচ্ছিস,সব পুষিয়ে দেব। পারবি? প্রেমও করলাম না,পাপও না, সরাসরি বিয়ে? ৪ বছর পর। পারবি অপেক্ষা করতে? আমাকে প্রতিদিন দেখতে?”

বাইরে এম্বুলেন্স টার ভিতর প্রসূতির চিৎকার মরণ চিৎকার হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ প্রসূতির সব ব্যাথা শেষ হয়ে গেল। বিনা ব্যাথায়,তার জরায়ু মুখ খুলতে লাগল। বাচ্চাটা একা একা পেটার ভিতর ঘুরে গেল। জরায়ুর কোনো সংকোচন ছাড়াই বাচ্চাটা জীবিত অবস্থায় বের হয়ে যেতে লাগল,,,,,,

রেজা বলেছিল,”পারবি অপেক্ষা করতে? ৪ বছর অপেক্ষা করলেই সারাজীবন একসাথে থাকব।”

অনন্যার চোখের নিচের কাল দাগ আস্তে আয়াতে চলে যেতে লাগল চোখের সামনেই,ভাঙা মুখমণ্ডল আবার উজ্জ্বল হল। মুখে আবার সেই হৃদয়কাড়া হাসিটা দেখা গেল। সে রেজাকে জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে বলল,”পারব।”

এম্বুলেন্স টা হাওয়ায় ভেসে উঠল ৭/৮ হাত। তারপর জ্যামের গাড়িগুলোর উপর থেকে ভেসে ভেসে কম্ফর্টেবল একটা গতিতে হাসপাতালের দিক রওনা হল,বাচ্চা আর তার মাকে চেক আপ করাতে।

রেজা সহ আশেপাশের সকল মানুষ ভয়াবহ বিস্ময়ে এই ঘটনা দেখতে লাগল। তবে রেজা ছাড়া কেউই বুঝল না রেজার বুকে ঠেকানো মাথাটা মালকিনের চোখ থেকে দীর্ঘদিন পর সাদাটে নীল একটা আলো ঠিকড়ে বেরোচ্ছিল।

সেনাবাহিনীর ট্রেনটাকে ফলো করা গাড়িটা কাছে এসে গিয়েছে। যেখানে রাস্তা আর রেললাইন একত্রে মিশে গেছে,সেখাএ গাড়িটা আসার পর তিনটা মুখোশ পড়া লোক মেশিনগান হাতে দড়িতে হুক বেধে ট্রেনের পিছনের বগি আটকাল। তারপর  বগিতে চড়ে সামনে এগোতে লাগল ট্রেনের ছাদের উপর দিয়ে। তাদের লক্ষ্য ইঞ্জিন রুম।

রেজার স্মৃতি রোমন্থনে এল তার ক্যাপ্টেন হবার স্মৃতি বিজড়িত রাত। চিঠি পেয়েই অনন্যাকে ফোন দিয়েছিল সে। অনন্যা বলেছিল, “রোজার ঈদে কয়দিনের ছুটিতে আসবি?”

রেজা বলেছিল, “বেশ কয়েকদিনের। তোকে বিয়ে করে এবার কোয়ার্টারে উঠব। আমি ক্যাপ্টেন হয়ে গিয়েছি। বাসায় ছোট চাচাকে বলিস,আব্বু আর আম্মুকে নিয়ে যাব তোদের বাসায়,,”

অনন্যা হা করে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। রেজা বলল,”অনেক কথা আছে তোর সাথে,তো শেষ খবর বল,শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিস এখন? নাকি রাগলেই সব এলোমেলো হয়ে যায়?”

অনন্যা বলল,”রাগ হই না তো?”

রেজা বলল,”তারমানে নিয়ন্ত্রণে আসে নি এখনো।দাড়া,বিয়েটা হোক,প্রতি রাতে তোকে আর্মি ট্রেনিং দেব নিয়ন্ত্রনের,,,”

রেজার স্মৃতিতে এই কথাটা বলার পর অনন্যার শব্দ করা হাসিটা কানে আসতেই রেজার মুখেও একটা হাসি ফুটে উঠল,,তখনই ঝাকুনি দিয়ে ট্রেনটার গতি প্রচণ্ড বেড়ে গেল।

আশেপাশে আর্মি অফিসাররা হুড়োহুড়ি করতে লাগল। কি হয়েছে ঘটনাটা বোঝার জন্য। ট্রেনের গতি বেড়েই চলেছে, অফিসাররা সিটের সাথে লেপ্টে আসে এতটা গতির জন্য,,,,

৩.

অনন্যা রেজার মা আর বাবার সাথে স্টেশনে অপেক্ষা করছে। অনেক চেষ্টা করেও মুখের মিষ্টি হাসিটা চাপতে পারছে না।

রেজার বাবা মা আড়চোখে ব্যাপারটা দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। মেয়েটাকে ১০ বছর ধরে চেনে তারা।কতবার তাদের বাসায় এসেছে সে। মেয়েটাকে রেজার মা খুবই আদর করে। মনে।মনে সেই ১৪ বছর বয়স থেকেই নিজের ছেলের বউ ভাবে সে।

রেজার মা ভাগ্যে বিশ্বাসী। ছেলের সুস্থতার জন্য দিনরাত অলৌকিক কিছুর প্রার্থনা করত সে আল্লাহর কাছে। ডাক্তাররা বলে দিয়েছিল তার ছেলে আর বাচবে না। এভাবে প্যারালাইজড হয়েই মারা যাবে। তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

ঠিক তখনই এই মেয়েটা তার মরতে বসা স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়া অঙ্গ নিয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখতে আসার সাথে সাথে তার ছেলে পুরোটা স্বাভাবিক হয়ে মা বাবা বলে চিৎকার দেওয়াটা অবশ্যই অলৌকিক ঘটনা।

এবং রেজার মা নিশ্চিত, এই মেয়েটার আশ্চর্য ক্ষমতার জোরেই তার ছেলে বেচে আছে,এই মেয়েটা তার ছেলের জন্য ভাগ্য নিয়ে এসেছে। এই মেয়েটা তার ছেলের জীবনে আসার পরই তার ছেলে বদলে গিয়েছে। দুরন্ত,অমনোযোগী ছেলে বেচে উঠেছে তো বটেই,শান্ত আর মেধাবীও হয়েছে। এই মেয়েটাকে তার ছেলের জন্য রেখে দেবার প্লান তার অনেক আগেই।

রেজার মা বাবা দুইজনই নরম বিনয়ী মেয়েটাকে পছন্দ করে। সেদিন যখন রেজা তাদের বলল,সে ক্যাপ্টেন হচ্ছে। এবং সে অনন্যাকে বিয়ে করতে চায়। তার বাবা মা বিনাবাক্যব্যয়ে রাজি হয়ে গিয়েছিল।

আজ যখন ছেলেকে রিসিভ করতে আসবে,অনন্যাও হঠাৎ বাসায় এসে তাদের সাথে যাবার বায়না করতেই নিয়ে আসল তারা মেয়েটাকে।

অনন্যা ট্রেন যেদিক থেকে আসার কথা সেদিক তাকিয়ে আছে। তার তর সইছে না,ট্রেনটা কখন আসবে। কখন একনজর দেখবে তাকে,,, রেজা বলেছে,বিয়েটা খুব তাড়াতাড়ি কম সময়ের ভিতর করবে। তার জয়েনের আগেই। অনেক কিছু বাকি আছে অনন্যার, রেজার সাথে শেয়ার করার,একসাথে স্বপ্ন দেখার,,,অনেক কিছু,,,আর মাত্র কয়েকদিন। ১০ বছরের যন্ত্রণার উপসম হবে।

ট্রেনের চালকের কেবিনে গিয়ে দুইজন চালকের গলায় ছুরি বসিয়ে পোচ দিল এক মুখোশধারী। তারপর ব্যাগ থেকে একটা ডিভাইস বের করে ট্রেনের এক্সেলারেটরে লাগিয়ে একটা বাটন টিপল সে। সাথে সাথে বাংলাদেশের শ্লথগতির ট্রেন প্রচন্ড গতিতে লাইন বেয়ে সামনে এগোতে লাগল।

বাকি দুইজন  বন্দুকধারী নিজেদের একটা দড়ির সাথে হুক দিয়ে আটকে স্পাইডারম্যানের মত ঝুলে ঝুলে বগির জানালা বেয়ে ভিতরে ঢুকে আর্মি অফিসারদের গায়ে মেশিনগান দিয়ে বৃষ্টির মত গুলি করতে লাগল। বগিগুলো আর্মি অফিসারদের রক্ত আর মগজে বিকট নকশা সৃষ্ট করল।

ট্রেনটা শুধু আর্মি অফিসারদের জন্যই বুকড। সদ্য পাশ করা লেফটেন্যান্ট, সদ্য পদোন্নতি হওয়া ক্যাপ্টেন। কয়েকজন মেজর আছে এখানে। একজন কর্ণেলের আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি শেষ মুহুর্তে এলেন না।

বগির পর বগি যখন আর্মি অফিসারদের বিস্ময়ের সুযোগ নিয়ে মেশিন গান।চলছে তখন একদম সামনের বগিতে থাকা মেজর শাহেদ সিট থেকে উঠে আতংকিত লেফটেন্যান্ট আর ক্যাপ্টেনদের দিক তাকাল।

“এই বগিতে যারা যারা আছো,আমার কমান্ড অনুযায়ী, ট্রেন থেকে লাফ দিতে রেডি থাক। পিছনের বগিতে যারা আছে,তারা হামলাকারীদের আটকানোর চেষ্টা করছে।”

রেজার মনে পড়ল,মেজর শাহেদ,চট্টগ্রাম থেকে নিজে বাছাই করে কয়েকজনকে এনে এই বগিতে বসিয়েছিল,কেউ কারণ জানতে চাইলে বলেছিল, “এরা আমার ফেভারিট স্টুডেন্ট, একটু পিকনিক টাইপ করব,চাকরির পর,কে কোথায় যায় তার তো ঠিক নেই,,,”

এদিকে পিছনের বগির সেনা অফিসাররা ধাক্কা সামনে অস্ত্র হাতে রেডি হয়ে আসে। হঠাৎ বিদ্যুৎ গতিতে ৫ টা উদ্ভট দেখতে বড় গাড়ি বুলেট গতিতে চলা ট্রেনটার পাশে সিরিয়াললি দাড়াল। আরো মুখোশধারীরা লাফিয়ে বগিতে চড়তে লাগল। লাফিয়ে চড়ার সময় কেউ কেউ পা পিছলে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়তে লাগলে,কিন্তু পিছনের কেউ পাত্তা না দিয়ে একইভাবে লাফিয়ে মেশিনগান নিয়ে ট্রেনে চড়তে লাগল।

সব মুখোশধারী ট্রেনে উঠলে,উদ্ভট গাড়িগুলো জাস্ট অদৃশ্য হয়ে গেল ভোজবাজির মত।

ট্রেনের গোলাগুলি বেড়ে গেল। নতুন আসা মুখোশ ধারীদের মেশিনগান থেকে বজ্রের মত শব্দে গুলি বৃষ্টির মত আসতে লাগল।

এদিকে আর্মি অফিসাররাও অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হল, তারাও পালটা গুলি ছুড়তে লাগল।

দুইপক্ষেরই অনেক মানুষ মরেতে লাগল।

এদিকে সামমের বগীতে মেজর শাহেদ দরজা খুলে প্রচন্ড গতিতে চলন্ত ট্রেনের পাশ দিয়ে তার বগীর ক্যাপ্টেন আর লেফটেন্যান্ট দের লাফাতে বলতে লাগল,একটু নিরাপদ নরম ঘাসওয়ালা জায়গা বা পানি দেখলেই,,,,

বগীতে শুধু মাত্র রেজাসহ তিনজন থাকল, আর মেজর শাহেদ।

রেজাকে যখন লাফাতে বলবে, তখনই বগিতে আরেকজন মেজর ঢুকল। মেজর অরুণ।সে ঢুকেই দেখল বগী প্রায় ফাকা। চোখ বড় করে সে ওদের দিক তাকাল।

“মেজর শাহেদ, আপনি পালাচ্ছেন? ওদিকে মেজর ফয়সাল,কিশোর আর শহিদ তাদের আন্ডারের ক্যাপ্টেন আর লেফটেন্যান্ট দের নিয়ে লড়াই করছে। আপনি তো কাপুরুষ না। আপনি পালাচ্ছেন কেন?”

মেজর শাহেদ চিৎকার করে রেজা সহ বাকি ৩ জনকে লাফিয়ে পড়তে বলল। ওরাও অক্ষরে অক্ষরে কমান্ড পালন করল।

মেজর শাহেদ, বাঘের মত ঝাপিয়ে অরুণের গলা চেপে ধরল। “তুই,,,তুই সবকিছুর মূলে,, বেঈমান,,, ”

অরুণ প্রথমে বিস্মিত ভাব করলেও হেসে দিল। “কেউ বাচবে না শাহেদ,, তোমার প্রিয় প্লাটুনের ওরাও বাচবে না।আমি সব জানি।তোমার পরিকল্পনা,সব জানিয়েছি। তুমি আমাদের বিরুদ্ধে লেগে অবিবেচক এর কাজ করেছ।পিপড়া কখনো হাতির দলের সাথে পারে বলো?”

শাহেদ ওর প্যান্টের পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে অরুণের পেটে উপর্যুপরি ছুরি চালিয়ে ওর লিভার আর এবডমিনাল এওর্টাটা কেটে দিল। তারপর বগির খোলা দরজা দিয়ে নিজে লাফ দিল।

এদিকে গোলাগুলিততে মেজর কিশোর একা বন্দুল হাতে রক্তাক্ত হয়ে রক্ত আর ছিন্নভিন্ন অঙ্গের স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে আছে,বুক কাপছে তার। হঠাৎ গুলি খাওয়া এক অস্ত্রধারীকে সে নড়তে দেখল। তাকে ধরে মুখোশটা খুলে ফেলল।

সোনালী চুলের এক বিদেশি লোকের চেহারা বের হয়ে গেল। নাকমুখ থেকে রক্ত পড়ছে। লোকটা মরা আগে হিসহিসিয়ে বলল,”লং লিভ দ্য লবি”

এই বলে মরে গেল সে। মেজর কিশোর চিল্লাতে লাগল,”লবি? লবি কি? ”

ট্রেনের চালকদের খুন করা মুখোশধারীটা কিশোরের পিছনে এসে তার চুল ধরে গলাটা কেটে ফেলল।

ছটফট করতে থাকা কিশোরের কানের কাছে মুখ এনে বলল,”লবি সর্বশক্তিমান, পৃথিবীটাকে জীবানুশূন্য করার শেষ ভরসা,,, ইসলাম নামক দুরারোগ্য রোগকে সমূলে উৎপাটন করা জন্য পৃথিবীবাসীর শেষ আশ্রয়,,,”

কিশোরের মৃতদেহ পড়ে গেল। মুখোশধারী চলন্ত ট্রেনে হুক লাগিয়ে খুবই শৈল্পিকভাবে নেমে গেল ট্রেন থেকে।

এদিকে ঢাকার স্টেশনে অনন্যা প্লাটফর্ম এর কাছে গিয়ে ট্রেন আসার দিক তাকিয়ে আছে। ট্রেনের শব্দ পাচ্ছে সে। আসছে ট্রেনটা। রেজাকে নিয়ে আসছে,,,,

রেজার মা বা বলল,”অনন্যা,মা,অত কাছে যেও না,পড়ে যাবে, পিছিয়ে আসো,,,”

অনন্যা পিছাতে গিয়েও থেমে গেল। কিছু একটা ঠিক নেই,ট্রেনটা অস্বাভাবিক গতিতে আসছে।

রেজার মা আবার বলল,”অনন্যা,পিছে আসো,পড়ে যাবা ওখান থেকে,,,”

অনন্যা আতংকিত হয়ে চিৎকার দিল। “আংকেল,আন্টি সরে যান ওখান থেকে।”

প্রচন্ড গতিতে ট্রেনটা লাফিয়ে প্লাটফর্ম এ উঠে গেল,প্লাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা অসংক্যা মানুষ কে চোখের নিমিষে পিষে দিল,রেজার মা বা চোখের পলকে রক্তাক্ত পিন্ড হয়ে গেল….

অনন্যা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে পড়ল। বিশ্বাস করতে পারছে না সে। চোখ ফেটে পানি পড়ার সময় সে খেয়াল করল,ট্রেনটা স্টেশন ভেঙে চুরে  মেইন রোডের দিক যাচ্ছে,আশেপাশে অসংখ্য মানুষ এর ভয়ার্ত আর্তনাদ।

সাথে সাথে রেললাইন দুটো মাটি থেকে উপড়ে পড়ল।কাঠগুলো ভেঙে গেল। সাপের মত দুটো ইস্পাতের লাইন হাওয়ায় ভেসে ট্রেনটার পিছু নিতে লাগল। অনেক কিলোমিটার জুড়ে থাকা রেললাইন  উপড়ে গেল এভাবে। 

অনন্যা হাওয়ায় ভেসে উঠল। সাপের মত হাওয়ায় ভেসে চলতে থাকা রেললাইন দুটোর পিছু নিল। ট্রেনে এখনো রেজা আছে।

এদিকে ট্রেনটা রাস্তায় উঠে বাস,ট্রাক,সি এন জি, মানুষ,সবকিছু ভেঙে চুরে প্রচন্ড বেগে সামনে এগোতে লাগল।

রেললাইন নিয়ে অনন্যা ওটার পিছু নিতে লাগল। ইস্পাত দুটো ট্রেনের দুপাশ দিয়ে পাল্লা দিয়ে এগোতে লাগল। সেটে গেল ট্রেনের পাশে। সামনে অতিরিক্ত থাকা ইস্পাত দুটো পরস্পরের সাথে প্যাচ খেতে লাগল। আর প্রচন্ড শক্তিতে ট্রেনকে পিছের দিক ঠেলতে লাগল। উল্টাদিকের এই প্রচন্ড ধাক্কায় ট্রেনের বগি গুলো হাওয়ায় উঠে গেল একটার সাথে আরেরটা লেগে। সাইকেল জোরে চালিয়ে ব্রেক করলে যেভাবে পিছন দিকটা উচু হয় সেভাবে।

বগি গুলো অত উচুতে ওঠায় বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে পড়তে লাগল।

অনন্যার চোখে সাদাটে আলো ঝিক করে উঠল। বগিগুলো তুলার মত ভেসে ভেসে নামতে লাগল।

বগিগুলো নামার পর অনন্যা প্রত্যেকটা বগি তে দৌড়ে দেখতে লাগল। রক্ত আর মগজ  আর লাশের গনধে বমি করে দিল। তাও,ওই লাশ গুলোর ভিতর রেজাকে খুজতে লাগল সে।

না,নেই রেজা এর মধ্যে। এদিকে বাইরে পুলিশ,ফায়ার ব্রিগেড,এম্বুলেন্স এর শব্দ,সাংবাদিক রা আসছে, অনন্যা  দৌড়ে পালাতে গেল। যেখানে তাকায়,ট্রেনের নিচে কাটা পড়া লাশ। ওর মাথা ঘুরাতে লাগল।

হঠাৎ ঘাড়ের কাছে কিছু একটা লাগল তার। সারা শরীর কারেন্টের শক খেল। অজ্ঞান হয়ে গেল সে।

 কাল লম্বা পোশাক পড়া কিছু লোক এসে ওকে একটা গাড়িতে তুলল।গাড়িতে ওদের লিডার বসে রয়েছে।

৪.

ট্রেনের বগি থেকে লাফানো ১৩ জন লেফটেন্যান্ট ও ক্যাপ্টেন একটা গোপন পুরনো বাসায় বসে আছে।ওদের মোবাইল কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে সবার দৃষ্টি এখন দেয়ালে সাটা টিভিটার দিক। সেখানে ব্রেকিং নিউজ চলছে।

“…. ট্রেনটিতে চালক ছিল না।কেন যে একটা সাধারণ বাংলাদেশি ট্রেন চীনের বুলেট ট্রেনের গতিতে চলবে এটা একটা রহস্য। প্রচন্ড গতির কারণে ট্রেনটি প্লাটফর্মে উঠে আসে,এবং স্টেশন ভেঙে রাস্তায় চলে আসে।এ সময় সামনে থাকা সব মানুষ ওটার নিচে পড়ে ঘটনাস্থলে নিহত হয়। তবে ট্রেনটির নিচে আরো কয়েকশ মানুষ খুন হতে পারত। সেটা হয় নি একটা আশ্চর্য কারণে, ঢাকা থেকে কয়েক মাইক দূর পর্যন্ত থাকা রেললাইনের ইস্পাতদুটি আস্ত অবস্থায় উঠে এসে ট্রেনটিকে সাপের মত পেচিয়ে ধরে থামায়,, তবে কি বাংলাদেশে এনিহিলেটর,ভিলেনোর পর আরো একজন ভয়াবহ শক্তিধর প্রাণির আবির্ভাব হল?”

রেজা জানে এটা কার কাজ,, কে ট্রেনটাকে এভাবে থামিয়েছে,, অনন্যা এসেছিল ওকে রিসিভ করতে,ওর বাবা মার সাথে,,,,কোথায় এখন ও?

