গল্প ৯৫

​”শেষ চিঠি”

লেখা:ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

থরথর করে কাপছে শুভ্র। কাপাকাপা হাতে লিখছে একটা চিঠি। এযুগে কেউ চিঠি লেখে না। ফেসবুকে পোস্ট দেয়,ইমেইল করে। চিঠি যখন কেউ লেখে,বুঝতে হবে বিশেষ কিছু ঘটছে।

শুভ্র ভালবাসে কোনো একজনকে। শুভ্রের ধারণা,সেই একজনও তাকে অনেক ভালবাসে। দুইজনের ভালবাসা সমান, আবেগ সমান, স্বপ্ন সমান। তবে কিসের যেন একটা ঘাটতি। সেই ঘাটতি পূরণ করতে আশেপাশে যেন ঘোরে খুবই অশুভ কিছু।

শুভ্র আয়নার সামনে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ।  লেখা বাদ দিয়ে। তবে আয়নার সামনে শুভ্র নিজেকে আর দেখতে পায় না। সেই একজনকে দেখে। মাঝে মাঝে মনে হয়,সেই একজনের অস্তিত্ব নেই দুনিয়ায়। শুধু তার হৃদয়ে সেই একজনের বসবাস। নইলে কারো সাথে কারো মিল এভাবে কিভাবে হয়?

শুভ্র আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আয়নার ভিতর সেই একজন তার ভুবন ভুলানো হাসি দেয়। তবে শুভ্র জানে, আয়নার ভিতরের সেই একজন আজ তাকে তার শেষ চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে। এই ভুবন ভোলানো হাসি সে আর কখনো দেখবে না,এ হাসি অন্য কারো জন্য।

ভুবন ভোলানো হাসির মায়ায় হারয়ে যেতে না যেতেই শুভ্র দেখে আয়নার সামনে সেই দাঁড়ানো। শুভ্র তার চিঠিটা লিখতে আবার টেবিলে যায়,,,

“প্রিয় তুমি,

ভাবতে শিখিয়েছ,বুঝতে শিখিয়েছ,,ভালবাসা কাকে বলে। পুরো পৃথিবী জুড়ে তোমার আবেশ ছড়িয়েছিলে।সেই লেক পাড়ে পাশাপাশি হাটার সময় প্রথমবার তাকিয়েছিলে,ওই চোখেই বুঝে গিয়েছিলাম তোমার পুরো মনটা,,,,,

আমাকে আরো আপন করে পেতে চেয়েছিলে,চেয়েছিলে অপার পৃথিবীসসম ভালবাসা যেন পূর্ণতা পায়,সমাজের বাধাধরার খাচায় আটকা পড়ে গেল সেই স্বপ্ন,সেই আশা।

তাও আমরা কেউ হাল ছাড়িনি,স্বপ্ন দেখেই গিয়েছি,ভালবাসাকে পূর্ণতা দেব। সে যত সময়ই লাগুক। ভালই তো হল,সমাজ বাধা দিল,সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ভালবাসাটাকে তো বাড়িয়ে নেওয়া যাবে,,,,

শত বাধা আসল,,তোমাকে আমার কাছ থেকে অনেকে কেড়ে নিতে চাইল,তুমি আমাকে আকড়ে ধরলে,, ছাড়লে না।

তুমি শুধু চেয়েছিলে তোমার ভালবাসার মূল্য যাতে দিতে পারি, তোমার দেওয়া ভালবাসা যাতে পরিশোধ করতে পারি,,,,

তোমার মনটাকে নিজের হাতের রেখার মত পড়তে শিখে গেলাম।কখন কি চাও,কি না চাও,,সব বুঝে গেলাম।

এইখানে এসেই সব গোলমেলে হয়ে গেল। আমি তোমার সব বুঝি,তুমি আমাকে বুঝতে পারলে না,হাজার চেষ্টা করেও না। আমার মন বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে,,,

স্বাভাবিক, আমার কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নিতে যারা থাবা বাড়িয়ে দেয়,তাদের সাথে লড়তে গিয়ে বুঝি তোমার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে।যে শক্তিবলে আমার মন পড়ার কথা ছিল তোমার,কোন আশুভ পিশাচ হয়ত সেটা শুষে নিয়ে গিয়েছে।

ভালবাসা বাড়ানোর কথা ছিল, বাড়াতে গিয়ে নিজেদের সবকিছু শেয়ারের কথা ছিল। সেই ভালবাসা বাড়ানোর মিশনের যে ধাপে নিজের অতীত,নিজের রাগ,নিজের অভিমান শেয়ার করা হয়,তুমি সেটাই নিতে পারলে না। মনে করলে সেটাই বুঝি আমার হৃদয় ছিল।

নিজের প্রতি আস্থা,নিজের সিদ্ধান্তের সঠিকতা নিয়ে তুমি প্রশ্ন তুললে। নিজেকে  বললে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল তুমি করেছ,আমার সাথে জীবন শেয়ার করতে চেয়ে। শুধুমাত্র আমার রাগ,আর আমার অতীতকে সহ্য করতে না পেরে।

নিজের প্রতি  এতটাই ঘৃণাবোধ হল তোমার,আমার কাল ছায়া থেকে সরে যেতে চাইলে। কিন্তু তোমার সারা পৃথিবীতেই তুমি আমার প্রবেশাধিকার দিয়ে দিয়েছিলে। আমার ছায়া থেকে বাচতে তাই তুমি পৃথিবী থেকেই চলে যেতে চাইলে,,,,,,

আল্লাহ তোমাকে ফিরিয়ে দিল আমার কাছে আবার, আরেকটা সুযোগ দিল। তোমার সাথে ভালবাসা বাড়াতে,,,,

এদিকে আমাকে আরো বেশী আকড়ে ধরার লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলে তুমি। আমি তোমার ক্লান্ত রূপ দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। তোমাকে আশা দিতে চাইলাম। কিন্তু তোমার ক্লান্তিকে আমি পরাজয় ভেবে ভুল করলাম,তোমার ভালবাসা নিয়ে প্রশ্ন তুললাম।

সেদিনই তোমাকে হারিয়ে ফেললাম। কোনো এক অন্ধকার টানেলের ভিতরে,,, অন্ধকার টানেলের ওপাশে আলো,এপাশে আমি। আমার চোখে সেই আলো হল আগুণ। আমি তোমার আশ্রয়,, তোমার কাছে সেই আগুণ আলো,, আর আমি কদাকার পিশাচ,,,,

পিশাচের সাথে কাটানো সময় মনে পড়ে তোমার,তুমি টানেলের ভিতর দোদুল্যমান থাকো,,,,, কখনো এই পিশাচটা তোমার চোখে শুভ্র হয়ে আসে,,তখন তুমি আমার কাছে যাত্রা কর। আর কখনো এই পিশাচটাকে তুমি নতুন করে দেখো,,আবার চলে যাও সেই আলোর দিকে,,,

হয়ত সেটা সত্যিই আলো,, অন্ধকারের জীবের কাছে মায়াবী আলোও আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত,,,,  

এই দোদুল্যমান তোমাকে কাছে পেতে মরিয়া হয়ে ছিলাম। কিন্তু বুঝি নি,,কবেই চলে গেছি তোমার মন থেকে,, আস্তে আস্তে তোমার টানেল যাত্রা আমার থেকে দূর পর্যন্ত আসে, চোখ বড় করে পিশাচের মাখে তোমার শুভ্রকে খুজে ফেরো তুমি,,,,

কিন্তু তুমি তো ক্লান্ত। মহাক্লান্ত। তাই আজ বলে দিলে তুমি মোহতে ছিলে,পিশাচের মোহতে,, শুভ্র বলে কখনওই কেউ ছিল না,,সব তোমার কল্পনা,দুর্বলতা,,যেটা নিয়ে একটা পিশাচ খেলল।

আমাকে শেষ চিঠি দিয়ে দিলে তুমি। শেষ পর্যন্ত সেই আলোর দিকে যাবে তুমি,,, 

আমি টানেলের অপরপ্রান্তে সেই অন্ধকার ভুতুড়ে পৃথিবীতে,,,, তুমি ফিরে গেলে তোমার মায়াবী দুনিয়ায়,,,, যেখানে তোমার সব ছিল,আছে,,খালি আমিটা নেই।

আমার কালো মেঘ ঘূর্ণিঝড়ের সাথে সাথে কেটে গিয়ে তোমাকে দেবে নির্মল পৃথিবী,,,তুমি তার আশা রাখো,,,,

আমার থেকে নাকি অনেক দূর চলে গেলে,,, অনেক দূর,,, আমাকে তোমার শেষ চিঠি দিয়ে,,,,,,,, ”

শুভ্র শেষ চিঠি লেখা শেষ করে না। পোড়োবাড়ির জানালার বাইরে ভুতুড়ে টানেলটা আবার উকি দিচ্ছে,,, 

শুভ্র আবার টানেলের মুখে দাঁড়ায়,,,, এই বুঝি তুমি এলে,, জড়িয়ে ধরে বললে,,, “ভালবাসি”

Advertisements

গল্প ৯৪

​”বয়ফ্রেন্ড কেন ধনুষ্টংকার রোগী”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

প্রাক্তন ৯৫ কেজির নব্যপ্রেমিক এখন ১০৩ কেজির পুরনো প্রেমিক। আর তার সুন্দরি প্রেমিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেও বেশী সুন্দরি এবং অনেক বেশি খিটখিটে।

প্রেমিকের সাথে তার বেস্ট ফ্রেন্ড ডেটিং এক্সপার্ট এর দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই। নতুন নতুন প্রেমিকা পছন্দ করার সময় ১০৩ কেজির প্রেমিক দিনরাত তার বেস্ট ফ্রেন্ড ডেটিং এক্সপার্টের সাহায্য চাইত। ডেটিং এক্সপার্ট তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বিস্তৃত পরামর্শ দিত তার বন্ধুকে গার্লফ্রেন্দ পাওয়ানোর জন্য।

তবে ১০৩ কেজি ওজনের প্রেমিক ডেটিং এক্সপার্ট এর প্রত্যেকটা পরামর্শের উলটা কাজ করে শহরের সেরা সুন্দরির সাথে কয়েকমাস ধরে চুটিয়ে প্রেম করছে।

এদিকে লোকমুখে শোনা যাচ্ছে ডেটিং এক্সপার্ট নাকি শহর ছেড়ে চলে গেছে,ঢাকায় বসবাস করছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিনেমা বানাবে,ঐতিহ্যবাহী বাংলা সিনেমা। নিজের সুবিশাল প্রেমিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিঙড়ে সিনেমা প্রসব করবে। যার লেখক,পরিচালক,প্রযোজক, নায়ক,সবই সে। দুষ্টলোক বলে সিনেমার নাম হল, “খয়রাতির প্রেম”

যাই হোক,ডেটিং এক্সপার্টের চলে যাবার ফাকে, ১০৩ কেজি ওজনের প্রেমিককে রিলেশনশিপে এই প্রথম এসে একটা বিশাল বাধার মুখে পড়তে হল।

বাধার নাম প্রেমিকার বান্ধবী আর লেডিস বন্ধুগণ।

১০৩ কেজি ওজনের প্রেমিক শহরের সেরা সুন্দরি প্রেমিকাকে নিয়ে গত কয়েকমাসের প্রেমে কোনো ডেটেই আড়ালে যায় নি। শহরের রাস্তা তাদের ডেটিং ক্ষেত্র। শহরের এমন কোনো রাস্তা নেই,যেখানে কত কয়েকমাসে এই জুটিকে দেখা না গেছে। বলতে গেলে শহরে এই জুটিটা বিখ্যাত। মানে ১০৩ কেজির কোন ছেলে যার পোশাক আশাক আর গেট আপেই বোঝা যায়,বিশেষ টাকা পয়সা নাই,তার পাশে এরকম সেরা সুন্দরিকে মেইন রাস্তাগুলায় ডেইলি হাত ধরে হেটে কথা বলতে দেখলে কে না মনে রাখবে।

রিকশা, অটো এমনকি ট্রাক বাস তাদের রাস্তার পাশে রেখে অতিক্রমের সময় সেগুলোর চালকরা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে।বাস ট্রাক সহ যাত্রীরা ভিরমি খায়।

সব ঠিকই ছিল। তবে প্রেমিকা প্রেমিককে কখনো তার বান্ধবীদের সাথে পরিচয় করায় নি। বান্ধবীরা খুব আগ্রহ করে এরকম পপুলার  সুন্দরির বয়ফ্রেন্ডকে দেখার জন্য উদগ্রীব ছিল। কিন্তু প্রেমিকা জানত তার বয়ফ্রেন্ড জীবনের পুরোটা সময় ধরে আতেল ছিল। নিজের রুমই ছিল তার জগত। তার সাথে মিট হবার আগে পৃথিবীরর অনেক কিছুই সে বুঝত না। তাই মানুষের সাথে সাক্ষাৎ তার বয়ফ্রেন্ডকে কিছুটা বিব্রত করে। তাই প্রেমিকা চাচ্ছিল আস্তে আস্তে বয়ফ্রেন্ডকে মিট করাবে বান্ধবী আর আত্মীয়দের সাথে।

কিন্তু সড়ক ডেটিং তো আর বন্ধ ছিল না। আর ব্যাক্টেরিয়ার মত এদেশে মানুষ জন্মাচ্ছে।এত ব্যাক্টেরিয়ার ভীড়ে,শক্তিশালী ব্যাক্টেরিয়া,মানে প্রেমিকার এক হিজরা বন্ধু ওদের দেখে ফেলল।

হিজরা বন্ধু শেষে ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাইকে জানিয়ে দিল প্রেমিকা একটা বয়স্ক আলুর বস্তার সাথে প্রেম করে,প্রতিবন্ধী আলুর বস্তা সে সিওর। কেমন জানি বাকা করে হাটে,মুখটাও প্রতিবন্ধীদের মত।

সেই হিজরা থেকে শুরু করে প্রেমিকার ফ্রেন্ড সার্কেলের গুটিকয়েক এঞ্জেল জেরিন মানে জরিনা বেগমসহ মোটামুটি সবাই জেনে গেল প্রেমিক একটা ইয়া বড় কাল কুচকুচে ডাইনোসর এর সাথে প্রেম করে।

এমনকি প্রেমিকার কিছু বান্ধবী,প্রশ্নফাঁস ব্যাচের মেডিকেল স্টুডেন্ট ফেসবুকে থিসিস দিল,”আসলে অতিরিক্ত মোটা হলে ধনুষ্টংকার এর জীবাণু হেপাটাইটিস কৃমি ঘাড়ের পিছে কুতকুত খেলে, তাই বাকা হয়ে হাটতে পারে। ” 

সেই শুরু,প্রেমিকার আশেপাশের সবাই বলা শুরু করল,”তোর প্রেমিকের জন্মগত ধনুষ্টংকার আছে,তুইও আর বেশিদিন বাচবি না,হাতের মধ্যে দিয়ে ধনুষ্টংকার এর কৃমি ছড়ায়,আহারে বড্ড ভাল মেয়ে ছিল গো।”

প্রেমিকা কেঁদে কেটে অস্থির।  সে প্রেমিকের কাছে এসে প্রেমিকের কলার ধরে বলল,,”তোর ধনুষ্টংকার হইছে তুই ডাক্তার কেন দেখাস না,তুই মরলে আমি কেমনে বাঁচব?”

প্রেমিকাকে একটু ঠান্ডা করার পর প্রেমিক জিজ্ঞেস করল, “ঘটনাটা কি?”

প্রেমিকা সব খুলে বলল।

প্রেমিক পুরো ঘটনাটা শুনে অবাক হবার চেষ্টা করল। তবে সে কোন বিষয়টায় অবাক হবে সেটাই বুঝল না। জন্মের সময় ধনুষ্টংকার হলে সে এতবছর কেমনে বেচে আছে? আর সে এতদিন পড়ে এসেছে ধনুষ্টংকার হয় ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে,কিন্তু এখন শুনছে এটা কৃমি দিয়ে হয়,আবার কৃমিটার নাম হেপাটাইটিস, 

এই বিষয়ের কোনটায় অবাক হবে যখন বিবেচনা করছিল সে তখন আরেকটা বিষয় তার মাথায় এল, তার প্রেমিকা কি বুঝতে পারে নি তাকে অপমান করতে এসব বলেছে তার বন্ধুরা? কিন্তু সে সেই বিষয়ে না কেদে ঝরঝর করে বুক ভাসাচ্ছে,রোগে ভুগে প্রেমিকের মরে যাওয়ার সম্ভাবনা ভেবে,,,,

প্রেমিক বলে,”কাঁদো কেন? আমার মরণব্যাধি কোন রোগ হয়ে নাই।”

প্রেমিকা ছলছল চোখে বলল,,”আমি জানি ধনুষ্টংকার খুব খারাপ রোগ,তুমি ডাক্তার দেখাও।”

প্রেমিক বলল,,”৫ বছর পড়ছি মেডিকেলে,ধনুষ্টংকার হেপাটাইটিস কৃমি দিয়ে গয়,আর সেটা মোটা বলে ঘাড়ে কুতকুত খেলে,এই কথা কোনো স্যারের সামনে বললে,সাথে সাথে স্ট্রোক করত।”

প্রেমিকা বলল,,”ওরা যে বলল?”

প্রেমিক বলল,,”আরে ধুর,তোমাকে পচাচ্ছে,তোমার বয়ফ্রেন্ড দেখতে খারাপ,বেঢপ,তোমার সাথে যায় না,সে জন্য।”

প্রেমিকা কিছুক্ষণ ভ্রু কুচকে কিছু ভাবল। তারপর আস্তে আস্তে তার বন্ধুদের টিটকারি বুঝতে পারল। সাথে সাথে মুখে রণরঙ্গিণী ভাব ফুটে উঠল। চিল্লিয়ে বলল,,”আবার বয়ফ্রেন্ড দেখতে কেমন তাতে ওদের কি?”

চিল্লানি শুনে দুইটা বাস,একটা ট্রাক আর একটা মাইক্রো ঠাস করে ব্রেক কষল।

প্রেমিকা ঘুরেই পিছু হাটতে লাগল। কি মনে করে আবার পিছে ফিরে এসে প্রেমিকের কলার ধরে আবার চিল্লানি দিল,,”এত করে বলছি ব্যায়াম কর,একটু ওজন কমা,,শুনিস নাই,তুই কমলে এগুলো শুনতে হইত?”

বাসভর্তি যাত্রী তাকিয়ে আছে। প্রেমিক মিনমিনিয়ে বলল,,”আমি তো জিমে ভর্তি হইছি”

প্রেমিকা ভলিউম বাড়িয়ে বলল,,”জিমের ঠিকানাটা দাও আমি একটু দেখতে চাই। কোন দেশী জিম এটা,, ৯৫ কেজি থেকে বাড়িয়ে ১০৩ কেজি করে দেয়?”

প্রেমিকা রাগে কাপতে কাপতে চলে গেল। বাসভর্তি যাত্রী প্রেমিকের দিক চেয়ে রইল। প্রেমিক দাতগুলো বের করে বলল,,”গার্লফ্রেন্ড,হে হে হে,,”

পরের কয়েকদিন গার্লফ্রেন্ডের সাথে তার বান্ধবী আর বন্ধুদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলতে লাগল। যার সাথেই দেখা হয় সেই গার্লফ্রেন্ডকে বলে,”তোর বয়ফ্রেন্ড ধনুষ্টংকার হওয়া একটা আলুর বস্তা।”

আর গার্লফ্রেন্ড চেচায়। আর প্রেমিকের সাথে সেই রাগ ঝাড়ে বিভিন্নভাবে।

ফেসবুকে থাকলে প্রেমিকার বান্ধবীরা আর হিজরা বন্ধুগুলো বিশাল বিশাল মোটা লোকের ছবিতে মেনশন দিয়ে রাখে তাকে। বলে,”এদের এট লিস্ট টাকা আছে।”

পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ তখন প্রেমিক নিরুপায় হয়ে ঢাকায় সিনেমা বানাতে ব্যস্ত বেস্ট ফ্রেন্ড ডেটিং এক্সপার্টকে কল দিয়ে সব ঘটনা খুলে বলে।

এদিকে “খয়রাতির প্রেম” সিনেমার নায়িকার রোলের জন্য অডিশন দিতে ঢাকার বাঘা বাঘা সুন্দরিরা ডেটিং এক্সপার্ট এর অফিসে ভিড় জমিয়েছে। অত্যধিক গরমে হিমসিম খাচ্ছে নায়িকা হতে ইচ্ছুকরা। এদিকে একটা খাতা হাতে একটা টুলে বসে হাফপ্যান্ট,টি শার্ট,বাথরুমের চটি, আর সাহেবি হ্যাট পরা ডেটিং এক্সপার্ট একটু পর পর বলছে,”নেক্সট।”

অডিশন নিতে নিতে ডেটিং এক্সপার্ট প্রেমিককে বলল,,”হ্যা রে দোস্ত,একটু ব্যস্ত আছি,নায়িকাদের অডিশন নিচ্ছি।পরে কথা বলি।”

প্রেমিক বলল,,”আমার এত বড় প্রবলেম আর তুই ওখানে আকাম করে বেড়াচ্ছিস?”

ডেটিং এক্সপার্ট বলে,,”ছি ছি দোস্ত,কি বলস এসব,,আমি ভাল ছেলে,, ” তারপর নায়িকা হতে আসা এক সুন্দরিকে বলল,,”হ্যা একটু কোমড় দুলিয়ে নেচে দেখাও,,হ্যা হ্যা,এভাবে,,,”

প্রেমিক বিরক্ত হয়ে বলল,,”মেয়েগুলো জানে সিনেমার নাম “খয়রাতির প্রেম”?”

ডেটিং এক্সপার্ট বলল,,”অবশ্যই জানে,এজন্যই তো এত ভীড়,বাংলাদেশে সে সব ছবির শেষে “প্রেম” কথাটা আছে, সবই বাম্পার হিট,অভিনয় করলেই সুপারস্টার, ওই যে শুনিস নি,”চাকরের প্রেম,রিকশাওয়ালার প্রেম,দারোয়ানের প্রেম,কুদ্দুইসসার প্রেম”

প্রেমিক বলল,,”তা খয়রাতির প্রেমের কাহিনীর সারসংক্ষেপ টা বল।”

ডেটিং এক্সপার্ট বলল,,”না,নো,নেহি,এটা কোটি টাকার কাহিনী,তোমাকে বলি আর তুমি বিক্রি করে দাও কাহিনী,আমি কি এতই বোকা?”

প্রেমিক বলল,,”তারমানে কোনো কাহিনী নেই,তুই সুন্দরি পটাতে ভুয়া অডিশন খুলে বসছিস।”

ডেটিং এক্সপার্ট বলল,,”ছিঃ,আমাকে এতটা লুচু ভাবিস তুই?”

প্রেমিক বলল,,”আমাকে সাহায্য করবি কিনা বল,নইলে ঢাকার কোন ফ্রেন্ডরে তোর অফিসে পাঠিয়ে বলাব সবাইকে তুই আসলে কি করতেছিস,মাইর একটাও বাইরে পড়বে না।”

ডেটিং এক্সপার্ট বলল,,”আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস?”.

প্রেমিক বলল,,”দাড়া বলতেছি।”

এক্সপার্ট বলল,,”না না দোস্ত,,আমি বরিশাল আসতেছি,তোর কি সমস্যা সব সমাধান করে দেব।”

পরেরদিনই ডেটিং এক্সপার্ট ঢাকা থেকে চলে এল।সব শুনে বলল,,”আচ্ছা,তার মানে তোর ফিগার দেখে তোর গার্লফ্রেন্ডের বন্ধু বান্ধব ওরে পচাইতেছে,ও ডিপ্রেশনের ভুগতেছে,আর তোর সাথে খিটখিট করতেছে,এই তো?”

প্রেমিক বলল,,”আর বলিস না ভাই,ধর,এই একটা কিছু বলে ওকে হাসালাম,আর ফোন রাখতেই একজন মেসেজ দিয়ে বলবেই বলবে,”মানুষ আর আলুর বস্তার সংকর করলে কি হবে? মালু নাকি আনুষ।”

ডেটিং এক্সপার্ট হো হো করে হেসে দিল। তারপর প্রেমিকের লুক দেখে সাথে সাথে থেমে গেল। এক্সপার্ট বলল,,”দাড়া দাড়া,আমি যখন এসে গেছি কোনো চিন্তা নাই,তা দোস্ত,তোর ওজন কমাইতে কত দিন লাগবে?”

প্রেমিক চিল্লিয়ে বলল,,”জিমে গিয়া ডেইলি লাফাইয়া,দৌড়াইয়া ওজন ৮ কেজি বাড়ছে, আর তুই বলতেছিস কমবে কবে?”

ডেটিং এক্সপার্ট বলল,,”জিমের ঠিকানাটা দে তো,ওজন একটু বাড়ানো দরকার,,,,,”

প্রেমিক ডেটিং এক্সপার্ট এর পিঠে দড়াম করে একটা কিল বসিয়ে দিল।

ডেটিং এক্সপার্ট ব্যাথায় পিঠ বাকিয়ে হেটে দূরে সরে গেল। এমন সময় সেই যে হিজরা ফ্রেন্ড প্রেমিক আর প্রেমিকাকে একসাথে হাত ধরাধরি করে হাটতে দেখেছিল,সে দেখে ফেলল ডেটিং এক্সপার্ট কে। 

এখন ডেটিং এক্সপার্ট কে সে আগে থেকেই চিনত,তখন দেখেছিল ছেলেটা ভালই সোজা হয়ে হাটে,কিন্তু চলন্ত রিক্সায় প্রেমিকের কাছ থেকে বাকা হয়ে ডেটিং এক্সপার্ট কে সরে যেতে দেখে হিজরা বন্ধুর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সে ফোন করে পুরো ফ্রেন্ড সার্কেলকে জানিয়ে দিল,,”এ যে ভুতুড়ে ব্যাপার,আমরা এতদিন ক্ষেপানোর জন্য ওর বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে যা যা বলতাম,অলৌকিক ভাবে সব সত্যি,ওর সংস্পর্শে গেলে আসলেই মানুষ বাকা হয়ে যায়,ধনুষ্টংকার হয়ে যায়।”

প্রশ্নফাস ব্যাচের মেডিকেল এর বন্ধুরা বলল,,”হ্যা হ্যা,ধনুষ্টংকার এর আরেকটা জীবাণু আছে,নাম কলেরা কৃমি,এটা হাত থেকে ঘাড়ে যায় না,কিলের মাধ্যমে ছড়ায়,,বেশি ভয়ংকর। ধরলেই মৃত্যু।”

প্রেমিকার বিশাল ফ্রেন্ড সার্কেলের  সবাই আতংকিত হয়ে গেল। তাদের এত প্রিয় বান্ধবীকে নিয়ে এতদিন মজা করত,মজাটা আসলেই সত্যি,তবে কি ধনুষ্টংকার হয়ে তাদের বান্ধবীও বাকা হয়ে যাবে?

সাথে সাথে প্রেমিকার বন্ধুরা প্রেমিকার বাসায় রওনা দিল। গিয়ে দেখল রুমে প্রেমিকা ডিপ্রেশন এ বাকা হয়ে বসে আছে,সাথে সাথে তারা চিল্লিয়ে বলল,,”হায় হায় রে,ধনুষ্টংকার হয়ে মেয়েটা বাকা হয়ে গিয়েছে।”

প্রেমিকার মা বলল,,”সে কি কথা,ওকে তো ধনুষ্টংকার এর টিকা দেওয়া আছে।”

বন্ধুরা বলল,,”না না আন্টি,এই ধনুষ্টংকার ভয়ংকর ধনুষ্টংকার, কলেরা কৃমি দিয়ে হয়।”

প্রেমিকার মা কিছু বলার আগেই ওরা সবাই প্রেমিকাকে চ্যাংদোলা করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। প্রেমিকা চিল্লিয়ে বলল,,”হেল্প হেল্প,,আর ডিপ্রেশনে ভুগব না,এবারের মত তোরা আমাকে মাফ কর।”

এদিকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর ডাক্তার এসে বলল,,”কি হয়েছে?”

বন্ধুরা বলল,,”ধনুষ্টংকার, ভয়ংকর ধনুষ্টংকার, ওর বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে এসেছে,ওর বয়ফ্রেন্ড জন্মগত ধনুষ্টংকার এ আক্রান্ত।”

ডাক্তার মুখ ভেচকাইয়া রইল। বন্ধুরা বলল,,” এ কেমন ডাক্তার,দাড়ান আমাদের মেডিকেলের ফ্রেন্ডকে ধরিয়ে দিচ্ছি ফোনে,ওর কাছ থেকে শুনে নেন।”

মেডিকেলের ফ্রেন্ড ফোন ধরে  ঘটনাটা আচ করতে পেরে বলল,,”দোস্ত,বড্ড বাথরুম পেয়েছে,আসছি আমি।”

এদিকে প্রেমিকা চিল্লায়,,”ওই তোরা আমাকে ছেড়ে দে,এরকম করতেছিস কেন?”

বন্ধুরা বলল,,”দেখলেন ডাক্তার সাহেব, কলেরা কৃমি কিভাবে মেয়েটার ধনুষ্টংকার করেছে? মেয়েটা বুঝতেই পারছে না যে ও রোগী।”

ডাক্তার বলল,,”কলেরা একটা কৃমি? সেটা ধনুষ্টংকার করে?”

বন্ধুরা বলল,,”হ্যা,, এই ধনুষ্টংকার হেপাটাইতীস কৃমি দিয়ে ঘটানো ধনুষ্টংকার এর চেয়েও ভয়ংকর। ”

এটা শুনে ডাক্তার নিজের বুক চেপে ধরে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল।

বন্ধুরা কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। তারপর বলল,,”ডাক্তারেরও মনে হয়ে ধনুষ্টংকার হয়েছে,দেখ না কেমনে বাকিয়ে পড়ে আছে।”

আরেক বন্ধু বলল,,”কিন্তু উনি তো রোগীকে ধরলেন না,তাইলে ধনুষ্টংকার কি বেয়ে ঘাড়ে গিয়ে কুতকুত খেলল?”

বন্ধুরা পরস্পরের দিক চাইল। এরপরু সেই হিজরা বন্ধুটা চিল্লিয়ে বলল,,”এটা বায়ুবাহিত!!!!!! ”

 এই বলেই প্রেমিকাকে হাসপাতালের বেডে রেখে বন্ধুরা এক দৌড়ে হাসপাতাল থেকে চলে গেল।

প্রেমিকাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এসেছিল। মোবাইল, টাকা কিছুই নেই সাথে। এদিকে বায়ুবাহিত ধনুষ্টংকার এর ভয়ে পুরো ওয়ার্ড ভরা রোগী আর আত্মীয়রাও দৌড়ে পালাচ্ছে,সে এক হুলস্থূল কান্ড।

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে,বাইরে অন্ধকার,হাসপাতালের জায়গাটা নির্জন। প্রেমিকা একা একা বাইরে বের হল খালি পায়ে, কিছু নেই আশেপাশে।  কোথাও একটা রিকশাও নেই।

আস্তে আস্তে অন্ধকারে খালি পায়ে হেটে রাস্তায় গেল প্রেমিকা।

তখনি পিছন থেকে কে যেন ডাক দিল।প্রেমিকা পিছু ফিরে দেখল,অনেক আগে তার বাসায় প্রপোজাল পাঠানো এক ব্যাংক অফিসার।  

অফিসার বলল,,”এখানে আসতেছিলাম এক রোগীকে দেখতে,তোমাকে পেয়ে গেলাম, শুনলাম তোমার আলুর বস্তা বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে নাকি খুব হতাশায় ভুগছ?”

প্রেমিকা হাটা ধরল। অফিসার পিছু পিছু আসতে লাগল,,”আমার মধ্যে কি নাই? আমার পিছে মেয়েরা ঘুরে,আমার ভাল চাকরি আছে,আমার বাবার বাড়ি আছে,,তুমি ওই লুজারটার মধ্যে কি দেখলে?”

প্রেমিকা ছুটতে লাগল। কি ব্যাপার,আজ রাস্তায় কোথাও কেউ নেই কেন?

অফিসার পিছনে আসতেছে,বলল,”আমার প্রশ্নের উত্তর চাই,সন্তোষজনক উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত যেতে পারবে না”

প্রেমিকা কাঁদতে লাগল। আরো জোরে দৌড়াল,একটু পর হোচট খেয়ে একটা বস্তার মত কিসে সাথে যেন ধাক্কা লাগল। কিন্তু বস্তাটার হাত ওকে পড়তে দিল না।

প্রেমিকা দেখল ১০৩ কেজি ওজনের প্রেমিক এর বুকে এসে পড়েছে সে। প্রেমিক বলল,”আন্টি বলল,তোমাকে নাকি হাসপাতালে নিয়ে এসেছে?কাল হরতাল,সন্ধ্যার পর থেকে গাড়িঘোড়া সব ভয়ে চলাচল বন্ধ। আমি শুনেই দৌড়ে এসেছি ১২ কিলোমিটার। তোমার কি হয়েছে? হাসপাতালের বাইরে কেন তুমি?”

ব্যাংক অফিসার এগিয়ে আসল। প্রেমিক ব্যাংক অফিসারকে দেখে নি। প্রেমিক দেখল প্রেমিকার পা খালি। প্রেমিক নিজের জুতা খুলে প্রেমিকাকে পড়াল। ব্যাংক অফিসার দেখল,১২ কিলোমিটার ছুটে এসে স্যান্ডেলের ঘষায় প্রেমিকের পা ছিলে গেছে,রক্ত বের হচ্ছে।

ব্যাংক অফিসার উত্তর পেয়ে গেল। সে চলে গেল প্রেমিক আর প্রেমিকাকে একা রেখে।

গল্প ৯৩

​”অস্পৃশ্য”

লেখা : ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১. 

  “হাড় মটমট, অক্ষিকোটর, দন্তাল সে হাসি হায়

 ধুলিমাখা,ধু ধু প্রান্তরতলে একাকী কবরময়,,,”

  রাফসান আহমেদ ভয়ার্ত একটা অস্ফুট চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসে। ঘরের ডিমলাইটের নীল আলো তার ধবধবে সাদা শরীরটা নীল একটা দ্যুতির মত আশেপাশে ছড়াতে থাকে,কাচের জানালা থেকে পাশের বাসার যে মেয়েটা সারাদিন উকিঝুকি মারে তাকে এক পলক দেখতে,সে ঘুমিয়ে না পড়লে এই আলো আধারির খেলা দেখে ভিরমি খেত।

রাফসান ইদানীং বেশ কিছু বাজে স্বপ্ন দেখছে। প্রত্যেকটা স্বপ্ন ইনভলভ করে রক্ত,পচাগলা কিছু লাশ,আর পোকা খাওয়া ধবধবে হাড়,, আর কখনো কখনো  অন্ধকার চারকোণা একটা জায়গা,,যেটার উপরে বাশ আর চাটাই দেওয়া,, মাঝে মাঝে মাটি খুড়ে বাশ এর ফাকে মুক ঢুকায় শিয়াল,চাটাইয়ের নিচে সাদা কাপড়ে জড়ানো রাফসানের অবশ দেহ ভয়ার্ত চিৎকার দেয়।

নাহ আজ আর ঘুম আসবে না। রাফসান বিছানা থেকে উঠে পানি খায়। ঘরের কোণায় একমাত্র আয়নায় নিজের চেহারা দেখে।খুবই দুষ্প্রাপ্য এক সুদর্শন চেহারা তার দিক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আয়নার ভিতর থেকে।

হ্যা,রাফসান জানে ও দেখতে সুন্দর। শুধু সুন্দর না,যেরকম সুন্দর হওয়া উচিৎ একটা ছেলে তার থেকেও বেশি সুন্দর। সেই বয়ঃসন্ধিকালের পর থেকেই আশেপাশে যত মেয়ে আছে,সবাই তার দিকে তাকালে কেমন যেন করে উঠত।

রাফসানের রুমের দরজাটা একটু নড়ে উঠে। আয়নায় সেটা দেখেও রাফসান পাত্তা দেয় না। একটুপর দরজা থেকে মোটা,কুৎসিত, বেঢপ চেহারার এক লোক রুমে ঢোকে।

নাদুস নুদুস লোকটার চোখের দৃষ্টি দেখে যে কেউ বলবে লোকটা দুনিয়ায় কিছুই কেয়ার করে না।কোনো ব্যাপারে ইন্টারেস্ট নেই। যেন কোনো আগ্রহ নেই এমনভাবে রাফসানকে সে জিজ্ঞেস করল,”চিৎকার শুনলাম মনে হচ্ছে,খারাপ স্বপ্ন?”

রাফসান মেজাজ দেখিয়ে বলল,”বাবা তোমাকে না বলেছি,নক না করে আমার রুমে ঢুকবে না?”

লোকটা এখনো যেন কোন আগ্রহ নেই সেই স্টাইলে বলল,” তোমার চিৎকার শুনলাম।মনে হল,তুমি ভয় পেয়েছ,তোমার আমাকে প্রয়োজন, তাই এসেছিলাম।দুঃখিত।তুমি নিশ্চিত, তোমার কিছুর দরকার নেই?”

রাফসান বলল,,”না, জাস্ট একটা দুঃস্বপ্ন,যাও তো রুম থেকে। ”

রাফসানের বাবা বশীর আহমেদ একইরকম অগ্রাহ্য ভঙ্গি করে বের হয়ে গেল। তবে রাফসান জানে,সে আবার ফিরে আসবে। দুই মিনিট পর তার বাবা এক জগ পানি নিয়ে রাফসানের বেডসাইড টেবিলে রেখে, এলোমেলো ঘামে ভেজা বেডশিটটা সরিয়ে আরেকটা বেডশিট বিছিয়ে গেল। তারপর যেন তার কোন ইন্টারেস্ট নেই সেই ভঙ্গি করে বের হয়ে গেল।

রাফসান তার বাবার ব্যবহার সম্পর্কে খুব ভাল করে জানে।সে বিছানায় শুয়ে পড়ল,সাথে সাথেই আমার ঘুম পেয়ে গেল। ঘুমের সাথে সাথে শেষবারের মত চিন্তা করল যে স্বপ্নটা সে দেখেছে সেটার ব্যপারে,,,,

ধু ধু প্রান্তর,,আশেপাশে বিশাল জায়গা ধরে কোনো বাড়িঘর নেই, এটা একটা বিল,গরমের খা খা রোদে বিলের মাটি শুকিয়ে ফেটে গেছে। এরকম একটা বিলের পাশে সারি সারি ৭ টা বড় তালগাছ,সেটার গোড়ায় একটা ভাঙা কবর,,,,

এটুকু দেখার পর রাফসান নিজেকে সেই কবরে শুয়ে থাকতে দেখে,নিজের দেহটা সাদা কাফনে বাধা,কবরের ভিতর একটা শিয়াল মুখ দেয়,, তবে রাফসান শিয়াল দেখে চেচায় না,,শিয়ালের পর যেটা আসে সেটা দেখে চেচায়,,

রক্তমাখা পোড়াপোড়া শরীর,চামড়াহীন মুখে দুইটা বেরিয়ে থাকা অক্ষিগোলক,, কবরটায় উকি দিয়ে বলে,, “রাফসায়ায়ায়ায়ান,,,,,”

 আর আশেপাশে রক্তের বন্যা দেখা যায়,,গ্যালন গ্যালন রক্ত সেই জিনিসটাকে নিয়ে কবরের ভিতর ঢুকে যায়,,,,

প্রায় প্রতিদিন এই স্বপ্নটা দেখার পর আজ রাফসান শিয়াল কবরে মুখ ঢোকানোর পরই চিৎকার দিয়ে ওঠে। সেই মুখটা আর রক্তের বন্যা যাতে না দেখতে হয়।

রাফসান আবার ঘুমিয়ে যায়। রাফসান ঘুমিয়ে যেতেই ওর ঘরের দরজাটা আবার খুলে যায়। ঘরে ঢোকে ওর বাবা। বিড়বিড় করে কিসব পড়ে বিছানার আশেপাশে ঘুরতে থাকে। রাফসানের মুখের দিকে আরেকবার তাকায়। তারপর পকেট থেকে একটা নোটপ্যাড বের করে একটা পেইজে লেখে, ” ২৩ দিন,২৩ তম দিনে সে নিজে স্বপ্নটা থেকে নিজেকে প্রথমবারের মত বাঁচাতে পেরেছে।

রাফসানের দিক আবার তাকিয়ে বশীর আহমেদ ঘরটা থেকে বের হয়ে যায়।

২.

২২ বছর আগে,,,,,,,

মোটামুটি ফর্সা,তবে মুখমণ্ডল, পেট আর বুকে মেদ জমা নাদুসনুদুস একটা ছেলে বসে আছে পার্কের একটা বেঞ্চে।

ফ্যাশন সম্পর্কে,পোশাক আশাকে একদম অজ্ঞ সে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। পোশাক ক্ষ্যাত,চেহারা খারাপ,হা করে একটা চোর চোর লুক তার মুখে।

তবে তার অযত্নে থাকা শরীর এবং ড্রেস আপের মধ্যে একটা হাতঘড়ি আছে। সব কিছু অযত্নের হলেও এই ঘড়িটা চকচক করছে,দেখেই বোঝা যায়,ঘড়িটার নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয়। একদম খুবই আদরের সাথে ব্যবহার করা যায়। দেখেই বোঝা যায় এটা একটা গিফট। এবং এই গিফটটা যে দিয়েছে,সে এই বিদঘুটে চেহারার লোকটার জীবনের সবকিছু।

বশীর একটু পর পর ঘড়িটা দেখছে,আর অপ্রয়োজনীয় ভাবে রুমালটা দিয়ে ঘড়িটা মুছতেছে।

একটুপর বশীর আহমেদকে চঞ্চল হতে দেখা গেক। বেঞ্চ থেকে সে লাফিয়ে উঠল। দূর থেকে একটা মেয়ে এই বেঞ্চটার দিকে এগিয়ে আসছে। বশীরের মুখে একটা বলদ বলদ হাসি ছড়িয়ে গেল। একটু একটু করে অনিন্দ্যসুন্দর মেয়েটা ওর কাছে চলে এল।

মেয়েটা মাথা নিচু করে রইল। বশীর দাঁড়িয়ে রইল। শাড়ির আচলটা ঠিক করে,আর চুলের খোপাটা একবার হাত দিয়ে দেখে মেয়েটা বেঞ্চে বসে গেল।

বশীর তোতলিয়ে বলল,,”মন খারাপ শিলা?”

শিলা বলল,,”প্রায় ২ বছর হয়ে গেল,এখনো কথা বলতে তোতলানো লাগে? স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পার না?”

বশীর বলল,,”তুমিও তো দুই বছর হলেও এখনো আমার দিকে তাকিয়ে কথা  বলতে লজ্জা পাও,হে হে হে”

শিলা বলল,,”ওভাবে হাসবা না,বিশ্রী লাগে।”

বশীর মুখ বন্ধ করল। তারপর বলল, “মন খারাপ কেন?”

শিলা বলল,,”বাসায় আমার জন্য আরেকটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।”

বশীরের মুখ থেকে হাসি একদম গায়েব হয়ে গেল। চোখে আতংকের ছাপ দেখা গেল।সে বলল,”তারপর কি হল?”

শিলা বলল,,”আমি মুখের উপর না বলেছি। কিন্তু কতদিন আর পারব এরকম? বড় বড় ঘরের ধনী ছেলেরা প্রস্তাব পাঠাতে থাকে। বাবা এখনো কিছু চাপ দেয় না পড়াশুনা করি বলে। কিন্তু যদি কখনো হ্যা বলে দেয়?”

বশীর চাপা গলায় বলল,”না”

তারপর বেঞ্চ থেকে উঠে পায়চারি শুরু করল সে।  ভয় পেলে সে এমন করে।

শিলা বলল,,”তুমি চাকরির জন্য চেষ্টা করছ তো?”

বশীর বলল,,”হ্যা,কয়েকজায়গায় আবেদন করেছি।ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকছে। কিন্তু চাকরি হলেও যে টাকা পাব,তার চেয়ে অনেক টাকাওয়ালারা তো তোমাকে ডেইলি প্রস্তাব দেয়।”

শিলাও বেঞ্চ থেকে উঠে গেল। বলল,”ওদের তো আর আমি ভালবাসি না। শুধু একটা চাকরি জোগাড় কর। যত তাড়াতাড়ি পার। তারপর আমাদের বাসায় আস। বাকিটা আমি করব।”

বশীর বলল,,”হ্যা হ্যা,, আজ আরো কয়েকটা জায়গায় দরখাস্ত করব।”

শিলা ওর হাতটা ধরে বলল,”ভয় পেও না। তোমাকে ওয়াদা দিয়েছি তো। তোমারই হব। আর কারো না। খালি সহজ করে দাও বিষয় টা।”

বশীর শিলার হাতটা চেপে ধরল।

ওরা খেয়াল করল না,পার্কের অপরপ্রান্তে শিলার বাসার পাশে থাকা এক দম্পতি ওদের দেখছিল। 

মহিলাটা বলল,,”ছিঃ মেয়েটাকে ভাল বলে জানতাম। পার্কে বসে পরপুরুষ এর সাথে হাত ধরাধরি করে?”

তার স্বামী বলল,,”আর আমরা যখন আমাদের ছেলের প্রস্তাব নিয়ে গেলাম মেয়েটার মায়ের সে কি ডাট,,আমার ছোট মেয়েকে এখনি বিয়ে দেব না,হুহ। মেয়ে কি আর ছোট? পার্কেই হাত ধরাধরি, আর আড়ালে কি হয় কে জানে,,,”

সেদিন থেকে শিলার পাড়ার সবাই জেনে গেল শিলা কার সাথে যেন প্রেম করে। আর ধরাধরি করে। কেউ কেউ খবরটা এভাবেও জানল, শিলা নাকি ৪ টা ভিন্ন ভিন্ন ছেলের সাথে ধরাধরি করে। কেউ কেই এভাবেও খবর পেল,শিলাকে ৩ টা ছেলের সাথে হোটেলে দেখা গেছে।

এভাবে হাত ধরাকে ধরাধরি,টিপাটিপি, খাওয়াখাওয়ি হিসেবে প্রচার করার পর ব্যপারটা শিলার বাবারও কানে এল। শিলার বাবা অসুস্থ হয়ে গেল। হাসপাতালে নেওয়া লাগল।

এদিকে শিলা তো বশীরের সাথে কথাই বলে না। ওই বলদটার জন্যই তো সব হল। চাকরি পেতে এত সময় কি কারো লাগে? এত বলদ মানুষ হয়? চাকরি পেলে এভাবে পার্কে দেখা করতে যেতে হত না।অনেক আগেই বিয়ে হয়ে যেত।

বশীর আশেপাশে ঘোরে শিলার সাথে দেখা করতে।বেশি কাছে ঘেষতে পারে না। শিলার আত্মীয় দের ভয়ে।শিলা চাইলে দেখা হত।

এদিকে মেয়ের নামে দুর্নাম রটল বলে মেয়ের পরিবার আর আত্মীয়রা ইমিডিয়েটলি মেয়ের বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগল। এদিকে শিলার বাবাও একটু সুস্থ হল। পাড়ার ছেলেরা শিলাকে দেখলে টিটকারি মারে।

এদিকে বশীর একটু খোজ নিয়ে জানতে পারল,শিলার বাড়িওয়ালার ছেলে অনেক আগে থেকে শিলার উপর ক্রাশ খাওয়া। শিলা পাত্তা দিত না। কিন্তু সেই ছেলে পিছে লেগেই ছিল। ওই মূলত পাড়ার ছেলেদের কন্ট্রোল করে। কিন্তু এতদিন ও জানত না যে শিলার প্রেমিক আছে। তাই পাড়ার ছেলেদের বলত,শিলা তোদের ভাবি। এখন পার্কের সেই আংকেল আন্টি যখনি প্রচার করল শিলা ধরাধরি করে।তখনি বাড়িওয়ালার ছেলে পাড়ার ছেলেদের লেলিয়ে দিল শিলাকে টিজ করতে।

এদিকে শিলার পরিবার শিলাকে বিয়ে দেবার চেষ্টা করছে এটা পাড়ায় রটে গেল। তাজ্জব বিষয়,যারা এতদিন ধরে শিলার হাত ধরাকে,ধরাধরি,টিপাটিপি আর খাওয়াখাওয়িতে পরিণত করে প্রচার করেছিল,তারাই তাদের ছেলেদের বউ করতে শিলার বাবার কাছে ধরণা দিতে লাগল।

সে এক হুলস্থূল কান্ড। শিলার বাবা কাউকে না বললে,তারা আগের গুজব আরো জোর দিয়ে প্রচারের ভার নিত,আজব এক পরিস্থিতির মুখে পড়ল শিলার পরিবার।

এদিকে বশীর চাকরির জন্য হন্যে হয়ে গেছে। অনেকগুলো জায়গায় আবেদন দেওয়া আছে,কিন্তু অভিজ্ঞতা নেই বলে একটা একটা ইন্টার্ভিউ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।এখন চাকরি না পেয়ে শিলার বাসায় যাওয়াও সম্ভব না। বেকার ছেলের সাথে শিলার পরিবার বিয়ে দেবে না,সে শিলা যতই আশ্বস্ত করুক তাকে,সে খুব ভাল করেই জানে।বশীর মরিয়া হয়ে ওঠে।

এদিকে পাড়ায় শিলার নামে যখন এভাবে কুৎসা উঠে গেছে শিলা আর পাড়ার আশেপাশে বশীরের সাথে মিট করার সাহস দেখায় নি। বেশ কয়েকদিন ওদের দেখা হল না।

এদিকে সেই যে বাড়িওয়ালার ছেলে শিলাকে পছন্দ করত,সে হঠাৎ ভাবল,শিলার যখন প্রেমিক আছে,ওর সাথে প্রেম করার আশা নেই। এর চেয়ে শিলাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে সে।এখন তারা এও খেয়াল করল যে শিলার বাবা মা মেয়ের নামে এতকিছু রটার পরেও পাত্র খোজার ব্যপারে যথেষ্ট সতর্ক। তাই বাড়িওয়ালার ছেলে একটা আলাদা প্লান করল। পাড়ার বখাটে ছেলেদের দিয়ে শিলার আর শিলার পরিবারের উপর অত্যাচার বাড়িয়ে দিল। প্লান হল,অত্যাচারর অতিষ্ঠ হয়ে গেলে,বাড়িওয়ালার ছেলে নায়কের মত সামনে গিয়ে পাড়ার ছেলেদের বাধা দেবে,পাড়ার ছেলেরা সরে যাবে,শিলার পরিবার ইম্প্রেসড হবে। ওদের বিয়ের প্রস্তাব ফেলে দেবে না।

এই প্লান মত এগোল বাড়িওয়ালার ছেলে। কিন্তু সমস্যা হল,এতকিছুর পরও শিলার পরিবার একটু বাঁকছে না। বরং এলাকা ছেড়ে চলে যাবার কথা বলছে। বাড়িওয়ালার ছেলে প্রমাদ গুণল।অতিষ্ঠ হয়ে তারা চলে যেতে পারে এটা তো তার মাথায় আসে নি। তাই সে তার প্লান অনুযায়ী একটু তাড়াতাড়িই নায়কের মত এগিয়ে গিয়ে শিলার বাবা মাকে শুনিয়ে নিজের লাগানো পাড়ার ছেলেদের শিলাকে বিরক্ত করতে মানা করল। 

জিনিসটা যে অভিনয় বুঝে গেল শিলার বাবা মা। তারা এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ততেই অটল থাকল।

এরই মধ্যে বশীরের চাকরি হয়ে গেল। শিলার সাথে পাড়া থেকে অনেক দূরে সাক্ষাৎ করল সে। শিলা এই কথা শুনে আনন্দের আতিশয্যে বশীরকে জড়িয়ে ধরল।

বশীরকে বলল,”আজই বাসায় প্রস্তাব পাঠাও,রাজি আমি করাব।”

বশীর বলল,”দাড়াও,আগে জয়েন করে নি।পোস্টিং শহরের বাইরে। বেশ ভাল বেতন।কিন্তু জায়গাটা নির্জন।আমাকে পুরো একটা অফিসেরই দায়িত্ব দিয়েছে।লোক নেই।নিজে গিয়ে গুছাতে হবে।”

শিলা বলল,,”২ বছর অপেক্ষা করেছি,আর কয়েকদিন পারব।”

এদিকে বাড়িওয়ালার ছেলেকে শিলার বাবা মা বেশ কিছু কথা শুনিয়ে দিয়েছিল। কারণ বাড়িওয়ালার ছেলে নায়কোচিত অভিনয়টা বাজে হয়েছিল। শিলার বাবা মা শিলার বদনাম একটু ঢাকার চেষ্টা করল,সবাইকে এতদিন পর অবশেষে বিবৃতি দিল,বাড়িওয়ালার ছেলে শিলাকে পাওয়ার জন্য এভাবে তার নিষ্পাপ মেয়ের নামে কলংক ছড়িয়েছে।

ছেলেকে ভয়াবহ অপমান করায়,বাড়িওয়ালা শিলাদের বাড়ি ছাড়তে নোটিশ দিল।শিলারা বাসা খুজতে লাগল।এর মধ্যেই বাড়িওয়ালার ছেলে তার বাবাকে বুঝিয়ে নোটিশ টা বাতিল করাল।

বাড়িওয়ালার ছেলে এখনো আশা ছাড়ে নি শিলার। সে শিলার পিছু নিল। শিলাকে বশীরের সাথে দেখলে ছবি তুলবে।সেই ছবি পোস্টারের মত পাড়ায় ছড়াবে। যখন ছিঃ ছিঃ করার প্রমাণ পাবে মানুষ, তখন বাড়িওয়ালার ছেলে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। বাধ্য হয়ে তারা বিয়ে দেবে।

এদিকে শিলা বশীরের চাকরির খবর শুনে জড়িয়ে ধরার সময়ই ছবিটা তোলা হল। সেই ছবি পোস্টারে পোস্টারে করে সারা পাড়ায় ছড়ানো হল।

বাড়িওয়ালার ছেলে তো মহাখুশি।আর দুই একদিন পর যখন সবার ছিঃ ছিঃ অসহনীয় হবে,তখন সে বিয়ের প্রস্তাব দিবে।

কিন্তু তার ২য়য় প্লানেও ভুল ছিল। শিলার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসতেই ছিল সবসময়ই। এখন যেহেতু মেয়ের প্রমাণসহ বদনাম রটে গেছে,শিলার বাবা মা প্রথম যে বড়ঘরের প্রস্তাব টা পেল,তার সাথেই মেয়ের বিয়ে ঠিক করে দিল। খুব তাড়াতাড়ি। 

শিলাও আর না করতে পারল না। কারণ পোস্টারে পোস্টারে তার আর বশীরের ছবির দেখার পর,তার মা বাবা তার উপর থেকে সব ধরণে স্নেহ,আশা,আস্থা উঠিয়ে ফেলেছিল।

বাড়িওয়ালার ছেলে কপাল চাপড়াতে লাগল।এতকিছু করেও শিলাকে পাওয়া হল না। পার্কে সেই প্রথম দেখা আংকেল আন্টিও মুখ ভেংচি কেটে বলল,,”কত কি যে দেখব,পার্কে বেড়ায় একজনের সাথে,বিয়ে আরেকজনের সাথে।”

এদিকে বশীর নতুন চাকরি তে জয়েন করেই জানল তার পোস্টিং শহরের বাইরে। তখন টেলিফোন এর যুগ। বশীরের টেলিফোন নেই। তড়িঘড়ি করে যাওয়ায় বলে যেতে পারল না শিলাকে।

যেদিন ফিরে এল বশীর,দেখল শিলার বিয়ে হচ্ছে,বর নাকি বিশাল বড়লোক, তাই শিলার বাবা মা সময় নেয় নি।

বশীরের মাথায় বাজ পড়ল। শিলা বিশ্বাসঘাতকতা করল? 