“নিহতদের একটি তালিকা দেওয়া হচ্ছে। ট্রেনের বগির ভিতর আর্মি অফিসারদের রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন দেহ পাওয়া গিয়েছে,গোলাগুলির চিহ্ন তাতে স্পষ্ট। মুখোশধারী কিছু জঙ্গিকে পাওয়া গিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এরা আলকায়েদা, আই এস বা তালেবানদের কেউ। চুল এর রঙ দেখে,এদের ভিতর বিভিন্ন জাতির মিশেল পাওয়া যাচ্ছে,,,”

নিহতদের তালিকা প্রকাশের পর ১৩ জনকে কাঁদতে দিল মেজর শাহেদ। সেরাতে তাদের কিছু বলল না। রাতটা নির্ঘুম থাকতে হবে। পাহারা দিতে হবে। আর পরবর্তী প্লান দেখতে হবে।

দুইদিন পর শোক একটু শান্ত হলে মেজর শাহেদ সবাইকে মিটিং এ ডাকল।

“তোমাদের একটা জিনিস জানা দরকার।  ট্রেনে হামলা হয়েছিল মূলত তোমাদের খুন করতে। তোমাদের ১৩ জনকে।  ”

আশেপাশে গুঞ্জন উঠল। তবে সিনিয়র এর সামনে হইচই করা নীতিবিরুদ্ধ। কয়েক সেকেন্ড পর চুপ হয়ে গেল। প্রশ্ন করার অনুমতি দেবার আগে প্রশ্ন করার নিয়ম নেই।

“মেজর অরুণ,আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল।তোমরা জানো।ও আমার ভাইয়ের মত ছিল। আমার আসল কাজ বা পরিকল্পনা শুধু ও জানত,আর এখন বুঝতে পারছি, সেটা আমাদের শত্রুরাও সবসময়ই জানত।”

সবাই চুপ।

“চল,তোমাদের কিছু জিনিস দেখাই। এই ছবিগুলো দেখ।”

সবাই কিছু ছবি দেখতে লাগল। গ্রামাঞ্চলের ছবি। আর ভেঙে পড়া ইট,আর পোড়া কাঠ আর টিন। তবে সব ছবিতেই এটা কমন যে এগুলো মসজিদের ধ্বংসাবশেষ।

সবাই অবাক হয়ে তাকাল মেজর শাহেদের দিক।

“আমি এন এস আই এর সদস্য। বাংলাদেশি ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স। আর আমি যে নির্দিষ্ট ব্রাঞ্চের সাথে জড়িত,সেটার লক্ষ্য হল,এই দেশে যেকোনোরকম সাম্প্রদায়িক দাঙা এড়ানো।”

সবাই এদিক ওদিক তাকাল।

শাহেদ বলল,”তোমাদের নিশ্চয়ই কয়েকবছর আগের সেই দানব স্ক্যান্ডাল কথা মনে আছে? ওই যে বিদঘুটে মানুষ গোয়েন্দাগিরি করত। খুব বেপরোয়া ছিল। তবে একবার ক্যান্টনমেন্ট এ ঘটা একপ্তা ধর্ষণের দায়ে যখন সেনাবাহিনী টালমাটাল অবস্থা,সে আসল অপরাধীদের বের করে সেনাবাহিনী কে বড় একটা লজ্জার হাত থেকে বাচিয়েছিল। এর পর আস্তে আস্তে বড় এক একটা আনসলভড রহস্য সমাধান করে এমন এমন অপরাধীদের সে আমাদের সামনে এনেছিল,যাদের আমরা ফেরেশতার মত সম্মান করতাম।

তবে সেই দানব একবার বেশ কিছু হিন্দুপাড়াকে আগুণ এ পোড়ার হাত থেকে বাচিয়েছিল। ভয়াবহ এক দাঙার হাত থেকে,,,, 

আমরা যখন তাকে ধন্যবাদ জানাতে যাই। সে বলেছিল,  এটা এখানেই শেষ না। বড় একটা সাম্প্রদায়িক দাঙা আসছে। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান হয়েছিল,ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ভেঙে বান্টুস্থান হবে।এমন একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রটা রুখতে সর্বপ্রথম হিন্দু,খ্রিস্টান আর বৌদ্ধদের নিরাপত্তা দিতে হবে, যতদিন না সে এই ষড়যন্ত্রের সত্যতা না খুজে পায়।

এরপর তো তোমরা সবাই জানো,দানবকে জেলে ভরা হল ভারতীয় গুপ্তচর হিসেবে,জেল ভেঙে তাকে অপহরণ করা হল,এরপরের কাহিনী আমরা জানি না। (দানব কথন: গল্প ৭,৮,৯ এ বিস্তারিত কাহিনী আসবে)

তবে আমরা দানবের কথাটাকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলাম। এদেশে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙা বাধানোর প্লান চলছে। এবং ধর্মের ভিত্তিতে এদেশ ভেঙে সংখ্যালঘুদের নিয়ে একটা দেশ তৈরি হবে। যে দেশকে চালাবে বিদেশী শক্তি,একটা ঘাটি হিসেবে (Annihilator: খলনায়ক গল্পে বিস্তারিত আসবে)।

আমরা তাই এদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে লাগলাম।সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। পূজার সময় আমরা অনেকবার পাহারায় থাকা পুলিশদের কারো ইশারায় চলে যেতে দেখেছিলাম। খোলা মন্দির ভাংচুর করতে। আমরা ঠেকিয়েছি।সে খবর আসে নি মিডিয়ায়।

তবে এই গ্রামের মসজিদ গুলোর ছবি দেখ। আমরা মসজিদ কখনো পাহারা দিই না।৯০% মুসলিমের দেশে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আঘাতের সম্ভাবনা খুবই কম হয়।যদিও আমাদেরকে দানব বলেছিল। যারা এই দাঙা বাধাবে,সবাই একই চক্রের। তারা নির্দিষ্ট ধর্মকে টার্গেট করবে না। তারা এমন কিছু করবে যাতে দাঙাটা ঘটে।”

“এখন এই মসজিদ গুলো ভাঙা হয়েছে নিরেট গ্রামে।শুধু তাই না, মসজিদের ইমামদের মাথা কেটে সামনে রেখে দেওয়া হয়েছে,,,”

রেজা সামলাতে পারল না।বলে উঠল,”মানে? এত বড় ঘটনা মিডিয়ায় এল না?”

হইচই পড়ল। মেজর শাহেদ কিছুক্ষণ থেমে বললেন,”মিডিয়ায় এল না,কারণ আমি পারসোনাল্লি সিউর করেছি যে ঘটনাটা যাতে মিডিয়ায় না আসে।”

সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঠান্ডা একটা ভয়ের স্রোত খেলে গেল রুমের মধ্যে।

“নীরেট ১৪ টা গ্রামে ১৪ টা মসজিদ ভাঙা হয়েছে,সাথে ইমাম,মুয়াজ্জিন আর কিছু মুসল্লির মাথা কেটে মিম্বরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।এই খবর সারাদেশে যদি ছড়ায় কি হবে বলতে পার? ৯০% মুসলমান, মানে আঠার কোটির ষোল কোটি লোক মুসলমান। যদি জানতে পারে,তাদের দেশে মসজিদ ভেঙে ইমামকে জবাই দেওয়া হচ্ছে,কি হবে এই দেশে? তুলকালাম হবে। বাকি ২ কোটি সংখ্যালঘু দেদারসে খুন হবে। বিদেশি শক্তি তাদের সাহায্য করার নামে এদেশ আক্রমণ করবে,এদেশ ভেঙে আরেকটা দেশ হবে,যেটা নামেমাত্র ধর্মীয় ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের দেশ হবে,আসল কারণ হবে গুরুত্বপূর্ণ একটা সামরিক ঘাটি বানানো। যেই ঘাটিকে কেন্দ্র করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে। আমেরিকা,চীন, রাশিয়া আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে।শুধু মাত্র ওই ঘাটিটা দখল করতে…. (Annihilator:খলনায়ক গল্পে বিস্তারিত আসছে) ”

একজন বলে উঠল,”আপনি বলতে চাচ্ছেন,সংখ্যালঘুরা একটা নতুন দেশের স্বপ্নে ইচ্ছা করে দাঙা বাধাতে এটা করছে?”

মেজর শাহেদ বলল,”না,এত সহজ না। এই ঘটনা ঘটাচ্ছে অজানা এক শক্তি। এদেশ ভেঙে একটা সামরিক ঘাটি বানালে যাদের সবচেয়ে বেশি লাভ।”

সবাই চুপ করে গেল। 

“এবার এই ছবিটা দেখ সবাই।”

এবারের ছবিটা দেখে ক্যাপ্টেন আর লেফটেন্যান্টরা ভয়ে লাফিয়ে উঠল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক হুজুর মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে আসে,চোখে মুখে আতংক,পিছনে মসজিদটা আগুনে পুড়ছে, আর হুজুরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে,,,, ওটা কি?

পাথরের তৈরি কদাকার একটা অবয়ব।  হাত আর পা সমান মোটা আর লম্বা। ডানহাতটা বজ্রমুষ্টি করা,আর বামহাতটা কনুই দেখে একটা ধারাল চকচকে তলোয়ার। মুখটায় কোন নাক নেই,আকার নেই, একটা ভয়াবহ বড় একটা হা,কাল গহব্অর। আর চোখ দুটো গোলাপী,,,,

মেজর শাহেদের দিক তাকাল সবাই শাহেদ বলল,”কি মনে হয়? এটা সংখ্যালঘু কেউ?”

সবাই চুপ করে আছে।

শাহেদ বলল,”খুব বেশি দেরি নেই,এই ঘটনাগুলো শহরে ঘটবে,ঠেকানোর কেউ নেই, যে আমাদের এই ছবিটা তুলে সেন্ড করেছিল,তার কাছে রকেট লঞ্চার ছিল।সেটা নিয়ে এটাকে আঘাতের পরেও এটার কিছুই হয় নি। আর শহরে ঘটার সাথে সাথে,মানুষ সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করবে তাদের দায়ী করে,,,,”

রেজা বলল,”আমাদের সাথে এসবের সম্পর্ক কি?”

শাহেদ বলল,”তোমরা আমার বাছাই করা সদস্য,তোমাদের আমি অনানুষ্ঠানিক ভাবে এন এস আই এর সাথে যুক্ত করে দিয়েছি। এ কারণে তোমরা অন্যদের চেয়ে বেশি বেতন পাও।তাড়াতাড়ি পদোন্নতিও হয়েছে,তোমরা আমার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। তোমাদের আমি বাছাই করেছি,একটা তথ্যের উপর বিবেচনা করে,,

“কয়েকদিন আগে একটা মাতাল গাড়ি এক্সিডেন্ট করে। তার গাড়ি থেকে আমরা কিছু লিফলেট পাই। এসব থেকে কিছু স্লোগান পাওয়া যায়। স্লোগানগুলোতে বলা,ইসলাম একটি বর্বর ধর্ম। আরো অনেক কিছু,ভাষা শুনে মমে হচ্ছে,অলরেডি সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হয়েছে,,,সেজন্য তারা স্লোগান রেডি করেছে। এরা কিছু একটা জানে। এরা প্রগতিশীল চেতনাধারী সংগঠন,আধুনিকতায় বিশ্বাসী। দেশের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলনের অজুহাতে এরা ইসলামকে ব্যাকডেটেড বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এরা চিহ্নিত নাস্তিক। এবং এদের বাবা মা সবাই মুসলিম। এরাও একসময় নামাজ রোজা 

করত। কিন্তু এখন এসব দল খুলে বসে আছে।কিন্তু এদের এবারের কর্মকাণ্ড খুবই গোপন।”

“আমি তোমাদের এসব দলের সাথে গুপ্তচর হিসেবে ঢুকাব।তোমরা আমাকে জানাবে এদের আসল প্লান কি। অনেকেই না করতে পার,তবে তোমরা বাধ্য,তোমাদের গুপ্তচর হিসেবে আমি ওসব সংগঠনে ঢুকানোর কথা অরুণকে শেয়ার করার পর উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত,বিদেশিরা চলন্ত প্লেনে উঠে হামলা করেছে। সুতরাং,আমার ধারণা ঠিক।আমাদের দেশটা অনেক বড় হুমকির মধ্যে….”

রেজা বলল,”ট্রেনটার ওভাবে অবিশ্বাস্য গতি কিভাবে হল? ”

শাহেদ বলল,”সেটা এন এস আই এর অলৌকিক ব্রাঞ্চের জন্যই তোলা থাক।”

৫.

অনন্যার জ্ঞান যখন ফিরল,সে খুবই রাজকীয় একটা কামরায় শোওয়া। তার দুইপাশে দুইটা মেয়ে দাঁড়ানো। সেনাবাহিনীর এটেনশন ভঙ্গিতে।

কি ঘটনা ঘটল বুঝে উঠতে তার রাগ আসল। তখনই একটা পুরুষ কন্ঠ বলে উঠল,”তোমার রাগ হওয়া স্বাভাবিক,মা। তবে দয়া করে নিয়ন্ত্রণ হারিও না।অন্তত আমার কথা শেষ হবার আগে।”

অনন্যা তাকাল। একজন বুড়ো লোক ঘরে ঢুকেছে।এই লোকটা তাকে তুলে আনা গাড়ির ভিতর ছিল। এই তাদের নেতা।

লোকটা অনন্যাকে বলল,”তোমার কাপড় চোপড়,আমার ব্রাঞ্চের মেয়ে এজেন্টদের দিয়ে চেঞ্জ হয়েছে। তুমি মনে কোনো আতংক বা ভয় বা রাগ রেখো না। আমার কথাটা শোনো,,, বাধ্য হয়ে তোমাকে এখানে আনতে হয়েছে আমাদের।”

অনন্যা একটু শান্ত হল। বিছানা থেকে নামল। মেয়ে দুটোকে লোকটা চলে যেতে বলল।ওরা দরজা আটকে বাইরে পাহারা দিতে লাগল। অনন্যার চোখমুখে এখনো সন্দেহ আর রাগ জমে আছে।

লোকটা বলল,”ধন্যবাদ মা,আজ আমাদের গণনা অনুযায়ী প্রায় ২০০০ মানুষ বেচে গিয়েছে,ট্রেনটা সময়মত আটকানোর জন্য,,”

অনন্যার চোখে রেজার মা বাবার ছবি ভেসে উঠল। চোখ ভিজে গেল।সে জিজ্ঞেস করল,”কয়জন মারা গিয়েছে,,,”

লোকটা বলল,”১৮৭ জন পথচারী, ৪০ জন সেনাবাহিনীর লোক,, আর ১৭ জন মুখোশধারী,যাদের এখন আই এস বলা হচ্ছে,,”

অনন্যা নিজের মুখ চেপে ধরল।বসে পড়ল বিছানায়। লোকটা পায়চারি করতে লাগল। 

“মা,তুমি কে, তোমার কি শক্তি,এটা আমরা প্রায় ৪ বছর ধরে জানি, যখন তুমি এক প্রসূতি মা সহ একটা এম্বুলেন্সকে হাওয়ায় ভাসিয়ে হাসপাতালে সবার সামনে নিয়ে গিয়েছিলে,,,”

অনন্যা অবাক হয়ে বলল,”আপনারা কিভাবে জানেন? এই কথা শুধুমাত্র একজন মানুষ জানে সারা দুনিয়ায়,,”

লোকটা বলল,”হুম, রেজা ইসলাম,ওই ট্রেনে ছিল। বেচে আছে সে। তাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, খবর পেয়েছি আমরা। মূলত সে আর তার ব্যাচের ১২ জনকে খুন করতেই ট্রেন হামলাটা করা হয়েছে।”

অনন্যা লাফিয়ে উঠল,”মানে?”

লোকটা আস্তে আস্তে মেজর শাহেদের কথাগুলো অনন্যাকে বলল।

অনন্যার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। 

লোকটা বলল,”তোমাকে আমরা ৪ বছর ধরে ফলো করছি।তোমার অবস্থান সেদিন আমরা জেনেছিলাম,একটা ডিভাইস নিয়ে।সেটা আমাদের দিয়েছিল ঈমান আহমেদ নামে এক বিজ্ঞানী প্লাস শিল্পপতি, দানবীর,যা ই বল। তবে তার আরেকটা পরিচয় আছে, তাকে ভিলেনো নামেও ডাকা হয়।”

অনন্যার পরিচিত লাগছে নামটা। হ্যা,একে চেনে সে,কয়েকবছর আগে এই নাম নিয়ে টিভিতে অনেক হইচই ছিল। তবে সিরিয়ালের জন্য বাংলাদেশি খবর অতটা দেখা হত না।

“ভিলেনো নিরুদ্দেশ হবার আগে,আমাদের বলে যায়,পৃথিবীতে ছড়ানো ইলেক্ট্রিক্যাল চার্জ,যা ওর ধারনা ওর সাথে কথা বলে, সেটা ওকে বলেছে,ওর মত, এনিহিলেটরের মত আরো দুইজন আছে এদেশে,,,, (Villaino:মৃত্যুর অনেক রঙ গল্পে বিস্তারিত আসছে)।”

সবকিছু অনন্যার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।

লোকটা বলল,”ও আমাদের একটা ডিভাইস দিয়ে যায়,তোমাদের খুজে বের করার জন্য। তোমরা,মানে অস্বাভাবিক শক্তির অধিকারীরা। বাংলাদেশ তো একটা ছোট দেশ মাত্র, ওই পৃথিবী নাকি তাকে বলেছে,আরো অনেক অনেক ভয়াবহ বিপদের লক্ষ্য আমরা। এদের হাত থেকে বাচাতে মাত্র ৬ জনের উপর বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে,,,,

নাম্বার ১ : ভিলেনো, সে তোমাদের সবচেয়ে বড়,এবং বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিশেষ শক্তির অধিকারি, এর শক্তি হল এক স্থান থেকে আরেক স্থানে চোখের নিমিষে টেলিপোর্ট করা,মানুষের মনের ভিতর ঢোকা,চিন্তা পরিবর্তন করে দেওয়া,আর একটা শক্তিশালী ইস্পাতের আর্মর আছে তার,যেটা তাকে বর্ধিত শক্তি দেয়।

নাম্বার ২: এনিহিলেটর, আলোর চেয়েও বেশি গতিতে ছুটতে পারে যে। সাথে প্রচন্ড শক্তি,এবং আঘাত সহ্যের ক্ষমতা।

নাম্বার ৩: দানব। এর ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানা যায় নি। বিশেষ শক্তি আছে কি নেই।

নাম্বার ৪: মিঃ উমর। একজন গোয়েন্দা,অস্বাভাবিক চিন্তাশক্তি এবং বুদ্ধির অধিকারি।

নাম্বার ৫: একে আমরা এখনো খুজে পাই নি। তবে ভিলেনোর মত,এই লোকটা একটা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বাঘিনীর পিঠে চড়ে,এবং বাঘিনীর বিশেষায়িত শক্তিগুলো নিজের করে নিতে পারে।

নাম্বার  ৬: তুমি। এই ৬ জনের ভেতর সবচেয়ে শক্তিশালী। এবং একটামাত্র নারী সদস্য। তোমার শক্তি সম্পর্কে ভিলেনো আমাদের কিছু বলে নি। তবে বলেছে,তোমাকে সময়মত নিয়ে এসে বুঝানো,তোমার কাজ কি,সততা,চরিত্র,মানবতা সম্পর্কে শিক্ষা কেমন তোমার,এসব জেনে নেওয়া,ভাল বলতে যা বোঝায়,তুমি তাই কিনা,,, তোমার শক্তির কথা ভিলেনো জানে,পুরো শক্তির কথা,,, তুমি নিজেও এখনো জানো না,এবং তোমার এই শক্তি কথা মনে করতে গিয়ে ভিলেনো কেপে উঠছিল। তোমাকে কেউ খারাপ পথে টেনে নিলে,মহাপ্রলয় হবে,,মহাপ্রলয়,,, তোমার শক্তি দুনিয়ার সব মাত্রায় বিস্তৃত,সব ডাইমেনশনে তোমার পদচারণার ক্ষমতা আছে,,,,

তুমি ডাইমেনশন।

অনন্যা হেসে দিল। লোকটার মাথায় সমস্যা আছে। লোকটা কে? পাগল ধনী কেউ? তাকে এখানে ধরে এনেছে কেন?সে এখান থেকে বের হবার রাস্তা খুজতে লাগল।

লোকটা বলল,”বিশ্বাস হল না? করতে হবে না। নিজেই একদিন বুঝবা। তবে সময় নষ্ট করব না আমি। তোমাকে এখানে এত তাড়াতাড়ি কোনো পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়া আনাটা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে এই ৪ বছরে তোমাকে অনুসরণ করে,তোমার চরিত্র আর তোমার নীতি সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে এই ক্রাইসিস এর সময়ে আমরা তোমাকে ডেকে এনেছি।

অনন্যা আবার মনযোগ দিল লোকটার উপর। বলল,”আপনার নাম কি?”

লোকটা বলল,”অমল,রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অমল বোস। আমাকে জানার অনেক সময় পাবা তুমি। একটু আগে তোমার বয়ফ্রেন্ড সম্পর্কে যা যা বললাম,তা তো শুনেছ,তাই না?”

বয়ফ্রেন্ড বলায় অনন্যা লজ্জা পেল। কিন্তু তারপরও বলল,”হ্যা।”

অমল কয়েকটা ছবি ফেলে বলল,”এই নাও।এই ছবি গুলো দেখো।”

অনন্যা ছবিগুলো দেখে কাপতে লাগল। রাগে না ভয়ে,সে জানে না,,,,

অমল বলল,”এই জিনিসটাকে দেখেছ? ছবি দেখে এটার উচ্চতা প্রায় ১১ ফুট মনে হচ্ছে।এই জিনিসটার সাথে পৌরাণিক একটা জিনিসের মিল পাওয়া যায়। পুরাণ মতে,ইহুদিদের শত্রুরা যখন তাদের আশেপাশে বেড়ে যাবে,তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির শুকনো মাটি নিয়ে একটা রক্ষক তৈরির ক্ষমতা থাকবে,এই মাটির তৈরি জীবটাকে সে বানাবে, তাতে প্রাণ দেবে, এবং তাকে তার শত্রু,পাপাচারদের বিনাশে লাগাবে,,, এর একটা নাম আছে,, “গোলেম””

অনন্যা বলল,”আমি বুঝছি না কিছু”

অমল বলল,”ইহুদিদের পরিবর্তিত ধর্মীয় নীতিতে ইহুদিদের একমাত্র শত্রু বলা হয়েছে মুসলিমদের। এই নীতি বাইরে প্রচার পায় না,এটা গুপ্তচর দের দিয়ে আনানো খবর। আর এই জিনিসটা অলরেডি বাংলাদেশের ১৪ টা গ্রামের ১৪ টা মসজিদ ভেঙে, বেশ কিছু মুসল্লিদের খুন করেছে। এখন বল,বুঝেছ?”

অনন্যার চোখ বড় হয়ে গেল। 

অমল বলল,”এমন গোলেম একটা না,অসংখ্য থাকতে পারে,তুমি জানো এই গোলেমকে ধ্বংসের ক্ষমতা কার থাকতে পারে? এক, যে তাকে বানিয়েছে,সেই রাবাই, দুই, যেই শত্রু বংশকে ধ্বংস করতে তাকে বানানো হয়েছে,সেই শত্রুদের মধ্যে জন্মানো এক নিষ্পাপ,কিন্তু প্রচন্ড শক্তিধর কেউ,,,”

অনন্যা চুপ করে আছে,,,

অমল বলল,”ডাইমেনশন,,, তুমি এম্বুলেন্সকে হাওয়ায় ভাসিয়ে কয়েক মাইল দূরের হাসপাতালে নিতে পারে,কম বয়সে বাসকে হাওয়ায় উড়িয়ে ১৫ ফুট লম্বা দানব মারতে পার, তোমার চরিত্র সম্পর্কে আমরা সব জানি।ব

তুমিই সে,,যে এই জিনিসটাকে ঠেকাতে পার। এই জিনিসটাকে না ঠেকালে,এর কাজের ফল হিসেবে অনেক বড় কিছু ঘটে যাবে এদেশে। দেশটা আগুনে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে, এই জিনিসটার ইসলাম ধ্বংসের মিশন সময়মত বন্ধ না হলে কেউ নিরাপদ না এদেশে,,কেউ না,,,,”

সেরাতে অনন্যা ছাদের অন্ধকারে একা বসে রইল বিশাল বাড়িটার। তারপর চাঁদ দেখতে লাগল।

 অনেক দূরে কোনো এক প্রগতিশীল চেতনার সংগঠনের এক নাইটক্লাবে তথ্য সংগ্রহ করতে রেজা ইসলাম ঢুকল। সবাই যখন মদ খেয়ে বিদেশি মিউজিকের সাথে নাচছে,সেও চাদের দিক চেয়ে রইল জানালা দিয়ে। মনে হল, একটা পরী এই চাদের আলোয় কোথাও বসে তার কথা ভাবছে, যার চোখের পানি তার হাতের পরশ পেতে মুখিয়ে আছে।

রেজা বুক পকেটে থাকা ছবিটাকে আরো জোরে চেপে ধরল  বুকের সাথে।

৬.

দশম রমজান।  রাত ৯ টা। তারাবীহ পড়া হচ্ছে ছোট একটা শহরের মসজিদে। হাফেজ সাহেব কোরআন পড়ছেন প্রথম রাকাতে।

হঠা মসজিদটা ঠান্ডা হয়ে গেল। হাফেজ সাহেবের গলা কেপে উঠল।

তিনি নামাজ শেষ করলেন কোনমতে। কিন্তু তারপরই ভয়ার্ত কন্ঠে মাইকে বলে উঠলেন,”ভাইয়েরা,আপনার সবাই কলেমা পড়েন,তওবা করেন, কি যেন একটা ঢুকছে মসজিদে,,,কি যেন একটা,,,,”

সশব্দে মসজিদের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। মুসল্লিদের আর্তনাদ শোনা গেল। আর ধারাল কিছু চালানোর শব্দ,মসজিদের টাইলস বেয়ে রক্ত চলছে, সেই রক্ত ভিতর আগুন জ্বলে উঠল,মসজিদটা ধ্বসে পড়তে লাগল। গোলেম বের হল,সেই আগুনের কুন্ড থেকে। হাতে হাফেজ সাহেবে ঝলসানো কাটা মাথা,,,,,

পরেরদিন সারা দেশে খবরে ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়ল। পোড়া মসজিদের সামনে হাফেজের কাটা মাথার ছবি আসল। দেশভর্তি মুসলমানরা ক্ষেপে উঠল। তখনই এন এস আই বেশ কয়েকজন ফরেনসিক স্পেশালিষ্ট কে দিয়ে ঘোষণা দিল, গ্যাস পাইপ বিস্ফোরণে মসজিদ পুড়ে গেছে,হাফেজ সবার সামনে ছিল,ধাক্কাটা এত জোরে লেগেছে যে তার মাথা আলাদা হয়ে মসজিদের বাইরে চলে এসেছে,,,

গণ্যমান্য ফরেনসিক স্পেশালিষ্ট এর একই অভিমত দেখে একটু ঠান্ডা হল জনগণ।  এদিকে এন এস আই এর হিন্দু,খ্রিস্টান আর বৌদ্ধ এজেন্টরা পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে তাদের ধর্মের লোকদের বোঝাতে লাগল মুসল্লিরা তারাবীহ পড়তে ঢোকার পর যেন তারা মসজিদের বাইরে পাহারা দেয়,একই কাজ মুসলিমরাও পূজার সময় করবে।

এই প্রক্রিয়ার কারণে কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আর হামলা হতে পারল না কয়েকদিন। 

এরকম অবস্থায় একদিন তাবলিগের মুসলিম ভর্তি এক বাস শহর থেকে চলছিল।

এই শহরেরই এক বিল্ডিং এ অনন্যাকে রাখা হয়েছিল। রুমের ভিতর অনন্যা ছটফট করতে লাগল। 

এন এস আই এর এজেন্টরা ডাক্তার ডাকল। অমল বোস হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। অনন্যা ছটফট করছে।অমলকে বলল,”কিছু একটা ঘটছে,এরকম কখনো লাগে নি আমার। আশেপাশে ভয়ংকর কিছু একটা আছে,,,”

অমল চমকে উঠল। সাথে সাথে র‍্যাব,পুলিশের বিভিন্ন ব্রাঞ্চকে তৈরি হতে বলল। অনন্যা হঠাৎ বিছানা ছেড়ে ৫/৬ হাত উপরে ভেসে উঠল। তারপর বলল,”ওটাকে দেখতেই হবে আমার।”

অনন্যা উড়ে চলে গেল। অমল আর কিছু এজেন্ট নিয়ে একটা হেলিকপ্টারে করে পিছু নিল।

তাবলিগের মুসলিমভর্তি বাসটা আসছে। ব্যস্ত রাস্তার প্রতিটা কোনায় সিসি ক্যামেরা রাখা। হঠাৎ বাসের সামনে গেড়ুয়া পোশাক পরা এক টিকি ওয়ালা ব্রাহ্মণ এসে দাড়াল। হাতে একটা ঘন্টা,সেটা বাজছে,ঘন্টার উপরটা একটা চাবির সাথে লাগানো,চাবিটা একটা গ্রেনেডের।ব্রাহ্মণের মুখে ভয়াবহ শীতল একটা হাসি। যেন একটা গহবর।

অনন্যা উড়ছে,বাসটার পিছন দেখতে পারছে সে। ব্রাহ্মণ এর ছবি সব সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ল। হঠাৎ ক্যামেরা গুলো বন্ধ হয়ে গেল।

তখনি ব্রাহ্মণ এর রূপ নেওয়া জিনিসটা তার আসল রূপ ধরল। পাথরের ভয়ংকর ১১ ফুটের গোলেমের সাথে বাসটা ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত হয়ে গেল। হুজুরদের মৃত্যুর সময়কার চিৎকারে আকাশ বাতাস কাপতে লাগল। অনন্যা সেই আগুনের ভিতর গিয়ে গোলেমটার গলা চেপে ধরে তাকে মাটি থেকে উপরে তুলে ফেলল। তারপর সজোরে মাটিতে ছুড়ে ফেলল।

গোলেম আর ডাইমেনশন দুইজনই অবাক ডাইমেনশনের এই শক্তিতে। গোলেম ওঠার আগেই ডাইমেনশন গিয়ে ওটার বুকের উপর চেপে বসল। ডাইমেনশনের সারাটা শরীর থেকে সাদাটে নীল আলো বের হচ্ছে।গোলেমটা নড়তে পারছে না।

গোলেম বিকট কিড়মিড়ে কন্ঠে বলল,”ওরা জানতেন,তুই থাকবি,তুই কে ওনারা জানে,,, তোর জন্য তাই এই  বিশেষ উপহার…..”

গোলেমের শরীরটা গলে যেতে লাগল,সাথে একটা প্রিজমের মত সাতরঙা আলো ছড়াতে লাগল। পুরো শরীরটা গলে যেতেই বিদঘুটে আলোটা বিশেষ একটা স্পার্ক করল।

অনন্যা চিৎকার করে মোচড়াতে লাগলে রাস্তায়। অমলের হেলিকপ্টারটা নামল। অনন্যা চিৎকার করছে,, “আমার চোখ,,আমার চোখ,,,,”

অমল গিয়ে অনন্যার হাত সরাল ওর মুখ থেকে। ওর সুন্দর চোখ দুইটার জায়গায় এখন বড় বড় দুইটা গর্ত।

৭.

এক ব্রাহ্মণ হাতে গ্রেনেড নিয়ে বাসের সামনে দাঁড়ানো ছিল। সিসি ক্যামেরা হঠাৎ বন্ধ হবার আগে এই দৃশ্যই শেষ দেখা গিয়েছিল। আর পরবর্তী খবর হল, এক বাস ভর্তি মুসল্লি পুড়ে মরেছে। 

মুসলমানরা পাগল হয়ে উঠল ক্ষোভে। কিন্তু কেউ কারো উপর আঘাত করল না। নিজ নিন এলাকায় তারা দেখেছে, তারাবীর সময় হিন্দুরা মসজিদ পাহারা দেয়,সেহরির সময় ঢোল পিটিয়ে জাগিয়ে দেয়, এরা ভাইয়ের মত। কাদের মেরে,ক্ষতি করে প্রতিশোধ নেবে তারা?

এন এস আই এর অসাধারণ প্লানের জোরে পরপর দুইটা বড় ঘটনার জের ধরেও কোনো দাঙা বাধল না।

ডাইমেনশনকে একটা আলাদা কেবিনে রাখা হয়েছে। ওর জন্য ডাক্তার ২৪ ঘন্টা বহাল থাকে। চোখে পট্টি বাধা। তবে ডাক্তারদের ধারণা দৃষ্টি আর ফিরবে না। অনন্যা সব বুঝতে পারে।কাদতে চায়, বাট পানি পড়ার মত কিছু অবশিষ্ট নেই।

এদিকে মেজর শাহেদের নিয়োগ করা গুপ্তচররা একে একে ধরা খেতে থাকে। তাদের গোপন কোন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। মেজর শাহেদের নামে এন এস আই এর দপ্তরে সেই অফিসারদের কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আসতে থাকে।

শুধুমাত্র রেজা ছাড়া সবাই ধরা পড়ল। গুপ্তচর খুজতে যখন সংগঠনগুলো বেশি জোরদার ব্যবস্থা নিচ্ছে,রেজা বুদ্ধি করে এক নাস্তিককে গুপ্তচর সাজিয়ে দিল। 

নিজেদের লোককে গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল। তার মাথাটা কেটে মেজর শাহেদকে পাঠাতে মেজর বুঝে গেল,রেজা বেচে আছে। তার তথ্য সংগ্রহের আসা যায় নি।

রেজা খুজে বের করল,সেই মুখোশধারী হামলাকারীরা সব ইসরাইলি গোয়েন্দা সংগঠন মোসাদের প্রাক্তন সদস্য। মুসলিমদের প্রতি অত্যন্ত উগ্র মনোভাব এবং অত্যন্ত বেপরোয়া হওয়ায় তাদের দল থেকে ছাটাই করা হয়। এরা এখন নিজেদের একটা সংঘের সদস্য বলে দাবি করে,সংঘটার নাম “দ্য লবি”।  কিন্তু এই লবিটা কি,তা রেজা জানে না। রেজা এটাও বুঝতে পারে,লবি এই বিশেষ দেশটা নিয়ে একটু চিন্তিত। বাংলাদেশে ৬ জন সুপার পাওয়ার ওয়ালা মানুষ আছে। এবং প্রত্যেকেই অত্যন্ত সৎ, চরিত্রবান,নীতিবান। এই ৬ জন এর পরিচয় তারা পেয়েছে। ভিলেনো নামে এক সুপার পাওয়ার ওয়ালা ক্যারেকটারকে ব্লাকমেইল করে তার কাছে থাকা এই ৬ জনের তথ্য সংগ্রহ করেছে তারা (villaino:মৃত্যুর অনেক রং গল্পে বিস্তারিত আসছে)।

রেজা আরো জানল,এই ৬ জনের ভিতর সবচেয়ে ক্ষমতাধর হচ্ছে একটা মেয়ে। যাকে ভিলেনো ডাইমেনশন নাম দেয়। এর বাবা দ্য লবির এক পৌরাণিক মিশন বানচাল করে দেয় (Dimension origins: part 3)।এই মেয়েটা ক্ষমতা নিয়ে লবি খুবই ভয়ে আছে। তাই এর পুরো ক্ষমতা সম্পর্কে আত্মসচেতন হবার আগেই,একে বিকল করার প্লান করেছে তারা। অলরেডি সফলও হয়েছে, মেয়েটার চোখ নষ্ট করে দিয়েছে তারা।তাদের তৈরি গোলেমের ভিতর শুধুমাত্র মেয়েটার চোখ নষ্ট করার এক উপাদান ঢুকিয়ে দেয়,অনেক গবেষণা করে পাওয়া। তারা জানত, ভিলেনো,দানব আর এনিহিলেটর বর্তমানে পলাতক (villaino: মৃত্যুর অনেক রং, Annihilator: খলনায়ক,দানব কথন: গল্প ৯ এ কারণ বলা হবে)। সুতরাং এই গোলেমের পিছনে এন এস আই একজনকেই লাগাবে,সে ডাইমেনশন।আর তার শারীরিক ক্ষমতা আর দুর্বলতা জানা আছে লবির।এভাবেই তার চোখ নষ্ট করার প্লান করে তারা। মেয়েটার চোখ থেকে সাদাটে নীল আলো বের হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। এটা নষ্ট হলেই তার শক্তি শেষ।

রেজা মুখ বুজে সব শোনে। চোখ ফেটে পানি আসে তার। ডাইমেনশন বলতে ওরা কাকে বুঝাচ্ছে,সে জানে। ওর অনন্যা,,ওর অনন্যা এখন অন্ধ,,,,

রেজা আরো জানতে পারে, এই সংগঠনটা লবির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র এনে রাতের আধারে সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করবে। তাদের তৈরি গোলেম যেদিন একটা মসজিদ ভাঙবে,সেদিনই একটা করে সংখ্যালঘু পাড়ায় আগুন দেওয়া হবে। তখনই এই সংখ্যালঘুদের অত্যাচার ঠেকাতে তিনটা দেশ আমেরিকার আদেশে সামরিক পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশে, ঢাকা,খুলনা আর রাজশাহী নিয়ে তৈরি হবে বান্টুস্থান।সেটা হবে আমেরিকার ঘাটি। রাশিয়া,চীন আর উত্তর কোরিয়ায় যেকোনো সময় আক্রমণে সক্ষম এক ঘাটি।

যে দেশ তিনটা সংখ্যালঘু আক্রমণের প্রতিশোধ মিশনে নেতৃত্ব দেবে, তারা হল ভারত,মিয়ানমার আর শ্রীলংকা।

৮.

রেজা তথ্য নিয়ে পালাল। লবি বুঝে গেল,রেজা ছিল গুপ্তচর।তবে ওকে নিয়ে বেশি মাথা ঘামাল না।তারা মুখোশধারী লবির সিক্রেট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এজেন্টদের দিয়ে এন এস আই এর বাংলাদেশি ঘাটিতে আক্রমণ করল। মেজর শাহেদ,ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অমল বোস মারা গেল। এন এস আই এর অনেক অভিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক লোকদের গুলি করে মারা হল। যারা বেচে রইল,পালিয়ে গেল।

বাংলাদেশ আক্রমণের খবরটা রেজা কাকে দেবে বুঝে ওঠার আগেই লবির এদেশীর এজেন্টরা সংখ্যালঘু পাড়ায় আক্রমণ শুরু করল। আগুন জ্বলতে লাগল সারাদেশে। 

একটা গোলেম ধ্বংস হয়ে যাবার পর,আরো কয়েকশ গোলেম পাঠানো হল বাংলাদেশে। গোলেম গুলো হাফেজ দের টার্গেট করতে লাগল। বিভিন্ন মাদ্রাসায় ঢুকে ছোট ছোট বাচ্চা হাফেজদেরও মারতে লাগল।

দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বলে খুব কম জিনিসই টিকে রইল। সব ধর্মের প্রতিষ্ঠানে আগুন জ্বলতে লাগল।

সব প্লান মাফিক হতে লাগল। ভারত,মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের দিক ট্যাংক আসতে লাগল। শ্রীলংকা থেকে নৌবহর। বিজিবি ও সেনাবাহিনীকে ভিতরে সংগঠিত দাঙা ঠেকাতে নিয়োগ করা হল। সীমান্ত অরক্ষিত রয়ে গেল।

লবি গোলেমদের স্পেশাল মশন দিয়েছিল ডাইমেনশনকে খুজে বের করে তাকে মেরে ফেলা। রিস্ক রাখবে না তারা। এর সম্পর্কে যা শুনেছে তারা,সব যদি সত্যি হয়, লবিকে নেড়ি কুকুরের মত মারতে এই একজনই যথেষ্ট। সুতরাং তার ক্ষমতা ফিরে আসার অবসর দেওয়া যাবে না।

গোলেমরা অমল বোসের ডাইমেনশনকে গোপনে রাখার জায়গাটা খুজে বের করে হামলা চালাল।

ডাইমেনশনের চিন্তাশক্তি ওকে আগেই সাবধান করে দিল। অনন্যা আহমেদ পালাল অন্ধ অবস্থায়।

অন্ধ অবস্থা যখন সে রাস্তায় নামল। মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি চলছে। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বলছে,লুটতরাজ চলছে। ভারত,মিয়ানমার আর শ্রীলংকা আসছে সামরিক অভিযান চালাতে। পিপড়ার মত মানুষ মরবে।

অনন্যার একজনের কথাই বার বার মনে পড়তে লাগল।রেজা,রেজা করতে লাগল তার মন। রেজা তখন এন এস আই এর শেষ ব্রাঞ্চটা ঝুজতে এই শহরে এসেছে। এই ব্রাঞ্চেই অনন্যাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

মানুষজন দৌড়াচ্ছে,অনন্যা এর ওর সাথে ধাক্কা খাচ্ছে।হঠাৎ ওর মনে হল,আশেপাশে খুব পরিচিত কেউ আছে, ও চিৎকার করে উঠল,”রেজা!!”

রেজা পালাতে থাকা মানুষের ভীড়ে হাসফাস করছে।

অনন্যা বলল,”আমি জানি,রেজা, তুমি এখানে,ওরা আমার চোখ কেড়ে নিতে পারে,মনটা পারে নি। রেজা!!!”

রেজা ডাক শুনল। ডাকের দিক পালাতে থাকা মানুষদের ধাক্কিয়ে আসতে লাগল। চিল্লিয়ে বলতে লাগল,,”অনন্যা!!!!”

 ভারতীয় ট্যাংক আর মিয়ানমারের ট্যাংক সীমান্ত পার হচ্ছে। শ্রীলংকার নৌবহর সার বেধে দাড়িয়েছে বাংলাদেশের উপকূলে। কয়েকশ গোলেম পালাতে থাকা মানুষকে পায়ে পিষে এগোচ্ছে,ওরাও অনন্যার কন্ঠ শুনেছে।

রেজা এখনো ঠেলাঠেলি করে অনন্যার দিক যাওয়া শুরু করেছে।

 এদিকে লবির যেই এজেন্ট সেই ট্রেনহামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল সে পায়ের সাথে সেদিনের ট্রেনের মত এক্সেলারেটর ডিভাইসটা বসিয়ে উড়ে উড়ে শহর থেকে শহর প্রদক্ষিণ করছিল অনন্যাকে খুজতে।যদি গোলেমরা ব্যর্থ হয়,সে অনন্যাকে মারবে।

অনন্যার চোখে পট্টি বাধা। পিছে সারি বেধে গোলেমরা আসছে। 

রেজা মানুষের ধাক্কা খেয়েও এগিয়ে আসতে আসয়ে চিল্লাতে লাগল,”অনন্যা,তোমার মনে আছে তুমি আমার ব্রেইন কিভাবে সারিয়ে দিয়েছিলে? মনে আছে তোমার? নিজের চোখকে কল্পনা কর। তোমার ওই মায়াভরা চোখের বর্ণনা আমি তোমাকে অনেকবার দিয়েছি,, কল্পনা কর,, তুমি তোমার চোখ নিজেই ঠিক করতে পারবা,,,,”

গোলেমরা কাছে এসে গেছে। লবির এজেন্টটাও ডিভাইজটা পরে উড়ে আসছে। মানুষগুলো পালাচ্ছে। রেজা অবশেষে অনন্যার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। বলল,”তুমি পারবে, আমি জানি। তোমার চোখ দুটো ফিরিয়ে আনো,,, বাদামী মণি,, হরিণের মত টানা টানা,,,”

লবির এজেন্টটা অনন্যাওকে দেখতে পেয়ে গুলি করল। রেজা অনন্যাকে বুকে জড়িয়ে অন্যদিকে সরিয়ে পিঠ পেতে দিল।

অনন্যা পট্টির নিচে সাদাটে নীল আলো দেখা দিল,পট্টিটা খসে পড়তে লাগল। ওর চোখ দুটো আবার ফিরে এল। ও রেজার দিকে তাকিয়ে অনেক দিন পর মিষ্টি একটা হাসি দিল।

এজেন্ট আরেকটা গুলি করল। আতংকে অনন্যা জমে গেল। রেজা ঢলে পড়ল ওকে জড়িয়ে,,, বলল,”মাফ করে দিও,,,”

 ডাইমেনশন বসে পড়ল। ওর কোলে রেজার লাশ,,,,

গোলেমগুলো এগিয়ে আসছে। এজেন্টগুলো আরেকটা গুলির জন্য তৈরি। ভারতীয় আর মিয়ানমারের ট্যাংকগুলো সীমান্তে ঢুকে গুলি চালাতে লাগল। অসংখ্য ঘর পুড়তে লাগল। শ্রীলংকান নৌবহর উপকূলে টর্পেডো মারতে লাগল।

ডাইমেনশন একটা চিৎকার দিল। ভয়াবহ চিৎকার। সাদাটে নীল আলো ওর চোখ তগেকে বের হতে লাগল,চিৎকার করা খোলা মুখ থেকেও, সারা শরীর থেকে,, আলো গুলো রেজাকেও ঢেকে দিল,,ডাইমেনশনের চুল উড়তে লাগল।

আগেই পালিয়ে গিয়েছে সাধারণ মানুষ। বহুতল বিল্ডিং গুলো কড়কড় আওয়াজে আকৃতি বদলাতে লাগল,আসতে আস্তে সেগুলো অক্টোপাস এর শুড়ের মত হয়ে গেল। তবে মাথা তীক্ষ্ণ।  মাটি থেকে সমূলে উপড়ে যাওয়া বিল্ডিং এর চোখা মাথা গুলো কয়েকশ গোলেমের শরীর ভেদ করে ঢুকতে লাগল। ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল ওর শরীর।

এজেন্ট পালিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া এজেন্টের শরীর কয়েকশ মাংসপিণ্ড তে বিস্ফোরিত হল।

ডাইমেনশন এখনো চিৎকার করছে। সমুদ্র উপকূলের পানি হঠাৎ কয়েকশ ফিট উপরে উঠে গেল। তারপর একটা হাতুড়ির রূপ নিল। শ্রীলংকার জাহাজ গুলোকে একটা করে চুরমার করতে লাগল।

ভারতীয় আর মিয়ানমার এর ট্যাংক বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকতে লাগল। সৈন্যরা বের হতে লাগল অত্যাচার করতে।

হঠাৎ মাটিগুলো বিশাল দাত ওয়ালা সাপের মত আকৃতি নিয়ে লম্বা হতে লাগল। তারপর ট্যাংক গুলোকে আস্ত গিলতে লাগল।

বের হওয়া  সৈন্য গুলো অসংখ্য মাংসপিন্ডে বিস্ফোরিত হয়ে গেল।

সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষজন পালানো বন্ধ করে ডাইমেনশনকে ঘিরে ধরল। ডাইমেনশন চিৎকার থামাল।

পালানো ভীত মানুষগুলো বলতে লাগল,,”ডা-ডা-ডাইনী।”

কেউ কেউ বলল,”পিশাচিনী,,”

ডাইমেনশন কিছু বলল না, নিস্তব্ধ হয়ে ওর কোলে থাকা লাশটার দিক এক দৃষ্টে চেয়ে রইল।

(Dimension origin story সমাপ্ত)

গল্প ১২৩

​”তুমি কান্নার রঙ”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.