এদিকে শিলাকে জোর করে বিয়ের সাজ পরানো হল। শিলা সেই শাড়ির আচল খুলে ওর রুমের ফ্যানের সাথে বাধল।

এদিকে শেষবারের মত বশির চাইল শিলার সাথে কথা  বলতে,এর মানে কি সেটা জানতে।

শিলা যখনি ঝুলে পড়বে গলায় শাড়ি দিয়ে,তখনি ওর জানালায় খটাস করে একটা শব্দ হল। শিলা শাড়ি গলা থেকে খুলে শিগগিরি জানালার কাছে গেল। দেখল বশীর নিচে দাঁড়িয়ে, তখন শিলা একটা কাজ করল,লুকিয়ে ছাদে চলে গেল। দোতলা বাড়ির ছাদ। বিয়ের সাজ পরেই এর আগে কখনওই যা করার কথা ভাবে নি সেটাই করল। পাইপ বেয়ে নামা শুরু করল।

শিলাকে পাইপ বেয়ে নামতে দেখেই বশীর যা বোঝার বুঝে গেল। আতংকে বলে উঠল,”পড়ে যাবা তো,”

বলার সাথে সাথেই শিলা পড়ে গেল। বশির নিচে দাড়াল। শিলা ওর গায়ের উপরই পড়ল। শিলা আর বশীর উহ করে উঠল।

বশীর বলল,,”ব্যাথা পেয়েছ?”

শিলা বলল,,”পালা,শিগগির ভাগি চল।”

৩.

বশীর আহমেদ  তার বেডরুমে বসে আছে। বয়স এখন ৪৫ তার। যুবক বয়সের মোটা,ব্যায়ামহীন শরীরে খুব তাড়াতাড়ি ই বাত হয়ে গেছে তার। বাতের ব্যথায় একটা লাভ,ফজরের সময়ই তার বাত তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে।

বশীর আহমেদের হাতে একটা ফ্রেমে বাধা ছবি। ২২ বছর আগে তোলা। বশীর আহমেদ আর তার স্ত্রী শিলা আহমেদের ছবি। ছবির এক্সপ্রেশনেরি বোঝা যাচ্ছে বশীর আতংকিত।  বিয়ের ছবি যে কেউ আতংক নিয়ে তোলে এ ছবি না দেখলে বুঝবে না কেউ। কারণ তো আছেই,বেশ বড় ঘরের এক সুন্দরি মেয়েকে এক বড়লোক পাত্রের বিয়ের আসর থেকে ভাগিয়ে এনে শহরের বাইরের এক কাজী অফিসে বিয়ে করার দুঃসাহস দেখালে আতংক হওয়া স্বাভাবিক।

অন্যদিকে শিলার মুখে হাসি। নির্মল এক হাসি। ২ বছরের প্রেম পূর্ণতা পাওয়ার হাসি। সারাজীবন একসাথে থাকার স্বপ্ন দেখার হাসি,,ভালবাসার মানুষ এর সাথে।

বাইরে থেকে রাফসান বলল,,”বাবা ভার্সিটি যাব। খাবার হয়েছে?”

বশীর ছবিটা সরাল,বলল,,”হ্যা,টেবিলে দেখো।”

রাফসান বলল,,”তুমি আসো,খেয়ে নাও,ওষুধ খেতে হবে।”

বশীর বলল,,”খাবো,তুমি খেয়ে ভার্সিটি যাও”

রাফসান খাচ্ছে,তখনি বাসার দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। রাফসান খাবার ছেড়ে উঠে দরজা খুলল। 

এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক দাঁড়ানো সেখানে,চোখের নিচে কালি।বেশ কয়েকরাত ঘুমানো হয় নি বোঝা যাচ্ছে।

লোকটা বলল,,”এটা কি বশীর আহমেদের বাসা?”

রাফসান বলল,,”হ্যা,আসুন ভিতরে।”

লোকটা ভিতরে আসতেই বশীরকে ডাকল রাফসান,”বাবা,একটা লোক এসেছে,,”

বশীর খুড়িয়ে খুড়িয়ে রুম থেকে বের হল। লোকটা বশীরকে দেখে কপাল কুচকাল।বলল,”আপনি বশীর আহমেদ?”

বশীর আহমেদ বলল,,”হ্যা।”

লোকটা বলল,,”কিন্তু আমি ভেবেছিলাম,,,”

বশীর লোকটাকে হাত উঠিয়ে থামাল। রাফসানকে বলল,,”তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া শেষ কর। তারপর বের হও,তোমার প্রতিদিন দেরি হয়।”

রাফসান অবাক হল না,মাঝে মাঝে কিছু লোক আসে বশীরের কাছে কিছু কাজে,কিন্তু বশীর সেই লোকগুলোকে কখনওই রাফসানের সামনে কথা বলতে দেয় না।রাফসান প্রথম প্রথম ভাবত,ওর বাবা কি কোনো অপরাধী?  পরে দেখল,অপরাধী হলে তাদের নিজেদের বাড়ি গাড়ি থাকত,ভাড়া একটা বিশ্রী বাসায় থাকতে হত না।

বিনাবাক্য ব্যায়ে রাফসান খাওয়া শেষ করে চলে গেল।

মধ্যবয়সী লোকটা বশীরকে বলল,,”আমি আপনার কথা শুনেছি,আমি ভেবেছিলাম,আপনি পীর জাতীয় কিছু হবেন। মানে বুঝতেই তো পারছেন,যারা এসব বিষয়ে এক্সপার্ট। ”

বশীর বলল,,”আমি অতিরিক্ত কথা পছন্দ করি না। আপনি কি সমস্যা নিয়ে এসেছেন সেটা বলেন।”

লোকটা বলল,”আমার মেয়ে,,, মাত্র এইচ এস সি দিল। পরীক্ষা শেষে আমরা বাসা চেঞ্জ করে নতুন বাসায় উঠলাম। বেশ ভাল বাসা,কম খরচে। বাসায় আবার ছাদ আছে। মেয়ে তো খুব খুশি,সব গুছিয়ে বিকেলে  ছাদে উঠেছিল। তারপর সন্ধ্যার দিকে ছাদ থেকে নামে। এরপর থেকে কেমন যেন করতেছিল। প্রচণ্ড জ্বর। ভাবলাম নতুন পরিবেশ। তাই হয়ত। রাতে প্রলাপ বকতে লাগল। চোখ লাল,টকটকে,ডাক্তার নিয়ে এলাম। ডাক্তার যেই গায়ে হাত দিল,ডাক্তারকে একটা থাপ্পড় দিল। ডাক্তার জাস্ট উড়ে গিয়ে দেয়ালে টাক খেল।

আমার মেয়ের গলা থেকে একটা পুরুষ বলে উঠল,,,”ধরতে এত শখ কেন? ওরে আমি নিয়ে নিছি,ও আমার,,,”

ওইদিনই আমরা বুঝে গেলাম কি হয়েছে। আমরা আসলে এসব বিশ্বাস করি। আমার বাচ্চা মেয়ে,অতবড় এক পুরুষ ডাক্তারকে যেভাবে থাপ্পড় মেরে সিনেমার মত উড়িয়ে দিল। তা তো নিজ চোখে দেখলাম।

আমরা হুজুর ডেকেছিলাম,হাফেজ,হুজুর,পীর,সব,, কেউ আমার মেয়েটাকে সারাতে পারল না। বলল সম্ভব না। শেষে আমার এক বন্ধু আমার কাছ থেকে সব শুনে আপনার কথা বলল,,আপনি আমার শেষ ভরসা,,, আপনি যদি আমার সাথে আসতেন,মেয়েটা অনেক কষ্ট পাচ্ছে,সেদিন ওটা মেয়েটার শরীর থেকে বের হয়ে আমার মেয়েটাকে নিয়ে লোফালুফি খেলছিল। ওটাকে আমরা দেখি নি,হাসির শব্দ শুনেছি,আমার মেয়েটা চিৎকার করছে,ওটা আমার মেয়েকে অজ্ঞানও হতে দিচ্ছে না। বিছানা থেকে ফ্যানের একদম কাছে ছুড়ে দিচ্ছে,এক ইঞ্চির জন্য ফ্যানের ব্লেড ওর গায়ে লাগছিল না,,,,”

বশীর বলল,,”আপনি একটু দাড়ান,আমি আসছি।”

লোকটা বসে রইল। একটু পর বশীর দুইটা ব্যাগ নিয়ে এল। একটা ব্যাগ খালি।খালি ব্যাগটা লোকটাকে দিল। আরেকটা ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল,”চলেন।”

মেয়েটার বাসার কাছে বশীর আসতেই শুনল,ভয়ংকর মোটা একটা পুরুষকন্ঠের হাসি শোনা যাচ্ছে,আর গান,আর একটা মেয়ের একটু পর পর ভয়ংকর চিৎকার।

বশীর ব্যাগ থেকে একটা মার্কার বের করে বিড়বিড় করতে করতে মেয়েটার রুমের বাইরের দেয়ালে একটা দাগ দিল। সাথে সাথে ভিতরের পুরুষের হাসিটা স্তব্ধ হয়ে গেল।একদম ঠান্ডা।

বশীর এবার ঘরে ঢুকল। মেয়েটার রুমের বাসার ভিতরের দেয়ালে দাগ দিল।দরজা আটকানোই ছিল।দরজায়ও কিছু আঁকিবুঁকি করল।

সাথে সাথে দেয়াল আর দরজায় ভিতর থেকে ধুপধাপ আওয়াজ হতে লাগল। আতংকিত কন্ঠে কে যেন বলল,,”কে? কে এসেছে? কে?”

বশীর চুপ করে রইল। যেন কিছু পাত্তা দেয় না। এভাবে ব্যাগ থেকে জাফরান আর পানি বের করল। আর একটা কাগজ বের করে,জাফরানের কালি দিয়ে কাগজে সুরা নাস লিখতে লাগল।

ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে এল।ভয়ার্ত পুরুষ কণ্ঠের আর্তচিৎকার। “বশীর? বশীর আহমেদ?”

বশীর চুপ। সুরা নাস লিখে চলেছে আরবিতে। ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল,,”বশীর ভাই,,মাফ করে দেন,আমি চলে যাব ভাই,,আমি চলে যাব।”

বশীর চুপ। মেয়েটার বাবা মা আর ছোটবোন ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে কাপতেছে বীভৎস কন্ঠটা শুনে।

“বশীর ভাই,চলে যাব আমি।আমাকে মাফ করে দেন।”

বশীর বলল,,”তুই যাওয়ার হলে এরা আমাকে ডাকত না।আমাকে কেউ কখন ডাকে তোকে কেউ বলে নি কখনো? ”

জ্বিনটা বলল,,”বশীর ভাই,আমি বুঝতে পারি নি,,আমি বুঝি নি। আমি জানতাম না,আপনি সত্যিই আছেন।”

বশীর বলল,,”হা হা হা,,আধুনিক নাকি,,,আমাদের আধুনিক মানুষ রা বলে,জ্বিন ভূত বলে কিছু নেই। তোদের আধুনিকরা বলে নাকি,”বশীর বলে কেউ নেই?””

জ্বিনটা কাদতে লাগল। বশীরের সুরা লেখা শেষ হল। জ্বিনটা শেষবারের মত বলল,,”আপনি এই ঘরে যদি আমাকে কিছু করতে ঢোকেন,আমি নিজেও মরব,এই মেয়েটারও ঘাড় মটকে যাব বলে দিলাম”

মেয়ের পরিবার ডুকরে উঠল। জ্বিনটার কন্ঠ আশাবাদী শোনাল।

বশীর দরজার কাছে গিয়ে বলল,,”মেয়েটা অক্ষত থাকলে শুধু তোকে মারব। মেয়েটার কিছু হলে তোকে মারব,তোর যত আপনজন আছে সবাইকে মারব,,,বাচ্চাকাচ্চা,, সবাইকে,,,এখন তুই বল,,কি করব?”

জ্বিনটা ডুকরে কেঁদে উঠল। বশীর বলল,,”তুই কে,তোর পরিবার কই থাকে কে কে থাকে,আমি কয়দিনের ভিতর খুজে বের করব বলে মনে করিস?”

জ্বিনটা হাউমাউ করে উঠল।বশীর দরজা খুলে ফেলল। দেখল,একটা সুন্দরী মেয়ে হাইমাউ করে কাঁদছে।ও ভাল করেই জানে মেয়েটার ভিতর কি আছে। 

মেয়েটা ওকে দেখে পিছানে লাগল। ভিতর থেকে পুরুষ কন্ঠ আসল,”খবরদার, কাছে আসবেন না,আসবেন না।”

বশীর  সুরা নাস লেখা কাগজ টায় পকেট থেকে ম্যাচ বের করে আগুন ধরিয়ে দিল।মেয়েটা শেষ চেষ্টা করে ছুটতে চাইল। বশীর মেয়েটার চুল ধরে পুড়তে থাকা কাগজটার উপর চেপে ধরল মেয়েটার মুখ। পুরো ধোয়াটা মেয়েটার নাকে ঢুকল। মেয়েটা তড়পানো বন্ধ করে দিল।

মেয়েটার জায়গায় আর মেয়েটাকে দেখা গেল নান ধূসর লোম,সুচাল দাত,লাল চোখ আর সাপের মত চেড়া জিভ ওয়ালা একটা জীব দেখা গেল। সেটার হাতের পাঞ্জা আর নখ বিশাল বড়,পা উলটানো,গোড়ালি সামনে,আঙুল পিছনে।

বশীর জিনিসটার চামড়া ধরে টান দিল। এবাড়ির মেয়েটা বের হয়ে এল। জ্বিনের গলিত দেহটার ধোয়ায় রুমে তীব্র গন্ধ।

বাড়ির লোকেরা মেয়েটাকে এসে ধরল। মেয়েটা চোখ মেলল। অবাক হয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। বশীর বিকৃত শরীরটাকে ওদের সামনেই কুপিয়ে টুকরা করল। তারপর সেই খালি ব্যাগটায় ভরে বের হয়ে এল।

পিছে পরিবারটা তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে রইল তার গমন পথের দিকে।

বশীর ওর বাসায় ফিরল। ওর রুমে ঢুকল। ওর খাটের নিচে ঢুকে একটা বোর্ডের মত টেনে ধরল,একটা মই দেখা গেল। মই বেয়ে নামতে একটা বিশাল ঘর দেখা গেল।

ঘরের ভিতরে দেয়ালের সাথে টেপ দিয়ে লাগানো কিছু শরীরের টুকরা, শরীরগুলো পচে নি। কারো শরীর লোমশ,কারো সাপের মত,,কারো শরীরে পাখা আছে,কারো মুখ কুকুরের মত,,, কেউ কেউ ১০/১৫ ফুট লম্বা।

প্রত্যেকটা মৃতদেহের উপর লেখা,”শিকার নম্বর: ” 

দেয়ালের এক কোণায় শিকার নম্বরে মার্কার দিয়ে লিখল সে ২৩৭।

ব্যাগ থেকে নামানো জ্বিনটার মৃতদেহের টুকরা গুলো টেপ দিয়ে এমনভাবে সেটে দিল সে,মনে হবে আস্ত একটা দেহ।

দেহটার মুখমন্ডলে মৃত্যুর সময়ের শেষ আকুতিটা তখনো লেগেছিল।

৪.

রাফসান ভার্সিটিতে ঢুকে দেখল আজ কোনো কারণে ক্লাস বন্ধ। রাফসানের এত তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে মোটেই ইচ্ছা হল না।

সে ঘুরতে ঘুরতে কমনরুমে এল। রাফসানের শেষ বর্ষ এটা ভার্সিটিতে।

রাফসান যে মাত্রাতিরিক্ত সুন্দর একটা ছেলে সেটা তো আগেই বলা হয়েছে। রাফসান আর রাফসানের বাবাকে পাশাপাশি হাটতে দেখলে ভুলেও কেউ বলবে না রাফসান বশীরের ছেলে। 

রাফসান যতটা সুন্দর। বশীর ততটাই কুৎসিত।  বড় হবার পর রাফসান বশীরের কাছে অনেকবার শিলা আহমেদের ছবি দেখেছে। অপূর্ব সুন্দরি। রাফসান নিজেই বুঝে নিয়েছে কেন সে দেখতে এত সুন্দর। কারণ তার মা যে এত সুন্দরি ছিল।

রাফসান যখন স্কুলে পড়ত,তখন বশীর  প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে আসা যাওয়া করত রাফসানকে। হয়ত স্কুলের আগেও করত। প্রতিবেশিদের কাছ থেকে জানার জো নেই। ওরা প্রতিবছর বাসা চেঞ্জ করে।

রাফসান অনেক কিছু বোঝে,ওর বাবা ওর মাকে প্রচন্ড ভালবাসত। কিন্তু ওর মাকে রাফসান দেখেনি কখনো।  ওর মায়ের ব্যাপারে বশীর কখনো কোন কথা বলতে শোনেনি ওর বাবাকে। কিছু জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দিত না।  তবে মায়ের প্রতি বাবার ভালবাসাটা কখনওই লুকিয়ে রাখে নি বাবা। রাফসান বোঝে,বশীর আহমেদের জীবনের সব কিছুই প্রায় হারিয়ে গিয়েছে তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর। তাই হয় তো সন্তানকে আগলে রাখে সবসময়, স্বপ্নে দেখে চিৎকার করে উঠলেও দৌড়ে আসে ঘরে।

ছোটবেলা থেকে স্কুলে দিয়ে বাইরে বসে থাকা, খেলার মাঠে নিলে একটু দূর বসে থাকা,মোট কথা যেখানে যেত সে,বশীর সাথে যেত। রাফসানের ব্যক্তিভত জীবন বলে কিছুই যেন ছিল না।

এমনকি কলেজ লাইফেও রাফসানের বাবা কিন্ডারগার্টেন এর বাচ্চার মায়েদের মত বসে থাকত কলেজের বাইরে। এজন্য রাফসানকে যথেষ্টসংখ্যক অপমানিত হতে হয়েছে সহপাঠী দের সাথে।

বশীরের সারাদিন পাশেপাশে থাকায় রাফসানের কখনওই ভাল বন্ধু হতে পারে নি।  বাবা নিয়ে যদি কেউ ঘোরে,তার বন্ধু কেমনে হবে? বিশেষ জরে যেকোনো মানুষ ছেলের কাছাকাছি আসলে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে?

বিষয়টা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়,যখন বশীর রাফসানের ভার্সিটিতেও সেইম কাজ করতে থাকে। বাধ্য হয়ে রাফসান বাবার বিরুদ্ধে যায়,সবচেয়ে বড় ঝগড়া হয় ওদের জীবনে। ওর বাবাকে অনেককিছুই বলে বসে সে রাগের মাথায়,যা বলা উচিৎ ছিল না।

সেই থেকে বশীর রাফসানের সাথে কোথাও যায় না।তবে রাফসানকে কিচগু নির্দেশ দেয়। হয়ত বাবাকে ভালবাসে,নতুবা বাবা তার মগজধোলাই করে আসছে ছোটবেলা থেকে,তাই রাফসান বাবার কথা কখনওই অমান্য করে নি।

বশীর এর আয়ের উৎস নিয়ে রাফসান এর সন্দেহ নেই। বশীর কোথাও চাকরি করে না। বাসায় সন্ধ্যার সময় কিছু ছাত্র পড়ায়,কিছু বলতে বেশ কিছু। আর একটা জিনিস রাফসান দেখেছে,মাঝে মাঝে বিপদে পড়েছে এমন লোক ওদের বাসায় আসে,তারপর কি হয় ও জানে না। কয়েকদিন পর লোকগুলো আবার ফেরত আসে,এবার হাসিমুখে,আর বশীরকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে যায়,,,,

যাই হোক,বাবা যেরকম ছেলেদের উপদেশ দেয়,সেরকম ঠিকভাবে চলার জন্য বশীর অনেক কথাই বলে রাফসানকে। কিন্তু দুইটা কথা খুব জোর দিয়ে বলে,,, 

“কারো সাথে বন্ধুত্ব কর না,এবং কখনওই কোনো মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িও না।”

রাফসান জানে না কেন ওর বাবা ওকে একথা বলেছিল। তবে সে আজ পর্যন্ত কারো সাথে বন্ধুত্বও করে নি।কোনো মেয়েকে ভাল লাগলেও এড়িয়ে চলেছে। তা সে মেয়ে যতই চেষ্টা করুক।

তবে ৪ বছর ক্যাম্পাসে থেকে তার পিছনে লেগে থাকা ভার্সিটির সেরা সুন্দরি তিথিকে সে আর নিরাশ করবে না ভাবছে। অনেকদিন বাবার কথা শুনে চলেছে সে। তবে এবার মনের কথা শুনবে।

কমনরুমের এক কোণায় তিথিকে দেখল সে, গিয়ে সবার সামনে তিথির সামনে হাটু গেড়ে বলল,” আই লাভ ইউ,তিথি।”

৫.

২২ বছর আগে,,,,,

বশীর আর শিলা বশীরের অফিস কোয়ার্টারে থাকা শুরু করেছিল। ওদের নতুন সংসার। বিয়ের ৬ মাস হয়ে গিয়েছিল তখন। দুইজনের বাবা মাই বিশাল ক্ষেপে গিয়েছিল। স্পেশালি শিলার বাবা মা,মেয়ে বিয়ের পিড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়াটা বাবা মা মেনে নেয় না।

কিন্তু একমাত্র মেয়ে,মাফ করেই দিল বাবা মা। সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। বিয়ের ৬ মাস পর,বশীর ঈদের ছুটিতে শিলাকে নিয়ে শহরে ফিরল। নিজের বাসায় গেল,তারপর গেল শ্বশুরবাড়ি।

বাড়িওয়ালার ছেলে যে কাজটা করেছে এরপর শিলার পরিবার ওই এলাকায় আর থাকে নি। বাড়িওয়ালার ছেলে ঈদের ছুটিতে শিলাদের নতুন পাড়ায় কি কাজে গেল। দেখে ফেলল শিলা বশীরকে নয়ে শহরে এসেছে।

অপূর্ব সুন্দরি শিলা যেন আগের চেয়েও বেশি সুন্দর হয়েছে।আর ওর পাশে দাঁড়ানো বশীর এখনো কুৎসিত।  বশীর ফর্সা এটা ঠিক আছে। কিন্তু বাকিটা? 

মেদে ফোলা চেহারা,পেট,বুক। পা আবার বাকা। ফিগার যেমন বাজে,দেখেই বোজা যায় গায়ে এক ফোটা শক্তিও নেই।

খোজ নিয়ে বাড়িওয়ালার ছেলে জানল বশীরের টাকা দেখে যে শিলা পটেছে তাও না,নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে,নতুন চাকরিও আহামরি না।কথার জাদুত্র পটেছে শিলা তাও না, কেমন জানি বশীরের কণ্ঠ,একটু বেশিক্ষণ শুনলে গা জ্বলে।

বাড়িওয়ালার ছেলের মাথায় সব দেখে শুনে একটা কথা সরাৎ করে ঢুকল। ব্লাক ম্যাজিক না তো?

বশীর কোনো তান্ত্রিকের কাছে ধরণা দিয়ে শিলাকে মায়া মন্ত্রে ফেলে নি তো?  হ্যা,,এটাই একমাত্র কারণ হতে পারে,, কাল জাদু করে মেয়ে পটানোর কথা সে শুনেছে,এবং এটা যে সফল তাও অনেকে বলেছে,,এটাও কি তবে সেরকম কিছু?

এক দুই সপ্তাহ ঝড়ের গতিতে ভাবল বাড়িওয়ালার ছেলে।এই সিদ্ধান্ত নিল,যে বশীর শিলাকে কাল জাদু করেই বশ করেছে।

বাড়িওয়ালার ছেলে এক তান্ত্রিকের কাছে ধরণা দিল। সে শিলাকে কাল জাদুর হাত থেকে বাচাবেই।

তারপর লাগলে নিজের জন্য শিলার মনে নাহয় একটু জায়গা করে নেবে,,,,

তান্ত্রিকের কাছে সব খুলে বলল সে, অনেক টাকা দিল। টাকা দেখে তান্ত্রিকের চোখ চকচক করল। তান্ত্রিক বলল,,”আচ্ছা আমি বিষয়টা দেখব,এর আগে আমাকে বল,,তুই কি নিশ্চিত,মেয়েটাকে কাল জাদু করা হয়েছে?”

বাড়িওয়ালার ছেলে মুন্না বলল,,”গুরুজী,আপনারে ছেলেটার ছবি দেখাব? আপনি দেখলে বুঝবেন ওই পরীর মত মেয়েটা এই ছেলেরে কোন যুক্তিতে প্রেম করে বিয়ে করে,,,”

তান্ত্রিক ছবি আনতে বলল দুইজনের। মুন্না এনে দিল।এমনকি তান্ত্রিকও সিওর হল,কাল জাদু ছাড়া এই মেয়ে এই ছেলের প্রেমে পড়তে পারে না।

তান্ত্রিক আর কিছু না চিন্তা করে বলল,,”আচ্ছা,শোন,আমি এই ছবির উপর মন্ত্র করব। আমি দুইজোড়া জ্বিন পাঠাব। এক জোড়া,এই মেয়ের উপর কাজ করবে,আরেক জোড়া ছেলের উপর। ছেলের উপরের টা এই ছেলে মেয়েটাকে যে কাল জাদু করছে,সেই কাল জাদু সরিয়ে দেবে,আরেক জোড়া ওই জাদু সরে গেলে মেয়ের মনে যে ফাকা জায়গা তৈরি হবে সেখানে তোর জন্য ভালবাসা জন্মিয়ে দেবে বুঝলি?”

মুন্না খুব খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। তান্ত্রিক রাতের গভীরে,শ্মশানের কাছে গিয়ে কিসব যেন পড়তে লাগল। শুনলে গায়ের ভিতর শিউরে ওঠে।

চারটা বিকট মূর্তি রওনা দিল  বশীর আর শিলার ঘরের দিকে।

শিলা সেদিন প্রথমবারের মত বশীরকে বলেছিল,শিলা প্রেগন্যান্ট।

অনেক আদরের পর শিলা বশীরকে বলেছিল,,”যদি আমাদের ছেলে হয়,নাম রাখব রাফসান। মেয়ে হলে,তুমি যেটা বলবা।”

শিলা ঘুমিয়ে গেল। বশির ভাবতে লাগল, মেয়ের কি নাম রাখবে।

রাতে কচর মচর শব্দে বশীরের ঘুম ভাঙল। বশীর উঠে বসল। পাশে শিলার দিক তাকাল। 

একটা বেড়াল প্রায়ই রাতে কাটা খেতে জানালা দিয়ে ওদের ঘরে আসত। ওরা কিছু বলত না বিড়াল টাকে। 

বশীর দেখল,শিলা বিছানায় বসে,বিড়ালটাকে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে।

বশীরের গলা শুকিয়ে গেল।সে গুঙিয়ে উঠল। শিলা আস্তে আস্তে বশীরের দিল ফিরল। চোখটা টকটকে লাল।মুখ বেয়ে রক্ত পড়ছে,,,,,

“খিদা লাগছে জান,অনেক খিদা,,,,,”

বশীর অজ্ঞান হয়ে গেল।

 সকালে জ্ঞান ফিরতে  সে ভাবল,হয়ত দুঃস্বপ্ন ছিল। কিন্তু উঠে দেখল,শিলা ঘাড় বাকিয়ে  দেয়ালে ঠেস নিয়ে ফ্লোরে বসা, বুকে রক্ত,পাশে বিড়ালটার চামড়া,,, ফ্লোরর পেশাব আর পায়খানা।

বশীর কাছে গেলে শিলা লাফিয়ে উঠল। ওর গলা চেপে ধরতে গেল। কিন্তু একটুপর অজ্ঞান হয়ে বশীরের বুকে ঢলে পড়ল।

বশীর শিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। শিলার জ্ঞান ফিরল না। বশীর পুরো ব্যাপারটা ডাক্তারকে বলতেও পারল না।

শিলার সেরাতে জ্বর এল। একটু জ্ঞান দিরতেই সে বলল,,”বশির,,,বশির,,,ভালবাসি”

বশির এর চোখ ফেটে পানি এল। সে কুসংস্কারাপন্ন মানুষ। সে পরেরদিন সকালেই এক হুজুরকে ডেকে নিয়ে এসে সব বলল।

হুজুর বশিরের বাসায় এল। শিলাকে কছু দোয়া পড়ে দিল। শিলার জ্বর কমে এল। তবে সেটা দোয়ায় না ওষুধে,বশির বুঝল না।

এদিকে এক সপ্তাহ কেটে গেল। শিলা ভয়ানকভাবে শুকাতে লাগল।ওর অনেক কিছুই মনে থাকছে না। আস্তে আস্তে একদম মানসিক আর শারীরিক ভাবে ভেঙে পড়ল।

এদিকে সেই হুজুর বশিরকে মসজিদে এশার নামাজের পর একদিন দাড়াতে বলে বলল,,”আমার মনে হয় তোমাদের দুইজনের উপরি কিছু আছে।”

বশির বলল,,”মানে?”

হুজুর বলল,,”মসজিদের উঠানের বাইরে দুইজন দাঁড়ানো আছে,একটা পুরুষ আরেকটা মহিলা।”

বশির বলল,,”বুঝলাম না,,,”

হুজুর বলল,,”তোমার সাথেই এরা আসছে,আমি দেখছি তবে মসজিদ বলে ঢুকতে পারে নি। তবে  ওরা ফেরত যায় নাই।মানে তোমার বউয়ের সাথে এরা নাই। তোমার বউয়ের সাথে অন্য কেউ আছে।”

বশির বলল,,”হুজুর এসব আপনি কি বলেন? আমি এখনই যাব বাসায়।”

হুজুর বলল,,”আচ্ছা,আমার সাথে চল।”

বশির হুজুরের সাথে বাসায় গেল। হুজুরকে দেখে দুইটা সাদা কাপড়ের মত কি যেন বিদ্যুতগতিতে ছুটে চলে গেল।

বশির বাসায় গেল। হুজুর আর বশির ঘরে গিয়ে দেখল। শিলা একটা ছুরি হাতে নিজের গা পোচাচ্ছে।

বশির দৌড়ে গিয়ে  শিলাকে ধরল। বশির ধরতেই শিলা অজ্ঞান হয়ে গেল।

সেরাতে হুজুর কিছু দোয়া পড়ে ওদের ঘরটাকে বেধে দিয়ে গেল।

হুজুর চলে যাবার একটু পর বশির হুজুরের চিৎকার শুনল।

বশির ভয়ে কাপতে লাগল বিছানায়। পাশে শিলা অজ্ঞান। হঠাৎ বশির জানালার বাইরে বিকট কিছু কন্ঠ শুনল।

একটা মোটা কন্ঠ বলল,,”এই ছেলে তো জাদু করে নাই।”

একটা মেয়ে কন্ঠ বলল,”তাহলে কি জাদু সরাব?”

আরেকটা পুরুষ কন্ঠ বলল,,”মুন্না মিয়ার ভালবাসা মেয়েটার বুকে কিভাবে বসাব?”

আরেকটা মেয়ে কন্ঠ বলল,,”মেয়ে তো এমনিই ভালবাসে ছেলেকে,,,, মুন্না মিয়া ভুল।”

প্রথম কন্ঠ বলল,,”ভুলের শাস্তি কি?”

বিকট একটা অট্টহাসি। একসাথে চারটা কন্ঠ বলল,,”মুন্না মিয়া আর তান্ত্রিক বাবার  কলিজা,,,,”

হাসি শুনে অজ্ঞান হয়ে গেল বশির।

পরের দিন সকালে হুজুরের ধাক্কায় বশিরের ঘুম ভাঙল। বশির উঠে বলল,,”হুজুর,রাতে আপনার চিৎকার শুনলাম যে।”

শিলা একটু নড়ে উঠল। হুজুর এক দৃষ্টে চেয়ে রইল বশিরের দিকে। বলল,,”হুজুর তোদের বাচাতে গিয়ে মরে গেছে।”

বশির হা করে চেয়ে রইল।

হুজুর এর মত জিনিসটা বলল,,”চারটা বড় পিশাচ ছাড়া হইছে তোদের পিছে। ভুল করে ছাড়ছে। যারা ভুল করছে তাদের কালকে শেষ করছে ওরা। কিন্তু তোদের ওরা ছাড়বে না। ওরা মানুষ নিয়ে খেলা পছন্দ করে,,,”

বশির তাকিয়ে রইল। জিনিসটা বলল,,”তোদের বাঁচার একটা উপায় আছে। তোর বউ গর্ভবতী, ওরা তোর বউকে শেষ করবেই,আজ রাতের মধ্যে। তুই একটা কাজ করবি, আজ বিলের কাছে যাবি,ওখানে ৭ টা তালগাছ দেখবি। ওটা জ্বিনদের কবরস্থান।   ওই কবরস্থা জিয়ারত করতে রাত ১ টায় জ্বিনের বাদশা আসে,, ৭ টা শেয়াল টানা একটা গাড়িতে চড়ে।”

বশির চুপ। হুজুররূপী জিনিসটা বলল,,”আমি হুজুরের ছাত্র ছিলাম। জ্বিন ছাত্র,আমার সামনে ওরা হুজুরকে খুন করছে। তুই এই কাগজটা রাত একটায় ওই গাড়িটা চলন্ত অবস্থায় ওতে ছুড়ে দিবি,, ”

বশির বলল,,”আচ্ছা,, ”

জ্বিনটা বলল,,”আমি তোর বউকে পাহাড়া দিব। বাদশা এই চিঠিটা পড়লে ওই চারজনকে শাস্তি দিবে। তোরা বেঁচে যাবি। পারবি তো?”

বশির বলল,,”পারব।”

সেরাতে একটার সময় বশির সাত তাল্পগাছের গোড়ায় দাড়াল। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা আসল। ৭ টা শেয়াল টানা একটা অদ্ভুত গাড়ি। কবর জিয়ারত করতে এসেছে ওই গাড়িতে করে কেউ।

হাতের কাগজটা দলা করে গাড়িতে ছুড়ে দিল বশির।

তারপর বাসায় চলে আসল।

বাসায় এসে দেখল হুজুর সেজে থাকা জ্বিনটার কাটা মাথার বড়চুল ঝুটি করে ফ্যানে বেধে রেখেছে কেউ।

নিচে শিলা দাঁড়ানো। ঘাড় বাকা,বিদঘুটে একটা হাসি।

শিলা নিজের হাত নিজের পেটের উপর নিল।

বশির বলল,,”না,না,না,দয়া কর,,আল্লাহর দোহাই লাগে।”

শিলা আঙুল গুলো নিজের পেটে ঢুকিয়ে নিজের জরায়ুটা ছিড়ে মুখের কাছে নিয়ে কামড়াতে থাকল।রক্তে ভেসে যাচ্ছে সারা মেঝে।

বশির অজ্ঞান হয়ে গেল।

৬.

রাফসান তিথিকে নিয়ে বের হল ঘুরতে। তিথি সাথে সাথেই ওর প্রেমের প্রস্তাবে সায় দিয়ে দিয়েছিল। রাফসান তিথিকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট এ গেল,পার্কে গেল।

প্রায় সন্ধ্যার দিকে রাফসান তিথিকে ওর বাসায় পৌছে দিতে গেল। 

ঠিক তখনি রাস্তার মাঝে প্রচন্ড যানবাহনের ফাকে রাফসান এমন একটা জিনিস দেখল। যা ও জীবনে কখনওই দেখে নি।

সাদা আলখাল্লা পড়া বিশাল বড় চুল,সাদা মড়ার মত ফ্যাকাশে একটা মেয়ে ঠান্ডা একটা দৃষ্টিতে রাফসান আর তিথির দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে।

রাফসান হতভম্ভ হয়ে গেল। তিথি রাফসানকে ওদিকে তাকাতে দেখে বলল,,”কি দেখো?”

রাফসান কাপতে কাপতে আঙ্গুল তুলল। তিথি বলল,,”কি?  কি দেখ?”

রাফসান বলল,,”ঐ মেয়েটা,,”

তিথি বলল,,”কোন মেয়েটা?”

রাফসান অবাক হয়ে দেখল। তিথি ওই জিনিসটাকে দেখতে পাচ্ছে না।

রাফসান তিথিকে পৌছে দিয়ে বাড়ি গেল। বাড়িতে গিয়ে দেখল ওর বাবা ঘরে নেই। রাফসানের ভয় করতে লাগল একা বাসায়। ওই জিনিসটাকে মনে পড়তে লাগল।

এদিকে তিথির মন আজ খুবই উৎফুল্ল। ওর ৪ বছরের সাধনা আজ পূর্ণ হল। রাফসান অবশেষে ওকে আই লাভ ইউ বলল।

তিথি বিছানায় শুয়ে আজকের ব্যাপারটা ভাবতে লাগল।

সাদা আলখাল্লা পরা যেই জিনিসটাকে বিকেলে ও দেখতে পায়নি।সেই জিনিসটা ওর বিছানার পাশে এসে দাড়াল। তবে মুখটা মড়ার মত সাদা না। পোড়া,,আর অনেক বড়,,,,,

তিথি কিছু বলতেও পারল না। জিনিসটা বলল,,”বশিরের ছেলের ভালবাসা,,,,,”

তিথির ছিন্নভিন্ন দেহটা বিছানায় পড়ে থাকল। কারণটাও জানতে পারল না সে।

রাফসান ওর বাসায় শুয়ে রইল। সেও ভাবছে আজকের ঘটনাগুলো।এখনো জানে না তিথির কি হয়েছে।

রাফসান ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গেল। ঘুমে দেখল সেই স্বপ্নটা,,, বিলের পাড়ে ৭ টা তালগাছ,,, একটা ভাঙা কবর,,, ভিতরে সে শুয়ে আছে,একটা রক্তাক্ত পোড়াপোড়া দেহ উকি দিচ্ছে কবরে,,ওর নাম ধরে ডাকছে।

৭.

২২ বছর আগে,,,,, 

বশির শিলার মৃতদেহ নিয়ে বসে আছে ফ্লোরে। আশেপাশে হাসির শব্দ। ভয়াবহ হাসি। 

হঠাৎ হাসিটা বন্ধ হয়ে গেল। ঘর আলোকিত হয়ে গেল।

বশির পিছু ফিরল। খোলা দরজার ওপাশে শেয়ালটানা গাড়িটা,,,,

গাড়িটা থেকে একটা ৮ ফুট লম্বা সুন্দর চেহারার একটা লোক নামল। 

বশিরের কোনো সাড়াশব্দ নেই।

লোকটা দলা পাকানো কাগজটা বের করল।গমগমে কন্ঠে বলল,,”বশির তুমি আমাকে তোমার স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে বলেছিলে। আমি পারলাম না। এর বদলে তুমি আমাকে অন্য কিছু একটা বল”

বশির স্তব্ধ। অনেকক্ষণ পর বলল,,”ওই জিনিসগুলোকে কিভাবে মারতে হয় আমাকে শিখিয়ে দেন,,,,”

লোকটা বলল,,”সে তো আমার কাজ,আমি ওদের বাদশা,ওরা আমার অপরাধী,আমি নিজে ওদের শাস্তি দেব।”

বশির বলল,,”না,,আপনি ক্ষতিপূরণ এর কথা বলেছিলেন। আমি চাইলাম। আমাকে পদ্ধতি শিখিয়ে দিন”

বাদশা বলল,,”বেশ,তাই হবে,,, ”

বাদশা আঙ্গুল সরাল। বশির মেঝে থেকে ৫ হহাত উপরে উঠে গেল। আলোকিত হাত দিয়ে জ্বিনের বাদশা বশিরের মাথায় হাত রাখল।

বশির চোখ খুলল। জ্বিনের বাদশা চলে গেছে। বশির দেখল,সে অনেক কিছু জানে,,,অনেক কিছু,,,

বশির শিলার মৃতদেহ নিয়ে গোসল করাল একা।  ৪/৫ জন মূর্খ লোক জড় করে জানাজা পড়িয়ে নিজ হাতে মাটি দিল।

শিলাকে কবর দেওয়ার রাতে বশিরের ঘরের কড়া নাড়াল কেউ।

বশির দরজা খুলল।আশ্চর্য হয়ে দেখল,তার ভয়  বলতে কিছু নেই।

দরজা খুলতে এক পা টেনে ছিড়ে ফেলা হয়েছে এরকম একটা শেয়াল কে দেখল সে। শেয়ালের মুখে একটা চিঠি,,,,

চিঠিটা পড়ল বশির,ওতে কাপা কাপা অক্ষরে লেখা,,”তোমার কথামত আমি ওদের শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম। এই সুযোগে ওরা ৪ জন আমার প্রাসাদে হামলা করেছে,আমার সন্তানদের খুন করেছে,আগুন লাগিয়ে দিয়েছে,,,, তোমার ক্ষতিপূরণ তুমি আমার ক্ষতিতে পেলে। এখন ওই ৪ জন তোমাকে শেষ করতে আসবে,,, তুমি জানো ওদের কিভাবে শেষ করতে হবে।তোমাকে আমি সব পদ্ধতি বলেছি,,,,মনে রেখ,ওদের নির্বংশ করতে হবে,না পারলে আমার রক্তের কেউ বেচে থাকলে হয়ত চেষ্টা করবে। কিন্তু মনে রেখ,ততদিনে ওরা কি কি করতে পারে,সেটা ধারণার বাইরে,,,”

বশির চিঠিটা ফেলে দিল। শিয়ালটা মরে পড়ে আছে।

বশির রান্নাঘর থেকে একটা দা এনে ওতে আয়াতুল কুরসি আরবিতে লিখতে লাগল।

হঠাৎ ও বুঝতে পারল,ওর ঘরে ও ছাড়াও আরো চারজন আছে।

সবচেয়ে বড় পুরুষটা ভয়ংকর একটা হাসি দিয়ে এগোতে লাগল।

যেই কাছে এল,বশির ওর দুই পায়ের ফাক দিয়ে দা টা সোজা উপরে চালিয়ে দিল।

একদম বিনাক্লেশে জ্বিনটার শরীর দুই টুকরা হয়ে গেল।

এটা দেখে বাকি ৩ জন অদৃশ্য হয়ে গেল। তবে বশির কোনো আগ্রহ দেখাল না,ও জানে,ওরা কোথায় আছে,,,,,

বশির ওদের দেখতে পায়,,ওরা অদৃশ্য হলে দেখতে পায়,,, পিছু নিয়ে ঢুকল একটা পোড়া বাড়িতে,, বিকট কয়েকটা চিৎকার এল।

জ্বিনদের টুকরা টুকরা দেহ,আর মনে প্রতিশোধের তৃপ্তি নিয়ে বশির যখন ফিরছিল। তখন কান্না শুনল,,বাচ্চার কান্না,,, 

বশির খুজতে লাগল। সাদা ধবধবে একটা আশ্চর্য সুন্দর ছেলে শিশু একটা দোলনায় আছে।

বশির বুঝল,,বাচ্চাটা এই ৪ জনের কারো,,, সেই ৪ জন,,যারা ওর সব কেড়ে নিয়েছে,,,,

বাচ্চাটা কাদছে। হঠাৎ বশিরের কানে বাজল,,”আমাদের ছেলে হলে নাম রাখব রাফসান,,,,”

বশিরের বুকটা হু হু করে উঠল। দা টা নামিয়ে ফেলল সে,বাচ্চাটাকে কোলে নিল,,বলল,,”রাফসান”

৮.

রাফসান পরেরদিন খবর পেল তিথির লাশ বেডরুমে পাওয়া গেছে,ওর লাশ টাকে খুবলে ফেলা হয়েছে,, 

রাফসান তিথির বাসায় যেতে চাইল। কিন্তু ঘর বাইরে থেকে বন্ধ। ওর বাবা এখনো বাসায় আসে নি।

রাফসান পিছনে ফিরল। সাদা আলখাল্লা পরা যে জিনিসটাকে কালকে সে দেখেছে সেটা ঠিক ওর পিছে দাঁড়ানো। প্রথমে চমকে উঠলেও সে অবাক হয়ে দেখল,সে ভয় পাচ্ছে না।

জিনিসটা একটা থাবা দিল রাফসানকে।  কিছুই হল না তার। রাগের চোটে রাফসান ধাক্কা দিল জিনিসটাকে,ছিটকে পড়ল সেটা।

অবাক হয়ে জিনিসটা বীভৎস রূপ ছেড়ে খুবই সুন্দর একটা মেয়ের রূপ নিল। বলল,,”ভাই?”

রাফসান বলল,,”কি?”

মেয়েটা বলল,,”তুই আমার ভাই?”

রাফসান বলল,,”মানে?”

মেয়েটা বলল,,”তারমানে বশির আহমেদ তোকে খুন করে নি। নিজের ছেলের মত মানুষ করেছে।”

রাফসান চুপ করে রইল। 

মেয়েটা বলল,,”বশির আমাদের মা বাবা আর চাচা চাচীকে মেরে ফেলেছিল।আমি তখন ছোট,সব বুঝতে পারি। আমি ঘরের বাইরে থেকে সব দেখেছি। এরপর দেখেছি ও তোর কাছে গেল,,,তারপর আমি অদৃশ্য হয়ে গেলাম।তারপর অপেক্ষা করলাম,,বশিরের সব শেষ করব,,ওর পরিবার,,ওর পরিবারের বন্ধু,,সবাইকে,,,”

রাফসান কি বলবে বুঝছিল না। আশ্চর্য একটা পরিস্থিতি।

এদিকে বশির আহমেদ দাঁড়িয়ে আছে বিলের পাড়ে ৭ টা তালগাছের কাছে,,,,,

ভাঙা কবর থেকে পোড়া আর রক্তাক্ত জিনিসটা বের হয়ে ওর কাছে এল বুকে ভর দিয়ে।

বশির বলল,,”বাদশা,ছেলেটাকে স্বপ্নে কাছে আনার চেষ্টা করে লাভ কি? আপন ওকে ছুতে পারবেন না। ওকে আমি অস্পৃশ্য করে রেখেছি। আপনি কারো মাধ্যমেও ওর ক্ষতি করতে পারবেন না।”

বাদশা বলল,,”বেইমান,তুই কথা দিয়েছিলি ওদের নির্বংশ করব,তোর দাবি মেটাতে গয়ে অসতর্ক হওয়ায় ওরা আমার পুরো বংশ শেষ জরে দিয়েছে,আমাকে পুড়য়ে রক্তাক্ত করে এ অবস্থা করেছে,,আর তুই ওদের ছেলেকে নিজের ছেলে করে মানুষ করছিস?”

বশির বলল,,”ও বাচ্চা ছিল। বাচ্চারা কারো শত্রু না। এছাড়া ওর চেহারাটা আশ্চর্যজনকভাবে শিলার মত ছিল,,,”

বাদশা বলল,”বলদ,,তোর হাত থেকে ওকে বাচাতে মরার আগে ওর মা মন্ত্রবলে ওর চেহারা অমন করে দিয়েছিল। সেই মন্ত্র ওদের রক্তের কেউ ছাড়া কেউ ভাঙতে পারবে না। ওই  মন্ত্র ভাঙলে ও ওর আসল রূপ দেখাবে তোকে,,ওদের রক্তের মায়াদয়া নেই।তুই তো ভুক্তভোগী, ভুলে গেছিলি?”

বশির বলল,,”জানতাম আমি,সবই জানতাম,,,তাও আমি ওর বাবা হয়ে গেছি,ও আমার ছেলে,আশ্চর্য এক মমতা,,, ওই মন্ত্রের বলেই হয়ত ও আমাকে ভালবাসে,বা মন্ত্রটা বাধ্য করে ওকে ভালবাসতে মন্ত্রটার ধারণা, ওটা ভেঙে গেলে আমি ওকে মেরে ফেলব। ভুল,,,ওকে আমি মারতে মারব না।কখনো না।”

বাদশা বলল,,”আমি যতদিন বেচে আছি।ওকে শেষ করার চেষ্টা করেই যাব।”

বশির বলল,,”সেজন্যই তো আম আসলাম এখানে,যে আমাকে এই বিশেষ শক্তি দিল। সে হবে আমার ২৩৮ তম শিকার।”

বাদশা কিছু বলার আগেই,বাদশার গলাটা কেটে ফেলল বশির।

বাসার দিক রওনা দিল বশির।

কিন্তু ও জানে না বাসায় কি হচ্ছে।

৯.
রাফসানের বোন বলল,,”আমি বুঝেছি ভাই,একটা মন্ত্র দেখতে পাচ্ছি। বশির তোকে ছেলে হিসেবে রাখে নি। মা মনে হয় তোকে বাচাতে একটা মন্ত্র পড়ে দিয়েছিল।বশির তোকে কৃতদাস করে রেখেছে।”

রাফসান পিছাতে পিছাতে বলল,,”আমার কাছে আসবে না,,খবরদার আসবে না।”

রাফসানের বোন বাতাসের ভেসে এসে রাফসানের কানে কি যেন বলল,,,

রাফসানের সারা শরীরে যন্ত্রণা শুরু হল। প্রচন্ড যন্ত্রণা। অসহ্য চিৎকার শুরু করল সে। টের পেল,শরীরে তার প্রচন্ড শক্তি এসে গেছে,,,,

দরজাটা ঠাস করে খুলে গেল। বশির আহমেদ দাঁড়ানো দরজায়। রাফসান চিৎকার করছে প্রচণ্ড চিৎকার।

বশির ছুটে ওর কাছে আসতে চাইল। মেয়েটা অসতর্ক পেয়ে বশিরকে ছাদের দিক ছুড়ে ফেলল। 

বশির মেয়েটার আসল চেহারা দেখতে পেল। বুঝল ও কে। বাদশার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলল। মন্ত্র ভেঙে যাচ্ছে,রাফসানের পিশাচিনী মায়ের দেওয়া মন্ত্র।

দা দিয়ে বশির মেয়েটার দিকে ছুটে গেল। তখনি মেয়েটা বিকট কন্ঠে বলল,”ভাই, ও আমাদের পরিবারটা ধ্বংস করে দিয়েছে,,ওকে মার।”

রাফসান বিশাল নখওয়ালা লোমশ হাত দেয়ালে ঢুকিয়ে দিল। একটা রড টেনে বের করল।

বশির যখনি রাফসানের বোনের ঘাড়ে দায়ের কোপ দিল। রাফসান তখনি রডটা বশিরের বুকে ঢুকিয়ে দিল।

রাফসানের বোন পাশে মরে পড়ে রইল।

বশির এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল রাফসানের দিকে। রাফসানও তাকাল বশিরের দিকে। রাফসানের হঠাৎ খেয়াল হল,লোকটার উপর বিন্দুমাত্র রাগ তার নেই। বরং তাকে কষ্ট পেতে দেখে বুকটা হু হু করে উঠছে,,,,

রাফসান বলল,”এটা আমি কি করলাম বাবা?”

রাফসান ভয়ের সাথে দেখল,বশিরের দেহ নড়ছে না। এটাও শুনল,তার গলা থেকে যে কথাটা এল, সেটা ঠিক মানুষের গলা না।

গণ্ডগোল শুনে পাশের বাসার রাফসানের উপর ক্রাশ খাওয়া মেয়েটা জানালা দিয়ে উকি দিল। রাফসান জানালার দিক তাকাল। মেয়েটা ভয়ংকর একটা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।

রাফসান আয়নার কাছে গেল। দেখল,বিকট মেরুদণ্ড ঠান্ডা করা এক বীভৎস পিশাচ আয়নার দিক থেকে প্রতিবিম্ব হয়ে আছে,,,

রাফসান ভয়ে আতংকে ওর তিনটা চোখই বন্ধ করে ফেলল।

গল্প ৯২

​”অর্জুনবধ”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১. 

“মানুষের মনে সামান্য একটু ভয় ঢুকিয়ে দাও,তারা সেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আতংকের সৃষ্টি করবে।”

অর্জুন ভট্টাচার্যের রাজনীতিতে অভিষেক অনুষ্ঠান।অভিষেক করিয়ে স্থানীয় এম পি নাসির মোল্লা চলে গেলেন গাড়িতে করে।

অর্জুন ভাষণ দিচ্ছে,”আপনাদের সবার আশীর্বাদে আমি আজ থেকে জীবনের সবচেয়ে বড় এক চ্যালেঞ্জ নিলাম। রাজনীতিতে নামলাম। সুস্থ রাজনীতির জন্ম নিল আজ বাংলাদেশে,তারিখটা আপনারা লিখে রাখেন”

জনসভা থেকে একটা একটা করে লোক সরছে,,,,যারা সরে যাচ্ছে,সবাই অর্জুনের লোক। একদম মাঝে যারা দাঁড়িয়ে আছে,তারা শহরের বস্তিগুলোয় থাকে,২০০ টাকা করে দিয়ে জনসভায় লোক দেখাতে আনা হয়েছে, আজ এখানে ওদের জীবন শেষ হবে। জীবনের দাম ২০০ টাকা। 

ইন্সপেক্টর সাইফ তার নেতৃত্বে ২০ জন পুলিশ অফিসার নিয়ে দাঁড়িয়ে জনসভার শেষপ্রান্তে। তার আর নাসির মোল্লার ব্যবস্থায় নিষিদ্ধ এক জঙ্গিসংগঠন এর গাড়ি এসে দাড়াল,মাঠের আরেক প্রান্তে,,,

আরো একজন করে লোক সরে যাচ্ছে জনসভা থেকে। মাঝের বস্তির লোকেরা ভাবছে,২০০ টাকায় ফার্মের মুরগি কিনে যাবে আজ বাসায়,দুইমাস পর মাংস খাবে।

অর্জুন বলছে,”আমি কিন্তু আসতে চাই নি রাজনীতিতে,আপনারা মাটির মানুষেরা আমাকে এমনভাবে জোর করলেন,আপনাদের মুখের উপর  না কিভাবে বলি বলেন?”

সাইফ ব্যাগ থেকে গতু জবাইয়ের ছুরি বের করল। এমনই কথা হয়েছে নাসির মোল্লার সাথে।জঙ্গিরা যাতে অর্জুনকে না মারে,অর্জুনকে সে নিজ হাতে মারবে,,,,

জনসভায় অর্জুনের শেষ লোকটা চলে গেল। সেখানে আছে এখন বস্তির কয়েকজন লোক,আর ইন্সপেক্টর সাইফের  নেতৃত্বে ২০ জন পুলিশ অফিসার। 

জঙ্গিরা মাঠে ঢুকল,একপাশ থেকে না,চারপাশ থেকে,সাইফের অধস্তন এক অফিসার বলল,,”স্যার,ওদের না শুধু উত্তর দিক থেকে ঢোকার কথা?”

সাইফ আশেপাশে তাকাল। মানে কি?

অর্জুন ভাষণে হঠাৎ বলে উঠল,,”কিরে দুর্যোধন, কেমন লাগে?”

সাইফ তাকাল অর্জুনের দিকে। হঠাৎ চারপাশ থেকে বৃষ্টির মত গুলি আসতে লাগলে,সাইফ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। আশেপাশে মানুষ এর আর্তনাদ তার কানের ভিতর থেকে মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে ঢুকে গেল। ২০ জন অফিসার,প্রায় ১০০ জন বস্তর লোকের রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন দেহের নিচে চাপা পড়ল ইন্সপেক্টর সাইফ।

সেইদিনের প্রত্যেকটা মৃতের আর্তনাদের শব্দে লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসল সাইফ। তার বেডরুমটা অন্ধকার। জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল সে।

বালিশের নিচ থেকে রিভলভারটা বের করে নিজের মাথায় ঠেকিয়ে সাইফ বলতে লাগল,,”এখান থেকে বের হয়ে যাও,,, আমাকে একটু ঘুমাতে দাও।”

মাথার ভিতর থেকে কে যেন বলল,”ট্রিগারটা টেনে দাও।শান্তির একটা ঘুম আসবে,,,”

সাইফ রিভলভারটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল।সেই অভিশপ্ত দিনটার স্মৃতি তার মাথা থেকে সরছে না। নাসির মোল্লা আর অর্জুনের ষড়যন্ত্রে সৎ কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে অর্জুনকে মারতে যায় সে। প্রতিশোধ নিতে যায় নিজের স্ত্রী হত্যার। কিন্তু সবটাই অর্জুনের প্লান ছিল। সে দেখতে চেয়েছিল পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এ কয়টা অফিসার আছে,যারা তার বিরুদ্ধে যাবে,তাদেরকে মেরে ফেলতে এই প্লানটা করে।

অর্জুনের লোকদের উপর কড়া নির্দেশ ছিল,১০০ বা ২০০ যতজনই মরে না কেন,সাইফকে যাতে বাচিয়ে রাখা হয়,সাইফকে আরো অনেক কষ্ট দেবে সে। পাগল বানিয়ে তারপর মারবে।

সব শুরু হয়,বিশিষ্ট দানশীল এবং সমাজসেবী অর্জুনের মুখোশের আড়ালে থাকা ভয়ংকর সন্ত্রাসী এবং স্মাগলার রূপটা তদন্ত করে বের করে সাইফ তাকে তার বিয়ের পিড়ি থেকে তুলে গ্রেফতার করে মিডিয়ার সামনে থেকে।

অর্জুনের যা পাওয়ার আছে,তাকে বাংলাদেশের কোনো জেলেরই আটকে রাখার ক্ষমতা নেই। কিন্তু বিয়ের পীড়ি থেকে এভাবে তাকে তুলে আনায়,তার প্রেমিকাকে লগ্নভ্রষ্টা বানানোয়,মিডিয়ার সামনে তাকে অপমানিত করায় অর্জুন সাইফকে পার্সোনাল্লি ধ্বংস করার  ব্রত হাতে নেয়।

অর্জুন সাইফের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে,সাইফের অধীনস্ত ২০ জন অফিসারকে মেরে ফেলে,মিডিয়ার সামনে সাইফকে হাস্যস্পদে পরিণত করে,,,,

কিন্তু মেরে ফেলে না,,, সাইফকে আরো ধ্বংস হতে চোখে দেখে তৃপ্তি নিতে চায়।

তারপর একদিন শোনে সাইফকে ২ মাসের জন্য মানসিক চিকিৎসার জন্য চাকরি থেকে বেতনসহ সাসপেন্ড করা হয়েছে, তখন সিদ্ধান্ত নেয়,যথেষ্ট হয়েছে,এবার সাইফকে মরতে হয়।

সাইফকে খুন করতে লোক পাঠায় অর্জুন। সাইফ বুঝতে পেরে পালিয়ে যায়,তবে অর্জুনের জন্য একটা বার্তা লিখে যায়।

চিরশত্রু বলে অর্জুন সাইফকে অভিহিত করেছিল দুর্যোধন বলে,মহাভারতের কাহিনী অনুযায়ী, সাইফ পালানোর আগে মহাভারতে দুর্যোধনের বিখ্যাত উক্তিটি ছুরি দিয়ে টেবিল কেটে লিখে যায়,, “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী”

বিছানায় বসে সাইফ এই কথাগুলোই ভাবছিল। দুঃস্বপ্ন দেখে বড্ড তেষ্টা পেয়েছে তার। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে মুখে নিতে যায় সে,, দেখে,গ্লাসে মানির বদলে রয়েছে রক্ত।

বিছানার আশেপাশে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন রক্তাক্ত দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১০০ লোক,এদের মধ্যে সেই পুলিশ অফিসাররাও আছে।

রক্তমাখা সেদিনের নিহত লাশেরা এক দৃষ্টে সাইফের দিক তাকানো।

সাইফ জানে এগুলো তার দৃষ্টিভ্রম। এও জানে একটু পর এই লাশগুলো তার দিক আঙ্গুল তুলে বলবে,,”তোর জন্য,,সব তোর জন্য,,,”

অর্জুন যেদিন এই নিরাপরাধ মানুষ গুলোকে মেরে ফেলেছিল শুধুমাত্র সাইফের সাথে খেলা করার জন্য,সেরাত থেকেই এই লাশগুলো আশে সাইফের কাছে,পাগলের ওষুধ খেলে একটু কম দেখে,ওষুধের ক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে এরা বারে বারে আস্ত্র থাকে।

প্রথমদিকে এই লাশগুলোকে দেখলে সাইফ আর্তনাদ করত,রিভলভার নিয়ে দিগবিদিক গুলি করত,এটা জানার পরই তাকে ২ মাসের বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে চাকরি থেকে।

তবে সাইফ জানে,২ মাস কেন,২ যুগেও এই লাশগুলো তার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করবে না,,,,

কারণ যার জন্য এদের মরতে হয়েছে,সে অত্যন্ত সম্মানের সাথে মানুষের ভালবাসায় বহাল তবিয়তে আছে।

অর্জুনের বাংলাদেশে কোনো হেটার নেই। সাইফ যে ওকে সন্ত্রাসী বলে প্রমাণ দেখিয়ে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তার কোন ভিত্তি নেই এখন। সাইফ মানসিক ভারসাম্যহীন। সবাই জানে এখন এটা।

অর্জুনের অসাধারণ প্লানের মাধ্যমে জনসভার শ’কয়ের লোকের হত্যা এখন সারাদেশে এক জঙ্গিগোষ্ঠীর কাজ হিসেবেই পরিচিত। আসল ঘটনা জানে সাইফ আর এম পি নাসির মোল্লা,কিন্তু নাসির মোল্লা অর্জুনের কেনা গোলাম,আর সাইফ পাগল।

অর্জুনের জউ সারাদেশে,তাকে হত্যার বৃথাচেষ্টার দায়ে অসংখ্য মাদ্রাসা ছাত্রকে বিনাবিচারে জেলে পোরা হয়েছে। সব শান্ত এখন।

ইন্সপেক্টর সাইফ আবার ঘুমিয়ে গেল। লাশেরা তার বিছানার আশেপাশে দাঁড়িয়ে বলছে,,”তোর জন্য,,সব তোর জন্য,,,”

২.

বিশাল বাড়ির ড্রয়িংরুম।  থমথমে পরিবেশ চারপাশে। কেষ্ট মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সামনে সিংহাসনের মত চেয়ারে বসে আছে অর্জুন ভট্টাচার্য।

কেষ্ট বলে,”দাদা,বুঝতে পারি নি শালা কিভাবে পালাল”

অর্জুন ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,,”হুম”

কেষ্ট বলে,”দাদা,ও তো আর ওর বাসা ছেড়ে পালায়নি। বাসা তো চিনি।বাসায় গিয়ে শেষ করতে পারব।”

অর্জুন বলল,,”হারামজাদা আমার পুরো ইতিহাস,সেই কলকাতায় কি কি করেছি সব জানে,,যা যা করেছি,,আমারও মনে নাই,সেসবও জানে,যেরাতে ওর বউরে মারলাম,সেরাতে ওর ল্যাপটপটা নিয়ে এসেছিলাম। আমার নামে টোটাল একটা ডিস্ক আছে। এখন সেই সব প্রমাণের কপি যদি ওর কাছে থাকে,,,”

পাশ থেকে সাইদুর বলল,,”দাদা ও তো পাগল। ও যাই বলবে সবাই ওকে পাগলের প্রলাপ ভাববে। আপনি ভাববেন না”

অর্জুন বলল,,”ভাববে,,যার ভাবার ঠিকই ভাববে,আমি আমার ইতিহাস কাউকে জানাব না সাইদুর,আমার ইতিহাস কেউ জানে না,, তুই নাহয় বাংলাদেশে এসে কি কি করেছি তা জানিস,আমার বাপ সারাদিন মনফিরে পড়ে থাকত,আমি কি করি ভ্রুক্ষেপ করত না,,মাও তেমন,,তারাও কিছু জানে না। সেই অর্পনা দাস আর শুভম সেনকে মেরে বাংলাদেশে এসেছিলাম পালিয়ে,, এখন যদি ভারতে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করিস ও ব্যপারে,,আকাশ থেকে পড়বে,,সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। কিন্তু এই ছেলেটা,,এই ইন্সপেক্টর সাইফ,আমার সব বের করে ফেলল মাত্র কয়েক সপ্তাহে,,,নাহ,,ওর মুন্ডু না দেখে স্বস্তি পাচ্ছি না।”

কেষ্ট বলল,,”দাদা,আরেকবার যাই। এবারে মুন্ডুটা নিয়ে আসবই।”

অর্জুন বলল,,”আচ্ছা টেবিলটায় কি দেখেছিলি? একদম ফাকা? না কিছু রেখে গেছে?”

কেষ্ট বলল,,”ছুরি সিয়ে ট্রবিলে এবড়োখেবড়ো দাগিয়েছে দাদা,কি যেন লেখা,,কি মেদিনী না পেদিনী,,,”

অর্জুনের বুকটা ধড়াস করে উঠল। শেষবারে হাসপাতালে সাইফকে থ্রেট  দিতে গিয়ে তার ঠান্ডা চোখের কথা মনে পড়ল। মনে কু গাইল। খালি মনে হতে লাগল,,”দুর্যোধন,, ”

অর্জুন বলল,,”কেষ্ট,এই সপ্তাহের ভিতরে আমি ওর মাথা চাই। ওকে ২ মাসের বিশ্রাম দিয়েছে ডিপার্টমেন্ট। এরমধ্যেই ওকে শেষ করে আগের অফিসারের মত কুচি কুচি করে মাছকে খাওয়াতে হবে। যেন দুইমাস পরে হঠাৎ নাই হয়ে যায় ও।ওর অস্তিত্ব যাতে না থাকে।”

কেষ্ট আচ্ছা দাদা বলে চলে গেল। সাইদুর এবার সামনে এল, বলল, “দাদা, থাইল্যান্ডে ইয়াবা টানা মানুষ দেখলেই মেরে ফেলে,তাই ওদের ইয়াবা কমদামে মিয়ানমারে আসছে,মিয়ানমারে লোক কম। বেশীরভাগ ওরা খুচরো করে চাটগা সীমান্ত দিয়ে ঢুকায়।ভারতের সীমান্ত এখনো টের পায় নাই।যারা পায়,তারা সংঘবদ্ধ না। এই সুযোগে ওটা হাতাতে পারি আমরা।”

অর্জুন বলল,,”দিনাজপুর থেকে চাটগা সীমান্তের মাদক আমদানি রিস্কি,পথিমধ্যেই সব লোপাট হয়ে যাবে।”

সাইদুর বলল,,”লাভজনক ছিল বস,উপমহাদেশে আমরাই তাহলে একনম্বর ডিলার হতাম”

অর্জুন বলল,,”আচ্ছা আমি ভাবছি”

সাইদুর দাঁড়িয়ে রইল।

অর্জুন হঠাৎ বলল,,”সাইদুর,গোপাল দাস আমাকে বলল, কলকাতায় নাকি বাংলাদেশি মেয়েদের খুব চাহিদা। এমনকি দিল্লি আর মুম্বাই থেকে মেয়ে নিয়ে যায় ধনীরা,ক্রীতদাসী হিসেবে। সাপ্লাইটা বাড়াতে হবে।”

সাইদুর বলল,,”আচ্ছা দাদা”

অর্জুন বলল,,”আমাদের মালের কদর বাড়ছে,বস্তি থেকে মেয়ে নিবি না,,ভাল ঘর থেকে নিবি। আর শোন কেউ যাতে উচ্চবাচ্য না করে,এমন পরিবার ধরবি,যেখানে পুরুষ কম। বড় পুরুষ নাই,মেয়ে উঠিয়ে নিবি। আড্ডায় নিয়ে ভয়টয় দেখিয়ে অভিনয় করাবি,ভিডিও বানাবি। আমেরিকান পর্ন ইন্ডাস্ট্রি তেও আমাদের গ্রাহক বাড়ছে। আর খবরদার,হাউকাউ যাতে না হয়,,আমার কান পর্যন্ত যাতে হাউকাউ না আসে।আমি ঈদে গরীবদের কাপড় দেব,মিডিয়া আনবি।”

সাইদূর বলল,,”আচ্ছা বস,বস আরেকটা কথা,ফেন্সিডিল আনার সময় আমাদের দুইজন বিজিবির কাছে ধরা খাইছে সীমান্তে।”

অর্জুন বলল,,”কয়েকটা বাচ্চারে ধইরা কাটাতারের বেড়ার কাছে রেখে আসবি। হাতে খেলনা পিস্তল আর পটকা দিবি। বাকি কাজ বি এস এফ করে দেবে। বিজিবি তখন ব্যস্ত হয়ে যাবে,এর ফাকে গিয়ে যারা ধরা খাইছে তাদের ছুটিয়ে আনবি।”

“আমার একটা ব্যবসাও যাতে ডাউন না খায়। রাজনীতি তে নাম দিছি,নিনে দেখতে পারব না অনেক কিছু। যা যা করবি নিজ দায়িত্বে করবি। ছোট ছোট ব্যপারে আমাকে টানবি না।”

সাইদুর মাথা নিচু করে চলে আসল।

৩. 

নাসির মোল্লা তার অফিসে অর্জুনকে তলব করেছে। গাড়িবহর নিয়ে অর্জুন যাচ্ছ্র দেখা করতে। মনে হালকা ঘৃণা,আর মাত্র ২ বছর। এরপর সংসদ নির্বাচন এলেই নাসির মোল্লাকে খুন করাবে সে।মনোনয়ন নেমে এই আসনে। ততদিনে জনপ্রিয়তা আরো বাড়াবে। বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় জিতবে। তারপর মন্ত্রী হবে সে,হবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা,কোনো এক বিরোধীদলের গন্ডগোলের একফাকে প্রধানমন্ত্রীকে মেরে ফেলবে লোক দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীকে মারার জন্য বিনা বিচারে ছাত্র আর যুব সংগঠন সারা দেশের বিরোধী দল নিধন করবে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান মন্ত্রী হয়ে নির্বাচন দেবে সে, বিনা ভোটে দল জিতবে, ভারপ্রাপ্ত থেকে স্থায়ী প্রধানমন্ত্রী বানাতে বাধ্য করবে সংসদকে।

বাংলাদেশের রাজা হবে অর্জুন। যে রাজত্বে কোন দুর্যোধন নেই।

ভাবতে ভাবতে স্বপ্নালু চোখে অর্জুন জানালার বাইরে তাকাল। 

ইন্সপেক্টর সাইফ ফুটপাতের উপর দাঁড়ানো,একদৃষ্টে অর্জুনকে দেখছে,মুখে একটা ঠান্ডা হাসি।

অর্জুনের গলা শুকিয়ে গেল। বুঝল না কেন,বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্মাগলার র‍্যাকেটের নেতা সে,মাদক চোরাচালান,নারীপাচার,শিশুপাচার,এত বড় একটা রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয় নেতা,,,কিন্তু একটা “কেউ না” মানুষের মুখের ঠান্ডা হাসি দেখে বুকটা ছ্যাঁত করে কেন উঠল?

অর্জুন নাসির মোল্লার অফিসে গেল। নাসির মোল্লা তার অফিসে পায়চারি করছে।অর্জুন বলল,”স্যার,ডাকলেন কেন? পার্টির মিটিং তো মাসের শেষে,,,”

নাসির বলল,,”বসো অর্জুন,কথা আছে”

অর্জুন বসে বলল,,”কি হয়েছে স্যার”

নাসির বলল,,”ইন্সপেক্টর সাইফকে তুমি মারো নি?”

অর্জুন বলল,,”লোক পাঠিয়েছি, কেন স্যার?”

নাসির বলল,,”আমি জানি,তুমি ছেলেটার সাথে খেলতে পছন্দ কর,প্রতিশোধ নিচ্ছ তোমাকে বিয়ের পিড়ি থেকে সবার সামনে তুলে নেওয়ায়।কিন্তু আমার মনে হয়,ওকে নিয়ে আর সময় নষ্ট না করে,ওকে শেষ করে দাও”

অর্জুন বলে,,”বলেন তো স্যার কি হয়েছে?”

নাসির বলল,,”তুমি তো জানো,আমি তোমাকে প্রায় ৫ বছর ধরে আগলে রেখেছি,বিভিন্ন কাজে তুমি আমার লেগেছ,ভোটে জিততে সাহায্য করেছ,বিরোধী দলের নেতাকে গুম করে দিয়েছ।তোমাকে আমি এমনভাবে লুকিয়ে রেখেছি, যাতে তোমার লোকের খুন,অপহরণ, কিছুই মিডিয়ায় যায় না। মানুষ দিনাজপুরকে শান্তির শহর এজন্য বলে।

“তুমি জানো,আমার অফিসের সামনে অভিযোগ বাক্স আছে,ওই বাক্স আমরা চেক করি প্রতিদিন। অভিযোগ বাক্সতে আমার প্রশংসা করে মানুষ,আমার ভাল লাগে পড়তে।কালভেদ্রে কেউ কোনো বিষয়ে অভিযোগ করলে,সেই অভিযোগ মিডিয়া জানার আগেই অফিসের সামনের সিসিটিভিতে ধারণ করা লোকটাকে গুম করে দিই”

“কিন্তু আজ দেখো,,এই খামটা এসেছে,,,”

অর্জুন খামটা খুলল। টাইপ করা একটা বাক্য লেখা,, “জনসভার অতগুলো মৃতরা আপনার আগমনের শুভেচ্ছা জানাতে ফুল নিয়ে দাড়িয়েছে।”

অর্জুন বলল,,”ফাজলামি করে কেউ লিখতে পারে। সিসি ক্যামেরায় কাউকে দেখলেন?”

নাসির বলল,,”এক টোকাইকে দেখেছিলাম,ও বলতে পারল না কে দিয়েছে”

অর্জুন বলল,,”কোন সরকারবিরোধী আহম্মক হয়ত। চিন্তা করেন না”

নাসির বলল,,”দেখো অর্জুন,জনসভায় হামলার ব্যাপার এ তুমি আর আমি জানি শুধু,আর জানে সাইফ। আমাকে হুমকি কে দিতে পারে বুঝেছ?”

এখানে আসার পথে অর্জুনের ইন্সপেক্টর সাইফের দাঁড়িয়ে থাকার কথা মনে পড়ল।অর্জুন পাত্তা দিল না। বলল,,”সাইফকে আজ আমার লোক শেষ করে দেবে। ওর লাশ কুচি কুচি করে আমার ঘেরের মাছকে খাওয়াব।চিন্তা করবেন না।”

নাসির বলল,,”দেখ অর্জুন,আমার কথা সামনে আসতে আমি দেব না। সাইফ বেচে থেকে কোন ঝামেলা করলে,আমি ভাল করেই জানি কিভাবে নিজে বাঁচব। তোমাকে এতদিন আড়াল করে এসেছি।নিজে তোমাকে মিডিয়ার সামনে তুলে দেব।”

অর্জুন দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। বের হয়ে গেল সে। গাড়িতে বসে কেষ্টকে ফোন দিতে লাগল,ফোন ধরে না কেষ্ট।

রাতে অর্জুনের এক সিকিউরিটি গার্ড একটা প্যাকেট এনে বলল,”একটা বাচ্চা বলল,কেষ্ট দা আপনাকে এটা পাঠিয়েছে,আমরা স্কান করে  দেখেছি।বোম নেই।”

অর্জুন ওর বেডরুমে বসে পার্সেলের র‍্যাপার খুলতে লাগল। র‍্যাপার খুলতেই নিচে তাজা রক্ত চুইয়ে পড়তে দেখল।

একটা বড় শ্বাস নিয়ে অর্জুন ভাবল,কেষ্ট সাইফের মাথা পাঠাল এভাবে?

প্যাকেটটা খুলেই অর্জুন ভয়ংকর একটা চিৎকার দিয়ে উঠল।

অনেক দূরে ইন্সপেক্টর সাইফ আজ একটা শান্তির ঘুম দিল। পাশে গরু জবাইয়ের ছুরি,যেটা সে অর্জুনকে মারতে বানিয়েছিল। 

আজ তার করে সেদিনের জনসভার কোন রক্তাক্ত লাশ নেই।তবে রুমের ফ্লোরে রক্ত আছে।তবে এ রক্ত কাল্পনিক না।

কেষ্টর মাথাবিহীন শরীরটা পড়ে আছে ফ্লোরে। আর ওর চার সঙ্গীর লাশ। তাদের ঘাড়ে অবশ্য মাথা আছে।

৪.

কেষ্টর মৃত্যুতে অর্জুন কেপে উঠল। বাংলাদেশে নিজের আন্ডারওয়ার্ল্ড এর রাজত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যারা বিশ্বস্ত চাকর ছিল,তাদের অন্যতম ছিল কেষ্ট। বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাউকে খুন করতে হলে কেষ্টর উপর দায়িত্ব দিত অর্জুন।  

অর্জুন বুঝতে পারল খুনটা কে করেছে। মিডিয়াকে আগেই না জানিয়ে নিজের পোষা পুলিশ আর গুন্ডা পাঠাল অর্জুন পুলিশ কোয়ার্টারে একদম কোনার ঘরটায়,,সাইফ আর সাইফের স্ত্রী যেখানে উঠেছিল।

কিন্তু দরজায় তালা ছিল। দরজা ভেঙে ঢুকতে সাজানো গোছানো পরিষ্কার ঘর দেখল সবাই।

সাইফকে পাওয়া গেল না। সেরাতে অর্জুন ওর ড্রয়িংরুমে চেঁচামেচি শুনল। ও যে ঘেরের মালিক,তার ম্যানেজার এসে চিল্লাচ্ছে আর সাইদুরের সাথে গালাগালি করছে। অর্জুন হাঁকল,,”কিরে?”

ম্যানেজার বলল,,”দাদা, আপনার লোকেরা এতদিনে কি জানে না যে লাশ গুম করতে,টুকরা করে সব ঘেরে সমানভাবে ফেলতে হয়? আজ ৫ টা বডি টুকরা করে একটা ঘেরে ফেলেছে,,পানি টকটকে লাল হয়ে গেছে,মাছ মরে ভেসে উঠেছে,মানুষকে ঢুকতে দিই নি।কিন্তু দেখে ফেললে কি হত দাদা?”

অর্জুনের বুক ধড়াশ করে উঠল। সাইফ তদন্তের সময় জেনেছে ও কাউকে খুন করে লাশ ঘেরে ফেলে দেয়,কেউ জানে না। ওর নিজের লোকের লাশ এভাবে সাইফ ওরই ঘেরে এসে ফেলে দিয়েছে।

অর্জুনের গলা শুকিয়ে গেল।একটা সৎ পুলিশ অফিসার,জীবনে যে আইন হাতে নিয়ে কোনো অপরাধীকে মারে নি,একটা গুলি খরচ করে নি। সে নিঃসংকোচে মানুষ খুন করে ঠান্ডা মাথায় নিষ্কাশন করছে।

অর্জুন পরেরদিন মিটিং ডাকল।ওর দলে যত পেশাদার খুনি আছে,প্রত্যেককে লাগিয়ে দিল ইন্সপেক্টর সাইফকে খুন করতে। এসব খুনিরা অর্জুনের বড়বড় চোরাচালান গার্ড দিত।

এদিকে পেশাদার খুনিগুলো যখন দিনাজপুরে সাইফকে খুজছে। সাইফ তখন অর্জুনের যেসব ব্রাঞ্চে চোরাচালান হয়,সে সব ব্রাঞ্চের অর্জুনের প্রাক্তন প্রতিপক্ষ গ্রুপকে বেনামে উসকে দিল,যেসব ভয়ংকর লোকের ভয়ে তারা অর্জুনের স্মাগলিং এর ধারেকাছে ঘেষত না,তারা সাইফকে খুনের জন্য দিনাজপুরে।

অর্জুনের এই বিশাল বোকামির জন্য,ছোটোখাটো স্মাগলিং গ্রুপগুলো একসাথে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা অর্জুনের প্রত্যেকটা চোরাচালানে গিয়ে লুট করে নিল। অনেক টাকার মাদক আর নারী অর্জুনের বেহাত হয়ে গেল।

অর্জুন পাগল হয়ে গেল। রাজনীতিতে জড়ানোর পর এসব ছোটোখাটো বিরোধীদের অর্জুন আমলেই নিত না। ওর হয়ে সাইদুর এগুলো সামলাত।  সাইদুরেরও ধারণার বাইরে ছিল এই আক্রমণ।

শুধুমাত্র আদরে কেষ্ট মরে যাওয়ায় আর নাসির মোল্লার  হুমকিতে মাথা গরম করে সাইফিকে মারতে শক্তিশালী কিছু লোককে নিয়োগের সুযোগেই এই ক্ষতি হয়ে গেল অর্জুনের।

অর্জুন প্রচন্ড ক্ষেপে,সাইফের পিছনে লাগানো ভয়ংকর খুনিগুলোকে আবার ব্রাঞ্চে পাঠাল। ওরা কচুকাটা করার মত ছোটখাটো বিরোধীদের খুন করতে লাগল।

এদিকে সাইফ তখন বেনামে এই ছোটখাটো বিরোধীগুলোকে এক হবার পরামর্শ দিল। অর্জুন বাংলাদেশে এসে যেই আবুলচক্রের সদস্য হয়,এবং পরে তার লিডারকে মেরে ফেলে। সেই আবুল হোসেনের যত আত্মীয় আছে,সবাই অর্জুনের প্রতি ঘৃণা নিয়ে চুপচাপ ছিল এই কয় বছর। কিন্তু বেনামী ফোন আসার পর ওরা মিটিং ডাকে,এবং সারা বাংলাদেশে যত অজ্ঞাত,ছোটখাটো অপরাধী চক্র ছিল,অর্জুনের চক্রের ভয়ে কিছু করতে পারছিল না,সবাই এক হয়ে অর্জুনের বিশাল র‍্যাকেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।

৫.

মাত্র একমাসের মধ্যে অর্জুনের ৫ বছর ধরে গড়ে তোলা রাজ্য ধ্বসে পড়ল। মাদক চোরাচালান,নারী,পর্নোগ্রাফি সব ব্যবসা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

অর্জুন বুঝতেও পারল না,মাত্র এক মাসে,এভাবে তার বিরুদ্ধে দুর্বল স্মাগলারদের সংঘবদ্ধ করে কে এইকাজ করল। 

প্রত্যেকটা আক্রমণ খুবই সুচারুভাবে হয়। অর্জুনের ব্রাঞ্চগুলোতে আক্রমণ হয়,মালামাল লুট হয়,,সাথে সাথে কিভাবে যেন টিভি সাংবাদিকরা খবর পায়,সাংবাদিকদের দেখে অর্জুনের পোষা পুলিশদেরও কিছু করার থাকে না।

দেখতে দেখতে অর্জুন এক নিমেষে আন্ডারওয়ার্ল্ড এর রাজা থেকে ফকির হয়ে গেল। শুধু তাই না,এর জন্য সে দোষ কাকে দেবে সেটাও বুঝতে পারল না। যে ছোটখাটো গ্রুপ ওর ছোট ছোট ব্রাঞ্চকে এটাক করেছে,সেই গ্রুপকেও সাংবাদিকদের সামনে পুলিশ গ্রেফতার করে। যে শহরগুলোতে কয়েকদিন আগেও অর্জুনের চক্র বসত,সে শহরে মুহুর্তের ভিতর সব ধরণের লুকানো আর প্রকাশ্য ক্রাইম শেষ হয়ে গেল।

অর্জুন ওর অপরাধের টাকাগুলো দেশে বিদেশে অনেক ব্যাংকেই রেখে দিয়েছিল আগেই। আর আগেই মানুষকে দেখানো কারখানা,রেস্টুরেন্ট আর মাছের ঘের বানিয়েছিল,অর্জুন রাজনৈতিক নেতা। এতকিছু হয়ে গেল,বাইরের চালচলনে বোঝাই গেল না,অর্জুন এক নিমেষে গডফাদার থেকে ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। মনের তীব্র সব হারানোর কষ্ট অর্জুন চেপে রেখে হাসিমুখে সবার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখল।

ছোটখাটো যুদ্ধে অর্জুনের অনেক বিশ্বস্ত কর্মী মারা গিয়েছিল। 

একরাতে অর্জুনের বাসার ল্যান্ডলাইনে একটা কল আসল,,,, অর্জুন রিসিভ করে বলল,,”হ্যালো”

ঠান্ডা একটা কন্ঠা ওপাশ থেকে বলল,,,”কিরে মাদার**, কেমন আছিস?”

অর্জুন বলল,,”কে?”

সাইফ বলল,,”দুর্যোধন ”

অর্জুন বলল,,”কেষ্টকে মেরে এভাবে পার পেয়ে যাবি না তুই,তোর ব্যবস্থা করছি”

সাইফ বলল,,”শুধু কেষ্টকে মারার বদলা নিবি? আর কিছুর না?”

অর্জুন বলল,,”মানে?”

সাইফ বলল,,”মাত্র কয়েকটা ফোন করলাম,,হাতে গোণা যাবে সেই ফোনসংখ্যা,, আর একমাসের মধ্যে অর্জুন হারল তার রাজত্ব,,,,,”

অর্জুন সাথে সাথে সব বুঝে গেল।অবশ্যই,,,এই দুনিয়ায় একমাত্র সাইফ তদন্ত করে তার সবকিছু বের করেছিল,তদন্ত রিপোর্ট অর্জুন নিজ হাতে পুড়িয়েছে,ওর ল্যাপটপ নিজ হাতে পুড়িয়েছে,,, ফিসফিস করে বলল,,”তুই? তুই,,,,,শুয়োরের বাচ্চা,,,”

সাইফ বলল,,”অর্জুন,তুই কখনো সেই জনসভায় খুন হওয়া মানুষদের দেখিস?”

অর্জুন দাত কিড়মিড় করতে লাগল।

সাইফ বলল,,”সেই লোকগুলোর ছিন্নভিন্ন লাশ আমাকে বলে,,তোর জন্য,,সব তোর জন্য,,, এদের সামনে কে থাকে জানিস? আমার বউ নীলা,,,,”

অর্জুন চুপ করে রইল।

সাইফ বলল,,”এবার ব্যাপারটা ব্যক্তিগত,,,, তুই নীলাকে মেরেছিস,,তুই মিহিরকে মেরেছিস,,তুই মাইনুল আর ওর বউকে মেরেছিস,,,,, তোর বাবা মা,আর তোর বেশ্যা মালিহাকে সামলে রাখিস।”

 ফোন কেটে গেল। অর্জুন বজ্রাহত হয়ে তাকিয়ে রইল।

৫.

অর্জুনকে নিয়মিত টকশোতে ডাকা হতে লাগল। সুন্দর চেহারা দেখে প্রগতিশীল চ্যানেলগুলো ঈদের দিন ওকে আর মালিহা আজমকে ইনভাইট করে অনেক পাম্প টাম্প দিতে লাগল।এক অনুষ্ঠানের সুন্দরি উপস্থাপিকা তাকে বলল,”দাদা,গতবার তো একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পাগলের জন্য আপনাদের বিয়েটা হল না। এবার কবে করছেন বিয়েটা?”

অর্জুন টাস্কি খেয়ে উপস্থাপিকার শরীর দেখছিল।সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলল,,”খুব শিগগিরি।”

অনুষ্ঠান শেষে সাইদুরকে বলল,উপস্থাপিকাকে নিয়ে বাগানবাড়ি তে আসতে।

সাইদুর বলল,,”দাদা,আমাদের লোকবল কিন্তু অনেক কম,এখন কোন ঘটনা ঘটানো ঠিক হবে না।”

অর্জুন এসব ব্যাপারে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে না। সাইদুরকে গালি দিয়ে বলল,যতটাকা লাগে ওরে আন,আর আসতে না চাইলে হুমকি দে।

সাইদুর ব্যক্তিগত সাক্ষাতকার আর টাকার লোভ দেখিয়ে উপস্থাপিকাকে অর্জুনের বাগানবাড়ি নিয়ে চলল।

অর্জুন বাগানবাড়ি তে ঢোকার মুহুর্তে দেখল,প্রাঙ্গণের বড় মন্দিরটায় ওর বাবা বিশু ভট্টাচার্য পূজা দিচ্ছে।

অর্জুন বিব্রত হয়ে বলল,,”বাবা তুমি?”

বিশু ভট্টাচার্য বলল,,”তোর কোন বন্ধু বলল,বাগানবাড়ি তে নাকি পূজা হচ্ছে না অনেকদিন,তাই আমি এলাম।”

বিশু ভট্টাচার্য ভাবে অর্জুন বাংলাদেশে এসে বদলে গেছে। সেই অপর্ণা ঘোষ আর শুভমকে অপদেবতা ভর করায় মেরেছিল,বাংলাদেশে এসে সে শুদ্ধ হয়ে গেছে,হতেই হবে ঈশ্বরের কাছে বিশু দিনরাত পূজা দিচ্ছেন ছেলের জন্য।ছেলে শুধু শুধরাচ্ছেই না।ঈশ্বর ওকে অনেক টাকাও দিয়েছে।

অর্জুন চিন্তিত হয়ে ঘরে ঢুকল,একটুপর যা হবে সেসময় নিজের বাবার উপস্থিতিটা সে ভালোচোখে দেখল না। কিভাবে ম্যানেজ করবে,ভাবতে লাগল।

উপস্থাপিকা এল বাগানবাড়িতে। কিছুপরই অর্জুন ঝাপিয়ে পড়ল মেয়েটার উপর। ঠিক তখনই কাকতালীয়ভাবে মন্দিরের ঘন্টা বাজতে লাগল।মেয়েটার চিৎকার কেউ শুনল না। 

প্রায় আধাঘণ্টা পর মেয়েটাকে খুন করে বিছানায় ফেলে অর্জুন সিগারেট ফুকতে লাগল। মন্দিরে তখনো ঘন্টা বেজে যাচ্ছে।

অর্জুন হঠাৎ ভাবল,,এখনো ঘন্টা কেন বাজছে।

অর্জুন বাগানবাড়িরর মন্দিরের কাছে যেতে লাগল। 

বিশু ভট্টাচার্যের  জিভ বের করা লাশটা মন্দিরের ঘণ্টার দড়ির সাথে ঝুলছিল।

৬.

অর্জুন শান্ত হয়ে উপস্থাপিকা আর নিজের বাবার দেহ লোক দিয়ে কুচি কুচি করিয়ে মিলিয়ে ঘেরে পাঠিয়ে বাগানে বসে কাঁদতে লাগল।

অর্জুনের মোবাইলে ফোন এল। অর্জুন কেমন করে যেন বুঝল এটা কার ফোন। ফোন ধরেই চিৎকার করে বলল,,”কুত্তার বাচ্চা,আমার বাবা কি দোষ করল? জীবনে একটা মানুষের ক্ষতি করে নি সে।”

সাইফ বলল,,”আমার বউ কি দোষ করেছিল অর্জুন?ওকে মেরেই তো তুই যুদ্ধ শুরু করে দিলি। যুদ্ধের নিয়মই তো নিরীহ লোক মরা,,,,,”

অর্জুন বলল,,”তোর সারা গুষ্টিতে যারা যারা বেঁচে আছে,,আমি সবাইকে মেরে ফেলব। সবাইকে,,,, সবাইকে,,,,নিজ হাতে মারব আমি।”

সাইফ একটু চুপ করে বলল,,”দেখা যাবে।”

অর্জুন সত্যিই সাইফ এর বাবা,মা আর শ্বশুর এর পুরো গুষ্ঠির খোজ নেওয়া শুরু করল। বাড়ি গিয়ে নিজের মা কে বলল,,বাবা সন্ন্যাস নিয়েছে,মাকে বলে গেলে মা বাফহা দিত। তাই না বলে চলে গেছে,এটা শুনে অর্জুনের মা মিনতি দেবীর হাপানি উঠে হাসপাতালে ভর্তি হতে হল।

অর্জুন সাইফের গুষ্টির সবাইকে আস্তে আস্তে বের করল। কিন্তু বের করেই কিছু করল না। অপেক্ষা করতে লাগল। কিভাবে ও সাইফকে দেখিয়ে কাজগুলো করবে।

এদিকে মিডিয়ার কানাঘুষাতে অর্জুন মালিহার সাথে বিয়ের দিন ঠিক করল।

বিয়ের কয়েকদিন আগে অর্জুন নিজে তার কাছের কয়েকটা লোককে নিয়ে সাইফের বাবা মায়ের বাসায় গেল।

সাইফের বাবা মা অর্জুনকে দেখেই ভয়ে ঘরের ভিতর লুকাল।

অর্জুন লোকজন নিয়ে টেনে হিচড়ে  সাইফের বৃদ্ধ মা বাবাকে খুন করল,শুধু তাই না,সাইফকে দেখাতে তার বাবা মার চামড়া খুলে দরজায় টানিয়ে দিল।

কয়েকদিন সব চুপ।সাইফ আর কিছু বলছে না।

অর্জুন বিয়ের পিড়িতে বসেছে,অর্জুনের মা রীতি অনুযায়ী ছেলে আর ছেলের বউকে বরণ করতে বাসায়ই রয়ে গেছে।

বিয়েতে সাত পাক ঘুরতে ঘুরতেই অর্জুনএর কাছে ফোন এল অর্জুনের ঘেরের মাছগুলোকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। মালিহার কপালে সিদুর দেওয়ার পর আরেকটা ফোন এল,অর্জুনের গার্মেন্টস এ আগুণ লেগেছে,আর কারখানাতে শ্রমিক বিদ্রোহ হয়েছে,কারখানায় লুট হয়েছে।

অর্জুনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।

এদিকে অর্জুনের মা ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঝিমাচ্ছিল।হঠাৎ নাকে কেমন একটা গন্ধ এল তার। জানালা ফাক করে বাইরে তাকাল,যা দেখল তাতে একটা চিৎকার দিল। 

অর্জুন ওর মায়ের জন্য যে তিনজন সিকিউরিটি রেখে গিয়েছিল,তাদের গলা কাটা,তড়পাচ্ছে,তাজা রক্তের বোটকা গন্ধ আসছে,,,,,

অর্জুনের মায়ের পিছন থেকে একটা কণ্ঠ এল।

“মিনতি দেবী,আপনি জানের শয়তানের মাকে কি বলা হয়?”

মিনতি দেবী ভয়ার্ত চোখে শয়তানের মত দেখতে লোকটার দিক তাকাল।

সাইফ বলল,,” ডাইনী বলে,,,”

মিনতি দেবী কাপতে লাগল।

সাইফ বলল,,”মধ্যযুগে ডাইনী পোড়ানো হত,,,,,,”

মিনতি দেবীর আগুনে দাউদাউ করা দেহটার চিৎকার আশেপাশের সব মানুষ শুনল।কিন্তু তারা আসার আগেই মিনতি দেবীর তড়পানো শেষ হয়ে গেল।

অর্জুন এই কথা শুনে মা মা বলে কাঁদতে কাঁদতে মালিহাকে গাড়িতে রেখেই বাড়ির ভিতর দৌড়ে এল। সাথে সাথে গাড়ির ভিতর বিস্ফোরণ শুনে বুঝল,অর্জুনের সব শেষ,গাড়িতে থাকা সাইদুর আর মালিহা মরে গেল।

৭.

অর্জুন এর এত বড় ক্ষতিতে রাজনৈতিক দল এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা এসে ওকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। অসংখ্য মানুষ গলা ছেড়ে বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগল। টিভি চ্যানেলে অর্জুনের জন্য শোকবার্তা দেওয়া হতে লাগল।

অর্জুনের দল ভেঙে গেল। অর্জুন রাগের মাথায় কাকে বলবে সাইফের মাথা এনে দিতে?

অর্জুন শেষ চেষ্টা করে। সে নাসির মোল্লার শরণাপন্ন হতে চায়। কিন্তু নাসির মোল্লা ওর সাথে দেখা করতে অপারগতা জানায়।শেষে অর্জুন উড়োফোনে নাসির মোল্লাকে শাসায়,এই দুঃসময়ে নাসির মোল্লা ওর পাশে না দাড়ালে,সব কুকীর্তি ফাঁস করে দেবে। এখনো অর্জুনের জনপ্রিয়তা আছে।

নাসির মোল্লা বলে,”জনপ্রিয়তা ধুয়ে পানি খাও,,বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা দুই দিনের জিনিস,আজ ভালবাসছে,কাল ডাস্টবিনে ফেলবে”

অর্জুন বলল,,”দেশেবিদেশে ব্যাংকে আমার প্রচুর টাকা আছে,সব আমি করব,আপনি সাইফকে শেষ করার ব্যবস্থা করে দিন। সংগঠন এর লোক লেলিয়ে দিন ক্যাডার,ছাত্রকর্মী,সবাইকে।”

নাসির বলল,,”একটা সুযোগ আছে,আমরা বলত্র পারি,সেই জনসভায় তোমাকে মারতে জঙ্গি নিয়ে এসেছিল সাইফ,জঙ্গির সাথে সম্পৃক্ততা প্রমাণ করা সহজ।আমরা নিজেদের সরিয়ে,ওর কথা প্রচার করতে পারি। এতে করে সারা দেশে র‍্যাব পুলিশ ওকে ধরতে রেড এলার্ট দিবে।”

অর্জুন বলল,,”আচ্ছা ব্যবস্থা করেন”

নাসির বলল,,”একটু দেরি কর,,আমার বড় ভাই আর ভাবীকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। একটু সামলাই,,,”

অর্জুন ফোন রেখে দিল।চিন্তায় একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুম ভাঙল ঘরের বাইরে দুমদাম ঢিল পড়ার শব্দে। অর্জুন জানালা খুলে দেখল,পুরো শহল,মশাল,লাঠি, ঝাড়ু,হাতে,ওর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বলছে,,”অর্জুন, শয়তানের বাচ্চা বের হ।”

অর্জুন আতংকে জানালা বন্ধ করল। কি হল বুঝল না। ফোন দিল কয়েক জায়গায়,কেউ ধরল না। টিভি খুলল সে।

টিভিতে ব্রেকিং নিউজ হচ্ছে,,”সমাজসেবী অর্জুন ভট্টাচার্যের মুখোশ ফাস,,, পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্য ক্রিমিনাল। ”

অর্জুন চ্যানেল পাল্টাতে থাকল। সব চ্যানেলে একই নিউজ। একদম ২০১০ সাল থেকে ভারত থেকে ঘটিয়ে আসা সব কিছুর কথা টিভিতে বলা হচ্ছে,অর্জুন ভাবে,,এগুলোকে তো কয়দিন আগেও পাগলের প্রলাপ বলা হয়েছে,এখন এগুলো আবার ব্রেকিং নিউজে কেন বলছে?

এক চ্যানেলে হঠাৎ দেখল,,”নাসির মোল্লার অফিসে লুকানো ক্যামেরায় অর্জুনের কথোপকথন এর টেপ প্রচার করা হচ্ছে,,,,”

অর্জুন দেখল,যেদিন হন্তদন্ত হয়ে নাসির তলব করেছিল,সেদিনের লুকানো ক্যামেরার ভিডিও টিভিতে ছাড়ছে। গাড়িবহরের দিক তাকিয়ে সাইফের হাসির কারণ আজ বুঝল সে। গোপন ক্যামেরা লুকিয়েছিল সে,,,,

তারপর একটা রেকর্ড বাজাল, ঘুমের আগে,নাসির মোল্লার সাথে কথোপকথন এর রেকর্ড,,এটা কিভাবে পেল সাইফ?

এরপর বলা হল,,”এখন আপনারা দেখবেন খুবই ভয়ংকর একটা ভিডিও,নাসির মোল্লার বড় ভাই আর ভাবীকে নিজ হাতে অর্জুন হত্যা করে চামড়া ছিলে দরজায় আটকেছে,,,,”

অর্জুন চিল্লিয়ে বলল,”নাসির মোল্লার ভাই ভাবি মানে? ওটা তো সাইফের বাবা মা”

উন্মত্ত জনতা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকছে টের পেল অর্জুন। শিগগিরি বাড়ির পিছনে গিয়ে গাড়িতে চড়ে দিনাজপুরের বাইরে রওনা দিল সে।

ওইতো সামনে বিদায় দিনাজপুর লেখা,কিন্তু ও কি,পেন্ডুলাম এর মত ও কি ঝুলছে দিনাজপুর গেইট থেকে?

নাসির মোল্লার ঝুলন্ত লাশটা দেখে আতংকে গাড়ি পাশের গাছের সাথে লাগিয়ে দিল অর্জুন।

গাড়ির ইঞ্জিন থেকে ধোয়া বের হচ্ছে,গাড়ির দরজা খুলে বের হল অর্জুন হামাগুড়ি দিয়ে।সামনে কে যেন দাঁড়ানো। অর্জুন মাথা তুলে দেখল,,,কুড়াল হাতে সাইফ দাঁড়ানো।

সাইফ বলল,,”আমার কি খোলাশা করে কিছু বলার আছে? তুই ভাবলি কেমনে আমি নিজের বাবা মাকে তোকে শেষ করতে দেব? তোমে বধ করার টার্গেট নিয়ে যখ নেমেছিলাম,তখনি আমার পরিবারের সব তথ্য আমার বায়োডাটা থেকে মুছে দিয়েছি। আর তুই হুমকি দেবার পর বাবা মার জায়গায় নাসির মোল্লার ভাই ভাবির নাম ঠিকানা দিয়েছিলাম। আর সব জায়গাতেই ক্যামেরা সেট করা ছিল।”

অর্জুন হঠাৎ দেখল সাইফের পিছনে অনেকগুলো রক্তাক্ত লাশ। ছিন্নভিন্ন  লাশ,, সবাই এক নজরে অর্জুনকে দেখছে,,অর্জুনের গোটাজীবনের সব শিকার,,সেই শুভম সেন থেকে শুরু করে নাসির মোল্লার ভাই ভাবি,,সবার রক্তাক্ত লাশ।

সাইফ শীতল গলায় বলল,,”যাদের দেখছিস ওরা আমাকে কথা দিয়ে হে,,আজকের পর থেকে আমি আর ওদের দেখব না,,,,,,”

অর্জুনের গায়ে কুড়ালের উপর্যুপরি কোপ পড়তে লাগল,অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হবার আগ পর্যন্ত।

সাইফ রক্তামাখা শরীরে কুড়াল কাধে ফিরতে লাগল। ফেরার সময় গাড়ির আয়নায় নিজের চেহারা দেখল।

ভয়ের সাথে দেখল,,সাইফের চেহারাটা তার দিকে ফিরে নেই,আয়নায় অর্জুনের চেহারা,,,,,

শয়তানের উপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে কি আরেকটা শয়তান তবে তৈরি হল? 

গল্প ৯১

​”অর্জুন”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.কলকাতা,ভারত, ২০১০ সাল। ২০ মে রাত ১ টা।

অন্ধকার,,,, ফাঁকা চারিদিক,,,,,,

হাওড়া স্টেশনে ট্রেনটা থামল রাত ১২:৩৪ এ। বৃষ্টিতে রেললাইন এর মাটি ধুয়ে যাওয়ায় পাক্কা ২:৩০ ঘন্টা লেইট।

স্যুটকেস হাতে একটা তরুণী বের হল ট্রেন থেকে। পূজার ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল সে। কলকাতা মেডিকেলের ছাত্রী সে। কালই মেডিকেল খোলার কথা,বাবা মায়ের সাথে অতিরিক্ত একদিন কাটানোয় বিশাল বিপদে পড়ে গেছে সে বোঝাই যাচ্চজে। যে ক্লাস করতে তার তড়িঘড়ি করে আসা,সেটা হবে না সিওর।

ট্রেন থেকে কিছু যাত্রী নেমেছিল সাথে। অধিকাংশ যাত্রী সেই রেললাইনের ঝামেলা জায়গায় নেমে ভাঙা পথে কলকাতায় ফিরেছে। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা খরচের ভয়ে তরুণী নামে নি। হিসেব করে আনা গ্রাম্য স্কুলমাস্টারের মেয়ের টাকা। হিসেব করে খরচ করতে হবে।

আস্তে আস্তে সহযাত্রীরা সবাই হাওয়া হয়ে গেল। একসাথে বা দলবেধে,সোডিয়াম বাতির আলোয় ফাকা রাস্তায় তরুণী একা। দূরের আধার থেকে তরুণী আকর্ষণীয় ফিগারটা মোহনীয়ভাবে ফুটে উঠেছে।

একা একা হাটতে লাগল তরুণী। বুকে তার ঢিপঢিপ শব্দ। পদশব্দ আর হৃৎপিন্ডের শব্দ মিলে আশ্চর্য ভৌতিক সুর।

একটা ফাকা ট্যাক্সি পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল হঠাৎ।

তরুণী: এই ট্যাক্সি।

ট্যাক্সিটা ব্রেক কষল। আস্তে আস্তে পিছে আস্তে লাগল। কাছে আসতেই তরুণী বলল,”দাদা, মেডিকেল হোস্টেল যাব।”

ড্রাইভার তরুণীর বুকের দিক তাকাল। মূর্তির মত কয়েক মুহুর্ত পর বলল,”উঠুন”

তরুণী স্যুটকেস রাখার জন্য অনুরোধ করল ড্রাইভারকে। ড্রাইভার গাড়ি থেকে না বের হয়ে বলল,,”ট্রাঙ্ক খোলা আছে,তুলুন। আমি নামব না। গা গুলাচ্ছে,আপনাকে পৌছে দিয়েই বাড়ি যাব”

বিরক্ত হয়ে তরুণী ট্রাঙ্ক খুলে স্যুটকেস উঠাল।  ঝুকে পড়ায় তরুণী বুকের ক্লিভেজ স্পষ্ট।

ঠোট চেটে ড্রাইভার  ফোন বের করল। একটা নম্বরে ফোন গেল। ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরলেই বলল,,”হ্যালো,অর্জুন,,,”

কাছের পাড়ার মোড়ে রাত ১ পর্যন্ত আড্ডা দেওয়া আর গাজা টানা ৪ যুবকের মধ্যে সবচেয়ে গাঁট্টাগোট্টা নায়ক নায়ক চেহারার অর্জুন ফোন কানে নিয়ে ড্রাইভারের কথা শুনে মুচকি হাসল। বলল,,”নিয়ে আয়,সেখানে আগেরটালে এনেছিলি,,,”

ট্যাক্সি তরুণীকে নিয়ে এগোচ্ছে,রাতে তরুণী ঠাওর করতে পারছে না কোথায় নিচ্ছে। হঠাৎ ট্যাক্সির একদম উপরে এসে পড়ল একটা চশমা পড়া ছেলে। ট্যাক্সি সজোরে ব্রেক কষল। ছেলেটা চিৎ হয়ে পড়ে গেল ধাক্কা খেয়ে। 

মেডিকেল ছাত্রী তরুণী সাথে সাথে দরজা খুলে রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে এগোল। ট্যাক্সি ড্রাইভার মূর্তির মত চেয়ে রইল।

 তরুণী কাছে যেতেই ছেলেটা উঠল।হাত পা ছড়ে গেছে।

তরুণী: ঠিক আছেন তো?