ভার্সিটি ক্যান্টিনে ফার্স্ট ইয়ারের ৭ জন ফ্রেন্ড আড্ডা দিচ্ছে।তাদের বন্ধুত্বের বয়স ৪ মাস। এদের মধ্যে ৪ জন মেয়ে,৩ জন ছেলে। মেয়েদের নাম রূপা,নীলা,মিতু আর মোহিনী। ছেলেদের নাম হাসান,রূপম আর রাজীব।

রূপা ঢাকার মেয়ে।ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে,মা তার বাবা মরার পর থেকে কেমন জানি পাগল পাগল হয়ে যান,এক সময়ে অসুস্থ হয়ে তিনিও মারা যান। রূপার দুই ছোট ভাই আছে,একজন এবার কলেজে উঠল,আরেকজন নাইনে পড়ে। বাবার রেখে যাওয়া অল্প কিছু টাকা মায়ের মাথার সমস্যার চিকিৎসাতেই ফুরিয়ে গিয়েছিল।রূপা নিজের বৃত্তির টাকা দিয়ে আর ছোট বেলা থেকেই টিউশনি করিয়ে ছোট ভাই আর নিজেকে চালাত। ভাগ্য ভাল,বাড়িটা তাদের নিজের।নয়ত তার পক্ষে এতটা করা সম্ভব হত না। রূপা এখন ভার্সিটি ফার্স্ট ইয়ারে বসেই কোচিং ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে গেছে, বাড়ি ভাড়া আর কোচিং এর বেশ খানিকটা টাকা রাজার হালেই চলছে সে। দুই ভাই ই ক্যাডেটে পড়ে,কেউ কাছে থাকে না। রূপা শহরের সংগ্রামী এক নারীর প্রতিনিধি,অল্প বয়সেই জীবনযুদ্ধে জয়ী এক বীর সে,গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরি আর সবচেয়ে হাসিখুশি। কখনো কোন কিছুই তাকে কাদাতে পারে না,বা তার ঠোট থেকে হাসিটা মুছতে পারে না। খুব সহজেই মানুষকে বন্ধু বানিয়ে নিতে পারে সে।

মিতু আর মোহিনী চাচাতো বোন। ওরা থাকে চট্টগ্রামে।দুইজনের বাবাই আর্মি অফিসার। ছোটবেলা থেকে অনেক কড়া শাসনে মানুষ। ঢাকায় ভার্সিটি তে চানস পেয়ে প্রথমবারের মত স্বাধীনতা পেয়েও কেমন জানি চুপসে থাকে তারা। গোয়ালের গরুকে সারা বছর বেধে রেখে হঠাৎ ছেড়ে দিলেও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে,কিন্তু একবার চলা শুরু করলে পাগলামি করে বেড়ায়,এর ওর ক্ষেতে মুখ দেয়। মিতু আর মোহিনীর মাত্র বাধন খুলেছে,এখন তারা ঠায় দাঁড়ানো পর্যায়ে আছে।এর ওর ক্ষেতে মুখ দেওয়া অবস্থায় যায় নি। যখন যাবে,তখন তাদেরকে বাজে মেয়ে বলা হবে।রূপা তাই ওদের আগলে রাখছে নিজের বোনের মত।যাতে ওরা শৃঙ্খলার ভিতরেই থাকে।স্বাধীনতাটা টের না পায়।

নীলা উগ্র নারীবাদী মেয়ে। সে পুরুষ দেখতে পারে না। বলা যায়,নীলা,মিতু আর মোহিনীই তার ফ্রেন্ড। ছেলেদের মধ্যে বা আশেপাশে বসাটা তার পছন্দ না। রূপা দায়িত্ব নিয়েছে তার ভিতর থেকে এই ঘৃণা ভাবটা সরানোর। মাত্র ৪ মাসে সে যা পেরেছে,তা হল ওকে নিয়ে একসাথে ছেলেদের টেবিলে আড্ডা দেওয়া।

নীলার এমন স্বভাবের কারণ আছে। সে ধর্ষিত হয়েছিল ছোটবেলায়।নিজের এক আত্মীয়ের দ্বারা। শুধু তাই না,তাকে এরপর ফেলে রাখা হয়েছিল একটা খালের ভিতর,মৃত ভেবে। 

নীলার জীবন বাচানোর জন্য একটা অদ্ভুত পরিকল্পনা ছিল স্বয়ং আল্লাহর। নীলার ক্ষতবিক্ষত দেহটা যখন আস্তে আস্তে খালের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল। তখন পাশের বাসার পালা একটা গরু,যেটাকে খালের পাশের মাঠে বাফহা হয়েছিল,সেটা দড়ি ছুটে এসে নীলার একটুকরা ছেড়া কাপড় ধরে অজানা কারণে টেনে তোলে। তারপর টানতে টানতে বাসার দিক নিয়ে যায়।

নীলার ধর্ষককে নীলা জ্ঞান ফিরতেই দেখিয়ে দেয়।সে এখনো জেলে আছে, প্রায় ৭ বছর হয়েছে। 

নীলা ভেবে পায় না, সে আল্লাহর প্রতি জীবন বাচানোর জন্য শুকরিয়া করবে,নাকি তার জীবনটা অত ছোট বয়সে নষ্ট করার জন্য নাস্তিক হয়ে যাবে। এই দ্বিধায় তার রাত নির্ঘুম কাটে।

সেই গরুটা বুড়ো হয়ে গিয়েছিল। ওটাকে একদিন জবাই দিয়ে সারা গ্রামে মাংস বিলানো হয়েছিল। নীলা সেদিন ওর জীবনের শেষবারে মত কেদেছিল। এরপর তার চোখে কখনো কেউ পানি দেখে নি। এমন কি তার মায়ের মৃত্যুর সময়ও না, তার বাবার অন্য জায়গায় বিয়ে হবার সময়ও না। তার সৎমায়ের গালাগালি আর মারের সময়ও না….

নীলার কারো সাথেই বন্ধুত্ব হবার কথা ছিল না। সে ওরকম মেয়ে না,যে সহসেই মিশতে পারে কারো সাথে। তবে রূপার ব্যপারটা ব্যাতিক্রম।সে নীলাকে হাসাতে পারে,কষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারে।

রাজীব গরীব ঘরের ছেলে। তবে বেশিদিন তাকে গরীব থাকতে হয় নি। অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলেটা তার এতটুকু জীবনেই অসংখ্য কাজ করেছে।শেয়ার মার্কেটের ব্যবসায় বাংলাদেশে সফল হওয়া গুটিকয়েক ব্যক্তির মধ্যে সে অন্যতম।

হাসান একজন আতেল। সে মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানে না। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা পরে সারাদিন তাকে বই হাতে দেখা যায়। অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় গত চারমাসে সবচেয়ে র‍্যাগের শিকার সেই হয়েছে। এমনকি শিক্ষকরাও সুযোগ পেলে তার সাথে নিছক মজার জন্য বিপদে ফেলার চেষ্টা করে। তবে তাকে রূপা আর রাজীব দুইজনই আগলে রাখে,এভাবেই এই গ্রুপের সদস্য হয়েছে। শুধুমাত্র নীলা বাদে সবার সাথে মিশতে পারে সে এই গ্রুপে,নীলার সাথে ছেলেরা কথা বললে কাটছাঁট উত্তর দেয় সে। আর হাসানকে দুর্বল পুরুষ পেয়ে প্রায়ই নিজের পুরুষবিদ্বেষী মনোভাব তার উপর প্রকাশ করে ঝাল মিটায়।

গ্রুপের শেষ সদস্য রূপম। গ্রুপের সবচেয়ে সুদর্শন আর স্মার্ট ছেলে। তবে আর একটা গোপন পরিচয় আছে,যেটা নীলার ধর্ষণের কাহিনীর মতই গোপন। 

সে একজন প্লেবয়। নারীদের পণ্য হিসেবে ভাবতেই তার ভাল লাগে। সেই ক্লাস টেনে বসে প্রথম নারীদেহের স্বাদ পায় সে,তারই এক ক্লাসমেট এর সাথে। সেই থেকে শুরু। বিত্তশালী বাবার ছেলে,মেয়েদের সাথে মেশেই সে এই একটা কারণে। এমনকি এই গ্রুপে সেধে সেধে সে মিশেছে ৪ টা সুন্দরি মেয়েকে দেখে। সামনের ৪ বছরে এই ৪ জনকেই ভোগ করার ইচ্ছা আছে তার। তবে তার বাইরেটা দেখে এটা বোঝা যায় না। বাইরে সে খুবই ভদ্র একটা ছেলে,খুবই বিনয়ী,স্মার্ট,মেয়েদের হাসাতে পারে। এরমধ্যে মোহিনীর আবার ওকে একটু একটু পছন্দও। কিন্তু ওই যে ছোটবেলার কড়া শাসন।সেটার ভয়েই ছেলেটার দিকে প্রেমের সম্পর্কে এগোতে পারছে না সে। 

রূপমের প্রিয় শখ একা হলেই হাসানকে বিরক্ত করা,গায়ে হাত তোলা,সিগারেট আনানো। কিন্তু সবার সামনে ওর সাতবে সবচেয়ে ভাল ব্যবহার করা।

৪ মাস পূর্তির দিন ক্যান্টিনে যখন খাওয়া দাওয়া আর গল্প গুজব হচ্ছে,হঠাৎ ভার্সিটির দুই শিক্ষক ক্যান্টিনের এক টেবিলে এসে বসেছে।ছাত্ররা নড়েচড়ে বসল।রূপম সিগারেট ফেলে দিল।

একজন শিক্ষক বলছে সিনিয়র শিক্ষককে, “না না স্যার,এটা বে আইনি। ছেলেটা ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়ের চেয়ে কমপক্ষে ৫/৬ বছরের বড়। ভর্তি ছিল তাতে কি হয়েছে? এটা ভার্সিটির রুল হতে পারে না।এভাবে ভর্তি হয় কেমনে?”

সিনিয়র শিক্ষক বললেন,”আপনার কথাটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনি ভিসির সামনে এভাবে চেচামেচি করবেন না। আপনাকে সময়মত সরিয়ে এনেছি। নয়ত সমস্যায় পড়তেন।”

উত্তেজিত শিক্ষক বললেন,”আপনি জানেন স্যার এটা অন্যায়।মুখ বুঝে কেন মেনে নিতে গেলেন। এছাড়া,ছেলেটা তো অসুস্থ ছিল না,দুর্ঘটনার শিকারও ছিল না। ধর্ষণ প্রচেষ্টার মামলায় জেল খেটেছে,,,”

নীলা কথাটা শুনে শক্ত করে গেল।কাপছে সে। চোখ বড় হয়ে আছে। ওর কাহিনী শুধু রূপা জানে। রূপা ওর হাত ধরল শক্ত করে।

সিনিয়র শিক্ষক বললেন,”ছেলের বাবার অনেক ক্ষমতা। আমি শুনেছিলাম,ছেলেটার ১৪ বছরের জেল হয়েছিল,সেটাকে কমিয়ে  ৫ বছর করে এনেছে।”

উত্তেজিত শিক্ষক বলল,”আর যাই বলেন স্যার,এই ছেলেকে আমি আমার ক্লাসে ঢুকতে দেব না। জানোয়ারের বাচ্চার জায়গা আমার ক্লাসে নেই।”

সিনিয়র শিক্ষক বললেন,”আপনাকে মানতেই হবে স্যার। ডিপার্টমেন্ট প্রধান আপনার মাথা গরম দেখে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব দিয়েছেন আপনাকে ম্যানেজ করার। ভার্সিটির কিছু গোপন বড়ধরণের ফাক আছে।এর মাঝে আপনি পড়তে চাইবেন না,,,”

উত্তেজিত শিক্ষক চুপ করে গেলেন। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। এই কথোপকথনটা ওরা ছাড়া আর কেউ শোনে নি। আর শিক্ষক দুইজন তাদের ডিপার্টমেন্ট এর। বোঝাই যাচ্ছে,জেলখাটা ধর্ষকটা তাদের ডিপার্টমেন্ট এ আসছে।

২.

রূপা,নীলা, মিতু আর মোহিনী রূপার  বাসায় রূপার ফ্লাটেই থাকে। রূপা আর নীলা দুই রুমে। আর মিতু এবং মোহিনী এক রুমে। রূপার সামনের ফ্লাটটা অনেকদিন ধরে ভাড়া হচ্ছে না। ভাড়া হলেও দুই মাসের বেশি কেউ থাকে না। ২ বছর আগে এখানে একটা খুন হয়। এক মা তার নিজের বাচ্চাকে জবাই দিয়ে,নিজে আত্মহত্যা করে। যারাই ওঠে,তার নাকি ওদের দেখতে পায়। এটা পাড়ার সবাই জানে। ভূতের ভয়ে ভাড়া হয় না তাই।তবে টু লেট সাইনটা সবসময়ই বিল্ডিং এর সামনে লাগানো থাকে।

এমন এক সময় একদিন বিকেলে রূপার দরজায় নক পড়ল। রূপা দরজা খুলল। একটা খুবই চিকন ছেলে দাঁড়ানো,চশমা পড়া।তবে হাসানের মত অত পাওয়ারের না। চশমার আবার ফ্রেমের একটা ডাট ভাঙা। গায়ের জামা কাপড় খুবই ঢিলা। বোঝা যায় ছেলেটা একসময় নাদুস নুদুস ছিল। তবে এখন তার স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। রূপার চেয়ে বেশ বড়ই হবে ছেলেটা,চেহারায় একটা কেমন জানি মায়া, সাথে রাজ্যের ক্লান্তি।

ছেলেটা বলল,”এটা কি বাসার বাড়িওয়ালার ফ্লাট?”

রূপা বলল,”জ্বী।”

ছেলেটা বলল,” আমি সামনের ফ্লাটটা নিতে চাচ্ছি। আমি ব্যাচেলর। তবে আমি যেকোনো ভাড়াতেই রাজি। আমি লাগলে ৬ মাসের ভাড়া একবারে দেব।”

রূপা হেসে বলল,”সরি,আমি ব্যাচেলর ছেলে ভাড়া দেব না।”

ছেলেটা বলল,”আমি আপনার বাবা অথবা স্বামী অথবা বড়ভাইয়ের কাছ থেকে কথাটা ক্লিয়ার করতে চাচ্ছি।”

রূপা হেসে বলল,”আমিই বাড়িওয়ালী, সরি,বাসা ভাড়া দেব না আমি ব্যাচেলরদের।”

ছেলেটা পুরোটা সময় মাটির দিক তাকিয়ে কথা বলছিল। সে আস্তে করে ঘুরে চলে গেল। রূপা দরজা আটকে দিল।

কয়েকদিন কেটে গেল। ভার্সিটির রোলকলের খাতায় বেশ কয়েকটা নতুন নাম এড হয়েছে। অনেকেই ক্লাসে আসছে,অনেকেই আসছে না। নীলা এই মুখগুলোর ভিতর ধর্ষকটাকে খোজার চেষ্টা করছে। ও চিনবে তাকে। ধর্ষকরা দেখতে মানুষ এর চেয়ে একটু আলাদা হয়। ধর্ষিতারা বুঝতে পারে। দেখতে চায় সে জানোয়ারটাকে।

এমনসময় রূপা দেখল,সেই ব্যাচেলর ছেলেটা ক্লাসে ঢুকেছে। একই ক্লাসে। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র হিসেবে। সাথে সাথে সে বুঝে গেল এ কে। 

এদিকে নীলাও আশেপাশে খুজছে সেই কুলাঙ্গারকে,তবে কাউকেই ধর্ষকের মত লাগছে না।এমন সময় সেই উত্তেজিত শিক্ষক ক্লাসে এসে একটা নাম বলল,”শফিক আহমেদ” 

ছেলেটা দাড়াল আস্তে আস্তে। শিক্ষকের মুখটা এমনভাবে কোচকাল,যেন আশেপাশে টয়লেট আছে। ছেলেটা দাড়িয়েই থাকল।পুরোটা ক্লাসে শিক্ষিক তাকে বসতে বলল না। ছেলেটাও বসল না।

নীলা হা হয়ে রইল। ধর্ষকের মত তো দেখাচ্ছে না। হয়ত এটা ভুল ধারণা, সেদের আসলে চেনা যায় না।

কয়েকদিন চলতে লাগল। এই ৪ জন মেয়ে শফিকের থেকে দূরত্ব রাখতে লাগল। এমনকি বাকি ৩ জন ছেলেকেও বলতে লাগল ওর থেকে দূরে থাকতে।

প্রায় ১ বছর পরের কাহিনী। রূপার হঠাৎ কোচিংটা বন্ধ হয়ে গেল। সে একদম বেকার হয়ে বসে রইল। বাড়িভাড়ার উপরই চলতে লাগল। আর ব্যাংকে এতদিন জমানো টাকা।

এমন সময় খবর এল ওর একদম ছোট ভাইয়ের এক্সিডেন্ট হয়েছে, মাথায় রক্ত জমাট বেধেছে। ডাক্তাররা সরাতে পারছে না। ছেলেটা কোমায় চলে গেছে। শিগগিরি অপারেশন না করলে বাচবে না।

রূপার ভাইয়ের অপারেশনের জন্য ওর বন্ধুরা টাকা তুলতে লাগল। কিন্তু অপারেশনের টাকা এত ইল্পে যোগাড় হচ্ছে না,ওদিকে ছোটভাইটার অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে,দামি হাসপাতালের চার্জও ডেইলি অনেক। 

রূপার চোখে অনেকদিন পর কান্না দেখা গেল। চোখের সামনে তার ভাইটা মরে যাচ্ছে।

এমন সময় একদিন শফিক রূপার সামনে এসে বলল,”আমি আপনার বাসার ফ্লাটটা ভাড়া নিতে চাই। এক বছরের অগ্রিম দেব।”

রূপা অবাক চোখে চাইল তার দিকে। হ্যা এক বছরের অগ্রিম ভাড়ায় তার ভাইয়ের অপারেশন হয়ে যাবে। কিন্তু এই ছেলেকে বাসায় রাখা তো রিস্ক। এছাড়া,ছেলেটা এই বাসায় ওঠার জন্য অধীর হয়ে আছে,এখনো বাসা খালি আছে সেটাও জেনে রেখেছে। রূপা সিওর ছেলেটার মাথায় ওদের চারজনকে নিয়ে বাজে চিন্তা ঘুরছে। নয়ত পাড়ায় ভূতের বাড়ি শোনার পরেও এই বাসায় তগাকার জন্য এতটা পাগল হওয়ার কথা না। 

কিন্তু চোখের সামনে ভাইয়ের মুখটা ভেসে ওঠায় রূপা রাজি হয়ে গেল। বাকি ৬ জন অবাক হয়ে ওর দিকে ফিরল। কিন্তু কিছু বলল না,এমনকি নীলাও না।

রূওয়ার ভাইয়ের অপারেশন হল। সে বেচে গেল। আর নীলার ফ্লাটের ঠিক সামনেই একটা ধর্ষক এক বছরের জন্য পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করল।

৩.

ভার্সিটির ২য় বর্ষে এখন ওরা। এর মধ্যে সামান্য কিছু পরিবর্তন হয়েছে। রূপম এর সাথে দুইটা মেয়ের রিলেশন হয়ে ব্রেকাপ হয়ে গেছে। মেয়েগুলো গুজব ছড়িয়েছে রূপন তাদের খেয়ে ছেড়ে দিয়েছে।তবে রূপমে জনপ্রিয়তা বেশি,কেউ বিশ্বাস করে নি। ব্রেকাপের পর মেয়েটা এক্সের নামে অনেক কিছুই বানিয়ে বলে। রূপম এখন ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ের পিছনে ঘুরছে। এদিকে মোহিনীর রূপমের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।

নীলার মধ্যকার পুরুষবিদ্বেষ রাজীবের প্রতি একটু কমেছে। এর কারণ আছে। রাজীবের সাথে একা একা থাকলে রূপার গাল একটু লাল হয়ে যায়। নীলা তাই রাজীবের সাথে বাজে ব্যবহার করে না। প্রয়োজনীয় কথার বাইরেও কথা বলে। রূপা রাজীবকে পছন্দ করে সে জানে।

হাসানের প্রতি র‍্যাগিং এখনো কমে নি। এমনকি নিউ ফার্স্ট ইয়াররা পর্যন্ত উলটা ওকে র‍্যাগ দেয়। 

রাজীবের ভাল একটা কোচিং এর চাকরি হয়েছে। বেশ ভাল আয় হয় তার।আর মাঝে মাঝে শেয়ার মার্কেট তো আছেই।

সবচেয়ে অবাক বিষয় শফিক রূপার ভূতের ফ্লাটে বেশ কয়েকদিন ধরে রয়েছে, কয়েক সপ্তাহ। তবে এখনো কোনো অভিযোগ করে নি। শুধুমাত্র ভার্সিটি ছাড়া শফিককে রূপা কখনওই দেখে না। তবে রূপা জানে,এই ছেলে সুযোগের অপেক্ষায় আছে। অঘটন একটা ঘটাবে সে।

একদিন হাসানকে ফাইনাল ইয়ারের কিছু ছেলে র‍্যাগ দিচ্ছিল। র‍্যাগিং এর অংশ হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা দের মত ক্রলিং করে ক্যাম্পাসের মাঠ পেরোতে হবে। এদিকে আশেপাশের অনেকে বিষয়টা দেখছে। কেউ কিছু বলছে না। এমনকি তার বন্ধুরাও না। কারণ র‍্যাগ দেওয়া ছেলেরা ছাত্র সংগঠনের সিনিয়র কর্মী।

হাসানের চোখে পানি গড়াচ্ছে। সে জুনিয়রদের সামনে ক্যাম্পাসে উপুড় হয়ে রইল। তখনি একটা হাত তাকে উচু করে ধরল। 

শফিক হাসানকে দাড় করিয়ে ওর কাধে হাত রেখে এমনভাবে হেটে জায়গাটা অতিক্রম করে চলে গেল,যে কিছুই হয় নি।

রাজনৈতিক ছেলেরাও হা হয়ে রইল। ওরা শফিকের পিছু পিছু গিয়ে বলল,”ওই বেটা,ওই!”

শফিক হাসানকে একটা রিক্সায় উঠিয়ে বলল,”তুমি তোমার বান্ধবীদের ফ্লাটে চলে যাও,আমি ওদের বলে দিচ্ছি,একজনকে যেতে।”

ছেলেগুলো শফিকের পিছনে এখনো দাঁড়ানো। শফিক ওদেরকে অদৃশ্য ভাবছে যেন,সে গিয়ে রূপার কাছে গিয়ে বলল,”আপনার বাসায় ওকে পাঠিয়ে দিয়েছি,আপনি পিছু পিছু যান। আমার ফ্লাটে পাঠাতাম। কিন্তু ও ভয় পেতে পারে।”

ছেলেগুলো পিছ থেকে বলল,”হিরোগিরি ফুটাচ্ছ,ভাইয়া,কোন ইয়ার?”

শফিক ঘুরে বলল,”আমার কপালে ভিলেন নামটা সেটে আছে ভাই।আমি হিরো না। স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত ওই ছেলেটার মত অনেক অত্যাচার সয়েছি। জেলে বসে খুনের আসামীরা ধর্ষণের গল্প শুনতে আসত। না বলে চলে যেতে চাওয়ায় ৫ বছরে আমার দুইহাতের দশটা আঙ্গুলই ভেঙে দিয়েছিল। আপনাদের কি এর চেয়েও বড় শাস্তি জানা আছে?”

ছেলেগুলো চিনে ফেলল শফিক আসলে কে। জেলখাটা আসামীর সাথে লাগতে আসল না। চলে গেল নিজেদের পথে।

রূপা,নীলা,মিতু,মোহিনী,রাজীব আর রূপম শফিকের এই কথাগুলো খুব কাছ থেকে শুনল। সারা শরীর কেপে উঠল ওদের।

সেদিম থেকে হাসান ওদের সাথে কম মেশা শুরু করল। এক বছর পর শফিকের প্রথম ভার্সিটিতে এক বন্ধু হল।

একদিন রূপা হাসানকে বলল,”কিরে হাসু,তুই আমাদের টেবিলে আসিস না কেন আর? হলেও শুনেছি থাকিস না,থাকিস কোথায়?”

হাসান অন্যদিকে ফিরে বলল,”শফিক ভাই একজায়গায় থালার ব্যবস্থা করে দিয়েছে,তার কাছে থাকতে চেয়েছিলাম,রাজি হয় নি।”

রূপা ঠান্ডা গলায় বলল,”শফিক ভাই অনেক আপন লোক হয়ে গেছে,না?”

হাসান বলল,”হ্যা।”

রূপা রাগে ওর অন্য বন্ধুদের কাছ্র চলে আসল। রূপম সব শুনে বলল,”বাচ্চা ছেলে বড় হচ্ছে আস্তে আস্তে,নোংরা গল্প শুনতে ভাল লাগছে।তোরা জানিস? এই টাইপের আতেলরা যাদের মানুষ র‍্যাগ দেয় এরাই নাকি সব অপরাধ করে পরে। র‍্যাগিং এর জবাব তো দিতে পারে না। পরে নিরাপরাধ মানুষ এর উপর সেই ঝাল ঝাড়ে।রেপিস্ট হয়।সিরিয়াল কিলার হয়।”

নীলা ভাবল,”তাই তো,তার সেই আত্মীয়কেও তো সবাই কত ভাল ছেলে বলত।ভদ্র,বিনয়ী বলত।কিছুই নাকি বুঝে না কত কি!”