চশমাওয়ালা: হ্যা। হাত ছড়ে গেছে।

ড্রাইভার: শালা শুয়োরের বাচ্চা,মরার জায়গা পেলি না।

কাচের ভিতর থেকে তরুণী বা তরুণ কেউ শুনল না। তরুণকে তরুণী উঠাতে সাহায্য করল।

তরুণকে তরুণী বলল,,”এত রাতে এখানে কি করছেন?”

তরুণ বলল,,”খেলা দেখতে এসেছিলাম, ভারতের জয়ে একটু উৎসব হল। এরপর বাসায় ফিরতে গেলাম। কিন্তু আমার ড্রাইভারের গাড়ি নিয়ে যেখানে থাকার কথা সেখানে ছিল না।আমি পথঘাট চিনি না। দিল্লি থাকি। পথ হারিয়ে ফেলেছি।ফোনে চার্জ নেই।”

তরুণী বলল,,”আপনার হাতে ড্রেসিং লাগবে। আমি মেডিকেল যাচ্ছি,আসুন আমার সাথে।”

তরুণ গাড়িতে উঠল। ড্রাইভার তীব্র দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চাইল। কিন্তু একটু পর ভাবল। ৫ জন তো আছেই। কি হতে যাচ্ছে টের পেলে এও যোগ দিতে পারে। হাজার হোক,পুরুষ মানুষ,,,,

গাড়ি চলতে লাগল। মেয়েটা আর ছেলেটা আড্ডা দিতে লাগল। ছেলেটা বলল,”আপনার ফোনে চার্জ আছে? আমি বাড়ি ফোন দিয়ে বলতাম,আমি মেডিকেলে আছি,,”

ড্রাইভার হতবুদ্ধি হয়ে গেল। গতি বাড়াল গাড়ির, তাড়াতাড়ি অর্জুন এলেই হয়।ফোন তো করেই দিল।

মেয়েটার ফোন থেকে ছেলেটা ফোন দিয়ে বলল,,”বাবা,পথ হারিয়ে ফেলেছি। রমেশ কাকা গাড়ি নিয়ে আসে নি,,,,কি বললে? ওনার মেয়ে অসুস্থ? আমি একটু এক্সিডেন্ট করেছি,আমি এমনিতেই মেডিকেল যাচ্ছি ট্যাক্সিতে করে।তুমি আসতে পারবে?”

ওপাশ থেকে তরুণের বাবা পুলিশ সুপার সৌরভ সেন বলল,”আসছি আমি।”

ততক্ষণে রাস্তার সামনে ৪ জন লোক দাড়াল। ড্রাইভার গাড়ি থামাল। দরজা খুল বের হল। তারপর দরজা খুল ব্যাকসিটের।

টানতে টানতে তরুণীকে বের করা হল। মুখ চাপার কোনো দরকার নেই। আশেপাশে বাড়িঘর নেই। তরুণীকে বিবস্ত্র করা হল। অর্জুন কাপড় খুলে তরুণীর কাছে গেল। তরুণী চেচাচ্ছে। চশমাওয়ালা তরুণ পিছ থেকে অর্জুনের উপর ঝাপিয়ে পড়ল,”কি করছিস তোরা?”

অর্জুন যোদ্ধার দৃষ্টিতে জোশ উঠিয়ে তাকাল চশমাওয়ালার দিকে। বলল,,”দুইটা সুযোগ,হয় আমাদের সাথে আয়,নইলে ফিরে যেতে দেব না”

 চশমাওয়ালা অর্জুনের মুখে ঘুষি দিল। অর্জুন কিছু বলার আগে,বাকি চারজন চশমাওয়ালার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। সুচারুভাবে ঠ্যাং ভেঙে দিল। অর্জুন ততক্ষণে তার কাজ করছে,,,,

ঠ্যাঙ ভেঙে পাশের ঝোপে ফেলে দিল চশমাওয়ালাকে। ব্যাবস্থা পড়ে হবে,অর্জুনের কাজ দেখে তর সইছে না বাকিদের। মেয়েটার আর্তনাদ শোনার কেউ নেই।

মেয়েটার মোবাইল চশমাওয়ালার কাছে। চশমাওয়ালা ভাঙা ঠ্যাঙ নিয়ে ভিডিও করতে লাগল। একের পর এক মেয়েটাকে নিয়ে খেলছে ৫ জন সুপুরুষ। 

হঠাৎ ছেলেটার বাবা সৌরভ সেন কলকাতা মেডিকেলে ছেলেকে না পেয়ে,একটু আগের নম্বরে ফোন দিল। সাথে সাথে প্রত্যেকজন ফিরে তাকাল চশমাওয়ালার দিকে।দেখল,ভিডিও হচ্ছে।

অর্জুন একটা ছুরি  নিয়ে এগিয়ে আসছে,গায়ে কাপড় নেই। ছেলে বাবার শেষ ফোন ধরতে পারল না।,অর্জুন ফোনের দিকে হাত বাড়াতেই ফোনটাকে সে পাশের ঘনঝোপে ফেলে দিল।ভিডিও সেইভ হয়ে গেল।

অর্জুন চশমাওয়ালাকে জবাই দিল। তারপর দ্রুত কাজ শেষ করতে নির্দেশ দিল বাকিদের। তারপর মোবাইলটা খুজতে লাগল। এদিকে ছেলের খোজ না পেয়ে মেডিকেল এর রাস্তা থেকে নিনেই গাড়ি চালিয়ে এপথেই আসছেন সৌরভ সেন।গাড়ির আলো দেখে শিগগিরি ৪ জন ভেগে গেল। অর্জুন ছুরিটা নিয়ে রক্তাক্ত মেয়েটার কাছে এল। মেয়েটা দুর্বল কন্ঠে বলল,,”প্রাণে মারবেন না,,”

অর্জুন মেয়েটাকে জবাই দিয়ে চলে গেল।

 গাড়ি থামল সৌরভ সেনের। হেডলাইটের আলোয় দেখলেন উলঙ্গ মেয়েটার জবাই করা দেহটা শেষবারের মত হাত পা ছুড়ে তড়পাচ্ছে।

সৌরভ সেন কাছে যেতেই মেয়েটার প্রাণ বেরিয়ে গেল।

সৌরভের মনে ভয় ঢুকল। ছেলে কই তার? মেডিকেলের সব রাস্তা তো খুজে এলেন তিনি,হাসপাতালও। পেলেন না। এ রাস্তায় কি তার ছেলে এল?

শেষ নম্বরে আবার ফোন দিলেন তিনি। রিংটোন বাজল। ফোন খুজতে পাশের ঝোপে গেলেন তিনি। ফোনটা পেলেন। ভিডিও ফোল্ডার উঠে আছে ফোনে। একটা রেইপের দৃশ্য। রিংটোনের আওয়ায়। উলঙ্গ এক সুপুরুষের ছুরি হাতে আগমন,তার ছেলের কণ্ঠ,,”না, না,, বাবাআআআআআ”

কাপতে কাপতে আশেপাশের ঝোপে তাকালেন সৌরভ সেন। 

একমাত্র ছেলে শুভম সেনের জবাই করা লাশটা পেতে দেরি হল না।

১ জুন, ২০১০।

সারা কলকাতায় ভিডিও থেকে ক্রপ করা অর্জুন ভট্টচার্যের সুদর্শন ছবি। শুভম সেন ও অপর্ণা দাশের খুনের জন্য ধরিয়ে দিতে বলা হচ্ছে।

অর্জুন মাথায় মাফলার চড়িয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিক যাচ্ছে। অহরহ ভারতীয়রা এই সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ আসে। দরিদ্র পুরোহিত বিশু ভট্টাচার্য তার ছেলেকে বাঁচাতে কমটাকায়ই তাকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছে।

কলকাতাকে শেষবারের মত একবার দেখে ফাকা সীমান্ত দিয়ে বি এস এফের তত্ত্বাবধানে অর্জুন ঢুকল বাংলাদেশে।

কলকাতার ফকির মিসকিন লোকেরা শুনেছি বাংলাদেশে এসে রাজত্ব করে।

অর্জুন ভাবে,”ভালই হল,শেষ ২ টা খুন করে। অমন মেয়ে জীবনে খায়নি সে,এই একটা লাভ। আর কলকাতার ফকির মিসকিনরা বাংলাদেশে এসে যেকোনো ব্যবসায় রাজত্ব  করে,,,,”

তবে অর্জুন হবে সম্রাট। রাজাদের রাজা,,,,বাদশার বাদশা।

২.দিনাজপুর, বাংলাদেশ।

অর্জুনকে সীমান্ত পুশ ইনে যারা সাহায্য করেছিল।তাদের হাতে একটা লিস্ট ছিল। কয়জন ভারতীয় বাংলাদেশে আসবে,আর কয়জনই বা পলাতক বা কয়জনই বা স্থায়ীভাবে অবৈধ বসতি গাড়বে।

অর্জুন এমন এক লিস্টওয়ালা লোকের সাথে আলাপ করল। আলাপের এক পর্যায়ে এতই খাতির হল যে লোকটা অর্জুনকে লিস্ট দেখাল।

লিস্টে বেশ কয়েকটা শিরোনাম,, পলাতক,ভদ্রলোক,ভ্রমণকারী, ভারতীয় সরকারের বিশেষ এজেন্ট ইত্যাদি। এর মধ্যে পলাতক শিরোনামে আবার ছিল ২ টা শিরোনাম। স্থায়ী আর অস্থায়ী।  অনেকগুলো নামের মাঝে অর্জুন দেখল,অস্থায়ী নামের ভিতর আছে,অর্জুন ভট্টাচার্যের নাম।

অর্জুন লোকটাকে বলল,,”দাদা এই অস্থায়ী নামটার মানে কি”

লোকটা বলল,,”যারা সবচেয়ে কম টাকা দিয়েছে,তাদের আমরা থাকার কোন ব্যবস্থা রাখি নি। তারা নিন খরচে হোটেল মোটেলে থাকবে,তারপর ভারতে তাদের অপরাধের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফিরে আসবে।”

অর্জুন কপর্দকহীন। তার গরীব পুরোহিত বাবা তাকে গ্রেফতার বাচাতে কোনোরকম বাংলাদেশে পুশ ইন এর ব্যবস্থা করতে পেরেছে। এই প্রথম অর্জুনের শুভম সেনকে জবাই দেওয়ার জন্য আক্ষেপ হতে লাগল। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলেও সৌরভ সেন ওৎ পেতে থাকবে,ছেলে হত্যার প্রতিশোধ সে নেবেই।

অর্জুন পলাতকদের তালিকার নামগুলো পড়ল। স্থায়ী মানে সে বুঝে গেল,তাকে বাংলাদেশে রাখার ব্যবস্থা এই দালালরাই করবে। অর্জুন উত্তেজিত হয়েই ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিল। স্থায়ী লিস্টের কারো জায়গা সে নেবে।সীমান্ত থেকে এ পর্যন্ত কোনো পাসপোর্ট, ভিসা,বা পরিচয়পত্রের দরকার হয় নি। কোনো ছবিও না।বাংলাদেশে আসা খুবই সোজা। যদি তুমি ভারতীয় হও।তবে যাত্রাপথের নিরাপত্তা তোমাকেই দেখতে হবে।

অর্জুন প্রত্যেকটা স্থায়ী পলাতকদের উপর নজরদারি করতে লাগল। মোট ৮ জন ছিল সেখানে।অর্জুন বুঝল এর মধ্যে ৭ জন ভয়াবহ ক্রিমিনাল, খুনি। এতটাই পরিচিত কলকাতায় যে কলকাতায় তাদের লুকিয়ে চলতে হয়ে। তবে ৮ নম্বরটার উপর অর্জুনের নেক নজর পড়ল।

লোকটা ক্ষণে ক্ষণে কেপে উঠছে। কারো সাথে কথা বলছে না। হাতে একটা স্যুটকেস আছে তার। সে দালালদের কুলির হাতে দেয় নি স্যুটকেসটা।হাতে নিয়েই ঘুরছে।অর্জুন বুঝল ওতে টাকা আছে। এবং লোকটা খুবই সরল।কারণ সে প্রতি মুহুর্তেই বুঝিয়ে দিচ্ছে চালচলনে,সে আনাড়ি।কোন দুর্ঘটনা বা চক্রান্তের শিকার হয়ে ভারত ছাড়তে হচ্ছে সারাজীবনের জন্য। জমানো সব টাকা নিয়ে স্থায়ীভাবে থাকতে এসেছে বাংলাদেশে।

লোকটার নাম সৌভিক ঘোষ।অর্জুনের বেশি সময় লাগল না তার সাথে খাতির করতে। লোকটা যদিও খুবই সাবধানে কথা বলার চেষ্টা করল। তবে অর্জুন তার আতংক বুঝতে পারল।

লোকটাকে অর্জুন এতটাই আপন লোকের মত এপ্রোচ করল যে লোকটা মাত্র ২ ঘন্টার ভিতরে অর্জুনকে নিজের কাহিনী বলে দিল। এক বড় লোকসভার সদস্যের মেয়ের সাথে তার বিয়ে হয়।মাত্র ৩ মাস আগে। সে নিজে একজন সফল।ইঞ্জিনিয়ার ছিল। বিয়ের ১ মাস পর হানিমুনে যায় তারা।

কিন্তু লোকসভা সদস্যের বিরোধী পক্ষের কছু পোষা গুন্ডা তাদের ফলো করে,তাকে আহত করে মেয়েটাকে রেইপ করে মেরে ফেলে। কিভাবে যেন এভিডেন্স সাজিয়ে মেয়ের স্বামীকেই ফাসিয়ে দেয়। এমনভাবে যে খোদ মেয়ের বাবাও জামাইয়কে দায়ী করে।

এখন ভারতে জামাইয়ের বিরুদ্ধে দুই পক্ষ লেগেছে, নিজের শ্বশুর খুজছে প্রতিশোধ নিতে,বিরোধী পক্ষ খুজছে একমাত্র সাক্ষীকে শেষ করে দিতে।

সীমান্তঘেষা ভারতীয় পুশ ইনের জন্য ব্যবহৃত এক সস্তা হোটেলে এসব হচ্ছে। এই সব কথা। এখান থেকে কাউকে পাঠানো হবে ঢাকা,কাউকে বরিশাল,কাউকে চট্টগ্রাম। আর অর্জুনের মত অস্থায়ী লোকদের একদিন থালার সুযোগ,কালকে সকালে নিজ খরচে বাংলাদেশের যেকোন জায়গায় যাবে।

সৌভিক ঘোষের থাকার জায়গা হল রংপুরের একটা বাড়িতে। অর্জুন প্রয়োজনীয় সব তথ্য নিল। তারপর নিজের হাতের শেষ সম্বল ৫০০ টাকার পুরোটা খরচ করে সৌভিক ঘোষকে বিরিয়ানী,মাটন,চিকেন খাওয়াল।

সৌভিক ঘোষের বিশ্বাস বেড়ে গেল। অর্জুন বিড়বিড় করে বলল,,”ইনভেস্টমেন্ট”

সৌভিক ঘোষ হোটেলে ফিরতে চাইল। অর্জুন প্রস্তাব করল মেঠোপথ ধরে হেটে যাবে। সৌভিক ঘোষ কিছু বলল না। মেঠোপথের এক পর্যায়ে একটা পচা ডোবা পেয়ে, অর্জুন সৌভিক ঘোষের মাথা চেপে ধরল সেই ডোবায়। অর্জুনের পেশীবহুল শরীরের শক্তিতে বিন্দুমাত্র নড়ার সাধ্য রইল না সৌভিকের। স্থির হয়ে গেল তার শরীরটা।

শরীরটাকে ডোবায় ফেলে দিয়ে স্যুটকেসটা খুলল অর্জুন। বান্ডিল বান্ডিল টাকা দেখে বলল,,”প্রফিট।”

আর হোটেলে ফিরল না অর্জুন। সেই টাকা নিয়ে চলে গেল দিনাজপুর শহরে। কিছু খাবার খেয়ে ভাল একটা হোটেলে উঠল সে। কয়েকদিন ফুর্তি করে যাবে রংপুর।  সৌভিক ঘোষ এর নামে ফোন দেবে দালালদের কাছে। বলবে একাই চলে গেছে সে।

রংপুরের নির্ধারিত বাসায় থাকতে শুরু করল অর্জুন।সৌভিক ঘোষের টাকায় চলল প্রায় ৬ মাস।

বেহিসাবি খরচের ফলে ৬ মাসে মাসুল দিল অর্জুন। এক স্যুটকেস ভরা ইঞ্জিনিয়ারের সারাজীবনের সঞ্চয় মাত্র ৬ মাসে শেষ। ভাল পোশাক,ভাল খাবার, অসংখ্য মেয়ে মানুষ সামলাতে। এখন কি হবে ভাবতে লাগল। ফোনে আসতে লাগল একরাতের গার্লফ্রেন্ডদের ফোন। যাদের একরাতের পর আর যোগাযোগ করে নি।

বাসাটা ছাড়তে হল অর্জুনের। দুই কারণ,ভাড়া সামলাতে পারছে না,আর যেসব মেয়েদের নিয়ে খেলেছে বাংলাদেশে এসে,তাদের একজন আত্মহত্যা করেছে তাকে দায়ী করে। ফ্লাটে পুলিশ আসা সময়ের ব্যাপার। 

এই ছয়মাসে যে শুধু ফুর্তি করেছে অর্জুন,তা নয়,খাতির করেছে বেশ কিছু লোকের সাথে। তবে তার বন্ধুত্বের টান ছোটবেলা থেকেই থাকত পাড়ার মাস্তান,চাদাবাজদের দিকে। তার কলকাতার পাড়ার মাস্তানদের সরদারই তো ছিল সে।

এখন এমন এক মাস্তান সাইদুরের সাথে বেশ খাতির হয়েছিল তার। এতই খাতির যে নিজের জীবনকাহিনী বলে দেয় সে। শুধুমাত্র এই সাইদুরকেই। সাইদুর তাই কয়েকদিন লুকিয়ে রাখে অর্জুনকে। অর্জুনের ফ্লাটে পুলিশ সার্চ করছে,সেই আত্মহত্যা করা মেয়ের সুইসাইড নোটের উপর ভিত্তি করে।

সাইদুর একদিন অর্জুনকে বলে,”তুই এতদিন বড়লোকি না দেখিয়ে যদি প্রথমদিকেই বলতি,তোর ওই টাকা থাকত,শুধু থাকত না,আরো বাড়ত।”

অর্জুন মনে মনে বলল,”হ্যা,রাখতে দিতা ঠিকমত,একরাতে গলাটা কেটে নিয়ে যেতা সব কিছু”

সাইদুর বলল,,”আগের মত টাকা উড়াতে পারবি না। তবে বেশ ভাল টাকাই পাবি, মাস শেষে না,প্রত্যেকটা দাও মারার সময়,,,কিন্তু একটু রিস্কি।”

অর্জুন বলে,” কি বলতে চাস?”

সাইদুর বলে,”শোন,আমি নিজের ঝুকি নিয়ে তোকে বলছি। আমি এক কিডন্যাপিং গ্রুপের সাথে আছি। বাচ্চা,মেয়েমানুষ কিডন্যাপ করি আমরা। মুক্তিপণ নিই এরপর। এসব কাজে অভ্যাস আছে? ”

অর্জুন বলল,”না নেই,তবে চাদাবাজির অভ্যাস আছে। তবে করা যাবে। আমাকে ব্যবস্থা করে দে”

সাইদুর বলল,”আচ্ছা,আমি লিডারের সাথে কথা বলব।তুই আমাকে যা যা বললি,এই খুনের ঘটনা গুলো কি সত্যি। নিজে করেছিস? ”

অর্জুন বলল,”হ্যা।”

সাইদুর বলল,”লাগতে পারে তোকে। আমি তোকে জানাব”

পরেরদিন রাতেই সাইদুর অর্জুনকে নিয়ে গেল একটা সংঘবদ্ধ অপহরণ চক্রের কাছে।পরিচয় করিয়ে দিল তাদের লিডার আবুলের সাথে।

আবুল অপহরণচক্রটা কুখ্যাত ছিল শহরে। তারা টাকাওয়ালা লোকদের আত্মীয়, বিশেষত বাচ্চাদের অপহরণ করত।কিন্তু মোটা মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিত। এমনকি পুলিশের সাহায্য চাইলেও অপহৃতদের কিছু বলত না,বরং মুক্তিপণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিত,অতিরিক্ত টাকাটা যেত যে পুলিশ অফিসারের কাছে অভিযোগ গেছে,তার পকেটে। 

এভাবে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে আবুল চক্র বেশ চলছিল।

অর্জুন ভট্টাচার্য তাদের দলে ঢোকার পর আবুল চক্রের কৌশলের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল।

দুই একটা খুব জটিল এবং সিকিউরিটি থাকা সত্ত্বেও দুঃসাহসী কিডন্যাপিং এর জন্য অর্জুনের উপর চক্রের লিডার আবুল খুবই সন্তুষ্ট হল। খুব দ্রুত অর্জুন আবুলের খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল।

অর্জুন আবুলকে কিডন্যাপিং এর মাধ্যমে আরো টাকা অর্জনের অভিনব পন্থা বাতলে দিল। যেসব বাচ্চাদের অপহরণ করা হবে,তাদের মুক্তিপণ পেয়ে ছেড়ে দেওয়ার বিপক্ষে যুক্তি দিল। গত ছয়মাস টাকাপয়সা উড়িয়ে বেশ কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের সাথে অর্জুনের যোগাযোগ হয়েছিল। এদের মধ্যে একটা গ্রুপ ছিল যারা গরীব বাচ্চাদের উটের জকি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে বিক্রি করে দিত। অর্জুন এই চক্রটাকে আবুল চক্রের সাথে মিশাতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হাতে নিল।

আবুল চক্রের নতুন কৌশল হয়ে উঠল,চক্রের হয়ে বাচ্চা অপহরণ করে মুক্তিপণ চাওয়া হত,মুক্তিপণ দেবার পরেও বাচ্চাকে ফেরত দেওয়া হত না,বাচ্চাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করে দেওয়া হত, এক্সট্রা টাকা আসতে লাগল আবুল চক্রের কাছে।

আবুল প্রথমে খুবই খুশি ছিল এই ব্যবস্থায়।কিন্তু দ্রুতই অবস্থা পালটে গেল।বাচ্চা আর ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না বলে ঘুষখোর পুলিশদের উপর চাপ বেড়ে গেল। পুলিশ আবুলচক্রের সাথে সহযোগিতা করতে অপারগতা জানাল।

আবুল অর্জুনের উপর রুষ্ট হল। অর্জুন মাথা ঠান্ডা রাখল। ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যে বাচ্চা সরবরাহকারী চক্রটাও ক্ষেপে গেল। অর্জুন তখন দুই পক্ষকে সামলাতে অসাধারণ একটা  প্লান করল। বাচ্চা অপহরণ তারা বাদ দিয়ে ধনী ঘরের অথবা সম্মানিত কোনো পরিবারের মেয়েকে অপহরণ করা শুরু করল। অপহরণ করেই মেয়েগুলোকে রেইপ করে সেই ভিডিও করা হত। তারপর মুক্তিপণ চাওয়া হত।আর ভিডিওর কপি পাঠিয়ে দেওয়া হত পরিবারের কাছে,সম্মানের ভয়ে বাধ্য হত পরিবার মুক্তিপণ এর টাকা দিতে,বিন্দুমাত্র উচ্চবাচ্য হত না।না পুলিশ জানত না গোয়েন্দারা। মেয়েদের সকালে উঠিয়ে নেয়া হত,রাতে ফেরত দেওয়া হত। টাকার লেনদেন এর মাঝেই হয়ে যাওয়া হত। অর্জুন এভাবে আবুলের ক্ষোভটা সামলাল। 

এদিকে পাচারকারী চক্রের দলটাকে চক্র ভেঙে দিতে কনভিন্স করল অর্জুন। পরামর্শ দিল,যেই রেইপ ভিডিও ধারণ করা হয়েছে,সেগুলো দেশী বিদেশি ধনী কাস্টোমারদের সাপ্লাই দেওয়ার জন্য। রেইপ ভিডিওর চেয়ে সেক্স ভিডিওর ডিমান্ড বেশি। তাই অপহৃত মেয়েদেরকে অঙ্গহানির ভয় দেখিয়ে পর্নো নায়িকাদের মত করতে বাধ্য করানো হল। বড় বড় বিখ্যাত  পর্নোসাইটে বাংলাদেশি ভিডিও বড় একটা বাজার তৈরি করল। জিনিসটা সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হল প্রাক্তন পাচারকারী দলের উপর।

অর্জুনের জন্য সবাই খুশি। উত্তরবঙ্গের আন্ডারওয়ার্ল্ড এ অর্জুনের জনপ্রিয়তা বেড়ে গেল। সম্মান বেড়ে গেল। এমনকি অর্জুনের দলের লিডার আবুলের থেকেও অর্জুনের সম্মান বেড়ে গেল।

আবুল প্রমাদ গুণল। অর্জুন এভাবে উঠে যাচ্ছে বলে নিজের স্থান টিকিয়ে রাখতে অর্জুনকে সরিয়ে দেওয়ার প্লান করল।

এই প্লানটার ব্যাপারে অর্জুনের সেই বন্ধু সাইদুর জানাল। এও জানত্র পারল,আবুলের চেয়ে অর্জুনের জনপ্রিয়তা বেশি। আবুলকে সরিয়ে দিলে অর্জুন চক্রের লিডার হতে পারে।

কিন্তু আবুলকে সরানো অত সোজা না। অনেক বছর ধরে আবুল তার কিডন্যাপিং এর ব্যাবসা চালাচ্ছিল।পুলিশ তো বটেই,বড় বড় নেতার সাথেও তার ওঠাবসা।

অর্জুন আবুল কিছু করার আগেই আবুলকে হঠানোর একটা প্লান করল। আবুলের প্রতিনিধি হিসেবে সে গোপনে পুলিশ, নেতা প্রমুখদের কাছে গিয়ে ধরণা দিতে লাগল। দামী উপহার, নগদ টাকা ইত্যাদি দিয়ে কনভিন্স করতে লাগল,আবুল বর্তমানে এই উত্তরবঙ্গে বড় একটা নারী অপহরণ এবং পর্নোগ্রাফি ব্যবসা হাতে নিয়েছে,এমতাবস্থায় তাকে যদি ধরে টিভির তালাশ টিম,খোজ টিম,ক্রাইম পেট্রোল এসব জিনিসে হাইলাইট করা হয়,তবে এতদিনের ঘনিষ্ট হলেও আবুলের মত ঘৃণ্য অপরাধীকে ধরে তাদের চক্র ভেঙে দিলে পুলিশ এবং নেতার জনপ্রিয়তা বাড়বে।

পুলিশ,নেতা সবাই এই বিষয়টা বিশেষভাবে ভাবল। সাড়া মিলতেই অর্জুন গোপণে নিজের এতদিনে তৈরি করা এই বিশাল র‍্যাকেটের সব প্লান বলে দিল,খালি নিজের কথা বাদ দিয়ে। বলল,এসব আবুলেরই সৃষ্টি।

ঘুষখোর হোক,দুর্নীতিবাজ হোক,নারী ও শিশুদের প্রতি এরকম নৃশংসতা শুনে পুলিশ,নেতা সবারই অন্তরাত্মা কেপে উঠল,আবুলকে তীব্র ঘৃণা শুরু করল।

অর্জুন তখন আবুলের কয়েকজন সাপোর্টার,এবং আন্ডারওয়ার্ল্ড এর যেসব চক্র অর্জুনকে তখনো সম্মান দেয় না,এরকম ছোট ছোট কয়েক গ্রুপের আদ্যোপান্ত পুলিশকে জানিয়ে দিল।

আবুল যেদিন অর্জুনকে খুন করার অলান করছিল,সেদিনই অর্জুন আবুলকে বলে,,”দাদা,আমি জানি আপনি আমায় আর দেখতে পারেন না। তাও বলচি দাদা,আমায় প্রাণে মারবেন না, শেষ আপনার সাথে একটা কাজ করে,আমি দল ছেড়ে দোব দাদা, অনেক টাকা হয়ে গেছে আমার,এবার ঘর সংসার করব,অপরাধ ছেড়ে দোব।”

আবুল আর অর্জুন দুইজনই জানত একজন আরেকজনকে সরাতে হবেই।আবুল তাও অর্জুনকে বলল,”তুই ভাই আমার ব্যবসাটাকে এত বড় করেছিস,তোকে আমি মারতে পারি বল? তুই চিলে যাবি,তো যা না। অপরাধ ছেড়ে দিবি তো দে। তোর উপির আমার কোন দ্বেষ নেই।”

সেইদিন অর্জুন আবুল চক্রের হয়ে শেষ একটা মেয়েকে অপহরণ করল। এবং গিফট হিসেবে আবুলকে দিয়ে বলল,”এর সাতগে মাস্তি ভিডিও আপনি করবেন দাদা,আপনি নায়ক হবেন এই ভিডিওর,এটাই আমার শেষকাজের গিফট।”

মেয়েটাকে এদিন শিখিয়ে দেওয়া হল না বাচতে হলে পর্নো তারকার মত করতে হবে,অর্জুন নিজে দাঁড়িয়ে রেইপ ভিডিও করল আবুলের সাথে মেয়েটার। কাজ শেষ হলে,আগেই আস্তানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকে ইশারা দিল। ভিডিও রেকর্ডার এর মেমরিটা পকেটে ভরল। আর দস্তানা পরে একটা ছুরি দিয়ে মেয়েটাকে জবাই করে আবুলকে হতবুদ্ধি করে দিয়ে ছুরিটা ওর কাছে রেখে পাশের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে চলে গেল,আগে থেকেই এখানে একটা গাড়ি রাখা ছিল।অর্জুন তাতে উঠে চলে গেল। 

পুলিশ দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে আবুলকে নগ্ন অবস্থায় দেখল,পাশে রক্তমাখা ছুরি।বিছানায় উলঙ্গ তরুণীর জবাই দেওয়া লাশ।

রুমের এল ই ডি টিভির ক্যাবলের সাথে আগে থেকে কানেক্ট করা অর্জুনের ডিভাইসে অর্জুন গাড়িতে মেমোরি কার্ডটা ছেড়ে দিল। টিভি অন হয়ে আবুলের ধর্ষণ ভিডিও চালু হয়ে গেল।

এতদিন আবুলের টাকা খেয়ে চামচা হয়ে থাকা পুলিশও ঘৃণা আর রাগে কাপতে কাপতে বলল,,”শুয়োরের বাচ্চা,,,,”

এলোপাথাড়ি গুলিতে আবুলের ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে গেল ঘরের মেঝেতে।

ওদিকে গাড়িতে অর্জুন একটা সানগ্লাস পরল। গান বাজছে গাড়িতে,,,
 “মুঝকো পেহচান লো, মে হু ডন”

অর্জুন এর গাড়ি ছুটেছে বাংলাদেশের রাস্তায়। সে ভাল করেই জানে,উত্তরবঙ্গের গোটা আন্ডারওয়ার্ল্ড এর একচ্ছত্র অধিপতি এখন সে।

৩. দুই বছর পর……..

দিনাজপুর শহরের পুলিশ কোয়ার্টারে সস্ত্রীক নামল ইনস্পেক্টর সাইফ।পুলিশ থেকেই তাকে গাড়িটা দেওয়া হয়েছে। এর আগে তার পোস্টিং ছিল খুলনায়,তার আগে চট্টগ্রাম,তার আগে সিলেট,,তার আগে রাজশাহী,,,,,,,

অপরাধের সাথে আপোষ না করায় মাত্র ৫ বছরের ক্যারিয়ারে বারবার ট্রান্সফার হতে হয়েছে ২৯ বছর বয়সী ইন্সপেক্টর সাইফকে। সবচেয়ে কমবয়সী ইন্সপেক্টর  হিসেবে পুলিশে যোগদান করার পর এরই মাঝে তার বাগানো হয়ে গেছে সাহসিকতার জন্য বেশ কয়েকটি মেডেল।

দিনাজপুর নাকি শান্তির শহর। অন্তত তার আগের পোস্টিং গুলোর চেয়ে শান্তির শহর বলেই সে শুনেছে। বিশ্বাসও করেছে এটা সাইফ। তার মতে দেশের সব ক্রিমিনালরাই শক্তিশালী হয় কোনো শক্তিশালী নেতার ছায়াতলে থেকে। আর এক অঞ্চলের সাথে অন্য অঞ্চলের একই দলের নেতার সৌহার্দ রয়েছে,দায়িত্ব রয়েছে। কোনো এক শক্তিশালী অপরাধী ধরা খেলেই,তার ছা হয়ে থাকা নেতার লুঙ্গি দগরে টানাটানি হবে,আর এক নেতার লুঙ্গি খুলে গেলে সে নিজে একাই ল্যাঙটা থাকবে না,তারমত সবকয়জনকে ল্যাঙটা করে ছাড়বে,সব কিছু ফাস করে দেবে।তাই এক নেতা আরেক নেতার নিরাপত্তার কথা ভেবেই সাধারণত কোনো হুমকিকে পরস্পরের মাঝে আদানপ্রদান করতে চায় না।

সেই হিসেবে সাইফ এসেছে দিনাজপুরে বদলি হয়ে। কথিত আছে,দিনাজপুরের শক্তিশালী নেতা আদতেই শক্তিশালী।কোনো অপরাধ বরদাস্ত করেন না। ছায়া দেওয়া তো দূরের কথা।সে হিসেবে দিনাজপুরে অপরাধী তেমন নেই সেটাই শুনে এসেছে সাইফ।

তবে সাইফ যে তা পুরোপুরি বিশ্বাস করে তাও না। এই তো মাত্র দুইবছর আগেও দিনাজপুরে প্রলয়কারী ঘটনা ঘটে গেছে। জঘন্য এক নারী ও শিশু পাচারকারী আবুল হোসেন মারা পড়েছে স্থানীয় পুলিশের কাছে। খুবই গোপণে যারা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে শহরের মানুষকে তটস্থ করে রেখেছিল।

শোনা গেছে,যেই পুলিশ অফিসার নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল আবুলকে তাকে আর পাওয়া যায়নি কয়েকদিন পর। সবাই বলাবলি করছিল,হয়ত নিজ চোখে ভয়াবহ অপরাধ ঘটতে দেখে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে চলে গেছে সে নিভৃতে বাকিজীবন কাটাতে। বাংলাদেশের মানুষকে যা বলা হবে তাই বিশ্বাস করবে।এই কথাটা গুজব থেকে সত্য হিসেবেই প্রচার পেল সারা দেশে।

তবে সাইফের এক্ষেত্রেই কেমন বাগড়া লাগে। সেই অফিসারের রেকর্ড যা বলে,এত বড় কৌশলী একটা চক্রের মাথাকে নিজ বুদ্ধিতে সে ধরতে পারে না। সেরকম বুদ্ধি তার ছিল না। সাইফের একটা ধারণা ছিল,অফিসারকেও খুন করা হয়েছে। অফিসার নিজেই হয়ত ঘুষখোর ছিল।চক্র সম্পর্কে অনেক কিছুই জানত। আবুলের দলের কেউই হয়ত আবুলকে সরাতে অফিসারকে নিয়ে গিয়েছিল। তবে সব জেনে যাওয়ায় নিজের উপরে ওঠাটাকে যাতে বানচাল করতে না পারে,তাই আগেই সরিয়ে দিয়েছে।

সাইফ বিদেশি গোয়েন্দা থ্রিলারের মত অবাস্তব কথা ভাবে। সত্যিই যদি এরকম কেউ করে থাকে,সে শুধু বাংলাদেশের না,সারা বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ এক ক্রিমিনাল। প্রচন্ড ধড়িবাজ,এরকম একটা লোকের যদি অস্তিত্ব থেকে থাকে আসলেই,সে কোন থ্রিলার লেখকের কল্পনাকেও হার মানাবে।

সত্যিই এমন কেউ যদি থেকে থাকে, সে এখনো আড়ালে আছে,এবং অপরাধও করছে,,এমনভাবে করছে,যাতে দুনিয়ার কেউই তার অপরাধ সম্পর্কেও জানছে না,তার সম্পর্কেও না।

সাইফ তার স্ত্রী নীলাকে নিয়ে কোয়ার্টারে উঠল। সাইফের পুরস্কার পাওয়া,সাহসিকতার খবর এখানকার পুলিশের লোকেরাও শুনেছে,বড্ড হৃদয়গ্রাহী অভ্যর্থনা জানানো হল সাইফ আর তার স্ত্রীকে।

সাইফ প্রতিদিন থানায় যায়। চেয়ারে বসে থাকে,মাঝে মাঝে ছিচিকে চুরি,ছিনতাই, ইভটিজিং এর খবর আসে। অতটা মারাত্মক কিছু না,যেদিন ঘটে সেদিনই ঘটনার সমাধান হয়ে যায়।

সাইফ আর নীলা তাই প্রত্যেক বিকেলেই ঘুরে বেড়াতে পারে দিনাজপুর শহরটা।

শহরের কেন্দ্রে বিশিষ্ট মানবদরদী সমাজসেবক অর্জুন ভট্টাচার্যের আলিশান প্রাসাদ সদৃশ বাড়িতে এলাকার গরীব দুঃখীরা সমস্যা নিয়ে আসে।অর্জুন সবার সমস্যা শুনে মন দিয়ে,টাকা দেয়,যেভাবে সাহায্য চায় করে। গরীবরা অর্জুনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,,”বড্ড ভাল মানুষ,,,মানুষ না,ফেরেশতা ”

গরীব দুঃখীরা বাসা থেকে চলে যাবার পর  অর্জুনের সেক্রেটারি সাইদুর তাকে বলে,”দাদা,,নতুন ইন্সপেক্টর এসেছে শহরে। কি করতে বলেন?উপহার পাঠাব?”

অর্জুন বলে,”না,এখনি না,,, চেষ্টা কর সে যাতে না জানে আমাদের ব্যবসা সম্পর্কে,আমি কে তাও না জানে।হ্যা,আমি শিল্পপতি, সেটা সে জানতেই পারে,,কিন্তু কোনোভাবেই আমার কথা সেধে বলার দরকার নেই,নতুন কাউকে দলে টানার চেষ্টার পরিণতি একটাই,একদিন না একদিন তাকে খুন করতে হবে,আর খুন করা আহকাল কঠিন হয়ে গেছে। লাশ এখন সহজেই পাওয়া যায়।”

সাইদুর বলল,,”আগেরজনেরটা তো পাওয়া যায় নি”

অর্জুন বলল,,”গেছে,, সেই অফিসার মারা গেছে,এরকম গুজব নইলে কেমনে ছড়াল? লাশ দেখা গিয়েছিল। সুখের বষয়,যে সচক্ষের দেখেছে,তাকে সময়মত কেটে টুকরা করে,লাশ সহ আমার মাছের ঘেরে দেওয়া গিয়েছিল,,,,তাই জিনিসটা গুজবই ছিল।”

গত দুইবছরে অর্জুন কারখানা বানিয়েছে,গরীব দুঃখীদের তাতে কর্মসংস্থান দিয়েছে,ঘের বানিয়েছে মাছের,গার্মেন্টস করেছে ঢাকায়।নিয়মিত ট্যাক্স দিচ্ছে।এত কিছুর ভীড়ে সে আসলে কে মানুষ আর দেখার চেষ্টা করে নি।

আন্ডারওয়ার্ল্ড এর একচ্ছত্র রাজা অর্জুনের আধিপত্য শুধু নারী পাচার, অপহরণ,পর্নো ব্যবসায় থেমে থাকে নি,আগের চক্রের বাচ্চা পাচার,ভারতীয় সীমান্তে আগের পরিচিত কলকাতার বন্ধু,যারা ভাগ্যের ফেরে বড় স্মাগলার এখন,তাদের সাথে ফেন্সিডিল,গাজা,ইয়াবা,এসবের ব্যাবসাতেও মন দিয়েছে অর্জুন। এত্ত টাকা তার হয়েছে যে এখন সে যেকোনো বিভাগ কিনে নিতে পারে।

দিনাজপুর শান্তির শহর,,কারণ,কোনো ছিনতাইকারী, চোর,ডাকাত অর্জুনের কথা ছাড়া কিছু করে না। আলাদাভাবে যারা করে,তাদের অর্জুনই সরিয়ে ফেলে।সব অপরাধ সে নিয়ন্ত্রণ করে,,সব কিছু,,, কাউকে খুন করবা? নিজেকে কিছু করতে হবে না,অর্জুনের লোককে ধর,অর্জুন খুবই সূক্ষভাবে টাকার বিনিময়ে কাজ করিয়ে নেবে,, কোনো মেয়েকে মনে ধরেছে? নিজে কিছু কর না,অর্জুনের লোককে ধর,,এমনভাবে মেয়েটাকে এনে দেবে,এমনভাবে মেয়েটাকে ভয় দেখাবে,যে জিনিসটা আর ধর্ষণ মনে হবে না,,, ছিনতাই, ডাকাত,রাহাজানিরর দরকার নেই,অর্জুন মাসে তোমাকে ঘরে বসিয়ে মোটা টাকা দেবে,কিন্তু যখ তোমাকে বলবে কোনো জায়গায় ইয়াবা বেচতে,তোমাকে যেতে হবে,,যখন বলবে কাউকে খুন করতে,করতে হবে,ধরা পরলেও ভয় নেই,সৎ পুলিশ তোমার চুল স্পর্শ করার আগেই থানা থেকে তোমাকে ছাড়িয়ে নেওয়া হবে।

তবে অর্জুন এর সাথে বেইমানি করলে,তুমি জাস্ট নেই হয়ে যাবে। অস্তিত্বই তোমার কখনো ছিল না,তোমার পরিবারেরও না।  যা বলবে,মুখ বুজে করবা। তোমাকে কেউ কিছু বললে,অর্জুন তো আছেই,,,,,

দিনাজপুর একটা শান্তির শহর,কারণ এটা না যে এখানে অপরাধ হয় না,কারণ এটা,অপরাধের কথা কেউ জানে না,,ভুক্তভোগী জানলেও কিছু করার নেই।একটু টু শব্দ করলে,তোমাদের পরিবারই গায়েব হয়ে যাবে।

কোনো নির্বাচন হোক,সেটা জাতীয়,মেয়র বা কাউন্সিলর,,,প্রার্থীকে আগে অর্জুনের আশীর্বাদ নিতেই হবে,অর্জুনের যাকে পছন্দ হবে সেই নির্বাচিত হবে। হাসপাতালে ডাক্তার তো ছাড়,নার্স,সুইপার,ফার্মাসিস্ট সব নিয়োগ হত অর্জুনের কথায়। সব সরকারি অফিসের সবজায়গায়,প্রত্যেকটা পদে কে আছে সেটাও ঠিক করত অর্জুন। যাদের পছমদ করত,সেই পদ তাকে দিয়ে এক ঋণে জড়াত। কোনো দিন যেকোনোভাবে ঋণ তাকে শুধতেই হবে। শয়তানের কাছে চৌরাস্তায় নিজের আত্মা বিক্রি করার মত।

সব ঠিক ছিল। কলকাতায় সেই শুভব সেনকে খুনের ৭ বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রথম দুইবছর বিভিন্ন লোকের পায়ে চুমু খেয়ে বেড়াতে হয়েছে অর্জুনের। আর আজ অর্জুনের কথায় উত্তরবঙ্গের প্রত্যেকটা গাছের পাতা নড়ে,,,,

ইন্সপেক্টর সাইফের সেই অজ্ঞাত অপরাধী সম্পর্কে আকাশ কুসুম কল্পনাটা তার মনেই রয়ে যেত। কোনো এক গল্প যদি কখনো সে লেখে,হয়ত এই কল্পিত অপরাধীটা তার ভিলেন হবে। ইন্সপেক্টর সাইফের কল্পিত অপরাধী তার দুঃস্বপ্নে আসত,কল্পনা বাস্তবে আসার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা মনে ঢুকলেই শিউরে উঠত সাইফ। 

সব ভাল চলছিল।দিনাজপুরে এসে সাইফের অলস সময় কাটছিল। জীবনের প্রথমবারের মত সে তার সুন্দরী স্ত্রীকে সময় দিতে পারত। অফিসে ৮ ঘন্টা ডিউটি মাত্র,অপরাধ নেই,অভিযোগ আসে না,অতিরিক্ত কাজও নেই।

অর্জুনেরও ভালই কাটছিল। প্রতি রাতে অজস্র শয্যাসঙ্গিনী দের ভীরে প্রগতিশীল এক সুন্দরী মালিহা আজমকে খুবই মনে ধরল তার। এত বড় রাজত্বের এক রাণী বোধ হয় পেয়ে গেল সে।

তখনি এক আজব ঘটনা ঘটল। গণিত উৎসবের এক অনুষ্ঠানে ডিউটি পড়ল সাইফের। সাইফ দেখল,জুনিয়র ক্যাটাগরিতে জন্ম থেকে পঙ্গু এক কিশোর ক্রাচে ভর করে ডিসি সাহেবের কাছ থেকে প্রথম পুরস্কার নিল।

ছেলেটা ক্রাচে ভর দিয়ে পুরস্কারটা হাতে নিয়ে তার বাবাকে দেখাতে দ্রুত আসতে লাগল। কিন্তু ক্রাচটা একটা গর্তে পড়ে ছেলেটা পড়তে লাগল,কিন্তু মাটিতে পড়ার আগে,ক্ষীপ্রগতিতে সাইফ ধরে ফেলল ছেলেটাকে। এদিকে ছেলেটার বাবা ছুটে এল। অসংখ্য ধন্যবাদ দিল সাইফকে। সাইফ ছেলেটার দিক তাকাল। ছেলেটা ধন্যবাদ দিয়ে হাসল সাইফকে দেখে।

অনুষ্ঠান শেষ হল। বৃষ্টি শুরু হল। যে যেখানে পারে আশ্রয় নিল। এদিকে ছেলেটা আর ছেলেটার বাবা মা বৃষ্টিতে এক টিনের ঘরের নিচে আশ্রয় নিল।সাইফও সেখানে দাড়াল। 

এক ঘন্টা টানা বৃষ্টির মধ্যে আটকা পড়ে পরিবারটির সাথে সাইফের ভালই আলাপ হল। আলাপের ফাকে জানতে পারল,ছেলেটা জন্ম থেকে পঙ্গু,ছেলেটার মা গৃহিণী, ছেলেটার বাবা শহরের পানি সরবরাহকারী সংস্থার একজন অফিসার।

সাইফ পুলিশের গাড়িতে করে পরিবারটাকে পৌছে দিল তাদের বাসায়। যাবার পথে তার কোয়ার্টার পড়ে। পঙ্গু ছেলেটাকে সে বলল,”আংকেল,ওই যে আমার বাসা,তুমি বেড়াতে এসো মাঝে মাঝে”

সেরাতে পঙ্গু ছেলেটার বাবার ফোনে একটা কল আসল। অর্জুনের দলের এক পাতিগুন্ডা ফোন করেছে। অর্জুনই সেই পঙ্গু ছেলেটার বাবাকে পানি সাপ্লাইয়ের অফিসে অফিসার বানিয়েছে।যখন মোটা টাকা বেতনের চাকরিটা তাকে দেওয়া হয়,তখনি বলা হয়েছিল,এর পরিবর্তে তাকে কিছু একটা করতে হবে।।

লোকটার ফোন সিয়াওমি মডেলের। কেউ কল করলে একটা অপশনে ক্লিক না করলে সব কথা রেকর্ড হয়ে যায়। রাতে ঘুম থেকে উঠে ধরতে হল বলে লোকটা আর সেই অপশনে ক্লিক করতে পারল না।

তাকে বলা হল,একটা নির্দিষ্ট ছোট একটা পাড়ার লোকেরা অর্জুনের মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরোধী পক্ষের সমর্থক। সেই পক্ষের জনপ্রিয়তা বেশি। কিন্তু এই প্রার্থী অর্জুনকে ভাল উপহার দিয়েছে। জিতাতে হবেই এই প্রার্থীকে,কিন্তু সম্ভব না সেটা সাধারণ ভাবে নির্বাচন হলে। তাই অর্জুন সেই পক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিল প্রার্থীতা প্রত্যাহারের জন্য।প্রার্থী কথা শোনে নি। অর্জুনের কথা আইন। মুখের উপর না বলার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।  পুরো ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট কয়েকটা বিল্ডিং এ এই প্রার্থীর সাপোর্টার রা থাকে। পঙ্গু ছেলের বাবার দায়িত্ব,ওই কয়টা বিল্ডিং এ সাপ্লাইয়ের যে পানি যাবে,তাতে বিষ মেশাতে হবে।

পঙ্গু ছেলের বাবা নির্দেশ শুনে হতবাক। সে ফোন রেখে দিল। এরপরের কয়্বকদিন আরো ফোন আসতে লাগল। সে ফোন উঠাল না। এক পর্যায়ে অর্জুনের লোকেরা তার অফিসে গিয়ে ধরণা দিতে লাগল। লোকটা বাজে ব্যবহার করে তাদের ফহাড় ধরে বের করে দিল।

আর উপায় না পেয়ে সেই বিরোধী প্রার্থীকে খুন করতে হল অর্জুনকে। সাধারণ লোককে খুন করে লাশ গুম করলে কয়েকদিন পর মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু নিজের কথা রাখতে বিগত ৭ বছরের মধ্যে অর্জুন এই প্রথম ভুলটা করল।কাউন্সিলর প্রার্থীর খুনের জন্য সারাদেশে আলোড়ন হল। 

অর্জুন মানুষকে দিয়ে একটা গুজবের সৃষ্টি করল,কাউন্সিলর প্রার্থীর স্ত্রী পরকীয়ার জেরে স্বামীকে খুন করিয়েছে। ব্যস,বাংলাদেশের মানুষ সব বিশ্বাস করে। গুজবটাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করে ছড়াল তারা। গ্রেফতার হল কাউন্সিলর প্রার্থীর বউ,আর সাথে বস্তির একটা লোককে টাকা দিয়ে দাড় করানো হল পরকীয়া প্রেমিক হিসেবে।

এখন এই খুনের রাখঢাক করার একটা বাধা মাত্র। পঙ্গু ছেলের বাবা,এই লোকটা রাজি হলেই বিষয়টা এতদূর গড়াত না। কয়েকটা লোকের মৃত্যুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নিজের করে নেওয়া যেত।

স্বাভাবিকভাবেই পঙ্গুছেলের বাবার মৃত্যু পরোয়ানা জারি হল। একরাতে পঙ্গুছেলের বাবাকে কারা জানি ডাক দিল বাইরে থেকে। পঙ্গু ছেলেটা জানালা দিয়ে দেখল,টেনে হিচড়ে গাড়ির ভিতর ঢুকানো হচ্ছে তার বাবাকে। সেই যে তার বাবা গেল,আর আসল না।

প্রত্যেকটা খুনের মতই হল ব্যাপারটা। নিহতের পরিবারকে অর্জুনের লোকেরা প্রচুর টাকা দিল,আর বলল,টু শব্দ করলে মেরে ফেলবে বাকিদেরকে। পঙ্গুছেলের মাকে বলতে বলা হল,তার স্বামী তাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের সাথে চলে গেছে।

বিধবা মহিলাও সেটা মেনে নিল। কিন্তু পঙ্গু ছেলেটা সেটা মানতে চাইল না। চিল্লাচিল্লি করেও যখন তার মা কিছুই বলল না,এক ঝড়ের রাতে,ক্রাচে ভর করে  রওনা দিল ইন্সপেক্টর সাইফের বাড়িতে।

রাতের বেলা দরজা টাকাল। বাইরে ঝড়। নীলা দরজা খুলল। পঙ্গু ছেলেটা ভিজে জবুথবু হয়ে দাঁড়ানো। ভিতরে আনতেই কাঁদতে কাঁদতে বলে দিল সাইফকে, “আমার বাবাকে কারা যেন নিয়ে গিয়েছিল জোর করে গাড়িতে করে।”  

সাইফ ছেলেটার কথা শুনল। বলল,”তুমি একা এতরাতে এখানে কেন এসেছ? তোমার মা কোথায়?”

ছেলেটা বলল,,”মাকে কয়েকটা লোক অনেক টাকা দিয়ে বলেছিল,এটা রাখ কাউকে কিছু বললে আমাকে আর তাকে মেরে ফেলবে,সবাইকে যেন বলে বাবা চলে গেছে আমাদের ফেলে”

সাইফ বলল,,”চলতো তোমাদের বাসায় এখনি। তোমার মা একা কি করছে?”

সাইফ কাউন্সিলর প্রার্থী নিখোজ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই অনেক প্রেশারে ছিল। স্থানীয় পত্রিকা আর কয়েকটি চ্যানেল তার পিছনে পড়েছিল তার তদন্ত সম্পর্কে জানতে। তারপর হঠাৎ বলা হল পরকীয়ারত স্ত্রীর হাতে মৃত্যু।  এই খবর টা প্রচার পেলেও ইনস্পেকটর হিসেবে সে নিজে জানে আসলে এটা জাস্ট গুজব,পুলিশ কিছু জানে না। আর আজ এই ছেলে বলছে এর বাবাও নাকি নিখোঁজ।  কোনো যোগাযোগ নেই তো দুটো ঘটনায়?

সাইফ ছেলেটার বাসায় এসে দেখল ছেলেটার মা মরে পড়ে আছে। গলায় কিছু পেচানোর দাগ। তার মানে আসলেই কিছু ঘটছে এখানে। পঙ্গু ছেলের বাবাকে নিখোজ। মাকে সাবধান হতে বলেও মেরে ফেলা,,, কিন্তু কেন?

বাসাটার উপর কেউ নজর রাখছিল? দেখেছিল পঙ্গু ছেলেটা একা একা পুলিশের কাছে গেছে? কিন্তু ছেলেটাকে কোনো কারণে আটকাতে না পেরে মাকে মেরে ফেলল? বাচ্চার কথা থেকে মায়ের কথার গুরুত্ব পুলিশ বেশি দেবে বলে?

কিন্তু কেন একটা পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইবে কেউ।কথা শুনে তো সেদিন মনে হয়েছিল এদের কোন শত্রু থাকতে পারে না।

পঙ্গু ছেলেটা শোকে স্তব্ধ হয়ে রইল। সাইফ আর নীলার বাসায়ই সে থাকতে লাগল।

সাইফের চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। পুরো বিষয়টা আবার সে ভাবতে লাগল। প্রথমে ছেলেটার বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সম্ভবত মেরে ফেলা হয়েছে। তারপর তার মাকে শিখানো কথা বলতে বলা হয়েছে। কিন্তু ছেলে লুকিয়ে তা শুনে ফেলে,এবং বাবাকেও অপহৃত হতে দেখে,ছেলে মায়ের সাথে নিশ্চয় ঝগড়া করে,এবং এক পর্যায়ে পুলিশ ডাকতে আসে পরিচিত বাসায়।কোনো কারণে আটকাতে পারে না তাকে কেউ। কিন্তু বাচ্চার কথার দাম বেশি না, বড়দের বেশি,বাচ্চা পুলিশ নিয়ে মায়ের কাছে এলে মা সত্যি বলতে পারে ভেবে মাকে মেরে ফেলা হল।

কিন্তু কেন? 

সাইফ ছেলেটার বাড়ি ঢুকে সার্চ করে। দেখে যে বাসায় ব্যারিকেড দেবার পরেও কারা জানি ঢুকে কিছু তল্লাশি।করেছে। সাইফ বুঝতে পারে,কেউ কিছু খুজছিল। কিন্তু কি খুজছিল,এবং সেটা পেয়েছে কিনা,তা বলতে পারে না সাইফ।

ড্রয়ারগুলো টেনে বের করার সময় সাইফ কোরান শরীফ দেখে। কোরান শরীফ টা ধরে ড্রয়ার থেকে বের করে ড্রয়ারটা ভাল করে খুজতে। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করে কোরান শরীফটা একটু ফাকা,তার অভিজ্ঞ চোখ বলেই ধরা পড়ল।

ফাকা পেইজ খুলতে দেখল,একটা মেমোরিকার্ড রয়েছে সেখানে। ঠিক সেই আয়াতটার উপর,”নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কে অবগত”

মেমোরিকার্ড কেউ কোরান শরীফের ভিতর রাখতে পারে না। এ অসম্ভব। কার্ডটা নিয়ে  ফিরে চলল সাইফ। কার্ডটা সে তার মোবাইলে ঢুকাল।

কার্ডের সব কিছু ফাকা। গ্যালারীতে একটা ভিডিও,আরেকটা অডিও।

ভিডিও তে ক্লিক করতেই পঙ্গু ছেলের বাবা বলল,”আমি মাইনুল হক।দিনাজপুর পানি উন্নয়ন ও সরবরাহকারী বোর্ডের অফিসার। আমি এই ভিডিও রেকর্ড করছি এক কারণে,আমার ধারণা আমাকে মেরে ফেলা হবে। কারণ আমি কবুব শক্তিশালী এক লোকের কথা মুখের উপর অমান্য করেছি।”

তারপর মাইনুল হক বর্ণনা দিল কি কি হয়েছে। শেষে বলল,আমি জানি আমার কিছু হলে আমার মোবাইল থেকে ওরা সেই প্রমাণ গায়েব করে দেবে। তাই আমি সেই কলের রেকর্ড আর আমার ভিডিও এখানে রেখে,কার্ডটা কোরান শরীফের ভিতর রাখব। যে পাবে তার সুবিধার জন্য পুরো মেমোরি কার্ড ফাকা করে দিলাম।

সাইফ অডিও রেকর্ডটা শুনল। তার হাত পা কাপছে। অর্জুন ভট্টাচার্যের কথা বলছে এরা? বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিল্পপতি অর্জুন ভট্টাচার্য?  এ যফি আদলেই অপরাধী হয়,কেন তার নাম উচ্চারণ করার মত বোকামী করল তার লোক। বোঝাই যাচ্ছে,বেশ বড় অপরাধী সে।এরকম ভুল কেন করল?

সাইফ আরো তদন্তে নামল। প্রথমে খুজে বের করল সেই কল দাতাকে। দেখল,কলদাতা আসলে এক ফটকা মাস্তান,যাকে অর্জুন নতুন নতুন দিলে এনেছে,এতে তার গির্বের সীমা নেই,তাই সে মাইনুল হককে থ্রেট দেওয়ার সময় নিজের গুরুত্ব বোঝাতে বলদের মত একদম গডফাদারেরই নাম বলে দিয়েছে।অর্জুন যদি আসলেই ক্রিমিনাল হয়,সে খুশি হবে না এই লোকের উপর।

এদিকে মাইনুল হকের স্ত্রীকে মারার সময় অর্জুনের লোকেরা বাসায় সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছিল। কে কে ঘরে আসে সেটা দেখতে। তারা স্পষ্ট দেখল ইন্সপেক্টর সাইফ কোরান শরীফের ভিতরে একটা মেমোরি কার্ড পেয়ে মোবাইলে ভরে চালিয়ে দেখল।

তারাও বুঝে গেল সাধারণ কার্ড কখনওই কেউ কোরান শরীফের ভিতর লুকিয়ে রাখবে না।

 অতএব তারা এখন ইন্সপেক্টর সাইফের পিছু নেওয়া শুরু করল। সে কোথায় যায়,কি করে এই রিপোর্ট অর্জুনের বাহিনীকে জানানো শুরু হল।

সাইফ সেই ফটকা মাস্তানের কাছে যাবার পরই ভয়ে সে সব স্বীকার করে ফেলল। ফটকা মাস্তান কার কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছে সেটা বের করল সাইফ।

এটা জানতে পেরে অর্জুনের লোকেরা,তাদের নিজের দলের মধ্যে যারা যারা ফটকা মাস্তানের কাছে ওই ফোন দেবার আদেশের কথা জানত,প্রত্যেককে মেরে গণকবর দিয়ে দিল।

সাইফ ফটকা মাস্তানের কথা শুনে তার আদেশকারী দের খুজতে খুজতেই সার হল।ফটকা মাস্তান থেকে অর্জুন পর্যন্ত কানেকশন পুরোই অফ।

সাইফ বুঝে গেল,তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে। সাইফ তাই এক সপ্তাহ চুপচাপ বসে রইল। থানায় যাওয়া আর ফিরে বাসায় আসা। এর বাইরে কোথাও গেল না।সাইফের আগের পোস্টিং গুলোতে অভিজ্ঞতা ছিল,কনস্টেবল, হাবিলদার,ছোট পদস্থদের দায়িত্ব দেওয়া হলে অপরাধীদের কানে তদন্তের কথা তাড়াতাড়ি যায়। কারণ খুব কম টাকায়ই এসব ছোট পদস্থদের বাগানো যায়।

খুবই ক্যাজুয়াল ভাবে মৃত কাউন্সিলর প্রার্থী সম্পর্কে খোজ নিতে লাগল সাইফ,এখন এটা রুটিন জিজ্ঞাসাবাদ,কারণ ধারাবাহিক সাংবাদিক দের প্রতিবেদন এর কারনে অপরাধী গ্রেফতার হলেও পুলিশকে তদন্ত দেখাতে হয়।এছাড়া ফটকা মাস্তানের সাথে কাউন্সিলর প্রার্থীকে মিলাবে সাইফ এটা অর্জুনের লোকদের ধারণার বাইরে ছিল।

সাইফ খোজ নিয়ে জানল কাউন্সিলর আর তার স্ত্রী ৩০ বছরের বিবাহিত জীবনে সুখী ছিল,তাদের বিয়েও হয় প্রেম।করে, তাদের ৩ টা বাচ্চা আছে,,তারা লজ্জায় পুলিশের কাছে আসল না,কিন্তু বাসার অন্য লোকেরা বলল,প্রার্থীর স্ত্রী প্রার্থীকে খুবই ভালবাসতেন।

এদিকে অর্জুনের নিজের দলের ফটকা মাস্তানকে কলের আদেশ দেওয়া চেইন অফ কমান্ডের লোকগুলোকে মেরে গুম করে ফেলার কথা সাইফ বুঝতে পারে নি। সাইফ ভেবেছিল ওরা আত্মগোপন করেছে। সব বদলে গেল যখন সাইফ খবর পেল ফটলা মাস্তানের কাছে যাদের নাম পেয়েছে,তাদের একজনের পচা গলা লাশ পাওয়া গেছে নদীতে।

সমস্যা হল,এই লোকের আগের ইতিহাস বলে সে ছিনতাইকারী ছিল,কিন্তু ৩ ববছর আগে ছেড়ে দিয়েছে,কিন্তু তার টাকা পয়সার কমতি ছিল না।

বিরোধী প্রার্থী মারা যাওয়ায় প্রতিপক্ষ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর হয়। সাইফ খোজ নিয়ে জানে এই কাউন্সিলর অর্জুন ভট্টাচার্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে।

মাইনুল হকের অডিও রেকর্ডের উপর ভিত্তি করে চাইলেই সে পারত অর্জুনকে গ্রেফতার করতে। কিন্তু গ্রেফতার করে লাভ হবে না। ফটকা মাস্তানের কথায় এরকম বিশিষ্ট শিল্পপতিকে গ্রেফতার করা যায় না।

অতএব তদন্ত মাথায় তুলে সাইফ বসে রইল। হাতে একটা প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিছুই করার রইল না তার।

এদিকে পেপারে বড় করে খবর এল অর্জুন ভট্টাচার্য আর মালিহা আজমের বিয়ের হবে। এংগেজমেন্টের জন্য একটা অনুষ্ঠান হবে। পেপারে ছবি দেখাচ্ছিল। এই মুহুর্তে মাইনুল হকে ছেলে মিহির পেপারে ছবি দেখে আতকে উঠল। সাইফ কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল,”এই লোকটা বাবাকে টেনে হিচড়ে গাড়িতে উঠিয়েছিল”

সে আঙ্গুল দেখাচ্ছে অর্জুনের ছবির দুই তিন সারি পিছনে দাত বের করে থাকা এক লোকের দিকে। 

সাইফ আবার জোর পেল। সাথে সাথে খোজ নিল ওই লোকের ব্যাপারে। লোকটার নাম কেষ্ট। কেষ্ট ৭ বছর আগেও পকেটমারি করত শহরে,বেশ কয়েকবার গণধোলাই খেয়েছে। কিন্তু এরপরই হঠাৎ তার ভাগ্য চেনজ হতে থাকে,আলিশান ফ্লাটে থাকতে শুরু করে,বাইক কেনে দামী। অর্জুনের সাথে যখন ছবিতে আছে,সে অর্জুনের খুবই ঘনিষ্ঠ।

সাইফ সেরাতে কেষ্টর ফ্লাটে ঢুকে কেষ্টকে গ্রেফতার করল। ওর কাভহে ওয়ারেন্ট ছিল না,কিন্তু সেটা সমস্যা করে নি।কারণ ফ্লাটে ঢুকে সে বেশ কিছু নেশার দ্রব্য পায়।

যাই হোক,কেষ্টকে ধরে সে একটা জিনিস বোঝে,কেষ্ট অর্জুনের বিশ্বস্ত চাকর। এখন কেষ্টকে যদি কালকের ভিতর কেউ মাদক মামলার পরেও ছাড়িয়ে নিতে পারে,তবে সাইফ সিওর হবে অর্জুন অনেক বড়মাপের ক্রিমিনাল। যদি কেউ তাকে না ছাড়ায়,তবে আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে।

কেষ্টকে হাজার পিটালেও তার মুখ থেকে একটা আওয়াজ বের হল না। পকেটমারিং করতে গিয়ে মাইর খাওয়ায় সে অভ্যস্ত। পরেরদিন আসলেই কেষ্টকে ছাড়িয়ে নেওয়া হল।

সাইফ এবার ডাইরেক্ট অর্জুন সম্পর্কে খবর নেওয়া শুরু করল। মাত্র দুই বছর আগে অর্জুনকে কেউ চিনত না। আর এখন অর্জুন এক বিশিষ্ট সজ্জন এদেশের। সাইফ ২ ববছর আগে অর্জুন কে ছিল সেটা নিয়ে পড়ল নাওয়া খাওয়া ছেড়ে।

২ বছর আগের ইতিহাস খুব বিচক্ষণ ভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। যেন ২ ববছর আগে অর্জুনকে কেউ চিনত না। বাতাস ফুড়ে যেন এরকম এক বড়লোকের আবির্ভাব হয়েছে।

সাইফ নিজেও বুঝতে পারল না কেন এবং কিভাবে সে অর্জুনের পিছু নিল। তবে ও এটা বুঝতে পারল,কুখ্যাত আবুল চক্রের নেতা আবুল নিহত হবার পরেই অর্জুনের উত্থান হয়েছে। সাইফ এবার আবুলের ব্যাপারে খোজ নেওয়া শুরু করল।

অর্জুন কে তখনো সাইফ জানে না। তবে অর্জুনের জীবনে করা সবচেয়ে বড় ভুলটা সাইফ ধরতে পারল। অর্জুন আবুলকে পথ থেকে সরাতে নিজের তৈরি করা বিশাল নারী ও শিশু পাচার নেটওয়ার্কটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছিল তৎকালীন পুলিশ অফিসার এবং নেতাদের। এবং আবুলকে মারার পর শেষ প্রেস কনফারেন্স এ অর্জুনের নাম মুখে না নিলেও যতটা পারে আবুলের নাম করে পুলিশ অফিসার বলে দিয়েছিল। বিশ্বাসযোগ্য করতে অর্জুন সত্যটা বলে দেয়। পরে ভাবে পুলিশ তাকে চিনে ফেলেছে।ভবিষ্যতে ব্লাকমেইল করতে পারে।তাই সে সরিয়ে দিয়েছিল তাকে।কিন্তু বিগত খবরের কাগজে আবুলের নামে সত্য কথাগুলোর রেকর্ড পেয়ে গেল সাইফ। একটু খিটিয়ে দেখতেই সে বুঝে গেল,আবুল জীবনেও এই বিশাল নেটওয়ার্ক এর ব্যাপারে কিছুই জানত না,এই নেটওয়ার্ক তার ছায়াতলে গড়ে তলে এক লোক,যে দেখতে হ্যান্ডসাম,কথা বলা পুরো কলকাতার মানুষের মত,,, যেমন “দেব” কে বলে “দোব” , “করছি” কে করচি”  কথায় কথায় “বৈকি” “মাইরী” এসব বলত সে। আন্ডারওয়ার্ল্ড এর অত্যমত জনপ্রিয় এক লোক।

খুবই মিল আছে বর্ণণায়। অর্জুন ভট্টাচার্য।

৪.

অর্জুন ভট্টাচার্যের আংটি বদল হচ্ছিল সেদিন মালিহা আজমের সাথে। পাত্রী প্রগতিশীল আর পাত্র গোড়া হিন্দু,তাই সিদ্ধান্ত হল বিয়ে হিন্দু রীতিতেই হবে। বিয়ের দিন ধার্য হল।

বিয়ের পীড়িতে যখন অর্জুন ভট্টাচার্য বসল। তখনি ইন্সপেক্টর সাইফ বিয়ের পীড়ি থেকে উঠিয়ে সারাদেশের মিডিয়ার সামনে গ্রেফতার করল অর্জুন কে।

অর্জুনকে টেনে হিচড়ে গাড়িতে তোলার দৃশ্য সব জায়গায় দেখানো হল। নিজের দলের লোকদের উপর কড়া নির্দেশ ছিল অর্জুনের,যেন তার সামনে কখনওই গুন্ডামি না করে,অর্জুন নিজের ইমেজ ক্লিন রাখতে চায়। হাত নিশপিশ করলেও কিছুই বলল না তারা। অর্জুন এখনো হতবিহবল। অর্জুনের ভারত থেকে আসা আত্মীয়রা হতবাক,মালিহা আজমের আত্মীয়রা হতবাক।

সাইফ অর্জুনকে লক আপের ভরার সাথে সাথে অর্জুনের বুলি ফিরল। 

“কি হল এটা?”

সাইফ তার চেয়ারে বসল।

“আমি বলচি,এটা কি হল দাদা?”

সাইফের বিনিদ্র রজনীগুলোর প্রসূত লাল টকটকে চোখ,চোখের নিচে কালি,সাইফকে মনে হচ্ছি পাতালপুরীর কোন অসুর।

বিয়ের সাজে অর্জুনের সুন্দর চেহারা আরো ঝলমল করছিল।

সাইফ ঠান্ডা এক ঘৃণার চোখে তাকাল।

সাইফ অর্জুনের জীবনকাহিনী বলতে লাগল। গত ৩ মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে জোগাড় করা অর্জুনের জীবন বৃত্তান্ত।

সেই শুভম সেন আর অর্পণা দাশ থেকে শুরু করে মাইনুল হক হত্যা,সবকিছুর নির্ভুল বিবরণ দিতে শুনে অর্জুনের মাথা চরকির মত ঘুরে উঠল। শিক ধরে পতন ঠেকাল। কানে তার বাজছে সাইদুরের কথা,,”দাদা,ইন্সপেক্টরকে কি টাকা দেব?”

অর্জুন বলল,,”কত টাকা চাস? ছুধু এমাউন্ট টা বল, একটা তুড়ি বাজাব,টাকার বিছানায় গড়াগড়ি খাবি। বল,কত চাস?”

সাইফ রক্ত লাল হিমশীতল চোখে তাকিয়ে বলল,,”কত টাকা দিলে গত ৭ বছরে সে কয়েক হাজার মানুষের সর্বনাশ করেছিস,তার ক্ষতিপূরণ হবে?”

অর্জুন পালটা ঠান্ডা গলায় বলল,,”বলেচি তুড়ি বাজালে টাকার বিছানায় গড়াবি,কিন্তু এও বুঝে নিস,তুড়ি বাজালে তোর মুন্ডুহীন বডিটা নর্দমায় গড়াবে,,,”

সাইফ কিছু বলার আগে থানার সামনে গাড়ি বহর থামল। শহরের বড় বড় নেতা,সরকারি বা বিরোধী,সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীরা এসে ভিড় জমাল।

“আপনি কোন চার্জে অর্জুন ভট্টাচার্যের মত মানুষকে তার বিয়ের মন্ডপ থেকে তুলে আনলেন?”

“আপনার মাথায় কি সমস্যা আছে?”

“ওয়ারেন্ট ছিল আপনার কাছে?”

“আচ্ছা,আপনারা কি আসল অপরাধী খুজে পান না? এভাবে একটা মানী লোকের সম্মান নষ্ট করলেন? মানহানি মামলা দেওয়া উচিৎ।”

“চুউউউউউউউউউউপ”

পুরো থানা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কাপতে কাপতে সাইফ বলল,,”খুনের চার্জে গ্রেফতার করেছি,খুন,ধর্ষণের চার্জে,,,, ওয়ারেন্ট লাগে না এতে,,,, সন সত্য সামনে আসবে,, শুধু এদেশে না,৭ বছর আগে ভারতের কলকাতায় কি করা হয়েছিল,কি বিজ্ঞপ্তি এসেছিল সেটাও দেখানো হবে।”

কোত্থেকে এক উকিল এসে সবার সামনেই হন্তদন্ত হয়ে আদালতের রিলিজ পেপার দিল। কিছু বলার আগেই,পুলিশ কনস্টেবল নিজ থেকে হাজত খুলে দিল।

বিয়ের সাজ পরা মালিহা আজম কাঁদতে কাঁদতে এসে অর্জুনকে জড়িয়ে ধরল। অর্জুন থমথমে মুখে মালিহাকে নিয়ে বের হয়ে গেল। সাংবাদিক রা পিছন থেকে অনেক প্রশ্ন করছিল। অর্জুন গাড়িতে ওঠার সময় একটা কথাই বলল,,”এই মেয়েটাকে যে লগ্নভ্রষ্টা করল,তার বিচার ভগবান করবে”

 তীব্রদৃষ্টিতে থানার জানালায় দাঁড়ানো সাইফকে দেখল সে। একই ঘৃণামাখা দৃষ্টিতে সাইফ তাকিয়ে রইল অর্জুনের দিকে।

৫.

বিয়ের পিড়িতে হাতকড়া লাগানো, আর টেনে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নটা অর্জুন প্রায় একমাস ধরে দেখল। অর্জুনকে কখনওই এত রাগতে দেখা যায় নি। 

সাইদুর আর কেষ্ট দাঁড়ানো অর্জুনের চেয়ারের সামনে। কি বলবে শোনার অপেক্ষা।

“এই সাইফ কুত্তার বাচ্চার সম্পর্কে যা জানিস আমায় বল,ঠিকুজি কুষ্টি এনে দে আমায়,,, দুর্বলতা,অভ্যেস,,সব বল,,,কোথায় কোথায় যায়,, বাছায় কে কে আচে সব বল আমায়,,,,”

সাইদুর বলল,,”শুধু বউ আছে দাদা,নাম নীলা। কোয়ার্টারে থাকে। পুলিশ কোয়ার্টারে। আর সেই মাইনুল হকের লেংরা বাচ্চাটা থাকে সাথে”

অর্জুন বলল,,”মাইনুল হক কে আবার?”

সাইদুর বলল,,”ওই যে দাদা,যাকে সাপ্লাইয়ের পানিতে বিষ মিশাতে বলা হয়েছিল। যাকে দিয়ে বলা হয়েছিল সেই ফটকা মস্তান রফিক,সে সব গুবলেট করে দিয়েছিল,আপনার নাম বলে দিয়ে,মাইনুল ওর মোবাইলে রেকর্ড করে কথা,সেটা মেমোরি কার্ডে ঢুকিয়ে এক কোরান শরীফের ভিতর লুকিয়ে রাখে,সেটা সাইফ পায়,সেখান থেকেই আপনার নাম জেনেছে দাদা।”

অর্জুন বলল,,”রফিককার মাথা আমার কাছে  নিয়ে আয়। আর সাইফের বউকে তুলে আন। মাইনুলের ছেলেকে মেরে ফেল।”

সাইদুর বলল,”দাদা,মাথা গরম করেন না। সারাদেশ জানে সাইফ আপনাকে তুলে এনেছে,এখন ওকে কিছু করলে সবাই আপনার দিকে আঙ্গুল উঠাবে দাদা।”

অর্জুন বলল,,”একমাস ধরে কি আমি ঘাস কেটেছি? অই যে থ্রেট দিল কলকাতার ব্যাপারটা আনবে,এটা শুনে কলকাতায় লোক পাঠিয়ে শুভম সেনের বাবা পুলিশ সুপার সৌরভ সেনকে ভোগে পাঠানো লাগল,আমার নামে বের হওয়া সব রেকর্ড নষ্ট করতে হল আর্কাইভস আর ইন্টারনেট থেকে। আমার অতীত যখন এভাবে মুছতে পেরেছি,কিছু না ভেবে কি আমি বলেছি তোদের? এক কাজ কর,ওই লেংরা ছেলেটা আর সাইফের বউয়ের ছবি আন,সবাইকে দে, যেখানে পায় মেরে ফেলে যেন।”

কেষ্ট সাইফের বউয়ের ছবি জোগাড় করল। অর্জুন কে দিল। ছবি দেখে অর্জুনের ভিতরে শিউরে উঠল। সে বলল,,”সাইদুর,এই মালটাকে মারবি না। সাইফকে শহরের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা কর। আমি নিযে যাব ওর বাড়ি,,,,”

৬.

সাইফ খবর পেল কলকাতায় যেই সোর্স থেকে অর্জুনের বিষয়টা শুনেছিল,সেই সোর্সে থাকা সবাইকে লোক দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। সাইফ এতটাই অগ্নিশর্মা হয়ে গেল যে নীলার সাথে দুর্ব্যবহার করল। তারপর বাসা ছেড়ে বের হয়ে গেল। নীলা পিছন থেকে বলল,,”মাথা গরম কর না,আমি অপেক্ষা করব খাবার নিয়ে,রাতে তাড়াতাড়ি এসো বাসায়।”

সাইফ গাড়ি চালাতে লাগল। আগের দিন নীলার সাথে হওয়া কথোপকথন এর কথা মনে পড়তে লাগল,যেকারণে নীলার উপর মেজাজ বেশি খারাপ ছিল।

“তোমার কাছে যা শুনলাম,এই অর্জুন এর মত লোকের সাথে তোমার কখনওই দেখা হয় নি। এ জাত শয়তান। এর পিছনেএভাবে লাগার আগে তোমার ভাবা উচিৎ ছিল।”

সাইফ বলেছিল,”কি ভাবতাম?”

নীলা বলেছিল,,”আমার কথা,আমাদের ভবিষ্যৎ এর কথা”

সাইফ বলেছিল,”বাজে কথা রাখ,আমি থাকতে তোমার কিছু হবে না।”

সাইফ গাড়ি চালাচ্ছে। ওর মোবাইলে ফোন এল একটা, কে জানি বলল,”অর্জুনের ব্যাপারে কিছু কথা বলব আপনাকে,ও আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে,আমি ওর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিব আদালতে,আমার কাছে একটা জিনিস আছে,যা জানলে ওর বিরিদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা আপনার জন্য সুনিধা হবে।”

শহরের বাইরে একটা ঠিকানা বলল লোকটি।সাইফ কিছু না ভেবে চলে গেল গাড়ি নিয়ে। রাত নেমে এল,নীলা ফোন দিচ্ছে বারবার। ৫ বার। খেতে ডাকতেছে,মেয়েটা পারেও বটে,,এত জেদ!

মোবাইল সাইলেন্ট করে রাখল সাইফ। ঠিকানা অনুযায়ী গেল সে।  ঠিকানাটা একটা  শ্মশান। শ্মশান এর গেইটে লেখা, “বাসায় গিয়ে দেখ,অর্জুন তোর বউয়ের শরীরে প্রমাণ রাখতেছে।”

সাইফ এক দৌড়ে গাড়িতে উঠল। মেসেজ এসেছে একটা ১ ঘন্টা আগে। নীলা লিখেছে,,”প্লিজ ফোনটা ধর,,আমাকে বাচাও,,প্লিজ,,,,”

সাইফ নীলার ফোনে কল দিতে লাগল। কেউ রিসিভ করল না।

বাসার দরজা খোলা,সাইফ জানতে চায় না বাসায় কি হয়েছে,,,জানতে চায় না সে,,,চায় না।

মিহিরের গলাকাটা দেহের আশেপাশে জমাট বাধা রক্ত। বেডরুম এর দরজা খোলা,,বিছানায় কি আছে সাইফ দেখতে চায় না।

নীলার নগ্ন রক্তাক্ত গলাকাটা দেহটা দেখে সাইফ অজ্ঞান হয়ে গেল।

৭.

“মিঃ ভট্টাচার্য, স্যার,,, একটা প্রশ্ন স্যার, প্লিজ”

“হ্যা বলুন”

“স্যার,আপনার বিয়ের পিড়ি থেকে আপনাকে তুলে নিয়ে যায় ইন্সপেক্টর সাইফ,অপমান করে, আর তার এক মাস পর তার স্ত্রীর এভাবে মৃত্যু,এ বিষয়ে আপনার কি বক্তব্য?”

“আসলে দেখুন,আমি ভগবানে বিশ্বাস করি। ভগবান বলেছেন,সবাই কৃতকর্মের ফল পাবে। উনি আমায় অপমান করেছেন,ভগবান ওনার ক্ষতি করেছে,যদিও আমি এরম ক্ষতি চাই নি ওনার,,,”

“মিঃ ভট্টাচার্য, একাজ কারা করতে পারে বলে আপনার ধারণা?”

“আসলে,হয়েচে কি,,কত মানুষই তো আমায় ভালবাসে।আমার এরম অপমান সইতে না পেরে মাথা গরম করে কেউ করতে পারে। তবে আমি সবাইকে বলছি,মাথা গরম করবেন না কেউ। নরহত্যা পাপ। সে যেরম লোকই হোক না কেন

“স্যার,ইন্সপেক্টর সাইফ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে,তার উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন?”

“না না,তার প্রতি আমার ক্ষোভ নেই। উলটো তাকে দেখতে আমি হাসপাতাল যাচ্ছি। আহারে,বেচারার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল,,,,”

রেকর্ড করা রিপোর্ট হাসপাতালের কেবিনের টিভিতে বাজছে।অর্জুন বেডের সামনে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে সাইফের দিকে। সাইফ মাটির দিক তাকানো। আধশোয়া হয়ে,,,,,

“তিলতিল করে গড়ে তোলা আমার রাজত্বে। তুই কোথাকার কোন চুনোপুঁটি আমাকে আমার রাজত্ব থেকে হটাবি? বনবাসে পাঠাবি নাকি?”

সাইফ মাটির দিক তাকানো,,,,, 

“আমি অর্জুন। এটা আমার রাজত্ব। দুর্যোধন এর কাছ থেকে নিজের রাজ্য বাচাতে এযুগের অর্জুন পারে,তাকে বনবাসে যেতে হয় না।”

সাইফ মাটির দিক তাকিয়ে বলল,,”বনে পালালে বন পুড়িয়ে দেব,, মাটিতে লুকালে মাটি ফুড়ে আনব,আকাশে পালালে,আকাশ ফেটে চৌচির করে দেব,,,,,,,

ভয়ংকর দৃষ্টি দিয়ে অর্জুনের দিক তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে সাইফ বাক্যটা শেষ করল,,,”তোকে আমি শেষ করে দেব,,,,,”

অর্জুন হাসি হাসি মুখে কাছে এসে বলল,,”তোর বউটা সেই একটা মাল ছিল রে,,,আহ,,,”

সাইফ লাফিয়ে উঠে অর্জুনের গলা চেপে ধরল। বাইরে থাকা লোকেরা সাইফকে সরিয়ে নিল। সিডেটিভ দিয়ে দিল ডাক্তার রা।

ঘুমে চোখ জড়িয়ে যাবার আগে সাইফ অর্জুনের মুখের হাসি দেখতে পেল।

এক সপ্তাহ পর সাইফ জয়েন করল আবার থানায়। মানুষজন ওর দিক তাকিয়ে থাকে,ও পাত্তা দেয় না,কোয়ার্টার এর বাড়িটা ওর কাছে অসহ্য লাগে এখন।

দিনরাত সবসময় নীলার রক্তাক্ত দেহটাকে দাঁড়িয়ে তগাকতে দেখে সে,,, ফিসফিস করে নীলা বলে,,”তুমি আমাকে মেরে ফেললে,,,”

সাইফ বুঝতে পারে ও পাগল হয়ে যাচ্ছে। এদিকে অর্জুন আর মালিহার বিয়ের নতুন তারিখ পড়ে।

দিনাজপুরে যখন সাইফ প্রথম আসে সে জানত দিনাজপুর শান্তির শহর। সে এও জানত,দিনাজপুরের আসনের যে শক্তিশালী নেতা, সেই নেতা খুব সৎ,তার জন্য দিনাজপুরে শান্তি তগাকে সবসময়,,অপরাধীরা অপরাধ করে পার পায় না।

কিন্তু সাইফ এখন জানে এগুলো সব ভুয়া। নেতা নাসির মোল্লার কিছু করার নেই এতে। শহরের শান্তি,অশান্তি অর্জুনের আঙ্গুলের মাথায় থাকে।অর্জুন যখন চায়,শান্তি বিরাজ করে,যখ যায়,একটু অশান্তির দরকার,অশান্তি আসে।

তবে সাইফকে অবাক করে দিয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদ নাসির মোল্লা নিজে আসে তার সাথে দেখা করতে।

নাসির মোল্লাকে দেখে সাইফ উঠে দাড়াতেই নাসির তাকে বসিয়ে দেয়,,

বলে,”বসুন,আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি আপনার উপর নজর রাখছিলাম বেশ কিছুদিন। আপনি যখন মাইনুল হক নিখোঁজ আর কাউন্সিল প্রার্থী হত্যা নিয়ে তদন্ত করছিলেন,আপনার উপর দুই পক্ষের লোক নজর রাখছিল। অর্জুনের লোক আর আমার লোক।”

সাইফ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। নাসিরের মুখ মলিন হয়ে গেল।” আমার হাত গুটিয়ে বসে থাকার জন্য আপনার এতবড় একটা ক্ষতি হয়ে গেল। আমারই ভুল,সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয় নি।”

সাইফ এখনো চুপ। নাসির বলল,,”আসলে আপনি যখন জানবেন এলাকা আপনার,আসন আপনার,সংসদে জায়গাও আপনার। কিন্তু আপনার শবরের প্রত্যেকটা মানুষ ওঠাবসা করে আন্ডারওয়ার্ল্ড এর এক গডফাদারের আদেশে,আপনি কিছুই করতে পারবেন না। কাকে দিয়ে কি করব? প্রত্যেকটা সরকারি অফিসে নজরদারি এবং নিজের ব্যবসার নিরাপত্তার জন্য তার লোক বসানো,কি করতে পারেন আপনি? পুলিশ,র‍্যাব,সব তার পকেটে,,,ইসসসস,,তারপরো যদি সময় মত আপনার স্ত্রীকে কোনো নিরাপদ জায়গায় পাঠাতে পারতাম।”

সাইফ বলল,”স্যার,আপনি কেন এসেছেন”

নাসির বলল,,”মাত্র ৩ মাসে,আপনি অর্জুনের মত এক সুচারু, সুকৌশলী,এত বড় এক মাফিয়ার সবকিছু বের করে ফেলেছেন। দুর্বলতা, শক্তি,সবকিছু,ইতিহাস,সাক্ষী,প্রমাণ,,,  আর নির্ভয়ে যেভাবে এরেস্ট করলেন,অপূর্ব”

সাইফ বলল,,”আমি কিছু বুঝছি না।”

নাসির বলল,,”আমি অর্জুনকে ধ্বংস করতে চাই। আপনি পারেন একাজ করতে আমাকে সাহায্য করতে,,,আমার একটা প্লান আছে,,,”

সাইফ কিছু না ভেবেই বলে দিল,,”আম শুনছি স্যার,,অর্জুনকে শেষ করতে আমি সব করতে পারি,,,”

সেরাতে নাসির সাইফকে নিজের বাসায় ডাকল। বলল,”কিছু মনে করবেন না,আমার ধারণা থানায় অর্জুনের লোকে ভরা,সেখানে এইসব কথা বলা উচিৎ হয়নি,তাই ভাবছি আপনাকে বাসায় এনেই বলব”

সাইফ বলল,,”শুনছি,বলুন”

নাসির বলল,,”আমার প্লান হল,কাটা দিয়ে কাটা তোলা।”

সাইফ বলল,,”বুঝলাম না।”

নাসির বলল,,”আপনি জানেন অর্জুন ভারতীয়, ওর কথার স্টাইলেই আমরা বুঝতাম।  আপনার জন্য সিওর হলাম আমরা। ও ভারতীয়,আর ভারত হিন্দু দেশ। আমাদের দেশে কিছু ব্রেইনওয়াশড করা সংগঠন আছে,যারা মনে করে ভারত,সনাতন ধর্মালম্বীদের হত্যা করলে পূণ্য আছে।”

সাইফ বলল,,”হ্যা,বোগাস আইডিয়া ওয়ালা কিছু জঙ্গী সংগঠন।  যারা নিজের ইচ্ছামত কোরানের আয়াত তৈরি করে,স্বার্থ মত। কোরান খুজলেও ওদের কথামত আয়াত পাওয়া যায় না।”

নাসির বলল,,”একজাক্টলি। এই সংগঠনের মধ্যে কয়েকজন আমাদের নজরে আছে। আমাদের নজরদারিতে আছে বলে ওরা কিছু করতে পারছে না। আমার প্লান হল,এরকম কিছু সংগঠনকে যদি আমরা উসকে দিই,অর্জুনকে খুন করলে পূণ্য আছে অনেক। আর তারপর আমরা ওদের আক্রমণ এর সুযোগ করে দিই,তাহলে কেমন হয় বলুন?”

সাইফের মনের মধ্যে আলোড়ন চলছে,,অর্জুনকে শেষ করার মারাত্মক একটা প্লান। সে বলল,,”কিন্তু এরকম জঙ্গি সংগঠন এর উপর নজরদারি থাকে,ওদের অর্জুনের কাছাকাছিই যেতে দেবে না। এর আগেই এরেস্ট করবে।”

নাসির বলল,,”এক্ষেত্রে আপনার সাহায্য লাগবে। আপনার দায়িত্ব হল স্টেশনে আপনার মত সৎ অফিসার দের খুজে বের করা,যারা বিশ্বাস করে অর্জুন একটা শয়তান,এবং তাকে শেষ করার জন্য বদ্ধ পরিকর। এরকম অফিসারদের নেতৃত্ব দেবেন আপনি,তারপর আপনারা গাইড করে জঙ্গি দলকে নিয়ে যাবে অর্জুনের কাছে।”

সাইফ বলল,,”পারব স্যার,,পারব,,,আমি জানি কোন কোন অফিসার অর্জুনের কাছ থেকে টাকা খায় না।”

নাসির বলল,,”এক সপ্তাহ পর একটা জনসভায় অর্জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের দলে যোগ দেবে,রাজনীতিতে,আমি ওমে অভিষিক্ত করব। এভাবেই ওকে বাড়ির বাইরে আনা যাবে । আপনারা জনসভায় আসবেন। আমি আগে বক্তৃতা দিয়ে চলে যাব।তারপর অর্জুন মঞ্চে আসবে। জনসভার লোকেরা আমার লোক হবে,আপনাকে দেখলেই ওরা আস্তে করে সরে যেতে থাকবে,, আপনি তখন আপনার অফিসারদের নিয়ে জঙ্গিদের নিয়ে আসবেন। মনে রাখবেন একটাই সুযোগ পাবেন আপনারা ওকে শেষ করার।”

সাইফ উত্তেজনায় কাপতে লাগল। অর্জুনকে শেষ করার সুযোগ নিজ থেকেই চলে এসেছে ওর কাছে,,ও বলল,,”একটা রিকুয়েস্ট স্যার”

নাসির বলল,,”কি?”

সাইফ বলল,,”আমি নিজ হাতে অর্জুনকে জবাই দিতে চাই,,,”

নাসির মোল্লা মিটমিট করে হাসল।

৮. 

নাসির মোল্লার প্লান অনুযায়ী একসপ্তাহ ধরে খুজে খুজে অর্জুনবিরোধী ২০ জন পুলিশ অফিসারকে খুজে বের করল সাইফ। সবাইকে বোঝাতেই তারা এক বাক্যে রাজি হল। বলল,”অর্জুনকে এবার মরতে হবে।”

জনসভার দিন সাইফ ২০ জন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে মাঠের কোণায় দাড়াল। আশেপাশে নজর রাখল। জঙ্গিরা কোথায়।

নাসির মোল্লার ভাষণ চলছে। অর্জুন পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। সাইফের পিত্তি জ্বলে গেল,আজ তোর শেষ হাসি হেসে নে।

নাসির মোল্লা অর্জুনকে অভিষিক্ত করে নেমে গেল মঞ্চ থেকে। জঙ্গির দলকে দেখতে পেল সাইফ। ইশারা করল জঙ্গিদের। জঙ্গিরা মাঠ আস্তে আস্তে ঘিরে ধরতে লাগল। জনসভা থেকে একটা একটা লোক চলে যেতে লাগল।

জঙ্গিরা কাছিয়ে আসছে। সাইফ ওর ব্যাগ থেকে গরু জবাইয়ের ছুড়ি বের করল। আস্তে আস্তে হেটে আসছে সে,দৃষ্টি অর্জুনের দিকে।

অর্জুন আর ওর লোকেরা বাদে জনসভা খালি হয়ে গেল। অর্জুন তখনো ভাষণ দিয়েই যাচ্ছে।

তখনই সাইফের মাথায় ঢুকল কত বড় একটা ভুল করে ফেলছে সে,,, নাসির মোল্লা,,,,,

অর্জুন ভাষণ থামিয়ে সাইফ আর ওর হাতের ছুড়ির দিকে তাকাল। বাকা হাসি দিয়ে বলল,,”কিরে দুর্যোধন,,,,আজ কেমন বোধ করছ? ”

আশেপাশের জঙ্গিরা আল্লাহু আকবর বলে গুলি করা শুরু করল। ২০ জন পুলিশ অফিসারের বুক নিমিষে ঝাঝরা হয়ে গেল। রক্তের বন্যা আর লাশের স্তূপে চাপা পড়ল সাইফ। রক্তের পর্দা ভিতর দিয়ে দেখল,পাঞ্জাবী আর পায়জামা আর টুপি করা কেষ্ট নকল দাড়ি খুলে খ্যাক খ্যাক করে হাসছে।

কতক্ষণ ওখানে সাইফ পড়ে রইল সে জানে না। সন্ধ্যা নেমে এল। রক্তমাখা সাইফ হতভম্ব হয়ে এক সারি রক্তাক্ত লাশের মধ্যে দিয়ে দাড়াল। মাঠের কোণায় ওর বউয়ের রক্তাক্ত শরীরটা আবার দেখল সে, আকাশ বাতাশ বিদীর্ণ করে শব্দ হল,,”তোমার জন্য মরতে হল,,তোমার জন্য,,,,,”

৯.

মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন বলে চিকিৎসার জন্য বৈতনিক ছুটি পেল সাইফ। ২ মাসের বিশাল বন্ধ।

হাসপাতালের মানসিক ওয়ার্ডে যখন সে শুয়ে ছিল, অর্জুন এসে দেখা করেছিল,,,,বলেছিল, সাইফ ওর পিছনে লাগার পর ওর সন্দেহ হতে থাকে আরো পুলিশ ওর সাতগে যোগ দিতে পারে। এসব পুলিশকে একসাথে শেষ করার এক মাস্টারপ্লান করে নিজেই নাসির মোল্লাকে পাঠায় সাইফের কাছে।

অর্জুন বলল,,”তোর যে কই মাছের প্রাণ রে,,,,দুর্যোধন,, তোর প্রাণ কি তোর উরুতে নাকি? মহাভারতের মত? হা হা হা”

সাইফ কিছু বলে না,সাইফের মধ্যে কোনো ফিলিংসই নাই। কথা বলে না সে। রাতে সে মাঝে মাঝে ঘর কাপিয়ে চেচিয়ে ওঠে,,কানের মধ্যে ২০ জন পুলিশ অফিসারের আর্তনাদ ভেসে আসে,, আর ভেসে আসে ওর বউয়ে চিৎকার,,, তোমার জন্য,,তোমার জন্য,,,”

সাইফ দিনাজপুরে প্রথম এসে নীলাকে নিয়ে যেই চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এ গিয়েছিল,যে চেয়ারে বসেছিল।সেখানে বসল।সামনে টিভি চলতেছে,,,,, টিভিতে খবর হচ্ছে,, অর্জুনের সাক্ষাৎকার।

“আমি খুবই অবাক,আমাকে এভাবে কেন মারতে এল ওরা,আমি হিন্দু,এটাই কি আমার অপরাধ? আমাকে মারলে ওদের পূণ্য হবে অনেক? ছিঃ এ কেমন ধর্ম,এ কেমন নিয়ম,,,,ছিঃ”

রেস্টুরেন্ট এর বাইরে কেষ্ট সাইদুরকে বলছে,”তুই সিওর শালায় এখানে আছে?”

সাইদুর বলল,,”হ্যা,বলছে আমাগো লোক”

কেষ্ট বলল,,”সেইরাতে থানায় নিয়ে যে কয়টা বাড়ি দিছে,সেই কয়বার হালারে পোচামু ক্ষুর দিয়া,,দাদা বলছে,এভার যাতে ভুল না হয়,,ওর মাথা নিয়াই ফিরি,,,”

টিভিতে অর্জুন বলতেছে,,”২০ জন পুলিশ অফিসার আমাকে রক্ষা করতে গিয়ে এভাবে মরল,,,এরা শহীদ,,, এরা দেশের আসল বীর,,,”

সাইফ চিকেন কাটার ছুরিটা চেপে,কাঠের টেবিল পোচাতে লাগল।চোখ এক দৃষ্টে টিভিতে অর্জুনের মুখের দিকে।

কেষ্ট সিড়িতে উঠে এক ওয়েটার কে বলল,,”ইন্সপেক্টর সাইফ কোন টেবিলে রে?”

ওয়েটার বলল,,”ওই পিছের টায় একদম।”

কেষ্ট ক্ষুর হাতে ঢুকল আরো ৪ জনকে সাথে নিয়ে একদম শেষ টেবিলটায়।

টেবিলটা খালি।  কেউ নেই ওখানে। কেষ্ট টেবিলের কাছে গেল। ছুরি দিয়ে কাঠের টেবিলে কিসব জানি লেখা,,,,, 

 “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী”

গল্প ৯০

​”৪৫ মিনিট”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

শহরের শেষ প্রান্তে পাগলা বিজ্ঞানীর বাড়ি । মাথাভর্তি পাকা চুল,পাকা বড় একটা গোফ।আইনস্টাইন কে গুরু মেনে মনে হয় বিজ্ঞানচর্চা শুরু করে সে।আসল নাম ফিরোজ আহমেদ।  কিন্তু রগচটা,একগুঁয়ে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মানুষ পাগল বলে। ইউনিভার্সিটিতে ফিজিক্স পড়াত সে। কিন্তু ছাত্রদের মাথায় আজগুবি আজগুবি ধারণা গুজে দেওয়ায়,এবং ভার্সিটি ল্যাবে মারাত্মক ভয়ংকর কিছু এক্সপেরিমেন্ট এর অপরাধে কর্তৃপক্ষ তাকে আগে ভাগেই অবসর দিয়ে দিয়েছে।

ফিরোজ আহমেদ নিজের কিছু কিছু তত্ত্ব নিয়ে খুবই অহংকারী ছিল। ভাবত এই তত্ত্বগুলো বিশ্বে আলোড়ন ফেলবে। নোবেল পুরস্কার ঠেকায় কে। এসব কারণও তার বাধ্যতামূলক অবসরের অন্যতম কারণ।

যাই হোক, কাহিনী পেচাবো না,মানুষ বিরক্ত হয়। সোজা কথায়,ফিরোজ আহমেদ একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি পদার্থবিজ্ঞানী ছিল। কিন্তু তার তত্ত্বগুলো কেউ না বুঝায় তাকে নিয়ে হাসাহাসি করায় তার মনোবল ভেঙে যায়। এর উপর দিয়ে অবসরের ব্যাপারটা আসে।এছাড়া,অবিবাহিত চিরকুমার বুড়োমানুষকে নিয়ে বাংলাদেশিদের একটু হাস্যরসাত্মক ধারণা আছে। মোটকথা,এত প্রতিকূলতায়য় ফিরোজ আহমেদ প্রচন্ড বদরাগী হয়ে যায়। তার নাম শহরে ছড়িয়ে পড়ে পাগলা বিজ্ঞানী হিসেবে।

বাইরে তিনি প্রথম প্রথম বের হতেন,কিন্তু পাগল ভেবে পোলাপান ঢিল মারত। এরপর থেকে তিনি বাসা থেকে বের হন না। তবে দিনরাত তার বাসা থেকে অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ আসে।মানুষ ভাবে পাগল মানুষের সাথে জ্বীন ভূতের যোগাযোগ আছে।তাই পাগলা বিজ্ঞানী আর পাগলা বিজ্ঞানীর বাড়িকে এলাকার মানুষ এড়িয়ে চলে।

এখন,একরাতে একটা লোক পাগলা বিজ্ঞানীর বাড়ির দিকে রওনা দেয়। তার হাতে একটা ছুরি। চোখে মুখে ভয়। এর আগে ছুরি হাতে কোথাও যায় নি সে বোঝাই যাচ্ছে।

যাই হোক,ছুরি হাতে পাগলা বিজ্ঞানীর বাড়ির আশেপাশে সে ঘুরতে থাকে। পাগলা বিজ্ঞানীর বাগানে ঢুকতেই হঠাৎ “পিইইইইইইইইই” করে একটা শব্দ হয় জোরে। ছুরিওয়ালা লোকটা ছুরি হাতেই কান চেপে ধরে। তবে তীক্ষ্ণ শব্দটা এনাফ ছিল না,হঠাৎ একটা ধাতব ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনে সে। ঘুরে দেখে একটা রোবট কুকুর,বিশাল বড়,, আর দাত গুলো ধারাল ইস্পাতে চকচক করতেছে,তার দিকে ছুটে আসল।

ছুরিওয়ালা লোক একটা চিৎকার দিয়ে দৌড় দিল পাগলা বিজ্ঞানীর দরজার দিকে। পাগলা বিজ্ঞানীর দরজায় থাবা মারতে লাগল লোকটা, বলল,,”দরজা খোলো,,দরজা লোক,,,প্লিজ”

দরজার ওপাশে ধাতব শব্দ শোনা গেল। কে যেন বলল,,,”আমি তো পাগল,বুঝলাম,তো আমাকে একা ছেড়ে দে না বাপ।জ্বালাতে কেন আসিস,আমার রোবত্তা সারাদিন রাত বাড়ি পাহাড়া দেয়,হ্যা।”

ছুরিওয়ালা বলল,,”রোবত্তা?”

ভিতর থেকে জবাব এল,,”রোবট+কুত্তা=রোবত্তা,,,কি চাস তুই?”

ছুরিওয়ালা বলল,,”স্যার,একটু কথা ছিল,আপনার চতুর্থমাত্রিক পৃথিবী তত্ত্ব নিয়ে। সময় যে চতুর্থ মাত্রা,সেটা নিয়ে”

ভিতর থেকে  জবাব এল,”কি বলতে চাও?”

ছুরিওয়ালা বলল,” আইনস্টাইন বলেছে আলোর বেগে কোন বস্তু চলাচল করলে আপেক্ষিকতা অনুযায়ী সময় চেঞ্জ হবে না।আর এটাও বলেছে,আলোর বেগে বস্তু চলাচল করলে সেটা আর বস্তু থাকবে না, শক্তি হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার মতে আলোর বেগে কোন বস্তু চলাচল করলেও সেটাকে বস্তু রাখা যায়, যদি সময়কে পরিবর্তন করা যায়,বস্তুর ৩ টা মাত্রা,কিন্তু এর সাথে যদি আপনি মেনে নেন যে সময় ধ্রুব না থেকে চেঞ্জ হচ্ছে,তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে আলোর বেগে কোন বস্তু চললে একটা মাত্রা পরিবর্তনই যথেষ্ট, মানে যদি আমরা সময়কে মাথা ধরি,তাহলে বাকি তিন মাত্রা অক্ষুণ্ণ থাকবে,মানে আলোর বেগে চললেও বস্তু,বস্তুই থাকবে,শক্তিতে পরিবর্তন হবে না। এজন্য আমাদের শুধু দরকার সময়টাকে মাত্রা ধরে পরিবর্তন করা।”

ভিতর থেকে জবাব এল,”হ্যা এটাই আমি বলেছিলাম”

ছুরিওয়ালা বলল,,”আমি আপনার কথা মানি,আপনি একদম ঠিক। আর আপনার কথা যদি সত্যি হয়,তবে আমি সময়কে পরিবর্তন করতে পারব।মানে,সময়কে আমি ইচ্ছামত আলোর দিক অনুযায়ী আগে পিছে করতে পারব। এর মানে,আমি টাইম ট্রাভেল করতে পারব, ভবিষ্যতে যেতে পারব,অথবা অতীতে,,,,”

ভিতরে খুট করে একটা আওয়াজ হল। দরজা খুলে গেল।

ছুরিওয়ালা চিল্লিয়ে ছুরিটা ধরে লাফিয়ে ঘরে ঢুকল,,বলল,,”আমি জানি আপনি এই তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন,আমি জানি আপনি সফলও হয়েছেন,আপনার পুরনো অফিস থেকে আপনাকে বের করে দিয়েছিল,আপনার জার্নালটা রয়ে গেছিল,আমি পড়েছি,,আপনি একটা টাইম ট্রাভেল মেশিন বানানোর একদম কাছে চলে গেছিলেন।কেউ আপনাকে বিশ্বাস করে নি বলে আপনি কাউকে জানানও নি। তবে আমি জানি এতদিনে সেটা আপনি বানিয়ে ফেলেছেন। ওটা আমার চাই। এক্ষুণি দেন।”

কিন্তু ভিতরে কিছু ছিলনা। পুরো রুমটা থমথমে। হঠাৎ,প্রায় ১০ ফুট লম্বা একটা ধাতব বীভৎস  যন্ত্র রুমে ঢুকল।ওটার লাল চোখ গনগিন করে জ্বলছে। 

ছুরিওয়ালা অজ্ঞান হয়ে গেল।

জ্ঞান ফিরতে ছুরিওয়ালা দেখল,সে একটা চেয়ারে বসা। হাতে ছুরি নেই। কেউ তাকে বাধেও নি। কিন্তু তার সামনে তার দিক ভয়ংকর ভাবে চেয়ে আছে একটা ধাতব কুকুর,ধাতব বাঘ,আর ধাতব গাধা। সে যেই জিনিসটা দেখে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল,ওটা হাটু মুড়ে বসা। তবে ওটার বুক থেকে মাথা ভাজ হয়ে পিছের দিক ঝুকে আছে।বুকের ভিতর একটা চেয়ারে বসা পাগলা বিজ্ঞানী ফিরোজ আহমেদ।

ফিরোজ আহমেদ রাগান্বিত গলায় বলল,,”তুই কে?”