আস্তে আস্তে হাসান ওদের থেকে দূরে সরে গেল। রূপা সারাদিন শফিক আর হাসানকে একসাথে বসে থাকতে দেখে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় বই খাতা নিয়ে ওর সামমের ফ্লাটেও হাসানকে আসতে দেখে সে।তবে কখনোই রাতে থাকতে দেয় না ওকে শফিক।

রূপা ভ্রু কুচকায়।এই ব্যবহারের মানে কি? শফিক রাতে একা থাকে কেন? রাতে কি খারাও কিছুর প্লান করে সে?প্লান যদি করেই থাকে, হাসান প্লানের কতটুকু জানে?

৪.

হাসান আস্তে আস্তে পুরো চেঞ্জ হয়ে যায়। অসাধারণ একটা ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে ওর মাঝে। আগে যেমন কেউ একটু সুযোগ দিলেই পটপট করে কথা বলত,বা বইয়ের জ্ঞান দিত,বা বেফাস কথা বলে ফেলত,এখন তেমন কিছুই করে না। গম্ভীর একটা ভাব থাকে মুখে,ড্রেস আপও বদলে গেছে। শুধু সম্মানই পায় না সে এখন ভার্সিটিতে,অনেক মেয়ে তাকে পছন্দও করে।

তবে তাকে সরাসরি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে কেউ এগিয়েও আসে না,একটা ধর্ষকের সাথে সাহচর্য আছে বলে।

এমন একদিন বাইরে প্রচন্ড ঝড় আর বৃষ্টু হচ্ছে। মিতু,মোহিনী আর রাজীব ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে। রূপম ওর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ব্যস্ত। ক্লাসরুমের অন্ধকারে ক্লাস হবে না জেনেও রূপা আর নীলা বসে গল্প করছে। অন্ধকার এক কোণায়।

হঠাৎ কোত্থেকে শফিক আর হাসান ক্লাসরুমে ঢুকল।কেউ মেয়েদের খেয়াল করল না।

হাসান বলছে,”শফিক ভাই,প্লিজ ভাই,কিছু তো বলেন।”

শফিক চুপ করে একটা জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখতে লাগল।

হাসান বলল,”মেয়েটা আমার বইয়ের ফাকে চিঠি রেখে যায় ভাই প্রতিদিন। মেয়েটাও সুন্দর। তাই সেধে গিয়েই প্রপোজ করলাম। ভুল কি করলাম ভাই?”

শফিক বলল,”হাসান,কোনো মানুষ কখনো চেঞ্জ হয় না। তুমি কয়েকদিন আগেও যা ছিলা,এখনো তা ই আছো। আতেল,বলদ,অপদার্থ, মানুষ এর হাসির পাত্র।”

হাসান মাথা নিচু করে রইল। মুখ দেখে মনে হল কষ্ট পেয়েছে খুব। রূপা কিছু বলতে চাইল। নীলা ঠেকাল,ও চাচ্ছে হাসানকে শফিক আরো কিছু বলুক। যাতে অপমানিত হয়ে চলে যায় সে।

শফিক বলতে থাকল,”হাসান,তোমাকে আমি বারবার বলেছি,তোমার আর আমার মধ্যে পার্থক্য নেই। ঠিক ৫ বছর আগে আমি তোমার মতই ছিলাম। পার্থক্য হল,তোমাকে সেদিন র‍্যাগের হাত থেকে আমি বাচিয়েছিলাম। আমাকে কেউ বাচায় নি।”

হাসান বলল,”শফিক ভাই”

শফিক বলল,”হাসান,তুমি সেমিস্টার ফাইনালে ফার্স্ট হয়েছ না? প্লাস এসাইনমেন্ট সুন্দরভাবে বলতে শিখেছ। চালচলন বদলেছ,দেখতে তাই অতটা অপদার্থ লাগে না,অতটা লুজার লাগে না,যার সাথে কোনো মেয়ে মিশলে তাকে ছোট হতে হবে। তবে তুমি কিন্তু এখনো লুজার আছ, সেটা চেঞ্জ হবে না।”

হাসান চুপ করে আছে।

শফিক বলল,”মেয়েটা তোমার কাছ থেকে নোট নেবে,এসাইনমেন্ট,প্রেজেন্টেশন সব শিখবে,বলবে,ভালবাসি,বড় ভালবাসি,,,সব বলবে।

কিন্তু একদিন তুমি তাকে তার সোনায় সোহাগা জুটির সাথে দেখে ফেলবে। তোমাকে সে বলবে,ওরা জাস্ট বন্ধু,তুমিই ওর সব। তারপর একদিন তুমি তাদের পার্কে বসে কিস করতে দেখবে। তোমার মাথায় আগুন ধরে যাবে। অসুরের শক্তি আসবে। ছেলেটাকে পিটিয়ে তুমি রক্ত বের করে দেবা।

মেয়েটা তোমার কাছে মাফ চাইবে। তোমাকে তোমার নতুন জেগে ওঠা পুরুষত্বের,বীরত্বের প্রশংসা করবে। তারপর তোমাকে দিনে দুনে উত্তেজিত করার চেষ্টা করবে। একদিন তুমি উত্তেজিত হয়ে যাবে,মেয়েটা তোমাকে তার ঠিক করা জায়গায় নিয়ে যাবে। তুমি রুমের ভিতরে বসে তাকে স্পর্শ করার আগেই সে চিৎকার শুরু করবে,”বাচাও,বাচাও,,,”

আগে থেকে বাইরে থাকা তার বয়ফ্রেন্ড তাকে উদ্ধারে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আসবে। সেদিনের পার্কে বসার মাইরের বিশগুণ ফেরত দেবে। তুমি থানায় যাবে,তোমার ৫ বছরের গার্লফ্রেন্ড পুলিশ কে বলবে তুমি তাকে ধর্ষণ করতে নিয়ে গিয়েছিল,সময়মত ওর প্রেমিক ওকে বাচিয়েছে।”

নীলা,রূপা হা করে ছিল। হাসান তাকিয়ে ছিল শফিকের দিকে।

শফিক বলল,”হাসান,তোমার মা কি তোমাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছে? সেজন্য তুমি বন্ধুহীন হয়ে বড় হয়েছ? আতেল হয়েছ?”

হাসান বলল,”না ভাই।”

শফিক বলল,”হাসান তোমার বাবা তো তাহলে তোমাকে তার স্ত্রীর খুনি ভাবে না,তাই না? মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকে না,তাই না?”

হাসান বলল,”না ভাই,বাবা মা আমাকে অনেক ভালবাসে,আমাকে ঢাকায় একা পাঠানোর সময় দুইজনই কেদে দিয়েছিল।”

শফিক বলল,”ওহ, তাহলে হয়ত তারা তোমাকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে। আশেপাশের সাক্ষী জোগাড় করবে। যারা বলতে পারবে, তুমি আর মেয়েটা হাসতে হাসতেই রূমে ঢুকছিলা,মেয়েটা তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিল নিজ থেকেই। হয়ত তোমাকে তাহলে ভার্সিটির ৪ ববছর পড়াশুনার পর ৫ বছরের জন্য জেলে যেতে হবে না, ফিরে এসে বিদেশফেরত মামাদের ঘুষের মাধ্যমে আবার ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হতে হবে না। সবচেয়ে দুর্বল কয়েদি হিসাবে,তোমার শরীরে আঘাতের স্থায়ী চিহ্ন বসবে না।”

হাসান কেদে দিল। নীলা আর রূপা কাপতে লাগল। ঠান্ডা হয়ে গেছে শরীর।

শফিক বলল,”হাসান আমি চাই না তোমার ভাগ্য আমার মত হোক। ১% চান্সও আমি নিতে চাই না। তোমার জীবন যদি ধ্বংস হতে হয় হাসান,সেটা আমার অগোচরে হবে,আমার সামনে না। আমি তোমাকে মেয়েদের থেকে দূরে রাখব হাসান। আমি মেয়েদের ঘৃণা করি। এক মেয়ে আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়ায়,সারাজীবন খুনি নাম শুনতে হল,আরেক মেয়ের প্রেমের মাঝে বাধা হওয়ায় রেপিস্ট হতে হল। আমি তোমাকে কোনো মেয়ের সাথে মিশতে দেব না। তুমি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারো। আমি কিছু মনে করব না।”

হাসান শফিকের কাধে হাত দিল। বলল,”আপনি আমার বড় ভাইয়া,শফিক ভাই।আমি বাবা মার পরেই আপনাকে জায়গা দিলাম”

শফিক বলল,”আজকের কথা যেন কেউ না জানে হাসান। আমি মানুষের চোখে ধর্ষক হিসেবে বাচতে চাই। এখন আমার নিরাপরাধ প্রমাণে আমার কিছু যাবে আসবে না, আমার ৫ টা বছর কেউ আমাকে ফেরত দিতে পারবে না। আমি ধর্ষক হয়েই বাচতে চাই।”

৫.

সেই বন্ধের মধ্যেই একদিন রূপা আর নীলা ফ্লাটে বসে দেখল কখন হাসান আর শফিক বাসায় ফেরে। ওরা ফিরতেই রূপা গিয়ে নক করল দরজায়। হাসান দরজা খুলল। খুলে বলল,”তুমি?”

রূপা বলল,”কিরে? কয়েকদিন কথা হয় নি,আর আমি তুই থেকে তুমি হয়ে গেলাম? শফিক ভাই কই? তুই দরজা খুললি কেন?”

হাসান বলল,”আমরা দাবা খেলছি। কিছু বলবি?”

রূপা বলল,”আজ রাতে আমার আর নীলার সাথে রাতের খাবারটা খাস। নিম্নচাপের জন্য বৃষ্টি হচ্ছে। খিচুরি খাওয়া যাবে। শফিক ভাইকেও নিয়ে আসিস। আমাদের সাথে একটু কথা বলিয়ে দিবি।”

হাসান বলল,”দাড়া আমি জিজ্ঞেস করে নি।”

রূপা দাঁড়িয়ে থাকল। হাসান ফিরে এসে বলল,”না,আমরা বাইরে খাব। আমি বাসায় ফেরার পথে শফিক ভাইও সাথে আসবে।”

রূপা চলে আসল বাসায়। নীলা ওর স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে কেন জানি প্রস্তুত ছিল আজ ছেলেদের সাথে কথা বলতে,আড্ডা দিতে,খাওয়াতে। খিচুরির হাড়ি নাড়তে নাড়তে রূপার দিক তাকাল সে। 

রূপা বলল,”আসবে না বলল”

নীলা বলল,”আচ্ছা,একটা বাটিতে করে নিয়ে যাব নে।”

রূপা বলল,”তুই একথা বলছিস?”

নীলা সোজাসুজি বলল,”আমরা দুইজনই ভিক্টিম, রূপা। দুইজন দুইভাবে। কেউ কারো থেকে কম না।এজন্য হয়ত,ঘৃণাটা চলে গেছে। একটা মায়া এসে গেছে।

রূপা হেসে বলল,”তুই বলেই এত সোজাসুজি একথা বলতে পারলি।”

সেরাতে শফিক হাসানকে পৌছে দিয়ে বাসা ফিরে এসে দেখল ওর দরজার সামনে একটা বাটি আরেকটা চিঠি রাখা।

“জীবনে প্রথম কোনো ছেলের জন্য নিজ হাতে কিছু রাধলাম, খেয়ে দেখবেন,খুশি হব।-নীলা”

শফিকের চোখ বড় হয়ে গেল।কাপতে লাগল শরীর। ৫ বছর আগে ওর বাসার সামনে রেখে যাওয়া এমন আরেকটা বাটি আর আরেকটা চিরকুটের কথা মনে হল তার। আর একটা হাসি,মনকাড়া একটা হাসি মনে পড়ল। যেই হাসিটা তার জন্য ছিল না। কিন্তু সে কখনওই বুঝতে পারে নি।

শফিক চিৎকার করে বলল,”না!!!!!” 

তারপর একটা লাথি মারল বাটিটায়।খিচুরিগুলো মেঝেতে ছিটকে পড়ল। নীলা জেগেছিল। হয়ত অপেক্ষা করছিল,বাটিটা কেউ হাতে নেওয়ার। সে দরজার বাইরে গিয়ে দেখল,তার রান্না খাবার মাটিতে গড়াচ্ছে। চিরকুটটা দুমড়ানো। ফ্লাটের ভিতর চিৎকার শোনা যাচ্ছে,আর দেয়ালের সাথে কারো কপাল খোটার শব্দ,”আর কতদিন,তোমার অভিশপ্ত হাসিটা আমাকে দেখতে হবে,,,,আর কতদিন,,,,আর কতদিন,,,”

৬.

এই ঘটনাটার পর নীলার কষ্ট পাওয়া উচিৎ ছিল,রাগ হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু সে তা করল না। মেঝেটা পরিষ্কার করতে লাগল।

“আমি দেখতে তার মত,যার জন্য তোমার জীবন নষ্ট হয়েছে,,,,”  

নীলা খালি বাটিটা হাতে নিল। “আমার তোমার জন্য করা প্রথম কাজটা তোমাকে তাকে মনে করিয়ে দিল।”

নীলা ফ্লাটে ফিরে গেল। নির্ঘুম এক রাত কাটাতে, “তুমি এক পুরুষ,যাদের জন্য আমি সারা দুনিয়াকে ঘৃণা করি,কিন্তু তোমার প্রতি এত মায়া কিভাবে আসল? কখনো তো একটু কথাও হল না।”

নীলা বিষয়টা লুকিয়ে গেল রূপার কাছে।কিন্তু শফিকের প্রতি ওর মায়াটা বাড়তে লাগল। ক্লাসে শফিকের কাছাকাছি বসা শুরু করল সে। ক্যান্টিনের আড্ডায় গ্রুপের সাথে না বসে শফিক আর হাসানের টেবিলের আশেপাশে আলাদা টেবিলে বসতে লাগল সে। শফিকের কন্ঠ এই একভাবেই সে শুনতে পারে। হাসানকে শফিক যখন জীবন চলার পরামর্শ দেয়। নিজের জীবনের ভুলগুলোর কথা বলে,,,,

রূপা বুঝতে পারে নীলা শফিককে ভালবেসে ফেলেছে। নীলাও সেটা বুঝতে পারে। এমনকি হাসানও। তবে বাকি কেউ বোঝে না বিষয়টা। নীলা অদ্ভুত স্বভাবের মেয়ে।এটা সবাইই জানে।

এদিকে শফিকের কাটাকাটা কথার মাঝেও নীলা হাসির অনুভুতি পায়। কখনো কোনো কারণে শফিকের মুখে “এক্সকিউজ মি,একটু পাশে সরুন” ইত্যাদি শুনলেও ওর হাসি পায়। ও বুঝতে পারে আস্তে আস্তে শফিককে ও ভালবেসে ফেলেছে।

কল্পনায় শফিকের সাথে ও কথা বলে,”ধর,আমি এখনো পবিত্র থাকতাম,আমার সাথে বাজে কিছুই ঘটত না,,,,”

শফিক ওর কল্পনায় বলে,” ধর,তোমার সাথেই আমার দেখা হত,তার বদলে,,,”

নীলা কল্পনার কথাটা জোরে বলে ওঠে,”তুমি আমার হাসির ছায়া হতে না,তুমি আমার সুখের আলো হতে,,,”

এদিকে নীলা আর শফিকের ভিতর যখন একটা আশ্চর্য শক্তি কাজ করছে। যা শফিককে তার নারীবিদ্বেষ থেকে আস্তে আস্তে সরিয়ে আনছে,আর নীলাকে তার পুরুষবিদ্বেষ থেকে সরিয়ে আনছে,এবং আস্তে আস্তে নিজেদের দিকে সরে আসছে ওরা,রূপা খেয়ালই করল না,অবশেষে রূপম আর মোহিনীর প্রেম শুরু হয়েছে।

এদিকে হাসান যে মেয়েটাকে প্রপোজ করেও পরে সরে আসল।সে হাসানের পিছু ছাড়ল না। কিন্তু হাসানের মনে তো শফিক ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। নীলা গিয়ে ব্যাপারটা মেয়েটাকে খুলে বলল।

মেয়েটা এরপর থেকে হাসান আর শফিক কোনো টেবিলে বসলেই ওদের সাথে বসে কথা বলা শুরু করে। নীলার বুদ্ধিতে। শফিক সবার সামনে কোনো মেয়ের সাথে খারাও ব্যবহার করে না। ও ভেবেছিল ওর ধর্ষক তকমাটার জন্যই মেয়েরা দূরে থাকবে। তবে ও জানত না,বেশ কয়েকজনই এখন ওর আসল কাহিনীটা জানে,হাসান না বললেও।

এভাবে মেয়েটার সাথে নীলাও জুড়ে যায় হাসান আর শফিকের সাথে। আস্তে আস্তে শফিক নীলার অরতি সহজ হয়ে আসে,আগের মত দূর দূর করে না।

এদিকে রূপমের সাথে যে মেয়েটার ব্রেকাপ হয়েছে,সে হাসানের উপর ক্রাশ খাওয়া মেয়েটার বন্ধু। একদিন কথায় কথায় মেয়েটা বলে দিল হাসান,শফিক আর নীলাকে, রূপমের নামে কি কি শোনা যায় এসব আর কি।

শফিক বাদে সবাই ইন্টারেস্টেড হয়। নীলা শফিককে বলে,”রূপম আর মোহিনী দুইজনই আমার বন্ধু। রূপম যে এমন তা ভাবতে পারি নি। এখন কি করা যায়? মোহিনীর সাথেও তো ও সেইম কাজ করবে।”

শফিক বলল,”দুনিয়ার কোনো কিছুই ওই মোহিনীকে রূপমের কাছ থেকে ফেরাতে পারবে না। প্রাণী সমাজে কুমারী নারী সদস্যরা পুরুষের দুইটা জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয় সৌন্দর্য আর ধূর্ততা। ”

কিন্তু নীলা শফিককে টেনে আলাদা করল। শফিক চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। নীলা বলল,”আমি আমার চোখের সামনে কোনো মেয়ের জীবন নষ্ট হতে দেব না,তুমি তো হাসানকে সাহায্য কর অনেক ব্যাপারে, আমাকে করতে হবে।”

শফিক বুঝল না,মেয়েটা কেন তার উপর এত জোর খাটাচ্ছে। তবে কেন জানি শফিক নীলাকে তাড়িয়ে দিল না। সে একটা প্লান বের করল,যাতে মোহিনী রূপমের অতীত সম্পর্কে জানতে পারে।

নীলা রূপমের পুরনো বান্ধবীদের কাছ থেকে অনেক কষ্টে কিছু গোপন ছবি সংগ্রহ করে মোহিনী কে দেখাল।

মোহিনীর ২ বছরের ভাল লাগা সব শেষ হয়ে গেল। সে ক্যাম্পাসে সবার সামনে চিৎকার করে রূপমের সাথে ব্রেকাপ করল। রূপম কিভাবে যেন জানল,এর পিছনে নীলা আর শফিকের হাত আছে।সে সবার সামনেই বলল,”এর শোধ আমি নেব”

ভার্সিটির প্রথম বর্ষের ৭ জনের বন্ধুত্ব আস্তে আস্তে ভেঙে গেল। হাসান তো আলাদা হয়েছে আগে, আশ্চর্য আকর্ষণে নীলা আলাদা হল। রূপম চলে গেল। মোহিনী মনমরা হয়ে একা থাকতে পছন্দ করা শুরু করল। রূপার বাসা ছেড়ে দিল। ওর চাচাত বোন মিতুও ওর সাথে চলে গেল। বাকি রইল রূপা আর রাজীব। রূপা যে রাজীবকে পছন্দ করে সেটা শুধু নীলা জানতে। ওদের পরস্পরের পছন্দের ছেলেদের কথা দুইজনই জানায়,একে অপরকে সাহায্য করতে লাগল।

রূপা নীলা আর শফিককে মিলিয়ে দিতে চেষ্টা করল। আর নীলা রূপা আর রাজীবকে। এভাবে আরো এক বছর কেটে গেল। চারজনই নিজেদের মধ্যে টান অনুভব শুরু করেছে। শফিক আস্তে আস্তে হাসানের উপর দেখে অরেম ভালবাসার ব্যাপারে সান্ধ্য আইন সরিয়ে নিচ্ছে,হাসানের প্রেমটাও হয়ে গেল।

তখনো নিজেদের প্রতি টানটুকুই শুধু আছে।ভালবাসি বলা হয় নি। এমন এক সময় একদিন হঠাৎ রাজীব গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেল।

রূপা কল্পনাও করে নি ওর বাবা মার মত আবার কাউকে এভাবে হারাতে হবে। ও ভেবেছিল সব স্বাভাবিক নিয়মে এগোবে। ও কারো মৃত্যু আর দেখবে না, ওর ভাইয়েরা তো ছোট ওর চেয়ে। ও আগে মরবে,এমনকি ওর ভালবাসার আগেও ও মরবে,,,,

কিন্তু রাজীব হঠাৎ নেই হয়ে যাওয়ায় রূপা কেমন যেন হয়ে গেল। রূপার ভাইয়েরা নীলাকে বলল,ওদের বাবা মরার পর ওদের মাও নাকি এমন হয়ে গিয়েছিল।

রূপা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে গেল। ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল। ও চিলে যাবার পর বাকিদের মনে হতে লাগল,একটা ছায়া চলে গেছে।

৭.

আজ ভালবাসা দিবস।নীলা আজ নীল শাড়ি পরেছে। কপালে কালো টিপ। জীবনে প্রথমবারের মত ও সাজল। এবং কারো জন্য সাজল। অবশেষে শফিক ওর সাথে আলাদা দেখা করতে রাজি হয়েছে।

শফিক ফ্লাটে বসে আয়না দেখছে। আয়নায় এ বাড়ির ভূত দুটোর বীভৎস চেহারা দেখা যাচ্ছে। শফিক বলল,”এই বাসায় ইচ্ছা করে উঠেছিলাম তোমাদের কথা শুনেই,চেয়েছিলাম তোমরা আমাকে যাতে মেরে ফেল। আমি কাপুরুষ, আত্মহত্যার সাহস নেই। কিন্তু তোমরা আমাকে মারো নি। শুধু রাতের সময় দেখা দিয়েছ।তোমরা আসলে কি চাও?”

ভূত দুইটা দাড়িয়েই থাকল। শফিক বলল,”আমার মনে হয় তোমরা আমাকে ভালবাসো।তাই আমি তোমাদের দুইটা অনুরোধ করব।রাখবে?”

মা ভূতটা ঘাড় কাত করল। শফিক বলল,”নীলা কি আমাকে ভালবাসে? বলতে পারবা? আমার অভিশপ্ত জীবন কি শেষ হবে? ওর মাঝে কি আমি নতুন জীবন পাব?”

বাচ্চা ভূতটা বলল,”ভালবাসে,,,,”

মা ভূতটা বলল,”না,পাবে না ওকে”

শফিকের কাপড় পরা শেষ। সে বের হল,যাবার আগে বলে গেল,”রূপাকে পাগল হিসেবে থাকতে দিও না, হয় ওকে সুস্থ হতে সাহায্য কর,নয়ত মেরে ফেল।”

নীলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো ওর মনেই হয় নি ও এত সুন্দর। নিজেকে অপবিত্র,ঘৃণ্য ভাবত সে, প্রতিরাতে ওর ছোটবেলার ঘটনাটা মনে পড়ত।

আর হয়ত মনে পড়বে না। হয়ত নতুন জীবন শুরু হবে। নীলার চোখ থেকে এক ফোটা পানি পড়ল। নীলা কল্পনায় শফিকের সাথে কথোপকথন চালাল। শফিক ওকে বলছে,” কাদলেও তোমাকে সুন্দর লাগে কেন?”

নীলা বলছে,”কারণ তুমি কান্নার রঙ”

হঠাৎ নীলার মোবাইলে হাসানের ফোন এল। হাসান বলল,” নীলা,শফিক ভাই কি তার কোনো জামা ছুড়ে ফেলে দিয়েছে?”

নীলা বলল,”না তো।”

হাসান বলল,”রাস্তায় আমি শফিক ভাইয়ের সবুজ রঙের একটা শার্ট পড়া দেখলাম,কিন্তু শার্টটা ছেড়া।”

নীলা তখন শফিককে ফোন দিয়ে বলল,”তোমার কি কোনো শার্ট চুরি গেছে নাকি? সবুজ রং এর?”

শফিক বলল,”না,রূপম বলল,ওর একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য সবুজ একটা শার্ট লাগবে,আমি তো যাই না এসব জায়গায়,তাই ওকে দিয়ে দিয়েছিলাম।”

নীলা অবাক হয়ে গেল,বলল,”তুমি কোথায় এখন?”

শফিক বলল,”রেস্টুরেন্ট এ, কেন? তুমি কোথায়?”

নীলা বলল,” আমি আসছি”

নীলা বেরোতেই ওর ফোনে মিতুর কল আসল। ধরতেই মিতু হাউমাউ করে কাদতে লাগল, “তোর রেপিস্ট বয়ফ্রেন্ড মোহিনীকে মেরে ফেলেছে। খুন করেছে ওকে রেইপ করে।”

নীলা বলল,”মানে?”

মিতু কাদতে কাদতে বলল,”মোহিনীর লাশের হাতে ওর সবুজ শার্টের টুকরা আছে।”

নীলা বলল,”রূপম,রূপমের কাজ,,ও বলেছিল শোধ নেবে,,,”

 নীলা দৌড় দিল। শাড়ি পরে যতটুকু পারা যায়। শফিককে ফোন দিতে লাগল। কিন্তু শফিক ধরছে না ফোন। কিন্তু শফিককে পালাতে বলতে হবে,এক্ষুণি।

শফিককে রেস্টুরেন্ট থেকে ঘাড় ধরে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে।বলছে,”জানোয়ারের বাচ্চা,এবার খুনই করলি আকামের পর? এবার ফাসি কেউ আটকাতে পারবে না।”

নীলা ছুটছে। হঠাৎ পিছন থেকে একটা গাড়ি ওকে ধাক্কা দিল।

নীলার খোলাচোখের কাজল কাল অশ্রু রক্তের রঙ এর সাথে মিশে আশ্চর্য একটা রঙ সৃষ্টি করেছে পিচঢালা রাস্তার উপর।

যেন কোনো ধর্ষকের ফাঁসির আগে ছাড়া শেষ দীর্ঘশ্বাস।  

গল্প ১২২

​”একটি থার্ড ক্লাস ভূতের গল্প”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১. সাবজেক্ট ২৪৯ এর কথা:

ঢাকায় এর আগে মোট ৭ বার আসা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ বার ছিল ডাক্তার দেখাতে,আর একবার আসা হয়েছে ঢাকা ভার্সিটিতে এডমিশন টেস্ট এর জন্য,সে ৫ বছর আগের কথা। চান্স হয়েছিল ঢাবিতে,কিন্তু আব্বু পড়ালো না, ঢাবিতে নোংরা রাজনীতি হয় নাকি,আদরের ছেলেকে রাজনীতির বলি বানাতে চান নি,আশেপাশে কত ঘটনাই তো দেখা যায়।কত ঘটনাই তো শোনা যায়,কত ঘটনাই তো অজানা থাকে।

এবার ঢাকায় এসেছিলাম ঘুরতে। এই প্রথম ঘোরার জন্য ঢাকায় আসা।ভুল সিদ্ধান্ত, অপেক্ষাকৃত নীরব এবং কম জনবহুল শহরে সারাজীবন কাটালে ঢাকার কোলাহল অসহনীয় লাগে,বিরক্তি এসে যায়।

নাহ,ঢাকায় আমার থাকা হবে না।যদিও ডাক্তারিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে হলে ঢাকায় এসেই পড়তে হবে বাধ্য হয়ে।দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকাতেই আছে। এই চিন্তাটাই আমাকে আরো বিরক্ত করছে।

একা আসতে আম্মু দিতে চায় নি। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে,৩ মাসের ছুটি। এত বড় বন্ধ সারাজীবনে আর পাব না। কর্মজীবনে ঢুকলে দিনে ১৬ ঘন্টা হাসপাতালে ডিউটি করতে হবে,সরকারি ছুটির বালাই নেই। ঘরে না বসে থেকে এই তিন মাসে জীবনের যতটা পারি আনন্দ করে নেওয়াই উচিত।

আম্মুর আসতে না দিতে চাওয়ার কারণ আমার এক বন্ধু মাত্র কয়েকদিন আগে পরীক্ষা দিয়েই ঢাকায় ঘুরতে এসে গাড়িচাপা পড়ে মারা যায়। এটা শোনার পরেই আম্মু আর আব্বু দুইজনই নার্সারির বাচ্চাদের মত আগলে রাখতে চাইছে। একজন হবু ডাক্তারকে তার বাবা মা এভাবে আগলে রাখছে এসব জানাজানি হলে মান সম্মানের ব্যপার।

এছাড়া পত্রিকা খুললেই ঢাকায় এই হয়,ঢাকায় সেই হয়। এই তো সেদিন নাকি বাংলাদেশের ভার্সিটিতে পড়তে আসা এক মালয়েশিয়ান মেয়ে নিখোঁজ হয়ে গেল।মালয়েশিয়া থেকে তার বাবা মা এসে সে এক দক্ষযজ্ঞ বাধাল,অবস্থা এমন হয়ে গেল যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া কূটনৈতিক সম্পর্কও শীতল হয়ে গেছে। শুনেছি মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি শ্রমিকরা নাকি হামলার শিকার হচ্ছে এই ঘটনার জের ধরে।

তবে আমার ঢাকার লঞ্চে ওঠার আগের দিন আম্মু একদম ছেলেমানুষের মত কান্না জুড়ে দিয়েছিল। উনি নাকি স্বপ্নে দেখেছে আমি আর্তনাদ করছি,আর চারিদিকে অনেক রক্ত….

আমাকে যেতে না দিতে অনেক কসম টসমও দিয়েছিল। কি যেন হল আমার,সব উপেক্ষা করে গোঁয়ারতুমি করেই ঢাকা বেড়াতে আসলাম। এখন আসার পর তো ঢাকার কোলাহলে বিরক্তি ধরে গেল।তবে আমার ধারণা এই বিরক্তির পিছনে আমার অপরাধবোধ কাজ করছে,আম্মুর সাথে রাগারাগি করে লঞ্চে উঠেছি বলে হয়ত।

প্রথম দিনেই ঢাকার বেশ কিছু দর্শনীয় জায়গা দেখে ফেলেছি,আগে এগুলোর কথা বইয়েই পড়তাম শুধু। আহসান মঞ্জিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস,জাদুঘর, বিভিন্ন ভাস্কর্য, চিড়িয়াখানা,আরো অনেক কিছু দেখার বাকি। সবে তো দেশ ভ্রমণ শুরু,এই ৩ মাসে বাংলাদেশের সব দর্শনীয় স্থান দেখে ফেলব।

পরেরদিন সকালেই এক ফেসবুক গ্রুপের খপ্পরে পড়ে ঢাকা দেখা অসম্পূর্ণ রেখেই আশুলিয়া চলে গেলাম ফ্যান্টাসি কিংডম দেখতে। তবে সেখানে ঢোকার গেইটে বিশাল একটা লাইন দেখলাম। কি আর করার,বিরক্ত হয়েও লম্বা লাইনে দাড়ালাম।

খেয়াল করলাম,আমার ঠিক সামনের ছেলেটার উচ্চতা,চেহারা প্রায় আমার মতই। তবে পার্থক্য হল,আমার দেহ চর্বিতে ভরা,এবং মোটা হওয়ায় কুজো হয়ে দাড়াই,আর পা দুইটা ভিতরের দিকে খানিকটা বাকা,তবে চর্বি বেশি হওয়ায় বেশি বাকাই লাগে, তবে সামনের ছেলেটার সেই সমস্যাগুলো নেই। শার্টের নিচে আমার মত চর্বি দেখা যাচ্ছে না,তবে মাংসপেশি পেটানো বোঝা যাচ্ছে।

হঠাৎ কেন যেন মনে হল,কেউ আমার দিকে নজর রাখছে। ডানদিকে তাকালাম। 

পার্কিং লটের কাছে একটা হিজাব পরা,চাইনিজ চেহারার খুব সুন্দর একটা মেয়ে আমার দিকে একবার আর সামনের ছেলেটার দিকে একবার তাকাচ্ছে। সামমের ছেলেটা মেয়েটার দিকে নজর রাখছে না। তবে আমি মেয়েটার দিক চেয়ে রইলাম। মেয়েটা আসলেই সুন্দরি,তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে।

হঠাৎ ডানপাশ দিয়ে একটা মাঝবয়সী সুদর্শন এবং পেশীবহুল লোক আমার সামনের ছেলেটার ঘাড় চেপে ধরল। ছেলেটা চেঁচামেচি শুরু করল। লোকটা বিশ্রীভাবে গালি দিতে দিতে বলল,”টাকা দে আমার,টাকা দে।”

ছেলেটা বলল,”মানে? আপনি কে?”

লোকটা বলল,”তবে রে? এখন আমাকেই চিনছিস না?চল আমার সাথে,টাকা কেমনে বের করতে হয় আমার জানা আছে।”

ছেলেটা চেঁচাতে লাগল,”হেল্প,হেল্প”

লোকটা ছেলেটাকে নিয়ে ওপাশে গাছপালার আড়ালে চলে গেল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম,লাইনে দাঁড়ানো একটা লোকও কিছু করছে না,উলটা নিজেদের মধ্যে ঘটনাটা নিয়ে আলোচনা করছে।

হঠাৎ আমার ডান কাধে একটা আলতো টোকা পড়ল।আমি ফিরে দেখলাম,সেই সুন্দরি হিজাব পরা চাইনিজ মেয়েটা।আমি ঘুরতেই মেয়েটা বলল,”এক্সকিউজ মি,আমাকে একটু হেল্প করতে পারেন? আমার বিড়ালটা একটা গাছের উপরে উঠে গেছিল কুকুরের তাড়া খেয়ে এখন নামতে পারছে না।”

আমি বুঝলাম না আমি কেন তখন তাকে বললাম,”আচ্ছা চলুন”। কারণ অনেক সুদর্শন, লম্বা ছেলে ছিল আশেপাশে, মেয়েটা আমাকেই কেন ডাকল, আমি কিছুই চিনি না ঢাকার,আশুলিয়া তো দূরের কথা।সবচেয়ে বড় কথা আমি তো গাছে চড়তেই পারি না,বিড়াল নামাব কিভাবে?

আমি মেয়েটার পিছুপিছু গেলাম। মেয়েটা আমাকে কোনো গাছের দিক নিয়ে গেল না। পার্কিং লটের আরো ভিতরে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে গেল,আশেপাশে কোথাও কেউ নেই।

হঠাৎ মেয়েটা পিছনে ঘুরে তাকাল। হিজাবে মোড়া মিষ্টি চেহারাটা আর মিষ্টি নেই, ওটাকে মানুষ এর চেহারা বলা যায় না। 

চোখ দুইটা বিশাল বড়,লাল টকটকে,সেই চোখ বেয়ে রক্ত পড়ছে। নাকের জায়গায় শুধু একটা গর্ত,আর মুখের পরিধি অস্বাভাবিক বড়। কুকুরের মত দাতের ফাক দিয়ে সাপের মত লকলকে চেরা একটা জিভ বের হওয়া,,,,

আমি চিৎকার করতে যাবার মুহুর্তে মেয়েটার,নখরওয়ালা থাবাটা আমার মুখ চেপে দিল। 

তারপর আমার ১০০ কেজির দেহটাকে উচু করে বিদ্যুতগতিতে একটা প্রিজন ভ্যান টাইপ গাড়ির পিছনে উঠাল। তারপর নিজে চড়ে বস আমার পাশে, আমি আমার আরেকপাশে কাল আলখাল্লা পরা একটা বিশাল গোফওয়ালা লোককে দেখলাম। কপালে লাল একটা টিকা। একটা মানুষের ফিমার এর মাথা সে একটা লাল তরলের ভিতর ডুবিয়ে আমার কপালে ঠেকাল।সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

অজ্ঞান হবার আগে দেখতে পেলাম ভ্যানের পিছনের দরজা বন্ধ হচ্ছে। আর এর পিছনে পাগলের মত দৌড়াচ্ছে আর গুলি করছে লাইনে আমার সামনের ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাওয়া লোকটা, আর তার পিছনে আমার মত দেখতে ছেলেটাও দৌড়াচ্ছে।

ভ্যানের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

২. গোয়েন্দা কিশোর পাশার কথা:

আমি কিশোর পাশা। না, আসল নাম না। ছোটবেলায় স্বপ্নের চরিত্র তিন গোয়েন্দার গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর পাশার নামটা নিয়ে এই কেইসে ছদ্মনাম হিসেবে। 

কয়েকদিন আগে সি আই ডি থেকে মানসিক সমস্যার অভিযোগ এনে সাসপেন্ড করা হয়েছে আমাকে। এই কেইসটার উপরে আমার ভিন্নধর্মী তত্ত্বটার জন্যই এই সাজা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে,মাত্রাতিরিক্ত খাটুনির কারণে নাকি মাথা গরম হয়ে গেছে,ঠান্ডা করতে যেন কোথাও থেকে ঘুরে আসি।

এই কেইসের জন্য আমার ৭ বছরের ক্যারিয়ারে এই প্রথমবার আমাকে নিয়ে কেউ হাসাহাসি করল। কিভাবে ঘুরতে যাই? এই কেইসটা যেকোনভাবে হোক,আমি সমাধান করেই ছাড়ব।

তবে তদন্ত করছি অবৈধভাবে। অফিস জানলে স্থায়ীভাবে চাকরি খেয়ে দিতে পারে। তাই নিজের পরিচয় কোথাও দিতে পারছি না। নিজের নামও ব্যবহার করতে পারছি না। তাই ওই কিশোর পাশা নামটা নেওয়া আর কি।

যাই হোক,কেইসটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

গত এক দুই বছর ধরে বেশ কিছু খুন,ডাকাতি বা বোমা হামলার রহস্যের কুলকিনারা করতে সি আই ডি ব্যর্থ। শুধু সি আই ডি কেন, র‍্যাব,পুলিশ,এমনকি কয়েকটা কেইসে তো আর্মির সাহায্যও নেওয়া হয়েছে। ফলাফল শূন্য, খুনগুলো,অপহরণগুলো এমনভাবে সংঘটিত হয়,যে বিন্দুমাত্র অপরাধীর চিহ্ন পাওয়া যায় না।

তবে আমরা এতটুকু বুঝতে পারি যে প্রত্যেকটা অপরাধ একটা গ্রুপই করছে। বিভিন্ন থিওরিতে বোঝা যায়,আসলে এটা একটা পেশাদার হিটম্যান সংঘ। কোন অপরাধ ঘটাতে যে কেউ এদের টাকা দিতে পারে, আর টাকা দিলে এরা কাজটা করে দেয়,কিন্তু এতই নিখুঁতভাবে করে যে এদের খোজ পাওয়াই যায় না।

আমরা এরপর থেকে খুনির পিছে না গিয়ে,ভিক্টিমের শত্রুদের তালিকা করতে লাগলাম,কে তাদের মারতে পারে,মোটিভ কি,ইত্যাদি। কয়েকজন সন্দেহজনক লোককে পেয়েও গেলাম। স্টিং অপারেশনেও নামলাম। কিছুতেই কিছু হল না।

দুই একটা লোক ধরা পড়েছিল বটে। আমরা জানতে পেরেছিলাম এই লোকগুলো একটা বিশেষ সংঘকে টাকা দিয়ে তাদের শত্রুদের খুন করিয়েছিল। ব্যস এতটুকুই। এরপর সেই লোকগুলোও কিভাবে যেন গায়েব হয়ে যেত।

দেড় বছর ধরে এই কাল্পনিক সংঘটার অতিশয় ধূর্ত কার্যক্রমের কূলকিনারা করা গেল না।

তবে একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল,যা আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটিয়ে দিল,অন্তত আমার ডিপার্টমেন্ট তাই মনে করে।

রাজধানীর ১৫ তলা বিল্ডিং এর ৮ তলায় ভিতর থেকে বন্ধ ফ্লাটে একটা মেয়ের বীভৎস মৃতদেহ পাওয়া গেল। সারা শরীরে আচড়ের দাগ,রক্তের বন্যা বইছে, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে। দেখে মনে হবে বন্যপ্রাণীর কাজ। আসলে এই সংগঠনটার কাজই এমন।  খুনের সময় বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে,যাতে আমরা সব কাজ যে একদলেরই এটা ধরতে না পারি। শুধু তাই নয়,মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ তারা গায়েব করে দেয়।হয়ত ট্রফি হিসেবে রাখে।

তবে এই মেয়েটার ব্যাপারে বড় একটা ক্লু পাওয়া গেল।এই মেয়েটা খুন হবার আগে সেলফি তুলছিল। তার ফ্রন্ট ক্যামেরা ওপেন থাকা রক্তাক্ত মোবাইলটা ড্রেসিং টেবিল এর নিচে পাওয়া গেল।

হ্যা,মেয়েটার শেষ সেলফিটা পাওয়া গেল। ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত্যুর যে সময়টা তার মাত্র ২ মিনিট আগে তোলা সেলফি। মেয়েটাকে খুবই হাসিখুশি লাগছে। মেয়েটা হয়ত জানতও না মাত্র ২ মিনিট পর সে প্রাণহীন থাকবে।

আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর মাথা খারাপ হয়ে গেল। ২ মিনিটে একটা মানুষ এর শরীরের এই অবস্থা কে করতে পারে? 

ছবি বিশেষজ্ঞরা ছবিতেও রুমের যতটা জায়গা দেখা যায়,তন্নতন্ন করে খুনি তো দূরে থাক,খুনির ছায়াও পেল না। কিভাবে সম্ভব এটা। ২ মিনিটের মধ্যে মেয়েটার প্রাণবায়ু বের করবে যে খুনি এতক্ষণে তো এট লিস্ট তার একশনে যাওয়ার কথা।

তখনি ছবিটায় আমি একটা জিনিস খুজে পেলাম। যেটা আমার ডিপার্টমেন্ট এর লোকেরা ছবি তোলার ডিফেক্ট বলে চালিয়ে দিল।

মেয়েটা চুল ছিল স্ট্রেইট। সে বাম দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে ক্যামেরার দিক তাকিয়ে চুমু খাওয়ার ভঙ্গিতে ঠোট রেখে ক্লিক করেছে, কিন্তু ছবি তোলার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে,সে তার ডানপাশে উজ্জ্বল কাল,স্ট্রেইট চুলের প্রতি আলোকপাত করেছিল।

এখানেই একটা জিনিস দেখলাম আমি। মনে হল চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, অনেক চুল ওখানে, এবং চুলের একদম শেষের দিকে একটা অস্পষ্ট কোকড়ানো চুলের ছায়া,ভাল করে দেখলে মনে হয় শেষের চুলটায় জট পরা।

তখনি,হ্যা ঠিক তখনি আমি জিনিসটাকে দেখলাম। মেয়েটার দীঘল কাল চুলটার ডানের চুলগুলো মেয়েটার ছিল না। যার ছিল, তার মড়ার মত সাদা কুচকানো চামড়া,আর লাল চোখের একটা অস্পষ্ট ছায়া ভিক্টিমের চুলের ফাকে দেখা যাচ্ছে।

এই জিনিসটা আমার ঊর্ধ্বতন দের বলেই সাসপেনশনটা পেলাম। আমার নাকি মাথা গরম হয়ে গেছে। ওটা নাকি ছবির ডিফেক্ট। 

ওরা কি জানে? আমি আমার ৭ বছরের ক্যারিয়ারে যা যা দেখেছি সবই কি প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল? ওরা কি জানে? এসি রুমে বসে রাজনীতিবিদ দের তোয়াজ করতে করতে ওরা কিভাবে জানবে খুনের এভিডেন্স খুজতে পরিত্যক্ত ব্রিজের নিজে গভীররাতে ভিক্টিমের লাশকে কাদতে কি ওরা দেখে?

অলৌকিক জিনিস আছে দুনিয়ায়। আমি জানি আছে,আমি দেখেছি,সুস্থ মস্তিষ্কেই আমি দেখেছি। তবে ভূতে মানুষ খুন করে,বা অজানা গুপ্তসংঘের হয়ে এভিডেন্সবিহীনভাবে খুন করে,এটা এই প্রথম দেখলাম।

স্বাভাবিক উপায়ে যখন দেড় বছর ধরে অত্যাচার করে আশা গুপ্ত খুনিদের সংঘটার খোজ পাওয়া গেল না,তাদের অলৌকিক ধরে নিতে কি খুব বেশি লজ্জিত হতে হবে?

৩. সাবজেক্ট ২৪৯ এর সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার কথা:

বুক কাপছে আমার। এই মাত্র যা দেখলাম নিজ চোখে,সেটা কি সত্যি? আমার পিছনে দাঁড়ানো ছিল ছেলেটা।জাস্ট পিছনে,আমার মতই দেখতে,তবে ভীষণ মোটা। এছাড়া গায়ের রঙ,উচ্চতা একদম সেইম। চর্বি না থাকলে হয়ত ওর চেহারা আমার মতই দেখাত। বারবার চোখাচোখি হচ্ছিল আমাদের। অবাক দুইজনই হচ্ছিলাম। কিন্তু সংকোচের কারণে অপরিচিত কারোর সাথে কথা বলাটা হয়ে ওঠে  নি।

ফ্যান্টাসি কিংডমে যাওয়ার জন্য যে লাইনটায় আমি দাড়িয়েছিলাম। সেটা যেন চলছিলই না। তখনই আমি ডানদিকে একটা হিজাব পরা চাইনিজ মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। উফফফ,,শিউরে উঠছি এখন। মেয়েটা আমার দিকে তাকাচ্ছিল আর পিছনের ছেলেটার দিকে। মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছিল।

হঠাৎ মনে পড়ল মেয়েটাকে কোথায় দেখেছি। আরে,এটা তো সেই মালয়েশিয়ান মেয়েটা। বাংলাদেশে পড়তে এসেছিল।কয়েকসপ্তাহ আগে নিখোজ হয়ে গেল।

কিন্তু বেশি সময় আর অবাক হতে পারলাম না। হঠাৎ একটা লোক আমাকে গালাগালি করে টেনে হিচড়ে আড়ালে নিয়ে গেল। এই লোকটা গোয়েন্দা।নাম বলল,কিশোর পাশা। 

লোকটা আমাকে আড়ালে নিয়ে বলল,আমার নাকি জীবন হুমকির মুখে। আমাকে নাকি অপহরণ করা হবে।

আমি তো অবাক। আমাকে অপহরণ করা হবে মানে? আমি নিম্ন মধ্যবিত্তের ছেলে। ফ্যান্টাসি কিংডম দেখতে এসেছি সেভেন আপ খেয়ে একটা কুইজ জিতে।আমাকে অপহরণের টার্গেট কে করবে?