প্রাক্তন ছুরিওয়ালা বলল,,”আমি বারেক”

বিজ্ঞানী বলল,,”কোন বারেক?”

বারেক বলল,,”আমি বারেক বারেক”

বিজ্ঞানী চোখ গরম করে রইলেন। একটু পর বললেন,,”তুই কোন দেশের গুপ্তচর? ”

বারেক বলল,,”আমি গুপ্তচর না”

বিজ্ঞানী বলল,,”সব গুপ্তচরই একই কথা বলে”

বারেক বলল,,”স্যার,আমি শেষ একটা আশা করে এসেছি আপনার কাছে,আপনি যদি একটু দয়া করতেন,,,”

প্রবীণ বিজ্ঞানী ভাল করে বারেকের দিক চাইল। নাহ,ছেলেটা গুপ্তচর হতে পারে না। খারাপ লোকও হতে পারে না। বলদের মত ঘরে একটা ফল কাটার ছুরি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়া দেখেই বোঝা গেছে,এছাড়াও এই ছেলে তার তত্ত্বকে নিজের ভাষায়,খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছে,সুতরাং, প্রাপ্য ধারণা থেকে আপাতত এটাই বুঝা যায় যে ছেলেটা আতেল,এবং খুবই গাধা,কিন্তু মেধাবী,এবং আসলেই সে বিপদে পড়েছে।

বিজ্ঞানী বলল,,”টাইম মেশিন লাগবে তোমার? কেন? কি করবা সেটা দিয়ে?”

বারেক বলল,,”আমার বউকে আমাকে বাঁচানো থেকে বাঁচাব”

বিজ্ঞানী বলল,,”মানে? ”

বারেক বলল,,”আমার বউ আমাকে আজ থেকে দেড় বছর আগে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল,আমি সেটা ঠেকাব”

বিজ্ঞানী বলল,”কেন? ধরে নিলাম,তোমার বউয়ের তোমাকে বাঁচানো ঠেকানো গেল,কিন্তু এতে তো তুমি মরে যাবে।”

বারেক বলল,,”হ্যা,কিন্তু আমার বউ তো বেঁচে যাবে”

বিজ্ঞানী বলল,,”তুমি অসুস্থ মানসিকভাবে,তোমার বউ কোথায় থাকে?”

বারেক উপরে আঙ্গুল তুলে বলল,,”অনেক দূরে,,,,,”

বিজ্ঞানী এখনো বিব্রত এবং কনফিউজড।  সে বলল,,”বিষয়টা খুলে বল তো”

বারেক বলল,,”আমার বউ মরে গেছে। এই তো কাহিনী।  শেষ। টাইম মেশিনটা দেন,আমার বউয়ের সাথে যাতে আমার কখনো মিট না হয়,সে ব্যবস্থা করব আমি।”

বিজ্ঞানী বারেককে আরেকটা চেয়ারে বসালো। এটার নাম সে দিয়েছে ট্রুথ চেয়ার। চেয়ারে বসলে চেয়ারে থাকা একটা সার্কিট,চেয়ারের মানুষের মস্তিষ্কের ব্রেইনের সত্যকেন্দ্রে তরঙ্গ দিয়ে গুতা দেয়। বারেক অস্থিতিশীল, তার কাছ থেকে সত্যটা বের করে নিতে হবে,,,,

বারেককে জিজ্ঞেস করা হল, “তোমার নাম কি?”

বারেক বলল,”মোঃআব্দুল বারেক হোসেন”

“তুমি আমার কাছে কি জন্য এসেছ”

“টাইম ট্রাভেল মেশিনের জন্য”

“কেন”

বারেক চুপ করে রইল।

বিজ্ঞানী যন্ত্রের গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিল।

বারেক বলা শুরু করল। 

“দেড় বছর আগে  আমি একটা শপিং সেন্টারে ঢুকেছিলাম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন আমি এপ্লাইড ফিজিক্সে ৩য় বর্ষে পড়ি।

আমি শপিং সেন্টারের ৫ তলায় তখন। হঠাৎ শপিং সেন্টারে আগুণ লাগল। মানুষ পড়িমরি করে ছুটতে লাগল। আমিও দৌড় দিলাম। 

হঠাৎ খেয়াল করলাম, একটা মেয়ে পা হড়কে পড়ে গিয়েছে। লোকেরা তার উপর দিয়েই প্রাণভয়ে ছুটছে।এভাবে কিছুক্ষণ থাকলে মেয়েটা মরে যাবে।

আমি মেয়েটাকে তুললাম। দেখি,মাথায় কারো পাড়া লেগে ওর চোখে ঝিম ধরে আছে। হয়ত কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।

এমন সময় তাকে নিয়ে ছোটাই মুশকিল। কি আর করার। আমি তাকে ধরে একদম দেয়ালের সাথে মিশে রইলাম। মানুষজন পড়িমরি করে ছুটে পালাচ্ছে।

পুরো ৫ তলা প্রায় ফাকা হয়ে গেলে,আমি তাকে নিয়ে এগোতে চেষ্টা করলাম,আমাদের পিছিনের দোকান আর করিডোরে দাউ দাউ করে আগুন এগিয়ে আসছে।

মেয়েটার হঠাৎ হুশ ফিরল। নিজের মাথায় আঘাতের জায়গায় হাত বুলিয়ে আমার দিক টানা টানা চোখে তাকাল।চোখে বিস্ময়, আমাকে আগুনের কথা ভুলে বলল,,”আপনি? আপনি এখানে?”

আমি অবাক,মেয়েটাকে বাপের জন্মে দেখি নি,মেয়েটা আমাকে এভাবে কেন বলছে?

আমি বেশিক্ষণ ভাবতে পারলাম না। আগুনের ছাট চলে আসছে। মেয়েটা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল,,”আসেন,শিগগিরি ”

আমরা দৌড় লাগালাম। সিড়ির কাছে আসার আগেই পথটা ব্লক করে দিল আগুন। যেদিক যাই,সেদিকই আগুন। শুধু করিডোরের মুখে বড় কাঁচটা দিয়ে ঘিরে ধরা। 

আগুনে আটকা পড়লাম। নিশ্চিত মৃত্যু।  হঠাৎ মেয়েটা ওর হিল জুতা খুলে কাচের দিক সজোরে  ছুড়ে দিল। কাচটাতে একটু ফাটল ধরল।

আগুন এগিয়ে আসছে। মেয়েটা আরেকটা জুতাও ছুড়ে দিল, কাচটা আরো একটু ফাটল। 

এমন সময় কোন একটা দোকানে থাকা কোনো দাহ্য কিছুতে আগুন ধরল। প্রচন্ড বিস্ফোরণ হল। আগুন আরো সতেজে এগিয়ে এল। আমি আর মেয়েটা কাচের দিক লক্ষ্য করে ছুটলাম। কাচের উপর লাফ দিলাম। 

আরেকটা বিস্ফোরণ খুব কাছে হল,কাচটা টুকরা টুকরা হয়ে গেল। আমরা দুইজন ৫ তলা থেকে সবেগে নিচে নামলাম। আগুন আমাদের উপর দিয়ে শূন্যে কিছুদূর এগিয়ে এল।

আমরা পড়তে পড়ে চিৎকার দিলাম। নিচে দুই খাম্বার মাঝে সারে সারে টেলিফোন তার ছিল। ওগুলোর উপর পড়লাম তার গুলো ছিড়তে লাগল। আমাদের গতি কমতে লাগল। শেষ পর্যন্ত দুইটা তার আমাদের কোনরকম পতন রোধ করল মাটি থেকে ২/৩ ফুট উপরে, তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম, পা মচকে গেল। 

মেয়েটার দিক তাকালাম। ঠোট কেটে রক্ত পড়ছে, হাতে,বাহুতে আর গালের একটু পিছে কাচের টুকরায় কেটে ছড়ে গিয়েছে।মেয়েটা এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বিড়বিড় করে বলছে,”আপনি? আপনিই আমার জীবন বাঁচালেন?”

মেয়েটার নাম নীলা। সেই থেকে মেয়েটার সাথে আমার পরিচয়। আমার সাথে কখনো কোন মেয়ে প্রয়োজনের বেশি কথা বলে নি। কিন্তু এই মেয়েটা,,, এই মেয়েটার চোখে সেই প্রথমদিন আমি যেন পূর্বপরিচিত দেখার একটা লক্ষণ পেলাম।

মেয়েটা ঢাকা ভার্সিটিতেই পড়ত,তবে জুওলজিতে। দেখেছেন স্যার,আপনি, আমি,নীলা সবাইই একই ভার্সিটির।আপমাকে যখন অবসর দেওয়া হয় আমরা দুইওজনই সেবার নতুন ভর্তি হয়েছিলাম। আপনি হয়ত তাই আমাদের চিনবেন না।

আমাদের ওই আগুনের ঘটনার পরই পরিচয় হয়,বন্ধুত্ব হয়,অথচ এর আগে প্রায় ৩ বছর একই ব্যাচে আমরা ছিলাম,দেখাও হয় নি। যদিও এই কথা মেয়েটার সামনে আমি যখনই উঠাতাম,মেয়েটা কেমনভাবে যেন আমার দিকে তাকাত। কিন্তু কিছু বলত না।

আস্তে আস্তে আমাদের প্রেম হয়। কিন্তু প্রেম করে আমরা বেশিদিন থাকতে পারলাম না। ছাত্রাবস্থায়ই বিয়ে করে একসাথে থাকা শুরু করলাম।

আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে ওর সাথে আমার বিয়ে হয়। আজ ও বেঁচে থাকলে ঠিক একবছর হত।

বিয়ের পর কিন্তু আমরা সচ্ছল ছিলাম না। নিজের ইচ্ছায় বিয়ে তো। বাবা মা থ হয়ে গিয়েছিল। ওর বাবা মা মোটামুটি সচ্ছল হলেও আমার বাবা মা সচ্ছল ছিল না। কিন্তু ওর বাবা মা কার সাথে জানি ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিল। মেয়ে সেই ছেলেকে ফেলে আমাকে বিয়ে করায়  ওনারা মেয়ের মুখ দেখা বন্ধ করে দেয়।

আমরা নিজেদের সংসার চালাতে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরির জন্যেও ঘুরতে হত।

চাকরি আর কি,টিউশনিই তো। আমি একটু খুজতেই পেয়ে গেলাম। ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র বলে ভাল বেতনেই টিউশনি পেলাম। কিন্তু ঢাকার মত শহরে যত ভাল টিউশনি ই হোক,স্বামী স্ত্রীর সাচ্ছন্দে বেচে থাকার জন্য অপর্যাপ্ত।  

নীলাকে বাধ্য হয়েই চাকরি বা টিউশন খুজতে হত। কিন্তু আজব ব্যাপার,নীলা দেখতে অতটাও সুন্দরি ছিল না।কিন্তু যেখানেই যায়, লোকেরা ওকে কুপ্রস্তাব দিত। চাকরি বা টিউশনি কিছুই করা হত না।

কি আর করা, আমার টিউশনি আর বাসা দেখে অসচ্ছল বাবা মা যতটুকু দিত ততটুকুতেই চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম।

নীলার বাবা মা নীলার পড়াশুনার খরচও আর দিত না। সুতরাং নীলার আর আমার পড়াশুনার খরচও আমাকেই বহন করতে হত। 

আগেই বলেছি,যতই ভাল টিউশনি হোক,ঢাকা দম্পতি হিসেবে বেচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত না। 

নীলা ওর সব শখ আহ্লাদ বাদ দিয়ে আমার সাথে থাকত। আমার জন্য থাকত,মেয়েটা আমাকে সত্যিই ভালবাসত। আমরা অপেক্ষা করতাম পাশ করার,দুইজনে বি সি এস দেব। আশা করব যাতে হয়ে যায়, কত আশা। তারপর আমরা আবার সচ্ছিল হব। ভালভাবে বাচব,শখ আহ্লাদ পূরণ করব।

স্যার,নীলাকে আমি জীবনেও এক পিস কাপড় কিনে দিই নি। ওরবাগে যা ছিল,তা নিয়েই আমার সাথে এসেছিল। আমিও না কেন জানি এসব বুঝতাম না। আমার সামনে এত ভাল থাকার অভিনয় করত যে বুঝতেও পারতাম না ওর কত কষ্ট।

একদিন রাস্তায় ওর মা দেখে ফেলল নীলাকে। মা তো,দেখলেই বোঝে সন্তান কেমন আছে।

ওর মা নাকি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল মেয়েকে এরকম বিবর্ণ দেখে। ওর বাবা মা আবার এগিয়ে এসেছিল,মেয়ের সাথে সব মিটিয়ে নিতে।

কিন্তু একদিন হঠাৎ নীলা নিজের বাবা মার সাথে দুর্ব্যবহার করে চলে আসল। অনেক কান্নাকাটি করল। অনেক চেষ্টা করায় বলল,ওর বাবা মা নাকি ওকে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে করার কথা বলছে। এটা শুনেই অর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

সেদিন আমি প্রথম বুঝলাম কতটা আমাকে ভালবাসে মেয়েটা। প্রথম বুঝলাম,আমি কথটা দুঃখ দৈন্যে রেখেছি তাকে।

ততদিনে আপনার সময় তত্ত্বের জার্নালটা খুজে পেয়েছি আমি। মাঝে মাঝে মনে হত,ইসসসস,,,সত্যিই যদি টাইম ট্রাভেল করা যেত,আমি যেকরে হোক,নীলার সাথে নিজের পরিচয় হওয়াটা রুখতাম।

কষ্টে বুকটা ছিড়ে যাচ্ছিল।এই মেয়ে যত কষ্টই হোক জীবনেও আমাকে ছাড়বে না। আমাকে সে অনেক ভালবেসে ফেলেছে। আমি এমন কিছু করতে পারব না যা ওর ভালবাসা আমার প্রতি একটুও কমাতে পারে।

ইসসস,,মেয়েটার সাথে পরিচয় না হত,এত কষ্ট মেয়েটার হত না।

এভাবে ছাইপাশ ভাবতাম রাস্তায় হাটতে গিয়ে। হঠাৎ একদিন রাস্তায় মনের ভুলে হাটতে গিয়ে গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগল।

মাথায় আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার নাকি বলেছি,মাথায় একটা জায়গায় রক্ত জমাট বেধে আছে। জমাটটা না সরাতে পারলে আমি বাঁচব না। বাঁচলেও প্রতিবন্ধী হয়ে বাঁচতে হবে।

এখন জমাটটা অপারেশন করিয়েও সরানো যায়,ওষুধ দিয়েও।সমস্যা হল,ওষুধ নিয়ে এটা সারতে পারে নাও পারে,কিন্তু ওষুদগের ভরসায় থাকলে শেষে অপারেশন করেও লাভ হবে না।

নীলা নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিল। অপারেশনে অনেক টাকা লাগবে পাবে কোথায় এত টাকা। বাধ্য হয়ে ওর বাবা মার কাছে গিয়েছিল। বাবা মা শর্ত দিয়েছিল,টাকা দিতে পারে,তবে আমাকে ওর ডিভোর্স দিতে হবে।

নীলা এতে রাজি হয় নি। আমাকে ছেড়ে নাকি ও বাঁচতে পারবে না।

টাকার জন্য ও ওর ধনী বন্ধু বান্ধবীদের কাছে রিকুয়েস্ট করতে থাকে। ধার চায়। কেউই দিতে পারে না। এক বন্ধু হঠাৎ দিতে রাজি হয়। কিন্তু টাকাটা নাকি তার বাসায় গিয়ে আনতে হবে।

ওই বন্ধুর বাসায় ও যখন যায়, আরো কয়েকজন ওর জন্য ওৎ পেতে ছিল। আমি বুঝলাম না,,ও তো অত সুন্দরও না,,,,

নিজের সম্মানটাকে অন্তত আমার চেয়ে বেশি দাম দিয়েছিল সে। ওদের রান্নাঘরে গিয়ে কেউ কিছু করার আগেই নিজের বুকে নিজেই ছুরু মেরে দিয়েছিল,,,,,

বিকেল ৩ টা।পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃত্যুটা ঘটে বিকেল ৩ টায়। ডাক্তার বলে,ওষুধেই নাকি আমার মাথার রক্ত জমাটটা ছুটে যায়।ঠিক বিকেল ৩ টায়ই আমার জ্ঞান ফেরে,,,,,

স্যার,আমি আমার বউয়ের জীবন নিয়ে বেচে আছি। আপনার কি একটুও ধারণা আছে এটা কত কষ্টের,, বলেন তো? একটুও ধারণা আছে?

আমার সাথে পরিচয় না হলে ও আমাকে ওভাবে ভালও বাসত না। ও বেচে থাকত,,,,, ওর আয়ু নিয়ে আমি বাচতাম না,,,,

পারবেন স্যার? আপনার টাইম মেশিনে আমাকে মাত্র দেড় বছর পিছিয়ে নিতে??? পারবেন? ”

বিজ্ঞানী ফিরোজ আহমেদের কানে কিছু কাহিনী গেল। কিছু গেল না,,,তার টাইম মেশিনের একটা মডেল তো আছেই,,, নিজ থেকে যখন একটা গিনিপিগ চলে এসেছে,এর উপরই টাইম মেশিনের পরীক্ষাটা চালানো যায়।

বিজ্ঞানী বারেককে নিয়ে পাশের রুমে গেল। রুমের মাঝে একটা লিফটের ক্যাপসিউলের মত চারকোণা বাক্স,এর বাইরে একটা প্যাডে কিছু বাটন। মাস,দিন,বছর,ঘন্টা,মিনিট,সেকেন্ড।

বিজ্ঞানী বলল,,”তারিখ,আর সময় বল।”

বারেক বাক্সটার ভিতরে ঢুকে বলল,,”২ এপ্রিল,২০১৬, বেলা দুইটা”

বিজ্ঞানী সেট করে প্যাড গুটিয়ে আরেকটা প্যাড নামাল।

বলল,,”স্থান বল।”

বারেক বলল,,” সিটি সেন্টার,ঢাকা”

 
বিজ্ঞানী বলল,,,”৪৫ মিনিট সময় তোমার,এর মধ্যে যা পারো তাই কর। ৪৫ মিনিট পর তুমি আবার একা একা এখানে ফিরে আসবে।”

বারেক চোখ বুঝল। বিজ্ঞানী যন্ত্র চালু করে দিল।

টাইমটা কোথায় সেট হচ্ছে,সেটা বারেক ভিতর থেকে দেখতে পেল। এই তো, সে এখন ২০১৬ সালের জুনে চলে গেছে, মে তে,, এপ্রিলে,,,,,,

হঠাৎ বাইরের আকাশে সামান্য কিছু মেঘ থেকেই একটা বজ্রপাত পড়ল। বিজ্ঞানীর বাড়িটা কেপে উঠল। বাড়ির মেইন লাইনে আগুন জ্বলে উঠল। সারা বাড়ি অন্ধকার হয়ে গেল।

ব্যাক আপ জেনারেটর চালু হয়ে গেল। তখন বিজ্ঞানী খেয়াল করল,বজ্রপাতে মেইন লাইনই শুধু জ্বলে যায় নি,টাইম মেশিনের প্যানেলের ডেইট চেঞ্জ হয়ে গেছে। ২ এপ্রিল ২০১৬ না,,, সেটার ডেইট সেট হয়ে গেছে ১৪ জুন, ২০১৩ তে।

ভিতরে বারেক চিল্লাচ্ছে,বজ্রপাতে আগুণ ধরায়,মেয়াহিনে শর্ট সার্কিট হয়েছে,, বারেকের শার্টে আগুণ লেগে গেছে,শিগগিরি আগুন লাগা শার্টটা  খুকে ফেলল সে। ভয়ার্ত ভাবে দেখল টাইম মেশিনের ডেইট ১৪ জুন, ২০১৩ হয়ে গেছে।

বারেক ছিটকে এসে পড়ল ঢাকার সিটি সেন্টারের সামনে,খালি গা তার, ক্যালেন্ডার এ দেখল, আসলেই ২০১৩ সাল।

বারেক বের হয়ে নীলার বাবার বাসার দিকে ছুটল। আশেপাশের মানুষ তাকিয়ে আছে। কে কি  বারেক পাত্তা দেয় না।

নীলার বাসার কলিংবেল টেপে বারেক।দরজা খুলে যায়, তরুণী নীলা দাঁড়ানো সেখানে,বারেকের দিকে আজব নয়নে তাকাচ্ছে।

বারেক কেঁদে দিল। নীলাকে জড়িয়ে ধরল। নীলা ভয়ে চিৎকার করে উঠল। বলল,,”বাঁচাও বাঁচাও।”

বারেক বলল,” নীলা,২ এপ্রিল,২০১৬ সালে,তোমার সাথে আমার দেখা হবে,তোমার সাথে আমি আগুনের  ভিতর বন্দি হব,আর বেঁচে যাব, তারপর তোমার আর আমার বন্ধুত্ব হবে,প্রেম হবে,, বিয়ে হবে,,,, নীলা তুমি আমাকে অনেক ভালবাসবে,,, আর এই ভালবাসার জন্য তোমাকে জীবন দিতে হবে,,,,,নীলা,আমি এখন যে কথাটা বলব সেটা মন দিয়ে শোনো,,, তোমার সাথে যখন আমার দেখা হবে ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল,,সিটি সেন্টারে,,,  এরপর তুমি আমার সাথে কখনো যোগাযোগ রাখবা না,,বল প্লিজ,,, আমার দিকে ফিরেও তাকাবা না,,আমি এর যোগ্য না,,, প্লিজ নীলা।”

নীলা ভয়ে নীল হয়ে আছে। সিকিউরিটির অপেক্ষা করছে সে,এই পাগলটাকে সিকিউরিটি আসা পর্যন্ত আটকাতে হবে।

নীলা বলল,,”আ-আ-আচ্ছা ঠিকাছে,,,”

বারেক বলল,,”আহহহ,, বাঁচলাম,কথা দিলে কিন্তু নীলা,, কথা দিলে তুমি,,, এখন একটা শেষ অনুরোধ করি? বল,রাখবে?”

নীলা বলল,,”কি?”

বারেক বলল,,”আমি না টাইম মেশিনে করে এসেছি,তোমার সাথে দেখা করতে,আমার সময় ৪৫ মিনিট,কিন্তু আমার শার্টে আগুন লেগে গিয়েছিল,ওটা আমি টাইম মেশিনে ফেলে এসছি,মেশিনটা হয়ত পুরে গেছে,,,, ৪৫ মিনিট পর আমার কি হয় আমি জানি না। নীলা,এই ৪৫ মিনিট আমি তোমার সাথে একটু থাকতে পারি প্লিজ? এই ৪৫ টা মিনিট,,, এক জনমের জন্য শেষ ৪৫ টা মিনিট তোমাকে একটু দেখতে পারি ভাল করে,,,,প্লিজ,,,,”

সিকিউরিটি এসে বারেককে নিয়ে গেইটের বাইরে ফেলে দিল। বারেক গেল না। গেইটের বাইরে বসে কাঁদতে লাগল,”প্লিজ নীলা,অন্তত আমার চোখের আড়াল হয়ো না,,মাত্র তো ৪৫ মিনিট,,,প্লিজ।”

ঠিক ৪৫ মিনিট পর কি মনে হতে নীলা বারান্দায় উঠল।

গেইটের বাইরে তখন বারেকের দেহটা আস্তে আস্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে,,,,,

গল্প ৮৯

​”তুমি এবং আমি”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

তুমি: কদম ফুল!!!!!

আমি: বৃষ্টি বাইরে অনেক।এছাড়া গাছের ডালটা অনেক উঁচুতে।

তুমি: (নিরাশ হয়ে) তারপরও যদি….

আমি : সন্ধ্যার আগে বাসায় পৌছে দিতে হবে তোমাকে,ব্রিজ এখনো অনেক দূর….

তুমি: আজ একটু বেশীক্ষণ থাকা যায়। আম্মুকে তোমার কথা বলেছি। তোমার ছবিও দেখিয়েছি। আম্মু মানা করে নি।

আমি : আচ্ছা আগে যাই তো,১৫ মিনিটে আর কি ব্রিজ দেখব।

তুমি মাথা নিচু করে রইলে।

আমি: (তোমার গাল ফুলানো দেখে) আচ্ছা,ফেরার সময় দেখব নে।

তুমি: (তোমার ভুবনভোলানো হাসিটা দিয়ে) আচ্ছা ঠিক আছে।

ব্রিজের গোড়ায় নামার পর দেখা গেল জনশূন্য আশপাশ। প্রচন্ড জোরে ব্জ্রপাত পড়ল।বিকেলের আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। আলোর চমক।হঠাৎ আকাশ উগড়ে দিল সঞ্চিত বারিধারা। তুমি আমি ব্রিজের গোড়ায় একটা বন্ধ চা দোকানে আশ্রয় নিলাম। উপরের টিনে কানে তালা দেওয়া বৃষ্টির শব্দ।কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টির সাথে হু হু বাতাস।

আমি: অওসাম ডেইট। এই ওয়েদারে আমরাই একমাত্র,এবং পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম কাপল যারা ডেইট করতে বের হয়েছে।

তুমি: হ্যা,বের হতেই হত। আম্মুকে তোমার কথা বলেছি। আম্মু সায় দিয়েছে।সেলিব্রেশন তো লাগেই।

আমি: (বৃষ্টির দিকে চেয়ে) হ্যা বন্ধ চা দোকানে বসে বৃষ্টি দেখাটাও পৃথিবীতে এক বিরল সেলিব্রেশন।

তুমি: (পাশের বেকারীর দিক তাকিয়ে)  আইসক্রিম!!!!!

আমি: এই ঠান্ডায় আইসক্রিম???  বাইরে বৃষ্টি।এর সাথে আইসক্রিম যায়?

তুমি: হ্যা,আইসক্রিম সবসময় যায়,কদম ফুল বেস্ট হত,তবে আইসক্রিমও চলবে।

আমি: (আইসক্রিম এনে দিয়ে) খুশি?

তুমি: (আইসক্রিম খাওয়ায় মগ্ন) উমমমম…

আমি আর তুমি আইসক্রিম খেতে খেতে বৃষ্টি দেখছি। তোমার আইসক্রিম শেষ,আমারটা বাকি,আমি তোমাকে লোভ দেখিয়ে আস্তে আস্তে আইসক্রিম খাচ্ছি। তুমি আবার গাল ফুলালে,,,

আমি : ছাতা আছে তো?

তুমি: শংকর ছাতা,,বেস্ট ইন বাংলাদেশ,  (বলেই আমার দিক ফিরিয়ে ছাতাটা খুলে ফেললে,ঠাস করে আমার পেটে গুতা দিল সেটা)

আমি: আমারও ছাতা আছে। (এই বলে তোমার দিক ফিরিয়ে ছাতা খুলতে গেলাম,খুলল না,তুমি খিলখিলিয়ে হাসতেছ)

তুমি: এই বৃষ্টি থামবে না, চল ছাতা নিয়েই ব্রিজে উঠি।

আমি: আচ্ছা চল।

ব্রিজের সাইডের ফুটপাত দিয়ে আমরা হাটতেছি।ঝড়ো বাতাস তোমার আর আমার ছাতাকে উলটে দিচ্ছে,বৃষ্টিতে দুইজনই ভিজে গেছি। তোমাকে বৃষ্টিতে ভিজে মোহিনী লাগছে,,,

তুমি: তোমার ছাতা তো ফুটা,পানি তো ওটা বেয়েই গায়ে পড়ছে।

আমি: হ্যা,,আর তোমার শংকর ছাতা  বেস্ট ইন বাংলাদেশের কাপড় বাতাসে উলটে যাচ্ছে।

তুমি: এক কাজ করি,তোমার মোবাইলটা আমার ব্যাগে রাখি,, ছাতা দুইটা বন্ধ করি।ভিজি দুইজনে।

আমি : গ্রেট আইডিয়া।

আমি আর তুমি ভিজতে লাগলাম।কাকভেজা,,, বড় বড় বাস ব্রিজ থেকে যায়, যাত্রীরা আর হেল্পার আমাদের দেখে বাজে কথা বলে,তাকিয়ে থাকে,,,

তুমি: ওই,ওই বেটা, তাকাইস কেন? জীবনে কাউকে প্রেম করতে দেখিস নাই?

আমি তোমার রণমূর্তি দেখে একটু পিছে আছি।

হঠাৎ একটা বাস অনেক জোরে হর্ন বাজাল,,, 

তুমি: ওই,,  হঠাৎ করে এভাবে হর্ন দিস কেন? ভয় পাই না? 

আমি চোখ বড় করে আশেপাশে তাকাই।

বড় একটা লরি চলে গেল সা সা করে। ব্রিজ কেপে উঠল। তুমি ভয়ে আমার কাছে ঘেষে আসলে….

তুমি: মরবি তোরা,,আস্তে চালা গাড়ি,,,,

আমি? আমি আমার পাগলির পাগলামি দেখি।

একটা কাপল বৃষ্টির ভিতর অটো ভাড়া করে খুব ক্লোজ হয়ে ব্রিজে ঘুরছে।

তুমি: কি করতে আইছস তোরা? প্রেম করতে? বাসায় জানে?

কথাটা বলতে নিজেই কেপে উঠলা।জোরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। শিলাবৃষ্টি শুরু হল। তোমাকে নিয়ে আমি ব্রিজের নিচে চলে গেলাম।

তুমি কাপছ। ঠকঠক করে উপরে ব্রিজে সজোরে বৃষ্টি পড়ছে। তুমি শীতে কাপছ। আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম। তোমার শীত যাতে না লাগে।

আস্তে আস্তে মেঘের অন্ধকার ছাপিয়ে আরো অন্ধকার এল। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে।তোমাকে বাসায় পৌছে দিতে হবে

তুমি আর আমি আবার ব্রিজে উঠলাম। তুমি লজ্জা পাচ্ছ এখন আমার দিক তাকাতে। তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম বলে। তুমি এবড়োখেবড়ো হাটছ। ব্রিজের মাঝের দিক চলে গেলে।

একটা বাস আসছে,তোমাকে টান দিয়ে সরিয়ে ফেললাম হ্যাচকা টানে তোমার হিজাবের পিন খুলে গেল। আলগা জিহাবের ফাক দিয়ে তোমার মসৃণ কাল চুল দেখলাম।

শিগগিরি তুমি পিন উঠালে আমার,হিজাবে পড়তে গিয়ে নিজের আঙ্গুলে ঢুকিয়ে দিলে।

আমি: কি হইছে কি তোমার? এরকম কেন করতেছ? মন কই থাকে? এতগুলো রক্ত কেন বের করলা? 

তোমার আঙ্গুলে রুমাল বেধে দিচ্ছি আমি। তুমি আমার দিক তাকিয়ে আছ, কি সে দৃষ্টি জানি না,আগে কেউ এভাবে তাকায় নি আমার দিকে কখনো।

একটা অটো ঠিক করলাম। সেই অটো যেটাতে আমরা একটু আগে কাপল দেখলাম।

অটোতে উঠলাম। তুমি পুরোটা রাস্তায় চুপ। আমার কাধে মাথা দিয়ে থাকলে। ফিরার সময় সেই কদম গাছ আবার চোখে পড়ল। কিন্তু তুমি এবার আর কদম ফুল চাইলে না।

তোমাকে বাসায় দিয়ে এসে আমি আমার বাসায় আসলাম। বসতে না বসতে তোমার কল এল।

তুমি: আমাকে দেখতে পাত্রপক্ষ এসেছে।

আমি: (বজ্রাহত হয়ে) মানে? কি বল এসব? তুমি তো এখনো ছোট,ছাত্রী, ১৯ বছর বয়স।

তুমি: আম্মুকে তোমার কথা আজই বলেছিলাম বলে ভাগ্য।আম্মু আমাকে কথা দিয়েছে,ঠেকাবে এই বিয়ে।

আমি: (হতভম্ব) মাত্র শুরু হল আমাদের সম্পর্ক।

তুমি: (বাকরুদ্ধ হয়ে গেলে) ভয় করছে।

আমার আর কিছু বলার ছিল না। মাত্র ২ মাসের রিলেশন। এতটা ভালবেসে ফেলেছি এরমধ্যেই, কিন্তু কে বিশ্বাস করবে সেটা? ২ মাসে ভালবাসা হয়? সবার কাছেই তো এটা মোহ লাগবে। মেয়ের বাবা মা কি তথাকথিত এই মোহের উপর ভিত্তি করে ভাল পাত্র ছাড়বে?

সেরাতে তুমি আমার ফোন দিলে।

তুমি: ছেলেপক্ষ অনেক ধনী।ছেলে ডাক্তার। কেউ আটকাতে চাচ্ছে না। শুধু আমার আম্মু বলল বিয়ে দিবে না। প্রস্তাব তার বড়ভাই এনেছিল,অনেক কথা শুনাল। আম্মু কাদছে।

আমি: থাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। তোমাকে এত তাড়াতাড়ি হারাতে হচ্ছে না আমার।

তুমি: কিন্তু আমার জন্য আমার আম্মু যে কত কথা শুনল,,,,

আমি: মেয়ের সুখের কথা ভেবে মায়েরা অনেক কষ্ট স্বীকার করে,,,,

তুমি কোন একটা অব্যক্ত কথা আর বলতে পারলা না আমার জবাব শুনে।

কয়েকদিন পর,,,,,

তুমি : আমার প্রস্তাব এসেছে আমাকে বিয়ে করতে, এবার এক লেফটেন্যান্ট,,,,

আমি: তুমি এখনো স্টুডেন্ট,মাত্র ১৯ বছর,,, আর তোমাকে এই কয়েকদিনের ভিতর বিয়ে করতে ডাক্তার,পাইলট,লেফটেন্যান্ট,  সব এল?

তুমি আমার অব্যক্ত কোন কথা চেপে গেলে,,,

আরো কয়েকদিন পর,,,

তুমি: আম্মু বলতেছে,,তোমাদের পরিবার থেকে যদি আমার জন্য প্রস্তাব পাঠায়,আম্মু সেটায় হ্যা বলবে,আর সবাইকে বলে দিবে যাতে আর প্রস্তাব না আসে।

আমি: কিন্তু আমি তো ছাত্র। চাকরিতে ঢুকতে অনেক দেরি। তোমার বাসার বাকিরা কি মেনে নেবে? 

তুমি: আম্মু বলেছে,আম্মু দেখবে সেটা,,, তুমি তোমার বাসায় একটু বল,, জাস্ট আমাদের এসে বললেই হবে যে আমাদের বিয়েটা যেকোনো সময় হলেও হবে,কিন্তু পাকা কথা।

আমি: আব্বুকে আমি কেমনে বলব? আমি এখনো ছাত্র। আমি তো উপার্জন করি না।

তুমি:তাদের বল,বিয়ে না হয় পরে হবে,তুমি চাকরিতে গেলে। এখন জাস্ট কথা বলে যাক।

আরো কয়েকদিন পর,,,,

তুমি: (কাঁদতে কাঁদতে) এটা কি করলে তুমি?

আমি: (কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না)

তুমি: তোমার আব্বু এভাবে আমার আম্মুকে বলল। তুমি কিছুই বললে না?

আমি : (চুপ এখনো,কথা নেই)

তুমি: আমাকে বিয়ে দেবার জন্য আমার ফ্যামিলির সবাই নিজেদের চয়েজ অনুযায়ী পাত্র পাঠাচ্ছে। তাদের রিজেক্ট করলেই তারা অসন্তুষ্ট হচ্ছে। সেজন্যই তো বলছিলাম যে তোমরা যদি পাকা কথা বল,এরকম পাত্র আসবে না আর। তোমরা কিছু না বললে যদি কোন পাত্রকে পছন্দ হয়ে যায় ফ্যামিলির সবার?

আমি: তুমি কি ঠেকাতে পারবা না? বলতে পারবা না তুমি অন্য কাউকে ভালবাস,এছাড়া তোমার বিয়ের এখনি কি আছে  তুমি তো স্টুডেন্ট।

তুমি: তোমার আব্বু আমার আম্মুকে এসব কথাই বলছে,,আরো অনেক কিছু বলছে,,, আমি নাকি বোঝা আমার পরিবারের উপর,বিদায় করার জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছে,,,,,

আমি: সেটাই তো মনে হচ্ছে, 

তুমি: কি বললা?

আমি: আমি এখনো স্টুডেন্ট, তুমি চাইলে পারতা আমার জন্য ওয়েট করতে,বলতে পারতা তুমি এখন বিয়ে করবা না,এতেই তো আর পাত্র আসত না।

তুমি: মেয়ে হলে বুঝতা।

আমি: অতকিছু বুঝি না।আমাকে ভালবেসে থাকলে অবশ্যই তুমি পারতা আটকাতে।

তুমি: আমি তো আটকেই রেখেছি,,, তবে ভয় হয়,,, কোনোদিন যদি কোনো পাত্রকে সবার পছন্দ হয়ে যায়,, তোমাকে যদি আমার হারাতে হয়,,তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচব? তুমি কিছু বোঝো না, কিছু না,,,, তোমরা কেউ বোঝো না।

কয়েকদিন কথা বন্ধ, যোগাযোগ নেই। তোমার ছোটবোন একদিন আমাকে বলল,তোমার জন্য এক পাত্রকে নাকি তোমার ফ্যামিলির সবার পছন্দ হয়েছে। আমার আব্বু তোমার আম্মুর সাথে দুর্ব্যবহার করায় তোমার আম্মু কিছু বলে নি।

তুমি আমাকে ফোন দিলে।

তুমি: (কাপাকাপা গলায়)  আমি গেলাম।

আমি: (স্তব্ধ হয়ে) যাচ্ছ? 

তুমি : হুম।

আমি: ছেলে কি অনেক বেশি ভাল?

তুমি: আমি জানি না। ছেলে দিয়ে কি হবে। আমি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছি। তোমাকে না পেলে,আমি কারো হব না।আমার লাশের উপর দিয়ে বল,,তুমি স্টুডেন্ট, আমাকে বিয়ে করতে পারবা না।

আমি শিগগিরি তোমার বাসার দিক রওনা হলাম। বৃষ্টি পড়ছে।

তুমি তোমার জানালায়, তোমার সামনে একপাতা ঘুমের ওষুধ। কিন্তু তুমি শেষবারের মত মোবাইলে আমার ছবি দেখছ।

আমি বৃষ্টিতে ভিজে তোমার জানালার নিচে। তুমি একবার তাকালে,, ভাবলে দৃষ্টিভ্রম।

আমি ভাবলাম, বৃষ্টির সময়ের উপহারটা আনতে হবে।

আমি চলে গেলাম। 

তুমি হঠাৎ সোজা হয়ে দাড়ালে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বললে,,”হারব না আমি,,যাকে ভালবাসি তার কাছেই যাব,দেখি কে আটকায়।”

তুমি বৃষ্টির মধ্যে বাইরে বেরিয়ে গেলে,,রাগ হয়ে হিজাব পড়নি তুমি।

আমি কদম গাছের নিচে কদম ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি দাঁড়িয়ে আছ,মাঝ রাস্তায়।

ভাগ্যিস বৃষ্টি পড়ছে। নয়ত পরস্পরের চোখের জল দেখতাম আমরা।

গল্প ৮৮

​”অপরিচিতা” 

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

একটি মেয়ের দিকে আমি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে আছি । মেয়েটি সুন্দর বা অন্য কোন কারণ নয় । আমার মনে হচ্ছে মেয়েটিকে আমি চিনি সে আমার পূর্ব পরিচিত কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না মেয়েটি আসলে কে ? সাহস করে যে মেয়েটি কে জিজ্ঞেস করবো সেই উপায় নেই । 

.

হঠাৎ করে মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে আসছে মনে হচ্ছে সে আমাকে চিনতে পেরেছে । নিশ্চয়ই কথা বলবে । 

.

— এই যে মিস্টার আমি অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছি আপনি আমার দিকে ভ্যাবলা কান্তের মতো তাকিয়ে আছেন, কারণটা জানতে পারি ?

.

মেয়েটির কথা শুনে আমি আসলেই ভ্যাবলা কান্ত হয়ে গেছি । তার এই প্রশ্নের উত্তরে কি বলা যায় ভেবে পাচ্ছি না । 

.

— না মানে আপনাকে আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছিলো, তাই তাকিয়ে ছিলাম । 

.

— সব মেয়েদের বুঝি আপনাদের পরিচিত মনে হয় ? কেন ? এমনটা না করলে হয় না ! কই আপনাকে তো পূর্বে আমি কখনও দেখেছি বলে মনে হয় না । 

.

— কিন্তু আমি আপনাকে অবশ্যই দেখেছি । দেখেছি বললে ভুল হবে আপনি আমার বেশ পরিচিত । 

.

— আজকে গাঁজা মনে হয় একটু বেশি খেয়েছেন তা না হলে একটি অপরিচিত মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গুল মারতে পারতেন না । যান এখান থেকে আর কখনও মেয়েদের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না আর যদি এমনটা করেন তবে ইভটিজিং এর মামলা করে দিব । 

.

কি সাংঘাতিক মেয়েরে বাবা ! শুনেছি সুন্দরী মেয়েরা অহংকারী হয় কিন্তু রগচটা বা অভদ্র হয় না কিন্তু এ দেখি সব গুণে গুণান্বিত । 

.

আমি এখন রাস্তা দিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছি আর বারবার মনে করার চেষ্টা করছি মেয়েটি আসলে কে ? আদৌ কি মেয়েকে আমি চিনি নাকি সবটাই আমার অবচেতন মনের ভুল । 

বাসায় ফিরলাম,মেয়েটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।কত মেয়েই তো দেখি রাস্তাঘাটে,এর চেয়েও ঢের সুন্দরি মেয়েকে দেখি। সবার কথা যদি আমার মস্তিষ্ক গুরুত্বপূর্ণ মেমরি হিসেবে সেইভ করে রাখত তাহলে হয়ত ব্রেইনই বার্স্ট হয়ে যেত।

পরেরদিন সকালে আমার ডাক্তার আসল বাসায়,আব্বু আম্মু তাকে বসিয়ে আমাকে খবর দিল। আমি গেলাম নিচে,ডাক্তার বলল,”রায়হান সাহেব, কেমন আছেন?”

ডাক্তার কাকে ডাকছে এটা ধরতে একটু সময় নিল। এরা সবাই বলে আমার নাম নাকি রায়হান,যাদেরকে একটু আগে উল্লেখ করলাম,তারা বলে তারা নাকি আমার আব্বু আম্মু। আমি জানি না। এতটুকু জানি তাদের সাথে আমার পরিচয় মাত্র ৩ মাসের।

তবে বড়সড় একটা ঘাপলা আছে। আমি আয়নার সামনে যখন দাড়াই,একজন ২৩ বছর বয়স্ক যুবককে দেখি। আমাকে যে রুমে থাকতে দেওয়া হয়েছে,সেখানে আমার চেহারার সাথে মিল একটা মানুষের শৈশব,কৈশোর এর ছবি আছে।পুরনো বইপত্র আছে। আমি বুঝতে পারি,আমার নাম রায়হান,আমার বয়স ২৩,এটা আমার বাসায়,যে দুইজন লোক আমাকে নিজের বাবা মা বলে পরিচয় দেয়,তাদের সাথে আমার চেহারার অসাধারণ মিল,,,,,

ডাক্তার আরো আগে থেকে আসছে বাসায়,আমাকে বলা হচ্ছে আমার এমনেশিয়া হয়েছে।স্মৃতিভ্রম।আমার ২৩ বছরের জীবনে আমি যা যা শিখেছি,সব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মনে আছে,মনে নেই খালি পরিচিত মানুষদের চেহারা আর নাম,,,আর পিছনের ঘটে যাওয়া যেকোন ঘটনা,,,,,

ডাক্তার বললেন,”কি ব্যাপার?  কিছু মনে করতে পারলেন?”

আমি বললাম,”না,”

ডাক্তার বললেন,”স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা মনে আসে সেটাই অনেক,,ওষুধ দিচ্ছি,জোর করে কিছু মনে করার চেষ্টা করবেন না,খিচুনি উঠবে।”

আমি কিছু বললাম না। তবে আমার চেহারায় অস্বস্তি ফুটে উঠল।

ডাক্তারের হাসি মুখ মলিন হয়ে গেল। সে দাড়াল। আমার কাধে হাত রেখে বলল,”আপনার স্মৃতি ফিরে আসাটা খুবই জরুরি,,,খুবই”

ডাক্তার চলে গেলেন।আমি বসে রইলাম। প্রতিদিন এই লোক আসেন,দেখেন ওষুধ খাচ্ছি কিনা,কিছু উপদেশ দেন,আর শেষে বলেন আমার স্মৃতি ফেরাটা খুবই জরুরি। কেন,সেটা বলেন না,আমি জিজ্ঞেস করলেও না। আমার মাথা  বেশি খাটানো মানা,,, খিচুনি উঠবে।

আয়নার সামনে দাড়াই আমি। আমার মাথার চুল যেন কেমন। মনে হচ্ছে,অনেক ঘন চুল হঠাৎ পাতলা হয়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। সেখানে হাত দিলে,সদ্য সিলাই করা কিছু ক্ষত পাই আমি।

কিন্তু জানতে চাওয়া বারণ,কেন হয়েছে এটা,যদি আম্মুকে জিজ্ঞেস করি ত তিনি সাথে সাথে সিডেটিভ খাইয়ে দেন।মাথা থেকে চিন্তাটা সরে যাতে ঘুম চলে আসে।

সেদিন আমার মনে হল জীবনের প্রথম আমি বাইরে আসলাম।অবাক হয়ে আশেপাশের সবকিছু আমি দেখছিলাম। অবাক এক অভিজ্ঞতা,সবকিছুই নতুন করে দেখা।

বেশ কয়েকদিন গেল এরকম,কাজের ছেলেটাকে দিয়ে আমাকে প্রথম প্রথম বাইরে পাঠানো হত,স্মৃতি ফিরানোর চিকিৎসা হিসেবে। আস্তে আস্তে আমি বাইরের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিলাম। কাজের ছেলে ছাড়াই বাইরে যেতে পারি,,মানুষ দেখি,,, বিভিন্ন ধরণের মানুষ, মাঝে মাঝে মেয়েদের দেখি,সুন্দর সুন্দর মেয়েদের,আমার দিকে তাকায় মাঝে মাঝে তারা,লজ্জা পেয়ে চলে যায়।

সব চিকিৎসার অংশ। স্মৃতি ফেরাতে হবে আমার। এটা নাকি খুব জরুরি।

গত ৩ মাসে আমি পরিচিত মানুষ বলতে চিনেছি আব্বু, আম্মু,কাজের ছেলে আর ডাক্তারকে। মাঝে মাঝে আমি তাদের বলাবলি করতে শুনেছি,আমার সাথে কারা নাকি দেখা করতে চায়।কিন্তু ডাক্তারের পারমিশন ছাড়া আমার সাথে কারো কোন কথা বলা নাকি মানা।আমার প্রতিদিনকার রুটিন হল,,খাওয়া,ওষুধ খাওয়া,বাইরে গিয়ে মানুষ দেখা,প্রকৃতি দেখা,আর ঘুমানো।

আস্তে আস্তে যত দিন যেতে লাগল,কি যেন হতে লাগল আমার। বেশ কিছু জিনিস বুঝতে পারলাম।আমাকে বাইরে নেওয়া হলে প্রতিদিনই নির্দিষ্ট কয়েকটা জায়গায় নেওয়া হচ্ছে, একটা পার্ক,একটা বাস স্টেশন, একটা হোটেলের সামনের রাস্তা, থানার রাস্তা,আর হাসপাতালের রাস্তা।

মাঝে মাঝে কিছু লোক আমার সামনে দিয়ে হেটে চলে যায়। আমার দিকে তাকায়,সম্মানের চোখে তাকায়,তারপর তাদের চোখে একটা দুঃখের ছায়া নামে,তারপর চলে যায়,,,,,

এমতাবস্থায় একদিন সেই মেয়েটাকে দেখলাম,যার সাথে প্রথম সাক্ষাতের কথা উপরেই বললাম। এই মেয়েটাকে আগে আমি কখনো দেখি নি।অথবা,,দেখেছি কি,,চিনি কি তাকে,,,,?

কি জানি ৩ মাস আগের কিছুই ত জানি না।

পরেরদিন ডাক্তার এল না। আব্বু আম্মু গাড়িতে করে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল।কি জানি একটা পরীক্ষা করাবে,বাসায় সেটা সম্ভব না।

গাড়ি চলতে চলতে কালকে সেই লেকপাড়ের হাইওয়েতে এল, আমি গতদিন যেই মেয়েটাকে দেখেছি,তাকেই আবার দেখলাম,ঠিক একই জায়গায়,,,চলন্ত গাড়িতে আমার দিক এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে,,মুখে একটা ফাঁকা হাসি,,,

গাড়িটা যতক্ষণ দৃশ্যমান থাকল,মেয়েটা একদৃষ্টে আমার দিক চেয়ে রইল,হঠাৎ আমাদের গাড়ির পাশ দিয়ে একটা বাস গেল। বাস চলে যাবার পর মেয়েটাকে আমি আর দেখলাম না।আশেপাশে যাবার কোন জায়গা নেই।

ডাক্তার বললেন,,”রায়হান সাহেব কি অবস্থা?”

আমি বললাম,,,”একটা মেয়েকে দেখলাম আসার পথে,এর আগেও এক সন্ধ্যায় দেখেছিলাম,দেখে খুব পরিচিত লাগছে।”

ডাক্তার বললেন,”জিজ্ঞেস করতেন চেনেন কি না”

আমি বললাম,”গতদিন করেছিলাম,সে আমাকে বলেছিল আমি গাজা খেয়েছি কিনা,ইভটিজিং এর চেষ্টা করছি নাকি।”

ডাক্তারের মুখ বেজার হয়ে গেল। বলল,”হয়ত আপনার পরিচিত কেউ,কিন্তু আপনার অসুস্থতার কথা জানে না।”

আমি বললাম,”আজ সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল,কিন্তু হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল ফাকা রাস্তায়।”

ডাক্তার একটা ফাইল হাতে উঠেছিল।পাশে ক্যাবিনেট এ রাখার জন্য। হাত থেকে সশব্দে ফাইলটা পরে গেল।

আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল সে।আমিও পালটা চেয়ে রইলাম।ডাক্তার আর কিছু বলল না। আব্বু আম্মুকে ডেকে কি যেন বলল। আমি শুধু এট্টুকু শুনলাম যে,”কাজ হচ্ছে,জায়গাগুলোতে নিয়মিত নেয়া চালিয়ে যান তাকে,,,,,”

বাসায় ফিরার আগে আমাকে নিয়ে রুটিন অনুযায়ী প্রত্যেকটা জায়গায় নিয়ে গেল আব্বু আম্মু।বিশেষ কিছু ঘটল না। দুপুরর বাইরে খেয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম বাসায়। থানার সামনে দিয়ে আসার সময় গেটের সামনে আবার মেয়েটাকে দেখলাম,মুখে সেই ফাঁকা হাসি।

                       * * *

অন্ধকারে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে তরুণ লেখক রায়হানের বাসার জানালার পাশে। প্যান্টের পিছনে একটা পিস্তল।তাকে বলা হয়েছে,যেকোনোভাবে রায়হানকে শেষ করে দেওয়া। এর আগেরবার অনেক কাছে চলে এসেছিল সে কাজটার। কিন্তু লাভ হয় নি,আশেপাশে লোক চলে আসায় মৃত্যু নিশ্চিত করা যায় নি। কয়েক সপ্তাহ পর খবর পায় সে,,তেলাপোকাটা বেচে আছে,,, তবে সুখের বিষয় তার কোন স্মৃতি নেই।

রায়হান ৩ মাস আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার সাক্ষী।একমাত্র সাক্ষী। শুধু তাই না,ঘটনাটি ঘটার পর সে ঘটনাটার প্রমাণ এবং স্বীকারোক্তি রেকর্ড করে। সেই স্বীকারোক্তি যদি প্রকাশ পেয়ে যায়,পিস্তলওয়ালা লোকের ক্লাইয়েন্ট এক বড় নেতার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

পিস্তল ওয়ালা পেশাদার খুনি তানভীর মনে মনে শপথ নিল,,”গতবারের ভুল এবার আর হবে না। নিজের বরাদ্দ আয়ুর ৩ মাস অতিরিক্ত বেচেছিস তুই। ”

                        * * *

থানায় আজ রাত জেগে কাজ করছে এস আই পারভেজ। তার চোখের নিচে কালি। জীবনের প্রথম সে কোনো কেইস নিয়ে এতটা টেনশনে আছে।মালিবাগ হোটেলে তরুণী ধর্ষণ আর খুনের কেইস। 

গত তিনমাস ধরে কেইসটা তার চোখের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। কোনোভাবেই সুরাহা করতে পারছে না। সে জানে এই কেইস সমাধান করতে পারে একজন। সে হল তরুণ লেখক রায়হান। গত ৩ মাস আগে সে যখন সন্দেহভাজন খুনিকে বের করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। তার অন্যতম প্রিয় তরুণ এই লেখক হঠাৎ তাকে ফোন দিয়েছিল। কান্নাভেজা কণ্ঠে ফোনে বলেছিল,,”সবাই বলে আপনি নাকি সৎ পুলিশ অফিসার। টাকা খান না বলে প্রতিবছর বিভিন্ন জায়গায় আপনাকে ট্রান্সফার করানো হয়,অনেক আশা নিয়ে আপনাকে ফোন করেছি। ওই মেয়েটার খুনির নিজের মুখে করা স্বীকারোক্তি আমার কাছে আছে।”

এস আই পারভেজ দ্রুত দৌড়ে গিয়েছিল সেজায়গায়,যেখানে রায়হান আসতে বলেছিল তাকে। কিন্তু গিয়ে দেখে নির্দিষ্ট জায়গার কিছুদূরে রায়হানের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে।

পারভেজ তাকে সময়মত হাসপাতালে না নিয়ে এলে সে মরে যেত। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর লাভ হয়নি কোন। রায়হানের কোনো স্মৃতিই আর নেই। স্বীকারোক্তিটা কোথায় আছে,সে জানে না।আদৌ আছে,নাকি রায়হানকে আক্রমণকারীরা নিয়ে গেছে,তাও জানে না সে।

রায়হানের ডাক্তার আর পারভেজের উচ্চপদস্থরা কেউই রায়হানের আশেপাশে ঘেষতে দিচ্ছে না পারভেজকে। রায়হানের ডাক্তার দিচ্ছে না,কারণ পুরনো কথা জোর করে মনে করলে রায়হানের ক্ষতি হবে।আর পারভেজের উচ্চপদস্থরা ঘেষতে দিচ্ছে না। কারণ তারা চায় না এটার সুরাহা,,অনেক পরিচিত মুখ সামনে আসতে পারে।

পারভেজ প্রতিদিন তাই  দোয়া করতেছে আল্লাহর কাছে,এমন কিছু যাতে ঘটে,,রায়হানের স্মৃতি ফিরে আসে।

                       *  *  *

আমি আমার বেডরুমে শোওয়া। আমার রুমে আমার নতুন খোলা একটা ট্রাংক। এতদিন এটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ডাক্তারের পরামর্শে।আমার খুব সাম্প্রতিক কিছু জিনিস এখানে রাখা ছিল। এবং খুবই সংবেদনশীল জিনিস (ডাক্তারের মতে)। তিনি নাকি জিনিসগুলো দেখেছেন। তার মতে আমার মস্তিষ্কের বর্তমান যে অবস্থা,এই জিনিসগুলো দেখলে অবস্থার অবনতি হবার সম্ভাবনা নেই।

ট্রাংক খুলে আমি কিছু চিঠি পেলাম। গোলাপী খামে লেখা কিছু ছোট ছোট চিঠি,এক দুই লাইন সেগুলো তে লেখা।

আস্তে আস্তে আমি সেগুলো পড়তে লাগলাম। একটায় লেখা আছে,,”পরের গল্পটা কবে লিখবেন?”

একটায় লেখা আছে,” আচ্ছা,আপনার ছদ্মনাম দানব কেন?”

আরেকটায় লেখা,”আপনি কেন সামনে আসেন না? একবার একটু যদি আপনাকে দেখতে পারতাম।”

আরেকটায় লেখা,”হয়ত এরকম অনেকেই আপনাকে বলে,কিন্তু আপনার লেখা পড়েই আমি আপনাকে ভালবেসে ফেলেছি,,অনেক বেশি,,,,কি আশ্চর্য দেখুন তো,,,আপনাকে দেখলামও না”

আরেকটায় লেখা,” বইমেলায় সব লেখক তাদের বইয়ের স্টলে থাকে,আপনার বইয়ের স্টলে আপনি কেন আসেন না? আমি প্রতিদিন রাত পর্যন্ত ওয়েট করি,আর বাসায় গিয়ে বকা খাই।”

শেষ একটা চিঠিতে লেখা,” জানি,এই প্রযুক্তির যুগে এসব লেইম।কিন্তু আমি অনেক ব্যাকডেটেড। কেন যেন মনে হয় গোলাপি খামে ছোট ছোট কিছু কথা লেখলে আপনাকে মনের কথা বলা যাবে।আমি অনেক বোকা,আপনাকে এক নামে সারা দেশ চেনে,আপনার প্রেমে আপনাকে না দেখেই পড়া যায়। আপনি কেন পড়বেন বলুন তো আমাকে না দেখে? নিশ্চয়ই আড়ালে থেকে আপনার ফ্যান অনেক পাগল করা সুন্দরিদের আপনি দেখেন,আর হাসেন।”

একদম নিচে একটা ছবি। ছবিটা দেখে বিছানা থেকে শোয়া অবস্থা থেকে দাঁড়িয়ে গেলাম।

সেই মেয়েটা,,,যাকে আমি সব জায়গায় দেখি। আমার দিকে তাকিয়ে ফাঁকা ভাবে হাসে।

সেরাতে আমি ঘুমানোর পর স্বপ্নে এই গল্পের প্রথমে যে কনভারসেশন টার উল্লেখ করেছি,সেটা দেখলাম। পরের রাতেও দেখলাম,, তার পরের রাতেও,,,,,,

মেয়েটাকে আমার পরিচিত লেগেছিল খুব।কিন্তু মেয়েটা আমাকে পাত্তা দেয় নি।বলেছিল আমার কোথাও ভুল হয়েছে। আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে,,এটা কোন স্বপ্ন না,,,মেয়েটাও সত্যি না,,হয়ত সত্যি ছিল,,,, কিন্তু যেই আলাপটা আমাদের হয়েছিল,সেটা সেইদিন হয় নি,,,হয়েছিল ৩ মাস আগের কোন এক সময়ে,,হয়ত আরো আগে। ডাক্তার আমাকে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় যেতে বলে,বলে এগুলো নাকি আমার স্মৃতি ফিরতে সাহায্য করবে,,আমি কিন্তু ঠিক সেসব জায়গায়ই মেয়েটাকে দেখি। 

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেদিন আমি যেটা দেখেছি,সেটা সেদিন ঘটে নি। ঘটেছে অনেক আগে।

আমি কিছু জিনিস চিন্তা করলাম। তারপর চলে গেলাম ডাক্তারের কাছে।কেন যেন মনে হচ্ছে উনি অনেক কিছু জানে।

আমি তার কাছে গিয়ে ট্রাংকে চিঠি পাওয়ার  ঘটনাটা বললাম,একটা ছবি পাওয়ার ঘটনা বললাম। এও বললাম,এই মেয়েটাকে আমি কোথায় কোথায় দেখেছি। এই সন্দেহটাও তার কাছে বললাম যে মেয়েটার সাথে হওয়া আমার কনভারসেশন টা আমার মনে হচ্ছে অনেক আগের কথা। আমার এটাও ধারণা মেয়েটাকে শুধু আমিই দেখতে পাই।

ডাক্তার দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে একটা পুরনো পত্রিকার পাতা বের করলেন। সেখানে আমি দেখলাম একটা হেডলাইন। “মালিবাগে তরুণী ধর্ষণের পর খুন,সন্দেহভাজন তরুণীর কথিত বয়ফ্রেন্ড,বলছে পুলিশ”

আমি ফাঁকা চোখে চেয়ে রইলাম ডাক্তারের দিক।

“এটা আমার মেয়ে”  বললেন ডাক্তার।

আমি তাকিয়ে রইলাম। 

“সন্দেহভাজন বয়ফ্রেন্ডটা তুমি”

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। 

ডাক্তার বলতে লাগলেন,,”আমার মেয়ে তোমার লেখা পড়ে তোমার জন্য পাগল হয়ে যায়। ওর তো মা নেই,সব আমাকে বলত,এমনকি এটাও। আমি ভাবতাম,মাত্র টিনেজ পেরনো মেয়ে,সেলিব্রেটিদের প্রতি মোহ তো আসতেই পারে। অদেখা কোনো সেলিব্রেটি। আমি জানতাম না।সেলিব্রেটিটা তুমিই,,আমার বন্ধুর ছেলে।”

আমি হতবাক হয়ে আছি।

ডাক্তার বললেন,,”যেসব জায়গায় আমি তোমাকে যেতে বলি,আমি নিজে তোমাকে আর আমার মেয়েকে সেসব জায়গায় দেখেছি,যদিও ও জানত না,ওটাই তুমি। আমি আর তোমার বাবা তোমাদের বিয়ে ঠিক করেছিলাম। কাকতালীয়ভাবে,তুমিই ছিলে ওর মোহ,প্রেম,ভালবাসা,কিন্তু কখনো সামনে আসো নি বলে ও জানত না। তুমিও চাইতা আরেকটু সময় নিয়ে ওকে বলবা।”

হঠাৎ আমার মাথাটা কেমন জানি করে উঠল। পৃথিবীটা ঘুরতে লাগল। আমি পড়ে গেলাম।

দৃশ্যপট চেঞ্জ হয়ে গেল। মেয়েটা আমার সামনে দাঁড়ানো। আমাকে বলছে,,”দেখুন,আমি জানি আমাদের ফ্যামিলি আমাদের বিয়ে ঠিক করেছে। তবে জেনে রাখুন,আমি আরেকজনকে ভালবাসি”

আমি বললাম,,”কাকে?”

ও বলল,,”ওই যে দানব ছদ্মনামে লেখে একজন,,নাম রায়হান,তাকে”

আমি বললাম,”ওয়েল,আমার নাম রায়হান”

মেয়েটা নাক কুচকে বলল,,”কমন নাম,বাট আপনি কেন হবেন,, ও দেখতে অন্যরকম ”

আমি বললাম,,”কিরকম?”

মেয়েটা বলল,,”জানি না”

হাসপাতালের বেডে আমার ঘুম ভাঙল। পাশে ডাক্তার।আমাকে বললেন,,”আমি দুঃখিত,এসব কথা বলার জন্য বড্ড তাড়াহুড়া হয়ে গেছে,,আসলে আমি আমার মেয়ের খুনির বিচার চাই। তুমি একমাত্র সাক্ষী,কিন্তু তুমি যদি কিছু মনে করতেই না পার,আমার মেয়ে কখনওই বিচার পাবে না”

ডাক্তার চলে গেল। আস্তে আস্তে হাসপাতালের কেবিনে রাত নামল।বাইরের স্ট্রিট লাইট জানালা দিয়ে আমার বিছানায় এল।

মাথার ভিতরে একটা দৃশ্য এল।মেয়েটা আর আমি একটা রেস্টুরেন্টে,মেয়েটা আমাকে গল্পের বই পড়ে শুনাচ্ছে। আমার কাছে গল্পগুলো লেইম লাগছে,কিন্তু মেয়েটা এমনভাবে বলছে,যাতে গল্পের প্রতিটা অক্ষরে ওর হৃদয় লেপ্টে আছে।

আমি মনে মনে ভাবলাম,নাহ মেয়েটাকে বলেই দিই।কিন্তু জিনিসটা একটু নাটকীয় হতে হবে।

আমার নতুন বইয়ের প্রথম কপিটা ওকে দেব,আমার অটোগ্রাফ সহ। আমার বইগুলোতে অটোগ্রাফ থাকে আমার। এবার ওর সামনে লিখব সেটা। ও দেখবে এভাবে বুঝবে,আমি আর ওর প্রেম একই জিনিস।

ওকে আমি বললাম,একটা ফাইভস্টার হোটেলে দেখা করতে।বললাম,”আমি তোমার সাথে দানবকে দেখা করাব।”

হাসপাতালের বেডে সকাল হয়ে গেল। আমাকে আরো কিছু ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দিল ডাক্তার।

সেরাতে টিভিতে দেখলাম,কোন এক নেতার যুবক ছেলে বন্যার্তদের ত্রাণ সরবরাহের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে পা রাখছে।

সেরাতে ঘুমের সময় স্বপ্নে আমি দেখলাম,আমাকে ফোন দিয়েছে কেউ। দেখলাম,সেই মেয়েটা। আমাকে ফোনে বলছে,,”শোনেন,আমার এক বান্ধবী নাকি সেই লেখককে চেনে,ও আমাকে সেই লেখকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। ফাইভস্টার হোটেলের মিট টা ক্যান্সেল করি?”

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি যে সেই লেখক,এটা আমার আব্বু আম্মু আর সেই ডাক্তার আংকেল ছাড়া কেউ জানে না। ওর বান্ধবী কিভাবে জানল?

আমি মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম,”কোথায় আসবে সেই লেখক? আমি দেখতে চাই তাকে”

মেয়েটা বলল,,”লেখকের কাল জন্মদিন,আমার বান্ধবী আমাকে সেই পার্টিতে নিবে,মালিবাগের এক হোটেলে।”

আমি কিছু বলার আগেই কানেকশন চলে গেল মোবাইলে,বাইরে প্রচন্ড ঝড়,,কারা যেন বলছে,মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার পড়ে গেছে। দুইদিন কানেকশন অফ থাকবে।

আমি পরেরদিন সকালে মালিবাগ চলে গেলাম। অনেক হোটেল। কোথায় খুজব,, খুজতে খুজতে একটা দামী হোটেলে ঢুকলাম।

ঢুকতেই দেখলাম, একটা লোক বের হচ্ছে,হন্তদন্ত হয়ে। আমার সাথে ধাক্কা লাগল,তারপর তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। আম দেখলাম একটা ভিডিও টেপ পড়ে গেল তার পকেট থেকে। আমি কিছু করার আগে কয়েকটা লোক দৌড়ে এল। প্রথম লোকটা ভয়ে পালিয়ে গেল। লোকগুলো বলল,,”ধর ধর,,শালায় সব ভিডিও করছে।”

আমি স্পষ্ট দেখলাম,যারা দৌড়ে লোকটাকে ধরতে গেল,তাদের নেতৃত্বে সেই নেতার ত্রাণদানকারী নব্য রাজনীতিতে ঢুকা ছেলেটা।

আমার ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে চিল্লাচিল্লি হচ্ছে। আমার আব্বু যেন কার সাথে চিল্লাচ্ছে।

একটা পুরুষকন্ঠ বলল,,”আপনি বুঝছেন না,,,আপনার ছেলের যেকোনোভাবে মনে করতেই হবে,ওই সন্দেহভাজন ছেলেটা এখন রাজনীতিতে নাম দিয়েছে,,,”

আব্বু বলছে,,”আপনার কথা শুনে আমি আমার ছেলেকে হারাতে বসে ছিলাম,,আর না”

আমি গেলাম সেখানে,পারভেজ নেমপ্লেট পরা এক পুলিশ আমাদের ড্রইংরুম এ। আমাকে দেখে সে আব্বুকে উপেক্ষা করে বলল,,”রায়হান সাহেব,, প্লিজ,,আপনার মনে করতেই হবে,,, মনে করুন,,আপনি কি কারণে আমাকে সেরাতে ফোন দিয়েছিলেন। ”

আমি বাকরুদ্ধ থাকলাম কিছুক্ষণ।  পুলিশটা বলল,,”প্লিজ,ভাই,প্লিজ,,, মনে নেই,,সেরাতে আপনি কেদে কেদে আমাকে ফোন দিয়ে বললেন,,আপনার অনামিকাকে যারা কেড়ে নিয়েছে,তাদের আপনি ছাড়বেন না,,মনে করুন প্লিজ,,,”

আমার মাথায় মেয়েটার ছবি ভাসতে লাগল। মেয়েটা আমাকে বলছে,,তার সেই পরিচিত কন্ঠে,,,”আমার নাম অনামিকা,, আপনার?”

এরপর মেয়েটার ছবিটা পালটে গেল। রক্তাক্ত নগ্ন একা শরীর।মেয়েটার ঢাকার সামর্থ্য নেই, আমাকে বলল,,”রায়হান,,, হয়ত, লেখকটা আসলেই যোগ্য ছিল না,,ও হয়ত আসলেই একটা দানব ছিল,,,”

আমি বললাম,,,”না না,,অনামিকা,,আমিই সেই দানব,,,তোমার দানব,,নাটকীয়তা করতে গিয়ে তোমার কত বড় ক্ষতি আমি করে ফেললাম”

অনামিকা কিছু বলল না,,, শোনার আগেই সে চলে গেল।চিরজীবনের মত

কানে কেমন যেন এম্বুলেন্সের সাইরেন বাজল। আব্বুর কণ্ঠ শুনলাম,পুলিশকে বলছে,,,”আমার ছেলের যদি আবার কিছু হয়,,আমি আপনাকে ছাড়ব না।”

আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল। সেই অন্ধকার দুনিয়ার এক অন্ধকার কক্ষে আমি নিজেকে নিজে কাঁদতে দেখলাম,ফোন দিতে দেখলাম কাউকে,,,”এস আই পারভেজ,,, আমার হবু স্ত্রীকে এক মন্ত্রীর ছেলে মেরে ফেলেছে, এক লোক লুকিয়ে সেটার ভিডিও করছিল,ওরা দেখে ফেলায় পালাচ্ছিল। আমার কাছে সেই ভিডিও টেপটা চলে এসেছে। কিছু একটা করেন প্লিজ,,, অনামিকা এটা জেনে মরে গেল,যে ও যাকে ভালবাসত সেই ওকে নষ্ট করে মেরে ফেলল,,, সব আমার দোষ,,,আমার জন্যই সব হয়েছে,, এটা আমার প্রাপ্য,,,”

বাইরে এস আই পারভেজ কাকে যেন বলছে আমার হাসপাতালের বেডের বাইরে,,, “অনামিকার বান্ধবীকে আমরা অনেক আগেই ধরেছিলাম,ও আমাকে বলেছে,,মন্ত্রীর ছেলের নাকি অনামিকার প্রতি লোভ ছিল। অনামিকা দানব ছদ্মনামের এক অদেখা লেখককে ভালবাসে,এটা ওর কাছের লোকেরা জানে,এমনকি বিয়ে ঠিক হবার পরেও সে তার হবু বরকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে এই অদেখা লোকটার জন্য। আমরা এখন জানি সেই লেখক আসলে ওর হবু বরই ছিল। কিন্তু সেদিন,ওর বান্ধবী সেই মন্ত্রীর ছেলের কাছ থেকে টাকা খেয়ে অনামিকাকে সেই হোটেলে মিথ্যা পার্টিতে পাঠায়,মন্ত্রীর ছেলে নিজেকে সেই লেখক পরিচয় দিয়ে তার বন্ধুদের নিয়ে অনামিকাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলে,,,, এই ঘটনার রেকর্ড করেছিল বিরোধী পার্টির এক লোক। কিন্তু সে ধরা পড়ে যায় ওদের কাছে,ওরা তাকে গুম করে ফেলে। কিন্তু কাকতালীয় ভাবে টেপটা চলে আসে রায়হানের কাছে,,,,”

আমি শুনলাম সব। হঠাৎ দেখলাম সাদাকালো ভাবে কি যেন আমার চোখে ভাসছে,, টেপ হাতে প্রচন্ড দুঃখ নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি নির্জন রাস্তায়,এখানে আসার কথা এস আই পারভেজের। কিন্তু একটা কাল মোটা লোক এল। হাতে একটা রড। আমার মাথায় বাড়ি দিল। কিছু মনে নেই আর।অসহ্য যন্ত্রণা।

হাসপাতালের গেইট দিয়ে পেশাদার খুনি তানভীর ঢুকছে পিস্তল হাতে। এস আই পারভেজ রায়হানের কেবিনের সামনে দাঁড়ানো। আশেপাশে আর কেউ নেই।

সাইলেন্সার লাগিয়ে একটা গুলিতে পারভেজের খুলি উড়ে গেল।

তানভীর ঢুকছে রায়হানের কেবিনে। 

রায়হান জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে খোলা আকাশের দিকে। 

অপরিচিতা মেয়েটা এখন আর অপরিচিতা নেই। সেই জানালার সামনে খোলা আকাশে উড় হে সাদা কাপড় পড়ে। মুখে তার মোহিনী হাসি।

কেবিনের ভিতর থেকে সাইলেন্সার দিয়ে বেরোনো গুলির “পপ” করে একটা আওয়াজ হল। সাথে হাসপাতালের জানালা দিয়ে কারো নিচে পতন,,,,,,,,,

 

গল্প ৮৭

​”ওজন মেশিনে ভুল ছিল”

লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

৯৫ কেজি ওজনবিশিষ্ট নব্যপ্রেমিকের আজ মন ভাল নেই।মন খারাপের কারণ তার ওজন। 

বিষয়টা বিস্তারিত বলা প্রয়োজন।  তার ২ মাস আগে একটা নতুন প্রেম শুরু হয়।চোখ ধাঁধানো এক সুন্দরির সাথে। এখন দুইমাস পর সেই প্রেমিকার বান্ধবীরা নব্যপ্রেমিককে দেখার ইচ্ছা পোষণ করে। বিষয়টা গুরুতর রূপ ধারণ করে যখন প্রেমিকার হঠাৎ মনে পড়ে যে নব্যপ্রেমিকের ওজন ৯৫ কেজি। 

এখন ৯৫ কেজি ওজনের বয়ফ্রেন্ডকে কিভাবে বান্ধবীদের সাথে পরিচয় করাবে সেই টেনশনে নব্যপ্রেমিকের সুন্দরি প্রেমিকার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়,কাপাকাপি শুরু হয়,বুক ব্যাথা শুরু হয়,,খিচুনি হতে গিয়েও হয় না।

বেশ কয়েকদিন নব্যপ্রেমিকের প্রেমিকা দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে ওঠে। স্বপ্নে দেখে তার বান্ধবীরা তার বয়ফ্রেন্ডকে দেখে সবাই হার্ট এটাক করে মরে গেছে। এবং সেই বান্ধবীদের ভূত, “তোর জন্য আমরা মরে গেলাম অকালে,”  এই বলে খপ করে প্রেমিকারে গিলে খেয়ে ফেলছে।

আর স্ট্রেস নিতে না পেরে প্রেমিকা শেষ পর্যন্ত নব্য প্রেমিককে বলল,,”তুমি কি ১৫ দিনের মধ্যে ওজন ১৫ কেজি কমিয়ে ৮০ করতে পারবা? তোমাকে আমার বান্ধবীরা দেখতে চেয়েছে।”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”এটা কোন ঘটনা,তোমার জন্য সব করতে পারি”

কিন্তু প্রেমিকা চোখের আড়াল হতেই নব্যপ্রেমিক এক দৌড়ে চলে আসল তার ডেটিং এক্সপার্ট বেস্টফ্রেন্ডের পরামর্শ নিতে। অনেক খুজে দেখল,টি শার্ট,হাফপ্যান্ট আর বাথরুমের চটি পরা ডেটিং এক্সপার্ট একটা কালা চশমা চোখে দিয়ে দুইপাশে দুইটা সুন্দরির কাধে হাত রেখে বেলস পার্কের বেঞ্চে বসে আছে। সুন্দরিরাও প্রেমভরা দৃষ্টি তে ডেটিং এক্সপার্ট এর দিক তাকিয়ে আছে।

নব্য প্রেমিক: দোস্ত, ১৫ দিনে ১৫ কেজি ওজন কমানোর টিপস দে।

ডেটিং এক্সপার্ট : ব্যস্ত আছি। পরে দেখা কর।

নব্য প্রেমিক: তুই আসবি এখন আমার সাথে নইলে কিন্তু সেই কিলার এসমাইল কাহিনী এদের বলে দেব।

ডেটিং এক্সপার্ট শিগগিরি উঠে নব্যপ্রেমিকের মুখ চেপে ধরল। 

ডেটিং এক্সপার্ট : (সুন্দরিদের দিকে ফিরে)  আমি তোমাদের রাতে কল দিব। আর বিষয়টা যেন মাথায় থাকে।  (শয়তানি হাসি একটা)

মেয়েদুটো একসাথে বলল,,”যাহ দুষ্টু”।  এই বলে চলে গেল।

ডেটিং এক্সপার্ট : মামা,তুই এভাবে আমারে ব্লাকমেইল করতে পারলি?

নব্যপ্রেমিক: রাখ বলদ,আমার কি হবে এটা বল। মেয়ের বান্ধবীরা আমাকে দেখতে চাইছে। ৯৫ কেজি নিয়ে ওদের সামনে গেলে তো মেয়েরে নিয়ে হাসাহাসি করবে,অথবা পড়া পানি এনে ছিটা দিবে,যে আমি ব্লাক ম্যাজিক করছি কিনা।

ডেটিং এক্সপার্ট : সত্যিই করছস না ব্লাক ম্যাজিক?

নব্যপ্রেমিক ডেটিং এক্সপার্ট এর পিঠে একটা দড়াম করে কিল দিল।

ডেটিং এক্সপার্ট পিঠ বাঁকা করে দাঁড়িয়ে বলল,,”মারিস কেন? আচ্ছা দেখতাছি ব্যাপারটা কি করা যায়।”

নব্যপ্রেমিক : কিছু একটা বুদ্ধি বের কর

ডেটিং এক্সপার্ট : (নব্যপ্রেমিকের আপাদমস্তক দেখে)  মামা,তোর গার্লফ্রেন্ডের তো এমনিই স্ক্রু ঢিলা,তোরে তো ওইজন্যই বয়ফ্রেন্ড বানাইছে, এখন ওর বান্ধবীরা ওর স্ক্রু ঢিলা জানলে কি বেশি সমস্যা হবে?

নব্যপ্রেমিক আবার কিল দিতে উদ্যত হলে ডেটিং এক্সপার্ট বলল,”আচ্ছা,আর ইয়ার্কি করমু না। চল আগে তোর ওজনটা মাপাই। ধর,ওজন ৯৫ না, ৯০। তাইলে ১৫ দিতে ৫ কেজি কমিয়ে ৮৫ করাই অনেক। বাকিটা বুঝাইয়া বলবি। আর ৬ ফুট প্রায় লম্বা হইলে ৮৫ কেজি কোন মোটার মধ্যে পড়ে না”

নব্যপ্রেমিক দেখল কথা ঠিকই বলছে। অতঃপর তারা ওজন মেশিনওয়ালার কাছে গেল ওজন মাপাতে।

ডেটিং এক্সপার্ট : (মেশিনওয়ালাকে)  মামা,আমার দোস্ত ওজন মাপাইবে। মেশিনটা বাইর করেন

মেশিনওয়ালা: (নব্যপ্রেমিককে দেখে) মামা,আমার মেশিন ভাইঙ্গা যাইব। না খাইয়া মইরা যামু। 

ডেটিং এক্সপার্ট : ধুর হালা, মেশিন বাইর কর।

মেশিনওয়াল ওজন মেশিন নিয়ে একটা দৌড় দিল। ডেটিং এক্সপার্ট পিছে পিছে দৌড় দিয়ে মেশিনওয়ালার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। মেশিন ছিটে রাস্তায় পড়ল।

এই ফাঁকে নব্যপ্রেমিক মেশিনের উপর দাড়াল। মেশিনের রিডিং দেখে  নব্যপ্রেমিক ওজন মেশিনের উপর দাঁড়িয়ে দাড়িয়েই অজ্ঞান হয়ে গেল।

পিটাপিটি বন্ধ করে ডেটিং এক্সপার্ট আর মেশিন ওয়ালা নব্যপ্রেমিকের দিক তাকাল।মেশিন ওয়ালা বলল,,”আল্লাহ বাচাইছে,মেশিন ভাঙে নাই আমার”

ডেটিং এক্সপার্ট উঠে গিয়ে নব্যপ্রেমিককে নাড়া দিয়ে বলল,,”দোস্ত,কি হইছে?”

এটা বলে সে নিজেই ওজন মেশিনের রিডিং এর দিক তাকাল। দেখল,লেখা আছে “১৯৫”   

এটা দেখে ডেটিং এক্সপার্টও অজ্ঞান হয়ে গেল।

নব্যপ্রেমিকের মন তাই ভীষণ খারাপ। ব্রেকাপ এর ভয়ে ওজন সম্পর্কিত নতুন ব্যাপারটা গার্লফ্রেন্ডকে জানাল না। 

এদিকে ডেটিং এক্সপার্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।  ১৯৫ কেজি ওজন দেখে তার জ্বর এসে গেছে। জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বলতেছে,, “১৯৫ কেজি,,,, আসেন ভাই নিয়া যান,, ১৯৫ কেজি মাত্র,,,”

যাই হোক,, নব্যপ্রেমিক ব্যায়ামাগারে ভর্তি হল। ১৫ দিনে তার ওজন ১৯৫ থেকে ৮০ কেজিতে আনতে হবে। 

জ্ঞানীরা বলেন,মানুষের অসম্ভব কিছুই নেই। নব্যপ্রেমিক নিঃসন্দেহে একজন মানুষ।  তাই সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ,ওজন তাকে কমাতেই হবে।

ব্যায়ামাগারের ট্রেইনারকে নব্যপ্রেমিক বলল,,” আংকেল, নিউ গার্লফ্রেন্ড,ওজন ১৫ দিনের মধ্যে ৮০ কেজি না হলে ভীষণ মাইন্ড করবে।”

ট্রেইনার বলল,”তা বাবা তোমার বর্তমান ওজন কত?”

নব্যপ্রেমিক বলল,,”১৯৫ কেজি”

ট্রেইনার সেদিনই ব্যায়ামাগারের চাকরি ছেড়ে দিলেন।

ব্যায়ামাগারের এতদিনের ট্রেইনার চলে যাবার পিছে হাত আছে ভেবে কর্তৃপক্ষ নব্যপ্রেমিককে তাড়িয়ে দিল ব্যায়ামাগার থেকে।

এদিকে নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ড তার বেস্টফ্রেন্ডকে আর না থাকতে পেরে বলে দিল পুরো কাহিনী। যে তার বান্ধবীরা যে বলছে তার বয়ফ্রেন্ডকে দেখবে। কিন্তু তার বয়ফ্রেন্ড এর ওজন তো ৯৫ কেজি। কিভাবে দেখাবে?

বেস্টফ্রেন্ড বলল,,”তুই কি ৯৫ কেজি জানার পরও ভালবেসেছিলি?”

গার্লফ্রেন্ড: হ্যা

বেস্টফ্রেন্ড: ছেলে কি টাকাওয়ালা,হ্যান্ডসাম?

গার্লফ্রেন্ড: না

বেস্টফ্রেন্ড: বাইক আছে?

গার্লফ্রেন্ড: না,তবে সাইকেল আছে। কিন্তু ও চড়লে বাকা হয়ে যায় সাইকেল তাই চড়ে না।

বেস্টফ্রেন্ড: (গার্লফ্রেন্ডের কান টেনে)  কিছুই যখন ছেলের নাই,আর ৯৫ কেজি দেখেও যখন প্রেমে পড়তে পারছস,তাইলে বান্ধবীদের দেখাইতে সমস্যা কি? নাহয় টিটকারিই দিবে একটু,তাতে কি হইছে? তোর ভালবাসা,তোর গর্ব হওয়া উচিৎ

গার্লফ্রেন্ড: আরে আমাকে যত টিটকারি মারুক।ওকে যদি ওরা অপমান করে? সেজন্যই তো ভয় পাচ্ছি।

গার্লফ্রেন্ড মাথা নিচু করে বসে রইল। বেস্টফ্রেন্ড ওর পাশে নীরবে বসে মুচকি হাসতে লাগল,আর বলতে লাগল,,”হায়রে প্রেম।”

এদিকে গার্লফ্রেন্ডকে ফেসবুকে আর্মির এক লেফটেন্যান্ট অনেক জ্বালাইত। প্রেম করব প্রেম করব বলে। সেই লেফটেন্যান্ট বিশাল বড়লোকের ছেলে,সেই হ্যান্ডসাম। বডিও বেশ ভাল। গার্লফ্রেন্ড তাকে পাত্তা না দেওয়ায়,ডাইরেক্ট বাসায়ই প্রস্তাব পাঠায়। গার্লফ্রেন্ডের বাপ মা রাজি হলেও গার্লফ্রেন্ড নব্যপ্রেমিকের জন্য প্রত্যাখ্যান করে।

এখন সেই লেফটেন্যান্ট ভীষণ খেপে যায়। সে যখন দেখে গার্লফ্রেন্ডের প্রেমিক আসলে বিশাল মোটা,দেখতেও বেঢপ,টাকাপয়সাও তেমন নাই। তখন হিংসায় জ্বলতে থাকে। ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিতে থাকে,,”সুন্দরি মেয়েদের চয়েজ এত্ত খারাপ”   অথবা,,”রিয়েল লাভ তারা বোঝে না,প্রেম করে অসুরের সাথে”   অথবা,,ফেইক আইডি খুলে মেসেজ দিতে থাকে, “প্রেমিকের কিন্তু ঘাপলা আছে,, ”   অথবা “প্রেমিক লুচ্চা”  এই টাইপ।

এত জ্বালানোর পর বাধ্য হয়ে গার্লফ্রেন্ড যখন নব্যপ্রেমিককে বলে দিল সব কথা নব্যপ্রেমিক সেই লেফটেন্যান্ট এর কাছে গিয়ে বলেছিল, “ওর আশেপাশে যদি আর তোকে দেখি,তোর উর্ধ্বস্তন কর্মকর্তাদের নালিশ দিব,তোর চাকরি কেমনে থাকে দেখব”

লেফটেন্যান্ট তখন ফেসবুকে পোস্ট দিছিল,,”বাস্তবে নায়িকারা ভিলেনদেরই হয়,, (কান্নার ইমো হপ্পে)”

যাই হোক, লেফটেন্যান্ট কিন্তু হাল ছাড়ে নি। সে নব্যপ্রেমিক আর তার গার্লফ্রেন্ডের ব্রেকাপ ঘটানোর উপায় খুজতে নিয়মিত নব্যপ্রেমিককে ফলো করত। একটু বেচাল কিছু করার অপেক্ষায় থাকত,, যেমন সিগারেট খাইলেই ভিডিও করবে,বা কোন মেয়ের সাথে কথা বললেই “লুচ্চা ভিডিও” করে গার্লফ্রেন্ডের কাছে পাঠাবে এই ছিল তার প্লান।

এখন নব্যপ্রেমিক তো সিগারেট খায় না, মেয়েদের সাথেও মেশে না। তাই এতদিন লেফটেন্যান্ট ঘুরঘুর করেও কিছু করতে পারল না।

কিন্তু ফলো করে যেই দেখল নব্যপ্রেমিক এর ওজন ১৯৫ কেজি,অমনি বাসায় এসে “রূপবানে নাচেরে কোমর দুলাইয়া” গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে ভাবল,,আর ঠেকায় কে। এবার গার্লফ্রেন্ডকে এটা বললেই ব্রেকাপ হবে,আর গার্লফ্রেন্ড তাকে বিয়ে করবে।

ওদিকে যেদিন গার্লফ্রেন্ডকে কথাটা বলতে যায় লেফটেন্যান্ট সেদিনই গার্লফ্রেন্ড তার বেস্টফ্রেন্ডকে স্বীকার করতেছিল যে, সে ৯৫ কেজি হলেও নব্যপ্রেমিককে ভালবাসে।

এটা শুনে লেফটেন্যান্ট একটু কনফিউশন এ পড়ল। ৯৫ কেজি নব্যপ্রেমিককে যদি মেয়ে ভালবাসে,তাহলে কি ১৯৫ কেজি ওজনের নব্য প্রেমিককেও ভালবাসবে?

শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নেয়,নাহ,এভাবে হবে না,নব্যপ্রেমিকের সাথে গার্লফ্রেন্ড ব্রেকাপ করবে না। তাই নব্যপ্রেমিককে দিয়েই ব্রেকাপ করাবে। সে জবরদস্ত একটা প্লান করল।

সে ঘুরে ঘুরে দেখল নব্যপ্রেমিকের বেস্টফ্রেন্ড ডেটিং এক্সপার্ট জ্বরে দুর্বল শরীর নিয়েও বন্ধুর ওজন কমানোর উপায় খুজতে ছুটাছুটি করছে।

লেফটেন্যান্ট করল কি,লেংটি পড়ে  দাড়ি চুল লাগিয়ে কিছু পাগল হওয়ার ওষুধ নিয়ে ডেটিং এক্সপার্টের বাসার পাশের মাঠটায় এসে বসে  থাকল। সাইনবোর্ড লাগাল,,”লেংটা বাবার বিধ্বংসী আবিষ্কার, ১৫ দিনে ওজন কমবে ১১০ কেজি”

ডেটিং এক্সপার্ট সেটা দেখে আনন্দে লাফাতে লাফাতে নব্যপ্রেমিককে আনতে গেল।

এদিকে লেফটেন্যান্ট যে দোকান থেকে পাগল হওয়ার ওষুধ কিনেছিল। সেই দোকানের পাশে ছিল তখন নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ডের বেস্টফ্রেন্ড। মেয়েটা শুনল আড়ি পেতে যে লেফটেন্যান্ট দোকানদারকে মোটা টাকা দিয়ে বলছে,,”এই ওষুধ এক মোটুরে খাওয়াইয়া পাগল বানামু,হালায় আমার বউ ভাগাইয়া নিছে”

এটা গিয়ে বান্ধবী নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ডকে বলে দিল। নব্যপ্রেমিকের গার্লফ্রেন্ড নব্যপ্রেমিককে ফোন দিতে লাগল। কিন্তু চার্জ নাই বলে নব্যপ্রেমিক মোবাইল বাসায় রেখেই ডেটিং এক্সপার্ট এর সাথে মাঠে চলে গেল।

এদিকে প্রেমিকা জানত যে নব্যপ্রেমিকের ওই একটাই বন্ধু আছে সারা দুনিয়ায়,সে হল ডেটিং এক্সপার্ট।  এবং ওদের আড্ডার জায়গা সেই মাঠ।

প্রেমিকা তার বান্ধবীকে নিয়ে এক দৌড়ে সেই মাঠে গেল।

গিয়ে দেখল,, ওজন কমানোর বিধ্বংসী ওষুধ লেংটা বাবা লেফটেন্যান্ট এর হাত থেকে মাত্র নিল নব্যপ্রেমিক।

প্রেমিকা দৌড়ে গিয়ে নব্যপ্রেমিকের হাত থেকে পাগলের ওষুধ টা ফেলে দিল।

নব্যপ্রেমিক: আহা এ কি? আমার ওজন কমানোর বিধ্বংসী ওষুধ

প্রেমিকা: শাট আপ। তোর ওজন ৯৫ কেন, ২০০ কেজি হলেও তোকেই ভালবাসি।

নব্যপ্রেমিক: বাট তোমার বান্ধবীরা?

প্রেমিকা নব্যপ্রেমিককে জড়িয়ে বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,,”আই ডোন্ট কেয়ার।”

এদিকে লেংটা বাবা লেফটেন্যান্ট লাফাতে লাফাতে বলল,,”এই হালার চেয়েও আমি অযোগ্য? রাতে ঘুমাইতে পারি না,, আর বাই দ্য ওয়ে,,এর ওজন ৯৫ না, ১৯৫ ”

এটা শুনে প্রেমিকা জড়ানো অবস্থায়ই নব্যপ্রেমিকের মুখের দিক তাকাল। প্রেমিকার বান্ধবী এই বাড়তি ১০০ কেজির শক সইতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে গেল।

এদিকে লেফটেন্যান্ট একটা ছুরি বের করল। বলল,,”এই মোটু থাকলে তো তোরে আর পাব না, দাড়া,মোটুর চর্বি কমিয়ে দিই।”

লেফটেন্যান্ট এগোতেই ডেটিং এক্সপার্ট ঝাপিয়ে পড়ল লেফটেন্যান্ট এর উপর। দুইজন মোচড়ামুচড়ি করতে করতে পাশের গ্যাস বেলুন ওয়ালার ভ্যানে গিয়ে পড়ল,লেফটেন্যান্ট এর ছুরি ছিটকে গেল।

লেফটেন্যান্ট গ্যাসবেলুন গুলোর সুতা দক্ষ হাতে ডেটিং এক্সপার্ট এর কোমড়ে বেধে দিল। ডেটিং এক্সপার্ট আকাশে উঠতে লাগল। চিল্লিয়ে বলল,,”মামা,বাঁচা,,,”

নব্যপ্রেমিক দৌড়ে এসে ডেটিং এক্সপার্ট এর কোমড় পেচিয়ে ধরল। আতংকের সাথে খেয়াল করল,,তাকে শুদ্ধ বেলুন গুলো আকাশে উঠে যাচ্ছে।

প্রেমিকা বিস্ময়ের সাথে স্বগতোক্তি করল,”এ কেমন শক্তিশালী বেলুন”

এদিকে বেলুনওয়ালা পিছপিছ ছুটতে ছুটতে বলল,,”এই মামারা,আবার বেলুনের দাম দিয়া যান”   বেলুন তখন ডেটিং এক্সপার্ট আর নব্যপ্রেমিককে নিয়ে আস্তে আস্তে আরী উপরে উঠছে। বাতাস তাদের ভাসিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে লেফটেনেন্ট প্রেমিকার সামনে এসে বলল,,”ভালবাসা দিবি কিনা বল”

প্রেমিকা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। লেফটেনেন্ট বলল,,”সামনে ক্যাপ্টেন পরীক্ষা, মন বসে না পড়ার টেবিলে”

প্রেমিকা আস্তে আস্তে পিছু সরল। বলল,”সে কি? এ বাংলা সিনেমার নাম কেনো বলে?”

লেফটেন্যান্ট ও পিছপিছ দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,,”এই মন তোমাকে দিলাম,এ বাধন যাবে না ছিড়ে,কোপা শামসুউউউউউ,,,,”

এবার প্রেমিকা সিউর হল লেফটেন্যান্ট প্রেমের ডায়ালগ মুখস্ত করতে গিয়ে বাংলা সিনেমার নাম মুখস্ত করে এসেছে। সে দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,,”হেল্প,হেল্প মি,,,”

এদিকে বেলুন ১৫ ফিট উপরে উঠার পর আস্তে আস্তে নব্যপ্রেমিকের হাত পিছলাতে লাগল,পতন ঠেকাতে সে ডেটিং এক্সপার্ট এর স্টাইলিশ  হাফপ্যান্ট খামছে ধরল।

ডেটিং এক্সপার্ট চেচিয়ে বলল,,”এ্যাই শালা,প্যান্ট ধরে টানোস কেন?”

নব্যপ্রেমিক কিছু বলার আগেই ডেটিং এক্সপার্ট এর প্যান্ট খুলে  প্যান্ট সহ নিচে পড়ে গেল। নিচে প্রেমিকার পিছে বাংলা সিনেমার নাম জপতে জপতে লেফটেন্যান্ট দৌড়াচ্ছিল।

লেফটেন্যান্ট যখনই বলল,,”বুকের ভিতর আগুন জ্বলে,,,”  তখনই ১৫ ফুট উপর থেকে ডেটিং এক্সপার্ট এর হাফপ্যানট সহ নব্যপ্রেমিক তার ঘাড়ে এসে পড়ল। হাফপ্যান্ট টা তার মাথার আশেপাশে জড়িয়ে গেল।

লেফটেনেন্ট নব্যপ্রেমিক এর ওজন আর ডেটিং এক্সপার্ট এর এক সপ্তাহ না ধোওয়া হাফপ্যান্টের গন্ধের দ্বিমুখী  আক্রমণের অজ্ঞান হয়ে গেল।

এদিকে ডেটিং এক্সপার্ট কে নিয়ে গ্যাসবেলুন রেইন্ট্রি গাছের মাথায় বেধে রইল। ডেটিং এক্সপার্ট চেচাতে লাগল,,”আমাকে উদ্ধার করতে কেউ আসো, আর কাইন্ডলি একটা প্যান্ট নিয়ে আসো,আমি আন্ডারওয়ার পরি নি,,,”

১ সপ্তাহ পর….

নব্যপ্রেমিক,প্রেমিকা,ডেটিং এক্সপার্ট আর প্রেমিকার বান্ধবী রেস্টুরেন্ট এ গেল খেতে। খাওয়া শেষ হয়ে বের হলে তারা দেখল সামনে ওজন মেশিন নিয়ে এক লোক দাঁড়ানো।

প্রেমিকার বান্ধবী বলল,,”১ সপ্তাহ আগে মেপেছিলাম ৪৮ কেজি ছিল,ডায়েটিং করছি,জিরো ফিগার বানাবো,দেখে আসি ওই মেশিনে মেপে,ওজন কত হল।”

সবাই মেশিনওয়ালার কাছে আসার পর নব্যপ্রেমিক দেখল,,এটা সেই মেশিনওয়ালা,যার মেশিনে ওজন মাপাতে গিয়েই এত কান্ড।

প্রেমিকার বান্ধবী মেশিনে দাড়াতেই অজ্ঞান হয়ে গেল। সবাই দেখল, ওজনের রিডিং এসেছে,, “১৪৮ কেজি”

সবাই ধরাধরি করে বান্ধবীকে হাসপাতালে নিয়ে গেল,বান্ধবী জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বলছে,, “৪৮ থেকে ১৪৮ কেমনে হল?”

ডেটিং এক্সপার্ট নব্যপ্রেমিকের কানে কানে বলল,”মামা,ওজন মেশিনে ভুল ছিল।”

গল্প ৮৬

​Dimension Origins: Part 2

লেখা:ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব (Raihan Masud Bipu)

১.

“প্রচন্ড সাদা একটা আলো।ভয়াবহ চোখ ধাধানো একটা আলো। আলোটা এতই  শক্তিশালী যে রুমের আশেপাশে থাকা স্টিলের আলমারি,খাট গলিয়ে দিচ্ছে।

রুমের দেয়ালগুলো কাঁপছে। ভয়ংকর কাঁপুনি। ভূমিকম্প ভেবে তিনতলা বিল্ডিং এর নিচের  তলার লোকজন বাইরে দৌড়ে গেছে। বাইরের রাস্তা লোকজনের চিৎকার আর হুটোপুটির শব্দ।

ওপাশের রুমটা বারান্দা সহ ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই রুমের ধ্বসে পড়া মেঝে থেকে বের হওয়া রডে আটকে আছে একটা ছিন্নভিন্ন লাশ। একটা পুরুষের লাশ।লাশের চোখটা প্রচন্ড দুঃখ নিয়ে চেয়ে আছে নিষ্পলক,চেয়ে আছে প্রথম রুমে থাকা দোলনাটার উপর। যেই দোলনায় থাকা কারো চোখ থেকে এই ভয়াবহ আলোটা বের হচ্ছে,,,,,

দোলনার ঠিক সামনে দাঁড়ানো অত্যন্ত সুন্দরি, সোনালী চুলো ডাইনি লিন্ডা মাটি থেকে একহাত উপরে ভাসছে,তার মুখে একটা হাসি,,নীল চোখদুটো থেকে শীতল ঘৃণা ঠিকরে বের হচ্ছে।দুই হাত তার রক্তাক্ত,,একহাতে ধরা ওপাশের রুমে শুইয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহের পুরুষটার হৃদপিন্ড।প্রচন্ড চাপে,হৃদপিন্ডটা চুইয়ে রক্ত পড়ছে,,,

হঠাৎ দোলনায় থাকা উজ্জ্বল সাদা আলোর অধিকারিণীর ছোট শরীরটা জুড়ে একটা অমানুষিক রাগ বয়ে উঠল। সাথে সাথে লিন্ডার মুখটা বিকৃত হয়ে উঠল,চোখে বিশুদ্ধ আতংক ফুটে উঠল,,,,

“প্লিজ না,,, না,,, না,,, নাআআআআআআআ!!!!!”

ছাদটা ধ্বসে পড়ল,,লিন্ডার শরীরটা থেতলে গেল,,, উজ্জ্বল আলোটা আরো উজ্জ্বল হয়ে গেল,,,,,,,,,”

কুরআন পড়ার শব্দে অনন্যা আহমেদের ঘুম ভাঙল।চোখ খোলার সাথে সাথে সাদা উজ্জ্বল আলোটা যেন ঠিকরে পড়ল। অনন্যা লাফ দিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।তার সারা শরীরে ঘাম।

তার ১৪ বছর বয়স এখন। তার ধারণা এই ১৪ বছর প্রত্যেকটা রাতে সে এই স্বপ্নটা দেখেছে। এই ভয়ংকর রক্তাক্ত স্বপ্নটা।যত বড় হচ্ছে, স্বপ্নটা আরো স্পষ্ট হচ্ছে।আরো বুঝা যাচ্ছে।

পাশের রুম থেকে হাফেজ নবীন আংকেল কুরআন পড়ছেন। সেই সুর ভেসে আসছে এই রুমে। তারমানে ফজরের নামাজে উঠতে আজো দেরি হয়ে গেছে অনন্যার।

হাফেজ নবীন আংকেল অনন্যার পালক বাবা। কিন্তু নবীন আংকেল তাকে বলে দিয়েছে,”আমাকে তুমি আংকেল ডেকো,বাবা ডেকো না। তোমার বাবার মত আমি কখনওই হতে পারব না। তোমার বাবার মত কেউ নেই,অন্য কাউকে বাবা বলে নিজের বাবার স্মৃতিকে তুমি অপমান করবা না।”

নবীন আংকেল অনন্যাকে শুধু বলেছে তার বাবা অনেক মহৎ মানুষ ছিলেন। তার বাবা এই পৃথিবীটাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।কিন্তু এর প্রতিদান হিসেবে তার কপালে জোটে স্ত্রীর লাশ এবং নিজের মৃত্যু,তার একমাত্র মেয়ে হয়ে যায় এতিম।

অনন্যার বাবা আহাদ আহমেদ সম্পর্কে হয়ত নবীন কিছুই বলতেন না অনন্যাকে। কিন্তু আস্তে আস্তে দেখলেন,সেই বাসায় ঘটা ঘটনার অলৌকিক ব্যাখ্যা না পেয়ে মানুষ আহাদ আহমেদকে একটা সাইকো খুনি বানিয়ে দিচ্ছে। অনন্যাকে বলছে খুনির মেয়ে।তখন বাধ্য হয়েই ছোট্ট অনন্যাকে তার বুঝাতে হয় একটা ভয়ংকর সত্য,একটা অন্ধকার সত্য,,,একটা ব্যাখ্যার অযোগ্য সত্য,,,,

আহাদ আহমেদ কিভাবে এই পৃথিবীতে আসে আজব একটা ক্ষমতা নিয়ে,,, বস্তুজগৎ কে নিয়ন্ত্রণের,মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের,,, কিন্তু জীবনে খুব দুঃখে পড়ার আগে কখনো তার শক্তিটা আত্মপ্রকাশ করে নি।

প্রথম প্রথম ক্ষমতাটা পাওয়ার পর আহাদ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যায়। মানুষকে ঠকাতে থাকে। কিন্তু এভাবে ঠকাতে গিয়ে একটা নিরীহ লোকের আত্মহত্যার কারণ হয় সে। তারপর নিজেকে পালটে ফেলে। ঘুরে ঘুরে অসহায় মানুষের উপকার করতে থাকে সে,অত্যাচারী যারা,যাদের শাস্তি হয় না কখনো,, তাদেরকে শাস্তি দিতে থাকে।

কিন্তু সে নিজেই জানত না,তার এই শক্তির জন্য সে ভয়ংকর একটা ভবিষ্যতবাণীর অংশ। তাকে তার ক্ষমতা খাটিয়ে ৫ টা খুন করার অপেক্ষায় ছিল পিশাচপূজারীদের একটা দল। ভবিষ্যৎ বাণী ছিল,, “সৎ একজন লোক যখন ৫ টা খুন করবে,সে প্রস্তুত হবে একটা তন্ত্রের জন্য,তার হাতে বলি হবে আরেক সৎ মানুষ। সেই রক্তমন্ত্রে মুক্তি পাবে পাতালবন্দী পিশাচদেবতা হুইটজিলোপোক্টলি। পৃথিবীতে রাজত্ব করবে সে।”

রাগের মাথায় ৩ টা খুন করার পরই নিজেকে সামলে নেয় আহাদ।কিন্তু পিশাচপূজারীদের একজন,নাম লিন্ডা,বুদ্ধি খাটিয়ে,আহাদের পিছন থেকে এমন কাজ করে যে আহাদ বাধ্য হয় শেষ ২ টা খুন করতে। ৫ টা খুন সম্পূর্ণ হতেই তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে এই ভবিষৎবাণী সম্পর্কে জানানো হয়।

আরো বলা হয় পিশাচদেবতাকে মুক্ত করতে তাকে নিজ হাতে বলি দিতে হবে স্বদেশী এক পুণ্যবান লোককে।কাকতালীয়ভাবে এই লোকটিই ছিল হাফেজ নবীন।

শেষ মুহুর্তে দেখা যায়,বলি দেবার যজ্ঞের জন্য যে মন্ত্র পড়তে হয় সে মন্ত্রের বাক্যগুলো নিজের ক্ষমতাবলে পালটে দেয় আহাদ।উল্টিয়ে দেয়।পিশাচদেবতা মুক্তি পাবার বদলে পাতালেই মরে যায়।

পিশাচপূজারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।কিন্তু তরুণী লিন্ডা প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়।সে বাংলাদেশ এ এসে খুন করে তাসনিমকে,অনন্যার বয়স তখন মাত্র কয়েকদিন।সামান্য একটু দেরিতে আহাদ পৌছে যায়,ফলে অনন্যাকে কিছু করতে পারে না লিন্ডা।

তাসনিমকে খুনের দায় আহাদের উপর চাপানো হয়। কয়েকদিন আগেই আহাদকে ৫ টা খুন করাতে তাসনিমের চরিত্র নিয়ে মিথ্যা কথা ছড়ায় লিন্ডা।আহাদ এর রাগের কথা প্রতিবেশীরা জানত। কিছু গুন্ডা তাসনিমকে মারধর করে এসে,কিন্তু প্রতিবেশীরা ভাবে আহাদ তাসনিমের পরকীয়ার কথা জেনে মারধর করেছে।

তাই যখন বদ্ধ দরজার ভিতরে এক ডাইনি তাসনিমকে খুন করে,স্বভাবতই ভূত প্রেত বিশ্বাস না করা মানুষ আহাদকে ধরিয়ে দেয় পুলিশের কাছে।

হাফেজ নবীন আর আহাদের ছোট ভাই অনেক কষ্টে আহাদের বিরুদ্ধের অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণ করে।আহাদ ছাড়া পায়।মেয়েকে নিয়ে অনেক দূর চলে যায়।

আহাদ নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়।সে বুঝতে পেরেছিল তার ক্ষমতা ব্যবহার শুরু করার সময় থেকেই পিশাচপূজারীরা তাকে ট্রেস করা শুরু করেছিল।লিন্ডালে ভয় পায় সে। লিন্ডা ছিল তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী।

কিন্তু অনন্যার যখন এক বছর,চাকরির জন্য ইন্টার্ভিউ দিতে যায় আহাদ।আহাদ স্ত্রী খুনের মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও।দেশের মানুষ এর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল,আহাদই খুনি।কিন্তু তার ছোটভাই টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়েছে। ইন্টার্ভিউ এর লোকেরাও তাই ভেবেছিল,অপমান করেছিল আহাদ আর তার মৃত স্ত্রীকে। বাধ্য হয় আহাদ আবার তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে।লিন্ডা টের পেয়ে যায় আহাদের অবস্থান।

আহাদ বুঝতে পারে। তখনি ফোন দিয়ে হাফেজ নবীনকে অনুরোধ করে,,অনন্যাকে যেন নিজের মেয়ের মত মানুষ করে সে।

তারপর যে ঘটনাটাটা ঘটে, ১৪ বছরের অনন্যা এখনো সেটা প্রায় প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখে। মাত্র এক বছর বয়সে,সে লিন্ডাকে খুন করেছিল,তার চোখে ভাসে,,, তার বাবার ছিন্নভিন্ন লাশের অসহায় আকুতিভরা দৃষ্টি,,,,,,

এই ১৪ বছরে অনন্যা যেখানেই গিয়েছে,মানুষ তাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে,,অনন্যা পরকীয়ার ফসল,আর সেজন্য তার বাবা তার মাকে খুন করে।

হাফেজ নবীন তখন অনন্যাকে বলে,,”যারা তোমাকে মিথ্যা অপবাদ দেয়,এই জীবনেও ভুগবে,,পরকালেও কষ্ট পাবে।”

হাফেজ নবীন,একবার না, বারবার অনন্যাকে তার বাবার কাহিনীটা শুনায়। অনন্যা বুঝতে পারে,সে আসলে এক নায়কের মেয়ে। কোনো খুনির না। যে নায়ক না থাকলে এতদিনে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যেত,পিশাচদেবতা রাজত্ব করত।সারা দুনিয়া আহাদকে খুনি,আর অনন্যার মাকে চরিত্রহীনা বললেও,অনন্যার বুকটা নিজের মা বাবার প্রতি সীমাহীন মমতায় ভরে ওঠে। চোখ ভরে পানি আসে,কখনওই দেখা হল না তাদের সাথে,,,,,,

ফজরের নামাজে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে।এখনি নামাজটা পড়ে নেওয়া দরকার। অনন্যা তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নামে।

২.