তখন কিশোর পাশা আমাকে একটা আজগুবি কথা বলল। আমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলাম লোকটা মাদকাসক্ত।  লোকটা বলল,দুইবছর ধরে নাকি সে একটা গুপ্ত খুনিসংঘের পিছনে লেগে আছে। 

তবে এই সংঘটার কোন হদিস না পেয়ে হঠাৎ কোন একটা ছবির উপর ভিত্তি করে সে নাকি তার স্যারদের বলে এই খুনিসংঘটা ভূতের। মানুষজন নাকি ভূত ভাড়া করে খুন করায়। 

এই কথা বলায় স্বাভাবিকভাবে  তাকে সাসপেন্ড  করা হয়। কিন্তু লোকটা পাগলের মত একগুয়ে হয়ে তার ধারণা প্রমাণ এ ব্যস্ত থাকে। 

গত কয়েকমাসে বিভিন্ন তদন্ত করে সে খুজে পেয়েছে একটা গুপ্ত খুনি সংঘ আসলেই আছে এই শহরে। তবে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হয় একটা শয়তানপূজারীদের দলের মাধ্যমে। এই সংঘ নাকি তুলনামূলক বেশি টাকা নিয়ে নিখুতভাবে মক্কেলের চাহিদা অনুযায়ী অপরাধ করে। আর গোয়েন্দার ভাষ্যমতে অপরাধগুলো করে ভূতে।

এই সংঘ নাকি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মানুষের রক্ত  আর চুল সংগ্রহ করে। তারপর সেই রক্ত থেকে নাকি যোগ্য প্রার্থী খুজে বের করে। তারপর সেই প্রার্থীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তারপর কোনো উপায়ে সেই প্রার্থী বা মানুষটার শরীরে প্রেতাত্মা ঢুকিয়ে দেয়। মানুষটা মরে যায়, কিন্তু প্রেতাত্মাটা তার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রেতাত্মা নিয়ন্ত্রিত শরীরগুলো এমন এমন কাজ করতে পারে,এমন এমন জায়গায় যেতে পারে,যে সাধারণ মানুষ এর পক্ষে তা সম্ভব না। এরাই খুন করে। এদের শক্তি এত বেশি,যে এরা চাইলে দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে গিয়ে খুন করে আসতে পারবে।

আমাকে গোয়েন্দা বলল,”আমার কাছে একটা লিস্ট আছে,ওই সংঘের এক সদস্যকে পিটিয়ে তার কাছ থেকে লিস্ট আদায় করেছি আমি। ওই লিস্টে তোমার নাম আছে, তুমি ওদের প্রার্থী। তোমার শরীরকে ওরা প্রেতাত্মার মাধ্যম হিসেবে নেবে। তোমাকে খুন করে,ওদের প্রক্রিয়ায় প্রেতাত্মাকে ঢুকাবে তোমার শরীরে। তুমি হয়ে যাবে একটা পিশাচ। তারপর তোমাকে দিয়ে পেশাদারভাব্র খুন করাবে তারা। কোনো রকম প্রমাণ না রেখে। দারুণ ব্যাবসা। তুমি ওদের ২৪৯ তম টার্গেট। এরকম ২৪৮ টা পিশাচ ঘুরছে এই শহরে। জানো ২৪৮ তম টা কে? ওই যে একটা মালয়েশিয়ান মেয়ে নিখোঁজ হয়ে গেল…”

উনি কথাটা শেষ না হতেই আমি চিল্লিয়ে বললাম,”আমার সাথে আসেন, ওই মেয়েটাকে আমি দেখেছি। ও আমার দিকে আর আমার পিছনের একটা ছেল্রর দিক তাকাচ্ছিল। ছেলেটা দেখতে প্রায় আমার মতই,,,”

গোয়েন্দা চোখ বড় করে ছুটল। আমিও ছুটলাম ওর পিছে। লাইনের কাছে গিয়ে দেখি, মোটা ছেলেটা, সেই মেয়েটার সাথে পার্কিং লটের আড়ালে চলে গেল।

গোয়েন্দা একটা পিস্তল বের করে ছুটল।আমিও ছুটলাম পিছে। গিয়ে যা দেখলাম,দুঃস্বপ্নেও দেখতে চাই না।সুন্দরি মালয়েশিয়ান মেয়েটার চেহারা বীভৎস একরূপ নিল। মোটা ছেলেটার মুখ চেপে ধরে পুতুলের মত উচু করল,তারপর বিদ্যুৎ বেগে একটা ভ্যানের দিক ছুটল। গোয়েন্দা ছুটল,আমিও।

গোয়েন্দা অনেকগুলো গুলি করল। ততক্ষণে ভ্যানটা চলে গিয়েছে।

৪. কাল জাদুকর জগা কবিরাজের কথা:

আমি জগমোহন বাগচী। পিতৃভূমি পশ্চিমবঙ্গ এর হাওড়ায়। 

এজ্ঞে, আমার বাপ ঠাকুর্দা সকলেই বংশানুক্রমে প্রেতসাধক। প্রায় ৭০ বছর ধরিয়া আমাদিগের বংশ হাওড়ার ঘটিখালি গ্রামে এই বাণিজ্যই করিয়া আসিতেছি। 

গত বছর বন্যার সময়কার কাহিনী, হাওড়ার আশেপাশের বেশ কয়েকটি জেলা জলের তলে ডুবিয়া গেল। প্রচুর মানুষ মারা গেল। এমতাবস্থায় আমি এক জপ করিতে লাগিলাম,যা আমার বাপ ঠাকুর্দা কেহই করিতে সাহস পায় নাই। 

জপটি নিয়ম হইল,একশটি মড়ার যকৃৎ ভক্ষণ করিয়া অমাবস্যাতিথিতে মহাশ্মশানে আসন পাতিয়া এক মনে মহামতি পিশাচিনীকে ডাকিতে হইবে। পিশাচিনী ১০০ মড়া ভক্ষককে নিজ প্রভু ভাবিয়া উপস্থিত হইবে। অতঃপর তাহার নিকট হইতে যেকোনো শক্তি চাইলেই তাহা প্রদান করিতে বাধিত থাকিবে।

যাহাই হোক,উক্ত জপে আমি পিশাচিনীকে ডাকিলাম। আমি ভাবিয়াছিলাম কস্মিনকালে এত লোক একবারে মরে নাই বলিয়া আমার বাপ ঠাকুর্দারা এই জপ করিয়া শক্তি বাগাইতে পারে নাই। তবে আমার ভুল ছিল এই ধারণা। আমার বাপ ঠাকুর্দারা অতিশয় জ্ঞানী হবার হেতুই এই জপ হইতে বিরত  রহিয়াছিল।

পিশাচিনী আমাকে দেখিয়াই বুঝিয়াছিল,আমি একজন মূর্খ। কিন্তু জপ করিয়া তাহাকে ঠকাইয়া আমাকে শক্তি প্রসানে বাধ্য করিয়াছি আমি,তাই সে আমাকে কিছু প্রেতাত্মা দিল। বলিল,এই প্রেতাত্মারাই আমাকে শক্তিশালী করিবে। বলিয়া অট্টহাস্য করিয়া প্রস্থান করিল।

তখনো বুঝি নাই কি গ্যাড়াকলে পড়িয়াছি।প্রেতাত্মাগণ আমার বশে থাকিলেও ইহাদের নিয়মিত মনুষ্য ভোগ চাই। তা না প্রদান করিলে ইহারা আমাকে ভক্ষণ করিবে।

যখন বুঝিলাম, দেরি হইয়া গিয়াছে। বাধ্য হইয়া,আমি আমার প্রতিবেশীদের জাদু করিয়া তাহাদের উপর আমার প্রেতাত্মা চাপাইতে লাগিলাম। প্রেতাত্মারা তাহাদের পছন্দের মানুষ ভক্ষণ করিয়া খুশি হইয়া,আমাকে তাহাদের গৃহ হইতেই ইহা উহা আনিয়া দিতে লাগিল।

সপ্তাহখানেক যাইতেই ধরা পড়িলাম।  মানুষ বুঝিয়া গেল আমিই বিনাকারণে প্রেতাত্মা চাপাইতেছি তাহাদের উপর। আর বিনিময়ে প্রেতাত্মারা আমাকে উপহার প্রদান করিতেছে।

তাহারা আমাকে গ্রাম তো বটেই, দেশ ছাড়া করিল। প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশে আসিয়া উঠিলাম।

তবে প্রেতাত্মারা তো পিছু ছাড়িবে না। তাহাদের নরমাংস চাই,নয়ত আমার প্রাণ। কি করিব আমি?

তখনই মাথায় একটি বুদ্ধির সঞ্চার হইল। আমি শুনিয়াছি এদেশে খুন খারাপি অত্যধিক হয়। মানুষ মানুষকে তুচ্ছ হেতুতেও হত্যা করে। আমি একটি পেশাদার হত্যাকারী সংঘকে খুজিয়া লইলাম। প্রেতাত্মার সাহায্য লইয়া তাহদিগকে বুঝাইলাম,তাহাদের নরমাংসের হত্যাকারীর অপেক্ষা আমার প্রেতাত্মা ভাল হত্যা করিতে পারিবে। পরিকল্পনা ছিল মানুষ হত্যা করিয়া অর্থ উপার্জন করিব,ইত্যবসরে প্রেতাত্মারাও ভোগ পাইবে।

যাহারা আমার কথা উপেক্ষা করিল তাহাদের হত্যা করিলাম। সংঘটি স্বীয় নিয়ন্ত্রণে আনিলাম।

কিন্তু একটু সমস্যা দ্রষ্টব্য হইল।আমার প্রেতাত্মারা ধীরে ধীরে বিলীন হইতে লাগিল। বুঝিলাম ইহা পিশাচিনীর কার্য।আমাকে হত্যা করিতে প্রেতাত্মা চাপাইয়াছিল আমার উপর। যখন দেখিল,আমি প্রেতাত্মাদের হাত হইতে বাচিবার, উপরন্তু অর্থ উপার্জনের পন্থা পাইয়া গিয়াছি, পিশাচিনী তাহার প্রেতাত্মাগুলাকে সরাইয়া লইতেছে।

অন্য পরিকল্পনা করিলাম,দিব্যচক্ষু দিয়া প্রেতাত্মার বাহন খুজিব এই নগরে। অত:পর,নাহনমে হত্যা করিয়া প্রেতাত্মা প্রবেশ করাইব।প্রেতাত্মার স্থায়ী একটা দেহ হইবে।

আমি যে অত্যন্ত শক্তিধর হইয়া গিয়াছি বুঝিতে পারিলাম।

৫. একটি শপিংমলের উপরের তলার দেয়ালের কথা:

আমি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শপিং কম্পলেক্সের ১০ তলার বিল্ডিং এর একটা গোপন রুমের দেয়াল।

আমি কথা বলতে পারি না। তবে সব দেখতে পারি,সব শুনতে পারি,এবং অনেককিছু দেখাতে পারি।

আপনাদের এখন আমি দেখাব এই রুমের একদম মাঝখানের টেবিলটায় কি হচ্ছে।

এই ঘরের বাইরে একটা জাদুশক্তি কাজ করছে। এই শক্তির জন্য এই ঘরের কোনো শব্দই বাইরে যায় না। তবে এই শক্তিটাই আমার মত দেয়ালকে দেখার ক্ষমতা দিয়েছে। আমি এই ক্ষমতাটাকে ঘৃণা করি।

ওই যে দেখুন, টেবিলটার উপরে ওরা একটা মোটা ছেলেকে বাধছে। মোটা ছেলেটা তার পাশে দাঁড়ানো একটা বীভৎস নারীমূর্তি দেখে ভয়ে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। তবে এখন সে চিল্লাচ্ছে, ভূতের ভয়ের চেয়ে মৃত্যুভয় বড়। জগা কবিরাজের হাতে সে একটা ধারাল ছুরি দেখেছে। সে বুঝতে পারছে কি হতে যাচ্ছে তার সাথে।

জগা ছেলেটা পেটে ছুরিটা ঢুকিয়ে বুক পর্যন্ত চিরে ফেলল। ছেলেটা চিৎকার করে তার মাকে ডাকল। রক্তে টেবিল আর মেঝে ভরে যাচ্ছে। পাশে দাঁড়ানো নারীমূর্তিটা রক্ত দেখে হামাগুড়ি নিয়ে তা চেটে খাচ্ছে,যদিও কয়েকদিন আগে তাকেও এভাবে চেরা হয়েছিল।

জগা মোটা ছেলেটার ভিতর হতে চর্বি,মাংস,অঙ্গ আলাদা করে নিচের নারীমূর্তিরর সামনে ফেলল, সাথে সাথে কুকুরের মত ঝাপিয়ে পড়ল সেটা সেগুলোর উপর। 

মোটা ছেলেটা এখনো মরে নি। তবে কাপছে ভয়ংকর ভাবে। জগা পাশের তাক থেকে একটা বয়াম আনল। বয়ামটার ভিতরে হাত দিয়ে একটা কালো রঙ এর সাপ বের করল। প্রত্যেকবারই করে সে। এই সাপ আসলে প্রেতাত্মা।  

সাপটাকে মোটা ছেলেটার শরীরে ঢুকিয়ে দেল। সাথে সাথে ছেলেটার শরীর মোচড়াতে লাগল।

জগা চোখ বড় করে নিচে রক্ত, মাংস, চর্বি খেতে থাকা বীভৎস জিনিসটাকে বলল,”কি সব্বনাশ করলি,এ কাকে তুলে এনেচিস,, এ তো বাহন নয় মাইরি,,, এ তো তর ভাইকে ভিতরে দিতেই মেরে ফেলল রে। মানুষের আত্মার এত জোর আগে দেখি নি কো,,,”

নারীমূর্তি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। জগা বলল,”যত তাড়াতাড়ি পারিস এটাকে এখান থেকে সরা রে, এ তো সব শেষ করে দেবে,,,”

নারীমূর্তি মোটা ছেলেটার নিষ্প্রাণ ক্ষতবিক্ষত  দেহটা তুলে সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।

নিচে মানুষ এর কোলাহল শোনা যাচ্ছে। বন্দুক হাতে একটা লোক সিড়ি বেয়ে দৌড়ে উঠছে,তার সাথে আরেকটা ছেলে,যে দেখতে অনেকটা মোটা ছেলেটার মত। একেই আজ এখানে প্রেতাত্মার বাহন হিসেবে আনার কথা ছিল। মোটা ছেলেটা শুধু শুধু মরল। তবে জগার ভয়ার্ত মুখ দেখে মনে হচ্ছে,মোটা ছেলেটা মারা যেতে যেতে জগার বড় একটা ক্ষতি করে গিয়েছে, কি ক্ষতি আমি জানি না। আমি একটা দেয়াল মাত্র।

বন্দুক হাতে লোকটার পিছনে আরো বন্দুকওয়ালা লোক আসল, আরো অনেক লোক কৌতুহল নিয়ে আসছে। 

সিড়িতে বীভৎস নারীমূর্তি মোটা ছেলেটার লাশ কোলে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে এক নজর দেখে কয়েকজন বন্দুকওয়ালা লোক জ্ঞান হারিয়ে ফেল। অজস্র চিৎকার শোনা গেল।

রক্তাক্ত রুমটার জগা কবিরাজ নিজের বুকে নিজে ছুরি চালাল। তবে ২৪৮ জন এখনো ঘুরছে এই শহরে।

“পিশাচিনী, তোর ২৪৮ জনকে সময় থাকতেই নিয়ে যাস, ভুল করে যেটাকে এই মাত্র বানালাম,সেটার কাছে তুই কিছুই না, কিছুই না,,,,”

গল্প ১২১

​”পিকনিক”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

একটা গাড়িতে করে দুইটা দম্পতি,আর তিনজন ছেলে মোট ৭ জন হাইওয়ে ধরে যাচ্ছে। গাড়ির অডিও সিস্টেমে জোরে জোরে জে এন্ড দ্য আমেরিকান্স এর হোয়াম ব্যাম শ্যাং-এ-ল্যাং গানটা বাজছে। গ্রাম্য এলাকার ভিতর দিয়ে চলা হাইওয়ের নিরবতা খানখান করে গাড়িটা এগোচ্ছে। গাড়ির ইঞ্জিন আর জোরে গান বাজার কারণে মনে হচ্ছে রাস্তাটা কাপছে।

গানের পিক আপ লাইনে এসে ৭ জনের ৬ জন মিউজিকের সাথে কোরাস গাইছে গাড়ির ভিতর। বাকি যে একজন সে ইন্ট্রোভার্ট।  সে জানালা দিয়ে আশপাশটা দেখছে। তার এত শব্দ ভাল লাগছে না। সে এখানে এসেছে নগরীর প্রচন্ড কোলাহল থেকে একটু হাফ ছেড়ে বাঁচতে। একটু নিস্তব্ধতায় থাকতে। এজন্যই সে তার ভার্সিটি লাইফের বন্ধুদের সাথে পিকনিকে আসতে রাজি হয়েছে। এই লোকটার নাম রফিক।

রফিকের বাকি ৬ বন্ধু ভার্সিটি লাইফ থেকে পরস্পরের বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল।আড্ডা, গান বাজনা আর ঘোরাঘুরিতে গত ৫ টা বছর কাটিয়ে দিয়েছে তারা। এদের মধ্যে আহমেদ-ফারিয়া আর তাহসিন-তাসনিম ছিল বিখ্যাত আর ক্যাম্পাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি। ভার্সিটি লাইফ শেষে বিয়ে করে নেয় তারা। বাকি দুই ফ্রেন্ড রিয়াজ আর মোর্শেদ। দুইজনই প্লেবয়,লাইফ এনজয় করতে পছন্দ করে।

মজার ব্যাপার এই ৬ জনের কেউই ভার্সিটি লাইফে রফিককে দেখতে পারত না। গ্রাম থেকে উঠে আসা সহজ সরল ছেলে রফিক,তার জায়গা হয় নি আধুনিক সমাজে। এই ৬ জনের জন্যই এই শিক্ষাটা রফিক পেয়েছিল। গ্রামের মেধাবী হওয়ায়,পুরো ইউনিয়নে মেধাবী বলে জনপ্রিয় ছিল রফিক,এস এস সি আর এইচ এস সি তে বোর্ডে প্লেস করায় সাংবাদিক এসেছিল সাক্ষাতকার নিতে। নিজের সম্পর্কে উচ্চধারণা নিয়ে এসেছিল সে এই শহরে। ভেবেছিল স্কুল কলেজে মেধার জোরে যে ভালবাসা পেয়েছিল সে,ভার্সিটিতেও সেটার ব্যতিক্রম হবে না। তবে ধারণাটা ভুল ছিল।

মেধাবীদের এই শহরে আতেল বলা হয়,ইংলিশে নার্ড,গিক,ফ্রিক অসংখ্য শব্দ, প্রত্যেকটা শব্দ একটা চরিত্রকে হাস্যকর এবং বিরক্তিকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে। রফিকের সহজ সরলতার সুযোগে এই ৬ জনের ক্যাম্পাসের পপুলার গ্রুপটা অনেক প্রাংক করে পৈশাচিক মজা পেত। নগরীর বৈশিষ্ট্য এটা, নিজেকে বড় দেখাতে হলে বড় হওয়ার মত কষ্ট না করে,অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় দেখানোটাই সহজ।

প্রাংকের শিকার হয়ে অনেক সহজ সরল ছেলেই আত্মহত্যা করে,অথবা জেদ করে স্মার্ট হতে গিয়ে বিপথে চলে যায়। রফিক একটাও করে নি। সে তার মতই থেকেছে। আর মাথায় রেখেছে সমাহ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। 

ফলও সে পেয়েছে। পাশ করার পর ক্যারিয়ার সবচেয়ে ভাল এখন রফিকের। বাকিরা উচ্চবিত্তের সন্তান। ক্যারিয়ার গড়তে পারে নি। রফিক এখন একজন ম্যাজিস্ট্রেট।  ক্ষমতা আর অর্থ সবই আছে। কষ্ট করে স্মার্ট হতে হয় না মানুষের কাছে,অর্থ আর ক্ষমতাই তাকে স্মার্ট বানিয়ে দেয় মানুষ এর চোখে। তাই তো তার জীবনটা ভার্সিটিতে নরক বানিয়ে দেওয়া ৬ জন এখন সেধেই তাকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে,উচ্চবিত্ত সমাজের বিভিন্ন পার্টিতে তাকে ইনভাইট করা হয়,ওই ৬ জন রফিককে নিজেদের ভার্সিটি লাইফের “খুব ভাল বন্ধু” হিসেবে পরিচয় দেয়।

অনেকদিন ধরেই তারা পিকনিকের কথা বলছিল। একসাথে শহরের বাইরে কোনো গ্রাম্য পরিবেশে ভাল একটা স্পট খুজে পিকনিকে যাবে তারা।আগেই যেত,কিন্তু হাজার অনুরোধে রফিককে রাজি করাতে না পেরে মান অভিমানের পালা চলে। অবশেষে রফিক রাজি হওয়ায় আজ আহমেদের গাড়িতে করে ৭ জনের এই যাত্রা। পিকনিক স্পট টা বিভিন্ন ট্যুর গ্রুপ থেকে খুজে বের করেছে রিয়াজ।

স্পটটা একটা পুরনো জমিদারবাড়ি।  জমিদারবাড়ি না বলে ধ্বংসস্তূপ বলা চলে। তবে অন্য জমিদারবাড়ির মত জাদুঘর টাদুঘর না এটা। এটা পিকনিক স্পট হয়েছে আশেপাশে সুন্দর পরিবেশের জন্য। কার্পেটের মত বিশাল একটা মাঠ, শ্বেতপাথর এর মুর্তি আর গাছপালা। পুরনো জমিদারবাড়িটাতে নাকি বিদেশী ভূতের সিনেমার শুটিং হয়েছিল কয়েক বছর আগে। এরপর থেকেই বাংলাদেশিদের কাছে পরিচিতি পায় এলাকাটা বিশেষভাবে।

ফ্রেঞ্চ একটা ভূতের সিনেমার শুটিং হয়েছিল এখানে। যে পরিচালকের মুভি,সে ভূতের সিনেমার জন্য সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত। নিজের লেখা গল্পে মুভি বানায় সে। তার অভ্যাস হল আগে কোনো অজানা একটা গা ছমছমে স্পট খুজে বের করা, সে অঞ্চলের ভাষা শেখা, কোনো ভূতের কাহিনী প্রচলিত আছে কিনা সেটা জানা,তারপর সেই কাহিনীকে প্রবর্ধিত করে নিজের গল্প লেখা।গল্প থেকে চিত্রনাট্য। সেখান থেকে সিনেমা।

তবে এই জমিদারবাড়ি কে নিয়ে যে সিনেমাটা হওয়ার কথা ছিল সেটা কখনো হয় নি। কারণ  মুভির নায়িকা হঠাৎ গায়েব হয়ে যায় অজানা কারণে। পুলিশ কেস হয়। তবে নায়িকা উদ্ধার হয় না। ইন্টারপোলও আসে এই দেশে। তারাও খুজে খুজে হাল ছেড়ে দেয়। এটা নিয়ে সেসময় অনেক লেখালেখি হয়। এভাবেই জমিদারবাড়িটা পরিচিতি পায়।আর আস্তে আস্তে বাংলাদেশিরা এটাকে পিকনিক স্পট বানিয়ে ফেলে।

রফিক এই ৬ জনের দলটাকে এড়িয়ে চলে আগেই বলেছি। তবে তাদের গায়ে পড়া বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকাই তার কাছে জ্ঞানী সিদ্ধান্ত মনে হয়। তবে আজ সে রাজি হয়েছে তার একটা কারণ আছে। আজ সূর্যগ্রহণ।  শহরের উচু বিল্ডিং এর ভিড়ে, কংক্রিটের জঙ্গলে সূর্যগ্রহণের অপার্থিব সৌন্দর্য সে দেখতে চায় নি। সে চেয়েছিল একটু দূরে কোথাও গিয়ে খোলা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে এই ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করবে।

তবে সেটাও হল না। গাড়ি তখন ঘন জঙ্গলের পাশে,তখন কি কারণে গাড়ির চাকা পাংকচার হয়ে গেল। অতিরিক্ত টায়ার চেঞ্জ করতে বেশ সময় লাগে, ততক্ষণে সূর্যগ্রহণ হয়ে গেছে। হতাশা নিয়ে তাই রফিক গাড়ির পিছনের সিটে চুপচাপ বসে আছে,সারাটা দিন এমন মানুষগুলোর সাথে কাটাতে হবে,যাদের সে মনে প্রাণে ঘৃণা করে।

অবশেষে পিকনিক স্পটে এসে গেল তারা। ততক্ষণে বিকেল হয়ে এসেছে। গিয়েই সব জিনিস আনপ্যাক করে বার্বিকিউ টেবিল পেতে বসল তারা। গাড়িটা কাছেই রাখল,এখনো গাড়িতে গান বাজছে জোরে।এখন সাউন্ডট্রাক, এসি ডিসির হাইওয়ে টু হেল।

রফিক হঠাৎ খেয়াল করল আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। এটা একটা ব্যস্ত পিকনিক স্পট,এরকম ফাকা হবার কথা তো না।সবাই কি জমিদারবাড়ির ধ্বংসস্তূপের ভিতরে গেল? হতে পারে, বেশ বড় বাড়িটা।

তাড়াতাড়ি ওরা খেয়ে নিল। তারপর কথা বলতে বলতে ছবি তুলতে লাগল। আশেপাশে এখন পর্যন্ত একটা মানুষও তারা দেখে নি। এটা কাউকে বদার করছে না রফিকের মত।

রফিক ভাবল,”এতক্ষণ কি সবাই জমিদারবাড়ি থাকবে? কোনো পিকনিক স্পটে একদমই কেউ থাকবে না এমন তো হবার কথা না। নাকি কোনো কারণে আজ এখানে আসার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল? এই ৬ জন এখানে তার সাথে প্রাংক করতে এসেছে?”

বাকি ৬ জন হাসাহাসি আর ছবি তোলায় মশগুল। রফিক জমিদার বাড়িটার দিক তাকিয়ে রইল। 

আচ্ছা, ওই যে একটা মানুষ উকি মারছে না? জমিদার বাড়ির দোতলায়? হ্যা,একটা বাচ্চা ছেলে,,, বাচ্চা নাকি আসলেই? কি ওটা? রফিক আরো কাছে গেল্ম জিনিসটা ভিতরে ঢুকে গেল। পিছন ফিরতেই বাচ্চাটার পিঠে রফিক বিশ্রী গর্তের সমষ্টি দেখ,মাংস বের হয়ে আছে, কাচা মাংসের উপর ছোট ছোট গর্ত।

আতংকে রফিকের হাত পা কেপে উঠল। শিগগিরি সে বাকি ছয়জনের কাছে দৌড়ে আসল। এসেই বসে পড়ে হাফাতে লাগল।

তাসনিম বলল,”রফিক,তুমি ঠিক আছ?”

সবাই খুব কনসার্ন্ড হয়ে এগোল। রফিক ঘামছে। এইমাত্র কি দেখল সে?

কিন্তু সে কিছু বলল না, গ্রামের মানুষ সে, ভূতে বিশ্বাস শোভা পায় তার। তবে শহরে ভূতে বিশ্বাস স্মার্ট মানুষের কাজ না। ভূত একটা বিনোদনের মাধ্যম।

বাকিরা বলতে লাগল,”কি হয়েছে? অসুস্থ লাগছে?”

ফারিয়া বলল,”তোরা ওকে গাড়ির পিছনের সিটে শুইয়ে দে।”

রফিকের হঠাৎ মনে হল,ও যেন আতংকে কথা বলতে পারছে না। জমিদার বাড়ির দোতলার বারান্দায় আরেকটা মূর্তি। এটা একটা বয়স্ক পুরুষ। তার সারাটা শরীরে কোনো কাপড় নেই। পচে গলে পড়ছে মাংস। অসংখ্য ঘা শরীরে,আর গর্ত,,,,

কাপতে কাপতে রফিক আঙ্গুল তুলল সেদিকে। বাকিরা পিছন ফিরে তাকাল। ততক্ষণে জিনিসটা ভিতরে ঢুকে গেছে বাড়ির।

 ৬ জন মুচকি হাসল। ভূতের ভয় পেয়েছে রফিক। গেয়োভূতটার জন্য স্বাভাবিক। যত ভাল ক্যারিয়ার হোক। অন্স এ গেয়োভূত,অলওয়েজ এ গেয়োভূত। তবে একটা ম্যাজিস্ট্রেট এর সাথে এযুগে বন্ধুত্ব থাকা ভাল,অনেক কাজে লাগে, জোর করে কোনো ব্যঙ্গাত্মক কথা বলা থেকে বিরত রইল ওরা।

রফিক গাড়ির পিছনের সিটে বসল। জমিদার বাড়ির বারান্দায় এখন তিনটা বিকৃত মূর্তি। একদৃষ্টে চেয়ে আছে ওদের দিকে। রফিক দরজা লক করে দিল। আতংকে এখনও কথা বলতে পারছে না। হাত পা শক্ত হয়ে গেছে।

বাকিরা ওকে গাড়িতে রেখে  হাটতে লাগল স্পটে।  একটু দূরে যেতে তাহসিন পেট চেপে হাসতে লাগল। “দেখলি কান্ড, ভয়ে মনে হচ্ছে কাপড় নষ্ট করে দেবে।”

বাকিরাও হাসিতে যোগ দিল। ওরা আস্তে আস্তে জমিদার বাড়ির দিক যেতে লাগল। রিয়াজ হঠাৎ কি মনে হতে পিছন ফিরে তাকাল,গাড়ির ভিতর বসে রফিক ওর দিক তাকিয়ে সজোরে মাথা নাড়াল।

আস্তে আস্তে ওরা জমিদারবাড়ির দিক গেল। আসলেই কেন যেন ওদের কারোরই মনে হচ্ছে না কেন পিকনিক স্পটটা এত ফাকা। হয়ত ওরা আসতেই বিকেল করব ফেলেছে। আর বাকিরা ততক্ষণে চলে গিয়েছে।

মোর্শেদ বলল,”তোরা ভিতরে যা, আমি বাড়ির পিছনের মাঠটা একটু ঘুরে আসি আলো থাকতে থাকতেই।”

বাকিরা বাড়ির দিকে গেল। মোর্শেদ বাড়ির পিছনের গাছপালার আড়ালে পড়া মাঠটার দিকে গেল। এখানে অনেকবার এসেছে সে। আগেরবার এখানটায় এসেছিল ওর এক গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে,জায়গাটা সবসময় নির্জন থাকে।

আজ গাছপালার ওপাশে যেতে হঠাৎ দুমড়ানো মুচড়ানো উলটে পড়া কিছু গাড়ি দেখল সে, নতুন গাড়ি,বা নিয়মিত  যত্ন করা গাড়ি।গাড়িগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে একটার উপর একটা সাজিয়ে দেয়ালের মত করে রাখা হয়েছে। মোর্শেদ হা করে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

হঠাৎ কি মনে করে গাড়ির দেয়ালের ফাক দিয়ে ওপাশে তাকাল সে।

বিশাল মাঠে পিকনিক করতে যত মানুষ এসেছে তাদের চাদর বিছানো। আর সেই চাদরের উপর মাংসের স্তূপ। কোরবানীর সময় গরুর মাংস যেমন স্তূপ করা থাকে সেরকম। 

আর সেই মাংসের আশেপাশে বসে ছুরি দিয়ে কাটছে একদল মানুষাকৃতির জিনিস। সারা গা ভর্তি দগদগে ঘা, পচা মাংসের উপর গুড়ি গুড়ি গর্ত,,,,

একদলা করে মাংসগুলো মুঠি করে মুখে পুরছে জিনিসগুলো। মুখের পাশ দিয়ে রক্ত বেয়ে পড়ছে,কাচা মাংস চিবানোর সময়। কুরবানীর মাংসের চাটাইয়ের পাশে যেভাবে গরুর মাথা রাখা থাকে,প্রত্যেকটা চাদরের পাশে একটা করে মানুষের মাথা,,,,,

মোর্শেদ এই দৃশ্য দেখে বমি করে দিল। তারপর ঘুরেই একটা চিৎকার করে দৌড় দিল। আর সাথে সাথে গাড়ির দেয়ালের উপর নিয়ে বিশাল এক লাফে দগদগে ঘা ওয়ালা ৭/৮ ফুটের বিশাল একটা বিকৃত শরীর এপাশে এসে মোর্শেদের ছুটন্ত দেহের উপর আছড়ে পড়ল। তারপর চুল ধরে এক ঝাকিতে মাথাটা ঘাড় থেকে ছুটিয়ে দিল।,রক্তে জায়গাটা ভরে গেল।

জমিদারবাড়িতে বাকিরা ঢুকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। কেউ খেয়াল করল না, আড়াল থেকে কি যেন একটা ওদের উপর নজর রাখছে। বিশেষ করে আহমেদের উপর। ওর জিম করা শক্ত মাংসপেশির উপর।

ওদিকে গাড়ির ভিতরে  রফিকের মমে হঠাৎ ভয়ংকর একটা সাহস ভর করল। কেন যেন ওর মনে হল,যতই ঘৃণা করুক,এই ৬ জন মানুষকে এভাবে সে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে না।

সে গাড়ি থেকে নামল। বার্বিকিউ টেবিলটা উচু কপ্রে আছড়ে ফেলল। দুইটা রড ছুটে আসল। রড দুইটা হাতে নিয়ে সে রওনা দিল  জমিদারবাড়ির দিকে।

এদিকে দোতলার বারান্দায় চলে এসেছে বাকি ৫ জন। রফিক এক দৌড়ে রড হাতে ওদের কাছে গেল। ওরা রড হাতে রফিককে দেখে অবাক হয়ে গেল।

রফিক বলল,”মোর্শেদ কোথায়?”

রিয়াজ বলল,”পিছনে গেছে একটু,তোমার হাতে রড কেন?”

রফিক বলল,”ওকে ফোন দাও, আমাদের এখনি এখান থেকে যেতে হবে।”

তাহসিন বলল,”কেন?”

রফিক বলল,”আমি এই বারান্দায় কি যেন দেখেছিলাম।”

আহমেদ ব্যঙ্গ করে বলল,”ভূত দেখেছ? ওরে বাবা,ভূত খেয়ে ফেলবে রফিককে,,”

বাকিরা হেসে দিল। আহমেদ  বলতে লাগল,”হাউ মাউ খাউ,রফিকের গন্ধ,,,,,”

বলা শেষ না হতেই ৭/৮ ফুট লম্বা এক নারী মূর্তি,সারা গায়ে কাপড় নেই,দগদগে ঘায়ে ভরা,ঘা দেখে পুজ পড়ছে,মুখে সাপের মত ধারাল দাতের সারি,আহমেদের ঘাড় কামড়ে ধরল।

রিয়াজ,ফারিয়া,তাসনিম আর তাহসিন আর্তচিৎকার করে সিড়ির দিকে দৌড় দিল। রফিক এক মুহুর্ত দ্বিধা করল। তারপর হাতের রডটা  মহিলাটার বুকের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। মহিলা চিৎকার করে ঘরের ভিতর পড়ে গেল। রফিক রড ধরে থাকায় সেও ঘরের ভিতর ঢুকে গেল।

রক্তাক্ত হয়ে আহমেদ বারান্দায় অজ্ঞান হয়ে রইল। 

কতক্ষণ এমন অজ্ঞান হয়ে রইল সে বলতে পারবে না। ধাক্কা খেয়ে উঠল সে। চোখ খুলে দেখল রফিক দাঁড়ানো। রফিক বলল,”শিগগিরি চল এখান থেকে।”

আহমেদের অনেক দুর্বল লাগছে,ঘাড়টা ভীষণ জ্বলছে, ঘাড়ে হাত দিল সে, রূমাল চেপে রাখা। রফিক এর রূমাল। 

আহমেদ বলল,”বাকিরা কোথায়?”

রফিক বলল,”পালিয়েছে, আমাদের মৃত ভেবেছে,গাড়ি নিয়ে পালিয়েছে, শিগগিরি চল এখান থেকে, ওইগুলো আরো থাকতে পারে, ৩ টা দেখেছি আমি। একটাকে মেরেছি, বাকি দুইটা এখনো আছে।”

আহমেদ শিগগিরি দাড়াল। কিন্তু এক পা সামনে দিতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল।রফিক ওকে ধরে ফেলল। কাধে হাত নিয়ে কিছুটা ভর নিজের উপর নিল। এভাবে ওরা হাটতে লাগল।

আস্তে আস্তে ঝামেলা ছাড়াই স্পট পার হয়ে ওরা হাইওয়েতে উঠল। অনেক রক্ত হারিয়েছে আহমেদ। দুর্বল লাগছে। সে রফিক কে বলল,”ফারিয়া আমার বউ,৫ বছরের প্রেম করার পর বিয়ে,ও আমাকে একা মৃত্যুর মুখে রেখে পালাতে পারল?”

রফিক বলল,”তুমি মরে গেছ ভেবেছে হয় তো,এছাড়া অমন একটা জিনিস সামনে দেখলে ভয় পাবে না এমন তো কেউ নেই।”

আহমেদ বলল,”তুমি তো গেলে না ওদের সাথে।”

রফিক বলল,”জিনিসটাকে মারতে সময় লেগেছে,এরমধ্যেই ওরা চলে গিয়েছিল।  দেখলাম তুমি বেচে আছ। তাই তোমাকে নিয়েই বের হতে চাইলাম।”

আহমেদ কেঁদে ফেলল। বলল,”তোমাকে শুধু শুধু কত অপমান আর অত্যাচার করেছি,তুমি ব্যতিক্রম বলে,তুমি আমার জীবন বাচালে, আমাকে মাফ করে দিও।”

রফিক কোন কথা বলল না। আহমেদের ঘাড়টা প্রচন্ড জ্বলছে, দাত কিড়মিড় করে আছে সে। হঠাৎ একটা ট্রাক আসতে লাগল। রফিক দাড় করাল সেটা। বলল,”শহরে নিয়ে চলেন, একে হাসপাতালে নিতে হবে,অনেক রক্তপাত হয়েছে।”

ওরা ট্রাকে উঠল। আহমেদের ঘাড়টা যন্ত্রণায় ছিড়ে পড়ছে। আহমেদ চিৎকার করছে, তাও বলল,”রফিক,তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আজ থেকে।”

যত সময় যায়। আহমেদের চিৎকার আরো বাড়ে,সারা শরীর জ্বলছে ওর।

হাসপাতালের সামনে ট্রাক থামল। রফিক আহমেদকে হাসপাতালে ঢুকাল। আহমেদ যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, তাও সে বলল,”রফিক,ফারিয়াকে একটু খবর দাও।”

প্রচন্ড চিৎকারে আশেপাশের রোগী,ডাক্তার, নার্স সবাই উকি দিয়ে দেখতে লাগল আহমেদকে, পাগলের মত সারা শরীর ঝাকাচ্ছে আহমেদ,যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে চেহারা। 

ওকে কেবিনে নিয়ে ডাক্তাররা দেখতে লাগল। ওকে ধরে রাখা যাচ্ছে না, যন্ত্রণায় লাফাচ্ছে যেন আহমেদ।

রফিক বাইরে দাঁড়ানো,দেখছে কাচের এপাশ দিয়ে। হঠাৎ বিদেশি টানে বাংলায় কে যেন বলে উঠল,”কি হয়েছে ওর?”

রফিক পাশে তাকাল। দেখেই চিনে ফেলল লোকটাকে। লোকটা কাশছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়ত। সেই ফ্রেঞ্চ ভূতের সিনেমার পরিচালক জা ফ্রদ।

রফিক অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। বলল,”জা ফ্রদ? ফ্রেঞ্চ পরিচালক? আপনি এত ভাল বাংলা শিখলেন কিভাবে?”

কাশতে কাশতে জা ফ্রদ বলল,”আমি এখানেই থাকি এখন। এখানে সব হারিয়েছি আমি। এদেশ ছেড়ে তাই আর যাই নি।”

রফিক বলল,”মানে?”

জা ফ্রদ বলল,” আমার সিনেমার নায়িকা লামেলা আমার বাগদত্তা ছিল। ওকে যখন চলে যেতে দেখলাম ফ্রান্সে আর ফিরে গেলাম না। লামেলা যেখানে নেই,গিয়ে আর কি করব?”

রফিক কিছু বলল না। 

জা ফ্রদ বলল,”বললে না? তোমার বন্ধুর কি হয়েছে?”

রফিক সংক্ষেপে যা জানে খুলে বলল। শুনে জা ফ্রদের চোখ বড় হয়ে গেল। রফিক বলল,”কি? বিশ্বাস হচ্ছে না?”

জা ফ্রদ বলল,”তুমি আমার মুভির শুটিং স্পটে গিয়েছিলে? ”

রফিক বলল,”হ্যা”

জা ফ্রদ বলল,”তোমাকে একটা কাহিনী বলি শোনো, এটা বাইরের দুনিয়ায় বললে আমাকে পাগল ভাববে মানুষ। ইন্টারপোলের কাছেও আমি বিষয়টা গোপন করেছি। আমি আমার লামেলাকে নিজের চোখেই হারিয়ে যেতে দেখেছিলাম”

রফিক বলল,”মানে?”

জা ফ্রদ বলল,”তুমি হয়ত জানো,আমি কোনো একটা সিনেমার কাহিনী লেখার আগে,কোনো স্পট সিলেক্ট করে সেটার সম্পর্কে খোজ নিই। তুমি কি জানো ওই জমিদারবাড়ি সম্পর্কে খোজ নিয়ে আমি কি জেনেছিলাম?”

রফিক চুপ করে রইল। 

জা ফ্রদ বলল,” আমেরিকান বিজ্ঞানীরা একবার একটা ভাইরাস নিয়ে কাজ করেছিল। ভাইরাস টা আমেরিকানরা যুদ্ধে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। ভাইরাসটার কাজ হল। এটাকে বোমায় করে শত্রু অঞ্চলে ছেড়ে দিলে যারা যারা এর কাছে থাকবে, ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবে। আর আক্রান্তরা অসম্ভব শক্তির অধিকারী হয়ে যায়, গতি,দৃঢ়তা সব বেড়ে যায়, আর সাথে আরেকটা জিনিস এসে যায়, মানুষের মাংসের প্রতি একটা অদ্ভুত আকর্ষণ।”

রফিক তাকিয়ে রইল জা ফ্রদের দিকে।

জা ফ্রদ বলল,”প্লানটা সুন্দর, শত্রু অঞ্চলে ভাইরাস ছেড়ে দেবে, শক্তিশালী নারী পুরুষের শরীরকে ভাইরাস আরো শক্তিশালী করবে,তারা মানুষখেকো হয়ে যাবে, তারা নিজেরাই আশেপাশের মানুষকে খেয়ে ফেলবে। ব্যস,বিনা রক্তপাতে জয় আমেরিকানদের,পরে বোমাবর্ষণ করে পিশাচগুলোকে মেরে দেশটা দখল করবে, সহজ যুদ্ধজয়।”

রফিক হা করে রইল।

জা ফ্রদ বলল,” এই ভাইরাসকে গোপনে তৈরি করতে ওরা তৃতীয় বিশ্বের দেশ এই বাংলাদেশকে বেছে নেয় গোপন ঘাটি হিসেবে,রাশিয়া,ইরান,চীন,কেউই তাদের গুপ্তচর দিয়েও জানতে পারবে না আমেরিকার প্লান।কিন্তু কিছু একটা ভয়ংকর ঝামেলা হয়ে যায়।একটা টেস্টটিউব ভুল করে ভেঙে যায়,ভাইরাসটা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। চোখের সামনে তাদের ভয়াবহ পিশাচ হয়ে যেতে দেখে তাদের পাহারায় থাকা সি আই এর এজেন্টরা। শিগগিরি তাদের ভূগর্ভস্থ একটা গোপন কামরায় আটকে রাখে।”

জা ফ্রদের চক্ষু টলমল করছে।

“আমার লামেলা ভুলক্রমে সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষ খুলে ফেলার আগে,,,,”

রফিক এখনো চুপ।

“আমার চোখের সামনে লামেলাকে ওরা মাটির নিচে নিয়ে যায়।কেউ দেখে নি। আমি একা এটা দেখেছি। ভাইরাসটা কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। ভাইরাসটা মানব মস্তিষ্ককে আরো বুদ্ধিমান করে। ওরা মানুষের মাংস খায় ঠিকই,তবে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্য ওরা কিছু কিছু শক্তিশালী মানুষকে জাস্ট কামড়ায়,ভাইরাসটা তার দেহে ঢুকাতে,,,, ”

কেবিনের ভিতর আস্তে আস্তে আহমেদের গা থেকে চামড়া খসে পড়তে লাগল। গায়ে র মাংস থেকে ঘা বের হতে লাগল,গর্ত হয়ে যেতে লাগল। পুজ পড়তে লাগল। শরীরের দৈর্ঘ্য বেড়ে যেতে লাগল। দাতগুলো ধারাল হতে লাগল,,,,

ডাক্তার আর নার্সরা চিৎকার করে পালাতে চেষ্টা করল। আহমেদ কাউকেই পালাতে দিল না। ছিড়ে টুকরা টুকরা করতে লাগল। তারপর মাংস খেতে লাগল।

ভয়াবহ দৃশ্যটা দেখে জা ফ্রদ ভয়ে দৌড় দিতে চাইল। কিন্তু রফিক প্রচন্ড শক্তি নিয়ে তার ঘাড় ধরে রইল।

জা ফ্রদের কানের কাছে মুখ নিয়ে রফিক হিসহিসিয়ে বলল,” আরেকটা কথা, ভাইরাসটা মানুষের আকৃতি বদলাতে পারে,,,”

জা ফ্রদ ঘুরে আস্তে করে কাপতে কাপতে রফিকের দিক তাকাল। 

রফিকের দেহটা আস্তে আস্তে ঘা ওয়ালা একটা বীভৎস নারীদেহে পরিণত হল। জা ফ্রদ তোতলিয়ে বলল,”ল-ল-লামেলা,,,”

বীভৎস কন্ঠে জিনিসটা বলল,”সুইটহার্ট,অনেকদিন পর কিছু মূর্খ মাটির নিচের এয়ার টাইট কক্ষটা খুলে আমাদের বের করে দিয়েছিল। অবশেষে মুক্তি পেলাম আমরা,কত বছরে ক্ষুধা নিয়ে, আর কয়েকজনের ভিতর ভাইরাসটা সরিয়ে পিকনিকে যারা এসেছিল সবার মাংস দিয়ে ক্ষুধা মিটালাম। তবে এই ক্ষুধা মেটার না। তবে এই দেশে ১৮ কোটির মত শিকার আছে, ক্ষুধায় কষ্ট হবে না,,,, ”

পিশাচটা জা ফ্রদের মাথাটা কামড়ে ধরল।

ওদিকে পিকনিক স্পটে আসল রফিক,ফারিয়া,তাসনিম,তাহসিন,রিয়াজ আর মোর্শেদের মাথা তাদের মাংসের স্তূপের পাশে সাজানো। এখন ওদের মগজ বের করে খাওয়া হবে,,,