ধানমন্ডি,ঢাকা। পুরনো একটা বিল্ডিং। বিল্ডিং এর সামনে একটা গলি অনেকদূর পর্যন্ত গিয়ে মেইন রোডে গিয়েছে। গলিটার আশেপাশের দেয়ালে পোড়ামাটির কাজ। ফুল,পাখি,,, অনেক আগের এক প্রায় ভুলে যাওয়া বিলাসিতা আর শিল্পের ভগ্নপ্রায় উদাহরণ।

মানুষ বলে পুরনো এই নির্জন বাড়িটায় নাকি ভূত আছে। কেউ থাকে না।রাতের আধারে বাতি জ্বলে না এখানে। কোনো মানুষ যে এখানে কখনো ছিল তার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে তারপরও রাতে যেন কাদের গুমড়ে ওঠা কান্নার শব্দ পাওয়া যায়,,,,,

রেজার বয়স ১৪ বছর। তার বন্ধুরা আজ বাজি ধরেছে তার সাথে,এই ভুতুড়ে বাড়িতে ঢুকতে হবে তার।সারারাত থাকতে হবে। রেজা মনে মনে ভয় পেলেও বন্ধুদের সামনে পার্ট নিতে রাজি হল। ছোটবেলা থেকে নিজের সাহসের মিথ্যামিথ্যি গল্প করেছে বন্ধুদের সাথে। এখন যদি ভয়ে ওদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করে,সব গোমড় ফাঁস হয়ে যাবে। শর্ত হল,একটা ক্যামেরা নেবে সে প্রমাণ হিসেবে,,সারারাত কোন রুমে সেট করবে ওই বিল্ডিং এর।তারপর থাকবে। পরেরদিন সবাই দেখবে সেই ভিডিও।প্রমাণ হবে সে আসলেই ভূতের বাড়িতে রয়েছিল কিনা।

অন্ধগলির মধ্য দিয়ে রেজা চলেছে ধীর পায়ে,সেই বাড়িটার দিকে। কে বলে ঢাকা শব্দ দূষণের শহর?এখন রাত ১২ টা। রেজা খুব করে চাচ্ছে, প্লিজ কেউ একটু শব্দ করুক। পৃথিবীতে যে মানুষ আছে,সেটা সে বুঝুক।

বাড়িটার সামনে এসে সে দাড়ালো। অন্ধগলি অতিক্রম করে। বাড়িটা দেখে মধ্যযুগের ডাইনি প্রেতসাধকদের বাসা বলে মনে হয়।

রেজা গেইটের কাছে আসল।গেট খুলবে নাকি টপকাবে যখন ভাবছিল তখন আকাশ বাতাস কাপিয়ে এক অপার্থিব শব্দ আসল,,”এখানে কি করছ? বাঁচতে চাইলে পালাও,,এক্ষুণি পালাও।”

রেজার পেটের নাড়িভুঁড়ি মনে হয় আরো কয়েকটা প্যাচ খেল। পড়িমরি করে সে দৌড় দিল।কিন্তু একটা গলির বাক অতিক্রম করতেই একসঙ্গে প্যায় দশ বারোজনের আর্তনাদ শোনা গেল বাড়ির ভিতর থেকে,,,”কেউ এসেছ? প্লিজ বাঁচাও।প্লিজ,,,কোন ভূত নেই,, প্লিজ বাঁচাও,,,নয়ত মেরে ফেল আমাদের,,, আর সহ্য হয় না।”

রেজা ফিরল। হাপাচ্ছে। না তো,এতো ভয়ের শব্দ না। এটা তো কোন অপার্থিব শব্দ না। বাস্তব শব্দ,,খুবই বাস্তব।

রেজা আবার গেইটের কাছে গেল। একদম কাছে আসার আগে আশেপাশের দেয়ালের দিক তাকাল। এবার ভাল করে তাকাতে দেয়াল আর গেইটের মাঝখানে একটা একটা লালচে আলো ঝিক করতে দেখল। প্রথমে ভয় পেলেও হঠাৎ নিজের হাতের ভিডিও ক্যামেরার দিক তাকালো। হুবহু সেইম লাল আলো ঝিক করতে দেখল।

রেজা বুঝে গেল ওটা একটা লুকানো ভিডিও ক্যামেরা। আরো কাছে গেল।গেইটের কাছে দেয়ালটাতে হাত দিল।এই দেয়ালের অংশটা ফাপা।তার মানে একটা ভিডিও ক্যামেরা এখানে ছিল,ধরা পড়তেই কেউ সেটাকে ভিতরে টেনে নিয়েছে।

তারমানে প্রথমবার ভৌতিক গলায় তাড়িয়ে দেওয়া শব্দটাও কোন স্পিকার থেকে এসেছে। দেয়াল দুইটা বেশ খানিকটা হাতড়ে,আরও কিছু ফাপা স্থান পেল সে। ফাপা স্থান গুলো পাথরের না। ইস্পাতের পাতের।

রেজার ছোট মাথা বুঝে ফেলল,এই বাড়িতে আর যাই হোক,কোন ভূত নেই। তবে কিছু একটা ঘটছে এই বাড়িতে।

রেজা ফিরে চলল। দ্রুতপায়ে। কিন্তু বিল্ডিং এর ভিতরে কেউ তাকে দেখছিল। সে বুঝে গিয়েছিল রেজা পুলিশে খবর দেবে।

বাড়ির বাগানের নিচ থেকে একটা রোবটিক লেজার গান উঠল। অনেক উচু আর বড়। রেজার দ্রুত হাটা পথের দিক তাক করল। রেজার মাথা সই করল।

আলোর একটা ঝলক রেজার মাথায় আঘাত করল। রেজার সারা শরীর থলথলে অবশ হয়ে সে দুমড়ে মুচড়ে পড়ল রাস্তায়। চোখে অবিশ্বাস আর আতংক। মুখ হা। লালা ঝরছে। বেঁচে আছে সে,সব বুঝতে পারছে,,তবে নড়ার ক্ষমতাটা আর নেই।

বাড়ির ভিতরে এক অদ্ভুত দর্শন এপ্রন পরা লোক একটা রুমে ঢুকল। রুমের ভিতর ২০ টা খাচা, প্রত্যেকটা খাচায় মানুষ। ১২ জন জীবিত।  ৮ জন মৃত। মৃত মানুষদের শরীরগুলো বিকৃত,বোঝাই যাচ্ছে বিভিন্ন ধরণের এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়েছে এদের উপর। গা ভর্তি মোটা সিরিঞ্জের সুইয়ের দাগ,ফুটা স্থান ফুলো লাল হয়ে ফোলা। প্রচন্ড গন্ধ। কারো গা ভর্তি ইলেক্ট্রিক শকের দাগ। কারো সারা গা ভর্তি ফোড়া। লাল ফোস্কা,,, কারো চোখ নেই,প্রত্যেকজনের খাচা নিজেদের বমি,মল আর মূত্রে মাখামাখি। কারো গায়ে কোন কাপড় নেই।

এপ্রন পরা লোকটা বলল,,”কাউকে আসতে দেখলে মাইক্রোফোনে যখন আমি চলে যেতে বলি,তা শুনে এভানে তোরা কেন চিল্লাস? তাতেই তো আমি বাধ্য হই বাইরের লোকটাকে শেষ করে দিতে।মগজ স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে। আজ যেমন একটা বাচ্চাছেলেকে এরকম করতে বাধ্য হলাম।”

খাচার লোকগুলো গুমড়ে উঠল।

লোকটা বলল,,”তোদের মুক্তি নেই। এক বছরের মধ্যে আমার ওষুধটা বানাতে হবে। সেই ওষুধের স্যাম্পল তোদের উপরে প্রয়োগ করছি আমি। গিনিপিগ, খরগোশ, ইদুরের উপর প্রয়োগ করলে লাভ নেই,,,আমার দরকার মানুষ। জীবিত মানুষ।  ২০ টা মানুষের ৮ টা মরছে। তোদের অবস্থাও ভাল না,,আরো নতুন মানুষ লাগবে,,আমার নতুন নতুন স্যাম্পলের জন্য।”

মৃতপ্রায় লোকগুলো গুমড়ে উঠল। লোকটা বলে চলল,,”কাঁদিস কেন? তোদের চাকরি এটা। আমি তোদের মত অনভিজ্ঞ বেকারদের এক লাখ টাকার চাকরির যখন অফার করেছিলাম,তখন তো লাফাচ্ছিলি। অনভিজ্ঞ বেকারদের এক লাখ টাকার বেতন এর কাজ,,মনে কি একটু সন্দেহ হয় নি?”

“তোদের টাকার লোভ দিয়ে খুব সহজে ফাঁদে ফেলা যায়। তোদের লোভ দেখিয়ে চাকরি দেবার ছল করে এখানে এনেছি। শুধুমাত্র আমার এক্সপেরিমেন্ট এর জন্য।”

“তোরা ছাড়া তো এই বাসায় কেউ আসে না। আমার গবেষণার পৃষ্ঠপোষকরা মাঝে মাঝে টাকা আর উপকরণ দিয়ে যায়,বড্ড একা লাগে। তাই কি আর করার,বাধ্য হয়ে তোদের সাথেই গল্প করি,,, একই গল্প গত ৩ বছর ধরে প্রায় ১০০ লোকের সাথে করেছি। প্রত্যেকজনের লাশ,বাড়ির পিছনে মাটির নিচে আছে।”

“শোন,একটা গোপন সংস্থা আছে। নাম The Lobby। উগ্রবাদী ইহুদিরা চালায়।ওদের জীবনের মূলমন্ত্র হল পৃথিবী থেকে মুসলমান নামধারী সবাইকে নির্মূল করা। এই যে ইরাক যুদ্ধ,আফগান যুদ্ধ,সিরিয়া যুদ্ধ,,,মোট কথা সারা দুনিয়ায় যত মুসলমান  মরেছে এবং মরছে বিভন্ন যুদ্ধে,সেই যুদ্ধ লাগানোর পিছনে ইন্ধনদাতা এই লবি। আমেরিকা,ইংল্যান্ড, রাশিয়া,,সবাই ওদের কথায় উঠেবসে।অমুসলিমদের মধ্যে যারা ওদের কথা শুনতে অস্বীকৃতি জানায়,তাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো নিজেদের এজেন্ট দিয়ে ভেঙে দেয়।অভাবে পরে সেই দেশ। যেমন,,গ্রীস,ব্রাজিল,জার্মানি। জার্মানি পরে বাধ্য হয় ওদের কথায় উঠবস করতে,ওরা তখন রাতারাতি ওদের অর্থনীতি স্বাভাবিক করে দেয়।

হঠাৎ ১৪ বছর আগে লবির নজর পড়ে একটু ভিন্ন দিকে। একটা পিশাচসাধকদের গ্রুপের প্রতি। তাদের ভূত প্রেত সাধনার প্রতি কোন আগ্রহ ছিল না লবির। তাদের আগ্রহ ছিল ওদের বিশেষ একটা ক্ষমতার উপর….. 

ওরা ইচ্ছাশক্তি দিয়ে যেকোনো জিনিস ঘটাতে পারত,মানুষ মারতে পারত,চোখের নিমেষে এক জায়গা থেকে আরেকজায়গায় যাওয়া আসা করতে পারত,,,,

লবি এই গোপনীয়তাটা জানার জন্য উঠেপড়ে লাগল। তারা এদের টাকা দিতে লাগল।বিনিময়ের নিয়মিত চেক আপ করতে লাগল এদের শরীর,কি এমন বিশেষত্ব আসে সেই শরীরগুলোর,,,,

তারপর হঠাৎ ওদের মধ্যে একটা গণ্ডগোল হল। ওদের পিশাচপূজারীর দলটা ধ্বংস হয়ে গেল।

ততদিনে লবি ওদের ফিজিওলজি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে গিয়েছিল।

তারা আমার উপর দায়িত্ব দিল,এমন একটা প্রসিডিউর বের করা,ওষুধ বের করা,,যাতে মানুষ হুবহু সেই শক্তি গুলো পায়। আমি সফল হলে,সেই ওষুধ দিয়ে তৈরি হবে কিছু সুপার সোলজার। লবির এজেন্টরা হবে ভয়ংকর শক্তিশালী। আর গোপনে লবিকে কাজ করতে হবে না,,প্রকাশ্য যুদ্ধ হবে মুসলমানদের সাথে,,সব মরবে,,সব,,, আর আমি বিজ্ঞানী ড: এরিক পামার,আমাকে ইতিহাসের পাতায় মুসলিমহীন নব্য পৃথিবী গর্বভরে স্মরণ করবে।”

এরিক পামার গুমড়ে ফোপাতে থাকা খাচার ভিতরের এক মাংস পচে গলে পড়া মানুষ এর চোয়াল ধরে ফিসফিস করে বলল,,”কাঁদিস কেন? ৩ বছর ধরে চেষ্টা করছি,,সফল একদিন আমি হবই,,, আমি সফল হলে তোদের মধ্যে কেউ হয়ে যাবি সুপারহিরো,,, ভয়ংকরতম শক্তি তোদের শিরায় শিরায় বইবে,,,,”

গুমড়ে উঠে মানুষটা তখনি মরে গেল।

এরিক পামার হতাশ হয়ে বলল,,”আবার এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিতে হবে।”

৩.

পরেরদিন সারা শরীর অবশ,,মুখ বাকা,লালা ঝরা রেজাকে ভূতের বাড়ির সামনে থেকে উদ্ধার করা হল। সকলের মুখে মুখে ছড়াতে লাগল,,ভূত দেখে ভয় পেয়ে রেজা অসুস্থ হয়ে গিয়েছে।

রেজাদের স্কুলের দুইটা পার্ট,,এক পার্ট অল বয়েজ,আরেক পার্ট অল গার্লস। রেজা বয়েজ পার্টে ক্লাস নাইনে পড়ে। হাসপাতালে নেবার পর ডাক্তাররা সিটি স্কান করে দেখল, রেজার মস্তিস্কের এবড়োখেবড়ো অংশের ম্যাক্সিমাম সমান হয়ে গেছে,ফরে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শরীর চালনার কেন্দ্র অচল হয়ে গেছে,ভাগ্য ভাল নিচের ব্রেইন স্টেমে কিছু হয় নি,হলে ওর শ্বাস আর হৃদয়ও বন্ধ হয়ে যেত।

তবে রেজার বাবা মাকে জানিয়ে দেওয়া হল,ছেলে সারাজীবনই এমনই থাকবে।

এটা জানার পর পুরো স্কুলের ছেলে মেয়েরা রেজাকে দেখতে গেল। অনন্যাও ক্লাস নাইনে পড়ে,কিন্তু ওর পালক বাবা হাফেজ নবীন ওকে স্ট্রিক্টলি আদেশ দিয়েছে,ছেলেদের দিক তাকান যাবে না,কথা বলাও যাবে না,মেশাও যাবে না,,, বড় হচ্ছ এখন,,,অনেক কিছু মেনে চলতে হবে।

অনন্যার পূর্ণিমার চাদের আলোর মত রূপ সে নেকাব দিয়ে ঢেকে রাখে, তাও বাইরে দাঁড়ানো ছেলেরা কখনো নেকাবের উপর থেকে বেরোনো তার চোখ দুটো দেখলেই মায়ায় হারিয়ে যায়। কিশোর বয়সের প্রথম প্রেমে পড়ে।

এখন এত লোক দেখতে গেল রেজাকে। কিন্তু নবীন মানা করায় অনন্যা গেল না। একদিন অনন্যাকে পিক করতে স্কুলে আসার সময় নবীনকে অনন্যার এক স্যার বলল,,”ক্লাস নাইনের এক ছেলে চিরদিনের মত অচল হয়ে গেছে। হাসপাতালে এখনো আছে,আমরা সবাই দেখতে গেলাম,আপনার মেয়ে গেল না,বলল,আপনি নাক মানা করেছেন,এটা কিন্তু খারাপ দেখায়।”

নবীন অনন্যার দিক তাকিয়ে বলল,,”আমি কি তোমাকে যেতে মানা করেছি? আম ছেলেদের সাথে মিশতে মানা করেছি,অসুস্থ কোন মানুষকে সহমর্মিতা জানাতে নিষেধ করি নি।”

অনন্যা লজ্জা পেল। নবীন স্যারকে বলল,,”আমি নিজে অনন্যাকে নিয়ে যাচ্ছি। কোন হাসপাতালে আছে বলেন।”

এদিকে হাসপাতালের নামাজ রুমে রেজার মার চোখের পানিতে জায়নামাজ ভিজে গেছে,জায়নামাজ এর গায়ে চোখের পানির লবণের দাগ।

রেজার মা বলল,,”আল্লাহ,আমার ছেলেটাকে সুস্থ করে দাও। ও তো বাচ্চা ছেলে আল্লাহ, নিষ্পাপ, কেন এত কষ্ট দিচ্ছ? তুমি তো কত অলৌকিক ঘটনা দেখাও,,এবার কি পারো না দেখাতে?”

নবীন তখন অনন্যাকে নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছে,অনন্যার ছোট মুখের টানা টানা চোখ অবাক হয়ে আশেপাশে দেখছে,,এখনো তার মুখটা নেকাবে ঢাকা।

হাসপাতালের এক জায়গায় বড় একটা মানুষের মস্তিষ্ক এর ছবি।অনন্যা অবাক হয়ে ওটার দিকে তাকিয়ে রইল।একটু বড় নবীন ওকে নিয়ে রেজার রুমে গেল।

রেজার বাবা রেজার বিছানার পাশে বসা।রেজার মুখে ভাবলেশহীন দৃষ্টি, মুখ থেকে লালা ঝরছে,,চোখ থেকে পানি। ওর বাবা একটু পরপর উঠে ওগুলো মুছিয়ে দিচ্ছে।

অনন্যা অবাক হয়ে চেয়ে রইল রেজার দিকে। ছেলেটা অনেক সুন্দর। ওর কিশোরী হৃদয়টা জোরে জোরে বাজতে লাগল।

হঠাৎ হয়ত কিশোরী হরমোনের প্রভাবেই,অথবা অতিরিক্ত হার্টবিটের কারণেই,অনন্যার চোখে সাদা নীলচে আলো ঝিকমিক করে উঠল।

অনন্যার চোখে রেজার ঠিক মাথার ভিতরে মগজটার একটা ছবি ভেসে উঠল। সে কি? এটা তো বাইরে দেখা মানব মস্তিষ্ক এর মত না।

অনন্যার চোখ আবার জ্বলে উঠল, এদিকে নবীন রেজার বাবার কাধে হাত দিয়ে কথা বলতেছে,কেউই খেয়াল করল না।

অনন্যা হঠাৎ ভাবল,এই মগজটা এমন কেন? বাইরের ছবির ওটার মত কেন না? এটাকে কি ওরকম করা যায় না?

আস্তে আস্তে রেজার সমান হয়ে যাওয়া মগজটা নিখুত শিল্পের মত বাইরের ছবিটার মগজের মত হতে লাগল। কিশোরীর ডিজাইন অনুযায়ী।  একদম হুবহু দেখা সেই বাস্তব মস্তিষ্ক এর ছবিটার মত,,,,,

পুরোটা হয়ে যেতেই রেজার মুখ স্বাভাবিক হয়ে গেল,তারপিরেই সে দেখল অনন্যার চোখে নীলচে আলোটা আস্তে আস্তে নিভছে,,নেকাব টা খুলে গেছে,,, রেজা “বাবা” বলে একটা চিৎকার করে উঠল।

ভয়ে অনন্যার চোখ আবার জ্বলে উঠল,নবীন ফিরে তাকাল। আশেপাশের পালস অক্সিমিটার,ইসিসি মেশিন,এসি,বালব ঠাস করে ফেটে রুমটা অন্ধকার হয়ে গেল। রেজা এক লাফে বিছানা ছেড়ে নামল,,সটান দাঁড়িয়ে চেচাতে লাগল,,”বাবা,,মা!!!!”

উপর থেকে নামাজরতা রেজার মা দৌড়ে নিচে নামল,হাসপাতালের সব ডাক্তাররা ছুটে এল। নবীন অনন্যার হাত ধরে অতি দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করল।

বাসায় এসে অনন্যাকে শাস্তি দেওয়া হল,, তাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে আধাঘণ্টা ধরে জপতে বলা হল,,”বাবার মত ভুল করব না,আর এভাবে আমার ক্ষমতা দেখাব না। আমার অনেক শত্রু আছে। আমাকে পেলে মেরে ফেলবে।”

৪. 

নবীন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের লেকচারার হিসেবে ঢুকেছিল।প্রায় ৩৭ বছর হয়ে গেছে তার। বি সি এস করা ভাল চরিত্রের লোক। এখনো বিয়ে করে নি।।না করার কারণ আছে। অনন্যাকে হয়ত সে মানা করে নিজেকে বাবা ডাকতে,এটা করে সে আহাদ আহমেদের উপর সম্মান রেখে। কিন্তু বাইরে সবখানে সে বলে বেড়ায়,”আমার একটা মেয়ে আছে,নাম অনন্যা।”

বিয়ে করতে গেলে,পাত্রীপক্ষকে বলে,,”আমার একটা মেয়ে আছে।”  কাউকেই বলে না এটা পালক মেয়ে,,পালক মেয়ে বললে হয়ত একবারে বিয়ে হবে নবীনের, কিন্তু অনন্যার আর থাকা হবে না।অনেকে নবীন হাফেজ,হ্যান্ডসাম,আর সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এর চাকুরে বলে মেয়ে দিতে একপায়ে খাড়া,অনন্যার কথা জেনেও,তবে নবীন বোঝে,,এরা অনন্যাকে কষ্ট দিবে ভবিষ্যৎ এ। নবীন তাই খুজে বেড়ায়,এমন মেয়ে পেলেই বিয়ে করবে,যে অনন্যাকেও ভালবাসবে।

নবীন হুজুর মানুষ,মেয়েদের দিকে তাকায় না। তবে নবীনের এক তরুণী কলিগ তার উপর ক্রাশ খাওয়া। অনন্যা প্রায়ই নবীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। সেই তরুণী কলিগ,নাম জিনাত,,, সে জানে যে অনন্যাকে নবীন কতটা ভালবাসে। সে অনন্যার সাথেই খাতির জমায়।

অনন্যাও জিনাতকে অনেক পছন্দ করে। জিনাত মাঝে মাঝে বাসায় এসেও অনন্যার সাথে কথা বলে,গল্প করে,পড়া বুঝিয়ে দেয়। অনন্যা সবই বোঝে,কেন মূলত জিনাত এই বাসায় আসে,,কিন্তু নবীন পাত্তাই দেয় না। অনন্যা জানে নবীন এতদিন বিয়ে করে নি তার জন্যই। অনন্যা তাই নিজ দায়িত্বে নবীন আর জিনাতের বিয়ের ব্যবস্থা করে।

এবং অবশ্যই তার আশ্চর্য মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েই।

ফলে নবীন আর জিনাতের বিয়ের পর নবীন অনন্যাকে আবার কান ধরে জপতে বলে,,”আর জীবনেও আমার শক্তি দেখাব না,, আমার শত্রুরা আমাকে খুজে পাবে,মেরে ফেলবে,,,”

নবীনের বিয়ের কয়েকসপ্তাহ পর হঠাৎ মানববন্ধন হয়,,”মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা চাকরি পাচ্ছে না কেন?” এই টাইটেলে। তারা শ্লোগান দেয়,আমাদের দাদারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করছে,, আমরা যতই জি পি এ টু পাই না কেন,, সরকারের উচিৎ আমাদেরকে সরকারি চাকরি দেওয়া। বইলে কঠোর আন্দোলন হবে।

এই দাবিতে পুরো বাংলাদেশ সোচ্চার হলে,বাধ্য হয়ে সরকার বি সি এস করে আসা সরকারি চাকুরে,গেজেটেড অফিসারদের চাকরি থেকে ছাটাই শুরু করে,আর বীর মুক্তিযোদ্ধা দের জি পি এ টু পাওয়া মেধাবী সন্তানরা সরকারি চাকরিতে ঢুকতে থাকে,,এই ছাটাই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও চলে। নবীন আর জিনাত দুইজনের চাকরি ই চলে যায়।

তবে পুরনো বি সি এস দেওয়া রাজনৈতিক নেতাদের চাকরি ছাটাই হয় নি।

একে বিয়েতে টাকা খরচ। আবার জিনাতের বাবার একটা অপারেশনের দরকার হয়,সেখানে নবীন,জিনাত দুইজনেই প্রচুর টাকা খরচ করে। এখন এই মুহুর্তে মোটামুটি স্থায়ী চাকরি এভাবে চলে গেলে দুইজনেই বজ্রাহতের মত চেয়ে থাকে।

প্রথম দুই তিনমাস বেশি একটা কষ্ট হয় না। এর পরেই তিনজনের পরিবারটা অভাবে পড়ে,আগের দামী বাসাটা ছেড়ে দিয়ে একটা টিনশেড বাসায় থাকতে হয়।

নবীন পাগলের মত আশেপাশে চাকরি খুজতে থাকে। তবে এ যুগে দাড়ি টুপিওয়ালারা যতই যোগ্য হোক,তারা আবার যুদ্ধাপরাধী হতে পারে ভেবে নবীন কোথাও চাকরি পায় না। জিনাতও চাকরি খুজতে থাকে,কিন্তু বিয়ের পর নবীন তাকে বোরখা পরার নির্দেশ দেয়ায়,বোরখা পরেই ছুটাছুটি করে সে,,, কিন্তু বোরকাওয়ালীরা নাকি পড়াশুনা যাতে না, জ্ঞানী চাকরিদাতারা তাই বিসি এস করা জিনাতকে অ আ ক খ না পারায় চাকরি হবে না বলে তাড়িয়ে দেয়।

এরকম যখন সিচুয়েশন।তখন একদিন এক ইংরেজি পত্রিকায় নবীন একটা বিজ্ঞাপন দেখে,, চাকরির বিজ্ঞাপন, বেতন এক লাখ টাকা।বিশেষ কিছু লেখা নেই,যোগাযোগ করলেই বিস্তারিত বলা হবে।

জিনাতও দেখে ফেলে বিজ্ঞাপন টা। দুইজনই বলাবলি করে,”যা হবার ভালোর জন্যই হয়। এখন আমরা অনেক বেশি টাকার একটা চাকরি পেতে পারি। যা রিকুয়ারমেন্ট চাইছে,আমরা এর চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য।”

নবীন আর জিনাত ধানমন্ডির একটা পুরনো বাড়ির ঠিকানা দেখে রওনা দিল। তারা জানত না,এটাকে মানুষ ভূতের বাড়ি বলে,,, রাত বিরেতে নাকি এটা থেকে মানুষের গুমড়ে উঠা কান্নার আওয়াজ শোনা যায়……

৫.

এরিক পামার তার ল্যাবরেটির দিক চেয়ে আছে। বিশটা খাচা পুরো ফাকা। মানুষের লাশ নামিয়ে নিচ্ছে লবির এজেন্টরা। বাড়ির পিছনে লাশগুলোকে মাটি চাপা দিতে হবে,আর ল্যাবরেটরির গন্ধটাও দূর করতে হবে।

বিজ্ঞানীর পাশে কাল চশমা পরা একটা লোক দাড়ালো। বলল,,”তোমার কাজে আমরা মোটেও খুশি না এরিক। ৩ বছর আমাদের টাকা নিয়েছ তুমি। যখন যা চেয়েছ,দিয়েছি।কিন্তু বিনিময়ে আমরা বিকৃত, পচা গলা কয়েকটা লাশই পেয়েছি। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না।”

এরিক বলল,,”একটু সময় দাও প্লিজ। এটা বাংলাদেশ,মানুষ কোন ব্যাপার না এখানে।এজন্যই তো ঘাটি গেড়েছি। কেউ নিখোঁজ হলেও কেউ পাত্তা দেয় না। দরকার হলে আমরা আরো মানুষ আনব,,কাজের গতি আরো বাড়াব। আমি একটু উন্নতি দেখছি,,শেষের মানুষগুলো ৪৪০ ভোল্টের শক ২০ মিনিট ধরে খেয়েও বেচে ছিল। ”

লোকটা বলল,,”এত সময় দেয়া যায় না এরিক। সেরকম ফিজিওলজি তৈরি করা হচ্ছে না। তোমাকে তো আমরা রিপোর্ট দিয়েছিলাম”

এরিক বলল,,”আমি একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছি। তোমরা যেরকম চাও,আমার ল্যাবে ওরকম মানুষের ট্রেস পাবে যন্ত্রটা,যন্ত্রটা থেকে বুঝব,আমার এক্সপেরিমেন্ট সফল কিনা।”

লোকটা বলল,,”তো যন্ত্রটা কি বলে এরিক?”

এরিক মাথা নিচু করে রইল।

“এইটাই তোমার লাস্ট ব্যাচ এরিক। এটায় ব্যর্থ হল,তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে দেব আমরা।আর আমাদের অনেক কিছুই জেনে ফেলেছ তুমি। এবার আর বাঁচবে না। মেরে ফেলব তোমাকে।”

এরিকের অন্তরাত্মা কেপে উঠল।

এর মধ্যে বাইরের ক্যামেরায় একটা লোক, আরেকটা মহিলাকে দেখা গেল। কাল চশমা লোকটা বলল,,”শেষ ব্যাচের প্রথম শিকার এসে গেছে এরিক।”

নবীন আর জিনাতকে বাড়ির ভিতরে ঢুকানো হল। জিনাতের কেন যেন অশুভ লাগল বাড়িটা।চারদিকে কেমন যেন মৃত্যু ঘুরপাক খাচ্ছে।

নবীন আর জিনাত হলরুমে প্রবেশ করল। সাথে সাথে ল্যাবরেটরিতে থাকা এরিকের সুপার হিউম্যান নির্দেশক যন্ত্রটা সিগন্যাল দিতে লাগল।

লোকটা আর এরিক চোখ বড় করে তাকাল পরস্পরের দিকে। লোকটা বলল,,”এদের দুইজনের একজন হয়ত প্রকৃতিগত ভাবেই ওই ফিজিওলজি নিয়ে জন্মানো। আহাদ আহমেদ এর মত।”

এরিক বলল,,”শিওর হতে হবে,,,”

লোকটা একটা লেজার গান বের করল।বলল,,”যাদের ওই শক্তি আছে,এই লেজার ওদের গায়ে লাহলে কিছুই হয় না।”

সে জিনাতের দিকে ওটা তাক করে গুলি করল,,লেজার জিনাতের গায়ে লাগতেই,ওর শরীরটা গলে গেল। রক্ত ছিটকে উঠল।নবীন আর্তনাদ করে উঠল।

লোকটা বলল,,”তারমানে এই লোকটাই সেরকম,,,এ কিছু করার আগেই একে নিউট্রালাইজ কর।”

বাগান থেকে সেই বড় গান টা উঠে দাড়াল,কাঁদতে থাকা নবীনের মাথায় লাগল,, নবীন রেজার মত ওরকম অচল হয়ে গেল না। তবে অজ্ঞান হয়ে গেল।

জ্ঞান ফিরতেই দেখল নবীন খাচার ভিতরে।তার গায়ে কোন কাপড় নেই। তার খাচার আশেপাশে প্রায় ২০ জন লোক তার দিক তাকিয়ে আছে।

এরিক বলল,,”আহাদ আহমেদের মত এও প্রাকৃতিক?? ”

লোকটা বলল,,”আমার কেমন জানি সন্দেহ হচ্ছে। কিছু একটা মিলছে না।”

এরিক বলল,,”কি?”

লোকটা বলল,,”জানি না,,তবে মনে হচ্ছে এই লোকের কাছে সেই শক্তি নেই।তবে এমনো হতে পারে সে নিজেই জানে না এই শক্তির কথা। আমি শুনেছি আহাদও এটা জানত না,পরে অনেক স্ট্রেসের ভিতর তার শক্তি প্রথম প্রকাশ পায়।”

এরিক বলল,,”থাক,,কয়েকদিন গবেষণা করলেই বুঝব। তবে প্লান চেঞ্জ,আমার সম্পূর্ণ কোন ওষুধ তৈরি করতে হবে না। আমার তৈরি আগের স্যাম্পলে আমি এর শরীর থেকে পাওয়া অংশ মিলাব,,, লবির ধারণার বাইরে শক্তিশালী মানুষ তৈরি হবে।”

খাচার ভিতর থাকা নবীন “The Lobby” এর কথা শুনেই ভয়ার্তভাবে তাকাল। খুবই চেনা তার এই সংগঠন,খুব বেশি চেনা।

৬.

এক সপ্তাহ হয়ে গেল নবীন জিনাত বাসায় ফেরে না। অনন্যা চিন্তায় অস্থির। কোথায় কোথায় যেতে পারে সে খুজে এসেছে।জিনাত আর নবীনের পরিবার পুলিশে খবর দিয়েছে।পুলিশ দেখব বলে,টিভি দেখে ফেলেছে। কেউ আর উদ্ধার হচ্ছে না।

আহাদের ছোটভাই,যে প্রায়ই নবীনের বাসায় আসত ভাতিজিকে দেখতে। সে অনন্যাকে নিয়ে গেল। আহাদের বাবা মা নিজের নাতনির সাথে দুর্ব্যবহার করল। তাদের ধারণা এই মেয়ে আহাদের না। বাসার দারোয়ানের। 

অনন্যা সারাদিনরাত কাদে।তবে তার কাধে হাত রেখে চোখের পানি কেউ মুছে দেয় না। নবীনের কোন খোজ নেই।

এদিকে এক সপ্তাহ ধরে অনন্যা স্কুলে যায় না। রেজার একটা অভ্যাস হয়ে গেছিল,স্কুল ছুটির পর মেয়েদের বের হবার জায়গার দিক লুকিয়ে তাকিয়ে থাকার,অনন্যাকে একবার দেখার জন্য।

সাতদিন ধরে অনন্যাকে খুজে না পেয়ে সাইকেল চালিয়ে সে ঘুরে ঘুরে নবীনদের টিনশেড বাসায় যায়। ওখানের বাড়িওয়ালা বলে নবীন নিখোঁজ, অনন্যাকে তার চাচা নিয়ে গেছে তার দাদাবাড়ি।

রেজা সাইকেল চালিয়ে দাদাবাড়ি গিয়ে অনন্যার খোজ নেয়। অনন্যাকে একটা ছেলে খুজছে বলে অনন্যার দাদী অনন্যা আর তার মায়ের চরিত্র একবারে ধুয়ে দেয়। রেজা লজ্জিত হয়ে চলে আসে,কিন্তু জানালায় কান্নারত দুইটা লাল উৎসুক চোখ সে দেখতে পায়।

রেজা আর যায় না। একটু অন্ধকার হইলে রেজা জানালার কাছে যায়। জানালা টোকা দিতেই অনন্যা খোলে,এই প্রথম অনন্যাকে সে বোরখা ছাড়া দেখে।শুধু চোখ না,চোখের মালকিনের চেহারাটাও দেখে। তার কিশোর হৃদয়ে ঝড় ওঠে।

এদিকে অনন্যার কেন জানি রেজাকে দেখে মন একটু হালকা হয়। রেজা ওকে বলে,,”চিন্তা কর না,,আংকেল এসে যাবে বাসায়।”

অনন্যা কেদে দেয়। ওরা অনেকক্ষণ গল্প করে,তারপর রেজা চলে যায়।

এভাবে আরো দুইদিন রাতে জানালা ধরে কথা বলার পর একরাতে রেজাকে চোর ভেবে অনন্যার দাদী বটি নিয়ে তাড়া করায় অনন্যা সিদ্ধান্ত নেয় পরেরদিন থেলে স্কুলে যাবে।

স্কুলে গেল পরেরদিন। ছুটির পর বাওরে রেজাকে দেখে কিছুক্ষণ হাটল। রেজা জিজ্ঞেস করল,”আচ্ছা,আংকেল হঠাৎ কোথায় যেতে পারে? আন্টিও সাথে করে?তোমাকে বলে গেছে?”

অনন্যা বলল,,”আমি জানি না,,তারা চাকরি হারানোর পর সারাদিন চাকরি খুজত।হয়ত চাকরি খুজতেই গেছে।”

রেজা বলল,,”এই চাকরির খোজে তারা কি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে যেত?”

অনন্যা বলল,,”হ্যা হ্যা”

রেজা বলল,,”চল তো,,তারা যে পেপার পড়ত,সেই পেপারটা তাদের নিখোজ হবার এক সপ্তাহ আগে থেকে আনা প্রত্যেকটা কপির বিজ্ঞাপনগুলো পড়ে দেখি।”

ওরা পত্রিকার কপি কালেক্ট করল। পত্রিকারর বিজ্ঞাপন দেখল। অনন্যা বেশ কয়টা চিনল।রেজাকে বলতে লাগল,,”হ্যা হ্যা,,এখানে গিয়েছিল তারা,,চাকরি হয় নি, ফিরে এসেছিল,,তারপর আলোচনা করেছিল।”

রেজা এরকম পেপার ঘাটতে ঘাটতে নিখোজের একদিন আগের একটা বিজ্ঞাপন দেখল। দেখেই তার গলা শুকিয়ে গেল,, এক লাখ টাকা বেতনের বিজ্ঞাপন।  ঠিকানাটা খুবই মারাত্মকভাবে পরিচিত।

সে তার অসুস্থ হবাত কাহিনীটা অনন্যাকে বলল,,এও বলল,,”এই ঠিকানায় তো কোন মানুষ থাকে না। সবাই বলে এটা ভূতের বাড়ি।কিন্তু আমি এতে ভিডিও ক্যামেরা আর স্পিকার দেখেছি। আর কিছু মানুষের চিৎকার শুনেছি।”

অনন্যা আর রেজা নিশ্চিত হয়ে গেল সেই চিৎকার করা মানুষ দের কাতারে আছে নবীন আর জিনাত।

অনন্যা আর রেজা পুলিশের কাছে গেল। কিশোর বলে পাত্তা দিল না কেউ। আহাদের ছোটভাই,রেজার বাবা মা,এদের যখন আনল,পুলিশ শুনল পুরো ব্যাপারটা। কিন্তু উপরের নির্দেশ আছে,, রহস্যময় কোন ক্ষমতাশালী লোক,ওই ভূতের বাড়ির দিকে পুলিশ যাক,তা চায় না। তাই পুলিশ বলল,,”আচ্ছা,আমরা দেখব নে।”   এটা বলে তারা কথা রাখতে মোবাইলে পর্ন দেখল।

অনন্যা আর রেজা অসহায় হয়ে পড়ল। অনন্যা জেদ ধরে বসল। সে যাবেই তার পালক বাবাকে উদ্ধার করতে,সে সিওর ওখানেই আছে নবীন।

রেজা অনন্যার প্রতিজ্ঞা দেখে ভয় পেয়ে গেল। তার সেই নীলচে আলো চোখের ঝলকানি দেখা গেল।

৭.

এরিক পামার নবীনের উপর এক্সপেরিমেন্ট করে বুঝল,নবীনের কোন শক্তি নেই,, কিন্তু দীর্ঘসময় এরকম কোনো প্রচন্ড শক্তির আশেপাশে থাকায়,আর শরীর থেকে সেই শক্তিটা সামান্য প্রতিফলন হচ্ছে।

এরিক একটা প্লান করল। অনেক দিন শক্তি বিকিরণের কাছে থাকায় নবীনের শরীরে যতটুকু শক্তি এসেছে,সেটা সে এক্সট্রাক্ট করে লবিকে দেবে। আর নিজে নবীনকে অত্যাচার করে সেই শক্তির উৎসটা খুজবে,মানে সেই প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী মানুষটাকে,যার সাথে নবীন এতদিন ছিল। লবি এরিককে এমনিও খুন করবে,সেটা সেদিন এর হুমকিতেই বুঝেছে। এরিক তাই লবিকে বুঝাবে যে নবীনই আসল শক্তির ধারক,তার রক্ত থেকে পাওয়া স্যাম্পল দেবে ওদের। আর নিজে আসল শক্তিটাকে লোকেট করে তার থেকে এক্সট্রাক্ট করে বানাবে আরো শক্তিশালী স্যাম্পল।সেটা সে নিজের শরীরে নেবে। লবি আসুক তাকে খুন করতে,,দেখিয়ে দেবে।

এখন নবীনকে প্রচন্ড অত্যাচার করল সে। শক দিল,আঙুল কেটে দিল। নখ উপড়ে দিল। বল্পল,,”তুই নিশ্চয়ই ওরকম কোন শক্তির আশেপাশে ছিলি,,আমি জানি।  তুই আমাকে সেই শক্তির সন্ধান দিবি। আমি জানি সে আছে। আমি তার কাছ থেকে শক্তি নেব।”

নবীন এরিকের মুখে থু দিল।

এরিক নবীনের উপর অত্যাচার বাড়িয়ে দিল।

এদিকে নবীনের রক্ত থেকে সিরাম বের করে শক্তি বিকিরণ এর অংশটা নিজস্ব কেমিক্যাল প্রটোটাইপে ঢুকিয়ে এরিক লবির জন্য সুপার সোলজার/এজেন্ট এর ফর্মুলা বানাল।

এখন লবি যে এরিকের ল্যাবের কনায় কোনায় মাইক্রোফোন বসিয়ে রেখেছিল এরিক জানত না। লবি ওর প্লান ধরে ফেলেছিল।  তারাও খোজ নিচ্ছিল সেই শক্তিটার। সেটা মেয়েও হতে পারে,ছেলেও।

এরিক লবির এজেন্টকে ডাকল,কম শক্তির স্যাম্পলটা গছিয়ে দিতে। লবি তো আগেই সব জেনে গেছে। লবির এজেন্টরা এরিককে গুলি করল। নবীনের কাছ থেকে সেই সুপারপাওয়ার ওয়ালা ব্যক্তির সন্ধান চাইল। নবীন এবারো দিল না। এজেন্টরা নবীনকে নিয়ে যেতে চাইল।আরো অত্যাচার করে তথ্য নিতে।

এদিকে গুলি খাওয়া এরিক সেই লবিকে দেওয়া সিরামটা নিজের শরীরে পুশ করল।

মারাত্মক একটা ভুল,বা মারাত্মক একটা আশাতীত ফল হল। তিন বছর ধরে বানানো ব্যর্থ, মানুষকে বিভিন্নভাবে বিকৃত করা কেমিক্যালকে স্ট্যাবিলাইজ করল নবীনের শরীর দেখে বের হওয়া শক্তি সিরাম।

ফলশ্রুতি তে এরিকের দেহে পচন ধরল না। বরং তার সাইজ বাড়তে লাগল। ৫ ফুট এরিক আস্তে আস্তে ১৫ ফুট লম্বা হয়ে গেল। মাংসপেশি শক্ত,দৃঢ় আর বড় হয়ে গেল।

দাতগুলো চোয়ালের বাইরে চলে এল। হাড়গুলো ইস্পাতকঠিন হয়ে মাংস চিড়ে বেড়োতে লাগল। বিশাল এক দৈত্য হয়ে গেল সে।

লবির এজেন্ট রা গুলি করতে লাগল। আর এরিক ওদেরকে ধরে ধরে আছাড় দিতে লাগল,,কারো শরীর অর্ধেক করে ছিড়ে ফেলল।

 সবাই যখন মরে গেল।নবীনকে ঘাড় ধরে সে উঠাল। বিকট গলায় বলল,,”কই সে শক্তি? আমাকে বল,,না বললে আমি পুরো শহরের সবাইকে মেরে ফেলব। যে আমাকে বাধা দেবে,বুঝব সেই তেমন শক্তির ধারক। কিন্তু তাকে পাবার আগে এতগুলো মানুষের মৃত্যুর কারণ হবি তুই।”

নবীন বিকৃত মুখে বলল,,”জাহান্নামে যা,শয়তান।”

এরিক নবীন কে দেয়ালে ছুড়ে মারল। তারপর ছাদ ভেঙে বিশাল একটা লাফ দিয়ে দূরবর্তী বিল্ডিং এর মাথায় উঠল,সেখান থেকে নামল মেইন রোডে,রাস্তা ভেঙে টুকরা উচু হয়ে গেল। যানবাহন গুলো মানুষ সহ ছিটকে পড়তে লাগল। মানুষ আর্তনাদ করে ছুটোছুটি করতে লাগল।

এদিকে ওই বাড়ি থেকে একটা দৈত্যকে বের হতে দেখল সাইকেলে থাকা রেজা,,আর পিছে ক্যারিয়ার এ থাকা অনন্যা।

অনন্যা হা করে দানবটাকে চেয়ে দেখল।

অনন্যা বাবা বলে চিৎকার দিল। গেটটা উপড়ে পরে ছিটকে গেল। ওরা ভিতরে  দৌড়াতে লাগল। নবীন তখনো বেচে ছিল,মেরুদণ্ড ভাঙা অবস্থায় ক্রল করতে করতে দরজার দিক আসল। অনন্যা আর্তনাদ করে উঠল ওই অবস্থা দেখে,,”বাবা,বাবা ” বলে চিল্লাতে লাগল।

হঠাৎ অলরেডি ছাদ ভাঙা বাড়ি। আর দৈত্যটার ধ্বংস করা ল্যাবের আগুনে পুরো বিল্ডিং ধ্বসে পড়ল,অনন্যার চোখের সামনে নবীনের মাথার উপর পুরো ছাদ ধ্বসে পড়ল।

অনন্যা চিৎকার দিয়ে বসে পড়ল। রেজা ওকে জড়িয়ে রাখল। হাউমাউ করে কাদতে লাগল অনন্যা।

হঠাৎ মাটির নিচে থাকা জেনারেটর এ আগুন লেগে গেল,বিস্ফোরণ হল। মাটি ধ্বসে পড়তে লাগল। রেজা টানতে টানতে অনন্যাকে ওর সাইকেলে বসালো। সাইকেলে পেডাল দিতে লাগল জোরে জোরে,,পিছে মাটি ধ্বসে পড়ল,,গলির রাস্তা ধ্বসতে লাগল,,, পাশের দেয়াল গুলো সাইকেলের পিছে পিছে পড়তে লাগল।সাইকেলের গতি কমলেই নিশ্চিত মরণ,,,,,

গলির একদম মাথা এসে বুঝল রেজা, সাইকেল আর যেতে পারবে না,,পিছের চাকা ধ্বসের ভিতর ঢুকে গেল,সামনের চাকা উচু হয়ে গেল। অনন্যাকে নিয়ে সে বিশাল একটা লাফ নিয়ে মেইন রোডের কোণায় পড়ল।

মেইন রোডে তখন কিয়ামত চলছে,,রাস্তা থেকে গাড়ি দুইহাতে ধরে পাশের বিল্ডিং এ ছুড়ে মারতে লাগল। মানুষ পিপড়ার মত ছুটতে লাগল।

রেজা তার পাশে একটা ছুড়ে মারা ভেঙে পড়া বাস দেখল।অনন্যাকে নিয়ে বাসটায় লুকাল।

দানবটা রাস্তায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এদিকেই আসতে লাগল। একটা চলন্ত বাসকে ধরে ফেলল। ভিতরের মানুষ আর্তনাদ করে উঠল।

রেজা হঠাৎ দেখল,,দানবের হাত থেকে বাসটা ছুটে ধীরে ধীরে উপরে উঠছ্র,,দরজা জানালা ভেঙে পড়ছে,ভিতরের মানুষ গুলো আস্তে আস্তে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আশেপাশের বিল্ডিং এর বারান্দায় এসে পড়ল।

এই ভয়ের মাঝেও প্রত্যেকটা ছুটন্ত মানুষ থেমে গিয়ে কান্ডটা দেখতে লাগল। দানবটা অবাক হয়ে বাসটাকে দেখতে লাগল,,আস্তে আস্তে সেটা উপরে উঠছে।

রেজা বলল,,”অনন্যা,,অনন্যা,,দেখ।”

এই বলে অনন্যার দিক ফিরতেই ভয়ে রেজা ৫ হাত দূরে ছিটকে পড়ল।

অনন্যা বাসের পিছের সিটের ৩ হাত উপরে ভাসছে,, তার চোখে পানি,,,সুন্দর মুখটা প্রচন্ড রাগে বিকৃত। চোখটা সাদাটে নীল আলোয় জ্বলছে,,, আলোটা আস্তে আস্তে সারা বাসে ঠিকরে পড়ছে,,রেজা চোখ ঢাকল।

বাসটা থেমে গেল মধ্য আকাশে। ভাসছে ওটা,,ঠিক এরিকের মাথার উপর।

এক সেকেন্ডের কম সময়ে প্রচন্ড বেগে বাসটা আছড়ে পড়ল এরিকের মাথায়। এরিকের পনেরো ফুটের ইস্পাত কঠিন দেহ থেতলে গেল।বাসটা আবার উপরে উঠল,,আবার এরিকের উপর পড়ল,,যেন একটা বিশাল অদৃশ্যহাত বাসটাকে হাতে করে এরিককে হামানদিস্তার মত করে পিষতেছে।

বাসটা ততক্ষণই এভাবে উপরে উঠল,আর নিচে নামল,,যতক্ষণ পর্যন্ত এরিকের দেহটা ভর্তা না হয়ে গেল,,মাংসপিণ্ড না হয়ে গেল,,আকার আকৃতি বোঝার অবস্থায় না থাকল,,,, এরপর ভাঙাচোরা বাসটা রাস্তার পাশে পড়ে রইল।

রেজা দেখল অনন্যা দড়াম করে বাসের মেঝেতে পড়ে রইল।তার নাকমুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে।

এরকম অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা দেখার পর ধানমন্ডির লোকেরা আরেকটা আজব ঘটনা ঘটতে দেখল,, একটা কিশোর ছেলে একটা কিশোরী মেয়ের অজ্ঞান দেহ কাধে নিয়ে অনেক কষ্টে দৌড়াচ্ছে,, আর চিৎকার করছে,,”প্লিজ কেউ অনন্যাকে বাঁচান,,প্লিজ হাসপাতালে নিতে হবে ওকে।”

কিশোরী মেয়েটার নাক থেকে ফোটা ফোটা রক্তে ছেলেটার জামা ভিজে যাচ্ছে,,,,,,,,  

(পরবর্তী গল্প Dimension Origins:Part 3 তে Dimension এর অরিজিন স্টোরি সমাপ্ত হবে)